📄 হাদিস তৃতীয় হিজরি শতকে সৃষ্ট
গোল্ড যিহার তার বিশেষ উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করার জন্য এই কথা প্রচার করে থাকেন যে, ইসলামি শরিয়ার দ্বিতীয় উৎস হাদিস হিজরি তৃতীয় শতাব্দির শুরুর দিকে সংকলন করা হয়েছে। হাদিস রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী নয়। তিনি দাবি করেন, আহকামে শরিয়া বা ইসলামি জীবনব্যবস্থার ফিকহি রূপ ইসলামের প্রথম যুগের মুসলিম জনসংখ্যার মাঝে প্রচলিত ছিল না। আর আহকামে শরিয়াহ ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐতিহাসিক পটভূমি সম্পর্কে অজ্ঞতা বড় বড় ইমামদের সাথে সম্পৃক্ত ছিল। অর্থাৎ তাঁরা ইসলামি শরিয়া ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে অজ্ঞ ছিলেন। তিনি এসব বিধ্বংসী বক্তব্যের সমর্থনে কতিপয় পরস্পর বিরোধী, সংঘর্ষিক বর্ণনার সাহায্য নিয়েছেন।
📄 ইমাম আবু হানিফার বিরুদ্ধে অভিযোগ
গোল্ড যিহার ইমাম আবু হানিফার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত দেয় কিতাবুল হায়াওয়ান থেকে, এভাবে যে- আল্লামা মুহাম্মাদ ইবনে মুসা ইবনে ইসা ইবনে আলি আল কামাল আবুল বাকা আদ দিময়ারি কাহেরি শাফি (৭৪২- ৮০৮) ইমাম আবু হানিফা রহ. ১০৯ থেকে একটি বর্ণনা এভাবে পেশ করেন- তিনি বলেন, বদরযুদ্ধ উহুদ যুদ্ধের পূর্বে সংঘটিত হয়নি, বরং উহুদ যুদ্ধই প্রথম সংঘটিত হয়েছে। কোন সন্দেহ নেই, খুব কম সংখ্যক লোকই এ ধরনের বর্ণনা সম্পর্কে অবহিত।
আর আবু হানিফা রহ. যিনি ইসলামের ঐ সকল প্রসিদ্ধ ইমামদের একজন, যিনি ইসলামি যুদ্ধ-বিগ্রহের আহকাম সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করেছেন। ইসলামি যুদ্ধ ফিকহি ক্ষেত্রেও বেশ প্রভাব রাখে। ইমাম আবু হানিফা রহ. এর বিশিষ্ট শাগরেদবৃন্দ যারা তাঁর ইলমি গবেষণাকে প্রচার- প্রসার করেছেন, তাদের অন্যতম ইমাম আবু ইউসুফ ইয়াকুব, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রহ.। এটা একেবারেই অসম্ভব, জ্ঞান এটাকে কোনোভাবেই স্বীকার করে না যে, তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিরাত কিংবা মাগাযির (যুদ্ধ-সংগ্রামের) এমন ঘটনাবলি সম্পর্কে অজ্ঞ থাকবেন, অথচ সেই যুদ্ধ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি ফিকহি সমাধান পেশ করেছেন।
এ বিষয়ে আমি দুটি কিতাবের নাম উল্লেখ করাই যথেষ্ট মনে করছি। গ্রন্থদ্বয় ইসলামি রাষ্ট্রীয় আইন প্রবর্তনের ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংকলন।
প্রথমটি : كتاب الرد علي سير الأوزاعي এটি ইমাম আবু ইউসুফ ইয়াকুব রহ, রচনা করেন।
দ্বিতীয়টি : السير الكبير এটি রচনা করেন ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান রহ. (তাঁরা উভয় ইমাম আবু হানিফা রহ. এর ছাত্র)।
ইমাম সারাখসি রহ. এ কিতাবটির ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করেছেন। ইসলামি আইনে রাষ্ট্র সংক্রান্ত বিষয়ে এটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ, অগ্রবর্তী গ্রন্থ। সর্বশেষ এটি جامعة الدول العربية এর তত্ত্বাবধানে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব কর্তব্য বিষয়ে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ শায়বানি রহ. এর গবেষণা প্রকাশ করে।
আর এ দুটি গ্রন্থে ইমাম আবু হানিফার ছাত্রগণ এ বিষয়টি (যা ইমাম দিময়ারি বর্ণনা করেছেন) পরিষ্কার করেছেন। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও খোলাফায়ে রাশেদিনের সমকালীন ঐতিহাসিক ইসলামি যুদ্ধ-বিগ্রহ সম্পর্কে আবু হানিফার জ্ঞানের ধারক বাহক।
(ইমামের কোনো কথা বর্ণনা করার ক্ষেত্রে তাদের কথাই বেশি অগ্রাধিকার প্রাপ্ত)
গোল্ড যিহার উল্লিখিত কিতাব দুটি সম্পর্কে জানেন না, এমনটি নয়। তিনি যদি সত্যানুসন্ধানি হতেন, তবে অবশ্যই এ কথা বলার অবকাশ পেতেন না যে, ইমাম আবু হানিফা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সিয়ার ও সিরাত তথা পূর্ণাঙ্গ জীবন এবং যুদ্ধকালীন সামরিক পর্যালোচনার বিষয়ে অজ্ঞ ছিলেন। আর যদি তিনি বলেন, আসলেই এই বর্ণনাটি ইমাম আবু হানিফার বর্ণনা, যা দিমইয়ারি তার (حياة الحيوان ) প্রাণীজীবন কিতাবে উল্লেখ করেছেন; সে ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো দিময়ারি কোনো ইতিহাসবিদ ছিলেন না। তার গ্রন্থটিও ফিকহি কোনো কিতাব ছিল না। এমনকি এটা ইতিহাসের বইও নয় (বরং আসল কথা হলো এটি একটি প্রাচীন সংকলন)। তিনি শুদ্ধা-শুদ্ধির যাচাই-বাছাই ছাড়াই তার কিতাবের আলোচনা সংশ্লিষ্ট দুর্লভ ঘটনা, বর্ণনা, কাহিনি প্রভৃতি সংকলন করেছেন।
আর এ কথাও কারো কাছে অস্পষ্ট নয়, ইমাম আবু হানিফা, তার সমকালীন ব্যক্তি বিশেষ, অনুসারী ও তৎপরবর্তীগণের চিন্তা-ভাবনা ও পদ্ধতিগত পার্থক্যের ভিন্নতাও রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্পষ্ট শত্রুতাও প্রমাণিত হয়েছে। আর এই শত্রুতা ও বিদ্বেষের কারণেই সকল অবান্তর ঘটনা প্রবাহ ও বর্ণনার উৎস সৃষ্টি হয়েছে। আর ঐসব ঘটনা বর্ণনাকারী, গল্পকার, লিপিকার এমন কিছু কাল্পনিক ও অবাস্তব ঘটনা বর্ণনা করেছেন যার কোনটা দ্বারা ইমাম আবু হানিফার রহ. এর মর্যাদাকে আকাশচুম্বি করা হয়, আর কোনটা দ্বারা তাকে জমিনে আছড়ে ফেলা হয়।
এর অধিকাংশই তার অতি ভক্তিকারী কিংবা বিরুদ্ধবাদীদের পক্ষ থেকে বানানো, রূপক, কাল্পনিক, গুজব ও কৌতুক বৈ কিছুই নয়। গবেষক ও বিজ্ঞ আলেদের নিকট এর কোনো মূল্য নেই (তাই দিময়ারির মন্তব্যটিও অনুরূপ একটি কাল্পনিক বর্ণনা, যার কোনো ভিত্তি নেই)।
গোল্ড যিহার ইমাম আবু হানিফা রহ. এর সংকলিত, বিন্যস্ত গবেষণা দ্বারা পরীক্ষিত সর্বপ্রকার জ্ঞান ভাণ্ডার থেকে স্বেচ্ছায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। আর নির্ভর করেছেন মিথ্যা, অসত্য প্রমাণহীন বর্ণনা ও বক্তব্যের উপর। এজন্যেই তিনি এমন বাচ্চাসুলভ মন্তব্য করেছেন, যা শিশুশ্রেণির জ্ঞানান্বেষী শুনেও অট্ট হাসিতে ফেটে পড়ে। তার মন্তব্যটি হলো, সুন্নাতে নববি/হাদিস শরিফের এই বিশাল জ্ঞান শাখাটি প্রথম তিন শতাব্দীর পর মুসলিমদের দ্বারা তৈরি করা একটি জ্ঞান উৎস।
টিকাঃ
১০৮. আল্লামা দিময়ারি রহ. মিসরের বর্তমান রাজধানী কায়রোর দিময়ারি এলাকায় ৭৪২ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। ৬৬ বছর বয়সে ৮০৮ হিজরিতে কায়রোতে ইনতেকাল করেন। সূত্র: ইমাম ইবনে মাজাহ ও কিতাবুহুস সুনান, পৃষ্ঠা ২৫৭।
১০৯. ইমাম আবু হানিফা রহ.; আবু হানিফা নুমান ইবনে সাবেত রহ.। তিনি ৮০ হিজরিতে কুফায় জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৫০ হিজরিতে ইনতেকাল করেন। তিনি তাবেয়িদের অন্তর্ভুক্ত, অর্থ্যাৎ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাহাবিকে দেখেছেন। প্রসিদ্ধ চার ইমামের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাকে ইমামে আজম বলা হয়। ইসলামি ফিকহ্ তথা আইন-কানুনের ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ অনুসারীদের হানাফি বলা হয়। আবু হানিফা রহ. থেকে বর্ণিত ফিক্ তারই শিষ্য ইমাম মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানি রহ. নিজ রচনাবলিতে সংকলন ও সংরক্ষণ করেছেন। তা-ই আজ হানাফি ফিক্হ নামে প্রসিদ্ধ। ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর দিকে সম্বোধিত রচনাবলির অন্যতম হলো, ফিকহে আকবার, ফিকহ আওসাত, ওয়াসিয়াত ও রিসালাতুত তাওহিদ প্রভৃতি।
📄 ইমাম যুহরি জাল হাদিস তৈরি করতেন
২. একই প্রাচ্যবিদ গোল্ড যিহারের আরেকটি উদাহরণ। তিনি ইতিহাসের গ্রন্থাবলি এবং (الجرح والتعديل) ব্যক্তির মান নির্ধারণ) এর প্রাচীন গ্রন্থাবলি হতে সংকলিত ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে শিহাব আয যুহরি রহ.-এর একনিষ্ঠতা, সততা ও ন্যায়-নিষ্ঠা প্রভৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। জাপানি গোল্ড যিহার দাবি করেছেন, ইমাম যুহরি এমনটি ছিলেন না, বরং তিনি উমাইয়া খলিফাদের জন্য জাল হাদিস তৈরি করতেন। তার দাবি অনুযায়ী তিনি
لا تشد الرحال إلا إلى ثلاثة 'তোমরা তিনটি মসজিদে ভ্রমণ করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পার'। ১১০ তৎকালীন খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান” এর জন্য উল্লিখিত হাদিসটি জাল করেছেন। এ হাদিসটি অবশ্যই ইমাম যুহরি রহ. বর্ণনা করেছেন। আর ইমাম যুহরি রহ. খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ানের সমকালীন ব্যক্তি ছিলেন। আমি (ড. মুসতফা আস সিবায়ি) এ ভ্রান্ত ধারণার অবসান কল্পে স্বরচিত কিতাব السنة ومكانتها فى التشريع فى الإسلامي এর ৩৮৫ পৃষ্ঠায় এ আলোচনা করেছি।
টিকাঃ
১১০. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ২৪৮৪, সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ১৭৪১, সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং ১৪১৬, ইবনে মাজাহ, হাদিস নং ১৩৯৯, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং ৭০১৮, সহিহ ইবনে হিব্বان, হাদিস নং ১৬৫৩, সুনানে কুবরা নাসায়ি, হাদিস নং ৭৭0, বায়হাকি সুনানে সুগরা, হাদিস নং ২৯৭, বায়হাকি সুনানে কুবরা, হাদিস নং ৯৫১৫, মুসনাদে আবি দাউদ তয়ালিসি, হাদিস নং ২৬১৮, মুসনাদে আবি ইয়ালা, হাদিস নং ৫৮৩৪, মুসনাদে হোমাইদি, হাদিস নং ৯১৯, মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস নং ৮৯৪৭, মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হাদিস নং ১৮৩৯৩, তহাবি মুশকিলুল আসার, হাদিস নং ৫৫৭, ও দালায়েলুন নবুওয়াহ হাদিস নং ৮২৯ প্রভৃতি গ্রন্থে হযরত আবু হোরায়রা আবদুর রহমান ইবনে সখর রাদি. থেকে হাদিসটি বর্ণিত হয়েছে।
১১১. আবুল ওয়ালিদ আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান ইবনে আল-হাকাম ইবনে আবিল আস ইবনে উমইয়া আল-কুরাশী। তিনি ২৬ হিজরিতে মদিনায় জন্ম গ্রহণ করেন। ৮৬ হিজরিতে তিনি দামেশকে ইনতেকাল করেন। তিনি পঞ্চম উমাইয়া খলিফা ও খিলাফতে বনি উমাইয়ার দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ধর্মীয় জ্ঞান-বিদ্যায় আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ান উমাভী অন্যান্য খলিফাদের তুলনায় অগ্রগামী ছিলেন।
১১২. লেখক এ কিতাবের শুরুতে সংক্ষিপ্তাকারে ইমাম যুহরি রহ.-এর বিষয়টি আলোচনা করেছেন এবং গোল্ড যিহারের বিভ্রান্তির জবাব দিয়েছেন।
📄 আরবরা (ইসলাম) প্রজাদের পশুপাল মনে করে
৩. আরব বিজয়ীগণ অনারবি মুসলিমদের সাথে খারাপ আচরণ ও তাদের অবস্থান-মর্যাদাকে খাটো করে দেখার বিষয়ে প্রাচ্যবিদগণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এ ব্যাপারে তীর্যক আলোচনা করেছেন প্রাচ্যবিদ প্রকলামেন্ড তার تاريخ الشعوب الاسلامية গ্রন্থে। তার একটি উদ্ধৃতি здесь প্রদত্ত হলো। তিনি বলেন, আরবরা যখন বিজ্ঞ, জ্ঞানী-গুণীদের পছন্দ করতে লাগল, তখন তারা অনারবি জনগণকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক নির্ধারণ করল, অর্থাৎ তারা প্রজাদের পশুপাল ভাবল। আরবিতে যাকে الرعية বলে। এর বহুবচন الرعايا। আরবরা তাদেরকে সেই পুরনো সেমিটিক জাতির সাথে তুলনা করত, যারা (অ্যসিরীয়) আশুরিয়নদের কাছেও ছিল পছন্দীয়। এই প্রাচ্যবিদ ইতিহাসের নির্ভরযোগ্য সকল উৎসগ্রন্থ হতে মুখকে ফিরিয়ে নিয়েছেন। যেসব গ্রন্থে বিজয়ী মুসলিমদের ন্যায়, নীতি, সাম্য ও সহনশীলতা, তাদের পরস্পর লেনদেনের একীভূত হওয়া এবং আরব- অনারবের মাঝে কোনো পার্থক্য (Deference) না করা প্রভৃতি বিষয় গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এবং বিশুদ্ধ বর্ণনা রয়েছে।
টিকাঃ
১১৩. আশুরিয়ন প্রাচীন কালের ইরাক, সিরিয়া ও তুরুস্কের জনপদে খ্রিস্টান অনুসারীদের বলা হত। তবে এদের কিছু অংশ ইরানে, ব্রিটেন ও ইউরোপের সুইডেন-জার্মান অঞ্চলের অধিবাসী ছিল। তাদের প্রধান ভাষা ছিল সুরইয়ানিয়া বা সামিয়া। খ্রিস্ট প্রথম শতাব্দিতে আশুরিগণ ইসা আ. এর ধর্ম গ্রহণ করেন।