📄 গণকদের বিচারকার্য
তৎকালীন আরবে গণকদের কাছে রায় চাওয়ার প্রচলন ছিল। সাধারণ লোকদের বিশ্বাস ছিল গণকরা জ্যোতিষশাস্ত্রের মাধ্যমে, ভাগ্যগণনা এবং জিনদের সাহায্যে অদৃশ্যের সংবাদ জানতে পারে। গণকরা দাবি করত যে বিভিন্ন লক্ষণ, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এবং অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে তারা এসব বিষয় জেনে থাকে। বনু মাযিনের রবি ইবনু রবীআ ইবনি যিব এ ব্যাপারে খুব খ্যাতি লাভ করেছিল। সে ছিল প্রাচীন আরব গোত্র গাসসানের প্রবীণ গণক। আরবের লোকেরা শুধু যে তার কাছে বিচার নিয়ে যেত, তা-ই নয়। তার ফয়সালাও খুশিমনে মেনে নিত। সে যুগে তার সিদ্ধান্ত ছিল প্রবাদতুল্য। সে থাকত শামের উঁচু ভূমি জাবিয়াতে। নবি -এর জন্মের কিছুদিন পরে হিজরতের ৫২ বছর আগে ৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে সে মারা যায়। লোকেরা তার কাছে এসে বলত, বলুন তো আমরা কোন বিষয়ে কথা বলতে এসেছি? তখন সে তাদের আগমনের উদ্দেশ্য জানিয়ে দিত।
📄 দাবির সপক্ষে দলিল-প্রমাণের পদ্ধতি
জাহিলি যুগে আরবরা দাবি প্রমাণের ক্ষেত্রে সাক্ষী এবং তাদের উপাস্য দেবদেবীর প্রতি বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করত। এ ক্ষেত্রে তারা লটারি এবং শপথ গ্রহণের সাহায্য নিত। এটা হতো বারংবার শপথ গ্রহণের মাধ্যমে। সন্তানের বংশপরিচয় নিয়ে সন্দেহ হলে তারা কিয়াফা তথা নিশানা ধরে ট্রেস করতে পারদর্শী ব্যক্তির সাহায্য নিত। অপরাধীর অবস্থান শনাক্ত করতে তারা পদচিহ্ন ধরে ট্রেস করার পাশাপাশি অন্তর্দৃষ্টি কাজে লাগাত। এ ক্ষেত্রে তারা বাহ্যিক অবস্থা এবং পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণ করে মনের সুপ্ত প্রবল ধারণার মাধ্যমে প্রমাণ পেশ করত। সেসব গণক ও জ্যোতিষীর প্রতি তাদের অগাধ বিশ্বাস ছিল, যারা অবস্থা জানার জন্য জিন চালান দিত।
টিকাঃ
[৮৩] ইমাম বুখারি ইবনু আব্বাস সূত্রে জাহিলি যুগে শপথ গ্রহণের পদ্ধতি উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে সহিহুল বুখারির ৩৬৩২ নং হাদিস দ্রষ্টব্য।
📄 মোকদ্দমা এবং বিচারের ক্ষেত্র
সে যুগে উত্তরাধিকার সম্পত্তি, হত্যা, চুরি, ছিনতাই, রাহাজানি এবং নারীদের ওপর জুলুম নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিবাদ-বিসংবাদ এবং মামলা-মোকদ্দমা সংঘটিত হতো। এ ছাড়া পশুর চারণভূমি, ঘাস খাওয়ানো এবং পানি পান করানো নিয়েও কলহ সৃষ্টি হতো তাদের মাঝে। আবার নেতৃত্ব নিয়েও তারা ঝগড়া করত। ক্ষমতা আর কর্তৃত্ব নিয়ে তাদের মাঝে যুদ্ধ বেঁধে যেত। বংশীয় আভিজাত্যের বড়াই নিয়ে তাদের মাঝে দাঙ্গা-হাঙ্গামা লেগেই থাকত।
📄 মক্কায় ন্যায় প্রতিষ্ঠার সাংগঠনিক প্রচেষ্টা
কিছু কিছু সমস্যার সমাধানে আরবরা সুশৃঙ্খলভাবে চেষ্টা করেছিল। ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা, সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা, দুর্বল, অসহায় এবং মজলুম মানুষের পক্ষে লড়াই করার জন্য তারা দৃঢ় প্রচেষ্টা চালিয়েছিল। এ লক্ষ্যে কুরাইশরা ফয়সালার জন্য কয়েকজন লোককে নির্বাচন করেছিল। তাদের মধ্যে বনু সাহামের নেতৃস্থানীয় লোকেরা কুরাইশদের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ এবং মামলা-মোকদ্দমার নিষ্পত্তি করত। আর কুরাইশের সাথে অন্যান্য গোত্রের ঝগড়া-বিবাদ এবং মামলা-মোকদ্দমা নিষ্পত্তির জন্য বনু আদির কিছু লোককে ঠিক করা হয়েছিল। এ ধরনের বিচার ও সালিশি দায়িত্ব যাদের দেওয়া হয়েছিল, তারা হলেন হাশিম ইবনু আবদি মানাফ, আবদুল মুত্তালিব, আবু তালিব, আবু বকর সিদ্দিক, উমর ইবনুল খাত্তাব এবং যুল ইসবা আল-উদওয়ানি। এরপর কুরাইশের সবগুলো উপগোত্র হিলফুল ফুজুল নামে একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ঐকমত্য হয়। যার উদ্দেশ্য ছিল মক্কা মুকাররমায় থাকা স্বাধীন-দাস, আপন-পর, মুকিম-মুসাফির—এক কথায় সমস্ত মানুষ থেকে জুলুম আর অত্যাচার প্রতিহত করা। সমস্ত মানুষকে সহায়তা করা, তাদের অধিকার রক্ষা, জুলুম-নির্যাতন প্রতিহত করা এবং সবার প্রতি ইনসাফ করার ব্যাপারে তারা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিল। রাসূল ﷺ নিজেও তাদের সাথে প্রতিজ্ঞায় অংশ নিয়েছিলেন। সে-সময় তিনি ছিলেন ২৫ বছর বয়সের টগবগে তরুণ। এ ব্যাপারে তিনি বলেছেন, 'আমি তো আবদুল্লাহ ইবনু জাদআনের ঘরে একটি মৈত্রী চুক্তি দেখেছি। ইসলামের যুগেও যদি আমাকে এ ব্যাপারে আহ্বান করা হয়, তাহলে আমি অবশ্যই সাড়া দেবো। এই সংগঠনের মোকাবিলায় লাল উটও আমার কাছে বেশি পছন্দনীয় নয়। তারা এ মর্মে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল যে, মানুষকে তাদের প্রাপ্য অধিকার দেওয়া হবে; মজলুমের ওপর জালিমের অত্যাচার মেনে নেওয়া হবে না।'
টিকাঃ
[৮৪] তার নাম প্রকৃত হিরসান ইবনুল হারিস। জাহিলি যুগের প্রাজ্ঞ কবি এবং বাহাদুর। তার কবিতায় প্রজ্ঞা, উপদেশ এবং গৌরবগাঁথা থাকত। হিজরতের ২২ বছর আগে ৬০০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। — আল-আলাম: ২/১৮৪
[৮৫] সীরাতু ইবনি হিশাম: ১/১৩৩-১৩৪