📄 অভিযোগের তদন্ত এবং দুর্নীতি সংক্রান্ত বিচার
অভিযোগের তদন্ত বলতে এখানে শাসক, বিচারক ও দায়িত্বশীল কর্তৃক জনসাধারণের অধিকার পুরোপুরি রক্ষা এবং নাগরিকের প্রতি জুলুম করা থেকে বিরত রাখা উদ্দেশ্য। আর দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত বিচার দ্বারা উদ্দেশ্য হলো সৎ কাজের আদেশ পরিত্যাগ করা হলে তা জারি করা এবং ছড়িয়ে পড়া অসৎ কাজ থেকে মানুষকে নিষেধ করা।
নববি যুগে এই দুই ধরনের বিচারব্যবস্থাই পাওয়া যায়। কিন্তু সে যুগে এসব ছিল সাধারণ বিচারব্যবস্থার অধীনে। এসবের পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা পরবর্তী যুগে প্রকাশিত হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার জন্য আমরা কিছু উদাহরণ দেখতে পারি। রাশিদ ইবনু আবদিল্লাহ -কে নবিজি যখন বিচারক নিযুক্ত করেন, তখন অভিযোগের তদন্ত করার বিষয়টি সর্বপ্রথম সামনে আসে। নবি বলেছিলেন, 'কারও থেকে আমি সম্পদ নিয়ে থাকলে এই রইল আমার সম্পদ। এখান থেকে নিয়ে নাও। আর যদি কারও পিঠে আঘাত করে থাকি, তাহলে আমার পিঠে আঘাত করে তার বদলা নিয়ে নাও।'
বদরের দিন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে নবি সাহাবিদের কাতার সোজা করছিলেন। দেখলেন, সাওয়াদ ইবনু গাযিয়্যা কাতার থেকে একটু সামনে বেড়ে আছেন। হাতে থাকা তিরের মাথা দিয়ে তার পেটে সামান্য খোঁচা দিলেন তিনি। বললেন, 'সাওয়াদ! কাতার সোজা করো।' সাওয়াদ তখন বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে আপনি ব্যথা দিয়েছেন। আল্লাহ তো আপনাকে ন্যায় ও ইনসাফ দিয়ে পাঠিয়েছেন। অতএব আমাকে বদলা নিতে দিন।' আল্লাহর নবি তখন নিজের পেট থেকে কাপড় সরিয়ে দিয়ে বললেন, 'নাও, বদলা নাও।' সাওয়াদ তখন নবিজিকে জড়িয়ে ধরে তাঁর পেটে চুমু দিলেন। নবি অবাক হয়ে বললেন, 'ব্যাপার কী সাওয়াদ?' তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আজকের (অর্থাৎ যুদ্ধের) অবস্থা তো আপনি দেখতেই পাচ্ছেন। তাই আপনাকে ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে হলো।'
এ ছাড়াও অনেক হাদিস থেকে জানা যায়, নবি যাকাত উসুলের কাজে নিয়োজিত কর্মচারীদের থেকে হিসাব গ্রহণ করতেন। সহিহুল বুখারিতে এ সংক্রান্ত একাধিক বর্ণনা রয়েছে।
তদ্রূপ নববি যুগে দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত বিচারও সংঘটিত হতো। রাসূলুল্লাহ নানান বিষয়ে আপামর জনগণের খোঁজখবর রাখতেন। এজন্য তিনি নিজেই বাজার পরিদর্শন করতেন। দ্রব্যমূল্যের প্রতি তাঁর নজর থাকত এবং মানুষকে প্রতারণা করতে তিনি নিষেধ করতেন।
আবু হুরায়রা বর্ণনা করেছেন, একবার স্তূপীকৃত খাদ্যশস্যের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় নবি তাতে হাত ঢুকিয়ে দিলেন। তখন হাতে আর্দ্রতা অনুভব করে তিনি বললেন, 'হে খাদ্যশস্যের মালিক, এটা আবার কী!' সে বলল, 'হে আল্লাহর রাসূল! এতে বৃষ্টির পানি পড়েছিল।' রাসূল বললেন, 'ভেজা অংশ খাদ্যশস্যের ওপর দিকে রাখলে না কেন, তাহলে লোকেরা তা দেখতে পেত। যে ব্যক্তি ধোঁকা দেয়, সে আমার দলভুক্ত নয়।'
মক্কা বিজয়ের পর সাঈদ ইবনু সাঈদ ইবনিল আস-কে নবি সেখানকার বাজারের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেছিলেন। সে দায়িত্ব তিনি পালন করতেন। পরবর্তীকালে তায়িফ অভিযানের দিন তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
অভিযোগের তদন্ত আর দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত বিচার সে-সময় সাধারণ বিচারব্যবস্থার বহির্ভূত বিষয় ছিল না। নববি যুগের বিচারকগণ ব্যক্তিবিশেষের মাঝে যেমন ফয়সালা করতেন, তেমনি ক্ষমতাবানদের সীমালঙ্ঘন করতে বাধা দিতেন। সৎ কাজের আদেশ করা এবং তাদের সামনে সংঘটিত হচ্ছে কিংবা হওয়ার সংবাদ পেয়েছেন এমন অসৎ কাজে বাধা প্রদান করা ছিল তাদের নিত্যদিনের কাজ।
টিকাঃ
[১২৪] নবিজির ভাষণের এই অংশটি সীরাতবিদগণ উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন হাদিসে এর মর্ম পাওয়া যায়। প্রয়োজনে সহিহ মুসলিম: ১৬/১৫০; মুসনাদু আহমাদ: ২/২৪৩ ও ৬/৪৫; সুনানুদ দারিমি: ২/৩১৪-৩১৫ এবং তবাকাতু ইবনি সাদ: ২/২৫৫ দেখা যেতে পারে।
[১২৫] সীরাতু ইবনি হিশাম: ২/২৭৮-২৭৯
[১২৬] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ১৫০০ ও ৬৯৭৯
[১২৭] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০২
[১২৮] আল-ইসতীআব ফী মারিফাতিল আসহাব: ২/৬২১