📄 রাজনৈতিক ব্যবস্থা
ইতিহাস সাক্ষী যে, একটি সু-সংহত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিক দিয়ে ইসলামের একটি দুর্লভ ও আদর্শ যুগ অতিবাহিত হয়েছে। নিদারুণ পরিতাপের বিষয় এই যে, ইসলামের এ যুগ বেশী দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। আগামীতে আমরা এর প্রকৃত কারণ অনুধাবনের চেষ্টা করবো। কোন কোন ব্যক্তির ধারণা এই যে, এই কারণ স্বয়ং ইসলামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল প্রকৃতিতেই নিহিত রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই কারণ তার অভ্যন্তরেই নিহিত না বাইরে-তা আমরা পরে আলোচনা করবো। প্রথমে আমরা রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করবো। কেননা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সব সময় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীন এবং তার প্রকৃতির অনুসারী হয়ে থাকে।
নবী করীম (সঃ)-এর ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এলে একদিন তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে নামাজের ইমামতী করার নির্দেশ দিলেন। এতে হযরত আয়েশা (রাঃ) এই যুক্তি দেখিয়ে আপত্তি জ্ঞাপন করেন যে, আবু বকর (রাঃ) এর হৃদয় অত্যন্ত কোমল। তাই নামাজের ইমামতী করলে লোকেরা তার আওয়াজ শুনতে পাবে না, তাঁকে তার নির্দেশ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রেগে যান এবং আবু বকর (রাঃ)-কে ইমামতী করার জন্যে ডেকে আনার ওপর জোর দেন।
প্রশ্ন এই যে, এর অর্থ কি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে খলিফা নিযুক্ত করে গেছেন? মুসলমানরা কি এ দ্বারা স্পষ্টতঃ তাই বুঝেছিলেন?
আমাদের মতে এ দু'টোই নিতান্ত অযৌক্তিক কথা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যদি খলিফা নিযুক্ত করে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত করতেন এবং ইসলামে যদি খলিফা মনোনীত করার বিধানই থাকতো তাহলে তিনি যেমন ইসলামের অন্যান্য বিধি ও নীতি সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, এটাও সেরূপ করতেন। আর মুসলমানরাও যদি স্পষ্ট বুঝে থাকতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবু বকরকে খলিফা নিযুক্ত করে গেছেন-তাহলে সাকিফা নামক স্থানে মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে খলিফা নিয়ে যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় তার প্রশ্নই উঠতো না। কারণ আনসাররা কখনো রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সিদ্ধান্তে আপত্তি করার মত লোক ছিলেন না।
প্রকৃতপক্ষে খেলাফতের গোটা ব্যাপারটাকেই মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। লোকেরা পূর্ণ স্বাধীনতা ও সম্মতির সাথে খেলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি নির্বাচন করবে-এটাই ছিল উদ্দেশ্য। সাকিফায় অনুষ্ঠিত আলোচনার পর যদি এই সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে যে, খলিফা মুহাজেরদের মধ্যে থেকে হবে-তাহলে সেটা ইসলামের কোন নির্দিষ্ট বিধান ছিল না বরং মুসলমানদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত একটা সিদ্ধান্ত। আনসাররা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে তাতে কেউ আপত্তি করতে পারতো না। কিন্তু বাস্তবে যা হয়েছিল তাহলো এই যে, আনসাররা হযরত আবু বকরের খেলাফতে সম্মত হয়ে যান। কেননা তিনি অন্য সকলের চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। অবশ্য মদিনায় আওস ও খাসরাজ গোত্র আঞ্চলিকতা ভিত্তিক বিদ্বেষ উস্কিয়ে দিয়ে ব্যাপারটা ঘোলাটে করতে চেয়েছিল কিন্তু আনসাররা সে চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন।
এ ক্ষেত্রে খলিফা মোহাজেরদের মধ্য থেকে হবে, এ সিদ্ধান্তের অর্থ এ নয় যে, খলিফা কোরেশ বংশের মধ্য থেকেই হতে হবে, যদি তাই হতো তাহলে হযরত ওমর (রাঃ) পরামর্শ পরিষদ নিযুক্ত করার সময় বলতেন না যে "হোজায়ফার গোলাম সালেম জীবিত থাকলে আমি তাকে খলিফা নিযুক্ত করতাম।" জানা কথা যে, সালেম (রাঃ) কোরেশ বংশোদ্ভূত ছিলেন না। তাছাড়া ইসলামের মূলনীতি অনুসারেও কোন কোরেশীকে শুধু 'কোরেশী' এবং রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে অন্যান্য মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে আখ্যায়িত করা যায় না। স্বয়ং হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ-
مَنْ أَبْطَاعَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسبه (مسلم - ابوداؤد -ترمذی)
"যার কার্যকলাপ তাকে পিছিয়ে দেয় তার বংশ-মর্যাদা তাকে এগিয়ে দিতে পারবে না।"
হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত ওমর (রাঃ) কে খলিফা নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে তিনি মুসলমানদেরকে বাধ্য করে গিয়েছিলেন। তার এই নিয়োগকে রদ করার পূর্ণ অধিকার তাদের ছিল। হযরত ওমর (রাঃ) আবু বকরের নিয়োগের ফলে নয় বরং লোকদের নির্বাচনের ফলেই খলিফা হয়েছিলেন। এমনিভাবে হযরত ওমর (রাঃ) ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরামর্শ পরিষদ গঠন করেন। এই পরিষদকে নিজেদের মধ্য হতে একজনকে খলিফা নির্বাচনের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়ে যান। কিন্তু মুসলমানদের ওপর সেই ছয়জনের একজনকে খলিফা মেনে নেয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মধ্য থেকেই একজনকে নির্বাচিত করেন। কারণ প্রকৃতপক্ষে তখনকার মুসলিম উম্মতের মধ্যে ওই ছয়জনই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন।
হযরত আলীর (রাঃ) নির্বাচনের সময় মতভেদ দেখা দেয়। এই মতভেদের দরুন প্রথমবারের মত মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এর পরিণামেই একে একে এমন সব হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয় যে, ইসলামের প্রাণশক্তি, তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূলনীতি এবং জীবনের অন্যান্য বিভাগে তার প্রবর্তিত চিন্তাধারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে ইসলামের আসল মতাদর্শ আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেটা হচ্ছে এই যে, কেবলমাত্র মুসলমানদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতেই কোন ব্যক্তি শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চাচাতো ভাই, তার জামাতা এবং তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। এসব জেনে বুঝেও মুসলমানরা তাকে অনেক বিলম্বে খেলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত করেন। হয়তো বা হযরত আলীকে এরূপ বিলম্বিত করা বিশেষতঃ হযরত ওমরের পর-তার অধিকার ক্ষুন্ন করারই নামান্তর। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, এই বিলম্ব দ্বারাই ইসলামের শাসন পদ্ধতির সর্বাপেক্ষা নিখুঁত মূল্যায়ন সম্ভব হয়েছে। এতে করে এই বৃহত্তর কল্যাণ সাধিত হয়েছে যে উত্তরাধিকারের ধারণা খেলাফতের আসনের ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। কারণ এ ধারণা ইসলামের প্রাণসত্তা ও তার মূলনীতিসমূহ থেকে সবচেয়ে দূরত্বে অবস্থিত। হযরত আলীর প্রতি ব্যক্তিগতভাবে একটু অবিচার হলেও এই আদর্শের বাস্তব রূপায়ন যে তার চেয়েও গুরুতর, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এরপরে এলো বনু উমাইয়ার যুগ। তারা ইসলামী খেলাফতকে বনু উমাইয়া বংশের মধ্যে সীমিতই শুধু করলো না বরং এক স্বৈরাচারী রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করলো। এটা ইসলামের শিক্ষার ফল ছিল না বরং এটা ছিল "জাহেলিয়াতের" প্রভাব। জাহেলিয়াতের এই প্রভাব ইসলামের প্রাণ শক্তিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
এখানে ইয়াজিদের নিয়োগ ও 'বাইয়াত' কিভাবে সম্পন্ন হয়েছিল সে সম্পর্কে কতিপয় রেওয়ায়েত পেশ করলেই ব্যাপরটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
📄 শাসন পদ্ধতির কতিপয় নমুনা
এই সত্যের সঠিক উপলব্ধির ব্যাপারে সহায়তা করার জন্য আমরা খেলাফতে রাশেদার বিভিন্ন যুগ যথাঃ হযরত আবু বকর ও ওমরের যুগ, হযরত ওসমান ও মারওয়ানের যুগ, অতঃপর হযরত আলীর যুগ এবং এমনিভাবে আব্বাসী ও উমাইয়া যুগ থেকে শাসন পদ্ধতির কতিপয় বাস্তব নমুনা পেশ করার চেষ্টা করবো।
যখন মুসলমানগণ হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে খেলাফতের আসনে অভিষিক্ত করেন, তখন তাঁর দৃষ্টিতে মুসলমানদের ওপর আল্লাহর দ্বীন ও শরিয়তকে বাস্তবায়িত করা ছাড়া অন্য কোন কাজ ছিল না। এ ধরনের কোন চিন্তা তার ধারে কাছেও যেতে পারেনি যে, ইতিপূর্বে সাধারণ নাগরিক হিসেবে তার ওপর যে সব কাজ হারাম ছিল এখন তা এ পদের জন্য হালাল হয়ে যাবে। অথবা আগে যে সব অধিকার ছিল না, তেমন কোন নতুন অধিকার তিনি পাচ্ছেন কিংবা তার ওপর যে সব দায়িত্ব ও কর্তব্য এতদিন ছিল, এখন তা থেকে তিনি মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন।
সাকিফায় যখন তার অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় তখন তিনি নিম্নরূপ ভাষণ দেন, "আমি যদি আমার দায়িত্বসমূহ সুচারুরূপে পালন করি তাহলে তোমরা আমার সাহায্য ও সহযোগিতা করবে। আর যদি আমি বাঁকা পথে চলতে আরম্ভ করি, তাহলে তোমরা আমাকে সোজা করে দেবে। সত্যবাদিতা হচ্ছে বিশ্বস্ততা আর মিথ্যাবাদিতা হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সবচেয়ে দুর্বল, সে আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সবল-যাবত আমি তাকে তার অধিকার না দিয়ে দেই। আর যে ব্যক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী, সে আমার নিকট সবচেয়ে দুর্বল-যাবত আমি তার নিকট থেকে রাষ্ট্রের অধিকার আদায় করি। মনে রেখো, কোন জাতি যখনি জেহাদ থেকে পিছপা হয়, তখনই আল্লাহ তাকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করেন। যখনি কোন জাতি অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই আল্লাহ তায়ালা সকলের ওপর পাইকারীভাবে আজাব নাজিল করেন। যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করতে থাকবো, ততক্ষণ তোমরা আমার আদেশ মান্য করবে। আর যদি আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য থেকে বিচ্যুত হই, তখন তোমাদের ওপর আমার আদেশ পালনের দায়িত্ব থাকবে না।"
হযরত আবু বকরের বাড়ী মদিনার পার্শ্ববর্তী 'সাহে' অবস্থিত ছিল। একটা ক্ষুদ্র মামুলী ধরনের বাড়ী। খলিফা হবার পরও তিনি সে বাড়ীতে অবস্থান করেন। নতুন বাড়ীও নির্মাণ করেননি কিংবা সেই বাড়ী মেরামতও করাননি। সেই বাড়ী থেকে মদিনা পর্যন্ত তিনি প্রতিদিন সকালে ও বিকালে পদব্রজে আসা- যাওয়া করতেন। কখনো কখনো একটা ঘোড়া ব্যবহার করতেন কিন্তু সেটা বাইতুল মালের ছিল না, ছিল ব্যক্তিগত। পরে কাজের চাপ বেড়ে গেলে তিনি মদিনায় চলে আসেন।
তিনি ব্যবসায় দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। খলিফা নির্বাচিত হবার পরের দিন যখন ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে রওনা করেছেন, তখন মুসলমানরা তাকে থামিয়ে বললেন, "খেলাফতের দায়িত্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি পালন করা যাবে না।" তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "আমি যখন জীবিকা নির্বাহের অন্য কোন পন্থা জানি না তখন আমার চলবে কি করে?" সবাই তার বিষয় বিবেচনা করলেন এবং তার ব্যবসায় করতে না পারা ও খেলাফতের সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে 'বাইতুল মাল' থেকে তার পরিবারবর্গের বরণ-পোষণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বেতন নির্ধারণ করেন।
এ সত্ত্বেও তিনি মৃত্যুকালে অছিয়ত করেন যে তিনি 'বাইতুল মাল' থেকে যা কিছু গ্রহণ করেছেন তা যেন হিসাব করে তার জমি-জমা ও অন্যান্য সম্পত্তি থেকে গ্রহণ করে বাইতুল মালে জমা দেয়া হয়।
ইসলাম শাসক ও শাসিতের বিবেক ও মন-মগজে যে চেতনা ও দায়িত্বানুভূতি জাগিয়ে তোলে তারই প্রভাবাধীনে উজ্জীবিত হয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) প্রতিটি প্রজার অভাব অভিযোগ দূর করার জন্য নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী মনে করতেন। তিনি সানহে অবস্থানকালে তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল ও অসহায় প্রতিবেশীদের ছাগলের দুধ প্রতিদিন দুইয়ে দিতেন। যখন তিনি খলিফার পদে অধিষ্ঠিত হন তখন তাঁর প্রতিবেশীর একটি শিশু মেয়ে তাকে বলে, "এখনতো আপনি আর আমাদের ছাগল দুইয়ে দেবেন না, তাই না?" আবু বকর (রাঃ) বলেন, "কেন দেব না? নিশ্চয় দুইয়ে দেব।" তিনি যথার্থই তাদের দুধ দুইয়ে দেয়া অব্যাহত রাখলেন। কখনো কখনো ছাগলের মালিক বালিকাকে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, 'খালি দুধ দুইয়ে দেব, না মাখনও বের করবো?" কখনো সে বলতো, "মাখন বের করে দাও।" আবার কখনো বলতো, "খালি দুধ রেখে দাও।" মোট কথা সে যা বলতো, তিনি তাই করতেন।
হযরত আবু বকরের খেলাফতকালে হযরত ওমর (রাঃ) মদিনায় একটি অন্ধ মহিলার তত্ত্বাবধান করতেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখেন, তিনি যাওয়ার আগেই কে এসে মহিলাটির কাজ করে দিয়ে যায়। এরূপ প্রতিদিন হতে লাগলো। একদিন গোপনে লুকিয়ে বসে থাকেন। দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) এসে মহিলাটির সব কাজ করে দিয়ে যান। খেলাফত এবং তার গুরুদায়িত্ব তাকে এ কাজ থেকে নিরস্ত করতে পারেনি। তাকে দেখামাত্র হযরত ওমর (রাঃ) চিৎকার করে বলে উঠলেনঃ "নিশ্চয়ই আপনি। খোদার শপথ আপনিই (প্রতিদিন এই কাজ করে থাকেন)।"
এটা হলো হযরত আবু বকরের শাসন নীতির কয়েকটা সাধারণ নমুনা! তার স্থলে যখন হযরত ওমর এলেন তখনও এই নীতি অক্ষুন্ন ছিল। ওমর (রাঃ) কখনো খেলাফতকে নিজের একটা বাড়তি অধিকার হিসাবে গ্রহণ করেননি। তবে বাড়তি দায়িত্ব অবশ্যই মনে করেছেন। বলা বাহুল্য সে দায়িত্ব আল্লাহর আইন জারী করা ছাড়া আর কিছু নয়।
'বাইয়াত' অনুষ্ঠানে তিনি যে ভাষণ দেন তাতে বলেন, "ভাই সব! আমি তোমাদেরই একজন। তার চেয়ে বেশী কিছু নই। যদি খালিফাতুর রসূলের (হযরত আবু বকর) অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা সংগত হতো তাহলে আমি কিছুতেই তোমাদের এ দায়িত্ব গ্রহণ করতাম না।"
অপর এক ভাষণে তিনি বলেন, "আমার ওপর তোমাদের সম্পর্কে কতিপয় দায়িত্ব অর্পিত আছে সেগুলো আমি উল্লেখ করছি। এগুলো সম্পর্কে তোমরা সব সময় আমার কাছে হিসাব চাইবে। তোমাদের খাজনা ও কর আদায় করা আমার দায়িত্ব। আমি তোমাদের মধ্যে সততার সাথে ধন বন্টন করবো, তোমাদেরকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করবো না, বেশীদিন সীমান্ত রাখবো না এবং যুদ্ধের জন্যে বিদেশে থাকাকালে তোমাদের পরিবার বর্গের তত্ত্বাবধান করবো।"
তিনি বলতেন, "আমি আল্লাহর মালকে নিজের পক্ষে ইয়াতিমের মালের সমতুল্য মনে করি। প্রয়োজন না হলে স্পর্শ করবো না আর প্রয়োজন হলে সততার সাথে গ্রহণ করবো।"
একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, "আল্লাহর মাল থেকে আপনি কতটুকু গ্রহণ করা নিজের পক্ষে বৈধ মনে করেন?" তিনি উত্তরে বলেন, "শীত ও গ্রীষ্মের জন্যে দু'খানা কাপড়, হজ্জ-ওমরার জন্যে সওয়ারীর জন্তু এবং কোরেশের কোন মাঝারী পরিবারের সমমানের খাদ্য আমার পরিবারবর্গের জন্য। এর পরে আমি সাধারণ মুসলমানের মতই একজন মুসলমান। তারা যা পাবে আমিও তাই পাব।"
সাধারণতঃ তিনি এভাবেই জীবন যাপন করতেন। কিন্তু কখনো কখনো তিনি নিজের জন্য যা তিনি বৈধ বলে ঘোষণা করেছেন তার ব্যাপারেও অসাধারণ কঠোরতা প্রয়োগ করতেন। একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার জন্য মধু ব্যবহার করতে বলা হলো।
বাইতুল মালে প্রচুর মধু ছিল। তিনি মিম্বরে আরোহন করে বললেন : "তোমরা অনুমতি দিলে মধু ব্যবহার করতে পারি নইলে এটা আমার জন্য হারাম।" তৎক্ষণাৎ উপস্থিত সবাই অনুমতি দিয়ে দিল।
মুসলমানরা হযরত ওমরের এই কঠোরতা দেখে তাঁর কন্যা উম্মুল মোমিনীন হযরত হাফসা (রাঃ) এর নিকট গিয়ে বললেন, "ওমর (রাঃ) নিজের ব্যাপারে কৃচ্ছতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। বর্তমান সময়ে আল্লাহ তায়ালা স্বচ্ছলতা দান করছেন। যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ থেকে তাঁর ইচ্ছামত ও প্রয়োজনমত গ্রহণ করা উচিত। মুসলমানদের পক্ষ থেকে তাদের এরূপ করার পূর্ণ অনুমতি রয়েছে।" হযরত হাফসা যখন হযরত ওমর (রাঃ) কে এ কথা বললেন তখন তিনি জবাব দিলেন, "হাফসা, তুমি তোমার জাতির পক্ষপাতিত্ব করেছ আর নিজের পিতার সাথে অহিতাকাংখী সুলভ আচরণ করেছ। আমার পরিবারভুক্ত লোকদের আমার জান ও মালে অধিকার রয়েছে, কিন্তু আমার ধর্ম ও আমানতদারীতে কোন অধিকার নেই।"
তিনি নিজের ও নিজের প্রজাদের মধ্যে সাম্যের ওপর অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। যখন বিখ্যাত আমুর রমাদা'র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন হযরত ওমর (রাঃ) শপথ করেন যে যতদিন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসবে ততদিন তিনি ঘি ও গোশত স্পর্শ করবেন না। তিনি এই প্রতিজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। ফলে তেল খেতে খেতে তার শরীরের চামড়া শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। এর কিছু দিন পর বাজারে দুটো পাত্রে দুধ ও ঘি বিক্রি হতে দেখা গেল। হযরত ওমরের জনৈক ভৃত্য চল্লিশ দিরহাম দ্বারা তা কিনে নিয়ে এলো। সে এসে তাকে বললো, এখন আল্লাহ আপনার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করে দিয়েছেন। বাজারে দুধ ও ঘি বিক্রির জন্য এসেছে, আমি তা কিনে নিয়ে এসেছি। কিন্তু যখন তিনি তার দাম জানতে পারলেন তখন বললেন, "খুব চড়া দামে কিনেছো দুটোই সদকা করে দাও। আমি অপব্যয় করে খাওয়া পছন্দ করি না।" মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। অতপর বললেন, "জনগণের যে দুরবস্থা হয় তা যদি আমারও না হয় তাহলে তাদের সমস্যার গুরুত্ব আমি কি করে বুঝবো।"
ওমরের (রাঃ) মত ছিল যে জিনিস থেকে প্রজারা বঞ্চিত তা থেকে তার নিজেরও বঞ্চিত হওয়া উচিত। যেমন তিনি নিজেই বলেছিলেন, তার মনের কোন কোণেও এরূপ ধারণা বিদ্যমান ছিল না যে, খেলাফতের পদে অভিষিক্ত হয়ে তিনি কোনরূপ বিশেষ সুযোগ-সুবিধার অধিকারী হয়েছেন। তিনি মনে করতেন যে এ ব্যাপারে তিনি যদি সাম্য ও সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হন তাহলে জনগণের আনুগত্য লাভের কোন অধিকারই তার থাকবে না। এ থেকে ইসলামের রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি জানা যায়। তা হচ্ছে এই যে, কোন শাসক আল্লাহর আইন কার্যকরী করা এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা সত্ত্বেও নিজের বিচার ফায়সালায় ইনসাফ ও ন্যায়-নীতি রক্ষা না করলে আনুগত্য লাভের যোগ্য হতে পারে না। হযরত ওমরের (রাঃ) মনে ইসলামের এই মূলনীতি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল ছিল এবং এ সম্পর্কে অনুভূতি সব সময় জাগরূক থাকতো।
একবার তিনি এক ব্যক্তির সাথে একটি ঘোড়ার দরদপ্তর করেন। এরপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্দেশ্যে সেটায় সওয়ার হয়ে দৌড়াদৌড়ি করেন। ইত্যবসরে ঘোড়া ঠোকর খেয়ে পড়ে যায় এবং আহত হয়। তিনি ঘোড়া ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু মালিক ঘোড়া ফেরত নিতে অসম্মতি প্রকাশ করলো। শেষ পর্যন্ত উভয়ে মোকদ্দমা নিয়ে বিচারপতি শোরাইহের আদালতে গিয়ে হাজির হলেন। শোরাইহ উভয় পক্ষের বিবৃতি শ্রবণের পর বললেন, "আমিরুল মোমিনীন! আপনি যে জিনিস কিনেছেন তা নিয়ে নিন। নচেৎ ওটা যে অবস্থায় নিয়েছিলেন সে অবস্থায় ফেরত দিন।" ওমর বে-ইখতিয়ার বলে ওঠলেন, "একেই বলে ন্যায় বিচার।" অতঃপর তিনি শোরাইহকে তার ন্যায় বিচারে সন্তুষ্ট হয়ে কুফার বিচারপতি নিযুক্ত করেন।
যখন হযরত ওমরের নীতি নিজের ব্যাপারেই এত কঠিন ছিল তখন খলিফার আত্মীয় স্বজন ও অন্যান্য নাগরিকের বেলায় কোন বৈষম্যমূলক আচরণের তো প্রশ্নই ওঠে না। উদাহরণ স্বরূপ, যখন তার পুত্র আব্দুর রহমান মদ পান করেন তখন তার ওপর ইসলামী দন্ড জারী করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে তার ঘটনা সর্বজন বিদিত। এমনিভাবে আমর ইবনুল আসের পুত্র জনৈক মিশরীয় বালকের ওপর অত্যাচার করলে তাকে শরিয়তের দন্ড বিধি অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হয়।
কর্মচারীদের ব্যাপারে তার নীতি ছিল, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের নিকট যে অতিরিক্ত সম্পদ পাওয়া যেত, সে সম্পর্কে তাদেরকে জবাবদিহী করতে হতো। মুসলমানদের ক্ষতি করে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঐ সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে পুংখানুপুংখরূপে তদন্ত করা হতো! "সম্পদ কিভাবে অর্জিত হলো?" -এটা ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন এবং এ অনুসারে তিনি যখনই কোন কর্মচারীর মধ্যে দুর্নীতির সন্দেহ বোধ করেছেন তখনই কৈফিয়ত তলব করেছেন। মিশরের শাসনকর্তা আমর ইবনুল আসের অর্ধেক সম্পত্তি এই অনুসারেই বাজেয়াপ্ত করে বাইতুল মালে জমা করা হয়। কুফাস্থ প্রতিনিধি সাদ ইবনে আবি আক্কাসের সাথেও তিনি এ নীতি অবলম্বন করেন। এমনিভাবে বাহরাইনের শাসনকর্তা হযরত আবু হোরাইরার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন।
হযরত ওমরের রাজনীতির সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে এই যে, প্রজারা ইসলামের চতুর্সীমার মধ্যে থেকে সরকারের আনুগত্য ও হীত কামনা করবে, আর সরকার করবে ন্যায়বিচার ও সর্বাঙ্গীন জনকল্যাণ। এ জন্যেই তিনি তার একজন সাধারণ প্রজার এ উক্তি স্বীকার করেন যে, "যদি তোমার মধ্যে আমরা গোমরাহী দেখি তবে আমরা তরবারী দ্বারা সোজা করে দেব।" অর্থাৎ কিনা তিনি মেনে নিলেন যে, প্রজাদের শাসকের সমালোচনা ও সংশোধনের অধিকার রয়েছে। একদিন তিনি বক্তৃতা প্রসংগে বলেন, "তোমাদের জান-মাল ও মান-ইজ্জতের ওপর অযথা হস্তক্ষেপের জন্যে আমি কর্মচারীদেরকে নিয়োগ করিনি। তাদেরকে নিয়োগ করেছি তোমাদেরকে কোরআন ও সুন্নাহর বাস্তব শিক্ষাদানের জন্য। যদি কোন কর্মচারী কারো ওপর জুলুম অত্যাচার করে তবে আমি তা কিছুতেই বরদাশত করবো না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তার সম্পর্কে আমার নিকট অভিযোগ আনা উচিত।" এ ভাবে তিনি কর্মচারীদের জন্য তাদের ক্ষমতার সীমারেখা নির্দেশ করেন এবং তা লংঘন করতে নিষেধ করে দেন।
শাসকের এহেন গুরু দায়িত্বের পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি খাত্তাবের বংশধরদের মধ্য থেকে দ্বিতীয় কোন খলিফা নির্বাচিত হওয়া পছন্দ করেননি। তিনি সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করে যান যে আব্দুল্লাহকে যেন খলিফা নির্বাচিত করা না হয়। অবশ্য তিনি তাকে পরামর্শ পরিষদে শামিল করেন। এ সময়ে তিনি যে উক্তি করেন তা খেলাফত সম্পর্কে তার ধারণার সঠিক প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি বলেন, "আমরা তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করার আদৌ কোন অভিলাষ পোষণ করি না। আমি নিজেও এটা করে সুখী হইনি। তাই আমার বংশধরের মধ্যে আর কেউ এ দায়িত্ব গ্রহণ করুক তাও আমি চাই না। এটা যদি সত্যই ভালভাবে সম্পাদিত হয়ে থাকে তাহলে আমরা সকলে তার ন্যায্য অংশ পেয়েছি। অন্যথায় সমগ্র বংশের মধ্যে একলা ওমরের জবাবদিহী করাই যথেষ্ট।"
📄 হযরত ওসমানের শাসন পদ্ধতি
সন্দেহ নেই, শাসন পদ্ধতি সম্পর্কিত এ ধারণা হযরত ওসমানের (রাঃ) আমলে খানিকটা পরিবর্তিত হয়ে পড়ে। অবশ্য এ পরিবর্তন সত্বেও সেটা সামগ্রিকভাবে ইসলামের আওতাভূক্ত থাকে।
হযরত ওসমান (রাঃ) যখন অশীতিপর বৃদ্ধ তখন তার ওপর খেলাফতের দায়িত্ব অর্পিত হয়। মারওয়ান তার বার্ধক্যের সুযোগ গ্রহণ করে বহু বিষয়ে ইসলামের পরিপন্থী নীতি অবলম্বন করে। ওদিকে হযরত ওসমানের কোমলচিত্ততা এবং আত্মীয়-স্বজনের প্রতি তার অস্বাভাবিক প্রীতি ও স্নেহ এই দু'টোর কারণে এমন কতিপয় পদক্ষেপ গৃহীত হয় যা সাহাবাদের নিকট বিশেষ আপত্তিজনক বলে মনে হয়। এই পদক্ষেপগুলোর অত্যন্ত বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। এর ফলে যে ভয়াবহ গোলযোগ ও বিশৃংখলা দেখা দেয় তা ইসলামকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
হযরত ওসমান (রাঃ) এর স্বীয় জামাতা হারেস ইবনে হাকামকে তার বিয়ের দিন বাইতুল মাল থেকে দু'লাখ দিরহাম দান করেন। পরদিন প্রাতে বাইতুল মালের কোষাধ্যক্ষ জায়েদ ইবনে আরকাম (রাঃ) বিষন্ন বদনে ও অশ্রুসজল নয়নে খলিফার নিকট একে তাকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিতে অনুরোধ করেন। তিনি তার নিকট কারণ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলেন যে মুসলমানদের ধনাগার থেকে তার জামাতাকে দান করার কারণেই তিনি ইস্তফা দিতে চান। হযরত ওসমান (রাঃ) বিস্ময়ের সাথে বললেন, "ইবনে আরকাম। আমি আত্মীয় স্বজনের প্রতি সহৃদয় ব্যবহার করেছি এজন্য তুমি কাঁদছো? ইসলামের প্রাণশক্তি সম্পর্কে সুতীব্র অনুভূতির অধিকারী সেই ব্যক্তি এ প্রশ্নের উত্তরে যে জবাব দিলেন তাহলো, "না, আমীরুল মুমিনীন! কথা সেটা নয়, আমি এ চিন্তা করে কাঁদছি যে, আপনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) জীবদ্দশায় মুসলমানদের জন্যে যে বিপুল অর্থ দান করতেন তারই প্রতিদান হিসেবে এ অর্থ গ্রহণ করলেন না তো? খোদার শপথ করে বলছি, আপনি তাকে একশো দিরহাম দিলেও তা বেশী হতো।" খলিফার আত্মীয়-স্বজনের জন্য একশো দিরহাম ব্যয় করাকেও যার বিবেক সংগত মনে করতো না- সেই ব্যক্তির ওপর হযরত ওসমান (রাঃ) ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠেন এবং বলেন, "ইবনে আকরাম! তুমি চাবি রেখে যাও। আমি অন্য লোক অবশ্যই পাব।"
এই ধরনের দৃষ্টান্ত হযরত ওসমানের মধ্যে বহু দেখা যায়। একবার তিনি জুবায়েরকে ছ'লাখ, তালহাকে দু'লাখ এবং মারওয়ান ইবনে হাকামকে আফ্রিকার এক পঞ্চমাংশ রাজস্ব প্রদান করেন। এতে হযরত আলীর নেতৃত্বাধীন সাহাবাদের একটি দল আপত্তি তুললে খলিফা জবাব দেন, "আমার অনেক আত্মীয় স্বজন রয়েছে এবং তাদের সাথে আমার সহৃদয় ব্যবহার করা উচিত।" লোকেরা এই জবাবকে আরো আপত্তিকর আখ্যায়িত করে প্রশ্ন করলেন "হযরত আবু বকর ও ওমরের কি আত্মীয়-স্বজন ছিল না।" হযরত ওসমান (রাঃ) জবাব দিলেনঃ "আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) আত্মীয়-স্বজনকে বঞ্চিত করে আল্লাহর নিকট উত্তম প্রতিদানের প্রত্যাশা করতেন আর আমি তাদেরকে দান করে পূণ্য অর্জন করতে চাই।" এতে তারা রাগান্বিত হয়ে উঠে চলে এলেন এবং বললেন, "খোদার শপথ! যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে সেই দু'জনের নীতিই আমাদের নিকট আপনার নীতির চেয়ে অধিক প্রিয়।"
ধন-সম্পদ ছাড়া পদ ও চাকুরীর অবস্থা ছিল এই যে, ওসমানের (রাঃ) আত্মীয়-স্বজনের ওপর তা বৃষ্টির মত বর্ষিত হয়েছিল। এদেরই অন্যতম ব্যক্তি ছিলেন হযরত মুয়াবিয়া। ওসমান (রাঃ) মুয়াবিয়ার রাজ্যের সীমা বাড়িয়ে ফিলিস্তীন ও হেমসকেও তার অন্তর্ভুক্ত করে দেন। তাকে সমগ্র সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি বানিয়ে দেন এবং তিনি যাতে সমগ্র আর্থিক ও সামরিক শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে হযরত আলীর মোকাবিলায় খেলাফতের দাবীদার হয়ে দাঁড়াতে পারেন সেজন্য তার পথ খোলাসা করে দেন। চাকুরীর সুবিধা লাভকারী এই সব আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর প্রত্যাখ্যাত হাকাম ইবনে আস, তার পুত্র মারওয়ান ইবনুল হাকাম এবং তার দুধভাই আবদুল্লাহ ইবনে সাদ ইবনে আবিচ্ছারাহ অন্যতম ছিলেন। মাওয়ানকে তিনি নিজের প্রধান উজীরের পদে অধিষ্ঠিত করেন।
সাহাবারা এই সব কার্যকলাপের অবশ্যম্ভাবী ভয়াবহ পরিণতির কথা চিন্তা করে বারবার মদিনায় ছুটে আসতেন এবং ইসলামী রীতি-নীতিকে বিকৃতির হাত থেকে এবং খলিফাতুল মুসলেমীনকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চেষ্টা চালাতেন। কিন্তু খলিফার অবস্থা এই যে, বার্ধক্য ও দুর্বলতার দরুন মারওয়ানের ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। এ কথা ঠিক যে, হযরত ওসমান (রাঃ) এর মধ্যে ইসলামী ভাবধারার অবস্থিতি সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ অথবা কোন অভিযোগ আরোপ করার অবকাশ নেই। কিন্তু সংগে সংগে তাঁকে সম্পূর্ণ নির্ভুল বলাও কঠিন। ভুল-ভ্রান্তির কারণ আমাদের মতে মারওয়ানের ওজারত এবং হযরত ওসমানের বার্ধক্যজনিত মানসিক অস্বাভাবিকতা ছাড়া আর কিছু নয়।
একবার জনগণ সমবেত হয়ে হযরত আলীকে হযরত ওসমানের সাথে আলাপ-আলোচনার জন্য প্রেরণ করেন। তিনি গিয়ে বলেনঃ "আমি জনগণের প্রতিনিধি হয়ে এসেছি। তারা আমার নিকট আপনার সম্পর্কে নানা কথা বলেছে। কিন্তু আমি আপনাকে কি বলব তা বুঝতেই পারছি না। আমি যা জানি তা আপনার অজানা নয়। আপনাকে কোন কথা বুঝানোরও সাধ্য আমার নেই। কেননা আপনি নিজেই সব কিছু বুঝতে পারেন। আপনার চেয়ে অধিক জ্ঞান আমাদের কারো নেই। ইসলাম সম্পর্কে আপনার আগে আমরা কোন জ্ঞান অর্জন করিনি। এমন কোন তথ্য নেই যা শুধু আমরা জানি এবং আপনার নিকট তা এখন পৌঁছানোর প্রয়োজন হতে পারে। কোন কথাই আপনার কাছ থেকে গোপন করে আমাদেরকে শিখানো হয়নি। আপনি রাসূল (সাঃ) কে দেখেছেন, তাঁর কথা শুনেছেন, তার সাহচর্যে অবস্থান করেছেন এবং তার সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। আবু বকর (রাঃ) ও ওমর (রাঃ) আপনার চাইতে বেশী কল্যাণের নিকটবর্তীও ছিল না। রক্ত সম্পর্কের দিক দিয়েও যেমন, আবার শ্বশুর জামাতা সম্পর্কেও তেমন-আপনি তাদের উভয়ের চাইতে রাসূলুল্লাহর ঘনিষ্ঠতম ব্যক্তি। তাদের কেউ এ ব্যাপারে আপনার চাইতে অগ্রগামী ছিল না। সুতরাং নিজের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন। আপনাকে অন্ধকার থেকে আলোকে আনা কিংবা অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে আনার কোনই প্রয়োজন নেই। সঠিক পথ সম্পূর্ণ উজ্জল ও স্পষ্ট। ইসলামের নিদর্শন সমূহ এখনো অক্ষুন্ন রয়েছে। ওসমান! জেনে রাখুন! যে ন্যায়পরায়ণ শাসক নিজেও সুপথে থাকে, অপরকেও পরিচালিত করে, সুন্নাতকে প্রতিষ্ঠিত এবং বেদা'তকে বিলুপ্ত করে- সেই হলো আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম ব্যক্তি। খোদার শপথ! সব কিছুই স্পষ্ট। আল্লাহর নীতি এখনো প্রতিষ্ঠিত এবং তার পতাকা এখনো উড্ডীন। আল্লাহর নিকট সবচাইতে অধম ব্যক্তি হচ্ছে সেই, যে সুন্নাতকে বিলুপ্ত এবং বেদা'তকে প্রচলিত করে। আমি রাসূলুল্লাহ (সঃ)-কে বলতে শুনেছি যে, কেয়ামতের দিন জালেম শাসককে অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় হাজির করা হবে। তার ওজর-আপত্তি শ্রবণ করা হবে না এবং তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (তাবারী)
হযরত ওসমান (রাঃ) জবাব দিলেন, "আমি জানি, তুমি যা বলেছ লোকেরাও তাই বলে থাকে। শোনো! খোদার শপথ করে বলছি, যদি তোমার স্থলে আমি হতাম তাহলে আমি তোমার নিন্দা বা সমালোচনা করতাম না এবং তোমাকে সমালোচনার মুখে অসহায় ছেড়ে দিতাম না। আমি এ আপত্তি তুলতাম না যে, তুমি আত্মীয়-স্বজনের প্রতি কৃপা প্রদর্শন করলে কেন? গরীব-দুঃখীর সাহায্য করলে কেন? ওমর (রাঃ) যাদেরকে শাসনকর্তা পদে নিয়োগ করতেন- তাদেরকে নিয়োগ করলে কেন? আলী! আমি খোদার শপথ দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞাসা করছি, তুমি কি জান না- মুগিরা ইবনে শো'বা সেই পদে নিযুক্ত আছে।"
তিনি বললেনঃ "হ্যাঁ জানি।"
ওসমানঃ "জান, তাকে হজরত ওমর (রাঃ) শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন?"
আলীঃ "হ্যাঁ।"
ওসমানঃ "তাহলে আমি যদি আত্মীয়তার জন্য ইবনে আমেরকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করে থাকি, তাহল তোমরা সে জন্য আমাকে সমালোচনা কর কেন?
আলীঃ "আমি আসল ব্যাপার আপনাকে বলছি। ওমর (রাঃ) যাকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করতেন, ওমরের জুতা তার মস্তকোপরি থাকতো। তার বিরুদ্ধে টু শব্দটি শুনলেও তৎক্ষণাৎ তাকে হাজির হতে বলতেন এবং তার শেষ মীমাংসা করে তবে ক্ষান্ত হতেন। এ কাজটাই আপনি করেন না। আপনি নিজে দুর্বল হয়ে পড়েছেন এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে নম্র ব্যবহার করা শুরু করেছেন।"
ওসমানঃ "আর তোমার আত্মীয়দের সাথেও তো করি।"
আলীঃ "সন্দেহ নেই, তাঁদের সাথে আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তা রয়েছে কিন্তু অন্য লোক তাঁদের চেয়ে উত্তম।"
ওসমানঃ "তুমি নিশ্চয়ই জান, ওমর (রাঃ) তার খেলাফতের গোটা যুগ ধরেই মুয়াবিয়াকে শাসনকর্তা পদে বহাল রাখেন। আমিও তো তাকে শাসনকর্তা হিসাবে বহাল রেখেছি।"
আলীঃ "আমি আপনাকে খোদার শপথ দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি, আপনি কি জানেন না যে, ওমরকে গোলাম 'ইয়ারফা' যত ভয় করতো, মুয়াবিয়া তার চাইতেও বেশী ভয় করতেন?"
ওসমানঃ "হ্যাঁ।"
আলীঃ "কিন্তু এখন অবস্থা এই যে, মুয়াবিয়া আপনার মতামত না নিয়েই সিদ্ধান্ত করতে থাকেন অথচ আপনি তার খবরও রাখেন না। তিনি নিজের হুকুমকে লোকদের মধ্যে ওসমানের হুকুম বলে চালিয়ে দেন। এ সব ব্যাপার আপনার নিকট পৌঁছায়, কিন্তু আপনি মুয়াবিয়ার উক্তির প্রতিবাদ করেন না।"
শেষ পর্যন্ত হজরত ওসমানের বিরুদ্ধে এক ভয়াবহ অভ্যুথান শুরু হলো- এর মধ্যে সত্য ও অসত্য, ভাল ও মন্দ উভয় প্রকারের কার্যকারণ মিশ্রিত ছিল। তবে সামগ্রিকভাবে ব্যাপারটাকে ইসলামী দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে একথা স্বীকার না করে উপায় থাকে না যে, এই অভ্যুথান মোটমুটিভাবে ইসলামী ভাবধারার একটি গণবিস্ফোরণ ছিল। অবশ্য এই মত প্রকাশ করার সময় আমরা এ সত্য অগ্রাহ্য করছি না যে, এই বিস্ফোরণের পিছনে অভিশপ্ত ইহুদী সন্ত্রাসবাদী নেতা ইবনে সাবারও গোপন হাত সক্রিয় ছিল।
হজরত ওসমানের ওজর হিসেবে আমরা এ কথা পেশ করতে চাই যে, খেলাফতের দ্বায়িত্ব তার ওপর তার শেষ বুয়সে এসে অর্পিত হয়। তিনি ছিলেন অশীতিপর বৃদ্ধ আর উমাইয়া গোত্রের লোকেরা তাকে ঘিরে রেখেছিল। তাঁর অবস্থা সম্পর্কে হজরত আলী (রাঃ) সবচেয়ে নিখুঁত বর্ণনা দিয়েছিলেন। তিনি বলেন, "আমি যদি ঘরে বসে থাকি তবে তিনি (ওসমান) বলবেন যে, তুমি আমাকে ভুলে গিয়েছ- আমার অধিকার ও সম্পর্ক অগ্রাহ্য করেছো। আর যদি তার সাথে আলাপ-আলোচনা করি, তাহলেও তিনি নিজের খেয়াল-খুশী অনুসারেই কাজ করেন। মারওয়ান তাকে দিয়ে যা ইচ্ছা তাই করায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাহচর্য গ্রহণ করা সত্ত্বেও বার্ধক্যের কারণে তিনি পুরোপুরিভাবে তাদের খপ্পরে পড়ে গেছেন। তারা তাকে যেদিকে ইচ্ছা করে- সেদিকে চালিত করে।"
বস্তুতঃ তৃতীয় খলিফার বার্ধক্যের সময় এই গতিশীল জীবন ব্যবস্থাটি উমাইয়া চক্রের মুষ্ঠির মধ্যে চলে যাওয়ায় তার অপূরণীয় ক্ষতি সাধিত হয়। কেননা এর বাস্তব রীতি-পদ্ধতিকে এর আদর্শিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত রাখার সময় আর দীর্ঘায়িত করা সম্ভব হয়নি।
তাঁর দীর্ঘ খেলাফত যুগে উমাইয়া চক্রের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও শক্তি অত্যন্ত প্রবল ও মজবুত হয়। তারা সিরিয়া ও অন্যান্য দেশে ক্ষমতা সু-সংহত করার সুযোগ লাভ করে। তা ছাড়া হজরত ওসমানের অনুসৃত নীতির স্বাভাবিক ফল হিসাবে সম্পদের কেন্দ্রায়ন অতিমাত্রায় বেড়ে যায়। ফলে তার বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান মুসলিম উম্মতের ভিত্তিকে ইসলামের প্রাথমিক যুগেই দুর্বল করে দেয়।
এ যুগের ইতিহাস একদিকে সত্য দ্বীনের কতিপয় দুর্লভ গুণাগুণের স্বাক্ষর বহন করে। অপরদিকে তার পাশাপাশি সমাজ, রাষ্ট্র এবং শাসক ও শাসিতের অধিকার সম্পর্কে এক প্রবল চিন্তাগত বিপ্লবেরও নিদর্শন বহন করে। অবশ্য যে গোলযোগের সৃষ্টি হয় তার বিপজ্জনক ও সুদুরপ্রসারী প্রভাবও কম গুরুতর নয়।
📄 হযরত ওসমানের পর
হযরত ওসমান (রাঃ) যখন ইন্তেকাল করেন তখন কার্যতঃ উমাইয়া রাজত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল। খলিফা নিজেই তাদেরকে এ সুযোগ সরবরাহ করেন। সারাদেশে বিশেষতঃ সিরিয়ায় তারা নিজেদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। যুদ্ধলব্ধ সম্পদ এবং অন্যান্য যাবতীয় সম্পদকে তারা নিজেদের কুক্ষিগত করে। তারা সৌভ্রাতৃত্ব, অপরের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দান, সামাজিক, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা বিধান প্রভৃতি কাজকে উপেক্ষা করতে থাকে। আর এ সবই হজরত ওসমানের খেলাফতের ছত্রছায়ায় লালিত-পালিত হতে থাকে। এর কারণে মুসলিম জাতির মধ্যে ইসলামের প্রাণশক্তি ও ভাবধারা অত্যন্ত দুর্বল ও ম্লান হয়ে পড়ে।
খলিফার কতিপয় পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ জনগণের মনে কখনো স্বাভাবিকভাবে আবার কখনো অযৌক্তিকভাবে এক তীব্র ও তিক্ত ভাবাবেগের সৃষ্টি হয়। মুসলমানরা অভিযোগ মুখর হয়ে ওঠে যে, খলিফা নিজের আত্মীয়-স্বজনের সংগে বৈষম্যমূলক আচরণ করেন এবং তাদের লাখ লাখ দিরহাম উপঢৌকন দেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) দুশমনদেরকে শাসনকর্তা নিযুক্ত করার জন্য তাঁর প্রিয় সাহবীদেরকে অপসারিত করেন এবং আবু জরের (রাঃ) মত উন্নত চরিত্রের সাহাবীর ওপর শুধু এ জন্য নির্যাতন চালান যে, তিনি সম্পদের কেন্দ্রায়ন ও উঁচু তলার লোকদের বিলাসিতা ও আমোদ-প্রমোদের বাড়াবাড়ির বিরোধিতা করেছিলেন। আবু জর (রাঃ) দানশীলতা ও সৎপথে ব্যয়ের প্রচলন এবং শালীনতা ও পবিত্রতার পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এ সব কার্যকলাপ মুসলমানদেরকে মর্মাহত ও বিচলিত করে তোলে। এ ধরনের প্রবণতা যখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন কিছু লোকের মধ্যে বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে আবার কিছু লোকের মধ্যে হীনমন্যতার সৃষ্টি হয়। যাদের মনে ইসলামী আদর্শ বদ্ধমূল ছিল তাঁরা এ সব কার্যকলাপ দেখে নীরবতা অবলম্বন করাকে পাপ মনে করতে থাকেন। তাঁদের মনে সৃষ্ট এ ভাবধারা তাঁদেরকে বিদ্রোহ প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। আর যারা ইসলামকে শুধু লেবেল হিসেবে ব্যবহার করে, যাদের পার্থিব লোভ লালসা তাদেরকে আত্মকেন্দ্রিক করে রাখে, যারা সব সময় বাতাসের দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজেদের লক্ষ্য পরিবর্তন করেন, তাদের চরিত্র উচ্ছৃংখল এবং দুর্নীতি পরায়ণ হয়ে ওঠে। এহেন পরিস্থিতিই হজরত ওসমানের খেলাফতের অবসান ঘটায়।
হযরত আলী (রাঃ) যখন খেলাফতের মসনদে আসীন হলেন, তখন পরিস্থিতি আয়ত্বে আনা সহজ সাধ্য ছিল না। ওসমানের (রাঃ) যুগে যারা অবৈধ মুনাফাখোরীতে লিপ্ত ছিল বিশেষতঃ বনু উমাইয়া ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিল যে হজরত আলী (রাঃ) তাদের ব্যাপারে নীরব থাকবেন না। এ সব কথা চিন্তা করে তারা নিজ নিজ কল্যাণের খাতিরে মুয়াবিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
হযরত আলী (রাঃ) এই লক্ষ্য নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন যে তিনি জনগণ এবং সরকারকে পুনরায় ইসলামের আসল রাজনৈতিক আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত করবেন। তাঁর অবস্থা ছিল এই যে, তাঁর স্ত্রী স্ব-হস্তে গম পিষতেন এবং তা-ই তিনি আহার করতেন। একবার তিনি নিজের এক বস্তা গমের ওপর বায়তুল মালে জমা দেয়ার উদ্দেশ্যে সরকারী সিল মোহর অংকিত করছিলেন। বললেন, "আমি নিজের পেটে শুধু তাই প্রবেশ করাতে চাই যার হালাল হওয়া সম্পর্কে আমি নিশ্চিত।" কখনো কখনো এমন অবস্থাও হয়েছে যে, তাঁকে খাদ্য বস্ত্র খরিদ করার জন্য নিজের তরবারী পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। কুফায় তিনি শ্বেত-প্রাসাদে অবস্থন করা পছন্দ করেননি। বরং গরীব লোকদের মত কুঁড়ে ঘরে বসবাস করতেন, তিনি কি ধরনের জীবন যাপন করতেন সে সম্পর্কে নজর ইবনে মানসুরের বর্ণনা প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেনঃ
"আমি হজরত আলীর নিকট গিয়ে দেখি, তাঁর সামনে দুর্গন্ধযুক্ত টক দুধ এবং শুকনো রুটি রয়েছে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "আমিরুল মু'মিনীন! আপনি কি এ সব জিনিস খান? তিনি জবাব দিলেন, "রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চেয়ে শুকনো রুটি এবং মোটা কাপড় পরিধান করতেন। আমি যদি তাঁর নীতি অনুসরণ করে না চলি তাহলে আমার আশংকা হয় যে, হয়তো রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সংগী হতে পারবো না।"
এমনিভাবে হারুন ইবনে আনতারা বর্ণনা করেছেন যে, আমি খাওরানাক নামক স্থানে হজরত আলীর সাথে সাক্ষাত করতে যাই। তখন ছিল শীতকাল। হজরত আলীর (রাঃ) গায়ে একটা ছিন্ন পুরনো চাদর ছিল এবং তিনি থর থর করে কাঁপছিলেন। আমি বললাম, "আমিরুল মু'মিনীন! আপনার ও আপনার পরিবার পরিজনের জন্য এই সম্পদে আল্লাহ কিছু অধিকার নির্ধারিত করেছেন। তা সত্ত্বেও আপনি নিজের প্রতি এরূপ কঠোর আচরণ করছেন।" আলী (রাঃ) বললেন, "খোদার শপথ! আমি তোমাদের হক নষ্ট করবো না। এটা আমার সেই চাদর যা আমি মদিনা থেকে এনেছিলাম।"
অবশ্য হজরত আলী (রাঃ) নিজের ও নিজের পরিবার বর্গের ব্যাপারে এরূপ কঠোর নীতি অবলম্বন করার সময় এ কথা নিশ্চয়ই জানতেন যে, ইসলাম তাকে এর চেয়ে অনেক বেশী গ্রহণের অনুমতি দেয়। ইসলাম কাউকে সর্ব রকমের আরাম-আয়েশ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখে নিতান্ত সংসার বিরাগীর মত জীবন যাপন করতে বাধ্য করে না। তিনি জানতেন যে, তখনো একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে বাইতুল মালের ধন-সম্পদে তার যা প্রাপ্য ছিল তার চাইতে তিনি অনেক কম গ্রহণ করছিলেন। তা ছাড়া জনগণের কাজে সর্বক্ষণ নিয়োজিত শাসক হিসাবে তার প্রাপ্য আরো বেশী ছিল। তিনি ইচ্ছা করলে অন্ততঃ হজরত ওমর (রাঃ) বিভিন্ন দেশের শাসন কর্তাদের যেরূপ বেতন নির্ধারণ করতেন সেই পরিমাণ বেতন গ্রহণ করতে পারতেন। হজরত ওমর (রাঃ) কুফার শাসনকর্তা আম্মার ইবনে ইয়াসার এবং তার সহকারীদের জন্য মাসিক ছ'শ দিরহাম বেতন নির্ধারণ করেছিলেন। আর সাধারণ লোকদের মত যে সব দানের অংশ পেতেন সেটা এ থেকে স্বতন্ত্র। তা ছাড়া তিনি দৈনিক একটি ছাগলের অর্ধাংশ ও আধা বস্তা আটা পেতেন। এমনিভাবে কুফার জনগণকে ইসলামের শিক্ষাদানের এবং বাইতুল মালের দেখাশুনার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাঃ) কে নিয়োগ করেন এবং তাঁর জন্য মাসিক একশো দিরহাম এবং দৈনিক একটি ছাগলের এক চতুর্থাংশ নির্ধারণ করেন। ওসমান ইবনে হানিফের জন্য বাৎসরিক পাঁচ হাজার দিরহাম বৃত্তি, দৈনিক একটি ছাগলের এক চতুর্থাংশ ও মাসিক দেড়শো দিরহাম বেতন নির্ধারণ করেন।
হযরত আলী (রাঃ) নিজের জন্য যে কঠিন পথ অবলম্বন করেন, তা এ সব ব্যাপার না জেনে করেননি। তিনি যে দৃষ্টিভংগী অনুসারে এ নীতি অবলম্বন করেন তা হচ্ছে এই যে, শাসক সব সময়ই জনসাধারণের জন্য আদর্শ স্থানীয় হয়ে থাকে এবং তার ওপর সন্দেহের প্রচুর অবকাশ থাকে। যেহেতু সরকারী কোষাগার তার অধীন থাকে, তাই আত্মসাতের সন্দেহও সৃষ্টি হতে পারে। সেটা জনসাধারণ ও নিজের অধীনস্থ রাজ-কর্মচারীদের জন্য সততা ও সংযমের আদর্শ হয়ে থাকে। এ কারণে তিনি নিজেকে হজরত আবু বকর ও ওমরের (রাঃ) সংযমের নীতির অনুসারী করে তোলেন। যে সব ব্যক্তি আল্লাহর দ্বীনের ব্যাপারে আল্লাহর রাসূলের স্থলাভিসিক্ত হয়েছিলেন তাদের জন্য এই উন্নত মাপকাঠিই সর্বাপেক্ষা সংগত ছিল।
হযরত আলী (রাঃ) গোটা রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে নবী (সাঃ) ও তার পরবর্তী খলিফাদ্বয়ের আদর্শের অনুসারী করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালান।
একবার তিনি স্বীয় বর্ম জনৈক খৃষ্টানের নিকট পেয়ে তাকে ধরে নিয়ে বিচারপতি শোরাইহের নিকট গিয়ে উপস্থিত হন এবং একজন সাধারণ নাগরিকের মত তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। তিনি দাবী করেন যে, ওই বর্ম তার। শোরাইহ খৃষ্টানকে জিজ্ঞাসা করলেন যে আমিরুল মু'মিনীনের দাবী সম্পর্কে তার বক্তব্য কি? খৃষ্টান বললো, "বর্ম নিশ্চয়ই আমার, তবে আমিরুল মু'মিনীনকেও আমি মিথ্যুক বলতে চাই না।" শোরাইহ বললেন, "আমিরুল মু'মিনীন! আপনার নিকট কোন প্রমাণ আছে কি?" হজরত আলী (রাঃ) হেসে বললেন, "আমার কাছে প্রমাণ নেই।" শোরাইহ রায় দিলেন যে, বর্ম খ্রীষ্টানকে দিতে হবে। সে বর্ম নিয়ে রওয়ানা দিল আর আমিরুল মু'মিনীন অসহায়ের মত তাকিয়ে থাকলেন। কয়েক পা গিয়ে সে ফিরে এল এবং বলতে লাগলো "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, যে ধর্মের খলিফা স্বয়ং আমাকে বিচারকের নিকট পেশ করে এবং বিচারক তার বিরুদ্ধে রায় দেন; নিঃসন্দেহে তা সত্য ধর্ম।" এ বলেই সে কালেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করলো। অতঃপর সে বললো, "আমিরুল মু'মিনীন! খোদার শপথ করে বলছি, এ বর্ম আপনার। আপনি যখন সিফিন অভিমুখে যাত্রা করেন তখন আমি সেনাবাহিনীর পেছনে পেছনে চলছিলাম। এ বর্ম আপনার বাদামী রং-এর উটের ওপর থেকে পড়ে গেছে।" হযরত আলী (রাঃ) বললেন, "তুমি যখন ঈমান এনেছ তখন এটা তোমাকেই উপহার দিলাম।" (আবকারিয়াতুল ইমাম- উস্তাদ আব্বাস মাহমুদ আল আক্কাদ)
তিনি যে শাসন পদ্ধতি অনুসরণ করেন তার রূপরেখা তিনি তার অভিষেক অনুষ্ঠানের ভাষণেই নির্দেশ করেনঃ
"ভাইসব! আমি তোমাদেরই মত একজন মানুষ। তোমাদের যা অধিকার আমারও তাই। তোমাদের ওপর যে দায়িত্ব অর্পিত হয় তা আমার ওপরও অর্পিত হয়। আমি তোমাদের নবীর নীতি অনুসারে তোমাদের পরিচালিত করবো এবং তারই আইন চালু করবো। শোনো! ওসমান (রাঃ) যাকে যত জায়গা-জমি এবং আল্লাহর ধন থেকে যাকে যা কিছু দিয়েছেন তা বাইতুল মালে ফেরত নেয়া হবে। কেননা, বাস্তবকে কোন জিনিস পরিবর্তিত করতে পারে না। এমনকি যদি আমি দেখি যে, এই রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিয়ে কিংবা বাঁদী খরিদ করার কাজে ব্যয়িত হয়েছে অথবা তা বিদেশে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে তবুও আমি তা ফেরত আনবো। কারণ, ন্যায়-নীতি যার পক্ষে দুঃসহ হবে, জুলুম ও অত্যাচার তার পক্ষে আরো বেশী দুঃসহ হবে।"
"ভাইসব! হুশিয়ার হয়ে যাও! কিছুদিন আগে যাদের ওপর দুনিয়ার স্বার্থ প্রবল হয়ে পড়েছিল এবং তারা বড় বড় দালান-কোঠা, উট-ঘোড়া, দাস-দাসী ও চাকর-নফরের মালিক হয়েছিল - তাদেরকে যখন আমি এই সব কিছু থেকে বঞ্চিত করবো এবং তাদের আসল অধিকারের আওতায় ফিরিয়ে আনবো- তখন যেন তারা বলতে আরম্ভ না করে থাকে যে, আবু তালেবের বেটা আমাদেরকে আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। জেনে রাখ! রাসূলুল্লাহর সাহাবী, মুহাজের ও আনসারদের মধ্য থেকে কেউ যদি এরূপ মনে করে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নৈকট্য ও সাহচর্য লাভের দরুন অন্যান্যদের ওপর তার অগ্রাধিকার ও শ্রেষ্ঠত্ব রয়েছে তাহলে তার জানা উচিত যে, এই শ্রেষ্ঠত্ব ও অগ্রাধিকারের স্বীকৃতি শুধু আল্লাহর নিকট পাওয়া যাবে এবং সেখানেই এর উপযুক্ত প্রতিদান পাওয়া যাবে। জেনে রাখ! যে ব্যক্তি খোদা ও রাসূলের দাওয়াতে সাড়া দেবে, আমাদের জাতীয়তাকে গ্রহণ করবে, আমাদের সত্য দ্বীনের মধ্যে প্রবেশ করবে এবং আমাদের কেবলামুখী হবে, সে ইসলামের দেয়া যাবতীয় অধিকার লাভ করবে এবং তার নির্ধারিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে বাধ্য হবে। তোমরা সকলে আল্লাহর দাস এবং এ সম্পদ আল্লাহর সম্পদ। এটা তোমাদের মধ্যে সমানভাবে বন্টন করা হবে। এ ব্যাপারে কাউকে কারো ওপর অগ্রাধিকার দেয়া হবে না। খোদাভীরু লোকদের জন্য আল্লাহর নিকট উত্তম প্রতিদান রয়েছে।"
মুনাফাখোর, বৈষম্যপ্রিয়, স্বার্থান্বেষী ও সুবিধাবাদী মহল হযরত আলীর সমবন্টন নীতিতে খুশী হতে পারেনি এবং তা না হওয়াই স্বাভাবিক ছিল। তাই এই মহল শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী উমাইয়া শিবিরে গিয়ে মিলিত হয়। এই শিবিরে গিয়ে তারা ইনসাফ ও ন্যায়-নীতি জলাঞ্জলী দিয়ে নিজেদের তুচ্ছ স্বার্থের শেষ রক্ষা করতে তৎপর হয়ে উঠে।
যাদের দৃষ্টিতে মুয়াবিয়ার মধ্যে হযরত আলীর চাইতে বেশী চাতুর্য, বিচক্ষনতা, সতর্কতা ও দক্ষতা ধরা পড়ে এবং যারা এই কারণে শেষ পর্যন্ত মুয়াবিয়া বিজয়ী হয়েছেন বলে মনে করেন, তারা পরিস্থিতির পর্যবেক্ষণে ভুল করেন এবং হযরত আলীর প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ ও তার আসল কর্তব্য সম্পর্কে সঠিক মতামত স্থাপনে ব্যর্থ হন। হযরত আলীর সর্বপ্রথম এবং সর্বশেষ কর্তব্য ছিল ইসলামী ঐতিহ্যকে তার প্রকৃত শক্তিতে পুনর্বহাল করা এবং সত্য দ্বীনের নির্জীব-প্রায় দেহে পুনরায় জীবনীশক্তির সঞ্চার করা। হযরত ওসমানের (রাঃ) দুর্বলতা ও বার্ধক্যের সুযোগে উমাইয়া বংশীয় কু-চক্রীদের যে মলীনতা ও কদর্যতা ইসলামের প্রাণশক্তিকে কুলষিত করে তোলে তা থেকে তাকে মুক্ত করাই ছিল হযরত আলীর অন্যতম মিশন।
এই মিশন সফল করার সংগ্রামে তিনি যদি মুয়াবিয়ার (রাঃ) মত কর্মপন্থা গ্রহণ করতেন তাহলে তাঁর মিশনই ব্যর্থ হয়ে যেত। এর অর্থ এই দাঁড়াতো যে, তিনি খেলাফত অর্জনের সংগ্রাম শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য করেছেন। এরূপ হলে তাঁর সংগ্রামের কোন মূল্যই থাকতো না। আলীকে 'আলী' হয়েই থাকতে হবে, নচেৎ 'খেলাফত এবং সেই সাথে তার প্রাণও যদি তার থেকে ছিনিয়ে নেয়া হয় তাহলে তার আপত্তি নেই'- এই ছিল হযরত আলী (রাঃ) সংকল্প। এ সংকল্প তার মন থেকে এক মুহূর্তের জন্যও স্থলিত হতো না। এক বর্ণনা অনুসারে (অবশ্য যদি এটা সত্য হয়) হযরত আলী (রাঃ) বলতেন, "খোদার শপথ, মুয়াবিয়া আমার চাইতে ধূর্ত নয়, কিন্তু সে ধোকাবাজ। সে প্রকাশ্যে নাফরমানী করে। আমি যদি ধোঁকা ও প্রতারণা পছন্দ করতাম তাহলে আমি সবচাইতে ধূর্ত হতাম।"
হযরত আলীর ইন্তেকালের পর বনু উমাইয়ার যুগ আসে। উমাইয়াদের সামনে হযরত ওসমানের (রাঃ) ঈমান, তার খোদাভীরুতা এবং তার হৃদয়ের কোমলতা একটা প্রতিবন্ধক স্বরূপ ছিল। কিন্তু সেটা তো আগেই অপসারিত হয়েছিল। এবার হযরত আলীর ইন্তিকালে সর্বশেষ বাধাও দূর হয়ে গেল এবং উচ্ছৃংখলতার পথ উন্মুক্ত হলো।
এরপরও ইসলাম পৃথিবীতে সম্প্রসারিত হতে থাকে। কিন্তু ইসলামের প্রাণশক্তি যে মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল সে ব্যাপারে কোন দ্বি-মতের অবকাশ নেই। যদি স্বয়ং ইসলামের প্রকৃতিতে একটি প্রবল শক্তি লুকানো না থাকতো এবং তার আধ্যাত্মিক শক্তিতে গতিশীলতার যোগ্যতা না থাকতো তাহলে উমাইয়া যুগই তাকে তার আসল পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তার প্রাণশক্তি অবিরাম সংগ্রাম করতে এবং শক্তি অর্জন করতে থাকে। আজও তার মধ্যে সংগ্রামের ও বিজয়ের গোপন শক্তি নিহিত রয়েছে।
উমাইয়া যুগ থেকে মুসলমানদের কোষাগার অতিমাত্রায় উদার হয়ে পড়ে এবং তা বাদশাহ, তাদের চাটুকার ও তল্পিবাহীদের লুটের মালে পরিণত হয়। ইসলামী সুবিচার-ন্যায়নীতির ভিত্তি ধ্বসে পড়ে। শাসকরা বিশেষ সুবিধা ভোগী আর তাদের চাটুকাররা উপঢৌকন-ভোগীতে পরিণত হয়। মোটকথা খেলাফত রূপান্তরিত হয় রাজতন্ত্রে, আর তাও নিকৃষ্টতম স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রে। এই স্বৈরতন্ত্র সম্পর্কেই রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন। এর পরিণতি দাঁড়ালো এই যে, আমাদের গায়ক কবি ও চাটুকারদেরকে পুরষ্কার দেয়ার বহু কাহিনী শ্রবণ করতে হলো। মাবাদ নামক কবিকে জনৈক উমাইয়া বাদশাহ ১২ হাজার দিনার পুরষ্কার দেন এবং আব্বাসী বাদশাহ হারুনুর রশীদ ইসমাইল ইবনে জামে নামক গায়ককে শুধুমাত্র একটি গানের জন্য চার হাজার দিনার দান করেন, সেই সাথে একটা সুন্দর কারুকার্য খচিত মনোরম বাড়ীও দেন। কালের স্রোতধারা এভাবেই চলতে থাকে। কখনো অল্প সময়ের জন্যে এতে বিরতি দেখা দেয়, অতঃপর আবার পূর্ণ গতিবেগে ছুটে চলে।