📄 কেন উক্তিগুলো সংকলন করলাম?
যে কোনো পাঠক প্রশ্ন করতে পারেন, কেন আমরা প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের উক্তিগুলো সংকলন করলাম। এর উত্তরে আমরা কারণ হিসাবে বলবো—
১. অনেকে হয়তো বলবেন, কেন আমরা প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের সমালোচনা করছি এবং কেনই-বা তাদের গবেষণাকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছি। এগুলো শুধু শুধু করছি। আমাদের হাতে কোন ডকুমেন্ট নেই। তথ্য ছাড়াই আমরা সমালোচনায় লিপ্ত। আমরা তাদেরকে জানাতে চাচ্ছি, দেখুন তারা কেন ইসলাম নিয়ে গবেষণা করতেন। বিদ্বেষ ছড়ানোই ছিল তাদের গবেষণার মূল টার্গেট। সত্যকে মিথ্যা আর মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়াই ছিল তাদের ভ্রান্ত গবেষণার আসল চেহারা। উপর্যুক্ত উক্তিগুলো থেকে এ কথাই প্রতীয়মান হয়।
২. প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের গবেষণায় সত্যকে কতটা আড়াল করে রাখা হয়েছে তা সাধারণ পাঠকমাত্রই বুঝে আসবে।
৩. আর আমাদের দেশের আধুনিকমনা, অবান্তর প্রগতিবাদী ও ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞানহীন ধর্মান্ধরা যে প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের ভ্রান্ত গবেষণার ফলাফল দিয়ে ইসলামের উপর আঘাত করে, তা যেন স্পষ্ট হয়ে যায়। কারণ, তাদের দাবি আর প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের দাবি একই। সমালোচনার ধরনও একই। তাই ঐসব অর্থহীন প্রগতিবাদী ও ধর্মহীন ধর্মান্ধবাদীদের ব্যাপারে সাবধান থাকুন।
৪. ইসলামি গবেষণা দেখলেই তা যাচাই-বাছাই ছাড়া গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন। কারণ, এখানে উল্লিখিত অনেক প্রাচ্যীয় পণ্ডিতই ইসলাম নিয়ে গবেষণা করে তাফসির, হাদিসের ইতিহাস ও ব্যাখ্যাগ্রন্থ, আকিদা-বিশ্বাস ও ইসলামি ইতিহাস নিয়ে বই রচনা করেছেন। এসব গ্রন্থগুলোতে ইসলামের লেবেল লাগিয়ে দিয়ে ইসলাম বিরুধী আলোচনা-সমালোচনার অনুপ্রবেশ ঘটানো হয়েছে। পাঠকের কাছে ইসলামকে মূল্যহীন ও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
৫. সমালোচনার হোতাদের চিহ্নিত করার জন্য আমরা উক্তিগুলো সংকলন করেছি, যাতে করে পাঠকগণ তাদের ব্যাপারে সর্তক থাকেন।
৬. পাঠকের সামনে যেন স্পষ্ট হয়ে যায় এসব সমালোচক কুরআন, হাদিস, ইসলামি আইন, ইসলামি ইতিহাস, আকিদা, সাহাবি, আরবিভাষা ও ইসলামের অনুসারীদের নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক সমালোচনায় লিপ্ত। তাদের উদ্দেশ্যও স্পষ্ট; আর তা হলো ইসলামকে একটি প্রশ্নবিদ্ধ ধর্ম ও জীবনব্যবস্থা হিসাবে অগ্রহণীয় করে তোলা।
আমরা এ বইয়ের কলেবর বৃদ্ধির আশঙ্কায় প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের ঠুনকো ও খোঁড়া যুক্তি-তর্কের কোন উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি। তাদের আলোচনাগুলো একেবারে ভিত্তিহীন ও দলিল-প্রমাণহীন। তারা যে সমালোচনা করেছেন তা কোন গঠনগত সমালোচনা নয়। সময় সাপেক্ষে আমরা সমালোচনার জবাব আলাদা সংকলন ও বই রচনা করবো ইনশাআল্লাহ।
পাঠকদের প্রতি অনুরোধ থাকল, ইসলামকে জানার জন্য আল্লাহর প্রেরিত মহাগ্রন্থ আল-কুরআন, রাসুলের মুখনিঃসৃত হাদিস ও বিশুদ্ধ বর্ণনাসূত্রে সংকলিত ইতিহাস সরাসরি মুসলিম ও ইসলামের প্রকৃত স্কলারদের লেখা থেকে পাঠ করুন। আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন।
📄 ওরিয়েন্টালিস্টদের প্রশংসনীয় উক্তি
প্রাচ্যবিদ বা ওরিয়েন্টালিস্টগণের অনেকই ইসলাম ও মুসলিমদের নিয়ে গবেষণা করেছেন। অনেকে সমালোচনা করেছেন। আপত্তি উত্থাপন করেছেন— ইসলাম, মুসলিম, নবি, রিসালাত, কুরআন, হাদিস, ফিক্হ, তারিখ, আরবিভাষা ও ইসলামি ব্যক্তিত্ব, ইমাম, মুজতাহিদ ও আলেমদের ব্যাপারে। মিথ্যাশ্রয়ী হয়ে কিংবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে গবেষণার ভুলে তারা ইসলাম ও মুসলিমদের আহত করার চেষ্টা করেছেন।
পাশাপাশি প্রাচ্যবিদদের অন্য এক শ্রেণির গবেষক ও সমালোচক তুলে ধরেছেন আলাদা চিত্র ও গবেষণা পত্র। তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে ইসলাম-মুসলিমদের প্রশংসা। তারা প্রশংসা করেছেন নবি, রাসুল, কুরআন, হাদিস, ফিক্হ ও তারিখ।
ইসলামকে সর্বশেষ জীবনব্যবস্থা রূপে স্বীকার করছেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সর্বশেষ নবি হিসাবে মেনে নেওয়া ও সর্বশ্রেষ্ঠ মানব উপাধি প্রদান করেছেন।
প্রাচ্যবিদগণের মাঝে যারা সত্যকে উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং আল্লাহ তাদের জন্য হেদায়েতের দরজা খুলেছেন, তারাই ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সত্যকে প্রচার-প্রসার করার জন্য ভিন্ন আঙ্গিকে বই লিখেছেন। অন্যদেরকে সত্য গ্রহণের আহ্বান করেছেন। আমাদের বর্তমান আলোচনায় ওরিয়েন্টালিস্টদের প্রশংসনীয় কিছু উক্তি পাঠকের সামনে উল্লেখ করছি; তবে যারা রাসুল, কুরআন, হাদিস, সাহাবি, ইসলামি আইন, যুদ্ধ ও ইতিহাস প্রভৃতি নিয়ে প্রশংসনীয় মন্তব্য করেছেন তাদের সংখ্যা অগণিত। তাদের কিছু ব্যক্তি হলেন-
Arthur N. Wollaston C. I. E. (Halg Hours with Muhammad), Rev. R. Macgregor (Yorkshire Post), R. Bosworth Smith M. A. (Muhammad and Muhammedanism), Arthur Gilman (The Saracens), Ignaz Goldziher (Introduction to Islamic Theology and Law), Alfred Gulliaume (Islam), Edward Gibbon (The Decline and Fall of the Roman Empire), S. D. Goiten (Study in Islamic History and Institutions), E. H. Palmer (The Koran), A. S. Tritton (M. A. D. Litt) (Islam-Belief and Practice), N. J. Coulson (A History of Islamic Law), N. N. E. Bray (Shifting Sands), Annie Besant (The Life and Teachings of Muhammad), A. C. Bouquet (Comperative Religions), Edward A. Freeman (The History and Conquest of the Saracens), Annie Marie Schimmell (Gabriel's Wing), H. M. Hyndman (The Awakening of Asia), Bishop Boyd Carpenter (The Permanent Element in Religion), Thomas W. Arnold (The Caliphate), Thomas Carlyle (On Heroes, Hero-Worship and the Heroic in History), Tor Andrae (Mohammed), Rev. T. P. Hughes (Notes on Muhammadanism), James A. Michener (Islam:The Misunderstood Religion), G. Lindsay Johnson (F. R. C S.) (The Two World), Joseph J. Nunan (Islam and Utopean Civilization), John J. Pool (Studies in Muhammedanism), John Joseph Lake (Islam its Origin, Genius and Mission), John Devenport (An Apology for Muhammed and The Koran), John William Draper (M. D. L. L. D.) (A History of the Intellectual Development of Europe), Joseph Schacht (The Cambridge History of Islam), John Austin (Muhammad The Prophet of Allah), Charles R. Watson (What is this Moslem World?), W. Montagomery Watt (Mohammad at Mecca), D. H. Hogarth (A History of Arabia), W. M. Thomson (Democratic Readings), Duncan Black Macdonald (The Religious Attitude and Life in Islam), Robert L. Gullick (Muhammad The Educator), C. Snouk Hurgronje (Muhammedanism), Samuel M. Zwemer, F. R. G. S. (The Moslem World), Selwyn Gurney M. D. (Readings from World Religions), Stanwood Cobb (Islamic Contribution to Civilization), Stanley Lane-Poole (The speeches and Table Talk of the Prophet Muhammad), Philip K. Hitti (Islam- Away of life), Frank Ballard (Why Not Islam), Kenneth Cragg (The Call of the Minaret), Gustave Evon Grunebaum (Medieval Islam), Major Arthur Glyn Leonard (Islam-Her Moral and Spiritual Value), Maurice Gaudefroy (Muslim Institutions), Marcus Dods (Muhammed Buddha and Christ), William Muir (The Life of Muhammad), Wilson Cash (The Expansion of Islam), R. V. C. Bodley (The Messenger), Washington Irving (Mahomet and His Succssors), Von Kremer (The Orient Under the Caliphs), Hamilton A. R. Gibb (Studies on the Civilization of Islam).
যাদের নাম ও বইয়ের নাম উল্লেখ করা হলো তাদের প্রশংসনীয় উক্তি উল্লেখ করার মানে এই নয় যে, তারা সর্বদাই ইসলামে সম্পর্কে ভাল মন্তব্য করবেন; বরং একই ব্যক্তি অন্য কোন বইয়ে ইসলাম সম্পর্কে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। ইসলাম, নবি ও কুরআন-হাদিস নিয়ে ভ্রান্ত সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছেন। তাই প্রশংসাকারীদের তালিকায় নাম আসলেই তারা একেবারে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন হয়ে যান না।
সাথে সাথে পাঠকদের আমরা এ মেসেজও দিচ্ছি, যদি সৎ উদ্দেশ্য থাকে আর সত্য গ্রহণ করার ইচ্ছা থাকে, তাহলে একজন নিঃস্বার্থ গবেষক ইসলাম সম্পর্কে এমন মন্তব্য করতে বাধ্য হবেন— এটাই স্বাভাবিক।
১. Wolfgang Goeth Johann (1749-1832 খ্রি.) বলেন, আমি ইতিহাসে সর্বোৎকৃষ্ট ব্যক্তির অনুসন্ধান করছিলাম। অবশেষে আরবের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সেই বিশেষ গুণে বিশেষিত পেলাম। ৪০ একই প্রাচ্যীয় পণ্ডিত অন্যত্র বলেন, আমরা ইউরোপীয়ানরা আমাদের সকল বুদ্ধি-জ্ঞান দিয়ে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সমপর্যায়ে পৌঁছাতে সক্ষম হইনি। ৪১
২. Gustave Le Bon বলেন, যদি কর্মের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি নির্ধারণ করা হয়, তবে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি। পাশ্চাত্যে অনেকে এখন তাঁর ব্যাপারে ইনসাফপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি দেওয়া শুরু করেছেন; তবে অনেক ইতিহাসবিদ বিদ্বেষ পোষণ করার কারণে তাঁর অসামান্য অবদান স্বীকার করছে না। ৪২
৩. কার্ল মার্কস বলেন, জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিমাত্রই তাঁর নবি হওয়াকে স্বীকার করে। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পৃথিবীর বুকে রাসুল হিসাবে প্রেরিত হয়েছেন। ৪৩
৪. ইন্ডিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহারলাল নেহেরু (১৮৮৯-১৯৬৪ খ্রি.) বলেন, ইসলামের নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রকার উন্নত চরিত্রের চূড়ান্ত সীমায় উপনীত হয়েছেন। আমরা তাঁকে সকল কল্যাণের কাজে অনুসরণীয় হিসাবে স্বীকার করি। তিনি বিশ্বকে প্রকৃত ইসলামের মাধ্যমে পরিচালিত করতে সক্ষম হয়েছেন। ৪৪
৫. আমেরিকান প্রাচ্যবিদ ওয়াশিংটন ব্রিং বলেন, রাসুল ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী। তিনি বাসার লোকদেরকে সালাম ও সম্মান না জানিয়ে প্রবেশ করাকে অপছন্দ করতেন। ৪৫
৬. Thamas Carlyle (১৭৯৫-১৮৮১ খ্রি.) বলেন, আল্লাহর শপথ করে বলছি, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অত্যন্ত ভালবাসি। কারণ, তিনি লোক দেখান এবং লৌকিকতাহীন একজন মানুষ ছিলেন।
তিনি অন্যত্র বলেন, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক আলোকবর্তিকা। সেই আলোই পৃথিবীকে আলোকিত করেছে। ৪৬
৭. মাইকেল হার্ট বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ইতিহাসের বরেণ্যদের মাঝে প্রথমে আনার কারণে পাঠক হয়তো অবাক হবেন; কিন্তু ইতিহাসে তিনিই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পার্থিব-অপার্থিব উভয় ক্ষেত্রে সমভাবে সফলতা অর্জন করেছেন। ৪৭
৮. পাদ্রী আর ম্যাকগ্রেগর বলেন, পরস্পর কলহে লিপ্ত আরবের যুদ্ধবাজ সমস্ত গোত্রে মৈত্রী স্থাপনে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এক আল্লাহর ইবাদতের সূত্রে তাদেরকে গেঁথে দিতে সফলতা তাঁর হস্ত চুম্বন করে। রাসুল হিসাবে এই ঐতিহাসিক অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় ও বরণীয়। তাঁর এই অবিশ্বাস্য সফলতায় আমরা মুগ্ধ, অবাক। আমাদের মনে তাঁর প্রশংসার ঢেউ আছড়ে পড়ছে।
তিনি আজীবন ক্ষুৎ-পিপাসার সাথে লড়েছেন। এতে তিনি সীমাহীন ধৈর্যের অবিচল পাহাড় হওয়ার যে পরিচয় দিয়েছেন, তা কারো অজানা নয়। মদপান এবং নগ্নতার পরিবেশকে চির উৎখাত করে নিঃসন্দেহে তিনি আরবদেরকে মানবতার মাপকাঠিতে শ্রেষ্ঠ জাতিতে পরিণত করে দিয়েছিলেন। ৪৮
৯. আর বসওয়ার্থ স্মিথ এম. এ. বলেন, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্যায়ের মূলোৎপাটন করেছেন, অপরাধ দমনে যুগান্তকারী ভূমিকা রেখেছেন। এমন না করলে আরব এবং তার প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে মানবাধিকার লঙ্ঘন, শিশুহত্যা, কন্যাসন্তান হলে জীবন্ত দাফন, গৃহযুদ্ধে মেতে থাকা, যত ইচ্ছা বিবাহ করতে থাকা, কৃতদাসদের উপর সীমাহীন নির্যাতন চালানো, জুয়াতে মত্ত এবং মদে মাতাল থাকা ইত্যাদি হেরাচরিত অপরাধ চলতেই থাকত।৪৯
১০. আর্থার গিলম্যান বলেন, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বাধিক প্রশংসার পাত্র। কারণ, মক্কা বিজয়ের পর তিনি শত্রুদের প্রাণ ওষ্ঠাগত করা বিগত সমস্ত নির্যাতন মাটি চাপা দিয়ে সব ভুলে গিয়েছিলেন। সব শত্রু হাতের মুঠোয় আসার পরও প্রতিশোধের আগুন দাউ দাউ করে মোটেই জ্বলে উঠতে দেননি, যেটা সচরাচর অন্যদের ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। আরো এক ধাপ এগিয়ে তিনি নিজের লশকরদেরকে যে কোন মূল্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত না হতে আদেশ জারি করেন। এতে রেকর্ড সৃষ্টির জগতে তিনি এক অভাবনীয় অধ্যায়ের সূচনা করেন। অন্য বিজয়ীদের ন্যায় দাম্ভিকতার পরিবর্তে সীমাহীন উদারতা ও বিনয়ের বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। সাথে সাথে আল্লাহ তায়ালার অশেষ মেহেরবানির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে বিভোর থাকেন। ৫০
১১. এন. এন. ই. ব্রে বলেন, মধ্যআফ্রিকার বাসিন্দা, নগ্ন জঙ্গলে জীবনযাপনকারী হজের সময় সাদা পোশাকে আবৃত। হিন্দুস্তানী শাহজাদাও শাহী রেশমী পোশাকের পরিবর্তে ঐ একই সাদা পোশাকে আবৃত। এভাবে তারা আল্লাহর দৃষ্টিতে সমান হয়ে যায়। মক্কাতে তারা শুধু মুহাম্মাদী ভ্রাতৃত্বের আলোকে সম্বিলিত হয়। তারা তথায় পরস্পর মতবিনিময় করে। মুসলিম বিশ্বে উদ্ভব নানা সমস্যা নিয়ে তথায় তারা পর্যালোচনা করতে থাকে। হজ পালন শেষে তারা নিজ নিজ গন্তব্যস্থলে ফিরলে তাদের আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, এলাকাবাসী সবাই তাদের নিকট সমবেত হয়, যাতে তারা হাজিদের থেকে তাদের অভিজ্ঞতা এবং সুবিধা-অসুবিধার বিস্তারিত বিবরণ জানতে পারে। মতবিনিময় এবং প্রচার-প্রসারের জন্য এই অভিনব পদ্ধতির সামনে ইউরোপের সুপরিকল্পিত প্রোপাগান্ডা তেমন প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় না। ৫১
১২. এ. সি. বোকে বলেন, পতনশীল রোম সাম্রাজ্যের তুলনায় হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুবিশাল মধ্যপ্রাচ্যে নিজের অনুসারীদের মধ্যে অধিক সুষ্ঠু ও সুসংহত, অভিনব এবং অধিক বলিষ্ঠ রাজনীতি ও সমাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে সফল হয়েছিলেন। ৫২
১৩. এনি মেরি শিমেল বলেন, এ সত্যকে অকপটে স্বীকার করতে হয় যে, মধ্যযুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত ইউরোপের বিতর্কিত বই-পুস্তক, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ এবং সাহিত্য সমালোচনাতে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শ ও চরিত্রকে সম্পূর্ণ বিকৃত করে তোলা হয়েছে। তাঁর এবং তাঁর মিশনকে ইনসাফের সাথে তুলে ধরতে অমুসলিম বিশ্বের কয়েক শতাব্দী লেগেছে। মুসলমানদের ধর্মীয় জীবন পদ্ধতি বুঝতে শুধু এই অপচিন্তধারাই অমুসলিম জ্ঞান পিপাসু এবং মনীষীদেরকে অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখেছে। ফলে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামি রাষ্ট্রে যে সুমহান মর্যাদার অধিকারী ছিলেন, মধ্যম পর্যায়ের ইউরোপীয় প্রাচ্যবিদগণ তা থেকে সম্পূর্ণ অজ্ঞ। ৫৩
১৪. কুফরের আবাসস্থল আরবে ইসলাম ধর্ম সম্পূর্ণভাবে এক নতুন মতবাদরূপে আত্মপ্রকাশ করে। এই দুই সমাজব্যবস্থা পরস্পর সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়ায় উভয়ের মাঝে আসমান-জমিনের দূরত্ব ছিল। এ কথাগুলোর কোনটাই ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না। আরব জগতে ইসলামের জয়যাত্রা এবং প্রতিষ্ঠার ফলে সেখান থেকে পশুত্ব, বর্বরতা উৎখাত হয়েছিল, মানবাধিকার লঙ্ঘন নির্মূল হয়েছিল। শুধু এই মহান বিষয়গুলো স্বর্ণাক্ষরে উল্লেখ করলেই তার অবদান শেষ হয় না; বরং ইসলাম তো পূর্বের সমস্ত জীবনব্যবস্থাই পাল্টে দিয়ে তাদের মাঝে এক নতুন জীবনের সূচনা করেছিল। তৎকালীন অন্ধকারাচ্ছন্ন পরিবেশে এই নতুন সমাজব্যবস্থার যতই প্রয়োজন থাকুন না কেন, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময়ের সমাজব্যবস্থা কিছুতেই তা মেনে নেয়ার জন্য প্রস্তুত ছিল না। ৫৪
১৫. এফ. আর সি. এস জি. লিন্ডসে জনসন বলেন, অধিকাংশ খ্রিস্টান ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে অজ্ঞতা প্রকাশ করে থাকে। এটা খুবই মারাত্মক। তারা এই বাস্তবকে প্রকাশ করতে চায় না যে, যে ধর্মকে মানবজাতির একটা বিশেষ অংশ গ্রহণ করে নিজেদের জীবনযাত্রার প্রত্যেক স্তরে বাস্তবায়ন করেছে, নিঃসন্দেহে তাতে অসংখ্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকবে। আর তার বুনিয়াদ অত্যন্ত মজবুত, এতেও কোন সন্দেহ নেই। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের আদর্শ গড়ার বুনিয়াদ যে ধর্ম, সেই ধর্মপ্রাসাদের বুনিয়াদ অত্যন্ত মজবুত হওয়ার বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করা পাগলের প্রলাপ ছাড়া অন্য কিছুই নয়। খ্রিস্টানরা কুরআন সম্বন্ধে আমাদেরকে এমন অনেক অনেক অহেতুক কথায় বিশ্বাসী বানাতে চেষ্টা করেছে, যেগুলি হযরত মুহাম্মাদ কখনো বলেননি। এমনকি ঐ সমস্ত ভিত্তিহীন কথা কুরআনের কোন নির্ভুল তরজমাতেও পাওয়া যায় না। ৫৫
১৬. জন জোসেফ লেক বলেন, এটা একটা অভাবনীয় বাস্তবতা যে, গোলামীর শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ায় বাকি বিশ্বের যখন শ্বাসরুদ্ধ হয়ে উঠেছিল, ঠিক তখনই ইসলামি বিশ্বে ছিল সাম্য, ভ্রাতৃত্ব এবং স্বাধীনতা। তখন কোন মুসলমানের পক্ষে অন্য মুসলমানকে নিজের গোলাম বানানো কিছুতেই সম্ভব ছিল না। যুদ্ধবন্ধী অমুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ করলেই মূলত তারা স্বাধীন হয়ে যেত। শুধু এটাই নয়, বরং বর্ণ ভেদাভেদ সত্ত্বেও তারা নৈতিকতা এবং কাজে অন্যান্য মুসলমানের ন্যায় সমান সমান হয়ে যেত। ৫৬
১৭. রবার্ট এল গাল্লিক বলেন, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আধুনিক বিশ্বের সেই সমস্ত সংস্কারকদের তুলনায় শিক্ষাগুরু হিসাবে অধিক পূর্ণ ছিলেন, যাদের স্বাধীন শিক্ষা ইউরোপের গৃহযুদ্ধের সময় যুদ্ধ এবং জুলুম রুখে দিতে সক্ষম ছিল না।
তিনি একই বইয়ের অন্যত্র বলেন, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সর্বপ্রথম ঐশী প্রত্যাদেশ বা অহি হয়— 'পড়ুন'। তিনি বলেন, আমি পড়তে সক্ষম নই। ব্যক্তি বা সমাজের জন্য তাঁর দিক-নির্দেশনা অর্জিত শিক্ষার ফল ছিল না। কেননা, আজ পর্যন্ত কোন ব্যক্তি এমন কোন প্রামাণ্য তথ্য পেশ করতে সক্ষম হয়নি— কুরআনের কোন একটি সুরা সপ্তম শতাব্দীর কোন আরবিয় ব্যক্তির লিখিত। বাইবেলের ভাষ্য অনুযায়ী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ প্রবৃত্তির দাসত্বে কখনো কিছুই বলতেন না। কেননা তাঁর বাণী সরাসরি অহি হত। ৫৭
১৮, সি স্লোক হরগ্রোনজি বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষগণ মধ্যযুগে হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ধর্ম সম্বন্ধে যে বীভৎস আকৃতি তুলে ধরেছিল, বর্তমানে আমাদের নিকট তা একটা মহা অপবাদ এবং খুবই লজ্জাকর বলে মনে হয়।
রোমান ক্যাথলিকরা প্রটেস্টান্টদের উপর অপবাদ লাগানোর জন্য অধিকাংশ সময় দীনে মুহাম্মাদীর সাথে তুলনা করত। এ সময় ইউরোপবাসী তুর্কিদের কারণে খুব ভীত হয়েছিল। আর তুর্কিদের ক্ষমতা দখলের মূলে যে তাদের ধর্ম ছিল, এটা সবার ভালভাবে জানা ছিল। ৫৮
১৯. ক্যানেথ ক্রাগ বলেন, ক্রুসেডযুদ্ধে লড়াইকারী খ্রিস্টানদের ঐতিহাসিক পরাজয়ের তিক্ত স্মরণ এবং পরবর্তীর্তে তুর্কি উসমানি খিলাফতের সাথে পূর্ব থেকে চলে আসা তাদের বৈরিতা খ্রিস্টান জগতকে আরো তিক্ত করে তোলে। এ কারণে ইসলাম এবং পয়গামবরে ইসলামের প্রতি তিক্ততা থেকে এক জঘন্য অপবাদ প্রচার করতে শুরু করে। ৫৯
২০. হ্যামিলটন এ আর গিব বলেন, এ বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত যে, হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংস্কার নারী জাতির মর্যাদাকে বিশেষভাবে উন্নত করেছে। ৬০
২১. পাশ্চাত্যের এক বিখ্যাত স্কলার ব্রেফল্ট 'দ্য ম্যাকিং অফ হিউমানিটি' বইয়ে উদারচিত্তে স্বীকার করেন, আরবি মুসলমানগণ পাশ্চাত্যের শিক্ষা-সভ্যতার উৎকর্ষ সাধনে অভূতপূর্ব ভূমিকা রেখেছেন। তার ভাষায়- "It was not science only which brough Europe back to life. Other and manifold influences from the civilization of Islam communicated its glow European life." (p.202)
শুধু বিজ্ঞান ইউরোপকে জীবন দান করেনি, বরং ইসলামি সভ্যতার নানাবিদ প্রভাব ইউরোপের জীবনকে আলোকিত করেছে। ৬১
ইসলাম, মুসলিম, রাসুল, কুরআন, হাদিস, ইতিহাস, যুদ্ধ, ইসলামি বিধান প্রভৃতি নিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির ওরিয়েন্টালিস্টদের কিছু মন্তব্য এখানে সংকলন করেছি। এরকম অসংখ্য পজিটিভ বাণী ও সমালোচনা আমরা তাদের গবেষণায় খুঁজে পাব। পূর্বের আলোচনায় যেসব ওরিয়েন্টালিস্ট ইসলাম সম্পর্কে আপত্তি তুলেছিল, তাদের কথার জবাব পরবর্তী ওরিয়েন্টালিস্টের মাধ্যমে আমরা দিচ্ছি। তারাও তো ইসলাম, ইসলামের নবি, কুরআন-হাদিস ও আরো অন্যান্য বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছেন। তাদের ফলাফল পজিটিভ কীভাবে হলো, এটি প্রাচ্যীয় পণ্ডিতদের কাছে প্রশ্ন থেকে যায়। বিষয়টি এমনও নয় যে, পজিটিভ সমালোচনাকারীগণ মুসলিম। না, বরং তারা খ্রিস্টান বা সাধারণ গবেষক। এটাই হলো বিদ্বেষপূর্ণ আর সত্যানুসন্ধানী গবেষণার ফরাক।
প্রাচ্যবিদদের সম্পর্কে কবি ইকবালের কথাটি স্মরণীয়। তিনি ব্যাঙ্গালোরের মি. জামিলের নিকট ০৪/০৩/১৯৩০ খ্রি. এক চিঠি লিখেন। তাতে তিনি প্রাচ্যবিদদের জ্ঞানের প্রতি নিজের অনির্র্ভরতা উল্লেখ করে বলেন, I have little faith in European Oriebtalists whose book are mostly actuated either political propaganda or missionary considerations.
টিকাঃ
৩৯. প্রথমে ওরিয়েন্টালিস্টের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তারপর বন্ধনিতে তার লিখিত বইয়ের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। উল্লিখিত বইয়ে তিনি ইসলাম ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে প্রশংসা করেছেন।
৪০. আফাকে জাদিদ লিদ দাওয়াহ, লেখক আনওয়ার জুন্দي।
৪১. শামসুদ্দিন তাসতিয়াবু আলার গরাব।
৪২. হাদারাতুল আরাব, পৃ. ১১৫।
৪৩. আকওয়ালুল মুসতাশরিকিনাল গরাব, পৃ. ০২।
৪৪. প্রাগুক্ত, পৃ. ০৩।
৪৫. Life of Mohammad, page no : 302-303.
৪৬. Heroes and Hero Worship and the Heroic in History
৪৭. Ranking of the Most Influential the Persons of History.
৪৮. ইয়র্ক শায়্যার পোস্ট, ৮ জুন ১৯৯৫ ইং; পাশ্চাত্য মনীষীদের দৃষ্টিতে রাসুলে আকরাম (সা.), পৃ. ১৪। মূল, প্রফেসর শরিফ বাকা, ভাষান্তর, মুফতী শহীদুস সালাম কাসিমী, ২০০৬ ইং।
৪৯. মুহাম্মাদ এন্ড মুহাম্মডানইযম, ১২৫, লন্ডন ১৮৭৬।
৫০. আরব মুসলমান, পৃ. ১৮৪-১৮৫, লন্ডন, ১৮৮৭ ইং।
৫১. পরিবর্তনশীল মরুভূমি, পৃ.১৬, লন্ডন-১৯৩৭ইং।
৫২. বিভিন্ন ধর্মের তুলানামূলক সমীক্ষা, পৃ. ২৬৯-২৭০ লন্ডন, ১৯৫৪।
৫৩. বল জিবরিল, পৃ. ১৪৮-১৪৯, ১৯৬৩ ইং।
৫৪. তাবলিগে ইসলাম, পৃ. ৪২, লন্ডন ১৮৯৬ ইং।
৫৫. দুই দুনিয়া, ম্যানচেস্টার, ১৯৪০ ইং।
৫৬. ইসলাম ইটস ওরিজিন, জিনিয়াস এন্ড মিশন, পৃ. ৪৬ লন্ডন, ১৮৭৮ইং।
৫৭. মুহাম্মাদ দ্য এডুকেটর, ১২ লাহোর, ১৯৭৫ ইং ও প্রাগুক্ত পৃ. ৪৩, লাহোর, ১৯৭৯ ইং।
৫৮. মুহাম্মাদানিযম, পৃ. ৪-৬, ১৯১৬ ইং।
৫৯. দ্য কল অফ দ্য মিনারেট, পৃ. ১৮৭, আমেরিকা, ১৯৫৬ ইং।
৬০. মুহাম্মেডানিযম, পৃ. ৩৩, লন্ডন, ১৯৫৩ ইং।
৬১. দ্য ম্যাকিং হিউমানিটি, পৃ. ২০২।