📄 ঋণের ক্ষেত্রে ফয়সালা
কাব ইবনু মালিক বলেছেন, একবার রাসূলুল্লাহ -এর যুগে তিনি মসজিদের মধ্যে ইবনু আবি হাদরাদকে নিজের পাওনা পরিশোধের তাগাদা দিলেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ ঘরে অবস্থান করছিলেন। একপর্যায়ে তাদের কথার আওয়াজ উঁচু হয়ে যাওয়ায় তা রাসূলুল্লাহ -এর কানে পৌঁছে যায়। তখন তাদের সামনেই হুজরার পর্দা উঠিয়ে কাব ইবনু মালিককে তিনি ডাকলেন, 'হে কাব!' উত্তরে কাব বলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি হাজির আছি।' রাসূলুল্লাহ তখন হাত দিয়ে ইশারা করে বলেন, 'তোমার পাওনার অর্ধেক মাফ করে দাও।' কাব সঙ্গে সঙ্গে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি অর্ধেক মাফ করে দিলাম।' এরপর ইবনু আবি হাদরাদ-কে রাসূলুল্লাহ বললেন, 'যাও, অবশিষ্ট পাওনা শোধ করে দাও।'
ঋণ গ্রহণের পর দেউলিয়া হয়ে যাওয়া ঋণী ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে নবি বলতেন, 'তোমরা যতটা পারো পরিশোধ করো। এর বেশি পরিশোধ করা তোমাদের জন্য আবশ্যক নয়।'
দেউলিয়াকে তিনি আটকে রাখতেন না। বরং সচ্ছল হয়েও ঋণ পরিশোধে টালবাহানা করে এমন ব্যক্তিকে তিনি ঋণ পরিশোধের আগ পর্যন্ত আটকে রাখতেন এবং (প্রয়োজনে) প্রহার করতেন।
টিকাঃ
[১৪২] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৯৫
[১৪৩] আত- তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৬৪
📄 ভূমি-সংক্রান্ত ফয়সালা
ওয়াইল বলেন, হাদরামাউতের জনৈক ব্যক্তি কিনদার এক লোককে নিয়ে রাসূলুল্লাহ-এর কাছে উপস্থিত হয়। হাদরামাউতবাসী লোকটি বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! এ ব্যক্তি আমার পৈতৃক ভূমি জবরদখল করেছে।' তখন কিনদি লোকটি বলে উঠল, 'না, সেটা তো আমারই সম্পত্তি এবং আমারই দখলে আছে। আমি তাতে চাষাবাদ করে থাকি। এতে কারও কোনো অধিকার নেই।'
রাসূলুল্লাহ তখন হাদরামাউতের লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'তোমার কি কোনো সাক্ষী আছে?' সে না-বাচক উত্তর দিলে রাসূল বললেন, 'তাহলে বিবাদী এ বিষয়ে কসম করবে।' হাদরামাউতের বাসিন্দা বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! সে তো অসৎ লোক, কসম করার বিষয়ে তার কিছুর পরোয়া নেই। কোনো ব্যাপারে সে বাছবিচার করে না।' রাসূল বললেন, 'এ ছাড়া তার থেকে তোমার গ্রহণের ভিন্ন কোনো উপায় নেই।'
এরপর কিনদি লোকটি কসম করতে উদ্যোগী হয়। সে ফিরে যাওয়ার পর রাসূল বললেন, 'জেনে রেখো, ওই লোকটি যদি অন্যায়ভাবে সম্পদ গ্রাস করার জন্য কসম করে থাকে, তবে সে অবশ্যই আল্লাহর কাছে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তিনি তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন।'
টিকাঃ
[১৪৪] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০৯
📄 ব্যভিচারের ক্ষেত্রে ফয়সালা
আবু হুরায়রা এবং যায়িদ ইবনু খালিদ জুহানি বলেন, একজন বেদুইন রাসূলুল্লাহ-এর কাছে এসে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে আল্লাহর দোহাই দিয়ে বলছি, আমার ব্যাপারে আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফয়সালা করে দেবেন।' বেদুইনটির প্রতিপক্ষ ছিল তার চেয়েও অধিক বুদ্ধিমান। সে বলল, 'হ্যাঁ, আমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফয়সালা করুন, তবে (এর আগে) আমাকে (কথা বলার) অনুমতি প্রদান করুন।' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'বলো।'
লোকটি বলল, 'আমার এক ছেলে ওই ব্যক্তির বাড়িতে কর্মচারী ছিল। সে তার স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হয়েছে। তখন আমাকে সংবাদ দেওয়া হয়েছে যে, আমার ছেলের ওপর রজম (পাথর নিক্ষেপ)-এর বিধান আরোপিত হবে। তখন এর পরিবর্তে আমি একশটি ছাগল এবং একটি বাঁদি দিয়েছি। এরপর আমি এ ব্যাপারে আলিমদের কাছে জিজ্ঞাসা করলে তারা বললেন, আমার ছেলেকে একশটি বেত্রাঘাত করা হবে এবং এক বছরের জন্য তাকে নির্বাসন দেওয়া হবে। আর মহিলাটির শাস্তি হবে রজম।'
রাসূল তখন বললেন, 'যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন, তাঁর শপথ! অবশ্যই আমি তোমাদের মাঝে আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফয়সালা করে দিচ্ছি। বাঁদি এবং ছাগল ফেরত দেওয়া হবে। তোমার ছেলের ওপর একশটি বেত্রাঘাত এবং এক বছর নির্বাসনের হুকুম কার্যকর হবে।' (তারপর নবি একজন সাহাবিকে লক্ষ্য করে বললেন,) 'হে উনাইস! (বিষয়টি যাচাইয়ের জন্য) আগামীকাল সকালে তুমি ওই মহিলাটির কাছে যাবে। সে যদি তা স্বীকার করে নেয়, তবে তাকে রজম করবে।'
সাহাবিটি পরদিন সকালে মহিলাটির কাছে গেলেন। ব্যভিচারের বিষয়টি সে স্বীকার করল। রাসূল তখন মহিলার প্রতি শরীয়তের হুকুম কার্যকরের নির্দেশ দিলেন। তাকে রজম করা হলো।
বুরাইদা বলেন, একজন গামিদি মহিলা এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি ব্যভিচার করে ফেলেছি। আপনি আমাকে পবিত্র করে দিন।' তখন নবি তাকে ফিরিয়ে দিলেন।
পরদিন ওই মহিলা আবার এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনি কেন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন? আপনি কি আমাকেও মায়িযের মতো ফিরিয়ে দিতে চাচ্ছেন? আল্লাহর কসম করে বলছি, আমি তো গর্ভবতী হয়ে পড়েছি।' তখন নবি বললেন, 'তবে (আপাতত) চলে যাও এবং সন্তান প্রসব হওয়া অবধি অপেক্ষা করো।'
বর্ণনাকারী বলেন, এরপর সন্তান প্রসব করার পর মহিলাটি সন্তানকে এক টুকরা কাপড়ে জড়িয়ে নবি -এর কাছে নিয়ে এসে বললেন, 'এই সন্তান আমি প্রসব করেছি।' তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, 'যাও, তাকে (সন্তানকে) দুধ পান করাও। দুধপান করানোর সময় উত্তীর্ণ হওয়ার পরে এসো।'
এরপর যখন তার দুধপান করানোর সময় শেষ হলো, তখন মহিলাটি শিশু সন্তানকে নিয়ে তাঁর কাছে এলেন। শিশুটির হাতে ছিল এক টুকরা রুটি। এরপর বললেন, 'হে আল্লাহর নবি! আমি তাকে দুধপান করানো শেষ করেছি। সে এখন খাদ্য খায়।'
নবি তখন শিশুটিকে একজন মুসলিমের দায়িত্বে প্রদান করলেন। এরপর মহিলার ব্যাপারে (রজমের) আদেশ দিলেন। মহিলাটির বুক পর্যন্ত গর্ত খনন করানোর পর লোকদের নির্দেশ দিলে তারা রজম শুরু করল।... নবি বললেন, 'যে মহান সত্তার হাতে আমার জীবন তাঁর শপথ, জেনে রেখো! সে তো এমন তাওবা করেছে, যদি কোনো চাঁদাবাজ এমন তাওবা করত তবে তারও ক্ষমা হয়ে যেত।'
এরপর নবি-এর নির্দেশে মহিলাটির জানাযার নামাজ পড়া হলো। নবি -ও তার জানাযা পড়লেন। এরপর তাকে দাফন করা হলো।
টিকাঃ
[১৪৫] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৬৩৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৯৭
[১৪৬] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৬৯৫
📄 স্ত্রীর ভরণপোষণের ক্ষেত্রে ফয়সালা
আয়িশা সূত্রে বর্ণিত, হিন্দা নবি-কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আবু সুফইয়ান তো একজন কৃপণ ব্যক্তি। আমার ও আমার সন্তানদের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খরচ তিনি দেন না; তবে তার অজান্তে আমি (চাইলে) নিতে পারি।' তখন নবি বললেন, 'তোমার এবং তোমার সন্তানের প্রয়োজন অনুসারে ন্যায়সংগত পরিমাণ তুমি নিতে পারবে।'
ইবনুল কাইয়িম তার শাইখ ইবনু তাইমিয়্যাহর নিম্নোক্ত বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। 'নবি এবং খুলাফায়ে রাশিদিনের কেউই স্ত্রীর মাহর-সংক্রান্ত অপরাধে স্বামীকে বন্দি করেননি। ... যখন থেকে স্ত্রীর বিলম্বিত পরিশোধের দাবিতে স্বামীকে আটকে রাখার প্রচলন শুরু হয়েছে, তখন থেকেই সব ধরনের ক্ষতি, বিশৃঙ্খলা-সহ নানান ঝামেলা দেখা দিচ্ছে।'
টিকাঃ
[১৪৭] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৫৩৬৪
[১৪৮] আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ, পৃ. ৬৫