📄 আমাদের শিক্ষাবিদ ও সুসভ্য ব্যক্তিবর্গ
পশ্চিমা গবেষক ও প্রাচ্যবিদেরা যেসব ইসলামি উৎস গ্রন্থগুলোর সহায়তায় অধ্যয়ন করেছেন— ‘আলোচিত শিক্ষাবিদ’, ‘সুসভ্য ব্যক্তিদের’ সেগুলো মুরাজায়াত (ইসলামের মৌলিক বাণী কুরআন, হাদিস ও ফিক্হ প্রভৃতি)। যেগুলোর সহায়তায় পূর্ববর্তী প্রাচ্যীয় পণ্ডিতগণ গবেষণাপত্র-গ্রন্থ তৈরি করেছেন) করার সুযোগ তাদের হয়ে ওঠে না।
উল্লিখিত সময়ে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের ইসলামি মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ থেকে বিমুখ হবার কিছু কারণ নিম্নরূপ—
১. হয়তোবা আমাদের উৎস গ্রন্থগুলো মুরাজায়াত করা দুঃসাধ্য হবার দরুন।
২. অথবা দ্রুত গবেষণার ফলাফল বের করতে আগ্রহী হবার কারণে।
৩. অথবা আমাদের দীন এবং ইলমি গবেষণার বিরোধিতা করার প্রবৃত্তিগত তাড়না পূরণের জন্য।
৪. আর পশ্চিমা গবেষকদের বিপরীতে অনির্ভরশীলতা দুর্বলতা ও অসম্পূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের উপর এক নির্যাতনের স্টিমরোলার ও দখলদারিত্ব চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাচ্যবিদদেরকে সম্মান করা, তাদেরকে বড় ভাবা, তাদের প্রতি সর্বদা সুধারণা রাখা প্রভৃতি এরই ধারাবাহিকতার নামান্তর।
যখন আরব ও মুসলিম দেশগুলোতে রাজনৈতিক চেতনার আন্দোলনের সূচনা হলো, পশ্চিমাদের কর্তৃত্ব হতে বের হয়ে নিজস্ব রাজনৈতিক স্বকীয়তার প্রারম্ভ হলো, চিন্তা ও ভাবধারাগত স্বকীয়তার বীজ বপন হলো, তখন আমাদের কাছে গচ্ছিত পুরনো পাণ্ডুলিপি, আকিদা-বিশ্বাস ও আইন কানুন প্রভৃতির পরিচয় লাভের জন্য প্রাচ্যবিদদের উপর নির্ভর করা লজ্জা ও হতাশাজনক অবস্থান ছাড়া আর কিছুই না। দীনি ও গাইরে দীনি বিষয়- এই চেতনাবোধটি মধ্যপন্থী শিক্ষাবিদ ও সু-সভ্যদের মাঝে পৌঁছে গেছে। ফলে প্রকৃত বাস্তবতাকে আমরা উন্মোচিত করতে পারব। প্রাচ্যবিদগণের গবেষণা ও আলোচনার পিছনে তাদের দীনি ও ঔপনিবেশিক লক্ষ-উদ্দেশ্যের বাস্তবতা খুঁজে পাওয়া যাবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমরা এই মনোভাব নিয়ে অগ্রসর হতে থাকব ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের শক্তি-সামর্থ্য ও স্বকীয়তা পূর্ণতায় পৌছাবে না। কেননা, আল্লাহর নীতি সকল বস্তুর ক্ষেত্রে সমভাবে প্রযোজ্য।
📄 আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম
কিন্তু আমরা তো এই পথে চলছি। প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের ধোঁকা ও বিভ্রান্তি থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে সক্ষম হচ্ছি; কিন্তু এমন একদিন আসবে, যেদিন আমাদের সন্তান, নাতি, দৌহিত্ররা প্রাচ্যীয় ষড়যন্ত্রের মাঝে পুরোপুরি ফেঁসে যাবে। তখন তারা বলবে, কীভাবে আমরা ঐসকল প্রাচ্যবিদদের চক্রান্তে ধোঁকার জালে আবদ্ধ হলাম? এমন এক সময় আসছে, যেদিন আমরাই পশ্চিমাদের পাণ্ডুলিপি ও দীন, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক তাদের পর্যালোচনার উপর ঝুঁকে পড়ব। সেদিন অচিরেই আসছে, যেদিন আমাদের সন্তানরা পশ্চিমাদের তৈরি করা পর্যালোচনার নীতিমালা অনুসরণ করবে। আকিদা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে তাদের পর্যালোচনাই ধর্তব্য ও মাপকাঠি হবে। তখন তা হবে অত্যন্ত সাংঘর্ষিক ও ভয়ংকর। আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও আকিদার সাথে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতগণ বর্তমানে যা মিশ্রণ করেছে, ভবিষ্যতে তা আরো বেশি আপত্তিকর ও বিপদজনক হবে।
ভেবে দেখ, যদি মুসলিমগণ কুরআন-হাদিসের ক্ষেত্রে প্রাচ্যবিদগণের ব্যবহার করা সমীক্ষা ও সমালোচনাকে মাপকাঠি হিসাবে ব্যবহার করে, তবে তাদের কিতাব ও উত্তরাধিকারী সূত্রে প্রাপ্ত জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে কোন্ ধরনের শিক্ষা বাকি থাকতে পারে? প্রমাণ হিসাবেও বা কী অবশিষ্ট থাকল?
ভেবে দেখ, ভবিষ্যতে মুসলিমগণ যদি প্রাচ্যবিদগণের তথাকথিত গবেষণামূলক পর্যালোচনাকে আমাদের ইতিহাস, সভ্যতার ঐতিহাসিক তাৎপর্য, ইমামদের পর্যালোচনা, পবিত্র বস্তুসমূহ, বিজয় সেনানীগণ, নেতা, নেতৃত্বদানকারীগণ ও আলেমগণ প্রমুখের ব্যাপারে মাপকাঠি বানায়, তা হলে আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ও মহান ব্যক্তিদের সম্পর্কে বর্তমানের চেয়ে ভবিষ্যত প্রজন্মের আরো বেশি খারাপ ধারণা, বীতশ্রদ্ধাপূর্ণ ও সন্দেহ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে। তখন মুসলিম সভ্যতা পুরনো ঝলমলে কাপড়ে প্রকাশ পাবে (মানুষ তার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে)।
সাবধান। এ সভ্যতার এক শ্রেণির আলেম, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সাহিত্যিক উজ্জ্বল ও দেদীপ্যমান আকৃতিতে প্রকাশ পাবে, যাদের মাঝে থাকবে না মান-মর্যাদা, উত্তম আদর্শ, মানবিকতা ও আধ্যাত্মিকতা। আমি কামনা করছি না যে, আমাদের একটি অংশ এ সভ্যতা ও তার পুরোহিত-পাদ্রীদের সম্পর্কে হুবহু এই পদ্ধতিতে গবেষণার জন্য অবসর সময় বের করবে, যেভাবে প্রাচ্যবিদগণ করে থাকেন। যেমন: অসম্পূর্ণ বর্ণনা অনুসন্ধান, কোনো একটি বিষয়কে তার বাস্তবতার বিপরীত বোঝা বুঝানো, ভালকে মন্দ দ্বারা বদলানো ও প্রত্যেক মঙ্গলজনক বিষয়ে সন্দেহ সৃষ্টি করা প্রভৃতি। এগুলো সবই পাশ্চাত্য পাণ্ডিতদের থেকে অভিজ্ঞতালব্ধ বিষয়। বিষয়টা যদি এমনই হয়, তবে এই সভ্যতা ও তার খ্যাতিমান ব্যক্তিদের এমন এক কুৎসিত অবয়ব প্রকাশ পাবে, যা সকলের পূর্বে প্রাচ্যবিদগণই এর প্রতিবাদ করবে।
তুমি কি আমাদের মাঝে এরকম কাউকে পাবে, যে এই কাজের জন্য প্রস্তুত হবে। প্রাচ্যবিদদের তৈরি করা নিজস্ব নীতিমালাতে তাদের সভ্যতা, আকিদা-বিশ্বাস প্রভৃতি বিষয় নিয়ে তাদের একটি বাস্তব রূপ তুলে ধরবে। এটা প্রাচ্যবিদগণ নিজেরাই শুধু পাঠ করবেন। (যদি প্রাচ্যবিদগণ তাদের তৈরি করা মূলনীতির আলোকে বের করা গবেষণা পত্র-গ্রন্থ গ্রহণে আগ্রহী না হন) তাহলে তারা আমাদের ইতিহাস ও ধর্মীয় চেতনার ব্যাপারে বাস্তবতার পরিচয় লাভের জন্য যে খিদমতের পন্থা অবলম্বন করেছিল তা কীভাবে গ্রহণীয় হতে পারে? প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের ধিক্কার জানাই, হতে পারে এরপর থেকে গবেষণার নামে ক্রমাগত বিভ্রান্তি ও বিকৃতি সাধন ও ধ্বংসাত্মক কর্মতৎপরতা হতে তারা বিরত থাকবেন।
📄 এখনই সময় স্বকীয়তা ও উন্নত চেতনা তৈরীর
আমি স্বীকার করি, আমরা এমন এক যুগ পার করেছি, যখন আমরা আমাদের ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিচয় লাভ করার জন্য পশ্চিমাদের জ্ঞানকোষ ও তাদের অধ্যাপনার প্রতি নির্ভরশীল হলাম; অথচ আমাদের পূর্বপুরুষদের সংকলিত ও লিপিবদ্ধ গ্রন্থাবলি ছাড়া তাদের মৌলিক কোনো উৎসগ্রন্থ নেই। ইতিপূর্বে আমরা এ ব্যাপারে অজ্ঞ ছিলাম। আর ধর্মীয় উৎসগ্রন্থের ব্যাপারে লজ্জাজনক অন্ধত্ব হতে আমাদের ললাটকে সু-উচ্চ করার এখনই সময়।
ধর্মীয় গ্রন্থাবলি বোঝা ও অধুনাবন করা, আরবিভাষা শিক্ষা, বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস উপলব্ধি ও ধর্মীয় আলেমদের বিশ্বাসযোগ্যতার ব্যাপারে পশ্চিমাদের জ্ঞান-বুঝের উপর নির্ভরশীল হওয়া অপমানজনক। বিদ্বেষী প্রাচ্যবিদ ও পশ্চিমা গবেষকরা আশা করছেন আমরা যেন আমাদের দীন- ধর্ম, আলেম-ওলামাদের ব্যাপারে সন্দেহ-সংশয় ও কুধারণার মধ্যে থাকি। আর এখনই উপযুক্ত সময় এসেছে আমরা সকল ধুলা-বালি ঝেড়ে ফেলে কাজ করতে থাকব এবং আমাদের গচ্ছিত গবেষণালব্ধ ধনভাণ্ডারগুলোর প্রচার-প্রসার করব। এর দ্বারা একটি স্বকীয় ব্যক্তিত্ব, উন্নত চেতনা ও মন- মানসিকতা আমাদের মাঝে স্থান পাবে।
এরপরও যে ব্যক্তি আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের চিন্তা-চেতনা, ধ্যান-ধারণা ও মতামতকে বিশ্বাস করে, সে যেন অতিরিক্ত السنة ومكانتها في التشريع الاسلامي ficiale gas is abo
ও এ ধরনের আরো গ্রন্থ অধ্যয়ন করে নেয়। উক্ত গ্রন্থে আমি প্রাচ্যবিদগণ ও তাদের সাথে আমার ও তাদের বিভিন্ন মতামত নিয়ে পর্যালোচনা করেছি, যা দ্বারা ঐসকল প্রাচ্যবিদের ষড়যন্ত্রের নীলনকশা প্রকাশ ও প্রকৃত গুপ্তরহস্য উন্মেচিত হয়েছে।
আমরা বিকৃতি সাধনকারী ও বিপথগামীতার পথপ্রদর্শকদের ব্যাপারে কঠোরতা অবলম্বন করব; তবে যেসব প্রাচ্যীয় পণ্ডিতগণ আমাদের পুরাতন মূল্যবান গ্রন্থগুলো প্রকাশের ব্যাপারে ন্যায় ও ইনসাফের ভূমিকা পালন করেছেন এবং সত্যানুসন্ধানের গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন তাদেরকে আমরা অবমূল্যায়ন করছি না। কারণ, ইসলামি জ্ঞান এমন নয় যে, তা থেকে এক শ্রেণির লোক এক চেটিয়া সুবিধা ভোগ করবে আর অন্য শ্রেণি বঞ্চিত হবে।
ইসলাম আল্লাহর মনোনীত সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটা সম্ভব নয় যে, দীনের চিন্তা-চেতনা ও বুঝ দ্বারা শুধু নির্দিষ্ট সম্প্রদায় লাভবান হবে। এ আলোচনা হতে যে যতটুকু চায় যেন বুঝে নেয়। তবে (ইসলাম ও ইসলামি জীবনব্যবস্থার মৌলিক উৎস কুরআন-সুন্নাহ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য) শর্ত হলো, ইসলামিয়্যাত অধ্যয়নকারীকে প্রকৃত জ্ঞানীদের গুণাবলিতে সজ্জিত হতে হবে। আর তা হলো ন্যায়-নীতির দৃষ্টিভঙ্গি ও সত্যের প্রতি নির্ভেজাল একনিষ্ঠতা অর্জন করা; পাশাপাশি প্রকৃতির তাড়না, অবাধ্যতা ও অন্যায় আচরণ বর্জন করতে হবে।
টিকাঃ
১৩২. অর্থাৎ পশ্চিমাদের জীবনব্যবস্থা, ধর্ম ও সভ্যতার একটি বাস্তব রূপ তাদের তৈরী মূলনীতি দিয়ে বিশ্বাবাসীর কাছে পেশ করা হবে। এতে তারা যতটুকু মুসলিদের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানোর জন্য চেষ্টা করেছে তার থেকে হাজার গুণ তাদের অপকর্ম ও অসভ্যতা ফুটে উঠবে। যদি বাস্তব পর্যালোচনায় এমনটি উঠে আসে, তা হলে তাদের মত অসত্য ও ভ্রান্ত নীতিমালা অবলম্বন করলে কী অবস্থা দাঁড়াবে একবারও কি তারা ভেবে দেখেছে?
১৩৩. এই বইয়ের ভূমিকায় পঁচিশটির বেশি পুস্তিকা ও গ্রন্থের আলোচনা করা হয়েছে। একই বিষয় প্রিয় শায়খ সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদবি রহ. 'আল-ইসলাম ওয়াল মুসতাশরিকুন' নামে একটি পুস্তিকা রচনা করেছেন। সংক্ষিপ্তভাবে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের কর্মতৎপরতার ব্যাপারে ধারণা উক্ত বইটিতে পাওয়া যাবে।