📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 মুআয ইবনু জাবাল

📄 মুআয ইবনু জাবাল


তার উপনাম ছিল আবু আবদির রহমান। তিনি ছিলেন সাহাবিদের মাঝে হালাল-হারাম সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী। হিজরতের ২০ বছর আগে ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। সহনশীলতা, লজ্জা এবং বদান্যতায় তিনি ছিলেন মদীনার যুবকদের সেরা। হিজরতের আগে আকাবার বাইয়াতে এবং পরে নবি-এর সাথে সমস্ত যুদ্ধাভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
তাবুক যুদ্ধের পর নবি তাকে ইয়ামানে শিক্ষক এবং বিচারক নিযুক্ত করে পাঠান। তার সাথে দেওয়া ইয়ামানবাসীদের উদ্দেশ্যে লেখা পত্রে নবি লিখেছিলেন, 'আমার পরিবারের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিটিকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করলাম।' মুআয সেখানে আবু বকর এ-এর খিলাফতকালেও অবস্থান করেছিলেন। অবশেষে উমর-এর খিলাফতের সময় তিনি সেখান থেকে ফিরে শামে জিহাদরত মুজাহিদদের সাথে অংশগ্রহণ করেন। আবু উবায়দা আমওয়াসের মহামারি তথা প্লেগে আক্রান্ত হলে মুআয-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করলে উমর -ও তাকে সে পদে বহাল রাখেন। সে বছরই ১৮ হিজরি মোতাবেক ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে জর্দানের সীমান্ত অঞ্চলে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তাকে ইয়ামানে প্রেরণের সময় নবি-এর সাথে তার কথোপকথন সংবলিত হাদিস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ছিলেন ইয়ামানের একাংশের প্রশাসক এবং বিচারক। সেখানে তিনি কয়েকটি বিচারকার্যও পরিচালনা করেন।
আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ বলেছেন, মুআয ইবনু জাবাল ইয়ামানে জনৈক মৃত ব্যক্তির এক বোন ও এক মেয়েকে তার উত্তরাধিকার সম্পত্তি আধাআধি ভাগ করে দিয়েছিলেন। নবি-এর জীবদ্দশাতেই তিনি এ ফয়সালা করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তার সামনে ছিল মেয়ের সাথে বোনকে জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার নীতি। আরেকবার 'ইসলাম বৃদ্ধি করে, হ্রাস করে না'—এই যুক্তিতে একজন মুসলিমকে তার ইহুদি ভাইয়ের উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। এ ছাড়াও মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘটনা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। উমর-এর খিলাফতকাল অবধি তিনি ইয়ামানের বিচারক ছিলেন।
তিনি প্রতিদিন নিজ বৈঠকে বলতেন, 'আল্লাহ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। যারা সন্দেহ পোষণ করে, তারা ধ্বংস হয়। আলিমদের বিভ্রান্তির ব্যাপারে সতর্ক থেকো। কেননা শয়তান কখনো কখনো আলিমদের মুখ দিয়ে বিভ্রান্তিমূলক কথা বের করে থাকে। তাদের থেকে হক কথা শুনতে পেলে তা গ্রহণ কোরো। কেননা, হকের মধ্যে নূর নিহিত থাকে।'

টিকাঃ
[১৫৫] আল-ইসাবাহ: ৬/১০৬; উসুদুল গাবাহ: ৫/১৯৪; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৪৩
[১৫৬] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৮৯৩; আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/৯৯-১০০
[১৫৭] ইলামুল মুওয়াকিয়ীন: ১/১১২

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আলা ইবনুল হাদরামি

📄 আলা ইবনুল হাদরামি


তিনি মূলত হাদরামাউতের অধিবাসী ছিলেন। তার বাবা মক্কায় থাকার কারণে সেখানেই তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। তিনি যে-দুআ করতেন, সেটাই কবুল হতো। মাত্র কয়েকটি কথা বলে তিনি সাগরে নেমে পড়েছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম পারস্যের দ্বীপ জয় করেন এবং যুদ্ধের জন্য সর্বপ্রথম সাগর পাড়ি দেন।
৮ম হিজরিতে নবি তাকে বাহরাইনের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। যাকাত সংগ্রহ করার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত থাকায় যাকাতের পদ্ধতি কী হবে, সে সংক্রান্ত একটি পত্রও তাকে দিয়েছিলেন। বাহরাইনের লোকদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা, সেখানে শরীয়ত প্রতিষ্ঠা এবং জুলুমের দমন করা ছিল আল-আলা -এর দায়িত্ব।
বনু আবদুল কায়সের উদ্দেশ্যে প্রেরিত ফরমানে নবি লিখেছিলেন, ‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের তরফ থেকে আল-আকবার ইবনু আবদিল কায়সের প্রতি।... আলা ইবনুল হাদরামি হচ্ছে বাহরাইনের জলে-স্থলে, নগরে, সৈন্যদের মধ্যে এবং সেখানকার উৎপাদিত ফসলের মাঝে আল্লাহর রাসূলের তরফ থেকে তত্ত্বাবধায়ক। বাহরাইনবাসীর দায়িত্ব হলো সব ধরনের অনিষ্ট হতে তাকে রক্ষা করা এবং জুলুমের মোকাবিলায় তার পাশে দাঁড়ানো। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করা হবে এবং জিহাদের সময় তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করা হবে। এই নির্দেশের মাঝে কোনো রকম রদবদল করা হবে না।'
অন্য বর্ণনায় আছে, উট, গরু, বকরি, ফল-ফসল এবং সম্পদের ক্ষেত্রে যাকাতের হার কী হবে, আল-আলা -কে নবি সেটা লিখে দিয়েছিলেন। আল-আলা সেটা মানুষকে শুনিয়ে তাদের থেকে যাকাত উসুল করতেন। এ ছাড়াও তাকে বাহরাইনের বিচারক নিযুক্ত করার সময় যে পত্র দেওয়া হয়েছিল, সেটা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সাহাবি সে পত্রের ব্যাপারে সাক্ষী ছিলেন।
নবি-এর ইন্তেকালের সময় আল-আলা বাহরাইনের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর আবু বকর এবং উমর-ও তাকে সে পদে বহাল রাখেন। পরবর্তীকালে উমর তাকে বসরায় প্রেরণ করলে তামীম এলাকার কাছাকাছি পৌঁছলে পথিমধ্যেই তার ইন্তেকাল হয়ে যায়। কারও কারও মতে, বাহরাইনেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এটা ২১ হিজরি মোতাবেক ৬৪২ খ্রিস্টাব্দের কথা।

টিকাঃ
[১৫৮] তাবাকাতু ইবনি সাদ: ১/২৮৩
[১৫৯] তাবাকাতু ইবনি সাদ: ১/২৬৩
[১৬০] তাবাকাতু ইবনি সাদ: ১/২৭১
[১৬১] আল-ইসাবাহ: ৪/২৫৯; তাহযীবুল আসমা ১/৩৪১; আল-আলাম: ৫/৪৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আত্তাব ইবনু উসাইদ

📄 আত্তাব ইবনু উসাইদ


তার উপনাম আবু আবদির রহমান। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশীয়। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। বিজয়ের পর নবি মক্কা থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তাকে সেখানকার প্রশাসক ও বিচারক নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। হিজরতের ১৩ বছর পূর্বে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। রাসূল-এর পরে আবু বকর এ-ও তাকে সে পদে বহাল রাখেন। আবু বকর এবং তার ইন্তেকাল একই দিনে হয়েছিল। অন্য বর্ণনামতে, আবু বকর-এর ইন্তেকালের সংবাদ যেদিন মক্কায় এসে পৌঁছে, সেদিনই তার ইন্তেকাল এবং দাফন হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَاجْعَلْ لِي مِن لَّدُنْكَ سُلْطَنَا نَصِيرًا আপনার পক্ষ থেকে আমাকে সাহায্যকারী ক্ষমতা দান করুন।
এর আলোচনায় আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস বলেছেন, 'আত্তাব ইবনু উসাইদকে রাসূলুল্লাহ মক্কার প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। তখন জালিমের বিরুদ্ধে মজলুমের জয় হয়েছিল।' জাবির ইবনু আবদিল্লাহ বলেছেন, আত্তাব ইবনু উসাইদকে মক্কার প্রশাসক নিযুক্ত করার সময় নবি তার ভাতা ৪০ উকিয়া রুপা নির্ধারণ করেছিলেন। অন্য বর্ণনায় আছে, তার জন্য প্রতিদিন এক দিরহাম নির্ধারণ করেছিলেন। এটাই ছিল (ইসলামের ইতিহাসে) প্রথম সরকারি কর্মচারীর ভাতা।

টিকাঃ
[১৬২] সূরা ইসরা, ১৭:৮০
[১৬৩] ১ উকিয়া = ১০.৫ তোলা/১২২.৪৭২ গ্রাম
[১৬৪] আল-ইসাবাহ: ৪/২১১; তাহযীবুল আসমা: ১/৩১৮

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আমর ইবনুল আস

📄 আমর ইবনুল আস


মিশর বিজেতা হিসেবে তিনি প্রসিদ্ধ। ইতিহাসের অন্যতম মহান কুশলী এবং বিচক্ষণ ব্যক্তি। হিজরতের ৫০ বছর আগে ৫৭৪ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। জাহিলি জীবনে তিনি ছিলেন ঘোর ইসলামবিরোধী। ৭ম হিজরিতে খায়বার যুদ্ধের বছর হাবাশায় ইসলাম গ্রহণ করেন। তারপর মদীনায় এসে ইসলামের ঘোষণা দেন। নবি যাতুস সালাসিল অভিযানে তাকে সেনাপতি নির্ধারণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাকে ওমানের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। পরবর্তীকালে আবু বকর তাকে শাম অভিমুখে জিহাদের সেনাপতি বানিয়ে প্রেরণ করেন। অবশেষে উমর -এর খিলাফতকালে শাম বিজিত হয়। এ ছাড়াও তিনি কিনসিরিন জয় করেন এবং হালব, মানবিজ এবং আনতাকিয়ার অধিবাসীদের সাথে সন্ধি করেন।
উমর তাকে ফিলিস্তিনের প্রশাসক নিযুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে মিশরের দায়িত্ব দিলে তার হাতেই তা বিজিত হয়। উসমান-এর খিলাফতকালে চার বছর সেখানকার প্রশাসক ছিলেন। সিফফিন যুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন অন্যতম সালিশ। ৩৮ হিজরিতে মুআবিয়া তাকে পুনরায় মিশরের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। অবশেষে ৪৩ হিজরি মোতাবেক ৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইহজগতের সফর সমাপ্ত করেন।
নবি যে তাকে মদীনায় একটি মোকদ্দমা নিষ্পত্তির দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সে ঘটনা আমরা পেছনে উল্লেখ করেছি。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00