📄 আরবরা (ইসলাম) প্রজাদের পশুপাল মনে করে
৩. আরব বিজয়ীগণ অনারবি মুসলিমদের সাথে খারাপ আচরণ ও তাদের অবস্থান-মর্যাদাকে খাটো করে দেখার বিষয়ে প্রাচ্যবিদগণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ ব্যাপারে তীর্যক আলোচনা করেছেন প্রাচ্যবিদ প্রকলামেন্ড তার تاريخ الشعوب الاسلامية গ্রন্থে। তার একটি উদ্ধৃতি здесь প্রদত্ত হলো। তিনি বলেন, আরবরা যখন বিজ্ঞ, জ্ঞানী-গুণীদের পছন্দ করতে লাগল, তখন তারা অনারবি জনগণকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নির্ধারণ করল, অর্থাৎ তারা প্রজাদের পশুপাল ভাবল। আরবিতে যাকে الرعية বলে। এর বহুবচন الرعايا। আরবরা তাদেরকে সেই পুরনো সেমিটিক জাতির সাথে তুলনা করত, যারা (অ্যসিরীয়) আশুরিয়নদের কাছেও ছিল পছন্দীয়। এই প্রাচ্যবিদ ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য সকল উৎসগ্রন্থ হতে মুখকে ফিরিয়ে নিয়েছেন। যেসব গ্রন্থে বিজয়ী মুসলিমদের ন্যায়, নীতি, সাম্য ও সহনশীলতা, তাদের পরস্পর লেনদেনের একীভূত হওয়া এবং আরব- অনারবের মাঝে কোনো পার্থক্য (Deference) না করা প্রভৃতি বিষয় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে।
টিকাঃ
১১৩. আশুরিয়ন প্রাচীন কালের ইরাক, সিরিয়া ও তুরুস্কের জনপদে খ্রিস্টান অনুসারীদের বলা হত। তবে এদের কিছু অংশ ইরানে, ব্রিটেন ও ইউরোপের সুইডেন-জার্মান অঞ্চলের অধিবাসী ছিল। তাদের প্রধান ভাষা ছিল সুরইয়ানিয়া বা সামিয়া। খ্রিস্ট প্রথম শতাব্দিতে আশুরিগণ ইসা আ. এর ধর্ম গ্রহণ করেন।
📄 গোল্ড যিহারের আপত্তির জবাব
الرعية শব্দটি আভিধানিক ব্যাখ্যার দাবিদার। তিনি এ শব্দটি হতে এই অর্থ গ্রহণ করেছেন যে, মুসলিমগণ সাধারণ অনারবদেরকে বকরির পালের মত মনে করেন। আর যদি আমরা ( رعي ) ধাতুর মৌলিক আলোচনা অন্যান্য গ্রন্থে লক্ষ করি, তাহলে আল-কামুসুল মুহিত (القاموس المحيط) গ্রন্থে পাবো এ রকম-
والراعي كل ولي أمر قوم ، والقوم رعية، وراعيته لا حظته محسنا اليه، وراعيته أمره خفظته، كرعاه.
আর راعي বলা হয় প্রত্যেক এমন অভিভাবককে, যে সম্প্রদায়ের কর্মের তত্ত্বাবধায়ক হয়। সম্প্রদায় বা কওম হলো رعية বা নাগরিক। راعية অর্থ হলো দেখবাল করা, দেখাশুনা করা, সদয় দৃষ্টি রাখা প্রভৃতি।راعيت أمره অর্থ হলো, হেফাজত করা, নিরাপদ রাখা, সংরক্ষণ করা প্রভৃতি। সুতরাং الراعي শব্দটি অভিধানে যেমন 'বকরির রাখাল' অর্থে আসে, তেমনি এটি 'কওমের প্রধান ও তাদের কর্মনির্ধারক'। আর الرعية শব্দটি 'পশুপাল' অর্থে আসে, অনুরূপ সম্প্রদায়, জাতি প্রভৃতি অর্থেও আসে। আর الرعاية শব্দের অর্থ হলো, অনুগ্রহ করা, নিরাপদ রাখা।
ইসলাম যখন الرعية শব্দটি কোনো জাতির ক্ষেত্রে ব্যবহার করে, এর দ্বারা অনারবকে নির্দিষ্ট করে না যার দ্বারা এটা বুঝাবে যে, ইসলাম তাদেরকে বকরির পালের সাথে তুলনা করে; বরং ইসলামে الرعية শব্দটি দ্বারা জাতির সর্বসাধারণকে বুঝানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। আর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এ সম্পর্কে অনেক প্রসিদ্ধ হাদিস রয়েছে। যেমন: বুখারির বর্ণনায় একটি হাদিসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
ألا كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته، فالإمام التي على الناس راع، وهو مسؤول عن رعيته، والرجل ربع على أهل بيته، وهو مسؤول عن رعيته، والمرأة راعية على بيت زوجها، وولدها، وهي مسؤولة عنهم، وعند الرجل راع على مال سيده، وهو مسؤول عنه، ألا كلكم راع وكلكم مسؤول عن رعيته.
অর্থ : সাবধান! তোমরা প্রত্যেকে তত্ত্বাবধায়ক, আর তোমাদের প্রত্যেককে তার অধীনস্ত সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। সুতরাং সাধারণ জনতার পরিচালক ইমাম বা নেতা তার প্রজা ও নাগরিক সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। নারী তার স্বামী ও সন্তানদের রক্ষক, সে তাদের ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। ব্যক্তির অধীনস্ত গোলাম/কৃতদাস তার কর্তার বা মনিবের সম্পদের রক্ষক, সে এ ব্যাপারে প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। সাবধান! তোমরা সকলেই তত্বাবধায়ক আর তোমাদের প্রত্যেককে তার অধীনস্ত সম্পর্কে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হবে। ১১৪
টিকাঃ
১১৪. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৪৮২৮, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৩৪১৪, সুনানে তিরমিযি, হাদিস নং ১৬৫২, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৫৪৩, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৫৭০৯, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৫৮২, সুনানে কুবরা বায়হাকি, হাদিস নং ১৫২৯৮, মুআত্তা মুহাম্মাদ, হাদিস নং ৮৭২ ও বায়হাকি শুয়াবুল ইমান, হাদিস নং ৬৮৬৬- গ্রন্থে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রাদি. এর থেকে বিশুদ্ধ বর্ণনাসূত্রে বর্ণিত হয়েছে।
📄 ইবনে হাজার আসকালানির ব্যাখ্যা
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি রহ. ১১৫ এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন,
والراعي هو الحافظ المؤتمن الملتزم صلاح ما اؤتمن على حفظه فهو مطلوب بالعدل فيه والقيام بمصالحه.
আল্লাহ রাব্বুল রক্ষক, আমানতদার। তার কাছে যা গচ্ছিত রাখা হয়েছে তা নিরাপদ ও সংরক্ষিত রাখতে সে অঙ্গীকারাবদ্ধ। সুতরাং সেই আমানত ন্যায়-নিষ্ঠভাবেই প্রত্যাশিত। ১১৬
বুখারির অন্য এক হাদিসের মাঝে الرعية শব্দের প্রয়োগ মুসলিমদের ক্ষেত্রেও করা হয়েছে। যেমন-
وَمَا مِنْ وَالِ يَلِي رَعِيَّةٌ مِنْ الْمُسْلِمِينَ، فَيَمُوتُ وَهُوَ غَاشٌ لَهُمْ إِلَّا حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ.
যে তত্ত্বাবধায়ক কোন মুসলিম প্রজাদের দায়িত্ব পেল আর তাদের সাথে প্রতারণাকারীরূপে থেকেই মৃত্যু বরণ করল, তাহলে আল্লাহ তার উপর জান্নাত হারাম করে দিবেন। ১১৭
প্রাচ্যবিদ প্রকলামেন এসব আলোচনা হতে কীভাবে চোখ বুঝে থাকলেন? আর নিজে নিজে এ দাবি করা বৈধ মনে করলেন যে, মুসলিমগণ অনারবদের বকরির পালের মত মনে করে। তারা তাদের উপর الرعية শব্দটি এককভাবে ব্যবহার করে। এ কথার কোনো বর্ণনাসূত্র বা সনদ নেই; তবে হ্যাঁ, এ শব্দটি বকরিপালের জন্যও ব্যবহার করা হয়। অভিধানের একাধিক অর্থও স্পষ্ট। তবে الرعية শব্দের ব্যবহার অনারবদের জন্য (যেমনটি প্রকলামেন দাবি করেন) নির্দিষ্ট করার কোনো যৌক্তিকতা নেই; বরং এটা সূত্রহীন কাল্পনিক মন্তব্য। এটা সন্দেহবশত ঘটে যাওয়া কোনো বিষয় নয়। অবশ্যই কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ও কুপ্রবৃত্তির তাড়নায় এমনটি করা হয়েছে।
টিকাঃ
১১৫. শিহাবুদ্দিন আবুল ফদল আহমাদ ইবনে আলি ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আলি ইবনে মাহমুদ ইবনে আহমাদ ইবনে আহমাদ ইবনে কিনানি মিসরি আসকালানি রহ.। তবে তিনি ইবনে হাজার আসকালানি নামে বেশি প্রসিদ্ধ। ২২ শায়াবান ৭৭৩ হিজরিতে মিসরে জন্ম গ্রহণ করেন। ৭৬ বছর বয়সে ৮৫২ হিজরিতে তিনি ইনতেকাল করেন। মিসরের রাজধানী কায়রোতে তাকে দাফন করা হয়। বর্তমানে বাসাতিন নামক স্থানে তার মাকবারা রয়েছে। তার জীবনের অমর কীর্তি সহিহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ 'ফাতহুল রাবি'।
১১৬. ফাতহুল বারি, খণ্ড ১৩, পৃ. ৯৬।
১১৭. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৬৬৪৫ ও হযরত মাআকাল ইবনে ইয়াসার রাদি, থেকে বর্ণিত। এছাড়াও সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২০৮, সুনানে দারেমি, হাদিস নং ২৭১০, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ১৯৮৪২, সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস নং ৪৫৮৭, সুনানে কুবরা বায়হাকি, হাদিস নং ১৫৩০০ ও মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নং ৩৭০৩০ হাদিসটি বর্ণনা করেন।