📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 জাহিলি যুগে প্রচলিত আইনকানুন

📄 জাহিলি যুগে প্রচলিত আইনকানুন


আরবদের কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না কোনো বিধিবিধান ও আইনকানুন। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে তাদের মাঝে গোত্রভিত্তিক নানান রীতিনীতি, হরেক রকম শহুরে ও গ্রামীণ প্রথা এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন রসম-রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। এসবের ভিত্তিতেই তারা বিচার-আচার করত। যার মূল ছিল সাম্প্রদায়িক চেতনা। এর ভিত্তিতেই তারা একে অপরকে সাহায্য করত। চাই সে জালিম হোক কিংবা মজলুম। তারা ছিল ভয়ংকর প্রতিশোধপ্রবণ জাতি। প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা সীমালঙ্ঘন করত। প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল জালিম ও অপরাধীর প্রতি আক্রমণে তারা সীমাবদ্ধ থাকত না। বরং ওই গোত্রের নিরীহ মানুষদেরকেও নির্বিচারে হত্যা করত। প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে গোত্রপ্রধানকেও তারা ছাড় দিত না। সীমালঙ্ঘন করত। একপর্যায়ে তাদের মাঝে তুমুল যুদ্ধ বেঁধে যেত। প্রতিশোধ-স্পৃহা বেড়েই চলত। এমনকি তা ধারাবাহিকভাবে বংশপরম্পরায় চলে আসত।
রক্তপাত বন্ধের জন্য সন্ধির প্রতি আগ্রহী হয়ে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে মুক্তিপণ দেওয়া হতো। বিভিন্ন ধরনের বিবাহ-পদ্ধতি এবং নারী-বন্দির প্রথা প্রচলিত ছিল। তাদের মতে তালাকের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা ছিল না। কেবল প্রভাবশালী পুরুষরাই উত্তরাধিকার হতো। বঞ্চিত হতো শিশু এবং নারীরা। তাদের মাঝে পালকপুত্র গ্রহণ এবং মৈত্রী-চুক্তির রেওয়াজ ছিল। বেচাকেনা, হাদিয়া-তোহফা, মিরাস, ওসিয়ত, জবরদস্তি, দখলদারি, আক্রমণ এবং যুদ্ধের মাধ্যমে তারা মাল অর্জন করত। দাসদাসীর প্রথা তাদের মাঝে প্রচলিত ছিল। চলমান কঠিন যুদ্ধ এবং দীর্ঘ লড়াই থেকে বাঁচতে তারা মিত্র চুক্তিতে আবদ্ধ হতো। রুটি-রুজি, পশুখাদ্য, পানি এবং বৃষ্টির সন্ধানে প্রতিনিয়ত জায়গা বদল করা ছিল তাদের স্বাভাবিক বিষয়।

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 আরবদের জীবনযাত্রায় অন্য জাতির প্রভাব

📄 আরবদের জীবনযাত্রায় অন্য জাতির প্রভাব


আরব জাতি হাবাশা, রোম এবং পারস্যের মতো প্রতিবেশী কিছু জাতির জীবনব্যবস্থার মাধ্যমে প্রভাবিত ছিল। তবে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কিছু প্রাচীন রীতিতে নির্ভরশীল হওয়ার বিরল উদাহরণও পাওয়া যায়।
পরিবারগুলো হতো পিতৃকেন্দ্রিক। পিতা হতেন অগাধ শ্রদ্ধা, ভাবগাম্ভীর্য, সম্মান এবং ক্ষমতার অধিকারী। তিনিই সন্তানদের মাঝে সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসা করতেন। গোত্রের মাঝে তিনি হতেন পরিবারের প্রতিনিধি। আর গোত্রপ্রধানের যোগ্যতা ছিল রাষ্ট্রপতির যোগ্যতার সমান। তার থাকত কর্তৃত্ব, গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং যে-কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার। সাধারণত বয়সের ভারত্ব, সাহসিকতা, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান-গরিমা এবং বিচক্ষণতা দেখে গোত্রপ্রধান নির্বাচন করা হতো। বিবাদ মীমাংসা এবং গোত্রের লোকদের মাঝে সৃষ্ট বিরোধ মিটানোর ভার ন্যস্ত থাকত গোত্রপ্রধানের ওপর। আবার অন্য গোত্রের লোকদের সাথে বিরোধ দেখা দিলে দুই গোত্রপ্রধান মিলে সুরাহা করত। কিংবা তৃতীয় কোনো গোত্রপ্রধানের কাছে বিচার উত্থাপন করত। অথবা বিচারের জন্য সালিশ ডাকত।

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 সালিশি বৈঠক

📄 সালিশি বৈঠক


জাহিলি যুগের অনেক সালিশের কথা জানা যায়। এ ব্যাপারে অনেকের পারদর্শিতা প্রসিদ্ধ। বিশেষত বিচারিক বিধানাবলি এবং ঐতিহ্যসূত্রে প্রাপ্ত বিচক্ষণতার কারণে তাদের অনেকে আজও অমর হয়ে আছেন। এখানে এমন কয়েকজনের আলোচনা আমরা করব।
আকসাম ইবনু সাইফি: জাহিলি যুগে আরবের অন্যতম মাতব্বর। তিনি দীর্ঘ হায়াত পেয়েছিলেন। তিনি বলতেন, 'অন্তর নষ্ট হয়ে যাওয়া ব্যক্তির দৃষ্টান্ত এমন ব্যক্তির মতো, যার গলায় পানি আটকে গেছে। যে ব্যক্তি শিক্ষাগ্রহণ করে না, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঠাট্টা-মশকরা থেকেই বিদ্বেষের সূচনা হয়। সমতল ভূমিতে চললে আছাড় খেতে হয় না। বিপদমুক্ত স্থানেও সতর্ক থাকা উচিত। নিঃস্ব ব্যক্তির দুর্ভোগের শেষ নেই।' তিনি ইসলামের সময়কাল পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। ৯ম হিজরিতে ১০০জন লোক নিয়ে মদীনার উদ্দেশে রওনা হন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণের সৌভাগ্য তার হয়নি। মদীনায় পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। তার সাথি-সঙ্গীদের অনেকে মদীনায় পৌঁছে ইসলাম গ্রহণ করেন। সাথি-সঙ্গীদের তিনি বলতেন, 'মুহাম্মাদ তো সচ্চরিত্রের আদেশ করেন এবং মন্দ চরিত্র থেকে নিষেধ করেন। সুতরাং তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণে তোমরা এগিয়ে যাও। এ ব্যাপারে পিছিয়ে থেকো না।' এভাবেই নবিজির অনুসরণ করতে তিনি উদ্বুদ্ধ করতেন।
কুস ইবনু সায়িদা আল-আয়াদি: তিনি ছিলেন আরবের অন্যতম বিচক্ষণ ব্যক্তি এবং প্রসিদ্ধ বিচারক। জাহিলি যুগের বড় বড় বক্তাদের মাঝে তিনি অন্যতম। ছিলেন নাজরানের বিশপ। তিনি বলতেন, 'প্রমাণ দেখাবে দাবিদার এবং শপথ করবে অস্বীকারকারী।' কথিত আছে, তিনি ছিলেন আরবের মাঝে তলোয়ার বা লাঠির ওপর ভর দিয়ে সর্বপ্রথম বক্তৃতাকারী। أَمَّا بَعْدُ কথাটি সর্বপ্রথম তিনিই বলেছিলেন। রোম সম্রাটের কাছে প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থিত হলে তাকে যথেষ্ট সম্মান আর সমাদর করা হতো। নবুওয়ত লাভের আগে নবি ﷺ তাকে উকাযে দেখেছেন এবং নবুওয়ত প্রাপ্তির পরে তার প্রশংসাও করেছেন।
আমির ইবনুয যরিব আল-আদওয়ানি: তিনি ছিলেন মুদার গোত্রের অত্যন্ত বিচক্ষণ নেতা, মাতব্বর এবং ঘোড়সওয়ার। জ্ঞানগর্ভ বক্তব্য প্রদানে তিনি ছিলেন পটু। আরবের কেউ তার প্রজ্ঞা এবং বিচক্ষণতার ধারেকাছেও ছিল না। জাহিলি যুগে তিনিই সর্বপ্রথম মদ অবৈধ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তিনি দীর্ঘ হায়াত লাভ করেন।
উমাইয়া ইবনু আবিস সলত আস-সাকাফি: তায়িফ নিবাসী আরবের এই মাতব্বর ছিলেন জাহিলি যুগের প্রাজ্ঞ কবি। প্রাচীন কিতাবাদি সম্পর্কে তার জ্ঞান ছিল। জাহিলি যুগেই নিজের জন্য মদের অবৈধতা ঘোষণা দিয়ে পৌত্তলিকতা বর্জন করেছিলেন। ইসলামের যুগও পেয়েছিলেন তিনি। নবি ﷺ -এর কাছে কুরআন শুনে তাঁর সত্যতার ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। কিন্তু ইসলাম গ্রহণ করা থেকে তিনি বিরত থাকেন। বদর যুদ্ধে নিহত হওয়া মুশরিকদের মাঝে তার দুজন মামাতো ভাই ছিল। এ সংবাদ পেয়ে তিনি আর ইসলাম গ্রহণ করেননি। অবশেষে ৫ম হিজরিতে তায়িফে তার মৃত্যু হয়। তিনিই সর্বপ্রথম بِاسْمِكَ اللَّهُمَّ (হে আল্লাহ! আপনার নামে) লেখার প্রচলন করেছিলেন। তার কবিতা শুনে নবি ﷺ বলেছেন, 'সে তো প্রায় মুসলিমই হয়ে গিয়েছিল।' অন্য বর্ণনামতে তিনি বলেছিলেন, 'সে অবশ্যই তার কবিতায় মুসলিম হওয়ার কাছাকাছি চলে গিয়েছিল।'
সাহাবি আক্বরা ইবনু হাবিস: জাহিলি যুগে আরবের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এবং সালিশ ছিলেন। তামিম গোত্রের দারিম বংশের প্রতিনিধিদলের সাথে মদীনায় এসে ইসলাম গ্রহণ করেন। হুনাইনের যুদ্ধ এবং মক্কা ও তায়িফ বিজয়ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। মদীনাতেই অবস্থান করতেন। পরবর্তীকালে আবু বকর রা.-এর খিলাফতকালে তিনি দুমাতুল জান্দাল-এ চলে যান। খালিদ ইবনু ওয়ালিদ রা.-এর সাথে ইয়ামামার যুদ্ধ-সহ অনেক যুদ্ধে তার অংশগ্রহণ ছিল। ৩১ হিজরিতে খোরাসানের জোযজানে বাহিনী-সহ শাহাদাত বরণ করেন।
হাজিব ইবনু যুরারা: তিনি ছিলেন জাহিলি যুগের অন্যতম নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। বিভিন্ন স্থানে তামিম গোত্রের সর্দার ছিলেন। নবি ﷺ-এর জন্মের ১৯/১৭ বছর আগে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ইসলাম গ্রহণের পর নবিজি তাকে তামিম গোত্রের যাকাত উসুলের দায়িত্ব প্রদান করেছিলেন। এর কিছুদিন পরই তার ইন্তেকাল হয়ে যায়।

টিকাঃ
[৭৮] আস-আলাম: ১/৩৪৪
[৭৯] আল-আলাম: ৪/২০
[৮০] সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২২৫৫
[৮১] আল-ইসাবাহ: ১/২৮৬
[৮২] আল-আলাম: ৩/৩৮; আবকারিয়‍্যাতুল ইসলাম: ৪৩৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 গণকদের বিচারকার্য

📄 গণকদের বিচারকার্য


তৎকালীন আরবে গণকদের কাছে রায় চাওয়ার প্রচলন ছিল। সাধারণ লোকদের বিশ্বাস ছিল গণকরা জ্যোতিষশাস্ত্রের মাধ্যমে, ভাগ্যগণনা এবং জিনদের সাহায্যে অদৃশ্যের সংবাদ জানতে পারে। গণকরা দাবি করত যে বিভিন্ন লক্ষণ, গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এবং অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে তারা এসব বিষয় জেনে থাকে। বনু মাযিনের রবি ইবনু রবীআ ইবনি যিব এ ব্যাপারে খুব খ্যাতি লাভ করেছিল। সে ছিল প্রাচীন আরব গোত্র গাসসানের প্রবীণ গণক। আরবের লোকেরা শুধু যে তার কাছে বিচার নিয়ে যেত, তা-ই নয়। তার ফয়সালাও খুশিমনে মেনে নিত। সে যুগে তার সিদ্ধান্ত ছিল প্রবাদতুল্য। সে থাকত শামের উঁচু ভূমি জাবিয়াতে। নবি -এর জন্মের কিছুদিন পরে হিজরতের ৫২ বছর আগে ৫৭২ খ্রিষ্টাব্দে সে মারা যায়। লোকেরা তার কাছে এসে বলত, বলুন তো আমরা কোন বিষয়ে কথা বলতে এসেছি? তখন সে তাদের আগমনের উদ্দেশ্য জানিয়ে দিত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00