📄 ১. ধর্মীয় কারণ
প্রথম কারণটি বিশ্লেষণ করে পরিচয় তুলে ধরা এবং ব্যাপক বিশ্লেষণ-পর্যালোচনা করার প্রয়োজন বোধ করি না। কেননা, পশ্চিমা অধ্যয়নকারীদের মূল টার্গেট হলো এই ধর্ম। পাদ্রী-মিশনারিদের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে শুধু ইসলামের সমালোচনা করা, এর ব্যাপারে আপত্তি তোলা, সৌন্দর্যকে কুৎসিত-বিকৃতি সাধন করে বর্ণনা করা ও ইসলামি হাকিকত তথা বাস্তবতাকে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা, যাতে তারা তাদের জনগণের সম্মুখে এসব ভ্রান্ত ধারণাকে প্রমাণ করতে পারে। তাহলে সর্বসাধারণ ধর্মীয় (খ্রিস্টীয়) অনুশাসন মাথা পেতে মেনে নিবে। তারা প্রমাণ করতে চায়, ইসলাম এমন এক ধর্ম, যার প্রচার-প্রসার অনুপযোগী। মুসলিমগণ উচ্ছৃঙ্খল, ডাকাত, রক্ত পিপাসু জাতি। তাদের ধর্ম তাদের কায়িক ও শারীরিক ভোগ বিলাসে উৎসাহিত করে। ইসলাম তাদেরকে চারিত্রিক গুণাবলি, জীবনযাপন ও হাসি-কৌতুক প্রভৃতি হতে দূরে রাখে। আধুনিক সভ্যতা-সংস্কৃতির গতি-ধারা দেখার পর বর্তমানে তারা আরো বেশি প্রবল বেগে হামলা করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কেননা, পশ্চিমাদের কাছে মিশনারিদের আকিদা-বিশ্বাস একেবারে নড়বড়ে। এভাবে ধর্মীয় মনীষীদের কাছ থেকে সাধারণ খ্রিস্টানরা যে ইসলাম বিদ্বেষী শিক্ষা লাভ করেছিল তা সন্দেহ যুক্ত হয়ে গেল। অন্যদিকে প্রাচ্যের ইসলামিয়্যাত অধ্যয়নকারী গ্রুপের কাছে থাকা আকিদা-বিশ্বাস ও ধর্মীয় গ্রন্থের মাধ্যমে পাশ্চাত্য মুলুকের অধিবাসীদের দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরানোর জন্য ইসলামি সভ্যতার উপর তারা যে কঠিন আক্রমণ করেছিল তাতে কোনো সুফল পেল না। তারা এও জানত- প্রথম দিকের ইসলামি বিজয়গুলো, ক্রুসেডের যুদ্ধ, উসমানি খিলাফতকালে ইউরোপের নানা এলাকা বিজয়ের ফলে ইউরোপ ও পাশ্চাত্য অধিবাসীদের অন্তরে ইসলামি শক্তি- সভ্যতার প্রতি ভীতি ও তার অনুসারীদের প্রতি অনীহা কাজ করছিল। কালে তারা সুযোগ সন্ধানে থাকল এবং ইসলামিয়্যাত অধ্যয়নে তারা আরো বেশি কর্মোদ্দীপনা ও তৎপরতা বৃদ্ধি করল।
এখানে তাদের রয়েছে ধর্মীয় মিশনারি টার্গেট, যা তারা স্বীয় ইসলামি স্টাডির সময় ভুলে যায় না। তারা ইসলামি সংস্কৃতি অনুসারীদের মনস্তাত্ত্বিকভাবে প্ররোচিত করে আপন মতলب অনুযায়ী ইসলামি সুনামের উপর কুৎসা রটানোর কাজে লিপ্ত হয়, যাতে ইসলামি আকিদা-বিশ্বাসের প্রতি দুর্বলতার প্রবেশ ঘটাতে পারে। উত্তরাধিকারী সূত্রে পাওয়া ইসলামি জ্ঞান, ইসলামি সংস্কৃতি ও ইসলামি শিক্ষা ও সাহিত্য প্রভৃতির সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় সংশয় সৃষ্টিকরণই তাদের মূল টার্গেট।
📄 ২. ঔপনিবেশিক কারণ
ক্রুসেডারদের পরাজিত করার মাধ্যমে যখন ক্রুসেডযুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে (এ যুদ্ধটি ধর্মীয় যুদ্ধ হলেও প্রকৃতপক্ষে তা ছিল ঔপনিবেশিকতার যুদ্ধ) তখন তারা (ইউরোপিয়ানরা) আরবভূমি তথা ইসলামি দেশগুলোতে দখলদারিত্বের পুনরুজ্জীবিতকরণে হতাশ হয়নি; বরং এসব ভূখণ্ডের আঞ্চলিক শক্তির সাথে পরিচয় লাভ করার জন্য ইসলামি দেশের আকিদা-বিশ্বাস, স্বভাব-চরিত্র, ধন-সম্পদসহ জীবনের প্রত্যেকটি শাখায় তারা স্টাডি করার প্রতি মনোনিবেশ করে। এতে তারা ইসলামি রাষ্ট্রগুলোকে দুর্বল করতে পারবে। দেশকে দুর্বল করাটাই তারা উপযুক্ত ব্যবস্থা মনে করল।
যখন পাশ্চাত্যবাদীদের সামরিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ও প্রভাব পূর্ণতায় পৌঁছল, তখন তারা মানবিক ও আধ্যাত্মিকভাবে ইসলামকে দুর্বল করার জন্য ইসলামিয়্যাত অধ্যয়নের উপর অন্যদেরকে উদ্বুদ্ধ করতে লাগল। তারা আমাদের চিন্তা-চেতনায় হতাশা ও হীনম্মন্যতা সৃষ্টি করতে আত্মনিয়োগ করল। আর তা সফল হবে আমাদের হাতে থাকা পূর্ববর্তীদের রচিত পাণ্ডুলিপিগুলোর মাঝে এবং আমাদের সঠিক আকিদা-বিশ্বাস, প্রকৃত মানবতার মাঝে সন্দেহের বেড়াজাল সৃষ্টির মাধ্যমে; তবেই আমরা আপন সভ্যতা-সংস্কৃতি হতে বঞ্চিত হব।
আমরা যদি নিজেদেরকে পাশ্চত্যের অধীনে ছেড়ে দেই এবং চরিত্র, আকিদা-বিশ্বাসের মাপকাঠি তাদের মনে করি, তা হলে পশ্চিমাদের সভ্যতা-কৃষ্টি-কালচারের কাছে এমন বিনয়ী নতজানু দৃষ্টিভঙ্গির ফলে তাদের উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত হবে। আমাদের আর কোন মূল্য অবশিষ্ট থাকবে না।
লক্ষ্য করুন, কীভাবে তারা আমাদের দেশগুলোর মাঝে জাতীয়তাবাদকে উসকে দিচ্ছে, যা ইসলাম আগমনের ফলে আরবসমাজ থেকে মুছে গিয়েছিল। তখন আমাদের ভাষা, আকিদা-বিশ্বাস ও দেশ একটি ছিল। আরবগণ ইসলামের বাণী সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। তারা নিজেদের ও অন্যান্য জাতির মাঝে মানবিকতা, সভ্যতা-সংস্কৃতি ও ঐকান্তিকতা গড়ে তুলল। শক্তি বৃদ্ধি পেতে থাকল। মুসলিম জাতির সম্মান-মর্যাদা অনেক বেশি বৃদ্ধি পেতে থাকল।
পশ্চিমারা প্রায় অর্ধ শতাব্দি ধরে চেষ্ট করছিল মিসরে ফিরাউনি, লেবানন, ফিলিসতিন ও সিরিয়াতে ফিনিশিয়ান, এমনিভাবে ইরাকে অ্যাসিরীয় সভ্যতা চালু করতে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ জাতিকে তারা বিভক্ত করে রাখতে চেয়েছিল, যাতে পশ্চিমারা স্বাধীনতার শক্তি, ভৌগলিক কর্তৃত্ব, সম্পদ রক্ষণা-বেক্ষণ, সভ্যতা-সংস্কৃতির নতুন দিগন্ত ফিরিয়ে আনা আরব ভাইদের সাথে আকিদা-বিশ্বাসে একই বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া, উন্নয়নের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করা, একই ইতিহাস ও একই স্বার্থ সংরক্ষণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
📄 ৩. অর্থনৈতিক কারণ
যেসব কারণে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতগণ ইসলামিবিদ্যা ও দেশ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছে, তার অন্যতম কারণ হলো অর্থনীতি। পশ্চিমারা আমদানি-রপ্তানির মাধ্যমে তাদের পণ্যগুলো প্রচার-প্রসার করতে আগ্রহী। আর আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ কাঁচামাল (খনিজদ্রব্য) খুবই সামান্য মূল্যে কিনে নিবে, এটাও তাদের লক্ষ। কারণ তারা আমাদের আঞ্চলিক শিল্পগুলো ধ্বংস করতে চায়। বিশেষ করে যেসব শিল্প-প্রতিষ্ঠান আরব ও ইসলামি দেশগুলোর বিকাশ ও উন্নয়নশীলতায় সহায়তা করে।
📄 ৪. রাজনৈতিক কারণ
রাজনৈতিক অভিসন্ধি প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের বিকৃত গবেষণার আরেক কারণ। আমাদের যুগের সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত, ইসলামি রাষ্ট্রগুলোকে গ্রাস করা পশ্চিমা পণ্ডিতদের টার্গেট। প্রতিটি পশ্চিমা দূতাবাসের দূতগণ এসব দেশের সংস্কৃতি ও ভাষা (আরবি, বাংলা ও উর্দু) কে আত্মস্থ করে, যাতে তারা বুদ্ধিজীবী, চিন্তাবিদ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগ ও একান্ত আলাপ করতে সক্ষম হয়, এবং যাতে তারা বুঝতে পারে তাদের চিন্তা-চেতনা। অর্থাৎ তারা কি একনিষ্ঠ ইসলামপন্থি ও দেশপ্রেমিক, নাকি স্বার্থলোভী পশ্চিমাপন্থি, ভোগবাদি, সেকুলারপন্থি। নগ্ন হামলা-৬
তাদের অনুকূলে হলে তাকে দিয়ে স্বার্থসিদ্ধ করে। পশ্চিমাদের চিন্তাধারা অনুযায়ী তাদেরকে রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর উদ্বুদ্ধ করে।
অতীতে দিবালোকের মতো আমাদের নিকট এই সম্পর্কের ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। ঐসব পশ্চিমা রাষ্ট্রদূতগণ (যারা ইসলাম স্টাডি ও আরবিভাষা চর্চা করত) ইসলামি ও আরবরাষ্ট্রগুলোর মাঝে পরস্পর বিচ্ছেদ ঘটানোর জন্য ষড়যন্ত্রের জাল ছড়াত। দীর্ঘ পর্যালোচনা আর গবেষণার পর ঐসব দেশের অতিপ্রয়োজনীয় বিষয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এবং নানান অর্থবহ উপদেশের মাধ্যমে তারা অন্য ইসলামি রাষ্ট্র ও আরবদেশগুলোর মাঝে বিভেদ ও বিচ্ছেদ ঘটাত। তারা সাধারণ রাজনৈতিক নীতি-নির্ধারকদের মধ্যকার দুর্বলতার দিকগুলো উপলব্ধি করত; যার মাধ্যমে তাদের ঔপনিবেশিকতা ও স্বার্থ রক্ষার বিষয়গুলোর ব্যাপারে ব্যাপক জনপ্রিয়তার খবর জানতে ও বুঝতে পারত।