📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারের রায়

📄 বিচারের রায়


নববি যুগে বিচারের রায় ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি এবং শারঈ বিধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ। বিচারকার্য পরিচালনা করা হতো সরাসরি কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে কিংবা নববি সুন্নাহর মাধ্যমে। নয়তো রাসূল -এর ইজতিহাদ, সাহাবি এবং নবি কর্তৃক নিযুক্ত বিচারক ও প্রশাসকদের ইজতিহাদের মাধ্যমে। আর এসব বিচারের বৈধতায় থাকত আল্লাহ তাআলার সমর্থন। ফলে নিশ্চিতভাবে বলা যেত যে, এটাই আল্লাহ তাআলার বিধান।
মামলা-মোকদ্দমার ফয়সালা, বিবাদ-বিরোধের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত, বিশেষভাবে ও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কৃত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর এবং জানতে চাওয়া ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে রাসূল -এর ব্যাখ্যা প্রদান, সমাধান, এবং নির্দেশনা একদিক থেকে বিচার এবং অপরদিক থেকে ফতোয়া। আবার অন্যদিক থেকে সাহাবায়ে কেরাম-সহ সমস্ত মুসলিমের জন্য তা আল্লাহর পক্ষ হতে ঐশী বিধান। এ ব্যাপারে আল্লামা ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, 'রাসূল কৃত সমস্ত বিশেষ বিচারই সর্বজনীন বিধান।'
নববি যুগে বিধিবিধান প্রথমে পর্যবেক্ষণ করা হতো। তারপর সেটা উচ্চ আদালতে পেশ করা হতো। আর পর্যবেক্ষণ ও দিক-নির্দেশনা প্রথম সংঘটিত হতো আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে ওহির মাধ্যমে। তারপর রাসূল পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে নির্দেশনা প্রদান করতেন। যেমন হুযাইফা -এর হাদিস পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। বেড়ার বিষয়ে তিনি ফয়সালা করেছিলেন যে, 'বেড়ার সাথে লাগানো দড়িটি যার, বেড়াটিও তারই হবে।' এরপর রাসূল -এর কাছে ফয়সালাটি পেশ করা হলে তিনি সেটার অনুমোদন দিলেন। বললেন, 'সঠিক ফয়সালা করেছ।' অথবা বললেন, 'তুমি চমৎকার ফয়সালা করেছ।'
তেমনিভাবে ইয়ামানে চার ব্যক্তি নিহত হওয়ার ব্যাপারে আলি একটি ফয়সালা দিয়েছিলেন। একে অন্যকে ধরে ফেলার কারণে 'যুবয়াতুল আসাদ' নামক একটি কূপে পড়ে তাদের মৃত্যু ঘটেছিল। পরবর্তীকালে আলি কৃত ফয়সালাটি রাসূল -এর কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি বলেছিলেন, 'আলি যে ফয়সালা করেছে, সেটাই ঠিক আছে।'
আরেক বর্ণনায় আছে, কূপের পাড়ে যারা ভিড় করেছিল, আলি তাদের ওপর দিয়ত ধার্য করেছিলেন। রাসূল -ও সেটার অনুমোদন দিয়েছিলেন।
সুতরাং এটা বুঝে আসে, আলি -এর ফয়সালা শরীয়ত-বিরোধী হলে নবি অবশ্যই সেটা বাতিল করে এ ব্যাপারে বিধান বাতলে দিতেন; যেমনটা জনৈক কর্মচারীর ঘটনায় করেছিলেন। ঘটনাটির বিবরণ আমরা সামনে উল্লেখ করব।
আলি -এর নিজস্ব ইজতিহাদ নবি কর্তৃক অনুমোদিত হওয়ার আরেকটি ঘটনা আছে। একবার রাসূলুল্লাহ -এর একজন দাসী ব্যভিচার করেছিল। নবিজি তখন বাঁদিকে বেত্রাঘাত করার জন্য আলি -কে আদেশ দিলেন। ঘটনাক্রমে দাসীটি তখন সদ্য গর্ভবতী। আলি তখন ভয় পেলেন—এমতাবস্থায় বেত্রাঘাত করলে দাসীটি হয়তো মারা যাবে। এই ভেবে তিনি আর বেত্রাঘাত করলেন না। তারপর নবি -এর কাছে বিষয়টি উল্লেখ করা হলে তিনি বললেন, 'তুমি ভালো করেছ।' অন্য বর্ণনামতে তিনি বলেছিলেন, 'বেশ, সে সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও।'

টিকাঃ
[১৩১] যাদুল মাআদ: ৫/৫
[১৩২] সুনানুদ দারাকুতনি, হাদিস নং: ৪5৪৪
[১৩৩] যাদুল মাআদ: ৫/১৩; ইলামুল মুওয়াক্ষিয়ীন: ২/২০; মুসনাদু আহমাদ, হাদিস নং: ৫৭৩
[১৩৪] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৭০৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচার বাস্তবায়ন

📄 বিচার বাস্তবায়ন


নববি যুগের বিচারব্যবস্থা ছিল ফতোয়ার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মামলার ক্ষেত্রে উভয় পক্ষই আল্লাহ তাআলার ফয়সালা মেনে নিত। উভয় পক্ষেরই বক্তব্য হতো— 'আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।'
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা নিজেদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার হুকুম বাস্তবায়নে আগ্রহী থাকত। সে হুকুম তাদের নিজেদের বিপক্ষে গেলেও তারা পিছপা হতো না। রাসূলুল্লাহ স্বয়ং বা তাঁর নিয়োগকৃত বিচারক-প্রশাসকরা যে ফয়সালা বা আদেশ দিতেন, সেটা তারা আঁকড়ে ধরত।
অপরাধ-সংক্রান্ত ক্ষেত্রে বিচারক নিজেই তার ফয়সালা বাস্তবায়ন করতেন। অথবা ফয়সালা বাস্তবায়নের আদেশ দিয়ে তিনি নিজে সেটার তত্ত্বাবধান করতেন। সুতরাং বিচারক একইসাথে ফয়সালাকারী এবং ফয়সালা বাস্তবায়নকারী—উভয়ের দায়িত্বই পালন করতেন।
ফয়সালা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক। বিচার বা ফয়সালা ঝুলিয়ে রাখা হতো না। ফয়সালা বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কোনো ধরনের টালবাহানা, সময়ক্ষেপণ বা কোনো শর্তারোপ করা হতো না। বিচারের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল হকদারের কাছে তার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। যেমন, স্বীকারোক্তি প্রদানের পরই মায়িয -কে রজম করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তদ্রূপ কর্মচারীর ঘটনায় উনাইস -কে অভিযুক্ত নারী থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়ার আদেশ করেছিলেন। মহিলাটি নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করলে তাকে রজম করা হয়। আবার কাব ইবনু মালিক -কে তার পাওনার অর্ধেক ছেড়ে দেওয়ার ফয়সালা করে ইবনু আবি হাদরাদ -কে তৎক্ষণাৎ ঋণ পরিশোধের আদেশ দিয়েছিলেন। হাদিসের কিতাবে এ ধরনের আরও অনেক ঘটনা রয়েছে।
আজকের যুগে আমরা যে অর্থে জেলখানা বা কারাগার বুঝে থাকি, নববি যুগে সেই অর্থে কোনো জেলখানা বা কারাগার ছিল না। অপবাদ আরোপের অভিযোগে কাউকে বন্দি করা হলে তাকে এক দিন এক রাত আটকে রাখা হতো। তাও আবার হতো কাজকর্ম হতে তাকে বাধা দিয়ে নজরবন্দি করে রাখার মাধ্যমে। হয়তো তার নিজের ঘরেই তাকে গৃহবন্দি করা হতো। কিংবা মসজিদে আটকে রাখা হতো। অথবা কাউকে নিয়োজিত করা হতো, যে সর্বক্ষণ অপরাধীকে নজরদারি করত। তবে রাসূলুল্লাহ কখনো ঋণের অভিযোগে কাউকে বন্দি করেননি।

টিকাঃ
[১৩৫] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৯৫
[১৩৬] যাদুল মাআদ: ৫/৫

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারের স্থান এবং সময়

📄 বিচারের স্থান এবং সময়


নববি যুগে বিচারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা ছিল না। রাসূল-কে সর্বপ্রথম যেখানে পাওয়া যেত, লোকেরা সাধারণত সেখানেই মোকদ্দমা নিয়ে আসত এবং তিনি বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। বিশেষত মসজিদে নববিতেই অধিকাংশ বিচারকার্য অনুষ্ঠিত হতো। সেটা ছিল বিচারের অন্যতম জায়গা। আবার মসজিদের বাইরেও তিনি বিচার করতেন। যেমন, বনু কুরাইযার বিচার হয়েছিল মসজিদের বাইরে। আলি এবং ফাতিমা-এর মধ্যকার মতানৈক্যের মীমাংসা তাদের ঘরেই করে দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে রাসূলুল্লাহ-এর নিয়োগকৃত বিচারক এবং প্রশাসকরা তাদের উপস্থিতির জায়গাতে বা কাজের জায়গাতেই বিচার করতেন। বিরোধ ও মামলার মূল জায়গাতেও বিচার এবং ফয়সালা করা হতো। যেমন, বেড়ার ব্যাপারে হুযাইফা মোকদ্দমার জায়গায় গিয়ে বিচার করেছিলেন। আবার জনৈক সাহাবিকে রাসূল একজন মহিলার কাছে গিয়ে স্বীকারোক্তি গ্রহণ করতে বলেছিলেন।
এ থেকে বোঝা যায়, বিচারক চাইলে স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণ করার জন্য বিবাদের মূল জায়গায় যেতে পারবেন। তাহলে মামলাটি সূক্ষ্মভাবে যাচাই করা যাবে এবং প্রমাণ সাব্যস্তকরণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
নববি যুগে বিচারের জন্য নির্দিষ্ট কোনো স্থান যেমন ছিল না, তেমনি ধরাবাঁধা কোনো সময়ও ছিল না। কেননা আদালতের নির্দিষ্ট কোনো সময় নেই। জুলুম, নির্যাতন, সীমালঙ্ঘন যে-কোনো সময় সংঘটিত হতে পারে। তাই যত দ্রুত সম্ভব নির্যাতন প্রতিহত করতে হবে। গোড়াতেই জুলুম মিটিয়ে দিতে হবে। সীমালঙ্ঘনে তৎক্ষণাৎ বাধা প্রদান করা আবশ্যক। যেমন আবশ্যক যত দ্রুত সম্ভব হকদারের কাছে তার হক পৌঁছে দেওয়া। এ কারণেই কোনো অধিকার প্রত্যাশী ও বিচারপ্রার্থী তার অধিকার ও বিচারের জন্য যে-কোনো সময় দাবি জানাতে পারত। নবি নিজের ব্যাপারে কোনো সময় নির্ধারণ করেননি। না তাঁর নিয়োগকৃত বিচারকদের কাজের সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। আর না তাঁর পক্ষ থেকে নিযুক্ত প্রশাসকদের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছেন।
তবে হ্যাঁ, কুরআন কারীম পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ করার এমন কিছু নিয়মকানুন এবং আদব নির্ধারণ করে দিয়েছে, যেগুলো বিচারকার্যের সাথে সমন্বয় করা যায়। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِيَسْتَأْذِنُكُمُ الَّذِينَ مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ وَ الَّذِينَ لَمْ يَبْلُغُوا الْحُلُمَ مِنْكُمْ ثَلَثَ مَرَّتٍ مِنْ قَبْلِ صَلوةِ الْفَجْرِ وَ حِينَ تَضَعُوْنَ ثِيَابَكُمْ مِّنَ الظَّهِيرَةِ وَ مِنْ بَعْدِ صَلوةِ الْعِشَاءِ ثَلْثُ عَوْرَتٍ لَّكُمْ لَيْسَ عَلَيْكُمْ وَلَا عَلَيْهِمْ جُنَاحٌ بَعْدَهُنَّ
হে ঈমানদারগণ! তোমাদের মালিকানাধীন দাস-দাসীরা এবং তোমাদের মধ্যে যারা প্রাপ্তবয়স্ক হয়নি, তারা যেন তোমাদের কক্ষে প্রবেশ করতে তিন সময়ের অনুমতি গ্রহণ করে— ফজরের নামাজের পূর্বে, দুপুরে যখন তোমরা তোমাদের পোশাক খুলে রাখো এবং ইশার নামাজের পর। এই তিন সময় তোমাদের গোপনীয়তার সময়। এই তিন সময় ব্যতীত অন্য সময়ে বিনা অনুমতিতে প্রবেশ করলে তোমাদের জন্যে এবং তাদের জন্যে কোনো দোষ নেই। তোমাদের তো একে অপরের নিকট যাতায়াত করতেই হয়। এইভাবে আল্লাহ তোমাদের নিকট তাঁর নির্দেশ সুস্পষ্টভাবে বিবৃত করেন। আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
আবার আল্লাহর রাসূল -এর জীবদ্দশায় তাঁকে কষ্ট না-দেওয়ার ব্যাপারে কুরআন কারীমে সমস্ত মুসলিমের জন্য আবশ্যক কিছু নিয়মনীতি বর্ণিত হয়েছে। সেগুলো এমন সময়, যখন তিনি ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জীবনে ব্যস্ত থাকতেন। বিশেষত যখন তিনি স্ত্রীদের ঘরে অবস্থান করতেন, তখন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে কেউ যেন বিচার-সংক্রান্ত বা অন্য কোনো কাজে তাঁকে ডাকাডাকি না করে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّ الَّذِينَ يُنَادُونَكَ مِنْ وَرَاءِ الْحُجُرْتِ أَكْثَرُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ وَلَوْ أَنَّهُمْ صَبَرُوا حَتَّى تَخْرُجَ إِلَيْهِمْ لَكَانَ خَيْرًا لَّهُمْ
যারা ঘরের পেছন হতে আপনাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকে, তাদের অধিকাংশই নির্বোধ। আপনি বের হয়ে তাদের কাছে আসা পর্যন্ত তারা যদি ধৈর্যধারণ করত, তবে সেটাই তাদের জন্যে মঙ্গলজনক হতো।

টিকাঃ
[১৩৭] সূরা নূর, ২৪:৫৮
[১৩৮] সূরা হুজুরাত, ৪৯: ৪-৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00