📘 ইসলামি বিচারব্যবস্থার ইতিহাস > 📄 বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব

📄 বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব


বিচারব্যবস্থা শরীয়তের একটি অংশ মাত্র। শরীয়তের সাধারণ বিশেষণ, বৈশিষ্ট্য এবং বিশেষত্ব এই বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়ে থাকে। বিচারব্যবস্থা হচ্ছে ইসলামি ফিকহের একটি অধ্যায়, যা সব মাযহাবের ফকিহগণ এবং উলামায়ে কেরাম বিভিন্ন ফিকহের কিতাবে উল্লেখ করে থাকেন।
বিচারব্যবস্থার লক্ষ্য হলো সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়ের শাসন বাস্তবায়ন করা। মানুষের জান, মাল, সম্মান এবং অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সাধারণ প্রতিরক্ষা নীতির প্রচলন ঘটানো। শরীয়তের বিধিবিধান এবং শিক্ষা প্রয়োগের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার দণ্ডবিধি কায়েম করা। বিশুদ্ধ চরিত্র সংরক্ষণ করার মাধ্যমে সব ধরনের অন্যায়, অনাচার এবং সীমালঙ্ঘনের পথ রুদ্ধ করে দেওয়া।
ইবনুল কাইয়িম বলেছেন, 'আল্লাহ তাআলা কর্তৃক নবি-রাসূল প্রেরণ এবং কিতাব নাযিল করার উদ্দেশ্য হলো, মানুষের মাঝে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। এই ইনসাফের মাধ্যমেই আসমান ও জমিন টিকে আছে। ইনসাফের লক্ষণগুলো যেখানে যে-পদ্ধতিতে প্রকাশ পাবে, সেখানেই আল্লাহর দ্বীন এবং শরীয়ত প্রতিষ্ঠিত হবে।'
অতীতের বিভিন্ন শরীয়ত এবং দ্বীনের ইতিহাস দেখলে আমরা নিশ্চিত হয়ে যাব, নবি-রাসূলদেরকে আল্লাহ তাআলা বিধিবিধান দিয়ে পাঠিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, এর মাধ্যমে মানুষের জীবন আলোকিত করা। মানুষ যাতে নিজের যথাযথ প্রাপ্য বুঝে নেয় এবং নিজের করণীয় বুঝতে পেরে তা পালন করে।
প্রতিটি মানুষকে নিজের হক বুঝে নেওয়ার পাশাপাশি অন্যের হক সম্পর্কে সচেতন করাই শরীয়তের লক্ষ্য। এ লক্ষ্যেই শরীয়ত মানুষের মাঝে দণ্ডবিধির প্রচলন করেছে। মানুষকে জুলুম থেকে বিরত রাখার জন্য শরীয়ত প্রণয়ন করেছে আয়-ব্যয়ের নীতিমালা। মানুষকে বাধ্য করেছে তা মানতে। তাই মুসলিম অপর মুসলিমের হক নষ্ট করতে পারে না। অপরের হকের ক্ষেত্রে সীমালঙ্ঘন করা তার জন্য বৈধ নয়। কোনো মুসলিম স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না। শরীয়তের মাধ্যমেই প্রতিটি মানুষ নিজের করণীয় দিক জানতে পারে। এর মাধ্যমেই জীবন হয়ে ওঠে সুখময়, নিশ্চিন্ত এবং নিরাপত্তায় পরিপূর্ণ।
কিন্তু মন্দের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া মানুষের স্বভাব। সত্য থেকে সে সরে যায়। সীমালঙ্ঘন করা তার রীতি। অন্যের ওপর জুলুম করা তার অভ্যাস। মানুষের হাতে থাকা জিনিসের প্রতি তার লোভ চিরাচরিত। কর্তব্য পালনে সে পশ্চাৎপদ। নিজের হকের ক্ষেত্রে সে সীমালঙ্ঘন করেই চলে। এ কারণেই তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে বিচারব্যবস্থা আবশ্যিকভাবে প্রয়োজন।
খতিব শারবীনি বলেছেন, 'সৃষ্টিগতভাবেই মানুষ জুলুম করতে এবং অপরের হক নষ্ট করতে অভ্যস্ত। অল্পসংখ্যক মানুষই পারে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে।'
এ কারণেই আইনের প্রবর্তন ঘটেছে। প্রণীত হয়েছে বিধিবিধান। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে বিচারব্যবস্থা। ঐশী আইন হোক বা জাগতিক, উভয়টিই দুভাগে বিভক্ত। কিছু আইনের প্রয়োগ থাকে না। মানুষের অধিকারের সুবিধার্থে এসব আইন কেবল কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকে। আবার কিছু আইন এমন, যা মানুষের অধিকার, সীমারেখা এবং নিয়মনীতির সুরক্ষায় প্রণয়ন করা হয়। এ-ধরনের আইন কার্যকরী।
এই দুটি প্রকার একটি অপরটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটি না থাকলে অপরটিও পাওয়া যায় না। অনুসন্ধান এবং গবেষণার মাধ্যমে জানা গেছে, এই সম্পর্কটি সামগ্রিকভাবে সত্য এবং তার সহায়কের সম্পর্ক। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বিধান প্রতিষ্ঠার কাজের সুবিধার্থে এই সহায়ক প্রাপ্ত হয়। রাষ্ট্রপ্রধান এবং বিচারক হওয়ার কারণে নবি-ও এই সহায়ক পেয়েছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
إِنَّا أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَبَ بِالْحَقِّ لِتَحْكُمَ بَيْنَ النَّاسِ بِمَا أَرَبكَ اللَّهُ আমি তো আপনার প্রতি সত্য-সহ কিতাব অবতীর্ণ করেছি, যাতে আল্লাহ আপনাকে যা জানিয়েছেন, সেই অনুসারে মানুষের মধ্যে বিচার ফয়সালা করেন।
وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, সে অনুযায়ী আপনি ফয়সালা করুন; তাদের খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না।
নবি-এর পর এই কর্তৃত্ব তাঁর খলিফা এবং অন্যদের কাছে স্থানান্তরিত হয়েছে। আর বিজ্ঞজনের দূরদর্শিতা ও প্রাজ্ঞজনের বুদ্ধিমত্তার সম্মিলনে সৃষ্ট বিচার-বিষয়ক সূক্ষ্ম নীতির মাধ্যমে তার প্রচার-প্রসার ঘটেছে। বিচারক এটার মাধ্যমেই শাসকের প্রতিনিধিরূপে শক্তিমত্তা প্রকাশ করেন এবং প্রভাব বিস্তার করে থাকেন। মোটকথা, বিচারব্যবস্থা হলো রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সমাজ গঠনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। জনগণের জান, মাল এবং অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সমাজের শৃঙ্খলা ও বিধিবিধান রক্ষার দায়িত্ব বিচারব্যবস্থার ওপর। এর ফলেই সমাজে স্থিরতা বিরাজ করে। প্রতিষ্ঠিত হয় শান্তি এবং ইনসাফ।
জাতির নেতৃত্ব এবং স্বকীয়তার প্রতীক হলো বিচারব্যবস্থা। বিচারব্যবস্থা ছাড়া জাতির মাঝে কোনো ধরনের অধিকার বা ন্যায়বিচার নেই। প্রত্যেক জাতির বিচারব্যবস্থার ইতিহাস তার জন্য সম্মানজনক এবং গৌরবময়। এর মাধ্যমে তাদের বুদ্ধিমত্তা এবং চিন্তার ক্রমবিকাশ ঘটে। বিচারব্যবস্থা এবং ইনসাফের মাধ্যমে রাষ্ট্র এবং সরকারের সঠিক চিত্র ফুটে ওঠে। এর মাধ্যমে বুঝে আসে—সরকারের প্রতি জনগণ কতটা আস্থাশীল এবং জনগণের প্রতি সরকার কতটা সচেতন। বিচারব্যবস্থা এবং ইনসাফ হচ্ছে দায়িত্বশীল, নেতৃবৃন্দ এবং শাসকগোষ্ঠীকে পরিমাপ করার সূক্ষ্ম মানদণ্ড।
ইনসাফের কারণেই আসমান ও জমিন টিকে আছে। এটাই সমৃদ্ধির ভিত। বিচারব্যবস্থা হচ্ছে ইনসাফের সর্বোত্তম প্রকাশস্থল। এরিস্টটলের ভাষায় যাকে ‘বিশ্বের ভর’ বলে। সেটাই রাজত্বের ভিত্তি এবং নিরাপত্তার শক্তিশালী স্তম্ভ। এর মাধ্যমেই হয় আইনের প্রচলন, সমাজের উন্নতি ঘটে এবং জাতির অগ্রগতি হয়।
সাআলাবি বলেছেন, ‘সরকারের সিদ্ধান্তে জনগণ সংশোধিত হয় আর সুবিচারের মাধ্যমে রাজত্ব হয় সুসংহত। রাজ্যে ইনসাফ থাকলে সহায়কের অভাব থাকে না। যে শাসক ন্যায়ের প্রতি আকৃষ্ট, জনগণ তার প্রতি মনোযোগী। কাজেই, শাসনক্ষমতা হাতে পেলে ন্যায়বিচার করা উচিত। কারণ জনগণকে ধরে রাখার উপায় হচ্ছে ন্যায়পরায়ণতা। শাসক অন্যায় করতে থাকলে রাজ্যের সবাই দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ে। পক্ষান্তরে শাসক ন্যায়পরায়ণ হলে কেউ জুলুমের দুঃসাহস দেখাতে পারে না।'
সাআলাবি আরও বলেন, 'জুলুম করলে নিয়ামত ছিনিয়ে নেওয়া হয়। অন্যায় হলো শাস্তির কারণ। অত্যাচারীর পতন খুব নিকটে। মজলুমের দুআ অব্যর্থ। যে শাসকের সীমালঙ্ঘন যত বেশি, তার ক্ষমতা তত দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যায়। জালিমের কাছে থাকা লোকেরাই তার প্রতি বিরাগভাজন হয়ে থাকে। যার জুলুম আর সীমালঙ্ঘন বাড়ে, তার পতন ঘনিয়ে আসে। মজলুমের বিপক্ষে গিয়ে জালিমের সমর্থনকারী ব্যক্তি জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট।'
ইনসাফ বাস্তবায়ন করার জন্যই যুগে যুগে নবি-রাসূল প্রেরিত হয়েছেন এবং তাদের প্রতি কিতাব অবতীর্ণ করা হয়েছে। ইনসাফের প্রতি ইসলাম বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَتِ وَاَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتٰبَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ
অবশ্যই আমার রাসূলদের আমি সুস্পষ্ট নিদর্শন দিয়ে পাঠিয়েছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব আর ন্যায়নীতি, যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করে।
وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ إِنَّ اللَّهَ نِعِمَّا يَعِظُكُمْ بِه আর তোমরা যখন মানুষের মাঝে কোনো বিচার করবে, তখন ন্যায়ভিত্তিক ফয়সালা করবে। আল্লাহ তোমাদের যে উপদেশ দান করেন, তা কতই-না উত্তম।
মুসলিমরা বিচারব্যবস্থা এবং ন্যায়বিচারের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরেছিল। এ কারণেই আবু বকর বলেন, 'আপনাদের মধ্যে থাকা দুর্বল ব্যক্তিটি আমার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী, যতক্ষণ না তার অধিকার আমি ফিরিয়ে দিতে পারি। আবার আপনাদের মধ্যকার শক্তিশালী ব্যক্তিটি আমার কাছে সবচেয়ে দুর্বল, যতক্ষণ না আল্লাহর ইচ্ছায় তার থেকে অপরের অধিকার আদায় করতে পারি।'
উমাইর ইবনু সাদ ছিলেন উমর কর্তৃক নিযুক্ত হিমসের প্রশাসক। নিয়োগের পরে প্রথম ভাষণে তিনি বলেছিলেন, 'মনে রাখবেন, ইসলাম হচ্ছে একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ এবং একটি মজবুত দরজা। ইসলামের প্রাচীর হলো ইনসাফ এবং তার দরজা হলো ন্যায়পরায়ণতা। দেয়াল ভেঙে ফেলা আর দরজা ধসিয়ে দেওয়ার অর্থ ইসলামকে পরাজিত করা। ইসলাম ততক্ষণ নিরাপদ থাকবে, যতক্ষণ তার কর্তৃত্ব থাকবে সুসংহত। কর্তৃত্ব সুসংহত থাকার অর্থ তরবারির মাধ্যমে হত্যা বা চাবুক দিয়ে আঘাত করা নয়। বরং কর্তৃত্ব সুসংহত থাকা মানে ন্যায়বিচার করা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা।
এ কারনেই উলামায়ে কেরাম, ফুকাহা এবং শীর্ষস্থানীয় আলিমগণ বিচারকার্যের জ্ঞানকে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ, সম্মানিত এবং শ্রেষ্ঠ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, এই জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তি মানুষের জান-মাল এবং অধিকার রক্ষা করে থাকেন। জালিম আর সীমালঙ্ঘনকারীকে নিবৃত্ত করার পাশাপাশি হালাল-হারাম বাতলে দেন, যা ছিল স্বয়ং নবি-রাসূলগণের কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন,
يَـٰدَاوُۥدُ إِنَّا جَعَلْنَـٰكَ خَلِيفَةًۭ فِى ٱلْأَرْضِ فَٱحْكُم بَيْنَ ٱلنَّاسِ بِٱلْحَقِّ وَلَا تَتَّبِعِ ٱلْهَوَىٰ فَيُضِلَّكَ عَن سَبِيلِ ٱللَّهِ
হে দাউদ! আপনাকে আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি বানিয়েছি, অতএব আপনি মানুষের মাঝে সুবিচার করুন, তবে খেয়াল-খুশির অনুসরণ করবেন না। কেননা তা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে।
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِنْ حَكَمْتَ فَٱحْكُم بَيْنَهُم بِٱلْقِسْطِ ۚ إِنَّ ٱللَّهَ يُحِبُّ ٱلْمُقْسِطِينَ
আর যদি বিচার করো, তবে তাদের মাঝে ন্যায়বিচার করবে।
নবি বলেছেন, 'নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা এমন জাতিকে (গুনাহ থেকে) পবিত্র করেন না, যারা তাদের মধ্যকার দুর্বলদের অধিকার দেয় না।
অন্য বর্ণনামতে, নবি বলেছেন, 'আল্লাহ এমন জাতিকে কিভাবে (গুনাহ হতে) পবিত্র করবেন, যাদের সবলদের থেকে দুর্বলদের প্রাপ্য আদায় করে দেওয়া হয় না?
ইনসাফের সাথে বিচারকার্য পরিচালনা করতে পারাকে ঈর্ষণীয় নিয়ামত আখ্যা দিয়ে নবি বলেছেন, 'দুজন ব্যক্তিকেই কেবল ঈর্ষা করা যায়। প্রথমত সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা সম্পদ দিয়েছেন। তারপর সেটা বৈধ পন্থায় অকাতরে ব্যয় করার ক্ষমতা দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত সে ব্যক্তি, যাকে আল্লাহ তাআলা প্রজ্ঞা দান করেছেন। যার মাধ্যমে সে বিচার-ফয়সালা করে এবং অন্যকে তা শিক্ষা দেয়। এ সম্পর্কিত আরও অনেক হাদিস রয়েছে।
জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি মানুষ বিচারব্যবস্থার সাথেই থাকে। আম্বিয়ায়ে কেরামের অন্যতম মিশন এবং কাজ ছিল এই বিচারব্যবস্থা। নেককার আর প্রসিদ্ধ ব্যক্তিরা বিভিন্ন সময় নেতৃত্ব, দায়িত্ব এবং কর্তব্য পালন করতে গিয়ে অনেক সময় এই পদ অলংকরণ করেছেন। ইসলামের আলোকে বিচারব্যবস্থার বৈধতা নিয়ে আলোচনা করার সময় আমরা এ সংক্রান্ত অনেক আয়াত এবং হাদিস দেখব ইনশা-আল্লাহ।
অর্জিত হওয়া এবং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়া মহৎ উদ্দেশ্যের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব বুঝে আসে। বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে ইসলামে যে মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের প্রয়াস চালানো হয় সেটা হচ্ছে ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, সকলের অধিকার সংরক্ষণ, নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা, জান-মালের সুরক্ষা, জুলুম ও সীমালঙ্ঘনের প্রতিরোধ, দণ্ডবিধি কায়েম, অপরাধীকে পাকড়াও এবং তাকে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করা। যাতে অপরাধী নিজেও নিষিদ্ধ অন্যায় কাজে লিপ্ত না হয়, আবার অন্য কেউ যাতে অমন কাজ করার সাহসও না দেখায়। কারণ বুদ্ধিমান লোক অপরের অবস্থা দেখে শিক্ষাগ্রহণ করে থাকে। শাস্তি এমন হওয়া বাঞ্ছনীয়, যা প্রত্যক্ষ করে কেউ অপরাধে লিপ্ত হওয়ার আগে দশ বার ভাবতে বাধ্য হয়। এভাবেই বিচারব্যবস্থা অপরের অধিকার সংরক্ষণ করে, প্রতিহত করে সীমালঙ্ঘন, নিরাপত্তা নিশ্চিত করে এবং ছিনিয়ে নেওয়া অধিকার তার হকদারের কাছে ফিরিয়ে দেয় কিংবা যে-কোনোভাবে তার বিনিময় প্রদান করে থাকে। সেইসাথে সাধারণ নিয়ম, প্রচলিত শিষ্টাচার এবং উম্মতের মূল্যবোধ ও আদর্শ ঠিক রাখে। আর আল্লাহর আইন, দ্বীন এবং বিধানাবলির বাস্তবায়ন তো বিচারব্যবস্থার চূড়ান্ত লক্ষ্য।
ছোট-বড়, গরিব-ধনী সমস্ত মানুষই বিচারব্যবস্থার আওতাধীন। ক্ষমতাধর কিংবা সাধারণ মানুষ, নারী কিংবা পুরুষ কেউই এর গণ্ডির বাইরে নয়। ধর্মীয় বা জাতিগত কিংবা গোত্রীয় ভেদাভেদ এখানে হয় না। শত্রু-মিত্র এবং কাছে- দূরের সবাই এখানে বরাবর। কারণ বিচারব্যবস্থা হচ্ছে আল্লাহ তাআলার নির্দেশনা বাস্তবায়ন। তিনি বলেন,
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ بِالْقِسْطِ شُهَدَاءَ لِلَّهِ وَلَوْ عَلَى انْفُسِكُمْ أَوِ الْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর সাক্ষীস্বরূপ ন্যায়বিচারে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত থাকবে, যদিও সেটা তোমাদের নিজেদের অথবা বাবা-মা এবং আত্মীয়স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُونُوا قَوْمِينَ لِلَّهِ شُهَدَاءَ بِالْقِسْطِ وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَانُ قَوْمٍ عَلَى أَلَّا تَعْدِلُوا اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্য প্রদানে অবিচল থাকবে; কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়বিচার পরিত্যাগে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার করো, এটাই তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী, আর আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা যা করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে সম্যক অবগত।
وَإِنْ حَكَمْتَ فَاحْكُمْ بَيْنَهُمْ بِالْقِسْطِ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ
আর যদি বিচার করো, তবে তাদের মাঝে ন্যায়বিচার করবে।
وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى
তোমরা যখন কথা বলবে, তখন ন্যায্য কথা বলবে, যদিও তোমাদের আত্মীয়দের সাথে হয়।
قُلْ أَمَرَرَبِّي بِالْقِسْطِ আপনি বলুন, আমার প্রতিপালক আমাকে ইনসাফের আদেশ দিয়েছেন।

টিকাঃ
[২৭] আত-তুরুকুল হুকমিয়্যাহ: ১৪। এই কথাগুলো ইবনুল কাইয়িম তাঁর অনেক কিতাবেই উল্লেখ করেছেন। যেমন বাদায়িউল ফাওয়াইদ: ৩/১৫৩, আ'লামুল মুওয়াক্বিয়ীন: ৪/৩৭৩।
[২৮] মুগনিল মুহতাজ: ৪/২৭২
[২৯] সূরা নিসা, ৪: ১০৫
[৩০] সূরা মায়িদা, ৫:৪৯
[৩১] সূরা হাদীদ, ৫৭: ২৫
[৩২] সূরা নিসা, ৪: ৫৮
[১০৩] তবাকাতু ইবনি সাদ: ৪/৩৭৫
[১০৪] তাবসিরাতুল হুক্কাম: ১/২-৩
[১০৫] সূরা সোয়াদ, ৩৮:২৬
[১০৬] সূরা মায়িদা, ৫:৪২
[১০৭] আল মুজামুল কাবীর লিত তবারানি, হাদিস নং: ১০৫৩৪
[৩৮] সুনানু ইবনি মাজাহ, হাদিস নং: ৪০১০
[৩৯] সহিহুল বুখারি, হাদিস নং: ৭৩, ১৪০৯, ৭১৪১, ৭৩, ৭৩১৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ৮১৬
[৪০] সুরা নিসা, ৪: ১৩৫
[৪১] সূরা মায়িদা, ৫: ৮
[৪২] সূরা মায়িদা, ৫: ৪২
[৪৩] সরা আনআম, ৬:১৫২
[৪৪] সূরা আরাফ, ৭:২৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00