📄 আলি ইবনু আবি তালিব
তার উপনাম ছিল আবুল হাসান। তিনি একাধারে নবি -এর চাচাতো ভাই এবং নবি দুহিতা ফাতিমা -এর স্বামী। হিজরতের ২৩ বছর আগে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। নবিগৃহে তিনি লালিত পালিত হন। ছোটবেলায়ই ইসলাম গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন কনিষ্ঠদের মাঝে সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী। যেমন সাহসী বাহাদুর ছিলেন, তেমনি ছিলেন বাগ্মী বক্তা। তিনি ছিলেন একসাথে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবির অন্যতম, উমর -এর ওসিয়তকৃত ছয়জন উপদেষ্টার একজন এবং খুলাফায়ে রাশিদিনের মধ্যে চতুর্থ। ১৭ রমজান ৪০ হিজরিতে তিনি বিশ্বাসঘাতকের হাতে গুপ্তহত্যার শিকার হন। কুরআন, ফারায়েজ, শরীয়তের বিধানাবলি, ভাষা এবং কবিতায় তিনি পণ্ডিত ছিলেন। সাহাবাদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনায় তার দক্ষতা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। নবি তাঁকে ইয়ামানের বিচারক হিসেবে ইয়ামানে প্রেরণ করার সময়কার কাহিনি আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। সাহাবিরাও তার বিচারকার্যের শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।
আলি কৃত ফয়সালাগুলো আলিমগণ সংকলন করেছেন। আমরা সেখান থেকে নববি যুগে কৃত কেবল একটি ফয়সালার কথা উল্লেখ করেই তার প্রসঙ্গের আপাত ইতি টানব। ঘটনাটি ছিল চারজন লোকের সিংহ শিকারের গর্তে পতিত হওয়া সম্পর্কে। ইয়ামানের লোকেরা সিংহ শিকারের জন্য ফাঁদ পেতেছিল। এই ফাঁদ তারা এভাবে তৈরি করত যে, গভীর গর্ত করে ঘাস আর লতাপাতা দিয়ে তা ঢেকে রাখা হতো। বনের পশু চলতে গিয়ে সেই গর্তে পড়ে যেত। একদিন একটি সিংহ তাদের পেতে রাখা ফাঁদে আটকা পড়ে। লোকেরা উৎসাহী হয়ে গর্তের কিনারায় দাঁড়িয়ে সিংহ দেখছিল। ধাক্কাধাক্কিতে হঠাৎ এক ব্যক্তি গর্তে পড়ে গেল। সে পড়ে যাওয়ার সময় আরেক ব্যক্তিকে আঁকড়ে ধরে। ফলে দ্বিতীয় ব্যক্তিও গর্তে পড়ে গেল। কিন্তু পতিত হওয়ার সময় সে তৃতীয় আরেক ব্যক্তিকে ধরে ফেলে। তৃতীয় ব্যক্তি পড়ে যাওয়ার সময় চতুর্থ আরেক ব্যক্তিকে ধরে ফেলে। এভাবে একে একে চারজন ব্যক্তি গর্তে পড়ে গিয়ে সেখানে থাকা সিংহের হাতে প্রাণ হারায়। বিষয়টি নিয়ে নিহত হওয়া ব্যক্তির আপনজনেরা তাদের বিচারক আলি -এর কাছে মোকদ্দমা দায়ের করল। তিনি ফয়সালা দিলেন, যারা গর্ত খনন করেছে তাদের থেকে রক্তপণ গ্রহণ করা হবে। তবে এর পদ্ধতি হবে স্বাভাবিক থেকে একটু ভিন্ন। প্রথম ব্যক্তির জন্য হবে দিয়তের এক-চতুর্থাংশ। কেননা সে গর্তে পড়ে মারা গেছে বটে, তবে অন্য তিনজনের মৃত্যুর কারণও সে। দ্বিতীয় ব্যক্তির জন্য হবে দিয়তের এক-তৃতীয়াংশ। কারণ তার কারণে দুজন ব্যক্তির মৃত্যু ঘটেছে। তৃতীয় ব্যক্তির কারণে একজনের মৃত্যু ঘটায় তার জন্য থাকবে অর্ধেক দিয়ত। আর চতুর্থ ব্যক্তি পূর্ণ দিয়ত পাবে। লোকেরা এই ফয়সালা মেনে নিতে অসম্মতি জানিয়ে পরের বছর নবি-এর কাছে উপস্থিত হয়ে তারা পূর্ণ ঘটনার বিবরণ দিলো। সব শুনে আলি-এর ফয়সালা বহাল রেখে তিনি বললেন, 'সে তোমাদের মাঝে যে ফয়সালা করেছে, সেটাই ফয়সালা'।
টিকাঃ
[১৫২] আল-ইসাবাহ: ৪/২২৩; উসুদুল গাবাহ: ৩/৫৮৪; আল-ইসতীআব: ৩/৬৯
[১৫৩] যাদুল মাআদ: ৫/১৪; ইলামুল মুওয়াক্কিক্বয়ীন: ২/২০
📄 আবু মুসা আশআরি
তার প্রকৃত নাম আবদুল্লাহ ইবনু কায়স। উপনামেই তিনি প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। সিফফিন যুদ্ধের সময় আলি এবং মুআবিয়া-এর মধ্যকার অন্যতম সালিশ ছিলেন তিনি। হিজরতের ২১ বছর আগে ৬০২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইয়ামানে জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম প্রকাশিত হওয়ার পরপরই তিনি নিজ ভাইদের-সহ একটি দলের সাথে মক্কায় উপস্থিত হন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি স্বদেশে ফিরে যান। নবি তাকে ইয়ামানের জাবেদ, এডেন-সহ আরও কিছু অংশের লোকদের কুরআন শিক্ষা দান এবং সেখানকার বিচার পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রাসূল -এর ইন্তেকালের পর তিনি মদীনায় এসে শাম এবং ইরাক বিজয়াভিযানে অংশ নেন। উমর তাকে প্রথমে কুফার প্রশাসক এবং পরে বসরার প্রশাসক, শিক্ষক এবং বিচারক নিযুক্ত করেন। বিচারের নির্দেশনা-সংবলিত একটি পত্রও তাকে দিয়েছিলেন, যার বিবরণ আমরা সামনে উল্লেখ করব। হিজরি ২৩ সালে তার হাতে ইস্পাহান এবং আহওয়াজ বিজিত হয়। ৪৪ হিজরি মোতাবেক ৬৬৫ খ্রিষ্টাব্দে কুফাতে তিনি ইন্তেকাল করেন।
রাসূল প্রথমে আবু মূসা-কে ইয়ামানের দায়িত্ব দিয়ে প্রেরণ করেছিলেন। এরপর মুআয ইবনু জাবাল-কে পাঠিয়েছেন। মুআয সেখানে পৌঁছলে আবু মূসা একটি গদি বিছিয়ে দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। ঘটনাক্রমে আবু মূসা -এর সামনে তখন একজন শৃঙ্খলাবদ্ধ লোক ছিল। মুআয জিজ্ঞেস করলেন, 'লোকটি কে?' আবু মূসা বললেন, 'সে প্রথমে ইহুদি থেকে মুসলিম হয়েছিল। এরপর আবার ইহুদি হয়ে গেছে।' আবু মূসা তখন মুআয-কে বসতে বললে তিনি বললেন, 'না, তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে আমি বসব না। এটাই আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের ফয়সালা।' কথাটি তিনি তিন বার বললেন। এরপর লোকটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলো।
টিকাঃ
[১৫৪] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৯২৩
📄 মুআয ইবনু জাবাল
তার উপনাম ছিল আবু আবদির রহমান। তিনি ছিলেন সাহাবিদের মাঝে হালাল-হারাম সংক্রান্ত বিষয়ে সর্বাধিক জ্ঞানী। হিজরতের ২০ বছর আগে ৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন। সহনশীলতা, লজ্জা এবং বদান্যতায় তিনি ছিলেন মদীনার যুবকদের সেরা। হিজরতের আগে আকাবার বাইয়াতে এবং পরে নবি-এর সাথে সমস্ত যুদ্ধাভিযানে অংশ নিয়েছিলেন।
তাবুক যুদ্ধের পর নবি তাকে ইয়ামানে শিক্ষক এবং বিচারক নিযুক্ত করে পাঠান। তার সাথে দেওয়া ইয়ামানবাসীদের উদ্দেশ্যে লেখা পত্রে নবি লিখেছিলেন, 'আমার পরিবারের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিটিকে তোমাদের কাছে প্রেরণ করলাম।' মুআয সেখানে আবু বকর এ-এর খিলাফতকালেও অবস্থান করেছিলেন। অবশেষে উমর-এর খিলাফতের সময় তিনি সেখান থেকে ফিরে শামে জিহাদরত মুজাহিদদের সাথে অংশগ্রহণ করেন। আবু উবায়দা আমওয়াসের মহামারি তথা প্লেগে আক্রান্ত হলে মুআয-কে নিজের স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করলে উমর -ও তাকে সে পদে বহাল রাখেন। সে বছরই ১৮ হিজরি মোতাবেক ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে জর্দানের সীমান্ত অঞ্চলে তিনি ইন্তেকাল করেন।
তাকে ইয়ামানে প্রেরণের সময় নবি-এর সাথে তার কথোপকথন সংবলিত হাদিস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি ছিলেন ইয়ামানের একাংশের প্রশাসক এবং বিচারক। সেখানে তিনি কয়েকটি বিচারকার্যও পরিচালনা করেন।
আসওয়াদ ইবনু ইয়াজিদ বলেছেন, মুআয ইবনু জাবাল ইয়ামানে জনৈক মৃত ব্যক্তির এক বোন ও এক মেয়েকে তার উত্তরাধিকার সম্পত্তি আধাআধি ভাগ করে দিয়েছিলেন। নবি-এর জীবদ্দশাতেই তিনি এ ফয়সালা করেছিলেন। এ ক্ষেত্রে তার সামনে ছিল মেয়ের সাথে বোনকে জ্ঞাতি-গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়ার নীতি। আরেকবার 'ইসলাম বৃদ্ধি করে, হ্রাস করে না'—এই যুক্তিতে একজন মুসলিমকে তার ইহুদি ভাইয়ের উত্তরাধিকার মনোনীত করেন। এ ছাড়াও মুরতাদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড প্রদানের ঘটনা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। উমর-এর খিলাফতকাল অবধি তিনি ইয়ামানের বিচারক ছিলেন।
তিনি প্রতিদিন নিজ বৈঠকে বলতেন, 'আল্লাহ সত্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। যারা সন্দেহ পোষণ করে, তারা ধ্বংস হয়। আলিমদের বিভ্রান্তির ব্যাপারে সতর্ক থেকো। কেননা শয়তান কখনো কখনো আলিমদের মুখ দিয়ে বিভ্রান্তিমূলক কথা বের করে থাকে। তাদের থেকে হক কথা শুনতে পেলে তা গ্রহণ কোরো। কেননা, হকের মধ্যে নূর নিহিত থাকে।'
টিকাঃ
[১৫৫] আল-ইসাবাহ: ৬/১০৬; উসুদুল গাবাহ: ৫/১৯৪; সিয়ারু আলামিন নুবালা: ১/৪৪৩
[১৫৬] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২৮৯৩; আখবারুল কুদ্ধাহ: ১/৯৯-১০০
[১৫৭] ইলামুল মুওয়াকিয়ীন: ১/১১২
📄 আলা ইবনুল হাদরামি
তিনি মূলত হাদরামাউতের অধিবাসী ছিলেন। তার বাবা মক্কায় থাকার কারণে সেখানেই তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা। তিনি যে-দুআ করতেন, সেটাই কবুল হতো। মাত্র কয়েকটি কথা বলে তিনি সাগরে নেমে পড়েছিলেন। তিনিই সর্বপ্রথম পারস্যের দ্বীপ জয় করেন এবং যুদ্ধের জন্য সর্বপ্রথম সাগর পাড়ি দেন।
৮ম হিজরিতে নবি তাকে বাহরাইনের প্রশাসক নিযুক্ত করেন। যাকাত সংগ্রহ করার দায়িত্ব তার ওপর ন্যস্ত থাকায় যাকাতের পদ্ধতি কী হবে, সে সংক্রান্ত একটি পত্রও তাকে দিয়েছিলেন। বাহরাইনের লোকদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা, সেখানে শরীয়ত প্রতিষ্ঠা এবং জুলুমের দমন করা ছিল আল-আলা -এর দায়িত্ব।
বনু আবদুল কায়সের উদ্দেশ্যে প্রেরিত ফরমানে নবি লিখেছিলেন, ‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদের তরফ থেকে আল-আকবার ইবনু আবদিল কায়সের প্রতি।... আলা ইবনুল হাদরামি হচ্ছে বাহরাইনের জলে-স্থলে, নগরে, সৈন্যদের মধ্যে এবং সেখানকার উৎপাদিত ফসলের মাঝে আল্লাহর রাসূলের তরফ থেকে তত্ত্বাবধায়ক। বাহরাইনবাসীর দায়িত্ব হলো সব ধরনের অনিষ্ট হতে তাকে রক্ষা করা এবং জুলুমের মোকাবিলায় তার পাশে দাঁড়ানো। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করা হবে এবং জিহাদের সময় তাদের প্রতি ন্যায্য আচরণ করা হবে। এই নির্দেশের মাঝে কোনো রকম রদবদল করা হবে না।'
অন্য বর্ণনায় আছে, উট, গরু, বকরি, ফল-ফসল এবং সম্পদের ক্ষেত্রে যাকাতের হার কী হবে, আল-আলা -কে নবি সেটা লিখে দিয়েছিলেন। আল-আলা সেটা মানুষকে শুনিয়ে তাদের থেকে যাকাত উসুল করতেন। এ ছাড়াও তাকে বাহরাইনের বিচারক নিযুক্ত করার সময় যে পত্র দেওয়া হয়েছিল, সেটা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক সাহাবি সে পত্রের ব্যাপারে সাক্ষী ছিলেন।
নবি-এর ইন্তেকালের সময় আল-আলা বাহরাইনের দায়িত্বে ছিলেন। এরপর আবু বকর এবং উমর-ও তাকে সে পদে বহাল রাখেন। পরবর্তীকালে উমর তাকে বসরায় প্রেরণ করলে তামীম এলাকার কাছাকাছি পৌঁছলে পথিমধ্যেই তার ইন্তেকাল হয়ে যায়। কারও কারও মতে, বাহরাইনেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এটা ২১ হিজরি মোতাবেক ৬৪২ খ্রিস্টাব্দের কথা।
টিকাঃ
[১৫৮] তাবাকাতু ইবনি সাদ: ১/২৮৩
[১৫৯] তাবাকাতু ইবনি সাদ: ১/২৬৩
[১৬০] তাবাকাতু ইবনি সাদ: ১/২৭১
[১৬১] আল-ইসাবাহ: ৪/২৫৯; তাহযীবুল আসমা ১/৩৪১; আল-আলাম: ৫/৪৫