📄 নববি যুগের পরিচয়
মক্কায় কুরআন নাযিল হওয়ার মাধ্যমে ঐতিহাসিক নববি যুগের সূচনা হয় এবং তার সমাপ্তি ঘটে মদীনায় রাসূল -এর ইন্তেকালের মাধ্যমে ওহির ধারা বন্ধ হওয়ার দ্বারা। এই নববি যুগ তার পূর্ববর্তী স্তরকে ম্লান করে দিয়েছে।
কিন্তু বিচারব্যবস্থার ইতিহাসের আলোকে নববি যুগ কেবল মাদানি জীবনেই সীমাবদ্ধ। হিজরতের মাধ্যমে এর সূচনা হয়েছিল। এই সময়টাতেই তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, সংবিধান প্রণয়ন করেন, উম্মতের বিষয়াদি সুবিন্যস্ত করেন, সংবিধানের আলোকে বিচারব্যবস্থার প্রচলন ঘটান এবং রাষ্ট্রীয় শক্তির রূপ দান করেন। এটাই নববি যুগে বিচারব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের উদ্দেশ্য।
📄 নববি যুগে বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব
নববি যুগ ছিল বিচারব্যবস্থার প্রাথমিক যুগ। এ যুগেই বিচারব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এই যুগ ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। নানান দিক বিবেচনায় ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে এ যুগ অনন্য। যেমন,
১. নববি যুগেই ইসলামি বিচারব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে। প্রণীত হয়েছে নীতিমালা এবং প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বিচারের নিয়মকানুন। যাতে ইসলামের বিচারব্যবস্থা সুবিন্যস্ত হয় এবং শারঈ বিধিমালা আর বিচারের সাধারণ নিয়মকানুন সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
২. নববি যুগের বিচারব্যবস্থা ছিল নিরাপদ, নিপুণ, পরিপূর্ণ এবং হাতেকলমে বাস্তবায়ন। কুরআনের আয়াত এবং রাসূল -এর সেসব মৌখিক হাদিসের বাস্তব চিত্র, যা পালনের ব্যাপারে স্বয়ং রাসূলের পক্ষ থেকে তাত্ত্বিক আদেশ, উদাত্ত আহ্বান এবং উৎসাহের জোগান যেমন রয়েছে, তেমনি অন্যায়, অবিচার, সীমালঙ্ঘন এবং সম্পদ নষ্ট করার ব্যাপারে সতর্কবার্তাও আছে। এসব নিয়ে আমরা প্রথম পরিচ্ছেদে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আলোচনা করেছি।
৩. নববি যুগে ইসলামি বিচারব্যবস্থা ছিল জাহিলি যুগের প্রচলিত আদর্শ, মূল্যবোধ, নিয়মনীতি এবং বিধিবিধানের পার্থক্যকারী সীমানা। সে যুগে প্রচলিত আদর্শ, মূল্যবোধ, নীতিমালার মধ্য থেকে ইসলাম কেবল সেসবই গ্রহণ করেছে, যা তার সাথে মানানসই, তার উপযুক্ত এবং কল্যাণকর। যেগুলো অচল, বেকার, অগ্রহণযোগ্য, মিথ্যা, অকল্যাণকর এবং অপকারী, সেগুলো ইসলাম বর্জন করেছে। সেগুলোর সাথে আল্লাহর দ্বীন এবং শরীয়তের কোনো সম্পর্ক নেই। শরীয়তের সাধারণ কিংবা বিশেষ উদ্দেশ্য-কোনোটার সাথেই সেসব সামঞ্জস্য রাখে না।
৫. নববি যুগের বিচারব্যবস্থা এভাবে বিবৃত হয়েছে যে: রাসূলুল্লাহ হলেন একজন নবি, যার কাছে ওহি আসত। সেইসাথে একজন মানুষ বিচারক। দ্বীনি শক্তি আর আধ্যাত্মিক ক্ষমতার সাথে রাষ্ট্রীয় আর দুনিয়াবি ক্ষমতার সমন্বয় তাঁর মাঝে ঘটেছিল। সুতরাং নববি যুগের বিচারব্যবস্থা একদিক থেকে ছিল ঐশী প্রত্যাদেশ আর আল্লাহর শাসনের বাস্তবায়ন। অপরদিক থেকে তা ছিল রাষ্ট্রক্ষমতার অংশ, যা বাস্তবায়নে কর্তৃত্ব আর রাষ্ট্রশক্তি সহযোগিতা করে থাকে।
৬. যে বিচারব্যবস্থা আল্লাহর রাসূল নিজে পরিচালনা করেছেন, সেটা পবিত্র সুন্নাহর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামি শরীয়তের দ্বিতীয় উৎসরূপে কিয়ামত অবধি তা বহাল থাকবে। আল্লাহর রাসূল -এর পরিচালিত বিচারব্যবস্থা নিছক তত্ত্বকথা বা কোনো কাঠখোট্টা চিন্তা নয়। আবার চোখধাঁধানো প্রতীকি চিহ্নও নয়। বরং তা হলো ইসলামি শরীয়তের বাস্তবায়ন। বাস্তব জীবন আর জগতের সাথে যার রয়েছে দৃঢ় সম্পর্ক। মানবপ্রকৃতি ও স্বভাবের সাথে যার রয়েছে গভীর যোগাযোগ। মানবপ্রকৃতিতে ভালো-মন্দ, সততা-অসততা, আদর্শ এবং বাস্তববাদিতার মতো অসংখ্য বৈশিষ্ট্য রয়েছে। নবি কর্তৃক পরিচালিত বিচারব্যবস্থা ছিল মৌলিক ভিত্তির কার্যত নমুনা। মামলা-মোকদ্দমা, দাবিদাওয়া, দলিল-প্রমাণ, বিচারের নীতিমালা এবং ইসলামি বিধিবিধান বাস্তবায়নের বাস্তব উদাহরণ।
৮. নববি যুগের বিচারব্যবস্থা আঁকড়ে ধরা সকল সময়ের সব জায়গার সমস্ত মুসলিমের জন্য আবশ্যক। প্রতিটি মুসলিম তার অনুসরণ করতে বাধ্য। তার আলোয় আলোকিত হওয়া এবং তার ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করা সমস্ত মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এই চিন্তা সবাইকেই গ্রহণ করতে হবে। এই আদর্শ অনুসরণ করে এ পথেই সবাইকে চলতে হবে। এ পদ্ধতি ভিন্ন কোনো পদ্ধতি নেই। এ এক অদ্বিতীয় ব্যবস্থাপনা। অতএব এর প্রয়োগ, কার্যকর আর বাস্তবায়ন আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা বলেন,
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِى رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُوا اللَّهَ وَ الْيَوْمَ الْآخِرَ وَ ذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا
তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসূলের অনুসরণের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল।
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ يُدْخِلْهُ جَنَّتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهُرُ যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশমতো চলে, তিনি তাকে জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন।
وَ مَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُوْلَ فَأُولَبِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِّنَ النَّبِيِّنَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّلِحِينَ، وَحَسُنَ أُولَبِكَ رَفِيقًا
আর যে আল্লাহর এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করবে, সে ওইসব লোকের সঙ্গী হবে যাঁদের প্রতি আল্লাহ নিয়ামত দান করেছেন— অর্থাৎ নবিগণ, সিদ্দিকগণ, শহীদ এবং নেককার ব্যক্তিবর্গ। তারা কতই-না উত্তম সাথি।
وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য করে, সে অবশ্যই মহা সাফল্য অর্জন করবে।
قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَّحِيمٌ আপনি বলে দিন, 'তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো তাহলে আমাকে অনুসরণ করো, তাহলে আল্লাহও তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ মার্জনা করে দেবেন। আর আল্লাহ পরম ক্ষমাশীল চিরদয়ালু।
৭. সমস্ত বিশ্বের বিচারব্যবস্থার জন্য নববি যুগের বিচারব্যবস্থা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যা আমাদের নিরপেক্ষতা শিক্ষা দেয়, নিষ্ঠাবান হতে শেখায়, ইনসাফ শিক্ষা দেয় এবং সত্যকে আঁকড়ে ধরতে শেখায়। সত্য যদি আত্মীয়স্বজন, সন্তান-সন্ততি, এমনকি নিজের বিপক্ষেও হয়, তবুও ইনসাফ করতে হবে। কোনো মুসলিমের বিপক্ষে হলেও অকুণ্ঠ চিত্তে সত্য উচ্চারণ করতে হবে। এই বিচারব্যবস্থায় মুসলিম এবং কাফিরের মাঝে তফাত নেই। ইনসাফপূর্ণ খোদায়ি বিধান প্রতিষ্ঠা, শরীয়তের নীতিমালা সুদৃঢ় করা এবং আল্লাহ-প্রদত্ত চিরস্থায়ী সংবিধান বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নববি যুগের বিচারব্যবস্থা অনন্য।
টিকাঃ
[৯০] সূরা আহযাব, ৩৩: ২১
[৯১] সূরা নিসা, ৪:৮০
[৯২] সূরা নিসা, ৪: ১৩
[৯৩] সূরা নিসা, ৪:৬৯
[৯৪] সূরা আহযাব, ৩৩: ৭১
[১৫] সূরা আলি ইমরান, ৩: ৩১
📄 নববি যুগের বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য
সমস্ত ইসলামি যুগের মাঝে নববি যুগে বিচারব্যবস্থার কিছু অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল। এর মধ্যকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আমরা এখানে উল্লেখ করছি।
১) নববি যুগের বিচারব্যবস্থা ইসলামের বিচারব্যবস্থার ইতিহাসে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সে যুগেই এর সূচনা হয়। বপণ করা হয় ইসলামি বিচারব্যবস্থার বীজ। সেই সময়টাকে বিচারব্যবস্থার ভিত্তিপ্রস্তর বলা চলে। তখনই এর গোড়াপত্তন হয়। যার ওপর দৃশ্যমান হয়েছে ইসলামি, মানবিক এবং জাগতিক ইতিহাসের সুউচ্চ ভবন। কিয়ামত অবধি যার উন্নয়ন, উত্তরণ ঘটতে থাকবে। কেননা রাসূল-কে আল্লাহ তাআলা সত্য দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের মাঝে তা প্রয়োগের জন্য তিনি ছিলেন আদিষ্ট। তাই তাঁর বিচারব্যবস্থা ছিল ন্যায়ের সুস্পষ্ট চিত্র এবং সর্বাধিক সুন্দর অবস্থা। কারণ সত্য আর ন্যায়কে স্থান আর কালের গণ্ডিতে আবদ্ধ করা যায় না।
২) সে যুগে বিচারব্যবস্থা এবং সত্য আর ন্যায়ের সম্পর্ক ছিল আকাশের সাথে। সরাসরি আল্লাহর তত্ত্বাবধানে। তাই তো বিধান-সংবলিত ওহি নাযিল হতো। সত্যের নির্দেশনা আসত। নির্ণয় করে দেওয়া হতো সরল এবং সঠিক পথ। ঊর্ধ্বজগৎ থেকে তা বাস্তবায়ন আর প্রয়োগের দেখভাল করা হতো। কোনো ধরনের ত্রুটি-বিচ্যুতি ঘটলে সংশোধন করা এবং সঠিক পন্থা বাতলে দিতে নেমে আসত ঐশীবার্তা। ওহির ধারার পরিসমাপ্তি ঘটার পর এমন আর হয় না। নবুওয়ত শেষ হয়ে যাওয়ায় সেসবের পুনরাবৃত্তি হবে—এমন স্বপ্নও কেউ দেখে না। ওহির মাধ্যমে কত যে গবেষণা এবং বিধানের স্বীকৃতি মিলেছিল!
৩) রাসূলুল্লাহ ছিলেন প্রথম বিচারক। বিচারব্যবস্থার একমাত্র দায়িত্বশীল। নির্বাচিত নবি, মনোনীত রাসূল আর নিষ্পাপ শরীয়তপ্রণেতা হওয়ায় আল্লাহর রাসূল নিজেই বিচারব্যবস্থা পরিচালনা করতেন। নবুওয়ত ধারণের লক্ষ্যে আল্লাহ তাঁকে নির্বাচন করেছিলেন। দ্বীন প্রচারের জন্য তাঁকেই মনোনয়ন দিয়েছিলেন। ওহি এবং পাপমুক্তির মাধ্যমে তাঁকে জুগিয়েছিলেন শক্তি। আরও দিয়েছিলেন অনন্য বুদ্ধিমত্তা ও জীবনীশক্তি, চমৎকার দেহসৌষ্ঠব, চমৎকার আকৃতি, সুমহান চরিত্র, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং ক্ষুরধার মেধা। ফেরেশতারা তাঁকে পাহারা দিয়ে রাখত এবং তাঁর কদম সোজা করে দিত। তাই তো তাঁর বিচারব্যবস্থা প্রসিদ্ধ। সর্বাধিক ন্যায়পরায়ণ বিচারক তিনি। শীর্ষস্থানীয় বিচারকের আসনটি তাঁরই অধীনে।
৪) দ্বীনদারি, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, মেধা, অভিজ্ঞতা, শক্তি, উদ্যম এবং বিশ্বস্ততা দেখে নবি সাহাবিদের মাঝে বিচার এবং প্রশাসন পরিচালনার উপযুক্ত ব্যক্তি বাছাই করতেন। সত্য এবং ন্যায়পরায়ণতার পাথেয় জোগান দিয়ে তাদেরকে দিক-নির্দেশনা আর উপদেশ প্রদান করতেন। আবার এমনও হয়েছে যে, ধার্মিক দুনিয়াবিমুখ হওয়া সত্ত্বেও আবু যার-এর আবেদন নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'তুমি তো দুর্বল'। আবদুর রহমান ইবনু সামুরা-কে দায়িত্ব চেয়ে নেওয়ার ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন।
৫) বিচারক এবং প্রশাসকদের প্রতি রাসূলুল্লাহ লক্ষ রাখতেন। তাদের রায় ও হুকুম নবিজির সামনে উত্থাপিত হতো। যেসব বিধান শরীয়ত আর দ্বীনের অনুকূলে থাকত, সেগুলো তিনি সমর্থন করতেন। আর শরীয়ত পরিপন্থি হলে শুধরে দিতেন।
৬) বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব হলো সার্বজনীন দায়িত্বের অংশবিশেষ। এ কারণেই রাসূল আইনগত দায়িত্ব প্রদানের সাথে সাথে কার্যকরকরণ, বিচারিক তত্ত্বাবধান এবং অনুসন্ধানের দায়িত্বও প্রদান করতেন। তাঁর নিযুক্ত বেশির ভাগ বিচারকই সাধারণত বিচারকার্য যেমন পরিচালনা করতেন, তেমনি তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও আঞ্জাম দিতেন। বিচারব্যবস্থার সাথে অন্যান্য দায়িত্বের পার্থক্য খুব কমই হতো। শুধুমাত্র কলহ নিরসন আর দাবি-দাওয়া নিষ্পত্তির কাজে নিয়োজিত আলাদা বিচারক বলতে গেলে ছিলই না।
রাসূলুল্লাহ আল্লাহ তাআলার নাযিলকৃত কুরআন মানুষের কাছে পৌঁছে দিতেন। রাষ্ট্র পরিচালনা এবং কলহ নিরসন আর মোকদ্দমা নিষ্পত্তি ছিল তাঁরই দায়িত্ব। পাশাপাশি মানুষের মাঝে শরীয়তের বিধানও তিনি বাস্তবায়ন করতেন। আবার নিয়োগকৃত প্রশাসক এবং বিচারক সাহাবিদের রায় ও হুকুমের প্রতিও তাঁর নজর ছিল। এভাবেই তিনি এক হাতে রাষ্ট্রের সবকিছু সামলাতেন।
বিধান বাস্তবায়ন করা, নামাজ কায়েম, যাকাত ও সদাকা একত্রকরণ, মানুষকে দ্বীনি বিষয় বিশেষত কুরআন তিলাওয়াত এবং শরীয়তের বিধানাবলি শিক্ষা প্রদান ছিল তাঁর নিয়োগকৃত বেশির ভাগ বিচারকদের দায়িত্ব। মুআয ইবনু জাবাল, আলি ইবনু আবি তালিব, আবু মূসা আশআরি এবং আল-আলা ইবনুল হাদরামি -কে নিয়োগদানের বিষয়টি লক্ষ করলে এটাই স্পষ্ট হয়।
৭) নববি যুগের বিচারব্যবস্থা সাধারণত ফতোয়া প্রদান কিংবা সালিশব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্য রাখত। মুসলিমরা সাধারণত বাস্তব বিরোধ অথবা প্রকৃত বিবাদের কথা না-বলে বিরোধপূর্ণ ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান কী হবে—আল্লাহর রাসূল বা তাঁর নিয়োগকৃত বিচারকের কাছে সেটা জানতে চাইতেন। সে যুগে মোকদ্দমার সংখ্যা ছিল কম। রাসূল -এর কাছে বিধান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি জানিয়ে দিতেন। তখন তারা ফিরে গিয়ে সওয়াবের আশায় আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বিধান পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নে লেগে যেতেন। বিরোধের বর্ণনা দেওয়ার সময় বাদী-বিবাদী উভয়ই স্বেচ্ছায় হাজির থাকতেন। শরীয়তের বিধান শোনার পর সেটা কার্যকর করতে তারা কোনো রকম বিলম্ব করতেন না।
৮) নববি যুগে বিচারব্যবস্থা ছিল সহজ। এজন্য বড় কোনো আয়োজন ছিল না। আবার মোকদ্দমাও কম আসত। কিন্তু তার উন্নতির জন্য সর্বজনীন নীতিমালা, মৌলিক ভিত্তি, সামগ্রিক মূলনীতি এবং সদুদ্দেশ্য ছিল বিধায় সময় এবং স্থানের চাহিদা অনুপাতে তাতে গবেষণা করার সুযোগ ছিল। ফলশ্রুতিতে নববি যুগের বিচারব্যবস্থা সমস্ত যুগের মুসলিমের জন্যই কুরআন কারীমের পর আইনের দ্বিতীয় উৎস হয়ে ওঠে। এজন্যই রাসূলুল্লাহ মোকদ্দমা দায়েরের নিয়ম, বিচারের নীতিমালা, শুনানি প্রক্রিয়া, বিচারের রায় এবং কার্যকরের বিধানাবলি বাতলে দিয়েছেন। যাতে সর্ব যুগের সমস্ত স্থানের মানুষ এ ক্ষেত্রে দিশা লাভ করতে পারে।
৯) বিচারব্যবস্থা পরিচালনা এবং মোকদ্দমা দায়েরের নীতিমালার দিক থেকে নববি যুগের বিচারক পূর্ণ স্বাধীনতা রাখতেন। রায় প্রদান এবং গবেষণার ক্ষেত্রে কোনো রকম চাপ ছিল না। কুরআন-হাদিস মানার পর নিজের চিন্তা, বুদ্ধিমত্তা এবং বিচক্ষণতাকে উন্মুক্তভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ ছিল। বিচারক এবং প্রশাসককে নিয়োগ দানের পর নবি তাকে ন্যায় নিশ্চিত করার জন্য ছেড়ে দিতেন। যেমন হুযাইফা -কে বলেছিলেন, 'যাও, তাদের মাঝে ফয়সালা করো।' আত্তাব ইবনু উসাইদ -কে বলেছিলেন, 'চলো, বাইতুল্লাহর পড়শিদের দায়িত্বে তোমাকে নিযুক্ত করছি।' তাঁর নির্দেশনা ছিল: প্রথমে কিতাবুল্লাহর, তারপর সুন্নাহর শরণাপন্ন হতে হবে। এরপর প্রয়োজন অনুপাতে গবেষণা করা যাবে।
১০) স্পষ্টবাদিতা ছিল নববি যুগের বিচারব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য। সব ধরনের অবকাশ প্রদান, আনুষ্ঠানিকতা এবং জটিলতা থেকে তা মুক্ত ছিল। দ্রুত মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করে চটজলদি তা বাস্তবায়নও করে ফেলা হতো। ফলে বিচারব্যবস্থার লক্ষ্যের বাস্তবায়ন যেমন ঘটত, তেমনি অধিকার রক্ষা, ইনসাফ কায়েম এবং জুলুম আর সীমালঙ্ঘন নির্মূলের মতো বিচারব্যবস্থার উদ্দেশ্যও পূরণ হতো।
১১) সে যুগে অভিযোগের তদন্ত এবং নিয়ন্ত্রণ-সংক্রান্ত ফয়সালা সাধারণ বিচারব্যবস্থার সাথে সংযুক্ত ছিল। বিচারক সব ধরনের বিচার করার যোগ্যতা রাখতেন। সর্বজনীন আর পরিব্যাপ্ত ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারও বিচারকের ছিল।
টিকাঃ
[১৭৩] সিয়ারু আলামিন নুবালা: ২/৭৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৮২৫
[১৭৪] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১৫৬২; সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৬২২ ও ৭১৪৭
[১৭৫] আল-কাদ্বা ফী সদরিল ইসলাম, পৃ. ৯৯