📄 বিচারক নিয়োগ প্রদান
রাসূল নিজে মদীনায় যেমন বিচারকার্য পরিচালনা করতেন, তেমনি কোথাও গেলে বা অবস্থান করলে সেখানেও করতেন। আবার কিছুসংখ্যক সাহাবিকেও তিনি বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। তাদের অনেকে ছিলেন বিভিন্ন এলাকায় বিচারক। আবার তাঁর নিযুক্ত প্রশাসকদের কাজও ছিল বিচারকার্য পরিচালনা এবং মোকদ্দমা নিষ্পত্তি করা। সামনে আমরা কিছু উদাহরণ উল্লেখ করব।
(ক) কিছুসংখ্যক সাহাবিকে রাসূল কর্তৃক বিচারক নিযুক্তকরণ: তাদের কতক ছিলেন ইসলামি এলাকার দায়িত্বে, অনেকে ছিলেন এলাকার একাংশের দায়িত্বে, আবার কেউ কেউ ছিলেন নির্দিষ্ট শহরের দায়িত্বে। এদের মাঝে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো।
১. আলি-কে বিচারক বানিয়ে ইয়ামানে প্রেরণ করা হয়।
২. মাকিল ইবনু ইয়াসার-কে ইয়ামানের বিচারক নিযুক্ত করে পাঠানোর সময় তিনি বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমি তো বিচারকার্য ভালো পারি না।' উত্তরে নবি বললেন, 'আল্লাহ বিচারকের সাথে থাকেন, যতক্ষণ না স্বেচ্ছায় সে অন্যায় করে।'
৩. আবদুল্লাহ ইবনু উমর-কে খলিফা উসমান বললেন, 'যাও, লোকদের মাঝে বিচারকার্য পরিচালনা করো।' আবদুল্লাহ আরজ করলেন, 'আমিরুল মুমিনীন! আমাকে কি মাফ করা যায়?' খলিফা বললেন, 'এ পদটি তুমি অপছন্দ করছ, অথচ তোমার বাবা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন!' উত্তরে আবদুল্লাহ বললেন, 'রাসূলুল্লাহ-কে এই কথা বলতে আমি শুনেছি— "কোনো ব্যক্তি বিচারক নিযুক্ত হয়ে যদি ইনসাফের সাথে ফয়সালা করে, তবুও বরাবর আমল নিয়ে প্রত্যাবর্তন করা কঠিন ব্যাপার।” এরপর আমি আর কী আশা করতে পারি!'
অন্য বর্ণনামতে আবদুল্লাহ বলেছিলেন, 'আমার বাবা তো জটিল বিষয়ে নবিজির শরণাপন্ন হতেন। আর নবি জটিল বিষয়ে জিবরীল-কে জিজ্ঞেস করতেন। আমি তো শরণাপন্ন হওয়ার মতো কাউকে পাচ্ছি না, আর আমি আমার বাবার মতো যোগ্যও নই।'
দাউদ ইবনু আমির বলেছেন, 'এই উম্মতের বিচারক চারজন। তারা হলেন উমর, আলি, যায়িদ এবং আবু মূসা আশআরি।'
(খ) ইসলামের ছায়াতলে আশ্রয় নেওয়া নগর এবং এলাকাতে নবি প্রশাসক নিযুক্ত করতেন: বিচারকার্য পরিচালনা, লোকদের মোকদ্দমা নিষ্পত্তি, শরীয়ত প্রতিষ্ঠা এবং দ্বীনি বিধান কার্যকর করা ছিল এই প্রশাসকদের দায়িত্ব। এসব প্রশাসকের অনেকেই ছিলেন বিচারক। কিন্তু এ ব্যাপারে তারা প্রসিদ্ধি লাভ করেননি। যেমন তায়িফের প্রশাসক উসমান ইবনু আবিল আস, সানআর প্রশাসক মুহাজির ইবনু আবি উমাইয়া, খাওলানের প্রশাসক ইয়ালা ইবনু উমাইয়া, হাদরামাউতের প্রশাসক যিয়াদ ইবনু লাবিদ। এবং ইয়ামানে প্রেরিত আমর ইবনু হাযম। আমর-এর নিয়োগের ব্যাপারে নবি পত্রও লিখেছিলেন।
(গ) কোনো কোনো সাহাবিকে কিছু অঞ্চলের প্রশাসক ও বিচারক—উভয়টিই বানিয়ে পাঠানো হলেও তারা ইতিহাসে বিচারক হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করেছেন। যেমন,
১. মুআয ইবনু জাবাল -কে নবি জানাদ-এ পাঠিয়েছিলেন। তার দায়িত্ব ছিল লোকদের কুরআন ও শরীয়তের তালিম প্রদান এবং ইয়ামানের যাকাত উসুলকারীদের থেকে যাকাতের সম্পদ কালেক্ট করা। পাশাপাশি বিচারব্যবস্থার গুরুত্বের কারণে বিশেষভাবে সেটাও তাকে পরিচালনা করতে হতো। তাকে বিদায় দেওয়ার সময় নবি এই বিষয়টির প্রতি বিশেষভাবে গুরুত্বারোপ করেছিলেন। আশ্বস্ত হওয়ার জন্য পরীক্ষামূলক প্রশ্ন করেছিলেন, 'তোমার কাছে কোনো মোকদ্দমা আনা হলে কিসের ভিত্তিতে বিচার-ফয়সালা করবে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কিতাব মোতাবেক।' নবি বললেন, 'যদি আল্লাহর কিতাবে এর কোনো ফয়সালা না পাও?' মুআয বললেন, 'তাহলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ অনুসারে।' নবি বললেন, 'যদি রাসূলের সুন্নাহতে বা আল্লাহর কিতাবে সেটার ফয়সালা না পাও?' তখন মুআয বললেন, 'তাহলে আমি গবেষণা করব; কমতি করব না।' নবি তখন মুআযের বুক চাপড়ে বলেছিলেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে আল্লাহর রাসূলের মনঃপূত কাজ করার তাওফিক দিয়েছেন।'
২. ৮ম হিজরিতে মক্কা বিজিত হয়। সেখান থেকে চলে আসার সময় তিনি আত্তাব ইবনু উসাইদ -কে মক্কাবাসীদের প্রশাসক ও বিচারক নিযুক্ত করেন।
৩. আল-আলা ইবনুল হাদরামি -কে নবি বাহরাইনের প্রশাসক ও বিচারক নিযুক্ত করেন। প্রেরণের সময় নবি তাকে একটি দীর্ঘ পত্রও দিয়েছিলেন। সে পত্রের কিছু অংশ হলো:
'পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি। এটা মুহাম্মাদ ইবন আবদিল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত। যিনি উম্মি নবি, যিনি কুরাইশি বংশোদ্ভূত, হাশেমি গোত্রীয়, যিনি সমগ্র সৃষ্টিজগতের কাছে আল্লাহর প্রেরিত রাসূল এবং নবি। আল-আলা ইবনুল হাদরামি এবং তার সাথে থাকা মুসলিমদের উদ্দেশ্যে। তোমাদের থেকে আমি এই মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করছি: হে মুসলিমগণ! তোমরা সাধ্যমতো আল্লাহকে ভয় করবে। তোমাদের কাছে আমি আল-আলা ইবনুল হাদরামিকে প্রেরণ করেছি। তার প্রতি আমার নির্দেশ থাকছে সে যেন এক আল্লাহকে ভয় করে, যার কোনো শরিক নেই। সে যেন তোমাদের প্রতি দয়াপরবশ হয়। তোমাদের মাঝে সে যেন উত্তমভাবে চরিত্র গঠন করে। তোমাদের-সহ যার সাথে দেখা হবে, তার সাথে সে যেন আল্লাহর নাযিলকৃত ইনসাফের পদ্ধতি অনুসারে ফয়সালা করে। সুতরাং সে যখন বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত আচরণ করবে এবং অসহায়ের প্রতি দয়ার্দ্র হবে, তখন তার কথা শোনা এবং মানার জন্য তোমাদের আদেশ করছি। তোমরা তাকে সবরকম সাহায্য-সহযোগিতা করবে।'
এই পত্রটি হিজরতের ৪র্থ বছর যিলকদ মাসের ৩ তারিখ লেখা হয়েছিল। রাসূল বসা অবস্থায় সাহাবিদের উপস্থিতিতে মুআবিয়া ইবনু আবি সুফইয়ান পত্রটি লিখেছিলেন এবং উসমান ইবনু আফফান তার কপি তৈরি করিয়েছিলেন।
৪. ইয়ামানের জাবেদ, এডেন-সহ আরও কিছু অংশের প্রশাসন ও সেখানকার বিচার পরিচালনার দায়িত্ব দিয়ে আবু মূসা আশআরি-কে নবি পাঠিয়েছিলেন। ওয়াকি সূত্রে বর্ণিত আছে, আবু মূসা-কে নবি ইয়ামানের অর্ধেক দায়িত্ব এবং অবশিষ্ট অর্ধেকের দায়িত্ব মুআয ইবনু জাবাল -কে দিয়েছিলেন।
(ঘ) কোনো বিশেষ ঘটনার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সাহাবিকে বিচারের দায়িত্ব প্রদান করা।
১. উকবা ইবনু আমির সূত্রে বর্ণিত আছে, একবার দুজন লোক নবি -এর কাছে মোকদ্দমা নিয়ে এলে তিনি বললেন, 'যাও, উকবা! ওদের মাঝে ফয়সালা করে দাও।' উকবা আরজ করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমার তুলনায় আপনি তো এ কাজের অধিক উপযুক্ত।' নবি তখন বললেন, 'তা হোক। তুমিই ওদের মাঝে ফয়সালা করে দাও। গবেষণা করে সঠিক বিচার করলে ১০টি সওয়াব পাবে। আবার গবেষণা করার পরও ভুল করলে একটি সওয়াব তুমি পেয়েই যাবে।
২. হারিসা ইবনু যাফুর থেকে বর্ণিত আছে, দুজন ভাইয়ের যৌথ মালিকানায় একটি ঘর ছিল। ঘরটির মাঝামাঝি তারা একটি বেড়া দিয়ে নিয়েছিল। একসময় তাদের দুজনের মৃত্যু হয়ে যায়। উভয়ের ওয়ারিশই বেড়াটির মালিকানা দাবি করে। একপর্যায়ে বিষয়টি নবি -এর কাছে উপস্থাপন করা হলো। তিনি মীমাংসার জন্য হুযাইফা-কে পাঠালেন। বেড়ার কাছে থাকা যে দড়ি দিয়ে কুঁড়েঘরটি বাঁধা হয়েছিল, তার মালিকের সপক্ষে বেড়ার মালিকানার ফয়সালা দিলেন। ফিরে এসে নবি -কে বিষয়টি জানালে তিনি বললেন, 'সঠিক ফয়সালা করেছ।' অন্য বর্ণনামতে তিনি 'চমৎকার ফয়সালা করেছ' বলেছিলেন।
টিকাঃ
[১০০] হাদিসটি পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৮২ দ্রষ্টব্য।
[১০১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস নং: ২০৩০৫; আল-মুজামুল আওসাত, হাদিস নং: ৬৫০৮
[১০২] সুনানুত তিরমিযি, হাদিস নং: ১৩২২; ইমাম তিরমিযি বলেন, ইবনু উমর-এর হাদিসটি গারীব। আমার মতে এ হাদিসের সনদ পরস্পর সংযুক্ত নয়।
[১০৩] মুসনাদু আবদ ইবনি হুমাইদ: ১/৪৭
[১০৪] তবাকাতু ইবনি সাদ: ২/৩৫১
[১০৫] আল-ইসাবাহ: ৪/২২১
[১০৬] সীরাতু ইবনি হিশাম: ২/৬০০
[১০৭] প্রাগুক্ত
[১০৮] আস সীরাতুন নববিয়্যাহ: ২/৫৯৪
[১০৯] ইয়ামানের একটি প্রদেশ। সেখানে ইয়ামানের প্রশানিক দপ্তর ছিল। সানআ থেকে জানাদ-এর দূরত্ব ৫৮ ফারসাখ তথা ১৭৫ মাইল। মারাসিদুল ইত্তিলা: ১/৩৫০
[১১০] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৯২
[১১১] সুবুলুস সালাম: ৪/১৬১
[১১২] আল- মাত্বালিবুল আলিয়া বিযাওয়ায়িদিল মাসানীদিস সামানিয়া, হাদিস নং: ২১৭১
[১১৩] সিয়ারু আলামিন ন্যবালা: ২/৩৮১-৩৮২
[১১৪] আসবারুল কুরাত: ১/১০০-১০১
[১১৫] সুনানুদ দারাকুতনি, হাদিস নং: ৪৪৫৯
[১১৬] সুনানুদ দারাকুতনি, হাদিস নং: ৪৫৪৪
📄 নিয়োগের পদ্ধতি
নবি যাদের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত করতেন, তারা উপস্থিত থাকলে তাদেরকে মৌখিকভাবে নিয়োগ দিতেন। বিচারব্যবস্থার নিয়মকানুন এবং বিচারকের বৈশিষ্ট্য জানিয়ে দিয়ে তাদেরকে যাবতীয় দিক-নির্দেশনা প্রদান করতেন। মুআয ইবনু জাবাল এবং আলি ইবনু আবি তালিব-কে নিয়োগ দেওয়ার সময় তিনি এমন করেছিলেন।
পক্ষান্তরে অনুপস্থিত ব্যক্তিকে নিযুক্ত করার ক্ষেত্রে নবি তার উদ্দেশ্যে পত্র লিখতেন। যা-তে তার থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ-সহ বিচারব্যবস্থার মূলনীতি সংক্রান্ত নির্দেশনা থাকত। আমর ইবনু হাযম-কে ইয়ামানে প্রেরণের সময় এবং আল- আলা ইবনুল হাদরামি-কে বাহরাইনের বিচারক নিযুক্তির সময় তিনি এমন পত্র লিখেছিলেন。
📄 বিচারের পরিধি নির্দিষ্টকরণ
পেছনে উল্লেখকৃত উদাহরণগুলো থেকে নববি যুগে নির্দিষ্ট বিচারকের বিষয়টি যেমন স্পষ্ট হয়, তেমনি তাদের বিচারকার্য পরিচালনার নির্দিষ্ট এলাকাও স্পষ্ট হয়ে যায়। যেমন আত্তাব ইবনু উসাইদ-কে মক্কার প্রশাসক ও বিচারক নিযুক্ত করার সময় তিনি মক্কা নগরী এবং মক্কার পার্শ্ববর্তী এলাকা তার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছিলেন। বাহরাইন ছিল আল-আলা ইবনুল হাদরামি-এর নির্দিষ্ট জায়গা। ইয়ামানে নিযুক্ত সাহাবিদের প্রত্যেকেরই ইয়ামানের নির্দিষ্ট অংশ বা নগরীর দায়িত্ব ছিল। নবিজির নির্ধারিত বিচারকদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ পরিধিতে দায়িত্ব পালন করতেন।
তদ্রূপ বিচারের ধরন কী হবে এবং প্রকার কেমন হবে, সেটাও নির্দিষ্ট ছিল। বিচারক সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয় দেখবেন, নাকি যে-কোনো বিষয়ে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন, সেটাও নির্ধারণ করে দেওয়া হতো। আলি, আবু মূসা আশআরি এবং মুআয ইবনু জাবাল-এর নিয়োগের ক্ষেত্রে বিষয়টি সুস্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। তারা রক্তপণ, সম্পদ, দণ্ডবিধি, দৈহিক বিধানাবলি এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক পরিস্থিতির বিচারকার্য পরিচালনা করতেন। যেমন: বিবাহ, তালাক, বংশ প্রমাণিতকরণ, উত্তরাধিকার ইত্যাদি।
আবার কোনো কোনো মামলার ক্ষেত্রে বিচারকের সময়সীমা নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকত। নির্দিষ্ট মেয়াদের পর বিচারকের কার্যকারিতা এবং নিযুক্তির সময় উত্তীর্ণ হয়ে যেত। যেমন আমর ইবনুল আস-এর কাছে মামলা দায়ের করা এবং নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে উকবা ইবনু আমির আল-জুহানি এবং হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান -এর বিচার করার ঘটনা। তবে বিচারক সাধারণভাবে সব বিষয়ে বিচার পরিচালনা করবেন—এটাই ইসলামি বিচারব্যবস্থার মূল নিয়ম। রাসূল এবং বড় বড় বিচারকগণও এমনটাই করেছেন। এজন্যই আমরা দেখতে পাই, রাসূল যেমন রক্তপাতের বিষয়ে ফয়সালা করেছেন, তেমনি দণ্ডবিধিও কার্যকর করেছেন। সম্পদ ও সম্পদ-সংক্রান্ত অধিকারের বিচারের মতো দৈহিক অধিকার এবং বন্দির বিধান সংক্রান্ত বিচারও তিনি পরিচালনা করেছেন。
📄 নববি যুগে বিচারব্যবস্থার উৎস
নববি যুগে বিচারব্যবস্থা এবং অন্যান্য বিধান ছিল ওহির ওপর নির্ভরশীল। যা আসমান থেকে অবতীর্ণ হওয়া চিরসতেজ কুরআন কারীমের আকৃতিতে প্রকাশ পেত। কখনো-বা প্রকাশ পেত রাসূল থেকে বর্ণিত হাদিসের মাধ্যমে। যিনি কখনোই প্রবৃত্তি-তাড়িত হয়ে কথা বলতেন না। বরং তাঁর প্রতিটি কথাই ছিল আল্লাহর তরফ থেকে প্রেরিত ওহি। কখনো গবেষণার আকৃতিতে স্বয়ং রাসূল বা সাহাবিদের থেকে তা বিকশিত হতো। তবে সবগুলোই ছিল ওহির অধীন। শরীয়ত আর দ্বীনের সমর্থিত বিষয়কে ওহিও স্বীকৃতি দিত। পক্ষান্তরে শরীয়ত আর দ্বীনের সাথে বিরোধপূর্ণ বিষয় ওহি যে শুধু খণ্ডন করত তা-ই নয়, সেটা বাতিল আখ্যা দিয়ে সঠিক বিষয় বাতলেও দিত। মোটকথা, নববি যুগে বিচারব্যবস্থার উৎস ছিল তিনটি।
প্রথমত: কুরআন কারীম, যা মুহাম্মাদ-এর ওপর অবতীর্ণ হওয়া আল্লাহর কালাম। কোনো ঘটনা, প্রশ্ন এবং দাবির আগে যেমন তা অবতীর্ণ হতো, তেমনি সেসবের পরেও বিবরণ এবং সঠিক নির্দেশনা নিয়ে অবতীর্ণ হতো। কোনো মোকদ্দমা সামনে এলে নবি দুটি কাজের কোনো একটি অবশ্যই করতেন। হয়তো পূর্বে নাযিল হওয়া বিধানের আলোকে ফয়সালা করে দিতেন, নয়তো নাযিল হয়নি—এমন বিধানের ক্ষেত্রে ওহির অপেক্ষায় থাকতেন। অবশেষে ওহি নাযিল হওয়ার পরে বিধানটি সর্বত্র প্রচার করে দিতেন। যেমনটা ঘটেছিল উহুদ যুদ্ধে সাদ ইবনুর রবি শহীদ হওয়ার পরে। সাদের ভাইয়েরা তার মেয়েদের বঞ্চিত করে সব সম্পত্তি নিয়ে নেন। সাদের স্ত্রী তখন নবি -এর কাছে এ বিষয়ে মোকদ্দমা দায়ের করলে তিনি অপেক্ষা করার নির্দেশ দিলেন। অবশেষে উত্তরাধিকারের বিধান সংবলিত আয়াত নাযিল হওয়ার পরে সে অনুসারে ফয়সালা করলেন।
আরেকবার জনৈক মহিলার স্বামী তার সাথে যিহার করলে নবি তাকেও বিধান নাযিল হওয়ার অপেক্ষা করতে বলেছিলেন। অবশেষে এ সংক্রান্ত বিধান অবতীর্ণ হয়। এমন আরও অনেক ঘটনা আছে।
দ্বিতীয়ত: সুন্নাহ। অর্থাৎ নবি যা বলেছেন, করেছেন এবং সমর্থন দিয়েছেন। এর মূল ভিত্তি হলো ওহি। কারণ তিনি প্রবৃত্তি-তাড়িত হয়ে কোনো কথা বলেননি। এ হিসেবে সুন্নাহও মর্মগত দিক থেকে ওহি। জিবরীলের নির্দেশনায় কিংবা সরাসরি আল্লাহ তাআলার তরফ থেকে তা আসত। নবি তা কার্যকর করতেন এবং সাহাবিগণ তার বুঝ ধারণ করতেন। পরবর্তীকালে বিভিন্ন কিতাবে হাদিস ও সুন্নাহ সংকলন করা হয়।
তৃতীয়ত: কুরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই—এমন বিষয়ে গবেষণা করা। সেটার পদ্ধতি হলো বিধানযুক্ত বিষয়কে বিধানবিহীন সামঞ্জস্যপূর্ণ বিষয়ের সাথে তুলনা (কিয়াস) করার জন্য বিবেক-বুদ্ধি কাজে লাগানো। এর উদ্দেশ্য হলো সমতা প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় প্রতিহত করা।
এই উৎস তিনটি সর্বসম্মতিক্রমে স্বীকৃত এবং দলিলের মাধ্যমে প্রমাণিত। যেমন পূর্বে মুআয-এর হাদিস আলোচনা করা হয়েছে। ফয়সালা করার পদ্ধতি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, 'আমি গবেষণা করব; কোনো রকম কমতি করব না।' তখন বিচারব্যবস্থার এই সঠিক পদ্ধতিটিকে আল্লাহর নবি শুধু স্বীকৃতিই দেননি; বরং সন্তুষ্টিও প্রকাশ করেছিলেন। ইসলামি বিচারব্যবস্থার এই পদ্ধতি অন্যান্য সাহাবি এবং মুসলিমদের সবাই বুঝে নিয়েছেন।
উম্মু সালামা বর্ণনা করেছেন, দুজন ব্যক্তি মিরাস এবং পুরাতন জিনিসের ব্যাপারে মামলা নিয়ে হাজির হলে নবি তাদের বললেন, 'এ সম্পর্কে আমার কাছে কোনো হুকুম অবতীর্ণ না হওয়ায় আমি আমার মতানুযায়ী ফয়সালা করে দেবো।
আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন, 'কারও কাছে মোকদ্দমা পেশ করা হলে সে যেন আল্লাহর কিতাব অনুসারে ফয়সালা করে। আল্লাহর কিতাবে নেই এমন বিষয় উপস্থাপিত হলে নবি-এর বিচারকার্য অনুপাতে ফয়সালা করবে। যদি এমন মোকদ্দমা সামনে আসে যার বিবরণ আল্লাহর কিতাবেও নেই এবং নবি -ও তেমন বিচারকার্য পরিচালনা করেননি, তবে নেককার ব্যক্তিদের কথা অনুসারে ফয়সালা করবে। আর যদি এমন মোকদ্দমা সামনে আসে-যার বিবরণ আল্লাহর কিতাবেও নেই, নবিজির সুন্নাহতেও নেই, এমনকি নেককার ব্যক্তিরাও সে ব্যাপারে কিছু বলেননি, তাহলে নিজের ইজতিহাদ তথা গবেষণা অনুপাতে ফয়সালা করবে। কেউ যদি ভালোমতো গবেষণা করতে না পারে, তাহলে লজ্জা না করে বিষয়টি স্বীকার করে নেবে।'
অন্য বর্ণনায় এসেছে যে, আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেছেন, 'হারাম সুস্পষ্ট এবং হালালও সুস্পষ্ট। উভয়ের মাঝে কিছু সংশয়পূর্ণ বিষয় আছে। সুতরাং সন্দেহপূর্ণ বিষয় ছেড়ে সন্দেহাতীত বিষয় গ্রহণ করো।'
সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব আলি-এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন, 'আমি বললাম, “হে আল্লাহর রাসূল! এমন অনেক বিষয় আমাদের সামনে আসে, যে সম্পর্কে কুরআনে কিছু অবতীর্ণ হয়নি, এমনকি সে বিষয়ে আপনার কোনো সুন্নাহও পাওয়া যায় না।” উত্তরে তিনি বললেন, "আলিমদের বা ইবাদতগুজার মুমিনদের একত্র করে তোমাদের উপদেষ্টা বানিয়ে নেবে। তবে একজনের মতের মাধ্যমে অপরের মত খণ্ডন করবে না।”'
বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব গ্রহণের পর আলি-এর কাছে এমন এক মোকদ্দমা এল, যার সমাধান তিনি কুরআন-সুন্নাহয় খুঁজে পাচ্ছিলেন না। তখন তিনি বললেন, 'আমি তোমাদের মাঝে ফয়সালা করে দিচ্ছি। তোমরা সন্তুষ্ট হলে সেটাই হবে চূড়ান্ত ফয়সালা। অন্যথা বিষয়টি আমি মুলতুবি রাখব। তখন তোমরা মোকদ্দমাটি নিয়ে রাসূলুল্লাহ-এর কাছে যাবে।'
দেখা গেল, আলি কৃত ফয়সালা তারা মেনে নিতে পারেনি। অবশেষে তারা হজের সময় আল্লাহর রাসূল-এর কাছে গেল। তখন তিনি মাকামে ইবরাহিমের কাছে অবস্থান করছিলেন। সব শুনে তিনি আলি কৃত ফয়সালা বহাল রেখে বললেন, 'সে তোমাদের মাঝে যে ফয়সালা করেছে, সেটাই চূড়ান্ত।' সুতরাং বোঝা গেল, বিচারের ফয়সালা শরীয়ত মোতাবেক ও ওপরের তিনটি উৎস থেকে গ্রহণ করা উচিত।
টিকাঃ
[১১৭] আসবাবুন নুযূল লিল ওয়াহিদি: ১২২ দ্রষ্টব্য।
[১১৮] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৯২
[১১৯] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৮৫
[১২০] আল-মুসতাদরাক আলাস সহিহাইন, হাদিস নং: ৭০৩০
[১২১] সুনানুদ দারিমি, হাদিস নং: ১৬৭
[১২২] ইলামুল মুওয়াকিয়ীন (ইলনিয়্যাহ): ১/৫২
[১২৩] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস নং: ৫৭৩; যাদুল মাআদ: ৫/১৪; তবাকাতু ইবনি সাদ: ১/৯৫