📄 ইসলামের জন্য আরবকে নির্বাচনের কারণ
ইসলামের আবির্ভাব হয়েছে মক্কা মুকাররমায়। মক্কা হলো জাযিরাতুল আরব তথা আরব উপদ্বীপে থাকা সমস্ত জনপদের কেন্দ্রবিন্দু। তৎকালীন সমস্ত আরব গোত্রের একমাত্র ঠিকানা ছিল এই মক্কা। ইসলামের সুমহান পয়গাম বহনের জন্য আল্লাহ তাআলা আরব জাতিকে বাছাই করেছেন। কারণ আরব জাতির মাঝে অনেক গুণ এবং বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান ছিল। অবশ্য কিছু বৈশিষ্ট্য বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। আবার কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল শিরক ও পৌত্তলিকতা মেশানো। কোনো কোনো বৈশিষ্ট্যের উৎস ছিল গোত্রের সাম্প্রদায়িক চেতনা। আবার কতক বৈশিষ্ট্যের মূলে ছিল কেবলই আঞ্চলিকতা বা বর্বরতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা—যা নিয়ে তাদের অহংকার ও গর্বের সীমা ছিল না।
তারপর সৌন্দর্য, কল্যাণ এবং বিস্ময় প্রতিষ্ঠার বার্তা নিয়ে পৃথিবীতে মহান শরীয়তের আগমন ঘটে। সব ধরনের কলুষতা, খারাবি এবং নিন্দনীয় জিনিসকে দূর করাই যার লক্ষ্য। মূল্যবোধ ও আদর্শের পরিমার্জন করে তার উৎস প্রকাশ করা যার উদ্দেশ্য। যাকে কাজে লাগানোর মাধ্যমে চেতনা আর আদর্শকে নিষ্কলুষ, মূল্যবোধ, ফলদায়ক ও উপকারী করা যায়। এজন্যই আমরা ইসলাম-পূর্ব আরবের বিচারব্যবস্থার সংক্ষিপ্ত আলোচনা করতে চলেছি। যাতে এর পরে আমরা ইসলাম এবং জাহিলিয়াতের মধ্যকার সম্পর্ক পর্যালোচনা করতে পারি।
📄 আরব উপদ্বীপের রাজনৈতিক এবং সামাজিক জীবন
সবার আগে আমাদের জানা থাকতে হবে, আরব উপদ্বীপে আরবের একক কোনো জাতি বসবাস করত না। তাদের স্বতন্ত্র কোনো রাষ্ট্র ছিল না। বরং তাদের জীবন চলত গোত্রীয় জীবনব্যবস্থার অধীনে। বড় বড় শহর, শহরতলি, গ্রাম এবং গ্রাম্য জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রেই ছিল এই গোত্রব্যবস্থার আধিপত্য। আর গোত্রগুলো বিভিন্ন শাখা ও উপশাখায় বিভক্ত থাকত। যুদ্ধ-সন্ধি, মানুষের অধিকার, বিচারব্যবস্থা এবং পরিচালনার ক্ষেত্রে একচ্ছত্র ক্ষমতা থাকত গোত্রপতির কাছে। আর পরিবারপ্রধানের থাকত বিশেষ ক্ষমতা। সে যুগে নারীরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল না। বরং অধিকাংশ মানুষ নারী জাতিকে ভোগ্য সামগ্রীর চেয়ে বেশি কিছু ভাবত না। কখনো-বা নারীকে ঈষৎ সম্মানের জায়গায় স্থান দেওয়া হতো। পরিবারের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের সাথে পরামর্শ করা হতো। বিশেষত তার বিয়ের ব্যাপারে। সে যুগে কবিতা, সাহিত্য, লড়াই এবং জীবিকা নির্বাহের কাজে মহিলারাও পুরুষের সাথে অংশগ্রহণ করত।
📄 জাহিলি যুগে প্রচলিত আইনকানুন
আরবদের কোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না কোনো বিধিবিধান ও আইনকানুন। জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে তাদের মাঝে গোত্রভিত্তিক নানান রীতিনীতি, হরেক রকম শহুরে ও গ্রামীণ প্রথা এবং ঐতিহাসিক বিভিন্ন রসম-রেওয়াজ প্রচলিত ছিল। এসবের ভিত্তিতেই তারা বিচার-আচার করত। যার মূল ছিল সাম্প্রদায়িক চেতনা। এর ভিত্তিতেই তারা একে অপরকে সাহায্য করত। চাই সে জালিম হোক কিংবা মজলুম। তারা ছিল ভয়ংকর প্রতিশোধপ্রবণ জাতি। প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে তারা সীমালঙ্ঘন করত। প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল জালিম ও অপরাধীর প্রতি আক্রমণে তারা সীমাবদ্ধ থাকত না। বরং ওই গোত্রের নিরীহ মানুষদেরকেও নির্বিচারে হত্যা করত। প্রতিশোধ গ্রহণের ক্ষেত্রে গোত্রপ্রধানকেও তারা ছাড় দিত না। সীমালঙ্ঘন করত। একপর্যায়ে তাদের মাঝে তুমুল যুদ্ধ বেঁধে যেত। প্রতিশোধ-স্পৃহা বেড়েই চলত। এমনকি তা ধারাবাহিকভাবে বংশপরম্পরায় চলে আসত।
রক্তপাত বন্ধের জন্য সন্ধির প্রতি আগ্রহী হয়ে নিহত ব্যক্তির পরিবারকে মুক্তিপণ দেওয়া হতো। বিভিন্ন ধরনের বিবাহ-পদ্ধতি এবং নারী-বন্দির প্রথা প্রচলিত ছিল। তাদের মতে তালাকের নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা ছিল না। কেবল প্রভাবশালী পুরুষরাই উত্তরাধিকার হতো। বঞ্চিত হতো শিশু এবং নারীরা। তাদের মাঝে পালকপুত্র গ্রহণ এবং মৈত্রী-চুক্তির রেওয়াজ ছিল। বেচাকেনা, হাদিয়া-তোহফা, মিরাস, ওসিয়ত, জবরদস্তি, দখলদারি, আক্রমণ এবং যুদ্ধের মাধ্যমে তারা মাল অর্জন করত। দাসদাসীর প্রথা তাদের মাঝে প্রচলিত ছিল। চলমান কঠিন যুদ্ধ এবং দীর্ঘ লড়াই থেকে বাঁচতে তারা মিত্র চুক্তিতে আবদ্ধ হতো। রুটি-রুজি, পশুখাদ্য, পানি এবং বৃষ্টির সন্ধানে প্রতিনিয়ত জায়গা বদল করা ছিল তাদের স্বাভাবিক বিষয়।
📄 আরবদের জীবনযাত্রায় অন্য জাতির প্রভাব
আরব জাতি হাবাশা, রোম এবং পারস্যের মতো প্রতিবেশী কিছু জাতির জীবনব্যবস্থার মাধ্যমে প্রভাবিত ছিল। তবে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের কিছু প্রাচীন রীতিতে নির্ভরশীল হওয়ার বিরল উদাহরণও পাওয়া যায়।
পরিবারগুলো হতো পিতৃকেন্দ্রিক। পিতা হতেন অগাধ শ্রদ্ধা, ভাবগাম্ভীর্য, সম্মান এবং ক্ষমতার অধিকারী। তিনিই সন্তানদের মাঝে সৃষ্ট বিরোধের মীমাংসা করতেন। গোত্রের মাঝে তিনি হতেন পরিবারের প্রতিনিধি। আর গোত্রপ্রধানের যোগ্যতা ছিল রাষ্ট্রপতির যোগ্যতার সমান। তার থাকত কর্তৃত্ব, গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং যে-কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার অধিকার। সাধারণত বয়সের ভারত্ব, সাহসিকতা, অভিজ্ঞতা, জ্ঞান-গরিমা এবং বিচক্ষণতা দেখে গোত্রপ্রধান নির্বাচন করা হতো। বিবাদ মীমাংসা এবং গোত্রের লোকদের মাঝে সৃষ্ট বিরোধ মিটানোর ভার ন্যস্ত থাকত গোত্রপ্রধানের ওপর। আবার অন্য গোত্রের লোকদের সাথে বিরোধ দেখা দিলে দুই গোত্রপ্রধান মিলে সুরাহা করত। কিংবা তৃতীয় কোনো গোত্রপ্রধানের কাছে বিচার উত্থাপন করত। অথবা বিচারের জন্য সালিশ ডাকত।