📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস 📄 কুরআনের ভাষ্য

📄 কুরআনের ভাষ্য


ফয়সালা এবং বিচারকার্যের সপক্ষে কুরআনের অনেক আয়াত রয়েছে। মানুষের ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করে দেওয়া ছিল সাধারণভাবে নবিগণের ওপর এবং বিশেষভাবে নবি -এর জন্য আবশ্যক। এটা ছিল তাঁদের দায়িত্বের অংশ। কুরআনের ভাষ্য অনুসারে আল্লাহর দ্বীনের বিধান কবুল করা এবং তা বাস্তবায়ন করাই কেবল যথেষ্ট নয়। বরং আল্লাহর দ্বীন ও শরীয়ত অনুসারে ফয়সালার ওপরও ঈমান নির্ভরশীল। এখানে আমরা এ সম্পর্কিত কুরআন কারীমের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি। আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرْبكَ اللَّهُ وَلَا تَكُنْ لِلْخَا بِنِيْنَ خَصِيمًا আমি তো আপনার প্রতি সত্য-সহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছে সে অনুসারে লোকদের মাঝে আপনি ফয়সালা করেন। আর আপনি খিয়ানতকারীদের পক্ষে তর্ককারী হবেন না।
মানুষের মাঝে বিচার ফয়সালা করা তো এমনিতেই রিসালাতের অন্যতম লক্ষ্য। আর যে-কোনো ধরনের লোকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং তাদের মাঝে ফয়সালা করে দেওয়ার ব্যাপারে নবি যে আল্লাহর তরফ থেকে বিশেষভাবে আদিষ্ট ছিলেন, আলোচ্য আয়াতটি অবতীর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপট থেকে তা সুস্পষ্ট হয়ে যায়।
তু'মা নামক একজন আনসারি তার প্রতিবেশী কাতাদার কাছ থেকে একটি বর্ম চুরি করে। তারপর সেটি জনৈক ইহুদির কাছে লুকিয়ে রাখে। পরে খোঁজ করা হলে স্বাভাবিকভাবেই তু'মার কাছে বর্মটি পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া সে শপথ করে বর্মটি না নেওয়ার কথাও জানায়। অবশেষে ইহুদিটির কাছ থেকে বর্মটি উদ্ধার করা হয়। সে তখন জানায়, তু'মাই তার কাছে বর্মটি রেখে গেছে। এ ছাড়া আরও কয়েকজন ইহুদিও একই কথা বলে। তখন তু'মার গোত্রের কয়েকজন নবি -এর কাছে গিয়ে পূর্ণ ঘটনা বর্ণনা করে। তারা তু'মার পক্ষে রায় দেওয়ার জন্য নবিজিকে অনুরোধ করে। নাহলে বিষয়টি মুসলিমদের জন্য লজ্জাজনক হবে, আবার ইহুদিও ছাড় পেয়ে যাবে। নবিজিও তখন তু'মার পক্ষে রায় দিয়ে ইহুদিকে শায়েস্তা করবেন বলে ভাবছিলেন। এমন সময় আলোচ্য আয়াতটি নাযিল করে আল্লাহ তাআলা সত্য এবং সঠিক বিষয়টি স্পষ্ট করে দিলেন।
يَدَاوُدُ إِنَّا جَعَلْنَكَ خَلِيفَةً فِي الْأَرْضِ فَاحْكُمْ بَيْنَ النَّاسِ بِالْحَقِّ وَ لَا تَتَّبِعِ الْهَوَى فَيُضِلَّكَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ হে দাউদ! আপনাকে আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি বানিয়েছি, অতএব আপনি মানুষের মাঝে সুবিচার করুন, তবে খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। কেননা তা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।
মানুষের মাঝে বিচার-ফয়সালা এবং মামলা-মোকদ্দমার নিষ্পত্তি একজন নবির জন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজ। আল্লাহর জমিনে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করা অত্যাবশ্যক। এই আয়াতের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হয়। সামনের আয়াতের মাধ্যমে তা আরও জোরালোভাবে স্পষ্ট হবে।
এই আয়াত থেকে এটাও প্রমাণিত হয় যে, উম্মতে মুসলিমার প্রথম সম্পর্ক ঊর্ধ্বজগতের সাথে। তারপর নবি-রাসূলের ইতিহাসের সাথে। পূর্ববর্তীদের এবং আমাদের দেওয়া বিধান ও শরীয়ত এই দিক থেকে এক হওয়ার ব্যাপারে শরীয়তের মূলনীতি বিশেষজ্ঞ আলিমদের কারও দ্বিমত নেই। আর ইসলামে বিচারব্যবস্থার অর্থ আল্লাহর নীতি বাস্তবায়ন, আল্লাহর বিধান প্রয়োগ এবং পূর্ববর্তী নবি-রাসূলের কাজকে পরিপূর্ণ করা।
لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُوْمَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ وَلِيَعْلَمَ اللهُ مَنْ يَنْصُرُهُ وَرُسُلَهُ بِالْغَيْبِ إِنَّ اللَّهَ قَوِيٌّ عَزِيزٌ
অবশ্যই আমার রাসূলদের আমি সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে পাঠিয়েছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ন্যায়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকে। আর আমি লোহা দিয়েছি, যা-তে আছে প্রচণ্ড শক্তি এবং মানুষের জন্য বহুবিধ কল্যাণ। যাতে আল্লাহ জেনে নিতে পারেন যে, কে না-দেখেও তাঁকে ও তাঁর রাসূলদেরকে সাহায্য করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ মহাশক্তিধর, পরাক্রমশালী।
আলোচ্য আয়াতে প্রথমে রাসূলগণের প্রতি কিতাব ও ন্যায়নীতি অবতীর্ণ করার কথা সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করা হয়েছে। এরপর ন্যায়নীতি অবতীর্ণ করার কারণ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। পাশাপাশি লোহা দেওয়ার কথা বলে এ দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, মোকদ্দমা নিষ্পত্তি, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, বিধান বাস্তবায়নের জন্য শক্তিরও প্রয়োজন আছে। তবেই আল্লাহর দ্বীন ও শরীয়ত পূর্ণতা লাভ করবে।
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنفُسِهِمْ حَرَجًا مِّمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا
না, আপনার প্রতিপালকের শপথ! তারা ততক্ষণ ঈমানদার হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের মাঝে সৃষ্ট বিবাদের বিচারক্ষমতা আপনার ওপর ন্যস্ত না করবে; তারপর আপনার ফয়সালার ব্যাপারে তাদের মনে কোনো প্রকার সংকীর্ণতা না রেখে সন্তুষ্টচিত্তে তা মেনে নেবে।
এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঈমানকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের বিচারের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন। বুখারি এবং মুসলিমের বর্ণনামতে আলোচ্য আয়াতটি যুবাইর ইবনুল আওয়াম রা. এবং তার বিবাদীর জমিতে পানি সেচ দেওয়ার বিষয়ে অবতীর্ণ হয়েছিল।
কুরআন কারীম এখানে এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, নবি ﷺ-কে বিচারক মেনে নেওয়ার বিষয়টি ঈমানের সাথে সম্পৃক্ত। যেমন আরেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا
ঈমানদারদের যখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের দিকে ডাকা হয়, যাতে রাসূল তাদের মাঝে মীমাংসা করে দিতে পারেন, তখন তাদের কথা কেবল এটাই হয় যে, আমরা শুনলাম এবং মেনে নিলাম।
এই আয়াত থেকে বুঝে আসে, আল্লাহর দ্বীন এবং শরীয়তের ডাকে সাড়া দেওয়াই ঈমানের দাবি। মোকদ্দমা নিষ্পত্তি, ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্য রাসূলের আহ্বানে সাড়া দেওয়া, ন্যায়সংগত কথা মান্য করা এবং তাঁর কথার বাস্তবায়ন ঈমানদারদের কর্তব্য। সুতরাং বিচারকার্যও ছিল নবি -এর অন্যতম কর্তব্য। যা তাঁর পরে তাঁর খলিফা এবং বিচারকদের কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে।
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَبِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ
আপনার প্রতি আমি সত্য-সহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যা তার আগে অবতীর্ণ হওয়া কিতাবের সত্যায়নকারী এবং সেগুলোর সংরক্ষক। অতএব আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, সে অনুসারে তাদের মাঝে আপনি বিচার-ফয়সালা করুন। আপনার কাছে যে সত্য এসেছে, তা ছেড়ে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না।
এর পরবর্তী আয়াতেই আল্লাহ তাআলা বলছেন, وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعُ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَفْتِنُوكَ عَنْ بَعْضٍ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْكَ
আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, সে অনুযায়ী আপনি বিচার-ফয়সালা করুন; তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। তাদের ব্যাপারে আপনি সতর্ক থাকুন। তারা যেন আপনাকে এমন-কোনো নির্দেশ থেকে বিচ্যুত না করে, যা আল্লাহ আপনার প্রতি অবতীর্ণ করেছেন।
আয়াত দুটিতে কেবল লোকদের মাঝে বিচার-ফয়সালার আদেশই দেওয়া হয়নি; বরং এটাও নির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ। পাশাপাশি মানুষের খেয়াল-খুশি এবং আল্লাহর নীতির সাথে সাংঘর্ষিক মানবরচিত বিধানের ব্যাপারেও সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। কেননা এসব বিধান কুফরি, জুলুম বা পাপাচার। যেমন অন্য জায়গায় আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَفِرُوْنَ আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারাই কাফির।
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّلِمُوْنَ আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারাই জালিম।
وَمَنْ لَّمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَسِقُوْنَ আল্লাহর অবতীর্ণ বিধান অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারাই ফাসিক।
ওপর্যুক্ত আয়াত তিনটি আল্লাহর কিতাবে নাযিলকৃত বিধান ও শরীয়ত অনুযায়ী ফয়সালা করার আবশ্যকীয়তা বোঝায়। তবে সেটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা, সেখানকার বিচারব্যবস্থার নীতি অনুসারে মামলা-মোকদ্দমার ফয়সালা করার ক্ষেত্রে এবং ইনসাফ বাস্তবায়নের ওপর নির্ভরশীল। আয়াতগুলো থেকে এটা প্রমাণিত হয়— আল্লাহর নাযিলকৃত বিধানের বিরোধিতাকারী যদি নিজের বিরোধিতার প্রতি আস্থা রেখে আল্লাহর বিধানকে অবজ্ঞা করে, তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে। সে যদি আল্লাহর বিধানের পরিবর্তে ভিন্ন বিধান অনুসারে ফয়সালা করে, তবে সে জালিম হবে। আর যদি সে আল্লাহর বিধান অনুসারে ইনসাফ ও সুবিচার থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্যায় আর জুলুম করে, তবে সে ফাসিক বলে গণ্য হবে।
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَنَتِ إِلَى أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِهِ إِنَّ اللَّهَ كَانَ سَمِيعًا بَصِيرًا
নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তার প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেবে। আর যখন তোমরা মানুষের মাঝে ফয়সালা করবে, তখন সুবিচার করবে। আল্লাহ তোমাদের কত সদুপদেশ দান করেন। আল্লাহ তো সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।
এ আয়াতে নবি -সহ সমস্ত মুসলিমকে যথাযথ প্রাপকদের কাছে আমানত পৌঁছে দেওয়ার আদেশ করা হয়েছে। আর দায়িত্বশীলদের বলা হয়েছে, তোমরা মানুষের মাঝে সুবিচার করো। এটাই সমস্ত বিধানের উৎস। এ কারণেই শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ বলেন, 'আলোচ্য আয়াতটি প্রাপকের কাছে আমানত পৌঁছে দেওয়া এবং সুবিচার করার নির্দেশনা। সুতরাং এ দুটিই হলো ন্যায়-নীতি এবং সঠিক দায়িত্বের সমষ্টি।'
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُ بِالْعَدْلِ وَالْإِحْسَانِ وَ إِيتَائِ ذِي الْقُرْبَى وَيَنْهَى عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ وَالْبَغْيِ يَعِظُكُمْ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
আল্লাহ তো ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার আদেশ দেন। আর অশ্লীলতা, অসৎ কাজ এবং অবাধ্যতা থেকে নিষেধ করেন। তিনি তোমাদের উপদেশ দেন, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।
আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ন্যায়, হক প্রদান এবং আত্মীয়স্বজনের সাথে সদাচারের আদেশ আর অসৎ কাজ ও অবাধ্যতা করতে নিষেধ করেছেন। এখন মানুষ আল্লাহর নির্দেশনা মেনে নিলে লাভবান হবে। তার উদ্দেশ্যও সাধন হবে। তখন মানুষ সঠিক ও ন্যায়সংগত পথে থাকবে। দুনিয়ার শান্তি-সুখের পাশাপাশি সীরাতে মুসতাকিমের ওপর থাকতে পারবে। ফলশ্রুতিতে কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে লাভ করবে সওয়াব এবং বিনিময়। নাহয় শরীয়ত হয়ে যাবে কাগজের ওপর কলম দিয়ে লেখা মাত্র। চটকদার স্লোগান আর অলীক কল্পনা ছাড়া আর কিছুই তখন থাকবে না। জালিম আর সীমালঙ্ঘনকারীরা তখন মানুষের অধিকার নিয়ে খেলায় মেতে উঠবে। সুতরাং রাষ্ট্রের নীতি আর বিচারব্যবস্থা আল্লাহর শরীয়ত আর দ্বীন অনুসারে পরিচালনাই হলো মানুষের মাঝে ইনসাফ কায়েম আর ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একমাত্র কার্যকর পন্থা।
এখানে ন্যায় বলে সুবিচার, ইনসাফ এবং সাম্যের কথা বোঝানো হয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনু মাসউদ বলেন, 'কুরআনের এই আয়াতটিতে সব ধরনের ভালো-মন্দ বিষয়ের কথা এসে গেছে।'
কাতাদা বলেন, 'জাহিলি যুগের লোকদের সব রকম উত্তম চরিত্র, যত ধরনের ভালো কাজ তারা করত, এমনকি যেসব কাজ তারা পছন্দ করত সে-সবকিছুর প্রতিই এ আয়াতে আদেশ করা হয়েছে। শুধু তাদের অপছন্দনীয় কাজগুলোই নয়; বরং সব ধরনের নিন্দনীয় চরিত্র এবং কাজের প্রতিই এ আয়াতে নিষেধাজ্ঞা এসেছে।' নিন্দনীয় কাজের মাঝে সর্বাপেক্ষা নিকৃষ্ট হলো জুলুম, অবাধ্যতা এবং সীমালঙ্ঘন করা।
তৎকালীন আরবে বিচক্ষণ ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত আকসাম ইবনু সাইফি এই আয়াত শুনে বলেছিল, 'আমার মনে হয়, সর্বোত্তম চরিত্রবান হওয়ার আদেশ এবং নিকৃষ্টতম চরিত্রের অধিকারী হতে নিষেধ করা হচ্ছে। সুতরাং এ আদেশ পালনের ক্ষেত্রে তোমরা অগ্রগামী হও। এ ব্যাপারে তোমরা পিছিয়ে থেকো না।' নবি এই আয়াতটি ওয়ালিদ ইবনু মুগিরার সামনে তিলাওয়াত করলে সে বলল, আবার বলো দেখি। নবি তখন দ্বিতীয়বার তিলাওয়াত করলে সে বলল, 'আল্লাহর কসম, কথাটা বলতেও ভালো লাগে, আবার শুনতেও ভালো লাগে! নির্দেশনা যেমন চমৎকার, তার কার্যকারিতাও তেমনি দারুণ হবে। এটা কোনো মানুষের কথা হতে পারে না।'
এ ছাড়া অন্য আরও অনেক আয়াতে ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জোর দেওয়া হয়েছে। যার অধীনে বিচারব্যবস্থা থাকবে। তবেই আল্লাহর বিধানাবলি যথাযথভাবে প্রয়োগ হবে। নাহয় বিধানাবলি তার কার্যকারিতা হারাবে। শরীয়ত অচল হয়ে পড়বে। উদাহরণস্বরূপ সূরা মায়িদা নিয়ে চিন্তা করা যেতে পারে। সুবিচার, ন্যায় এবং ইনসাফের নির্দেশনা নিয়ে এই সূরাতে অনেকগুলো আয়াত আছে। এসব নির্দেশনা নবি এবং তাঁর খলিফাদের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছিল। আধুনিকভাবে তার বাস্তবায়ন করতে হবে বা আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে ব্যাখ্যা করতে হবে—এমন কোনো চিন্তার সুযোগ নেই। কুরআনে থাকা বিধান-সংবলিত প্রতিটি আয়াত থেকেই পৃথিবীতে আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের অপরিহার্যতা বুঝে আসে। বিশেষভাবে বিচারব্যবস্থা এবং ফয়সালা সংক্রান্ত আয়াত না থাকলেও সাক্ষ্য এবং লিখে রাখা সংক্রান্ত আয়াত তো কুরআনে সুস্পষ্টই আছে।

টিকাঃ
[৪৫] সূরা নিসা, ৪:১০৫
[৪৬] বিস্তারিত ঘটনা জানতে আসবাবুন নুযূল লিলওয়াহিদি: ১৫২ দেখুন।
[৪৭] সূরা সোয়াদ, ৩৮: ২৬
[৪৮] সূরা হাদিদ, ৫৭: ২৫
[৪৯] সুরা নিসা, ৪: ৬৫
[৫০] সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৪৩০৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ২৩৫৭; আসবাবুন নুযূল : ১২৮
[৫১] সূরা নূর, ২৪ : ৫১
[৫২] প্রখ্যাত তাফসিরবিদ কুরতুবি লিখেছেন, 'মুজাহিদ এ-সহ একদল আলিম বলেছেন, "যারা তাগুতকে বিচারক মানে তাদেরকে এই আয়াতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, কেবল আল্লাহর বিধানই চলবে; আর তা হবে রাসূলের সামনে।” সুতরাং শারঈ বিধানের সমালোচকের তাওবা করা আবশ্যক। আর বিচারকের সমালোচককে শাস্তি দেওয়া হবে। তবে বিচারক চাইলে ক্ষমাও করে দিতে পারেন।' আল জামিউ লিআহকামিল কুরআন: ৫/২২৬-২২৭
[৫৩] সূরা মায়িদা, ৫:৪৮
[৫৪] সূরা মায়িদা, ৫:৪৯
[৫৫] সূরা মায়িদা, ৫:৪৪
[৫৬] সূরা মায়িদা, ৫:৪৫
[৫৭] সূরা মায়িদা, ৫:৪৭
[৫৮] সূরা নিসা, ৪:৫৮
[৫৯] আস-সিয়াসাতুশ শারইয়্যাহ ফী ইসলাহির রায়ি ওয়ার রাইয়্যাহ : ৯
[৬০] সূরা নাহল, ১৬: ৯০
[৬১] তাফসিরুত তাবারি, ১৪: ১৬২-১৬৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস 📄 হাদিসের আলোকে বিচারব্যবস্থা

📄 হাদিসের আলোকে বিচারব্যবস্থা


এ বিষয়ে অনেক হাদিস আছে। যা কুরআন কারীমের ব্যবহারিক দিক। এসব হলো আল্লাহর কালামের ব্যাখ্যা। মূলত এগুলোর মাধ্যমেই ইসলামি বিচারব্যবস্থা ও ফয়সালা বাস্তবায়িত হয়। বিচারব্যবস্থার বৈধতা পূর্ণতা পায়। ইনসাফ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানানো হয়। তৈরি হয় বিচারব্যবস্থার নীতিমালা আর কার্যপদ্ধতি। যার মাধ্যমে জানা যায় বিচারকের মাঝে কী কী গুণাবলি থাকতে হবে, বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে শর্তাবলি কী, কেমন করে মামলা রুজু করতে হয়, বিচারক কিভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করবেন, মোকদ্দমার মাঝে শরীয়তের বিধানাবলি প্রকাশ কিভাবে করতে হয় এবং তা বাস্তবায়নের পদ্ধতিই বা কী হবে। এখানে বিচারব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে নবি -এর বক্তব্য যেমন উল্লেখ করব, তেমনি তাঁর কর্মমূলক হাদিসও আমরা আলোচনা করব। ফলে আমরা জানতে পারব—তিনি কিভাবে বিচার করতেন, তাঁর কাছে কিভাবে মোকদ্দমা দায়ের করা হতো এবং বিভিন্ন শহরে তিনি কিভাবে বিচারক নিয়োগ দিতেন। নববি যুগে বিভিন্ন দেশ এবং শহরে বিচারব্যবস্থার পদ্ধতি এবং বিচারকের অবস্থা কেমন ছিল—তা জানার পাশাপাশি সাহাবিদের কিছু বিচারের কথাও আমরা জানতে পারব, যা নবি সমর্থন করেছিলেন। তবে হ্যাঁ, সমস্ত হাদিসই যে আমরা উল্লেখ করব, তা কিন্তু নয়। বরং কিছু হাদিস উল্লেখ করব, আর কিছু হাদিসের দিকে আমরা শুধু ইঙ্গিত করব।
আমরা ইবনুল আস সূত্রে বর্ণিত, নবি বলেছেন,
‘কোনো বিচারক গবেষণা করে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হলে তার জন্য রয়েছে দুটি পুরস্কার। পক্ষান্তরে বিচারের ক্ষেত্রে কোনো বিচারক যদি গবেষণায় ভুল করে, তবুও সে একটি পুরস্কার লাভ করবে।’
উম্মু সালামা বলেন, একবার দুজন লোক উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তির মোকদ্দমা নিয়ে নবি -এর কাছে আসলো। সম্পত্তিটি ছিল নিশ্চিতপ্রায়। আবার তাঁদের দুজনের কারও কাছেই নিজেদের স্বপক্ষে কোনো দলিল-প্রমাণ ছিল না। তখন নবি বললেন,
‘আমি একজন মানুষ মাত্র। আমার কাছে তোমরা মোকদ্দমা নিয়ে আসো। হয়তো তোমাদের কেউ অপরজন থেকে প্রমাণ পেশের ব্যাপারে বেশি বাকপটু। তখন আমি যেমন শুনি, তার ভিত্তিতেই ফয়সালা করে থাকি। কাজেই আমি যদি কারও জন্য তার ভাইয়ের হক সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দিই, তাহলে সে যেন তা গ্রহণ না করে। কেননা তার জন্য আমি যে অংশ নির্ধারণ করেছি, তা তো কেবল এক টুকরা আগুন।’
নবি -এর কথা শুনে লোক দুজন কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আমার ভাইয়ের জন্য আমার দাবি ছেড়ে দিচ্ছি। তখন নবিজি বললেন, ‘ঠিক আছে। যাও, এই সম্পত্তি তোমরা নিজেরা ভাগাভাগি করে নাও।’ বর্ণনাকারী বলেছেন, তখন তারা দুজন আপসে ভাগ ভাগ করে নিয়ে অপর ভাই যে অংশ ভোগ করতেন তা বৈধ করে দিলেন।
হাবাবা বিনতু সাহল ছিলেন সাবিত ইবনু কায়স -এর স্ত্রী। নবি -এর কাছে এসে জানালেন, তিনি আর এ স্বামীর অধীনে থাকতে চান না। বিনিময়ে স্বামীর দেওয়া সম্পত্তি তাঁকে ফিরিয়ে দেবেন। নবি তখন সাবিত-কে ডেকে আনলেন। বললেন, সম্পত্তিটা নিয়ে স্ত্রীকে ছেড়ে দাও। তারপর হাবীবা নিজ পরিবারের কাছে ফিরে গেলেন। এটা ছিল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম খোলা তালাক।
ফাতিমা বিনতু কায়স -কে তার স্বামী তিন তালাক দিয়েছিলেন। কিন্তু খোরপোশ দেননি। নবিজিকে বিষয়টি জানানো হলে তিনি ফয়সালা দিয়েছিলেন যে, ফাতিমা কোনো খোরপোশ পাবেন না।
জনৈক মহিলাকে তার স্বামী তালাক দেওয়ার পর সন্তানকে নিয়ে যেতে চাচ্ছিলেন। অগত্যা মহিলাটি নবি -এর কাছে এসে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! সন্তানটি আমার গর্ভজাত। আমার বুকের দুধ সে পান করছে এবং আমার কোলই তার আশ্রয়স্থল। তার পিতা আমাকে তালাক দিয়ে একে আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে চাচ্ছে।' রাসূল তখন বললেন,
' যতদিন পর্যন্ত তুমি পুনরায় বিবাহ না করবে, ততদিন তুমি সন্তানের প্রতি বেশি অধিকার রাখো।'
এ ছাড়া কর্মচারীর ঘটনার ক্ষেত্রে হদ, সাফওয়ান ইবনু উমাইয়ার চাদর চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনায় হদ, নাদরের মেয়ে কর্তৃক থাপ্পড় দিয়ে বাঁদির দাঁত ফেলে দেওয়ার ঘটনায় কিসাস এবং মায়িয আর গামিদি মহিলাকে হদস্বরূপ রজম করার ফয়সালা নবি দিয়েছিলেন। যুবাইর ইবনুল আওয়াম এবং এক আনসারির মাঝে ফয়সালা করার ঘটনা আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি। আবার তিনি যিহারের ফয়সালা করেছেন, দাস-দাসীকে প্রহারের ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন। জিযিয়া ও গনিমতের ব্যাপারেও তাঁর ফয়সালা রয়েছে।
কয়েকজন সাহাবিকে নবি তাঁর সামনেই মোকদ্দমার ফয়সালা করতে বলেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল সাহাবির ফয়সালা এবং ইজতিহাদের যোগ্যতা যাচাই করা। যেমনটা আবদুল্লাহ ইবনু আমর সূত্রে বর্ণিত আছে, একবার নবি -এর কাছে দুজন ব্যক্তি মোকদ্দমা নিয়ে এলে তিনি সামনে থাকা আমর -কে ফয়সালা করার নির্দেশ দিলেন। আমর তখন আরজ করলেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার উপস্থিতিতে আমি কিভাবে ফয়সালা করতে পারি!' নবি তখন ফয়সালার জন্য জোর নির্দেশ দিলে আমর এই কাজের সওয়াব জানতে চাইলেন। উত্তরে নবি বললেন,
'তাদের মাঝে সঠিক ফয়সালা করলে তুমি দশটি নেকি পাবে। আর যদি ইজতিহাদ (গবেষণা) করে ভুল করো, তাহলেও একটি নেকি পাবে।'
নবি যুগের বিচারব্যবস্থার আলোচনায় আমরা এ সংক্রান্ত আরও উদাহরণ দেখতে পাব।
কয়েকজন সাহাবিকে নবি বিভিন্ন শহরে বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। তাদের কেউ কেউ একইসাথে প্রশাসক এবং বিচারক ছিলেন। আবার কেউ কেউ ছিলেন শুধু বিচারক। যেমন আলি ইবনু আবি তালিব বলেছেন, রাসূলুল্লাহ আমাকে ইয়ামানে বিচারক হিসেবে প্রেরণ করছিলেন। আমি বললাম, 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে বিচারক বানিয়ে পাঠাচ্ছেন, অথচ আমি তো উঠতি-যুবক! বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে আমার তেমন অভিজ্ঞতা নেই।' তিনি বললেন, 'অবশ্যই আল্লাহ তাআলা তোমার অন্তরকে সঠিক সিদ্ধান্তের পথ দেখিয়ে দেবেন এবং তোমার কথা সুপ্রতিষ্ঠিত করবেন। বাদী-বিবাদী তোমার সামনে বসলে তুমি যেভাবে এক পক্ষের বক্তব্য শুনবে, সেভাবে অপর পক্ষের বক্তব্য না শুনে কোনো রায় নেবে না। এতে তোমার সামনে মোকদ্দমার স্বরূপ উন্মোচিত হবে।'
আলি বলেন, তারপর আমি বিচারকার্য পরিচালনা করতে থাকি। কখনোই কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে দ্বিধায় পড়তে হয়নি।'
মুআয ইবনু জাবাল -কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় রাসূলুল্লাহ তাকে বললেন, 'তোমার কাছে কোনো মোকদ্দমা আনা হলে তুমি কিসের ভিত্তিতে ফয়সালা করবে?' তিনি বললেন, 'আল্লাহর কিতাব মোতাবেক।' নবি বললেন, 'যদি আল্লাহর কিতাবে এর কোনো ফয়সালা না পাও?' মুআয বললেন, 'তাহলে আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহ অনুসারে করব।' নবি বললেন, 'যদি রাসূলের সুন্নাহয় বা আল্লাহর কিতাবে সেটার ফয়সালা না পাও?' তখন মুআয বললেন, 'তাহলে আমি গবেষণা (ইজতিহাদ) করব; কমতি করব না।' নবি তখন মুআযের বুক চাপড়ে বললেন, 'সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর রাসূলের প্রতিনিধিকে আল্লাহর রাসূলের মনঃপূত কাজ করার তাওফিক দিয়েছেন।'
কম বয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও মাকিল ইবনু ইয়াসার -কে নবি ইয়ামানের বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। মক্কা বিজয়ের পর আত্তাব ইবনু উসাইদ -কে সেখানকার প্রশাসক এবং বিচারক বানিয়েছিলেন। তদ্রূপ আবু মূসা আশআরি ছিলেন ইয়ামানের একাংশের প্রশাসক এবং বিচারক। নববি যুগের বিচারব্যবস্থার আলোচনায় এ সংক্রান্ত আরও উদাহরণ থাকবে।
একবার কিছু লোক একটি কুঁড়েঘরের মালিকানা নিয়ে নবি -এর কাছে মোকদ্দমা দায়ের করল। নবি তাদের মাঝে মীমাংসার জন্য হুযাইফা-কে পাঠালেন। যাদের রশি দিয়ে ঘর বাঁধা ছিল, তিনি তাদের পক্ষে রায় দিলেন। তারপর ফিরে গিয়ে নবি -কে জানালে তিনি বললেন, 'তুমি সঠিক ফয়সালা করেছ এবং বিচার চমৎকার হয়েছে।
এগুলো ছাড়াও ইনসাফভিত্তিক ফয়সালার ব্যাপারে উৎসাহব্যঞ্জক হাদিস যেমন আছে, তেমনি আন্দাজে ফয়সালা করা এবং অন্যায় ফয়সালার ব্যাপারে ভীতিপ্রদর্শনমূলক হাদিসও আছে। সবগুলোর মাধ্যমেই বিচারব্যবস্থার বৈধতা প্রমাণিত হয়।

টিকাঃ
[১৩] সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৭৩৫২; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৭১৬
[১৪] সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৭১৬৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৭১৩
[১৫] আত তারগিব
[৬৫] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২২২৭
[৬৬] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ২২৭৬
[৬৭] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৭৭০
[৬৮] সুনানুন নাসায়ি, হাদিস নং: ৪৮৮১
[৬৯] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৮৯৪
[৭০] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৬৪৩৪ এবং সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৪৫২৮
[৭১] মুসনাদু আহমাদ, হাদিস নং: ১৭৮২৪
[৭২] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৮২
[৭৩] সুনানু আবি দাউদ, হাদিস নং: ৩৫৯২
[৭৪] সুবুলুস সালাম: ৪/১৬১
[৭৫] সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদিস নং: ২৩৪৩

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস 📄 ইজমার ভিত্তিতে

📄 ইজমার ভিত্তিতে


বিচারব্যবস্থার বৈধতার ব্যাপারে মুসলিমগণ একমত। এ ব্যাপারে কেউ দ্বিমত করেননি। সাহাবায়ে কেরাম বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়ে এ ব্যাপারে গুরুত্বারোপও করেছেন। অনেকে তো এই দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি অপরের থেকে তা প্রত্যাশাও করেছেন। ইসলামি রাষ্ট্রের প্রাণকেন্দ্র-সহ যেসব জায়গায় ঈমান এবং ইসলামের আলো ছড়িয়ে পড়েছিল, খুলাফায়ে রাশিদিন এবং তাঁদের পরবর্তী শাসকেরা সেসব স্থানে বিচারক নিয়োগ দিয়েছিলেন।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আবু বকর খলিফা নিযুক্ত হওয়ার পর উমর -কে বিচারের দায়িত্ব প্রদান করে বলেন, 'আপনি লোকদের মাঝে বিচারকার্য সম্পাদন করবেন। কারণ আমি তো একটি কাজ নিয়ে আছি।'
খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পর উমর অনেক সাহাবি এবং তাবিয়িকে বিভিন্ন স্থানে বিচারক নিযুক্ত করেছিলেন। আবুদ দারদা -কে প্রথমে মদীনার বিচারক নিযুক্ত করলেও পরে দামিস্কে পাঠিয়ে দেন। আবু মূসা আশআরি -কে বসরার বিচারক এবং শুরাইহ ইবনুল হারিস আল-কিন্দি -কে কুফার বিচারক নিযুক্ত করেন। শুরাইহ সেখানে দীর্ঘ ষাট বছর যাবৎ বিচারকের দায়িত্ব পালন করেন। বিচারকার্য পরিচালনা এবং মোকদ্দমা নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে আলি ছিলেন বিশেষভাবে পারদর্শী। খুলাফায়ে রাশিদিনের যুগের পর উমাইয়া যুগ, আব্বাসি যুগ-সহ ইসলামি খিলাফতের শেষ অবধি এভাবেই নানান স্থানে বিচারক নিযুক্তির প্রচলন ছিল। এ ব্যাপারে আমরা অচিরেই আলোচনা করব।
আলিমদের অনেকেই বিচারব্যবস্থার বৈধতা-সংক্রান্ত বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। উমর-এর একটি পত্রে তিনি লিখেছিলেন, 'বিচারব্যবস্থা একটি শক্তিশালী আবশ্যক বিধান এবং অনুসরণীয় রীতি।' অর্থাৎ এই বিধানটি রহিত হয়নি। আর কেউ এর বিরোধিতাও করেননি।
ইবনু কুদামা বলেছেন, 'বিচারক নিয়োগ দেওয়া এবং লোকদের মাঝে ফয়সালা করার ব্যাপারে মুসলিমদের মাঝে ইজমা রয়েছে। খতিব শারবীনি বলেছেন, 'বিচারব্যবস্থা কার্যকরের ব্যাপারে পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলেই একমত।'

টিকাঃ
[৭৬] আল মুগনি: ১০/৩২
[৭৭] মুগনিল মুহতাজ: ৪/৩৭২

📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস 📄 যুক্তির নিরিখে

📄 যুক্তির নিরিখে


সমাজবদ্ধতা মানুষের স্বভাব। মানুষের জীবন সমাজকেন্দ্রিক। স্বাভাবিকভাবেই একটি বিচারব্যবস্থার প্রয়োজন, যার মাধ্যমে মানুষ নিজেদের মধ্যকার বিবাদ নিষ্পত্তি করবে। কারণ মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই স্বার্থপর, বিজয়লিঙ্গু এবং লোভী। তীব্র লালসার কারণে একে অপরের ওপর আধিপত্য বিস্তার করতে চায়। এ কারণেই সে অন্যের ওপর হামলা করে, পরস্পরে ঝগড়া হয় এবং একজন অন্যজনের ওপর অত্যাচার করে। শরীয়ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব-সংক্রান্ত আলোচনায় এ বিষয়ে কথা হয়েছে। সুতরাং এগুলোর মাধ্যমে যৌক্তিকভাবে একটি বিচারব্যবস্থার অস্তিত্ব অত্যাবশ্যক প্রমাণিত হয়। যা মানুষের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য করে। এটাই হচ্ছে যুক্তির দাবি।
বাস্তবতা হচ্ছে সবচেয়ে বড় প্রমাণ এবং ইতিহাস হলো সর্বশ্রেষ্ঠ সাক্ষী। সুতরাং সুবিচার প্রতিষ্ঠায় এবং শরীয়তের বিধিবিধান বাস্তবায়নে রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনস্বীকার্য। প্রয়োজন এমন বিচারক, যিনি নিপীড়িত মজলুমের সাথে ইনসাফ করবেন। অন্যথায় মানুষের অধিকার খর্ব হবে। এ ব্যাপারে ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল বলেছেন, 'মানুষের অধিকার রক্ষা করার জন্য একজন (ন্যায়পরায়ণ) বিচারকের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।'

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية