📄 বিচারক নিয়োগ প্রদান
খুলাফায়ে রাশিদুন শুধু যে মদীনা আর ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানীতেই বিচার পরিচালনা করেছেন, তা-ই নয়। বরং মদীনা এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলোতেও তাঁরা বিচারক নিযুক্ত করতেন। আমরা এখন বিচারক নিয়োগের চার ধরনের দৃষ্টান্ত লক্ষ করব।
ক) ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানীতে বিচারক নিয়োগ প্রদান। আবু বকর মদীনার বিচারকার্য পরিচালনার জন্য উমর -কে নিয়োগ দিয়েছিলেন। উমর খলিফা হওয়ার পর ইয়াজিদ ইবনু উখতিন নামির -কে বলেছিলেন, 'ছোটখাটো কিছু বিষয়ে তুমি আমাকে সাহায্য কোরো।' আবার আবুদ দারদা-কেও মদীনার বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। উমর সফরে গেলে অধিকাংশ সময়ই যায়িদ ইবনু সাবিত-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত বানিয়ে যেতেন। নাফে সূত্রে বর্ণিত আছে, 'যায়িদ ইবনু সাবিত -কে উমর বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্বে নিয়োগ দিয়েছিলেন। এ কাজের বিনিময়ে তাঁর জন্য ভাতাও নির্ধারিত ছিল।
ফিকহবিদ সাহাবিগণ ফতোয়া প্রদান করতেন। বিধিবিধান বর্ণনা, সালিশি, মতবিরোধ নিরসন-সহ নানান কাজে লোকেরা তাঁদের শরণাপন্ন হতো।
শাবি আবু হুরায়রা -কে বলতে শুনেছেন, নবি বলেছেন, 'বিচারব্যবস্থা আছে আনসারগণের মাঝে।
একবার উমর এবং উবাই -এর মাঝে মতপার্থক্য দেখা দিলে তাঁরা উভয়ই যায়িদ ইবনু সাবিত -কে সালিশ মেনে তাঁর কাছে গিয়েছিলেন।
প্রথম খলিফাত্রয়ের দীর্ঘ সময়কালে মদীনায় আলি -এর বিচারের সংখ্যা অনেক এবং সেসব প্রসিদ্ধও বটে। বিচারকদের নিয়োগ দানের বিষয়টি এভাবেই চলে আসছিল। অবশেষে খিলাফতের রাজধানী কুফাতে স্থানান্তরিত হয়। সাহাবিরা তখনও একইভাবে মদীনাতে ফতোয়া, সালিশি এবং বিরোধ নিরসন করতেন। আর কুফাতে বিচারকার্য পরিচালনা ছিল শুরাইহের দায়িত্ব। আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস তখন মদীনায় আলি -এর প্রতিনিধি ছিলেন।
খ) প্রাদেশিক শাসককে একইসাথে প্রশাসন এবং বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করা। এটাই ছিল দীর্ঘ রাশিদুন যুগের সামগ্রিক চিত্র। তখন সাধারণত এ পদ্ধতিই চলত। এই প্রশাসকদের কেউ কেউ তো নববি যুগ থেকেই তার দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। পরবর্তীকালে আবু বকর -ও তাদেরকে স্বপদে বহাল রাখেন। উমর, উসমান এবং আলি -এর যুগেও অনেকে সে পদেই বহাল ছিলেন। যেমন ইয়ামানের জাবেদ এলাকার প্রশাসক আবু মূসা আশআরি, জানাদ অঞ্চলের প্রশাসক মুআয ইবনু জাবাল, মক্কার প্রশাসক আত্তাব ইবনু উসাইদ, বাহরাইনের প্রশাসক আল-আলা ইবনুল হাদরামি এবং সানআর প্রশাসক উসমান ইবনু আবিল আস। খলিফারা অন্যান্য শহরেও আরও কিছু প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। যারা প্রশাসনের পাশাপাশি বিচারকার্যও পরিচালনা করতেন। খলিফাগণ কর্তৃক নিযুক্ত বিচারকের ক্ষেত্রে এমনটা আমরা লক্ষ করেছি। সাধারণত খলিফাদের প্রত্যেকেই পূর্ব থেকে নিয়োজিত প্রশাসক এবং বিচারকদের বহাল রাখতেন।
গ) কেবল বিচারকার্য পরিচালনার জন্য নিয়োগ প্রদান: শিক্ষাদান, রাষ্ট্রীয় কোষাগার দেখাশোনা, সদাকা সংগ্রহ ইত্যাদি কাজের মতো কেবল বিচারের জন্যও নিয়োগ দানের প্রচলন ছিল। তবে তারা প্রশাসকদের অধীনস্থ ছিলেন না। এ ধরনের বিচারক কেবল উমর, উসমান এবং আলি -দের যুগেই ছিলেন। আবু বকর কর্তৃক বিভিন্ন শহরে বিচারক নিযুক্ত করার বর্ণনা কোথাও পাওয়া যায় না। আমরা পরে এসব বিচারকদের নাম আলোচনা করব।
ঘ) খুলাফায়ে রাশিদুন কখনো কখনো বিভিন্ন শহরে নিযুক্ত প্রশাসকদেরও বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব দিতেন। এ ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় তারা সর্বাধিক উপযুক্ত ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নির্বাচন করতে সচেষ্ট হতেন। এই ধারাবাহিকতায় মুআয ইবনু জাবাল এবং আবু উবায়দা -কে শামে প্রেরণের সময় উমর তাঁদেরকে পত্র মারফত নির্দেশ দিয়েছিলেন, 'আপনাদের পূর্ববর্তীদের মতো সৎ এবং উপযুক্ত ব্যক্তি দেখে বিচারের কাজে নিয়োগ প্রদান করুন।
বিচারক নির্বাচনের নির্দেশনা দিয়ে আবু মূসা আশআরি -কে উমর লিখেছিলেন, 'সচ্ছল এবং অভিজাত বংশীয় ব্যক্তিকেই কেবল বিচারক নিযুক্ত করবেন। কেননা সচ্ছল ব্যক্তি অপরের সম্পদের প্রতি লোভ করে না। আর অভিজাত বংশীয় ব্যক্তি নিজের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন থাকে।
খলিফা অনেক সময় নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেয়ার জন্য প্রশাসক বরাবর নির্দেশনা পাঠাতেন। যেমন মিশরের সর্বপ্রথম মুসলিম বিচারক কায়স ইবনু আবিল আস -এর ইন্তেকাল হয়ে গেলে মিশরের তৎকালীন প্রশাসক আমর ইবনুল আস আমিরুল মুমিনীন উমর -কে পত্র মারফত বিষয়টি অবহিত করলেন। খলিফা উত্তরে আমর ইবনুল আস -কে নির্দেশ প্রদান করেন, তিনি যেন কাব ইবনু ইয়াসার -কে বিচারক নিয়োগ দেন।
খলিফারা প্রশাসক ও বিচারকদের সূক্ষ্মভাবে বাছাই করতেন এবং তাদের বিচারের যোগ্যতা পর্যবেক্ষণ করতেন। তাদেরকে বিভিন্ন উপদেশ ও দিকনির্দেশনাপূর্ণ চিঠি প্রদান করতেন। এজন্যই শুরাইহের মাঝে অন্তর্দৃষ্টি, বিচারকার্য পরিচালনার সূক্ষ্ম দক্ষতা, বিভিন্ন বিষয় অনুধাবনের যোগ্যতা এবং মামলা-মোকদ্দমা বিশ্লেষণ করার মতো তীক্ষ্ণ ধীশক্তি আছে দেখে উমর তাঁকে কুফার বিচারক বানিয়ে পাঠিয়েছিলেন।
আবদুল্লাহ ইবনু উমর-এর যোগ্যতা, অনুধাবনের শক্তি, বুজুর্গি, দুনিয়াবিমুখতা এবং তাকওয়ার কথা উসমান-এর ভালোমতোই জানা ছিল। তাই আবদুল্লাহ-কে তিনি বলেছিলেন, 'যাও, মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করো।' কিন্তু আবদুল্লাহ ইবনু উমর সবিনয়ে অব্যাহতি কামনা করলে খলিফা বললেন, 'বিচারের দায়িত্ব নিতে তোমার বাধা কিসের! তোমার বাবাও তো বিচার করতেন।
উমর, উসমান-সহ অন্যান্য অনেক সাহাবি সব ধরনের বিচার, বিভিন্ন ঘটনা-প্রবাহ এবং জটিল সমস্যার সমাধানে আলি-এর শরণাপন্ন হতেন। বিচার-সহ অন্যান্য বিষয়ে তাঁর সাথে তাঁরা পরামর্শ করতেন।
খলিফাগণ দুর্বল, পাপাচারী এবং মন্দ লোকদের বিচারক পদে নিয়োগ দেওয়া থেকে বিরত থাকতেন। উমর বলতেন, 'জেনেশুনে কোনো পাপাচারীকে যে ব্যক্তি নিয়োগ দেয়, সে নিজেও তার মতো পাপাচারী।' তিনি আরও বলতেন, 'পাপাচারীকে কেবল আরেকজন পাপাচারীই নিয়োগ দিতে পারে।' আবদুল্লাহ ইবনু উমর বলতেন, 'প্রতারককে কেবল প্রতারকই দায়িত্ব প্রদান করতে পারে।
উমর তো এ-ও বলতেন, 'কেউ যদি পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে কাউকে নেতা কিংবা বিচারক নিযুক্ত করে, তাহলে সেই নিয়োগপ্রাপ্ত নেতা বা বিচারক যে গুনাহ করবে-নিয়োগদাতারও সেই অংশ বহন করতে হবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি মুসলিমদের স্বার্থের প্রতি লক্ষ রেখে নেতা বা বিচারক নিয়োগ দেবে, সে নিযুক্ত ব্যক্তির সওয়াবের ভাগীদার হবে। তবে নিযুক্ত ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজ করলে সে ওই গুনাহের ভাগীদার হবে না।
আলি তাঁর নিযুক্ত প্রশাসক মালিক আশতারকে এক চিঠিতে দীর্ঘ নসিহত করেছিলেন। তাতে লিখেছিলেন,
'তোমার কর্মকর্তাদের যাবতীয় বিষয় পর্যবেক্ষণ করার দায়িত্ব তোমার। তাদের চরিত্র এবং যোগ্যতা ভালোমতো যাচাই করার পর তাদের নিযুক্ত করবে। কোনো ধরনের পক্ষপাত করে বা কারও দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তাদের নিয়োগ দিয়ো না। অভিজাত বংশীয়, অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, লজ্জাশীল, নেককার এবং প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারী পরিবারের লোকদের মধ্য থেকে নিয়োগ দিয়ো। কারণ এসব লোক বেশি সদাচারী হয়। তাদের আখলাক প্রশংসনীয়। তারা সাধারণত লোভী হয় না। কাজের পরিণতি সম্পর্কে তারা সচেতন থাকে। এরপর তাদেরকে পরিপূর্ণ বেতন দিয়ো।
টিকাঃ
[১৮৫] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১০৪-১০৫। উমর নিজের খিলাফতকালে আলি -কে কিছু দায়িত্ব গ্রহণ করতে বলেছিলেন। কারণ তিনি ছিলেন সাহাবিদের মধ্যে বিচার-বিষয়ক সর্বাধিক দক্ষ এবং অভিজ্ঞ। - আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১২ এবং আবকারিয়্যাতুল ইসলাম, পৃ. ৪৩৯ দ্রষ্টব্য।
[১৮৬] আখবারুল কুদ্দাহ: ১/১০৮
[১৮৭] প্রাগুক্ত
[১৮৮] মুসনাদে আহমাদ: ৮৭৪৬; সুনানুত তিরমিযি: ৩৯৩৬
[১৮৯] প্রাগুক্ত
[১৯০] রওম্বাতুল কুথাহ: ৪/১৪৮
[১৯১] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ১২৩, ১৪৯, ২১৪, ২১৪, ২৩৯
[১৯২] আল-মুগনি: ১০/৩৪
[১৯৩] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/৭৬-৭৭
[১৯৪] আল-উলাতু ওয়াল কুদ্বাহ, পৃ. ৩০২-৩০৩; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/১৩৫; আখবারুল কুদ্বাহ: ৩/২২০
[১৯৫] আখবারুল কুদ্বাহ: ২/১৮৯
[১৯৬] তবাকাতু ইবনি সাদ: ৪/১১০-১৪৩; হুসনুল মুহাদ্বারাহ: ২/৮৯
[১৯৭] তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৪৭
[১৯৮] আখবারুল কুদ্বাহ: ১/১৮১
[১৯৯] কানযুল উম্মাল: ৬/১৭ এবং ২০
[২০০] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৫৯
📄 স্বতন্ত্র বিচার বিভাগ
নববি যুগের বিচারব্যবস্থা সাধারণত শাসনব্যবস্থার সাথেই যুক্ত থাকত। আবু বকর-এর যুগে এবং উমর-এর প্রাথমিক যুগেও ব্যবস্থাপনা এমনই ছিল। রাসূল রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব একসাথেই পালন করতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রশাসকরাও প্রশাসনের দায়িত্ব এবং বিচারের দায়িত্ব একই সঙ্গে পালন করতেন। বিচারব্যবস্থার এই পদ্ধতি আবু বকর-এর যুগে, তারপর উমর-এর খিলাফতের প্রথম দিকে এভাবেই চলমান ছিল। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসন এবং বিচার বিভাগের মাঝে কোনো ব্যবধান দেখা যেত না। কিন্তু রাশিদুন যুগের পরিবর্তন-পরিবর্ধন, ইসলামি রাষ্ট্রের আধুনিকায়ন, ইসলামি খিলাফত, এবং মুসলিমদের অধীনে আসা বড় বড় প্রদেশের প্রশাসনিক কার্যক্রমে যে ব্যাপক উন্নয়ন আর বিস্তার ঘটেছিল, তার পেছনে একমাত্র অনুঘটক ছিল বিচক্ষণ খলিফা উমর-এর ব্যাপক চিন্তাধারা আর সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ। তিনিই জনস্বার্থের প্রয়োজনে রাষ্ট্রের সমস্ত বিষয় সুসংহত এবং সংগঠিত করেছিলেন। এমন যুগোপযোগী বানিয়েছিলেন-যার মাধ্যমে শরীয়ত, দ্বীন, ইসলামি দাওয়াহর প্রসার ঘটে এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়।
উমর ঠিক করলেন, প্রথমে রাষ্ট্রের যাবতীয় প্রশাসনিক কাজ পৃথক করে দেবেন এবং প্রতিটি কাজে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নিয়োগ করবেন। কারণ পররাষ্ট্রের যাবতীয় বিষয়, ইসলামি রাষ্ট্রের অন্তর্গত সব প্রদেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের জন্য তাঁকে অনেক পরিশ্রম করতে হতো। তাই সমস্ত প্রশাসনিক বিভাগের জন্য তিনি পৃথকীকরণ নির্দেশ জারি করলেন। ফলত প্রশাসনিক সব বিভাগ আলাদা হয়ে গেল। তখন প্রতিটি বিভাগ পরিচালনার জন্য তিনি স্বতন্ত্র লোক নিয়োগ প্রদান করলেন। এভাবেই প্রতিষ্ঠা লাভ করল স্বতন্ত্র বিচার বিভাগ। প্রায় সব শহর এবং অনুগত সব রাষ্ট্রে পৃথক পৃথক বিভাগ তৈরি করা হলো। এ ছাড়াও বিচারক এবং প্রশাসকের কার্যক্রম পৃথকীকরণের নির্দেশ জারি করলেন তিনি। ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানীর মতো বড় বড় শহরেও বিচারক নিযুক্ত করলেন। আবুদ দারদা-কে নিয়োগ দিলেন মদীনায়, শুরাইহ ইবনুল হারিসকে কুফায়, আবু মূসা আশআরি -কে বসরায়, কায়স ইবন আবিল আস-কে মিশরে, উবাদা ইবনুস সামিত -কে ফিলিস্তিন এবং শামের বিচার বিভাগে।
উমর -এর নীতি ছিল-কিছুসংখ্যক সাহাবিকে নির্দিষ্ট অঞ্চল এবং নির্দিষ্ট শহরের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করা। তাদের একজনকে বিচারকার্য পরিচালনা এবং বিবাদ নিরসনের জন্য নির্দিষ্ট করে দিতেন। এ ধারাবাহিকতায় তিনি কুফায় আম্মার ইবনু ইয়াসির, উসমান ইবনু হুনাইফ এবং আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদকে প্রেরণ করেছিলেন। তাঁদের কাজও তিনি ভাগ করে দিয়েছিলেন। এদের মধ্যে আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ -এর দায়িত্ব ছিল বিচারকার্য পরিচালনা এবং তালিম প্রদান করা।
মোটকথা, উমর-ই সর্বপ্রথম সমস্ত প্রদেশে স্বতন্ত্র বিচারক নিয়োগ দিয়েছেন। দায়িত্বশীল এবং প্রশাসকদের থেকে তাদের স্বতন্ত্র দায়িত্ব দিয়েছিলেন। কিন্তু নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব নিজের অধীনেই রেখে দেন। তাই দেখা যায়, বিচারকদের সাথে তাঁর পত্র মারফত যোগাযোগ রক্ষা হতো। অন্যদের কাছে তাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতেন। প্রশাসকদেরও বলতেন, তারাও যেন তাঁর সাথে নিয়মিত পত্র প্রেরণ করে এবং বিচারের ক্ষেত্রে তাঁর সাথে পরামর্শ করে। কোনো প্রশাসক যেন বিচারে কোনো রকম হস্তক্ষেপ না করে-এমন নির্দেশনাও তিনি দিয়েছিলেন। এ বিষয়ে আমরা সামনে আলোচনা করব।
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনু খালদুন লিখেছেন, 'উমর-ই সর্বপ্রথম অপরকে বিচারের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মদীনায় বিচারের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি আবুদ দারদাকে। কায়স ইবনু আবিল আসকে মিশরের বিচারপতির দায়িত্ব এবং আমর ইবনুল আসকে সেখানকার প্রশাসকের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন।
পৃথক বিচারব্যবস্থা সম্পূর্ণ অভিনব বিষয় হওয়ায় রাষ্ট্র এবং প্রশাসকদের কাছে এর ব্যাখ্যা নিয়ে অনেক মতানৈক্য হয়েছিল। কোনো কোনো দেশে বিচারক এবং প্রশাসকদের দায়িত্ব নিয়ে কলহ অবধি গড়ায়। শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আমিরুল মুমিনীন উমর -এর কাছে উত্থাপিত হলে তিনি খুব জোরালোভাবে বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথকীকরণের নির্দেশ প্রদান করেন। স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন, 'বিচারকরা পরিপূর্ণ স্বাধীন; তারা প্রশাসনের অনুগত নয়।'
বেশ কিছু জায়গায় এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। তন্মধ্যে একটি ছিল শামের প্রশাসক মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান এবং ফিলিস্তিনের বিচারক উবাদা ইবনুস সামিত -এর মধ্যকার মতবিরোধের ঘটনা। আওযায়ি বলেছেন, উবাদা ইবনুস সামিত ছিলেন ফিলিস্তিনের প্রথম বিচারক। তিনি একটি বিচারের ফয়সালা কার্যকর করলে মুআবিয়া সেটার বিরোধিতা করলেন। একপর্যায়ে তাঁর কথা কিছুটা কঠিন হয়ে যায়। তখন উবাদা বললেন, 'আপনার সাথে এক জমিনে আমি আর কখনোই বসবাস করব না।' এই বলে তিনি মদীনায় চলে গেলেন। উমর তাঁর চলে আসার কারণ জানতে চাইলে তিনি সব খুলে বললেন। সব শুনে উমর বললেন, 'ফিরে যান। যে ভূমিতে আপনি বা আপনার মতো মানুষ নেই, সেই ভূমি আল্লাহ তাআলার পছন্দ নয়।' আর মুআবিয়া-এর উদ্দেশ্যে তিনি পত্র লিখলেন: 'উবাদার ওপর আপনার কোনো কর্তৃত্ব নেই।'
এই ঘটনা থেকে উমর কর্তৃক প্রশাসন থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ নিশ্চিত হওয়া যায়। প্রশাসক মুআবিয়া থেকে বিচারক উবাদা-এর কার্যক্রম পৃথক করে, খলিফার সাথে বিচারকের সরাসরি সম্পর্ক এবং নির্বিঘ্ন যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। ফলে বিচার বিভাগের স্বাতন্ত্র্য নিশ্চিত হয়েছে। ইসলামি রাষ্ট্রে অঙ্কুরিত হয়েছে স্বাধীন বিচারব্যবস্থার বীজ।
কিন্তু এ স্বাতন্ত্র্য কোনো দিক থেকেই পরিপূর্ণ ছিল না। তাতে কোনো ধরনের সর্বজনীনতাও ছিল না। কারণ বিচার বিভাগ সাধারণত বিরোধ, অর্থবিধি, শারীরিক মোকদ্দমা এবং বিবেচনামূলক শাস্তির নিষ্পত্তিতেই পরিচালিত হতো। অনেক সময় খলিফা এবং প্রশাসকরা দণ্ডবিধি এবং অপরাধ-সংক্রান্ত বিচার নিয়েই মশগুল থাকতেন। এই বিষয়গুলি স্বাধীন বিচারকদের কাজের অন্তর্ভুক্ত থাকত না। হলেও কেবল আংশিকভাবে কিংবা ধাপে ধাপে হতো। কিংবা একেবারেই মন্থর গতিতে চলত। আবার স্বাধীন বিচারকের নিয়োগ-যে সব দেশে ব্যাপকভাবে চালু ছিল, তা-ও নয়। আসলে উমর মূলনীতি নির্ধারণ করেছিলেন। কোনো কোনো দেশে কিছু প্রশাসকের ব্যাপারে প্রয়োজন এবং জনস্বার্থ অনুযায়ী তা প্রয়োগ করছিলেন।
বিচার বিভাগের চূড়ান্ত পৃথকীকরণ প্রতিষ্ঠিত না হওয়া অবধি বিষয়টি এভাবেই চলছিল। অবশেষে বনু উমাইয়া এবং আব্বাসি যুগে প্রশাসক, শাসক এবং দায়িত্বশীলদের কর্তৃত্ব থেকে বিচার বিভাগ সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে যায়। এটি নিয়ে আমরা পরবর্তীকালে বিস্তারিত আলোচনা করব।
আসলে রাশিদুন যুগে স্বতন্ত্র বিচার বিভাগের বিষয়টি প্রাথমিক পর্যায়ে ছিল। কিছু বিচারক তখন প্রশাসন থেকে পৃথক হয়ে গিয়েছিলেন বটে। কিন্তু বেশির ভাগ প্রশাসকই অনেক শহর এবং অঞ্চলে প্রয়োজন এবং কল্যাণ অনুপাতে নির্ধারিত শারঈ আইনকানুন মেনে বিচারকার্য এবং নির্বাহী ক্ষমতা পরিচালনা করে আসছিলেন। তাদের সব কার্যক্রমই জনস্বার্থের সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল।
টিকাঃ
[২০১] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৭৯; আল-ইসলামু ওয়াল হাদ্বারাতুল আরাবিয়্যাহ: ২/১৩৪; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/৮
[২০২] ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২০
[২০৩] সুনানু ইবনি মাজাহ: ১৮; আল-ইসতীআব ফী মারিফাতিল আসহাব: ২/৪১২
[২০৪] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ১৭১
📄 দুর্নীতির বিচার এবং তদন্ত বিভাগ
প্রশাসক, উচ্চপদস্থ কর্মচারী, নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ জনসাধারণের প্রতি জুলুম বা অবিচার করলে, কিংবা আল্লাহর বিধানের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করলে বা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে, অথবা জনস্বার্থ বাস্তবায়ন থেকে সরে গেলে তাদের জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা এবং বিচারের আওতায় আনা ছিল 'কাদাউল মাযালিম' এর লক্ষ্য। আর 'কাদাউল হিসবাহ' এর লক্ষ্য ছিল আল্লাহর শরীয়ত এবং দ্বীন বাস্তবায়নের জন্য সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধ করা। যাতে ইসলামের বিধিবিধান আর নীতিমালা বাস্তবে প্রয়োগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা করা যায়। ইতিপূর্বে আমরা ইঙ্গিত করেছি, দুর্নীতির বিচার এবং তদন্ত বিভাগের সূচনা নববি যুগেই ঘটেছিল।
রাশিদুন যুগে দুর্নীতির বিচার এবং তদন্ত বিভাগের স্বতন্ত্র কোনো অস্তিত্ব বা কাঠামো ছিল না। কিন্তু তার মানে এটা নয় যে, এ বিভাগ দুটির কাজ তখন বন্ধ ছিল, কিংবা এর লক্ষ্য নিয়ে কারও মনে কোনো চিন্তা ছিল না। আসলে তা বাস্তবায়নে কারও উদাসীনতা ছিল না। এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে সকলের মনোযোগ ছিল একান্ত কেন্দ্রীভূত। এ কাজকে আরও বেগবান করার চিন্তা সকলেরই ছিল।
পূর্বে যেমনটা উল্লেখ করা হয়েছে, নববি যুগেই এর বীজ বপন করা হয়েছে। তারপর এর চারা উদ্গত হয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছে। তা বিস্তার লাভ করেছে রাশিদুন যুগের দীর্ঘ সময়ে। অবশ্য স্বতন্ত্র এ বিভাগ না থাকা সত্ত্বেও এর মূল লক্ষ্য ঠিকই বাস্তবায়িত হয়েছে। রাজনৈতিক, প্রশাসনিক আর সামাজিক পরিবেশ-পরিস্থিতি এবং মানুষের মাঝে থাকা উন্নত আধ্যাত্মিক দীক্ষা ছিল স্বতন্ত্র বিভাগ না থাকার অন্যতম কারণ। এজন্য দুর্নীতি দমন, তদন্ত-সহ বিভিন্ন অভিযোগের বিচারের জন্য স্বতন্ত্র কোনো ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠার যথাযথ কারণ বা উপসর্গ ছিল না। সে যুগের অধিকাংশ মানুষ নিজের দায়িত্ব আর কর্তব্য সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকত। তারা স্বপ্রণোদিত হয়ে তা পালন করত। নিজের অধিকার এবং অধিকারের সীমারেখা তাদের অজানা ছিল না। সে অনুপাতে তারা সীমাবদ্ধ থাকত। সামান্য পরিমাণও সীমালঙ্ঘন তারা করত না।
এটা ছিল তৎকালীন সমাজের সামগ্রিক চিত্র। সামান্য অসংগতি, ব্যত্যয় অথবা কোনো ধরনের পদস্খলন দেখা দিলেই ওত পেতে থাকা খিলাফতের উচ্চ আদালত আর প্রশাসনের মুখোমুখি হওয়া লাগত। যার মাঝে অবাধ্যতা, হঠকারিতা, সীমালঙ্ঘনের সম্ভাবনা থাকত, যে ব্যক্তি অবিচার বা ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে, কিংবা আল্লাহ তাআলার বাতলানো সরল পথ আর সঠিক রাস্তা থেকে বিচ্যুত হওয়ার প্রবণতা আছে-এমন ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হতো। এ বিষয়টির লক্ষ্য, মাধ্যম এবং উদ্দেশ্য যে খুলাফায়ে রাশিদুনের কাছে দিবালোকের মতো স্পষ্ট ছিল, তা ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা এবং বিচারের কাহিনি থেকে পরিষ্কার হয়।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু বকর-এর সর্বপ্রথম ভাষণ ছিল দুর্নীতির বিচার, অন্যায় প্রতিরোধ, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমস্ত মানুষের মাঝে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম সংক্রান্ত। আল্লাহর প্রশংসা ও স্তুতি বর্ণনার পর তিনি বলেছিলেন,
'হে লোকসকল! আমাকে আপনাদের দায়িত্বশীল বানানো হয়েছে। যদিও আপনাদের তুলনায় আমি উত্তম নই। আমি ভালো কাজ করলে আপনারা তবেই আমাকে সহযোগিতা করবেন। আর বিপথে চললে আমাকে সংশোধন করে দেবেন। সত্য আমানত, আর মিথ্যা হচ্ছে খিয়ানত। আল্লাহ চাহেন তো আপনাদের দুর্বল ব্যক্তিটি আমার কাছে সবল বলে বিবেচিত হবে, যতক্ষণ না তার ন্যায্য অধিকার তার কাছে ফিরিয়ে দেবো। ইনশাআল্লাহ, আপনাদের শক্তিশালী ব্যক্তিটি আমার কাছে দুর্বল বলে বিবেচিত হবে, যতক্ষণ না তার থেকে আমি অন্যের ন্যায্য অধিকার আদায় করব। ... আমি যতক্ষণ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের আনুগত্য করব, ততক্ষণ আমার আনুগত্য করবেন। যখন আমাকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের নাফরমানি করতে দেখবেন, তখন আমার আনুগত্য করা আপনাদের জন্য আবশ্যক নয়।'
আবু বকর বিভিন্ন শহরে নিযুক্ত প্রশাসকদের এবং যুদ্ধে বিজয়ী সেনাপতিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করতেন। আপামর জনগণের সাথে তাদের আচরণ কেমন সে খবর যেমন রাখতেন, তেমনি সাধারণ মুসলিমদের খোঁজখবরও নিতেন। সৎ কাজ প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় থেকে বাধা প্রদান ছিল তাঁর প্রধান কাজ। তাঁর যুগে সবচেয়ে বড় অন্যায় ছিল রিদ্দাহ তথা ধর্মদ্রোহিতা, যা শুরু হয়েছিল রাসূল-এর ইন্তেকালের পর। তিনি শক্ত হাতে এর প্রতিরোধ করেছিলেন। তাঁর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা এই কাজ বাস্তবায়ন করিয়েছিলেন।
খিলাফতের বাইয়াত গ্রহণের পর দুর্নীতি দমন এবং তদন্ত সংক্রান্ত বিচারের ক্ষেত্রে উমর তাঁর পূর্বসূরি আবু বকর-এর পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের সময় তাঁর বক্তব্য ছিল আবু বকর-এর মতোই। তিনি বলেছিলেন,
'তোমাদের মাঝে কেউ যত দুর্বলই হোক না কেন, আমি অবশ্যই তার কাছে তার প্রাপ্য অধিকার ফিরিয়ে দেবো। আবার তোমাদের মধ্যকার যে যত বেশি শক্তিশালীই হোক না কেন, আমি তার থেকে অপরের ন্যায্য অধিকার আদায় করব।
উদ্বোধনী ভাষণে আল্লাহর প্রশংসা এবং দুআ করার পর তিনি বলেছিলেন,
‘আমার কাছে বা আমার অনুপস্থিতিতে অন্যদের কাছে তোমাদের বিষয় আসবে। আল্লাহর শপথ করে বলছি, কেউ ভালো আচরণ করলে আমিও তার সাথে ভালো আচরণ করব। আর কেউ অপরাধ করলে আমি অবশ্যই তাকে সাজা দেবো। আমাদের উপস্থিতিতে যা হবে, তার ব্যবস্থা আমরা নিজেরাই করব। আর আমাদের অনুপস্থিতিতে যা হবে, তার দায়িত্ব থাকবে বিশ্বস্ত এবং শক্তিশালী লোকদের কাছে। সুতরাং যারা ভালো কাজ করবে, তাদের সুযোগ-সুবিধা আমরা বাড়িয়ে দেবো। বিপরীতে অপরাধীদের জন্য থাকবে শাস্তির পরোয়ানা।’
বিচার-সংক্রান্ত পরিকল্পনার ব্যাপারে তিনি বলেছিলেন,
‘জেনে রেখো, আমার কঠোরতাকে আমি আপাতত নম্রতা বানিয়ে রেখেছি। কিন্তু এ কথা ভুলে যেয়ো না যে, সেই কঠোরতা মুসলিমদের ওপর জুলুম ও নিপীড়নকারীদের ওপর আপতিত হবে। পক্ষান্তরে শান্তিপ্রিয়, অনুগত, দ্বীনদার এবং সদিচ্ছাবান ব্যক্তিদের প্রতি আমি তাদের নিজেদের পরস্পরের অপেক্ষা অধিক কোমল। কারও প্রতি জুলুম-নিপীড়নের সুযোগ আমি দেবো না। জালিমের এক গাল মাটিতে ঠেকিয়ে অপর গাল হাঁটু দিয়ে চেপে ধরব, যতক্ষণ না সে অন্যের অধিকার স্বীকার করে নেয়। এত কঠোরতার পরও সংযমী এবং যোগ্য লোকদের জন্য আমি থাকব কোমলপ্রাণ।
তোমরা জিহাদের মিশনে দূরে গেলে ফিরে আসার আগ পর্যন্ত আমিই তোমাদের পরিবারের দেখাশোনা করব। সুতরাং আল্লাহর বান্দাদের ব্যাপারে তোমরা আল্লাহকে ভয় করবে। নিজেদের বিপক্ষে গিয়ে হলেও আমাকে সহযোগিতা করবে। আমার বিরুদ্ধে তোমাদের নফসকে কোনো ধরনের সুযোগ দিয়ো না। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজে নিষেধের মাধ্যমে আমাকে সাহায্য কোরো, যদিও সেটা আমার বিপক্ষে হয়। আল্লাহ তাআলা আমাকে তোমাদের যে দায়িত্ব দিয়েছেন, সে ব্যাপারে আমার প্রতি কল্যাণকামিতায় কমতি কোরো না।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের দিন প্রদত্ত ভাষণে উমর রা. বলেছিলেন,
‘হে লোকসকল! তোমাদের কেউ যতই দুর্বল হোক না কেন, তার পক্ষ হয়ে তার অধিকার আমি আদায় করবই। আবার তোমাদের কেউ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, তার থেকে অপরের ন্যায্য অধিকার আমি ছিনিয়ে নেবোই।
আবু মূসা আশআরি -কে উমর দুর্নীতি এবং অন্যায় সংক্রান্ত বিচারকার্য পরিচালনার দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। তাঁকে বলেছিলেন, 'শাসকের ব্যাপারে মানুষের অনেক ঘৃণা রয়েছে। আপনি দণ্ডবিধি বাস্তবায়ন করুন। দিনের কিছু সময় হলেও সাধারণ মানুষের অভিযোগ শোনার জন্য বসবেন।
উমর নিজ খিলাফতের সুদীর্ঘ সময়ে দুর্নীতি এবং তদন্ত বিভাগীয় বিচারের মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন। তিনিই পরিচালনা করতেন দুর্নীতির বিচার এবং তদন্ত। বাজার তদারকি, দ্রব্যমূল্য যাচাই, প্রতারণার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা, মানুষের অধিকার হরণে বাধা প্রদান-সব তিনিই করতেন।
উমর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তাঁর নিযুক্ত সমস্ত প্রশাসকের কাজকর্মের পর্যালোচনা করতেন। তাদের কাছে জবাবদিহি চাইতেন। তাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অপরাধ সংঘটিত হলে সাজা দিতেন। জুলুমের অভিযোগ পেলে বিচার করতেন। প্রতি বছর হজের মৌসুমে সমস্ত প্রশাসকদের ডেকে পাঠাতেন। তাদের বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগ থাকলে শুনতেন। তাদের বদলা নিতেন। এটার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করা। বছরের মাঝখানে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ আসলে তাদের ডাকিয়ে এনে মজলুমদের ইনসাফপূর্ণ বিচার করে দিতেন। এ ক্ষেত্রে তিনি কোথা কী অবস্থায় আছেন, সেটা মূল বিবেচ্য ছিল না। ইতিহাসের পাতায় আজও অমর হয়ে থাকা একটি ঘটনা আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
মিশরের তৎকালীন প্রশাসক বিখ্যাত সাহাবি আমর ইবনুল আস -এর ছেলের সাথে জনৈক কিবতির মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে আমর-এর ছেলে সেই কিবতিকে অন্যায়ভাবে আঘাত করে। কিবতি মদীনায় এসে উমর-এর কাছে অভিযোগ জানায়। খলিফা তখন আমর ইবনুল আস এবং তাঁর ছেলেকে ডাকিয়ে এনে কিবতিকে বদলা নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। খলিফা এটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, ছেলের এ জুলুম করার দুঃসাহসের একমাত্র কারণ ছিল বাবার ক্ষমতা। এজন্য আমর ইবনুল আস-কে ভর্ৎসনা করে উমর যা বলেছিলেন তার উল্লেখ ইতিহাসের পাতায় আজও লিখিত আছে। তিনি বলেছিলেন, 'কখন থেকে তোমরা মানুষদেরকে দাস বানাতে শুরু করলে, অথচ তাদের মায়েরা তাদেরকে স্বাধীন হিসেবে জন্ম দিয়েছে?'
কর্মচারীরা হজের মৌসুমে মানুষের সামনে লাঞ্ছিত হওয়ার ভয়ে জনগণের ওপর জুলুম থেকে বিরত থাকত। মানুষের মাঝে ন্যায় আর ইনসাফ কায়েমে ত্রুটি করত না।
উমর যে একা একাই এ ধরনের অভিযোগের বিচার করতেন তা নয়। বরং বিখ্যাত তাবিয়ি আবু ইদরিস খাওলানি-কেও তিনি এ কাজে নিয়োগ দিয়েছিলেন। দুর্নীতি-সংক্রান্ত বিচারের দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত ছিল।
মানুষের মাঝে দুর্নীতি-সংক্রান্ত বিচারের ঘোষণা দিয়ে উমর বলেছিলেন,
'হে লোকসকল! আল্লাহর কসম, তোমাদের কাছে তো আমার প্রশাসকদেরকে তোমাদের শরীরে আঘাত করে সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়ার জন্য পাঠাইনি। বরং এজন্য পাঠিয়েছি, যাতে তারা তোমাদের দ্বীন শেখায় এবং জীবন-যাপনের পদ্ধতি শিক্ষা দেয়। তারা যেন তোমাদের মাঝে যথাযথ বিচার এবং ন্যায়সংগত ফয়সালা করে। যে এর অন্যথা করবে, তার বিরুদ্ধে আমার কাছে তোমরা নালিশ জানাবে। যে সত্তার হাতে উমরের প্রাণ তাঁর শপথ করে বলছি, আমি অবশ্যই তার বদলা নেবো। (অর্থাৎ মজলুমের পক্ষ হয়ে জালিমকে শাস্তি দেবো)।
উমর আরও বলতেন, 'আমার কোনো প্রশাসক যদি কারও প্রতি জুলুম করে, এরপর সে অভিযোগের বিচার আমার কাছে আসার পরও আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত না লাগে-তাহলে এর অর্থ হলো আমি নিজেই জুলুম করলাম।
এরপর উমর নিজের খিলাফতের শেষ দিকে দুর্নীতি এবং অভিযোগের বিচারের ক্ষেত্রে কঠিন এক ধাপ অতিক্রম করেছেন। এ কাজে তিনি অত্যন্ত প্রজ্ঞাপূর্ণ এবং সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার ঘোষণা দেন। কারণ তাঁর ভয় ছিল, মজলুম আর নিপীড়িত মানুষের প্রয়োজন হয়তো তাঁর পর্যন্ত পৌঁছবে না। আপামর সাধারণ মানুষের সাথে তাঁর যোগাযোগ হয়তো বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তাই তিনি বলেন, 'যদি বেঁচে থাকি তাহলে ইনশাআল্লাহ এক বছর যাবৎ সাধারণ মানুষের কাছে গিয়ে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেবো। আমি জানি, মানুষের অনেক প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেগুলো আমার কাছে পৌঁছে না। না প্রশাসকরা আমার কাছে সেসব পেশ করে, আর না সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজন নিয়ে আমার কাছে আসতে পারে। অতএব আমি শামে সফর করে সেখানে দুই মাস অবস্থান করব। তারপর বাহরাইনে যাব। সেখানে থাকব দুই মাস। এরপর যাব কুফায়। সেখানেও দুই মাস থাকব।... আল্লাহর কসম! এটা হবে চমৎকার একটি সময়।
সরকারি ও প্রশাসনিক উচ্চতর কর্মকর্তাদের তুলনায় আপামর জনসাধারণের সাথে খলিফা উমর অধিক ইনসাফের পরিচয় দিতেন। মজলুম ফাজারির ঘটনা এ ব্যাপারে প্রসিদ্ধ। ফাজারিকে থাপ্পড় দিয়েছিল জাবালা ইবনুল আইহাম। বেচারা ফাজারি তখন খলিফার কাছে অভিযোগ দায়ের করলে তিনি জাবালা থেকে কিসাস বা বদলা নেওয়ার ফয়সালা দেন।
উমর -এর চরিত্র-মাধুরী এমন ছিল যে, কারও সাথে ভুলবশত অসৌজন্যমূলক আচরণ করে ফেললে সাথে সাথে ওই ব্যক্তির কাছে বদলা নেওয়ার আবেদন জানাতেন। নিজের হাতে থাকা চাবুক সে লোকের হাতে দিয়ে বলতেন, 'হে অমুক! আমার কাছ থেকে তুমি বদলা নিয়ে নাও।'
নিজের ছেলের ওপরও দণ্ড প্রয়োগে তিনি কুণ্ঠাবোধ করেননি। ছেলের সাথে তাঁর আচরণ ছিল অপরাপর সাধারণ মানুষের মতোই।
দুর্নীতির বিচারের ইতিহাসে উমরের চরিত্র আজও আলোকজ্জ্বল। হাসান বসরি থেকে আবু ইউসুফ বর্ণনা করেছেন, এক লোক উমর -কে বলল, 'উমর! 'আল্লাহকে ভয় করুন।' এভাবে উমর -কে সে অনেক কটুকাটব্য করল। এ সময় আরেক ব্যক্তি তাকে বলল, 'চুপ করো। আমিরুল মুমিনীনকে তুমি যথেষ্ট কথা শুনিয়েছ।' উমর তখন দ্বিতীয় ব্যক্তিকে বললেন, 'তাকে বলতে দাও। তারা এমন প্রতিবাদ না করলে তাদের মাঝে কোনো ধরনের কল্যাণ থাকবে না। আবার আমাদের মাঝেও কোনো কল্যাণ অবশিষ্ট থাকবে না, যদি আমরা তার প্রতিবাদ গ্রহণ না করি'।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর জনতার উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণে উমর বলেছিলেন, 'আপনাদের কেউ আমার মাঝে কোনো অসংগতি বা ত্রুটি দেখলে তা ঠিক করে দেবেন।'
তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রেও তাঁর নীতি ছিল অভিন্ন। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ ছিল তাঁর নিত্যকর্ম। মানুষকে ন্যায়, সততা এবং সীরাতে মুস্তাকিম দেখিয়ে দিতেন। প্রতারণা আর প্রবঞ্চনা প্রতিহত করতেন। ধোঁকার ব্যাপারে সতর্ক করতেন মানুষকে। আবার রাতের বেলা তিনি ছিলেন অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর জীবনীতে লিখিত আপামর জনসাধারণের খোঁজখবর রাখার নমুনা ইতিহাসে আজও অনন্য। এসবের বিস্তারিত আলোচনা এই স্বল্প পরিসরে করা অসম্ভব।
শুধু-যে মদীনাতেই দুর্নীতি আর তদন্তের বিচার হতো এমন নয়। বরং মদীনার বাইরে অন্যান্য শহরের প্রশাসকরাও উমর-এর অনুকরণে, তাঁর বিচারের সাথে মিল রেখে তারাও দুর্নীতি আর তদন্ত বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। কারণ মানুষ তাদের শাসকদের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে। শাসক ইনসাফ করলে প্রশাসক বা অন্য কেউ জনগণের প্রতি জুলুম করার দুঃসাহস করে না। কারণ দায়িত্বশীলের মনে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানোর ভয় থাকে।
সে-সময় খলিফার কাছে তাঁর প্রশাসকরা কেবল নিজেদের কৃতকর্মের জবাবদিহিই করতেন না। বরং তাদের অধীনে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলি সম্পর্কেও তারা জিজ্ঞাসিত হতেন। উমর-এর নিযুক্ত প্রশাসকদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায়— ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, অন্যায়-অবিচার প্রতিরোধ, জবাবদিহিতা এবং আল্লাহর পর্যবেক্ষণের অধীনে থাকার অনুভূতির ক্ষেত্রে তারা উমর-এর চেয়ে কোনো অংশেই কম ছিলেন না।
আল্লাহর শরীয়ত বাস্তবায়ন, সত্য ও ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং মিথ্যা ও জুলুমের উৎখাত-সহ যাবতীয় বিষয়ে তারা ছিলেন এক ও অভিন্ন। এই আচরণই ছিল সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস, হিমসের প্রশাসক উমাইর ইবনু সাদ, আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ, মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান, সাঈদ ইবনু আমির-এর জীবনের প্রতিটি আচরণে এবং উচ্চারণে।
এর চেয়েও কঠোর নিয়ম ছিল এটা যে, কোনো ব্যাপারে প্রশাসকদের কাছ থেকে জবাবদিহিতা গ্রহণের সময় স্বয়ং খলিফার পক্ষ থেকে কোনো জুলুম হয়ে যায় কি না, সেটা নিরীক্ষণের জন্য দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামা -কে। তিনি ছিলেন খলিফা ও তাঁর নিযুক্ত প্রশাসক এবং প্রশাসক ও জনগণের মধ্যকার কাজের তদন্তকারী। তার প্রতি উমর-এর আস্থা থাকায় সব ধরনের বিচারের তদন্তে তাকেই পাঠাতেন। সাদ ইবনু আবি ওয়াক্কাস-এর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্তও তিনিই করেছিলেন। তার তদন্তে সে অভিযোগ ভুল প্রমাণিত হয়। একইভাবে আবু মূসা আশআরি, আমর ইবনুল আস, ইয়াজ ইবনু গানাম এবং আবদুল্লাহ ইবনু কুরত -সহ আরও অনেকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের তদন্ত করার দায়িত্ব তার ওপরই অর্পিত হয়েছিল।
আবু মূসা আশআরি -এর উদ্দেশ্যে প্রেরিত পত্রে উমর লিখেছিলেন, 'দিনের কিছু সময় হলেও দণ্ডবিধি কায়েম করুন। অন্যায়কারীদের তটস্থ রাখুন। সরাসরি একজন একজন লোক করে বিচার করবেন।
পরবর্তীকালে উসমান-ও উমরের নীতিই অনুসরণ করেছেন। তাঁর প্রণীত নীতিমালাই রক্ষা করে চলেছেন। বিভিন্ন স্থানে থাকা বাহিনীর সেনাপতিদের উদ্দেশ্যে প্রেরিত পত্রে তিনি লিখেছেন,
'উমর যে-সকল নীতি তোমাদের জন্য প্রণয়ন করে গেছেন, সেগুলো আমাদের অজানা নয়। বরং আমাদের সকলের সামনেই তিনি সেসব প্রণয়ন করেছিলেন। সুতরাং আমার কাছে যেন তোমাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের রদবদলের সংবাদ না আসে। এমনটা করলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের অবস্থা পালটে দেবেন। তোমাদের পরিবর্তে অন্য জাতিকে তোমাদের স্থলবর্তী করবেন।
উসমান তাঁর সমস্ত প্রশাসকদের এ নীতি জানিয়ে ফরমান জারি করেছিলেন, 'আল্লাহ তাআলা শাসকদের দায়িত্বশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। জনগণের কাছে তাদেরকে কেবল ট্যাক্স উসুলকারী হিসেবে প্রেরণ করেননি। ... মনে রাখবেন, মুসলিমদের যাবতীয় বিষয়ে মনোযোগী থাকাই সর্বাধিক ইনসাফপূর্ণ আচরণ। তাদের ন্যায়সংগত অধিকার যেমন প্রদান করবেন, তেমনি রাষ্ট্রের অধিকার তাদের থেকে আদায় করে নেবেন। অমুসলিম নাগরিকদের বিষয়ে সচেতন থাকবেন। তাদের ন্যায্য অধিকার যেমন বুঝিয়ে দেবেন, তেমনি অন্যায় হলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া চলবে না।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু লিখেছিলেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ সৃষ্টিজগৎকে ন্যায়সংগতভাবে সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং কেবল ন্যায়সংগত বিষয়ই তিনি গ্রহণ করবেন। অতএব, সত্যকে ধারণ করুন এবং ন্যায়সংগতভাবে অপরের হক প্রদান করুন। আর আমানতের ব্যাপারে খুব সাবধান থাকবেন। এমন যেন না হয় যে, আপনারাই আমানতের প্রথম খিয়ানতকারী হয়ে গেলেন। তাহলে তো পরবর্তীরা আপনাদের অর্জনে অংশীদার হবে। প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করার ব্যাপারে হুঁশিয়ার থাকবেন। বিশ্বস্ততা বজায় রাখবেন। ইয়াতিম এবং চুক্তিবদ্ধ ব্যক্তিদের প্রতি জুলুম করতে যাবেন না। কেননা আল্লাহ তাআলা স্বয়ং তাদের ওপর জুলুমকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন।'
প্রতিটি শহরে উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু -এর এ ফরমান জারি করা ছিল, 'কর্মকর্তা এবং তাদের বিপক্ষে অভিযোগকারীরা যেন হজের মৌসুমে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে। সে-সময় তিনি তাদের মাঝে মীমাংসা করে দেবেন।' তাদেরকে জবাবদিহির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলতেন, 'তোমরা একে অন্যকে সৎ কাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ হতে নিষেধ করবে। ঈমানদার ব্যক্তি যেন নিজেকে অপদস্থ না করে। দুর্বল যতক্ষণ মজলুম থাকবে, ততদিন পর্যন্ত আল্লাহ চাহেন তো আমি দুর্বলের পক্ষেই থাকব।'
উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু তাঁর শাসনামলের শেষ দিকে কিছু অভিযোগ এড়িয়ে গিয়েছিলেন। এসব অভিযোগের অধিকাংশই ছিল ব্যক্তিগত এবং অসৎ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তা ছাড়া কর্মকর্তাদের ব্যাপারে আপামর সাধারণ জনগণ সেসব বিষয় মেনেও নিয়েছিল।
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু বিচার, প্রশাসন, দুর্নীতির বিচার এবং তদন্তের বিচারের ক্ষেত্রে পূর্বের খলিফাগণের নীতি অনুসরণ করেছেন। প্রশাসক এবং বিচারকদের নিয়োগ দেওয়ার সময় তাদের জন্য তিনি নীতিমালা নির্ধারণ করে দিতেন। তাঁর নিযুক্ত এক কর্মকর্তার প্রতি তাঁর নির্দেশনা ছিল এমন: 'তাদের কাছে গেলে তাদেরকে শীতবস্ত্র বা গ্রীষ্মকালে পরার মতো কাপড় কিনে দিয়ো না। তাদের খাওয়ার জন্য খাদ্য সামগ্রী কিংবা কাজের জন্য বাহনও কিনে দেওয়ার দরকার নেই। এক দিরহামের কারণেও তাদের কাউকে চাবুক মেরো না। আমরা তো কেবল ক্ষমার নীতি গ্রহণের ব্যাপারেই আদিষ্ট।'
আলি প্রথমেই উসমান কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসকদের অপসারণ করেছিলেন। শহরের লোকদের বাইয়াত তাঁর কাছে পৌঁছার অপেক্ষা করেননি। কারণ তাঁর দৃষ্টিতে এসব প্রশাসক মুসলিমদের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার যোগ্য ছিল না। তাই সরকারি কর্মকর্তা, প্রশাসক এবং বিচারকদের (নতুনভাবে) নিয়োগ দিয়ে সবাইকে তিনি দিকনির্দেশনা আর উপদেশ দিয়েছিলেন। আশতার -কে মিশরের প্রশাসক নিযুক্ত করার সময়ও তিনি এমন দিকনির্দেশনাপূর্ণ পত্র দিয়েছিলেন। যা-তে তিনি লিখেছিলেন,
'জনগণের মধ্যে মীমাংসা করার জন্য নাগরিকদের সর্বাপেক্ষা সম্মানিত ব্যক্তিকে নির্বাচন করবে। সে এমন হবে, যে কিনা মামলা-মোকদ্দমা এলে মেজাজের ভারসাম্যতা হারায় না এবং বাদী-বিবাদী তাকে উত্তেজিত করতে পারবে না। নিজের ভুল বুঝতে পারলে গোঁ ধরে থাকে না, আবার সত্য চিনতে পেরেও তা গ্রহণে গড়িমসি করে না। না সে লোভী হবে, আর না ভাসাভাসা জ্ঞান দিয়ে বিচার করবে। সন্দেহজনক বিষয়ে সে থমকে যাবে, যুক্তি-প্রমাণের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দেবে এবং ফরিয়াদির দীর্ঘ কৈফিয়ত শোনার জন্য সে থাকবে মানসিকভাবে প্রস্তুত। সূক্ষ্ম নিরীক্ষণ এবং বিশদ বিশ্লেষণের মাধ্যমে মিথ্যা থেকে সত্য উদ্ঘাটনের কাজে তাকে অবশ্যই ধৈর্যের পরিচয় দিতে হবে। রায় প্রকাশের সময় সে হবে নির্ভীক। তোষামোদে গলে যায়, আবার প্ররোচনায় পথ হারিয়ে ফেলে—এমন লোক বিচারক হওয়ার যোগ্যতা রাখে না।
পত্রে তিনি আরও লিখেছিলেন,
'ইনসাফ প্রতিষ্ঠার যে দায়িত্ব আল্লাহ তোমার ওপর দিয়েছেন, তার জন্য কষ্ট স্বীকার করবে। মানুষের প্রতি নিজের থেকেও বেশি সুবিচার করবে। তোমার আত্মীয়স্বজন এবং নাগরিকদের মধ্যে যাকে তোমার বেশি পছন্দ, তাদের ক্ষেত্রেও ইনসাফের পরিচয় দিয়ো। এমনটা না করলে তুমি জুলুম করবে।'
সাহাবিদের মধ্যে আলি ছিলেন বিচারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি পারদর্শী। বিচারকার্য পরিচালনায় তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল সুদীর্ঘ। পাশাপাশি তাঁর ছিল বুজুর্গি, আল্লাহভীতি, দুনিয়া-বিমুখতা এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন ও শরীয়ত প্রতিষ্ঠার দুর্বার আগ্রহ। খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি নিজেই দুর্নীতির বিচার এবং তদন্ত বিভাগ পরিচালনা করতেন। এর অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে। এ ধরনের অনেক বিচারের বর্ণনা তাঁর বিচারের ইতিহাস এবং তাঁর জীবনীতে পাওয়া যায়। প্রশাসক এবং বিচারকদের নিয়োগ দিয়ে তিনি নিজেই তাদের তদারকি করতেন। তাদের কাজের খোঁজখবর রাখতেন।
আলি তাঁর পূর্ববর্তী খলিফাদের পুরোটা সময় এবং তাঁর নিজের শাসনামলেও সাধারণভাবে বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করেছেন। বিশেষভাবে তাঁর খিলাফতকালে দুর্নীতি এবং তদন্তের বিচারব্যবস্থা তিনি নিজেই পরিচালনা করতেন। বিভিন্ন শহর থেকে প্রশাসকদের বিপক্ষে তাঁর কাছে অভিযোগ আসত। এমনকি অমুসলিমদের পক্ষ থেকেও এ জাতীয় অভিযোগ উত্থাপিত হতো। একবার জনৈক প্রশাসকের বরাবর তিনি একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। যা-তে তিনি লিখেছিলেন,
'মূলকথা এই যে, তোমার দেশের সম্পদশালী লোকেরা তোমার বিরুদ্ধে কঠোরতা আর নিষ্ঠুরতার অভিযোগ করেছে। তুমি নাকি তাদের অবজ্ঞা করো এবং তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করে থাকো। বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার পর আমার কাছে মনে হয়েছে—তাদেরকে খুব কাছে টানা কিংবা দূরে সরিয়ে দেওয়াও ঠিক হবে না। অতএব তুমি রুক্ষ ব্যবহার কোরো না। বরং তাদের সাথে ঈষৎ কঠোরতা মিশ্রিত কোমল আচরণ করো। তোমার অবস্থান যেন কঠোরতা এবং নম্রতার মাঝামাঝি থাকে। আল্লাহর ইচ্ছায় ঘনিষ্ঠতা এবং দূরত্বের মাঝে সমন্বয় করে চলতে তুমি সচেষ্ট থেকো।'
কাব ইবনু মালিক ছিলেন আলি-এর পক্ষ থেকে নিয়োজিত প্রশাসকদের পর্যবেক্ষক। আলি এ ব্যাপারে তাকে লিখেছিলেন, 'আপনার কাজের দায়িত্ব অন্য কাউকে দিয়ে সঙ্গীদের নিয়ে কুরাতুস সাওয়াদ এলাকায় নিযুক্ত আমার প্রশাসকদের ব্যাপারে লোকদের থেকে খোঁজখবর নিন। দজলা এবং আযিবের মাঝামাঝি তাদের আচরণ লক্ষ রাখবেন।'
জুলুমের উৎখাত, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের অধিকার রক্ষা করার ব্যাপারে আলি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতেন। তিনি বলতেন, 'সত্যকে যে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে, সে ধ্বংস হয়ে যাবে। আল্লাহ তো এই উম্মতকে চাবুক এবং তরবারির মাধ্যমে সভ্যতার শিক্ষা দিয়েছেন। অতএব শাসকের কাছে কেউ কোনো ধরনের প্রশ্রয় পাবে না।'
সৎ কাজের আদেশ, অসৎ কাজ হতে নিষেধ এবং পরিমাপ আর ওজনের ব্যাপারে অপব্যবহারের ক্ষেত্রে আলি বলেন, 'বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। কিন্তু তার বিরোধিতা বা গতিরোধ করার মতো কেউ নেই। এর জন্য কেউ তিরস্কার করে না বা বিরত রাখে না। ... আল্লাহর অভিশাপ সেসব লোকদের প্রতি, যারা (অপরকে) সৎ কাজের আদেশ দেয় কিন্তু নিজেরাই সৎ কাজ বর্জন করে। আবার মানুষকে অন্যায়ের ব্যাপারে নিষেধ করে অথচ নিজেরাই তাতে লিপ্ত হয়।
জুলুমের ভয়াবহতা এবং তা থেকে মুক্ত থাকার ব্যাপারে তিনি বলতেন, 'আল্লাহর কসম, কিয়ামতের দিন আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের সাথে আল্লাহর কোনো বান্দার প্রতি জুলুমকারী আর দুনিয়ার সামান্য খড়কুটো ছিনতাইকারী হিসেবে সাক্ষাৎ করার চেয়ে, সিংহের পিঠের ওপর রাত কাটানো বা সিংহকে বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়া আমার কাছে বেশি পছন্দনীয়। অতি দ্রুত ক্ষয়প্রাপ্ত হতে চলেছে এবং দীর্ঘকাল মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকতে হবে, এমন মানুষের জন্য আমি কি কারও ওপর জুলুম করতে পারি?'
টিকাঃ
[২০৫] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ২৩
[২০৬] সীরাতু ইবনি হিশাম, ৪/৬৬১; তবাকাতু ইবনি সাদ: ৩/১৮২; আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া: ৬/৩০১; তারীখুল খুলাফা লিস সুযুতি, পৃ. ৬৯; শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১৭/১৫৯
[২০৭] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ২৩; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ, ১/১৭০
[২০৮] আখবারু উমর, পৃ. ৬২-৬৪
[২০৯] ইবনু আবিল হাদীদ, শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/৯
[২১০] শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/১২
[২১১] আল-কামিল ফিল ইসলাম, পৃ. ১০১; আখবারু উমার, পৃ. ১৪৯
[২১২] আখবারু উমার, পৃ. ১৫৬ ও ২२৫
[২১৩] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০১
[২১৪] তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৫; ইবনু খালদুন, আল-মুকাদ্দিমাহ, পৃ. ২২২
[২১৫] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০১; আখবারু উমার, পৃ. ২৩৮ ও ২৫৮; শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/২২, ৬৩
[২১৬] শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/২২
[২১৭] তারীখুত তবারি, ৩/২৭১; শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/৬১
[২১৮] ১৬ হিজরিতে পারস্য বিজয়ের পর ইয়ারমুকের যুদ্ধে রোমান সেনাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জাবালা ইবনুল আইহাম ইসলাম গ্রহণ করে মদীনায় আসে। আমিরুল মুমিনীন উমর তাকে উপঢৌকন প্রদান করেন। জাবালা মুসলিম হলেও তার স্বভাবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। একবার সে হজ করার জন্য মক্কায় গমন করে। সেখানে বাইতুল্লাহ তাওয়াফ করার সময় তার ইহরামের কাপড় জনৈক ব্যক্তির পায়ে লেগে খুলে যায়। জাবালা তখন রাগান্বিত হয়ে লোকটিকে এত জোরে থাপ্পড় মারে যে, তার নাকের হাড় ভেঙে যায়। সে তখন খলিফার কাছে নালিশ করলে তিনি জাবালাকে তলব করেন। ঘটনার সত্যতা জানতে চাইলে জাবালা সব স্বীকার করে। খলিফা তখন বলেন, 'তুমি নিজের অপরাধ স্বীকার করে নিয়েছ। এখন সম্ভব হলে এই লোককে খুশি করো। নয়তো তাকে বদলা নেওয়ার সুযোগ করে দাও।' জাবালা অহমিকার কারণে নিজেকে সব ধরনের নিয়মকানুনের ঊর্ধ্বে ভেবেছিল। তাই খলিফার কথা শুনে সে অবাক হয়ে বলে, 'আমি একজন নেতৃস্থানীয়। পক্ষান্তরে লোকটি নিতান্তই সাধারণ ব্যক্তি। আমরা পরস্পর সমান হই কিভাবে?' উত্তরে খলিফা বললেন, 'ইসলামের দৃষ্টিতে তোমরা দুজনই সমান।' জাবালা বলল, 'এমন হলে তো আমি পুনরায় খ্রিষ্টান হয়ে যাব।' উমর বললেন, 'তাহলে মুরতাদের শাস্তি হিসেবে তোমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে।' খলিফা ইনসাফ কায়েম করেই ছাড়বেন বুঝতে পেরে জাবালা পরদিন সকাল পর্যন্ত চিন্তা-ভাবনার সময় নেয়। সেই সুযোগে রাতেই মদীনা থেকে সদলবলে পালিয়ে কনস্টান্টিনোপলে সম্রাট হিরাকলের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে সে। সেখানে সে পুনরায় খ্রিষ্টান হওয়ার ঘোষণা দিলে হিরাকল তখন জাবালার জন্য একটি জায়গীর নির্ধারণ করে দেয়। বিস্তারিত ঘটনা জানতে, আখবারু উমার, পৃ. ২০৬ দেখা যেতে পারে।
[২১৯] আখবারু উমার, পৃ. ২০২ এবং ৩৫৯
[২২০] আখবারু উমার, পৃ. ৩২০ এবং ৩২২: শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/১০৪
[২২১] আল-খারাজু লিআবি ইউসুফ, পৃ. ১৩; আসসিয়াদাতু ফিল ইসলাম, পৃ. ১৮৫
[১২২] আখবারু উমার, পৃ. ৩৫২, ৩৫৬; শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১২/১৪, ৬৩
[২২৩] আখবারু উমার, পৃ. ১৭৩, ২৪১, ২৭১; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়্যাহ, পৃ. ৩১
[২২৪] আখবারু উমার, পৃ. ১৫০; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ২৯, ৩১
[২২৫] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ২২
[২২৬] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৫৪; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/২৬
[২২৭] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৫৪; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/২৬
[২২৮] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৫৪; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০৪
[২২৯] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৫৫
[২৩০] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৫৯
[২৩১] আল-কাদ্ধা ফিল ইসলাম, পৃ. ১০৫; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়্যাহ: ২/৫১
[২৩২] নিযামুল হকম, পৃ. ৫৫৯
[২৩৩] আখবারুল কুদ্বাহ লিওয়াকি: ২/১৯৬
[২৩৪] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৬১
[২৩৫] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৬২
[২০৬] প্রাগুক্ত
[২৩৭] নাহজুল বালাগাহ: ৮/২৪৪
[২৩৮] নাহজুল বালাগাহ: ১১/২৪৫
📄 বিচারকদের বেতন-ভাতা
বিচারক হচ্ছেন নিয়োগপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। প্রশাসকের মতো তিনিও নিজেকে মুসলিমদের জনস্বার্থে নিয়োজিত রাখেন। তাই তার বেতন-ভাতার ব্যবস্থা করা মুসলিমদের একান্ত কর্তব্য। মক্কার প্রশাসক আত্তাব ইবনু উসাইদ বিভিন্ন শহরে নিযুক্ত কিছু প্রশাসকদের জন্য রাসূলুল্লাহ ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন।
আবু বকর খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর মুসলিমরা তাঁর জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। যাতে তিনি ব্যক্তিগত আয়-রোজগারের পেরেশানি থেকে মুক্ত হয়ে মুসলিমদের রাষ্ট্র পরিচালনার কাজে নির্বিঘ্নে আত্মনিয়োগ করতে পারেন। খলিফা এবং তাঁর পরিবারের প্রয়োজন মিটে যায় এ পরিমাণ ভাতা নির্ধারণ করা হয়েছিল। উমর এবং তাঁর পরবর্তীদের সময়ে ভাতা নির্ধারণের বিষয়টি এভাবেই চলত।
রাশিদুন যুগে অধিকাংশ প্রশাসক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিচারকদের ভাতার বিষয়টি এভাবেই চলে আসছিল। কিন্তু নববি যুগে এবং আবু বকর -এর যুগে বিচারের জন্য নির্দিষ্ট ব্যক্তি নিয়োগ দেওয়া এবং তার জন্য ভাতা নির্ধারণের বিষয়টি পাওয়া যায় না। নববি যুগের পর বেতনের সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকলেও খলিফার জন্য ভাতা নির্ধারিত ছিল। সেইসাথে আগে থেকেই প্রশাসন এবং বিচারের দায়িত্ব পরিচালনা করে আসা প্রশাসকরাও কিছু সুবিধা পেতেন।
এরপর উমর -এর শাসনামলে তিনি বিচারের জন্য বিশেষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেন। তাদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ বেতন-ভাতা নির্ধারণ করেন। এ আইন প্রবর্তন করেন যে, বিচারকরা সরাসরি বাইতুল মাল তথা রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে অথবা বাইতুল মালের যে-কোনো বিভাগ থেকে, কিংবা দেশের বা অন্য শহরের খিলাফতের যে-কোনো অফিস থেকে বেতন তুলতে পারবেন। মানুষের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করতে তারা নিজেদের অন্য কোনো ব্যস্ততা থেকে মুক্ত রেখেছেন বলেই এই সুবিধা তারা পেতেন। কারণ বিচারকরা জীবিকার জন্য কোনো কাজে ব্যস্ত হলে সাধারণ জনগণের অধিকার খর্ব হবে।
ওপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এটা স্পষ্ট যে, উমর-ই সর্বপ্রথম বিচারকদের জন্য সরকারিভাবে ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই বাইতুল মাল পরিপূর্ণ প্রশাসনিকভাবে গঠিত হয়। প্রশাসনিক অন্যান্য বিভাগের মতো বাইতুল মালের কার্যক্রম এবং নীতিমালাও তিনি নির্ধারণ করেছিলেন। প্রশাসকদের কার্যক্রম থেকে বিচারকদের যাবতীয় কার্যক্রম সম্পূর্ণ পৃথক বানিয়ে দিয়েছেন। বিচারকদের বেতন নির্ধারণের ধারাবাহিকতায় সুলাইমান ইবনু রবীআ আল-বাহিলির জন্য বরাদ্দ করেছিলেন মাসিক পাঁচশ দিরহাম এবং শুরাইহের জন্য একশ দিরহাম।
পূর্বে নাফে সূত্রে ওয়াকি-এর বর্ণনা আমরা উল্লেখ করেছি, যায়িদ ইবনু সাবিত-কে বিচারক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর উমর তার জন্য ভাতা নির্ধারণ করেছিলেন। এ ছাড়াও আম্মার ইবনু ইয়াসির, উসমান ইবনু হুনাইফ এবং আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ-কে কুফায় পাঠিয়ে তাদের জন্য ভাতা নির্ধারণ করে দেন। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ কুফাবাসীদের শিক্ষকতার পাশাপাশি বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। সেখানকার রাষ্ট্রীয় কোষাগার দেখাশোনার দায়িত্বও তার ছিল। তার বেতন ছিল মাসে একশ দিরহাম এবং দিনে একটি বকরির এক-চতুর্থাংশ।
বিচারকদের বেতন বৃদ্ধির ব্যাপারে উমর সবসময় সচেষ্ট থাকতেন। কেননা তাদের বেতন বৃদ্ধিতে জনস্বার্থ জড়িত থাকে। মুআয ইবনু জাবাল এবং আবু উবায়দা-কে শামে পাঠানোর সময় খলিফা তাদের উদ্দেশ্যে লিখেছিলেন, 'আপনাদের পক্ষ থেকে কিছু যোগ্য লোক দেখে বিচারকের দায়িত্বে নিয়োগ দিন। তাদের বেতন বাড়িয়ে দেবেন। আল্লাহ তাআলার দেওয়া সম্পদ থেকে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা করে দিন।
উসমান-এর শাসনামলে বিচারকদের ভাতার বিষয়টি উমর-এর যুগের মতোই অব্যাহত ছিল। বরং উসমান-এর সময়ে বিচারক, প্রশাসক-সহ তাবৎ মানুষের বেতন-ভাতা আগের তুলনায় বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়েছিল। হাসান বসরি বলেছেন, 'উমর এবং উসমান উভয়ই ইমাম, মুয়াযযিন, শিক্ষক এবং বিচারকদের বেতন-ভাতা দিতেন।'
আলি -এর যুগেও বিষয়টি এভাবেই চলছিল। বিচারকদের ভাতা বৃদ্ধির জন্য উমর -এর নীতি আলি -এর জন্য সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিল। বিচারকের ব্যাপারে মিশরের প্রশাসক আশতার -কে আলি বলেছিলেন, 'বিচারকের জন্য এ পরিমাণ খরচ করবে, যার মাধ্যমে তার সংকট দূর হয়ে যাবে। প্রয়োজনে মানুষের কাছে তার হাত বাড়ানোর দরকার পড়বে না।'
বিচারক শুরাইহ -এর নির্ধারিত মাসিক ভাতা যেখানে ছিল পাঁচশ দিরহাম, সেখানে খলিফাতুল মুসলিমীন আলি ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অল্পেতুষ্ট দুনিয়াবিমুখ ব্যক্তি। সামান্যতেই পরিতৃপ্ত হতেন তিনি। বাইতুল মাল থেকে পাওয়া দৈনিক এক পাত্র পরিমাণ ছারিদই তাঁর যথেষ্ট হয়ে যেত।
এভাবেই বাইতুল মাল থেকে প্রশাসক, সরকারি কর্মকর্তা এবং বিচারকদের প্রয়োজন অনুপাতে দেশভিত্তিক বেতন-ভাতা প্রদান করা হতো। বিচারকদের ভাতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্য ছিল একেবারে সুস্পষ্ট। এমনকি বিচারকগণ তাদের বেতন অগ্রীম পেতেন।
টিকাঃ
[২৩৯] আখবারু উমার, পৃ. ৩৪৮; তারীখুল উমামিল ইসলামিয়িয়্যাহ : ১/১৯১
[২৪০] আখবারু উমার, পৃ. ৩৫০
[২৪১] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৯; আখবারু উমার, পৃ. ১৪৬; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৮; তারীখুল কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ১৬২
[২৪২] আখবারুল কাদ্বা লিওয়াকি: ১/১০৮; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৭
[২৪৩] আখবারু উমার, পৃ. ১৪৫; আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৬-৪৭
[২৪৪] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৩২৬; নিযামুল হুকমি ফিশ শারীআহ, পৃ. ২১১; আল-মুগনি: ১০/৩৪
[২৪৫] উসমান নিজে ছিলেন হাতখোলা ব্যক্তি। সাধারণ মানুষ এবং সরকারি কর্মকর্তাদেরও তিনি হাত খুলে দান করতে উৎসাহিত করতেন। আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৫৫ দ্রষ্টব্য।
[২৪৬] আখবারু উমার, পৃ. ১৪৫; শারহু নাহজিল বালাগাহ: ১৭/৫৯
[২৪৭] আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ২৯; আখবারুল কুদ্ধাহ: ২/২২৮; তারীখুল কাদ্বা, পৃ. ১৫৩
[২৪৮] আল-ইদারাতুল ইসলামিয়িয়্যাহ, পৃ. ৪৭; আল-কাদ্বা ফিল ইসলাম, পৃ. ৩০