📄 ড. আবদুল কাদির ও গোল্ড যিহার
পাশ্চাত্যের মতাদর্শে বিশ্বাসী ড. আলি হাসান আবদুল কাদির এর نظرة عامة في تاريخ الفقه الاسلامی )ইসলামি আইনের ইতিহাস নিয়ে পর্যালোচনা) গ্রন্থে একই বক্তব্য ফুটে ওঠেছে। তার উক্ত গ্রন্থটি জার্মান ভাষায় ৭. العقيدة والشريعة في الدراسات الإسلامية -এর সঙ্গে ইসলাম গ্রন্থদ্বয়ের সমন্বয়ে রচিত। ড. তহা হোসাইন ও আহমাদ আমিন ও ড. তহা হোসাইন ও আহমাদ আমিনের মত তিনিও আপন পাশ্চাত্যের উসতাদদের মতামতকে নিজের মতামত হিসেবে চালিয়ে দেন। তাদের নাম উল্লেখ করেন না।
আমি যতটুকু জানি ড. আলি হাসান আবদুল কাদির বর্তমানে ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। তার সাথে একটি ঘটনা ঘটেছিল, যা প্রসঙ্গত এখানে উল্লেখ করা ভাল মনে করছি। এতে রয়েছে এক বিশেষ উপদেশ। এই ঘটনার কারণেই পরবর্তীতে السنة ومكانتها في التشريع الاسلامی ঘটনা বর্ণনা করার আগে আমি তার অনুগ্রহ, চারিত্রিক ভাল শিষ্টাচার প্রভৃতি স্বীকার করছি, যা সত্যিই প্রশংসনীয়।
টিকাঃ
৭০. আলি হাসান আবদুল কাদির একজন ইসলামি স্কলার। জার্মান থেকে ডক্টরেট লাভ করেন। তিনি আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিক্হ বিভাগের একজন অধ্যাপক। তার আলোচনা ও লেখালেখি ওরিয়েন্টালিস্টদের মতামত দিয়ে পূর্ণ থাকত। প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের তিনি উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করতেন। পরবর্তীতে অধ্যপনার জন্য তিনি লন্ডন চলে যান।
৭১. গোল্ড যিহার, তিনি হাঙ্গেরির ওরিয়েন্টালিস্ট। ২২ জুন ১৮৫০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। মৃত্যু ১৩ নভেম্বর ১৯২১। তিনি বোদাপেস্ট, বার্লিন, লিবজিগ ও লেইডেন ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়ন করেন। পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন দেশে অধ্যাপনার কাজ করেন। অবশেষে ব্রিটেনে স্থায়ীভাবে বসবাস করা শুরু করেন। আমাদের এ বইয়ে বহুবার তার আলোচনা আসবে। এই প্রাচ্যবিদ অনেক প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের হাতে খড়ি দিয়েছেন। তার উপস্থাপিত ভুল তথ্য দিয়ে অতীত ও বর্তমানের প্রাচ্যীয় পণ্ডিতগণ ইসলাম সম্পর্কে বিষোদ্গার করছেন। অবশ্য অনেক প্রাচ্যবিদ এখন আর গোল্ড যিহারের সমালোচনা গ্রহণ করেন না বলে দাবি করছেন। তাদের মতেও গোল্ড যিহার সত্যিকারের ন্যায়-নীতিবান সমালোচক ছিলেন না।
৭২. Muhammedanische Studies Halle Ges Islamic Intreduction to Thecnology and law
📄 জার্মানে অধ্যয়নকালে ইসলাম বুঝেছেন
১৯৩৯ সালে আমরা যখন কুল্লিয়ায়ে শারইয়্যাহ-এর ফিকহ, মূলনীতি ও আইনের ইতিহাস বিষয়ে দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে অনার্স করছিলাম ঘটনাটি তখনকার ছিল। শাইখ আল-মারাগি রহ.৭৩ এর যামানা; তখন ড. আলি হাসান আবদুল কাদেরকে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। তিনি আমাদের ইসলামি আইনের ক্লাস নিতেন। তিনি নগদে জার্মান হতে অধ্যয়ন শেষ করেছেন। তার অধ্যাপনার বিভাগটি ইতিহাসের ধর্মতত্ত্ব অনুষদের মতই। তিনি সেখানে চার বছর ছিলেন এবং দর্শনে ডক্টরেট অর্জন করেছেন।
তিনি আমাদের প্রথম যে ক্লাসটি নিয়েছেন তার সূচনা করেছেন এভাবে—ইসলামি আইনের ইতিহাস বিশ্লেষণে আজ আমি তোমাদের লেকচার দিব, তবে একটু ভিন্ন রকম। এমন গবেষণামূলক ভঙ্গিতে যা আযহারের যুগে কোন দিন হয়নি। আমি তোমাদের কাছে স্বীকার করছি, আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে চৌদ্দ বছর লেখাপড়া করেছি। অথচ ইসলাম বুঝতে সক্ষম হইনি, তবে জার্মানিতে অধ্যয়নকালে আমি ইসলামকে প্রকৃত অর্থে বুঝতে পেরেছি।
তার এ ধরনের বক্তব্যে আমি হতবাক হলাম। আমরা তখন ছাত্র। আমরা পরস্পর বলাবলি করতে লাগলাম তাহলে তো ভালই, যদি বিষয়টি সত্যিই হয়ে থাকে, তবে অবশ্যই আমরা অধ্যাপকের কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনবো; হতে পারে তিনি উল্লেখযোগ্য ও মান সম্পন্ন এমন কোনো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেছেন, যা তিনি আমাদের ইসলাম সম্পর্কে শিক্ষা প্রদান করবেন, আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে যা অনুপস্থিত।
তার সম্মুখে থাকা বড় একটি গ্রন্থের অনুবাদ করে হাদিসে নববির প্রসঙ্গে ক্লাসের সূচনা করলেন। পরবর্তীতে আমরা জানতে পারি এটি গোল্ড যিহারের রচিত গ্রন্থ। ৭৪ তিনি এই বই এর কথাগুলোই নকল করতেন। আর বলতেন, এটাই প্রকৃত গবেষণাধর্মী জ্ঞান। তার ক্লাস এভাবে চলতে থাকে। আমরা ছাত্ররা কোনো কোনো বিষয় তার সাথে বিতর্কে জড়াতাম যে, এটা সঠিক নয়। আর তিনি স্বভাবতই গোল্ড যিহারের বই-এর বর্ণিত কোনো বিষয়ের বিরোধিতা করতে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করতেন।
টিকাঃ
৭৩. শায়খ আল-মারাগী রহ. এর পূর্ণাঙ্গ নাম হলো, মুহাম্মাদ মুসতাফা ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল মুনয়িম আলা-মারাগী আল-হোমাইনী। জন্ম ১৮৮১ সালে এবং মৃত্যু ১৯৪৫ সালে। তিনি আযহার ইউভার্সিটি থেকে লেখা-পড়া সম্পন্ন করেন এবং মিসরের ইসলামি শরিয়ার কাযি হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। শায়খুল আযহারের দায়িত্ব প্রথম বার গ্রহণ করেন ১৯২৮ সালে। ১৯৩০ সালে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পুনরায় তিনি ১৯৩৫ সাল থেকে আমৃত্যু ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত এ দায়িত্বে অধিষ্ঠিত ছিলেন।
📄 ইমাম যুহরি জাল হাদিস তৈরি করতেন
একদিন তাঁর ক্লাসের পাঠ ইমাম যুহরি রহ.৭৫ এর হাদিস ও উমাইয়া খলিফাদের জন্য হাদিস জাল করার অপবাদ প্রসঙ্গে চলতে থাকল। আমি ইমাম যুহরি রহ. সম্পর্কে স্বীয় তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে বিতর্কে জড়ালাম। ইমাম যুহরি রহ. ছিলেন হাদিসের ইমাম, ওলামাদের নিকট নির্ভরশীল ও নির্ভরযোগ্য। তিনি তার মতকে প্রত্যাহার করলেন না; বরং তিনি ইমাম যুহরি রহ. সম্পর্কে গোল্ড যিহারের বক্তব্যকে পূর্ণাঙ্গ অনুবাদ করে তার থেকে নেয়ার জন্য আমাকে উদ্বুদ্ধ করলেন। নিজের হাতে দু'পৃষ্ঠাব্যাপী আলোচনা আমার জন্য অনুবাদ করেন।
অন্যদিকে সাধারণ লাব্রেরিগুলোতে আমি ইমাম যুহরি রহ. এর প্রকৃত জীবনী অনুসন্ধানের জন্য যাওয়া-আসা শুরু করলাম। আমি আযহার লাইব্রেরি ও দারুল কুতুবিল মিসরিয়ার জীবনী সংক্রান্ত কোনো পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করা বাকি রাখিনি এবং তাতে ইমাম যুহরি রহ. সম্পর্কে যত বিষয় আছে সব সংকলন করেছি। এভাবে ভার্সিটির ক্লাস শেষ করে ধারাবাহিক তিন মাস গভীর রাত পর্যন্ত এই কাজে ডুবে থাকি।
আমি জ্ঞানগর্ভ, বিশুদ্ধ তথ্য-উপাত্ত একত্র করে আমাদের অধ্যাপক ড. আবদুল কাদেরকে বললাম আমার কাছে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, ইমাম যুহরি রহ. এর বিষয়ে পূর্ববর্তী আলেমদের বক্তব্যকে গোল্ড যিহার (Gold Ziher) পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন। তখন তিনি আমাকে বলেন, এটা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কেননা প্রাচ্যের অধ্যাপকগণ- বিশেষ করে গোল্ড যিহার একজন নীতিবান আলেম। তিনি কোনো উদ্ধৃতি বা বাক্য পরিবর্তন করবেন না। আর কোনো বিষয় বস্তুও ওলট-পালট করবেন না। (এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস)
টিকাঃ
৭৪. উক্ত গ্রন্থটি হলো, Muhammedanische Studies Haile.
৭৫. আবু বকর আল-মাদানি মুহাম্মাদ ইবনে মুসলিম ইবনে উবাইদুল্লাহ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে শিহাব ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আল-হারেস ইবনে যুহর ইবনে কিলাব ইবনে লুয়াই। তার বংশধারা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধারার সাথে মিলিত হয়েছে। তিনি ৫৮ হিজরিতে জন্ম গ্রহণ করেন। একই বছরে উম্মুল মুমিনিন আয়েশা সিদ্দিকা রাদিয়াল্লাহু আনহার ওফাত হয়। ইমাম যুহরি থেকে প্রায় ২২০০ হাদিস বর্ণিত রয়েছে। তিনি আনাস ইবনে মালেক ও সাহল ইবনে সাআদ রাদি, এর সংস্রব লাভ করেন। এছাড়া সাত ফকিহের থেকেও ইসলামি জ্ঞান অর্জন করেন। -ইমাম আহমাদ ইবনে হামবল বলেন, ইমাম যুহরি রহ. এর সূত্রে সালেম ইবনে আবদুল্লাহ আন আবিহির বর্ণনাটি অধিক বিশুদ্ধ। তার থেকে আবান ইবনে সালেহ, রাবিয়া ইবনে আবি আবদুর রহমান, যায়েদ ইবনে আসলাম, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা, সালেহ ইবনে কিসান, আবদুল্লাহ ইবনে দিনার ও আতা ইবনে আবি রাবাহ প্রমুখ হাদিস বর্ণনা করেন। ঐতিহাসিকদের মতে বাহাত্তর বছর বয়সে তিনি ১২৪ হিজরিতে ইনতেকাল করেন।
📄 হিদায়া ইসলামিয়া পরিষদের সভা ও ড. আবদুল কাদিরের ভুল স্বীকার
তখন আমি হিদায়া ইসলামিয়া পরিষদের (এটি পুরাতন আবিদিন ভবনের নিকটে ছিল) মাধ্যমে এ বিষয়ে একটি লেকচারের আয়োজন করার দৃঢ় সংকল্প করলাম। পরিষদ দফতর দাওয়াতপত্রের মাধ্যমে এই লেকচারের জন্য আযহারের আলেমদের ও শিক্ষার্থীদের পত্র পাঠাল। সেদিন ছাত্র- শিক্ষকদের একটি বড় অংশ সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে আমাদের অধ্যাপক ড. আবদুল কাদেরও ছিলেন। এ লেকচার তার উপস্থিতিটা এবং তার মতামত প্রকাশ করাটা বিশেষভাবে কাম্য ছিল। তিনি উপস্থিত হয়ে কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ করেছেন।
ইমাম যুহরি রহ. সম্পর্কে গোল্ড যিহার যা বলেছেন তা ঘিরেই আমি বক্তব্য রেখেছি। সমাপ্তি টেনেছি এই বলে— এ বিষয়ে এটাই আমার সিদ্ধান্ত। আর এটাই ইমাম যুহরি রহ. সম্পর্কে আমাদের বিদগ্ধ আলেমদের মতামত। যদি আমাদের সম্মানিত অধ্যাপক ড. আবদুল কাদির-এর এ ব্যাপারে কোন বিপরীত মন্তব্য থাকে (যদি তিনি আমার আলোচনায় পরিতৃপ্ত না হন) তাহলে আমাদের অনুরোধ, তিনি যেন এ ব্যাপারে আলোচনা রাখেন। ডক্টর উঠলেন— আল্লাহ তাকে হেফাজত করুন— তিনি যে আওয়াজে কথা বলেছেন তা উপস্থিত সকলে শ্রবণ করছিলেন। তিনি বলেন, আমি স্বীকার করছি, আমি এর আগে ইমাম যুহরি রহ.-কে জানতাম না। এখন আমি তাকে চিনতে পারলাম। আর তুমি যা আলোকপাত করেছ তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। এর পর সভা শেষ হলো।