📄 নবিজি কুরআন-হাদিস সাহিত্যের মাধ্যমে সৃষ্টি করেছেন
৪. ডি. এস. মার্গউলিথ (D. S. Margoluth) প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম মুর১৮ (W. Muir) থেকে বর্ণনা করেছেন, আরবদের গ্রাম্য ব্যক্তিরা সাহিত্য ও ভাষা চর্চার প্রতি খুব বেশি গুরুত্বারোপ করতো। হতে পারে নবি মুহাম্মাদও এই বিষয়ে অধ্যয়ন ও চর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি এতে বিশেষ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন- এটা অসম্ভব কিছু নয়। (অর্থাৎ ভাষা সাহিত্যের শিক্ষা অর্জন করেই বর্তমান কুরআন- হাদিসের রূপ তিনি দান করেছেন (নাউযুবিল্লাহ)।
ডব্লিউ মুরের বক্তব্যে ঐসব প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের গবেষণার একটি মাপকাঠি আমাদের সম্মুখে ফুটে উঠেছে। তিনি অতি উৎসাহ ও উদ্দীপনাকে এ বিষয়ে কাজে লাগিয়েছেন। কেননা, এ কথা সকলেই জানত আরবগণ ভাষাসাহিত্য আলাদাভাবে শিক্ষা করত না। এমনকি তাদের এ রকম কোন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানও ছিল না, যার শিক্ষকগণ সাহিত্যের আলাদা মৌলিক নীতিমালা ও বিশ্লেষণ তৈরি করবেন। আর নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে এ রকম কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছেন বলে জানা যায় না। তা ছাড়া এমন কোনো উদ্ধৃতি (Text)-ও নেই, যার দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হবে; বরং এ কথাই সর্বজন স্বীকৃত ও প্রতিপাদিত যে, নবুওয়াত প্রাপ্তির পূর্বে এবং কুরআনুল কারিম অবতীর্ণ হওয়ার পূর্বে নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন প্রকার গদ্য-পদ্য ও রচনা-আবৃত্তির বর্ণনা পাওয়া যায় না।১১৯
প্রাচ্যের গবেষণায় কর্মরত গবেষকদের পর্যালোচনা ও সমালোচনায় ভিন্ন আরেকটি জিনিস ফুটে উঠেছে; তা হলো- সমালোচনা। কারণ, ঘটনার বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে তারা সীমালঙ্ঘনের আশ্রয় নিয়ে থাকেন। কল্পিত পাঠ্য নিয়েই তারা অধ্যয়ন করতে থাকেন, যার কোনো বর্ণনাসূত্র বা সনদ নেই। এটি একমাত্র কাল্পনিক ও আধিপত্যবাদিতা ছাড়া কিছুই নয়।
টিকাঃ
১১৮. উইলিয়াম মুর, জন্ম ২৭ এপ্রিল ১৮১৯ সালে এবং মৃত্যু ১১ জুলাই ১৯০৫ সালে। তিনি স্কটিশ ওরিয়েন্টালিস্ট।
১১৯. তা হলে কীভাবে তিনি লোকালয়ে এসে ভাষা-সাহিত্যে পারদর্শিতা অর্জন করেছেন- এ কথা প্রমাণিত হয়? এর সাথে মিলিয়ে বলা হচ্ছে, কুরআন-হাদিসের উৎপত্তি-ও সেই ভাষা-সাহিত্য থেকে, নাউযুবিল্লাহ! এ কথা মিথ্যার পূজারি ও বিশেষ এজেন্টরাই শুধু বলতে পারে- অনুবাদক।
📄 প্রত্যেক দেশেই কিছু আঞ্চলিক ভিন্নতা রয়েছে
তাদের বিভ্রাটপূর্ণ গবেষণার নীতিমালায় আরেকটি সমস্যা চোখে পড়ে, তা হলো, তারা (প্রাচ্যীয় পণ্ডিতরা) ভাবে যে, আরব ও প্রাচ্যের চিন্তা-ভাবনা, অভ্যাস-স্বভাব, আখলাক-চরিত্র পশ্চিমা ও ইউরোপিয়নদের ধ্যান-ধারণা, কথিত নীতি-নৈতিকতার মতই হবে। তারা এটা কোনোভাবেই স্বীকার করতে চায় না যে, প্রত্যেক পরিবেশের একটি আলাদা মাপকাঠি আছে। আছে আগ্রহ ও অভ্যাস-চরিত্র।
ফ্রান্সের মুসলিম প্রাচ্যবিদ নাসির উদ্দিন ড্যানিয়া প্রাচ্যবিদদের কথিত নীতিমালা, গবেষণা পদ্ধতি, বিভিন্ন বস্তুর হুকুম (নির্দেশনা প্রদানে) নির্ধারণে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের যাচাই-বাছাই করার মাপকাঠি (যা থেকে তারা একই বিষয়ে নির্দেশনা প্রদানের ক্ষেত্রে পরস্পর বিরোধপূর্ণ সমালোচনা করেন) প্রভৃতির ব্যাপারে খুব সুন্দর কথাই বলেছেন। তারা সকলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন ও ইসলামের আত্মপ্রকাশ ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ইউরোপের ধ্যান-ধারণার বিচারে বিচার করে থাকেন। এতে করে তারা প্রকৃত বিষয় (ইসলামের প্রকৃত গবেষণা) হতে অনেক দূরবর্তী ভ্রষ্টতার মাঝে পড়ে যান। কেননা, এটা তো সেই জিনিস নয়, যা তারা ভাবছেন। কেননা, ইউরোপে বর্তমানের মতাদর্শ প্রাচ্যের আল্লাহ প্রেরিত নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বিশুদ্ধ আকিদা-বিশ্বাস ও জীবনব্যবস্থার আলোকে হওয়া সম্ভব নয়।
ড্যানিয়া বলেন, প্রাচ্যবিদগণ নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সিরাতের সমালোচনা করার জন্য ইউরোপীয় নীতি-পদ্ধতি অনুসরণ করেছেন। কয়েক শতাব্দি ধরে তারা বিশ্লেষণ করছেন ও তাদের ভ্রান্ত বিশ্বাসের অনুকূলে অনুসন্ধান চালাচ্ছেন। এক পর্যায়ে তারা নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিরাতের যেসব বিষয় মুসলিমগণ একমত পোষণ করেছেন তার মাঝে ফাটল সৃষ্টি করেন। আর এই দীর্ঘ ও সুপ্ত বিশ্লেষণ আর গবেষণার ফলে আজ মহানবির বিশুদ্ধ সিরাতের উপর।
আঘাত হানা তাদের পক্ষে সম্ভব হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু এখন কি তাদের পক্ষে কিছুটা সম্ভব হয়েছে?
(ড. মুসতফা আস-সিবায়ি বলেন) এর জবাবে আমরা বলতে পারি, প্রাচ্যবিদগণ তেমন নতুন কিছু সৃষ্টি করতে সক্ষম হননি; বরং আমরা যখন ঐ সকল ব্যক্তিদের নতুন মতামতের দিকে গভীর দৃষ্টিতে (ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জাপান, বেলজিয়াম ও হল্যান্ড প্রভৃতি দেশের প্রাচ্যবিদের দিকে) তাকাই, তখন তাদের গবেষণাকৃত বিষয়গুলো মিশ্রিত অন্ধত্বের মতো কিছু গবেষণা বলে মনে হয়। আর আপনি লক্ষ করবেন (তাদের গবেষিত বিষয়ে) একটি বিষয়কে প্রমাণিত ও প্রতিপাদিত করলে অন্যজন তা প্রত্যাখ্যান করেন। অনুরূপ একজন একটা বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করলে অন্যজন তা প্রমাণ করেন (এভাবেই তাদের গবেষণা চলতে থাকে)।
এরপর ড্যানিয়া তাদের পরস্পর-বিরোধপূর্ণ বেশ কিছু মন্তব্যের উদাহরণ পেশ করেন। আর তার আলোচনা শেষ করেন এই বলে— যদি আমরা প্রাচ্যবিদদের গবেষিত বিরোধপূর্ণ আলোচনার একটি অনুসন্ধানি রিপোর্ট তৈরি করি, তা হলে অনেক দীর্ঘ সূত্রিতার সূচনা হবে। কোনটা আসল কথা বা আসল বক্তব্য তা অবহিত হতে পারব না। তাই আমাদের সম্মুখে আরবদের রচিত সংকলিত সিরাতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমরা গ্রহণ করবো (এতেই আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় সমাধান পেয়ে যাবো)।
আর যেসব (অধুনা) সংকলক দাবি করছেন যে, তারা নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবন বৃত্তান্ত তথা সিরাতকে অতি সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে আগ্রহী, তবে তারা কোনো কোনো বিষয় একমত হতে পারছেন না; যদিও তা কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়। তারা যেসব বিষয় আপত্তি তুলেছেন এবং স্বীকার করেছেন, তাদের ধারণা অনুযায়ী তারা বিশ্লেষণ প্রকাশে চেষ্টা করেছেন, তারা কেউ গন্তব্যে পৌঁছতে পারেনি, আর কখনো পারবেও না।
টমাস, ইসকান্দার ও তরস্ফুতের মত ব্যক্তিরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিরাত নিয়ে আলোচনা করা এবং তার রূপ-রেখা তৈরি করা কোনো সম্ভবপর কাজ নয়। এসব নামধারী গবেষক ব্যক্তিরা প্রথমে নিজেদের মত করে (স্বজাতির চিন্তা-চেতনা, স্বভাব-চরিত্র প্রভৃতি বিষয়ে) ভাবেন, এরপর তারা তাদের নিজেদের মত করে বুঝতে সক্ষম হন। সেভাবেই পূর্ববর্তীদের জীবন-আদর্শ রচনা করেন (যেমন: নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনী তারা রচনা করেছেন)। তারা (যাদের জীবনী লেখা হচ্ছে) তাদের দেশ, সমাজ, পরিবেশ প্রভৃতির পার্থক্যের দিকে ভ্রূক্ষেপ করেন না।
আরেকটি বিষয় হলো, ঐসকল প্রাচ্যবিদগণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যান। তাদের একান্ত করণীয় হলো, পূর্ব থেকে জন্ম নেয়া সকল মন্দ প্রবৃত্তির দরজা বন্ধ করতে হবে, যা তাদের পাশ্চাত্য চিন্তাধারা থেকে বদ্ধমূল হয়েছে। বিশেষত প্রাচ্যের সেই আরবদের ক্ষেত্রে যাদের জীবনবৃত্তান্ত তারা রচনা করতে চাচ্ছেন, তাতে মহান ব্যক্তিত্বের সঠিক জীবনী অনুসন্ধানের মাঝে আড়াল সৃষ্টি করে। এই ছোট্ট নোটটি স্মরণ না রাখার ফলে তারা প্রতিটি পদক্ষেপে ভ্রান্তি আর সন্দেহের মাঝে পতিত হন। ১২০
টিকাঃ
১২০. মুকাদ্দামাতু হাদিরিল আলামিল ইসলামি, আমির সাকিব আরসালান, খণ্ড ০১, পৃ. ৩৩।
📄 প্রাচ্যবিদদের ব্যাপারে আমার শেষ কথা
সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যখন ধর্মযুদ্ধের অবসান হলো, তখন থেকেই ইসলাম ও মুসলিমদের উপর ভিন্ন পন্থায় প্রতিশোধ গ্রহণ করার আক্রমণাত্মক চিন্তা-ভাবনা পশ্চিমাবিশ্ব প্রস্তুত রেখেছিল। তারা প্রথম যে পন্থা অবলম্বন করেছিল, তা হলো ইসলামি স্টাডি ও তার সমালোচনা। মধ্যযুগীয় সময় পাশ্চাত্যে খ্রিস্টসমাজ এই দৃষ্টিভঙ্গির নেতৃত্ব দিচ্ছিল। ইসলাম যখন রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি লাভ করতে আরম্ভ করল, তখন ইসলামি দেশগুলোর উপর শক্তি ও ক্ষমতার দিক থেকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তারা উঠে-পড়ে লেগে যায়।
পশ্চিমারা ইসলামি বিশ্বের উপর একের পর এক, এক দেশের পর অন্য দেশে আক্রমণ শুরু করল। এমনকি তারা ইসলামি বিশ্বের প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপর কর্তৃত্ব অর্জন করল। এক সময় ইসলাম ও তার ইতিহাস সম্পর্কে পাশ্চাত্যের স্টাডির সূচনা ঘটল। এক পর্যায়ে রাজনৈতিক ধ্বংস সাধনের মধ্য দিয়ে এই জাতির উপর ঔপনিবেশিকতা বৃদ্ধি পেতে থাকল।
এভাবে বিগত শতাব্দিতে ইসলামি জ্ঞানশাখার সর্বদিক — ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে তারা আপন স্টাডিকে পূর্ণতায় পৌছেছে। স্বভাবগতভাবে এই স্টাডি হকের স্পর্শ থেকে (আলো) আবৃত থাকে দুটি পর্দার মাধ্যমে। যথা:
এক. ধর্মীয় বিদ্বেষ, যা ইউরোপের শাসন ক্ষমতায় চির বিরাজমান। আর তার নেতৃত্বাধীন সমমনা সৈন্যবাহিনী যখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বায়তুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করল, তখন 'লর্ড আলনাবির'১২৯ একটি মন্তব্য করেছিলেন, যা আজও সকলের মুখে মুখে। আর তা হলো, এখন ধর্মযুদ্ধের অবসান হলো১৩০।
ইসলাম ও তার সভ্যতা-সংস্কৃতি বিষয়ক ধর্মীয় বিদ্বেষ এখনো অনেক পশ্চিমাদের লেখায় বিদ্যমান। পশ্চিমা ধর্মীয় গবেষক, সাহিত্যিক ও বিজ্ঞজনদের নিকট ইসলাম ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি ন্যায় আচরণ যতুটুক আমি পাই তার একটি দৃষ্টান্ত حضارة العرب গ্রন্থ হতে দিব। বইটির সংকলক হলেন গোস্তাফ লে বোন।
পশ্চিমাদের লেখা এটাই সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ, যাতে ইসলাম ও তার সংস্কৃতির ব্যাপারে ইনসাফের প্রতি লক্ষ রেখে আলোচনা-পর্যালোচনা করা হয়েছে। গোসতাফ লোবুন একজন জড়বাদী দার্শনিক। তিনি কোন ধর্মমতে বিশ্বাস রাখেন না। এ কারনেই তিনি এমন মত প্রকাশ করেছেন। তাঁর ইসলামি সংস্কৃতির প্রতি ইনসাফ করার আরেকটি কারণ হলো, তিনি দগ্ধ পশ্চিমাদের মধ্যযুগীয় সীমাবদ্ধ জ্ঞান ও গবেষণার প্রতি নির্ভর করেননি (বরং তিনি ইসলামি মৌলিক জ্ঞান কুরআন-হাদিস নির্ভর গবেষণা করেছেন)।
অবশ্যই তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম একজন ঐতিহাসিক ও সমাজবিদ; তা সত্ত্বেও পশ্চিমা ও ইউরোপিয়ানগণ তাঁর উপর আক্রমণ করেন, বিশেষকরে ফ্রান্সের প্রাচ্যবিদগণ।
দুই. পশ্চিমারা বস্তুবাদী ও তাত্ত্বিক শক্তিকে আঠারো ও উনিশ শতকে অর্জন করেছে। এ কারণে তাদের জ্ঞানী-গুণী, ঐতিহাসিক ও লেখকদের একটি বড় অংশের অন্তরে প্রবঞ্চনা ও ধোঁকা স্থান করে নিয়েছে। এমনকি তারা এখন বিশ্বাস করছে, (মুশরিকবাদে) ইতিহাসের সকল সভ্যতা ও সংস্কৃতির মূল হলো পশ্চিমারা। আর পশ্চিমা বুদ্ধিমত্তা, মানসিকতা-ই হলো সূক্ষ্মদর্শিতা মানবতার পরিচায়ক, যা সঠিক গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনা করতে সক্ষম। এ ছাড়া অন্য যেসব জাতি ও তাদের চিন্তাধারা রয়েছে—বিশেষকরে ইসলাম তাদের মানসিকতা অতি সাধারণ ও সাদাসিধে। এর চেয়েও বেশি স্পষ্ট উক্তি করেছেন প্রাচ্যবিদ এইচ. এ. আর. গিব তাঁর রচিত “জেহ্য়াতুল ইসলাম” গ্রন্থে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা হলো, ইসলামি মানসিকতা সকল বিষয় উপলব্ধি করে আংশিক ও সংকীর্ণতার মধ্য দিয়ে; ব্যাপক ভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম নয়।
ঔপনিবেশিকতার খড়গ পরিচালিত জাতির উপর প্রাচ্যীয় পণ্ডিতগণ জীর্ণ-শীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে এ রকম উদ্ভট মন্তব্য করে থাকেন। কারণ পশ্চিমা ও ইউরোপিয়াগণ যাদের উপর নেতৃত্ব ও ঔপনিবেশিকতার স্টীমরোলার চালিয়েছেন সে সময় তারা ছিল জ্ঞানহীন অন্ধত্বের মাঝে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই তারা ছিল পশ্চাৎপদ।
টিকাঃ
১২৯. লর্ড আলনবির-এডমন্ড হেনরি হানম্যান অ্যলেনবাই (Edmund Henry Hyniman Allenby)। ২৩ এপ্রিল ১৮৬১ সালে ইংল্যান্ডে জন্ম গ্রহণ করেন ও ১৪ মে ১৯৩৬ সালে লন্ডনে মৃত্যু বরণ করেন। অ্যলেনবাই একজন যোদ্ধা, রাজনীতিবিদ, কূটনীতিবিদ ও দার্শনিক। তিনি ১৮৮০ থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তিনি ব্রিটেনের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
الآن انتهت الحروب الصليبية أي من الناحية العسكرية . 200
১৩০. ১৩১. গোসতাফ লে বোন-(Gustave Le Bon)। লে বোন ৭ মে ১৮৪১ সালে ফ্রান্সে তার জন্ম হয় ও ১৩ ডিসেম্বর ১৯৩১ সালে ফ্রান্সের মারনিয়াহ লাকোকিয়া শহরে মারা যান। পেশায় তিনি একজন ডাক্তার ও ইতিহাসবিদ। প্রাচ্যবিদদের মাঝে যারা ন্যায়-নীতিবান হিসাবে প্রসিদ্ধ, তিনি তাদের অন্যতম। তার রচিত অন্যতম গ্রন্থ হলো,
حضارة العرب وحضارات الهند (١٨٨٤) وحضارة العرب في الأندلس وسر تقدم الأمم. وروح الاجتماع.
এছাড়া তিনি ফরাসি ভাষায় অসংখ্য বই রচনা করেন। তিনি অন্যতম প্রাচ্যবিদ, যিনি আরব জাতি ও ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতির ন্যায়-সঙ্গত মতামত দিয়েছেন। লে বোনের মতে, 'মুসলিমগণ ইউরোপকে সভ্য বানিয়েছে'। কিন্তু অন্য অন্য ইউরোপিয়ানগণ তার এ মন্তব্যকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখেন।
📄 পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে আমাদের মিশ্রণ
বর্তমান শতাব্দিতে (উনিশ শতক) পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সাথে আমাদের মিশ্রণ ঘটতে শুরু করেছে। আমাদের ও তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ছে। বর্তমান সময়ের এমন কোন সুসভ্য শিক্ষাবিদ পাওয়া যাবে না (ওলামায়ে কিরাম ব্যতীত) যাদের সম্মুখে আমাদের পুরাতন ধাঁচের গ্রন্থাবলি পথনির্দেশক রূপে রয়েছে। তবে অবশ্যই তাদের সম্মুখে রয়েছে ঐসব (ইহুদি-খ্রিস্টান) প্রাচ্যবিদদের লেখা গ্রন্থাবলি, যারা আমাদের সংস্কৃতি ও সভ্যতা নিয়ে গবেষণা করার জন্য সাধারণ পাঠাগারগুলোর ভাণ্ডার থেকে উৎস অনুসন্ধান করতে আপন জীবন বিলীন করে দিয়েছেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতির সকল দিক নিয়ে (কুরআন, হাদিস, ইতিহাস, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ভূগোল, রাষ্ট্র প্রভৃতি) গবেষণামূলক গ্রন্থ লিখতে জীবনের বিশটি বছর ব্যয় করেছেন। আমাদের পূর্বর্তী আলেমদের পুরাতন যত উৎসগ্রন্থ রয়েছে সবগুলোই তারা মুরাজায়াত (বারবার অধ্যয়ন) করেছেন।
তাদের বিজ্ঞজনদের ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, পূর্ণ সময় নির্ধারণ, ঔপনিবেশিকতার ধর্মীয় চেতনার প্রতি আগ্রহ তাদের এমন দীর্ঘ স্টাডি করতে বাধ্য করেছে। তারা সক্ষম হয়েছে আমাদের শিক্ষাবিদদের কাছে আমাদের ইসলামি সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে সুবিন্যাস্ত করে উপস্থাপন করতে। সক্ষম হয়েছে আমাদের সু-সভ্যদের উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে।
বিশেষ করে যখন তারা আমাদের পুরনো গ্রন্থাবলির বিন্যাস ও প্রাচ্যবিদদের গবেষণা বিন্যাসের সাথে তুলনা করবে, তখন অবশ্যই তারা তাদের (প্রাচ্যবিদদের) জ্ঞান ও গবেষণার প্রশস্ততায় অভিভূত হয়ে প্রাচ্যবিদদের গ্রন্থাবলির দিকে উদ্দীপ্ত ও তাড়িত হবে। এ ধারণা করবে যে, হ্যাঁ, তারা সত্যই বলেছেন। আর যেসব বিষয় তারা আমাদের ওলামায়ে কিরামের বিরোধিতা করেছেন সেগুলোর ব্যাপারে তারা মনে করে প্রাচ্যবিদরাই সঠিক হুকুম দিয়েছেন। তাদের মতই সঠিক। কেননা, তারা অতি সূক্ষ্ম-বিশ্লেষণাত্মক পদ্ধতিতে এ পথে চলছেন। তারা অনিরপেক্ষও নন। এভাবেই ঐসব পাশ্চাত্য ও ইউরোপিয়ান গবেষকদের গবেষণামূলক আলোচনা দ্বারা নতুন জীবনধারা সৃষ্টি হয়েছে। তাদের মতামতের উপর আস্থাশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে।