📄 গ্রন্থকারের ভূমিকা
بسم الله الرحمن الرحيم
প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের প্রতি উদার দৃষ্টি ঠিক নয়
প্রাচ্যীয় পণ্ডিত ও তাদের অধ্যয়ন এমন এক আলোচিত বিষয়, যার ব্যাপারে প্রকৃত ইসলামি গবেষকদের তেমন কেউ ব্যাপকহারে প্রাথমিক ইতিহাস, লক্ষ-উদ্দেশ্য, ভাল-মন্দ, নানা গ্রুপ, ক্রিয়া-কর্ম, (যে সকল গবেষণায় তারা সফলতা অর্জন করেছেন, আর যে সকল গবেষণায় তারা বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন এবং আপন বিষয়, আলোচনা ও সংকলনে ভ্রান্তি প্রকাশ করেছেন) প্রভৃতি নিয়ে গবেষণা করেননি।
তবে যারা এ বিষয়ে লিখেছেন তাদের আলোচনা প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের অনর্থক উচ্ছ্বসিত প্রশংসা হতে খালি নয়। যেমন: অধ্যাপক নাজিব আকিকির 'আল-মুসতাশরিকুন' বইটি। আর কতিপয় লেখক খুব সংক্ষিপ্তভাবে তাদের মিশনারি ও ঔপনিবেশিক তৎপরতা সম্পর্কে ধারণা প্রদান করেছেন।
তবে প্রাচ্যীয় পণ্ডিত ও তাদের বিকৃত গবেষণার প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানী যথার্থ মূল্যবান আলোচনা করেছেন আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব, ইসলামি সংস্কৃতি ও সভ্যতা বিভাগের মহাপরিচালক ড. মুহাম্মাদ আল-বাহি রহ.৬৭। একদা তিনি আযহারের এক সেমিনারকক্ষে উক্ত বিষয়ে আলোচনা পেশ করেন।
📄 প্রাচ্য পণ্ডিতদের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক সীমালঙ্ঘনের নামান্তর
প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের গবেষণার প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক সীমালঙ্ঘনের নামান্তর। এ প্রবণতা তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে বিদ্বেষ পোষণ করতে ও তার প্রচার করতে। আহমাদ ফানরেস শাদইয়াক তার গ্রন্থ যাইলুল ফারিয়া-তে বলেন, এই সকল প্রাচ্যীয় পণ্ডিত কোন শায়খের কাছ থেকে ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা করেন নাই। ধর্মীয় ব্যাপারে তারা অনধিকার চর্চা করছেন। এ ব্যাপারে তারা লাফিয়ে লাফিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন।
কেউ যদি ধর্মীয় ব্যাপারে সামান্য কোনো জ্ঞান চর্চা করেনও, তবে তা অবশ্যই মিশনারি পাদ্রীদের কাছ থেকে করেছেন। এসব পাদ্রীগণ মাথায় কল্পিত, ভ্রান্ত চিন্তা অনুপ্রবেশ ঘটান। সেভাবে আমি কিছু জানতে পেরেছি অথচ সে কিছুই জানে না। তাদের কেউ যদি প্রাচ্যের কোন একটি ভাষায় ক্লাস করায় অথবা কিছু অনুবাদ করে, তবে তা অন্ধকারে পথ চলার মত। কোথাও যদি কোনো সন্দেহ দেখা দেয়, তা হলে তাদের নিজেদের ইচ্ছে মতো জোড়াতালি দেয়া শুরু করেন। যেখানে সন্দেহ ও বিশ্বাস উভয়টা নিয়ে দোদুল্যমান থাকেন। শেষ পর্যন্ত তারা একটা অনুমান করেন অথবা ধারণা করেন। পরে প্রত্যাখ্যাত বিষয়কে প্রাধান্য দেয় এবং অনুত্তমকে উত্তম বানায়।
প্রকৃত কথা হলো, প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের ইসলামি বিষয়গুলোর উপর গবেষণা করার ক্ষেত্রে তাদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করা অথবা অনর্থক বিদ্বেষ পোষণ করা কোনটাই সত্যের মানদণ্ডে ঠিক নয়। আর আমরা এমন এক মুসলিম জাতি, যাদেরকে ধর্মীয় ব্যাপারে ন্যায়-নীতি অবলম্বন করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এমনকি পরম শত্রুর সাথেও।
আল্লাহর বাণী- وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ أَنْ صَلُّوكُمْ عَنِ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ أَنْ تَعْتَدُوا وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَى وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ شَدِيدُ الْعِقَابِ
আর কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদের যেন অন্যায় করতে উদ্বুদ্ধ না করে। তোমরা ইনসাফ কর, কেননা এটাই খোদাভীতির অধিক উপযোগী ও নিকটবর্তী।
মুসতাফা আস-সিবায়ি
📄 প্রাচ্য পণ্ডিতদের ইতিহাস
সুনির্দিষ্টভাবে কেউ জানে না সর্বপ্রথম প্রাচ্যের কোন লোকটি ইসলামি বিষয়গুলো অধ্যয়ন করেছেন এবং এ-ও জানা নেই তা কখন শুরু হয়েছিল, তবে একথা তো জোর দিয়ে বলা যায়, কতিপয় পশ্চিমা ধর্মযাজক স্পেনের গৌরবময় সোনালি যুগে সেখানে আসেন। তখনকার সে-সব মাদরাসায় তারা সুশিক্ষা, সভ্যতার জ্ঞান লাভ করেন। তারা কুরআনুল কারিম ও আরবিভাষার ধর্মীয় অনেক গ্রন্থ নিজ ভাষায় অনুবাদ করেন। তারা মুসলিম বিদগ্ধ আলেমদের ছাত্রত্ব গ্রহণ করে জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায় পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। এ শাখার অন্যতম হলো দর্শন, চিকিৎসা ও গণিতশাস্ত্র।
তাদের প্রথম ব্যক্তি হলেন ফ্রান্সের Jerbert, যিনি ৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে রোমে অবস্থান করার জন্য একটি জায়গা নির্ধারণ করেন। তিনি স্পেনের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দীক্ষা লাভ করেন এবং পরবর্তীতে নিজ দেশে ফিরে যান। Pierrele Aènèrè 1092-1156 এবং Gerard de Grèmone 1114-1187 খ্রিস্টাব্দে আসেন।
তারা নিজ দিশে ফিরে যাবার পর আরবসভ্যতার ও আরব মহাজ্ঞানী আলেমদের প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমূহের প্রচার-প্রসার করতে থাকেন। তারপর তারা আরবদের মাদরাসার মতো শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি প্রস্তর করেন। বিভিন্ন গবেষণাকেন্দ্র আর একাডেমিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে, তারা আরবদের গ্রন্থগুলো ল্যাটিন ভাষায় অনুবাদ করে পাঠদান শুরু করলেন।
তখনকার সময় ল্যাটিন ভাষায়ই ছিল ইউরোপের একমাত্র ভাষা। প্রাচ্যীয় তৎকালীন ভার্সিটিগুলো আরবদের গ্রন্থের ওপর নির্ভর করে স্থায়ীত্ব পেয়ে গেল। ছয় শতাব্দি পর্যন্ত অধ্যয়নের জন্য আরবি গ্রন্থগুলোই উৎসমূল হিসেবে পরিগণিত হত। এ দীর্ঘ সময় এমন কোন মুহূর্ত অতিবাহিত হয়নি যখন মানুষ ইসলাম, আরবিভাষা, কুরআন অনুবাদ, কতিপয় গবেষণালব্ধ আরবিগ্রন্থ ও সাহিত্যের বই পাঠ গ্রহণ করেনি।
এভাবে চলে আসে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ। এ সময় ইসলামি বিশ্বের ওপর ইউরোপ ও পাশ্চাত্যগোষ্ঠী ঔনিবেশিকতা ও সম্পদ-সম্পত্তির ওপর আগ্রাসন সূচনা করে। তখন পাশ্চাত্যের বড় এক জামাত ইসলামি বিষয়গুলো অধ্যয়নে বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করে। এ লক্ষ্যে পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে নানা পত্র-পত্রিকা প্রকাশ করতে থাকে। আরবি ও ইসলামি দেশগুলোর আরবি পাণ্ডুলিপিগুলোতে তারা পরিবর্তন সাধন করেন। তারা অজ্ঞ ও মুর্খ আরবদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করে। অথবা গোলযোগপূর্ণ প্রত্যন্ত অঞ্চল হতে সাধারণ লাইব্রেরি পাণ্ডুলিপি তারা চুরি করতো। এগুলো তারা নিজ দেশের লাইব্রেরিগুলোতে নিয়ে যেতো। যখন তারা আরবি পাণ্ডুলিপির এক বিশাল ও বিরল স্তূপ জমা করলেন তখন তা ইউরোপের বিভিন্ন লাইব্রেরিতে পাঠাতে থাকেন।
১৯০০ খ্রিস্টাব্দে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল দুইশ পঞ্চাশ হাজার ভলিয়ম। এ সংখ্যা বাড়তে বাড়তে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আর ১৯০০ শতাব্দীর একেবারে শেষ ভাগে ১৮৭৩ সালে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের সর্বপ্রথম কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। আর এ রকম অসংখ্য অগণিত কনফারেন্স তারা ধর্ম ও সংস্কৃতি প্রভৃতি বিষয়ে আজ অব্দি করছে।
📄 প্রাচ্য পণ্ডিতদের কর্মক্ষেত্র
প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের প্রথম পর্যায়ে অধ্যয়নের বিষয় ছিল আরবিভাষা ও ইসলাম। মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমাদের ঔপনিবেশিকতার পরিধি বৃদ্ধি পাবার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের সকল ধর্মতত্ত্ব, সংস্কৃতি, ভৌগলিক ম্যাপ, প্রসিদ্ধ ভাষা ও অনুকরণ-অনুসরণ প্রভৃতি বিষয় তারা স্টাডি করেছে। যদিও তাদের কাজের একটি অংশ জুড়ে আছে ইসলাম ধর্ম, সাহিত্য ও ইসলামি সংস্কৃতি। বর্তমানে প্রাচ্যবিদদের কাছে এটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দীনি ও রাজনৈতিক বিষয়ে দৃষ্টি রাখার জন্য তাদেরকে প্রাচ্য বিষয়ক অধ্যয়নকে উৎসাহিত করে। ৭৭
টিকাঃ
৭৭. একটু পরেই এ নিয়ে আলোচনা হবে- অনুবাদক।