📄 নববি যুগের বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
সমস্ত ইসলামি যুগের মাঝে নববি যুগে বিচারব্যবস্থার কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল। এর মধ্যকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
১) নববি যুগের বিচারব্যবস্থা ইসলামের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সে যুগেই এর সূচনা হয়। বপণ করা হয় ইসলামি বিচারব্যবস্থার বীজ। সেই সময়টাকে বিচারব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর বলা চলে। তখনই এর গোড়াপত্তন হয়। যার ওপর দৃশ্যমান হয়েছে ইসলামি, মানবিক এবং জাগতিক ইতিহাসের সুউচ্চ ভবন। কিয়ামত অবধি যার উন্নয়ন, উত্তরণ ঘটতে থাকবে। কেননা রাসূল-কে আল্লাহ তাআলা সত্য দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মাঝে তা প্রয়োগের জন্য তিনি ছিলেন আদিষ্ট। তাই তাঁর বিচারব্যবস্থা ছিল ন্যায়ের সুস্পষ্ট চিত্র এবং সর্বাধিক সুন্দর অবস্থা। কারণ সত্য আর ন্যায়কে স্থান আর কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ করা যায় না।
২) সে যুগে বিচারব্যবস্থা এবং সত্য আর ন্যায়ের সম্পর্ক ছিল আকাশের সাথে। সরাসরি আল্লাহর তত্ত্বাবধানে। তাই তো বিধান-সংবলিত ওহি নাযিল হতো। সত্যের নির্দেশনা আসত। নির্ণয় করে দেওয়া হতো সরল এবং সঠিক পথ। ঊর্ধ্বজগৎ থেকে তা বাস্তবায়ন আর প্রয়োগের দেখভাল করা হতো। কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে সংশোধন করা এবং সঠিক পন্থা বাতলে দিতে নেমে আসত ঐশীবার্তা। ওহির ধারার পরিসমাপ্তি ঘটার পর এমন আর হয় না। নবুওয়ত শেষ হয়ে যাওয়ায় সেসবের পুনরাবৃত্তি হবে—এমন স্বপ্নও কেউ দেখে না। ওহির মাধ্যমে কত যে গবেষণা এবং বিধানের স্বীকৃতি মিলেছিল!
৩) রাসূলুল্লাহ ছিলেন প্রথম বিচারক। বিচারব্যবস্থার একমাত্র দায়িত্বশীল। নির্বাচিত নবি, মনোনীত রাসূল আর নিষ্পাপ শরীয়তপ্রণেতা হওয়ায় আল্লাহর রাসূল নিজেই বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। নবুওয়ত ধারণের লক্ষ্যে আল্লাহ তাঁকে নির্বাচন করেছিলেন। দ্বীন প্রচারের জন্য তাঁকেই মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ওহি এবং পাপমুক্তির মাধ্যমে তাঁকে জুগিয়েছিলেন শক্তি। আরও দিয়েছিলেন অনন্য বুদ্ধিমত্তা ও জীবনীশক্তি, চমৎকার দেহসৌষ্ঠব, চমৎকার আকৃতি, সুমহান চরিত্র, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং ক্ষুরধার মেধা। ফেরেশতারা তাঁকে পাহারা দিয়ে রাখত এবং তাঁর কদম সোজা করে দিত। তাই তো তাঁর বিচারব্যবস্থা প্রসিদ্ধ। সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ বিচারক তিনি। শীর্ষস্থানীয় বিচারকের আসনটি তাঁরই অধীনে।
৪) দ্বীনদারি, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, মেধা, অভিজ্ঞতা, শক্তি, উদ্যম এবং বিশ্বস্ততা দেখে নবি সাহাবিদের মাঝে বিচার এবং প্রশাসন পরিচালনার উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করতেন। সত্য এবং ন্যায়পরায়ণতার পাথেয় জোগান দিয়ে তাদেরকে দিক-নির্দেশনা আর উপদেশ প্রদান করতেন। আবার এমনও হয়েছে যে, ধার্মিক দুনিয়াবিমুখ হওয়া সত্ত্বেও আবু যার-এর আবেদন নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'তুমি তো দুর্বল'। আবদুর রহমান ইবনু সামুরা-কে দায়িত্ব চেয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন।
৫) বিচারক এবং প্রশাসকদের প্রতি রাসূলুল্লাহ লক্ষ রাখতেন। তাদের রায় ও হুকুম নবিজির সামনে উত্থাপিত হতো। যেসব বিধান শরীয়ত আর দ্বীনের অনুকূলে থাকত, সেগুলো তিনি সমর্থন করতেন। আর শরীয়ত পরিপন্থি হলে শুধরে দিতেন।
৬) বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব হলো সার্বজনীন দায়িত্বের অংশবিশেষ। এ কারণেই রাসূল আইনগত দায়িত্ব প্রদানের সাথে সাথে কার্যকরকরণ, বিচারিক তত্ত্বাবধান এবং অনুসন্ধানের দায়িত্বও প্রদান করতেন। তাঁর নিযুক্ত বেশির ভাগ বিচারকই সাধারণত বিচারকার্য যেমন পরিচালনা করতেন, তেমনি তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও আঞ্জাম দিতেন। বিচারব্যবস্থার সাথে অন্যান্য দায়িত্বের পার্থক্য খুব কমই হতো। শুধুমাত্র কলহ নিরসন আর দাবি-দাওয়া নিষ্পত্তির কাজে নিয়োজিত আলাদা বিচারক বলতে গেলে ছিলই না।
রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত কুরআন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন। রাষ্ট্র পরিচালনা এবং কলহ নিরসন আর মোকদ্দমা নিষ্পত্তি ছিল তাঁরই দায়িত্ব। পাশাপাশি মানুষের মাঝে শরীয়তের বিধানও তিনি বাস্তবায়ন করতেন। আবার নিয়োগকৃত প্রশাসক এবং বিচারক সাহাবিদের রায় ও হুকুমের প্রতিও তাঁর নজর ছিল। এভাবেই তিনি এক হাতে রাষ্ট্রের সবকিছু সামলাতেন।
বিধান বাস্তবায়ন করা, নামাজ কায়েম, যাকাত ও সদাকা একত্রকরণ, মানুষকে দ্বীনি বিষয় বিশেষত কুরআন তিলাওয়াত এবং শরীয়তের বিধানাবলি শিক্ষা প্রদান ছিল তাঁর নিয়োগকৃত বেশির ভাগ বিচারকদের দায়িত্ব। মুআয ইবনু জাবাল, আলি ইবনু আবি তালিব, আবু মূসা আশআরি এবং আল-আলা ইবনুল হাদরামি -কে নিয়োগদানের বিষয়টি লক্ষ করলে এটাই স্পষ্ট হয়।
৭) নববি যুগের বিচারব্যবস্থা সাধারণত ফতোয়া প্রদান কিংবা সালিশব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্য রাখত। মুসলিমরা সাধারণত বাস্তব বিরোধ অথবা প্রকৃত বিবাদের কথা না-বলে বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান কী হবে—আল্লাহর রাসূল বা তাঁর নিয়োগকৃত বিচারকের কাছে সেটা জানতে চাইতেন। সে যুগে মোকদ্দমার সংখ্যা ছিল কম। রাসূল -এর কাছে বিধান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানিয়ে দিতেন। তখন তারা ফিরে গিয়ে সওয়াবের আশায় আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বিধান পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নে লেগে যেতেন। বিরোধের বর্ণনা দেওয়ার সময় বাদী-বিবাদী উভয়ই স্বেচ্ছায় হাজির থাকতেন। শরীয়তের বিধান শোনার পর সেটা কার্যকর করতে তারা কোনো রকম বিলম্ব করতেন না।
৮) নববি যুগে বিচারব্যবস্থা ছিল সহজ। এজন্য বড় কোনো আয়োজন ছিল না। আবার মোকদ্দমাও কম আসত। কিন্তু তার উন্নতির জন্য সর্বজনীন নীতিমালা, মৌলিক ভিত্তি, সামগ্রিক মূলনীতি এবং সদুদ্দেশ্য ছিল বিধায় সময় এবং স্থানের চাহিদা অনুপাতে তাতে গবেষণা করার সুযোগ ছিল। ফলশ্রুতিতে নববি যুগের বিচারব্যবস্থা সমস্ত যুগের মুসলিমের জন্যই কুরআন কারীমের পর আইনের দ্বিতীয় উৎস হয়ে ওঠে। এজন্যই রাসূলুল্লাহ মোকদ্দমা দায়েরের নিয়ম, বিচারের নীতিমালা, শুনানি প্রক্রিয়া, বিচারের রায় এবং কার্যকরের বিধানাবলি বাতলে দিয়েছেন। যাতে সর্ব যুগের সমস্ত স্থানের মানুষ এ ক্ষেত্রে দিশা লাভ করতে পারে।
৯) বিচারব্যবস্থা পরিচালনা এবং মোকদ্দমা দায়েরের নীতিমালার দিক থেকে নববি যুগের বিচারক পূর্ণ স্বাধীনতা রাখতেন। রায় প্রদান এবং গবেষণার ক্ষেত্রে কোনো রকম চাপ ছিল না। কুরআন-হাদিস মানার পর নিজের চিন্তা, বুদ্ধিমত্তা এবং বিচক্ষণতাকে উন্মুক্তভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল। বিচারক এবং প্রশাসককে নিয়োগ দানের পর নবি তাকে ন্যায় নিশ্চিত করার জন্য ছেড়ে দিতেন। যেমন হুযাইফা -কে বলেছিলেন, 'যাও, তাদের মাঝে ফয়সালা করো।' আত্তাব ইবনু উসাইদ -কে বলেছিলেন, 'চলো, বাইতুল্লাহর পড়শিদের দায়িত্বে তোমাকে নিযুক্ত করছি।' তাঁর নির্দেশনা ছিল: প্রথমে কিতাবুল্লাহর, তারপর সুন্নাহর শরণাপন্ন হতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুপাতে গবেষণা করা যাবে।
১০) স্পষ্টবাদিতা ছিল নববি যুগের বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। সব ধরনের অবকাশ প্রদান, আনুষ্ঠানিকতা এবং জটিলতা থেকে তা মুক্ত ছিল। দ্রুত মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করে চটজলদি তা বাস্তবায়নও করে ফেলা হতো। ফলে বিচারব্যবস্থার লক্ষ্যের বাস্তবায়ন যেমন ঘটত, তেমনি অধিকার রক্ষা, ইনসাফ কায়েম এবং জুলুম আর সীমালঙ্ঘন নির্মূলের মতো বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্যও পূরণ হতো।
১১) সে যুগে অভিযোগের তদন্ত এবং নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত ফয়সালা সাধারণ বিচারব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত ছিল। বিচারক সব ধরনের বিচার করার যোগ্যতা রাখতেন। সর্বজনীন আর পরিব্যাপ্ত ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারও বিচারকের ছিল।
টিকাঃ
[১৭৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৫
[১৭৪] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫৬২; সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৬২২ ও ৭১৪৭
[১৭৫] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ৯৯