📄 প্রথমত : নবিজির নবুওয়াত অস্বীকার
সন্দেহপূর্ণ বিকৃত গবেষণা প্রকাশের আবার কয়েকটি পর্যায় রয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত ও তার প্রতি নাযিলকৃত অহির ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করা। তাদের অধিকাংশ পণ্ডিত রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ হতে অহি (প্রত্যাদেশ) প্রাপ্ত হওয়াকে অস্বীকার করে। তারা অহির প্রকাশস্থল তথা হযরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম-এর ব্যাপারে বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা করে। যে-সব অবস্থা সাহাবিরা (রাদিয়াল্লাহু আনহুম) স্বচক্ষে দেখেছেন, বিশেষত হযরত আয়েশা রা. দেখেছেন তাও তারা অস্বীকার করে। প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের মধ্য হতে যারা মৃগরোগে আক্রান্ত, তারা একের পর এক রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আহত করেই যাচ্ছেন।
তাদের কেউ কেউ অহিকে কাল্পনিক কথা-বার্তা সাব্যস্ত করে নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দিকে সম্বোধন করে। আবার কেউ কেউ বলে, তাঁর রুগ্নতার কারণে তিনি এমনটি বলেছেন। তাদের কথায় যেন এটাই বুঝায়, আল্লাহ তা'আলা ইতিপূর্বে আর কোনো নবিকে প্রেরণ করেননি। তাই তাদের কাছে অহির ব্যাখ্যা স্পষ্টকরণে কষ্টসাধ্য ও দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাদের কেউ কেউ ইহুদি অথবা খ্রিস্টান। তারা অবশ্যই তাওরাতের সকল নবি আলাইহিমুস সালাম সম্পর্কে অবহিত এবং স্বীকার করেন। (তাদের ওপরও আল্লাহর পক্ষ হতে অহি এসেছে) আসলে তারা হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইতিহাস, কার্যকারিতা ও তাঁর আহূত নীতিমালার ক্ষেত্রে খুবই গৌণভাবে দেখে। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতকে ধর্মীয় বিদ্বেষবশত অস্বীকার করে, যেমনটি মিশনারি, পাদ্রী ও পুরোহিতদের অন্তর হয়ে থাকে।
তারা একারণেই 'কুরআন আল্লাহর বাণী' এ কথা অস্বীকার করে। তারা অবাক হয়ে যায়, যখন একজন উম্মি নবির (যিনি দুনিয়ার কারো থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেননি) থেকে এসব আলোচনা প্রকাশ পায়, যা পূর্ববর্তী জাতিদের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। এ-তো অসম্ভব। তারা জাহিলি যুগের মুশরিকদের মত বলতে লাগল- এসব জ্ঞান-বিজ্ঞান ও ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ সম্পর্কে তাকে অন্য কেউ অবহিত করে, আর তাই তিনি আমাদের বলেন। তারা এক আশ্চর্য রকম বিকৃতি সাধন করছে। আল- কুরআনের ঐ সকল বিজ্ঞানময় চুলচেরা বিশ্লেষণ তাদের হতবাক করে দেয়, যা আর কোনো যুগে প্রকাশ ঘটেনি। একমাত্র তাঁর (রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর) যুগেই প্রকাশ পেয়েছিল। তারা এ বিষয়টিকে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রখর মেধার কারসাজি বলে চালিয়ে দেয়। এ মিথ্যা বিকৃত অপবাদের ক্ষেত্রে তারা পূর্ববর্তী মুশরিকদের থেকে আরো বেশি অগ্রগামী।
📄 দ্বিতীয়ত : ইসলাম কোন নতুন ধর্ম নয়
তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াত ও আসমানি কুরআনকে অস্বীকার করে ক্ষান্ত হয়নি। এমনকি তাদের মতে ইসলাম আল্লাহর কাছে মনোনীত কোন নতুন ধর্ম নয়; বরং তাদের মতে এ ধর্ম ইহুদি-নাসারাদের ধর্ম হতে সৃষ্ট একটি নতুন ধর্ম। এ ধর্মের এমন কোনো মৌলিক সূদৃঢ় সূত্র নেই, যা নিয়ে গবেষণামূলক আলোচনা করা যেতে পারে। তা এমন কিছু রীতি-নীতির সমন্বয়ে তৈরী ধর্মমত, যা পূর্ববর্তী ধর্মগুলোর মাঝে ও ইসলামের মাঝে সম্মিলন ঘটিয়েছে।
পাঠক জেনে রাখুন, প্রাচ্যীয় ইহুদি পণ্ডিতদের মধ্যে গোল্ড যিহার ও জে. এফ স্কাচট৮০ এর দাবি হলো, ইসলাম ইহুদিধর্ম ও তার প্রভাব দ্বারা প্রভাবিত। আর খ্রিস্টান প্রাচ্যীয় পণ্ডিতগণও একই দাবি করে থাকেন (তাদের এ দাবি ভিত্তিহীন)। কেননা, খ্রিস্টান ধর্মের মাঝে এমন কোন আইন-কানুন ও জীবনব্যবস্থা নেই, যার মাধ্যমে তারা দাবি করতে পারে ইসলাম ধর্ম তাদের মাধ্যমে প্রভাবিত ও তার থেকে কিছু গ্রহণ করেছে। (বহুবার বিকৃতির পর) বরং খ্রিস্টান ধর্মে শুধু চরিত্রগঠনের কিছু মূলনীতি রয়েছে।
তারা বিশ্বাস করে, ইসলাম এর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ইসলামে এর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। তাদের কথায় মনে হয় এলাহি ধর্মগুলোর চারিত্রিক মূলনীতি পরস্পর বিরোধী। (অথচ বিষয়টি এমন নয়। বরং এলাহি ধর্মের মৌলিক শিক্ষা একই) যেন একজন একটি ধর্ম প্রবর্তন করেছেন আর আরেকজন অন্য একটি ধর্ম প্রচলন ঘটিয়েছেন। আসলে তারা যা বলে তা থেকে মহান আল্লাহ অনেক ঊর্ধ্বে।
টিকাঃ
৮০.J.F.Schacht তিনি ১৩ মার্চ ১৯০২ সালে পোলান্ডে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১ আগস্ট ১৯৬৯ সালে ইংলান্ডে মৃত্যু বরণ করেন। পোলান্ড থেকে পড়া-শুনা করেন এবং পরবর্তীর্তে সেখানেই অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। ১৯৩২ সালে তিনি সেমিটিক ভাষার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি প্রথমে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। পরবর্তীতে তিনি নেদারল্যান্ডে ইসলামিক স্টাডিজের উপর অধ্যাপনা করেন।
📄 তৃতীয়ত : হাদিসের ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করা
বিদগ্ধ আলেমগণ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যে হাদিসকে বিশুদ্ধরূপে গ্রহণ করেছেন তার ব্যাপারে সন্দেহ সৃষ্টি করা প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের অন্যতম কাজ। তারা যুক্তি হিসেবে জাল হাদিস ও দুর্বল হাদিসকে উপস্থাপন করে। অথচ তারা জানে না আমাদের শীর্ষ আলেমগণ সহিহ হাদিসকে দুর্বল হাদিস থেকে বাছাই করার জন্য সর্বাত্মক পরিশ্রম করেছেন। অনুসন্ধান আর গবেষণার ক্ষেত্রে তারা এমন সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম মূলনীতি প্রণয়ন করেছেন যার এক দশমাংশও তাদের (খ্রিস্টান ও ইহুদি) ধর্মের কথিত বাইবেলের ক্ষেত্রে লক্ষ রাখা হয়নি। আমি এ সম্পর্কে চূড়ান্ত! আলোচনা করেছি সম্প্রতি প্রকাশিত গাযায় السنۃ ومکانتھا فی التشريع আল ইসলামী গ্রন্থে।
তাদের এ ধোঁকা ও শঠতাপূর্ণ আলোচনার মূল কারণ হলো তারা আমাদের ধর্মীয় আলেম ব্যক্তিবর্গ যে হাদিসভাণ্ডারকে সম্বল হিসাবে গ্রহণ করেছেন তাকে একটি চিন্তা প্রসূত ভাবনা আর অনর্থক আইন হিসেবে মনে করা। তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করে। তাদের দাবি হলো, এ কথা কোনোভাবেই যুক্তি সঙ্গত নয় যে, ইসলামি সকল আইন-কানুন উম্মি নবি হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কর্তৃক রচিত; বরং এটা প্রথম তিন শতাব্দীর মুসলিমদের আমলের সমষ্টি। সুতরাং তাদের মৌলিক বিশ্বাস হলো, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতকে অস্বীকার করা। আর এর থেকেই তাদের সকল বিভ্রান্তি ও অপপ্রচারের উৎপত্তি।
📄 চতুর্থত : ইসলামি আইনের ব্যাপারে সংশয় সৃষ্টি করা
ইসলামের যে বিশাল সমৃদ্ধ আইনি ভাণ্ডার রয়েছে তার সমপরিমাণ কোনো যুগের কোনো জাতির কাছে সংকলিত নেই। এ বিশাল আইনি পর্যালোচনার গুরুত্ব ও মহত্ত্ব তাদের কাছে নিষ্প্রভ হয়ে গেছে, যখন তারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নবুওয়াতের উপরই বিশ্বাস স্থাপন করে না। তারা এ ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য এ পন্থা অবলম্বন করল যে, এই সমৃদ্ধ আইনিকাঠামো রোমানদের থেকে ধার করা, অর্থাৎ এটা পাশ্চাত্যের জীবনধারা থেকে গ্রহণ করা একটি জীবনব্যবস্থা। আমাদের বিদগ্ধ আলেমগণ তাদের এ নোংরা দাবির অসারতা প্রমাণ করেছেন। তারা এটা প্রমাণ করেছেন যে, ইসলামি ফিকহ তথা জীবনব্যবব্যবস্থা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ আলাদা জীবনব্যবস্থা, যা কারো থেকে ধার করা নয়। আলেমদের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা বিদ্বেষীদের নির্বাক ও লা- জাওয়াব করেছে। আর সত্যানুসন্ধানি ব্যক্তিদের পরিতুষ্ট করেছে।