📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 বিজিত দেশ সমূহের সাথে ব্যবহার

📄 বিজিত দেশ সমূহের সাথে ব্যবহার


বিজিত দেশসমূহের অধিবাসী এবং মুসলিম দেশসমূহের অমুসলিম জাতি সমূহের সাথে যে ব্যবহার করা হয়েছে, এবার আমরা সে সম্পর্কে পর্যালোচনা করবো। কারণ সাম্য, সুবিচার ও বিবেকের স্বাধীনতার সাথে এর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইসলাম প্রবর্তিত এই সাম্য ও সুবিচার ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও ইসলামের পরিধি ছাড়িয়ে সমগ্র মানবতার সাথে যুক্ত হয়েছে।
বিজিত দেশসমূহ সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে দেশ জয়ের ব্যাপারে ইসলামের প্রকৃত উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও কার্যকারণের প্রসংগ স্বভাবতঃই এসে পড়ে। এটা একটা দীর্ঘ আলোচনার বিষয়। আমরা এ সম্পর্কে শুধু যতটুকু অপরিহার্য এবং ইসলামের বিশ্বজনীন সামাজিক ন্যায়-নীতির সাথে সম্পৃক্ত ততটুকুই আলোচনা করবো।
ইসলামী দাওয়াত মানুষের বিবেক ও মন-মগজকে আবেদন জানায়। এতে বল প্রয়োগ ও বাধ্যবাধকতার অবকাশ নেই। এমনকি পূর্ববর্তী ধর্মগুলোতে অলৌকিক ঘটনাবলীর আকারে যে মনস্তাত্মিক বল প্রয়োগ প্রচলিত ছিল ইসলাম তাঁকেও প্রশ্রয় দেয়নি। ইসলামই একমাত্র বিধান, যা মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও চেতনা-অনুভূতির প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছে, তাকে অলৌকিক ঘটনা বা মোজেজার মাধ্যমে সম্মোহিত করা এবং মনস্তাত্মিক উপায়ে প্রলুব্ধ করার পরিবর্তে তাকে সাদাসিদে ভাষায় সম্বোধন করে ক্ষান্ত হয়েছে। তরবারীর শক্তি দ্বারা মানতে বাধ্য করার পন্থা সে কখনো অবলম্বন করেনি।
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ (البقرة)
"জীবন বিধানের ব্যাপারে বল প্রয়োগের অবকাশ নেই।"
ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ (النحل - ١٢٥)
"সদুপদেশ ও বিচক্ষণতার মাধ্যমে তোমার প্রভুর পথে আহ্বান জানাও। আর উত্তম পন্থায় বিতর্ক কর।"
কিন্তু কোরাইশরা প্রথম দিন থেকেই বস্তুগত শক্তি দ্বারা এই নতুন জীবন বিধানের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে। আল্লাহ তায়ালা যাকেই ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দিয়েছেন, তার ওপর তারা অমানুষিক নির্যানত চালিয়েছে। কিছু সংখ্যক মুসলমানকে তারা তাদের ঘর-বাড়ী, স্ত্রী-পুত্র-পরিজন থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছে। তাদেরকে পর্বতের গুহায় আটক রেখে সামাজিক 'বয়কট' করে অনাহারে মেরে ফেলার ষড়যন্ত্র করেছে। মোট কথা, মানুষকে ইসলাম থেকে দূরে রাখার জন্য বস্তুগত শক্তি ব্যবহারের কোনো পন্থাই তারা বাদ রাখেনি।
এমাতবস্থায় ইসলামের অনুসারীদেরকে জুলুম থেকে রক্ষা করা ছাড়া গত্যন্তর ছিল না-
اُذِنَ لِلَّذِيْنَ يُقَاتِلُوْنَ بِاَنَّهُمْ ظُلِمُوْا - وَاِنَّ اللهَ عَلٰى نَصْرِهِمْ لَقَدِيْرُ (الحج -٣٩)
"যাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে, তাদেরকে অস্ত্র ধারনের অনুমতি দেয় গেল। কেননা তারা মজলুম। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম।"
وَقَاتِلُوْا فِيْ سَبِيْلِ اللهِ الَّذِيْنَ يُقَاتِلُوْنَكُمْ وَلَا تَعْتَدُوْا اِنَّ اللهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِيْنَ - (البقرة - ١٩٠)
"যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করে, আল্লাহর পথে তাদের সাথে যুদ্ধ কর। অবশ্য বাড়াবাড়ি করো না। কারণ সেটা আল্লাহ পছন্দ করেন না।"
এরপর এক সময়ে সমগ্র আরব উপদ্বীপ ইসলামের ছায়াতলে এসে যায়। দেশ জয়ের ধারাবাহিকতা আরবের বাইরে পদার্পণ করে। প্রশ্ন জাগে যে, এই দেশ জয়ের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য কি ছিল?
আগেই বলেছি, ইসলাম আপনাকে একটা আন্তর্জাতিক মতাদর্শ ও বিশ্বজনীন জীবন বিধান পেশ করেছে। সে নিজেকে কোন বিশেষ উদ্দীপনার চতুসীমায় আবদ্ধ করতে পারে না। নিজের কল্যাণ ধারাকে সে বিশ্বের প্রতিটি কোণে এবং সমগ্র মানব জাতির নিকট পৌঁছিয়ে দিতে চায়। কিন্তু পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় রোম ও পারস্যের দুই বিশাল সাম্রাজ্য। তারা তাকে ধ্বংস করার জন্য ওৎ পেতে বসে থাকে। এই শক্তি ইসলামী আন্দোলনের নিশানবাহীদেরকে পৃথিবীতে ঘুরে ফিরে লোকদের নিকট ইসলামের মর্মবাণী পৌঁছে দেয়ার সুযোগ দিতে প্রস্তুত ছিল না। এমতাবস্থায় খোদায়ী বিধান ও সাধারণ মানুষের মাঝে যে রাষ্ট্রীয় শক্তি অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল তা অপসারণ করা ছাড়া ইসলামের গত্যন্তর ছিল না। এই বাধা অপসারণের পর সে মানুষকে একমাত্র আল্লাহর আনুগত্য করা এবং মানুষের আনুগত্য ও গোলামী থেকে মুক্ত হবার সুযোগ দেয়। বাতিল ব্যবস্থার স্থলে ইসলামী ব্যবস্থা কায়েম হবার এ হচ্ছে মর্মার্থ। এতে মানুষ অবাধ বাক-স্বাধীনতা লাভ করে। রাষ্ট্রীয় শক্তির রাধা অপসারিত হওয়া এবং আল্লাহর বিধানের বিজয়ের পর আনুগত্য শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে যায় এবং মানুষ মানুষের গোলামী থেকে মুক্তি লাভ করে। এরপর যার ইচ্ছা হবে স্বেচ্ছায়-সানন্দে ও পূর্ণ স্বাধিকার নিয়ে ইসলাম গ্রহণ করবে, যার ইচ্ছা হবে না-গ্রহণ করবে না। কেননা প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব নীতি নিজেরই নির্ধারণ করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে। কোরআনের নিম্নোক্ত ঘোষণায় দ্বীন বা আনুগত্যের কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হওয়ার এটাই মর্মার্থ-
وَقَاتِلُوْا هُمْ حَتَّى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونُ الدِّينَ كُلُّهُ لِلَّهِ (انفال (۳۹)
"এই কাফেরদের সাথে সংগ্রাম কর। যাবত আনুগত্য পুরাপুরيভাবে কেবলমাত্র আল্লাহর জন্য নির্দিষ্ট হয়ে না যায়।" এখানে দ্বীন শব্দের অর্থ হচ্ছে আনুগত্য। উদ্দেশ্য এই যে, মানুষ মানুষের কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্ব থেকে মুক্ত হয়ে আল্লাহর কর্তৃত্ব ও সার্বভৌমত্বের অধীন হবে। অতঃপর কোন বাধা বিপত্তি ও জোর-জবরদস্তি ছাড়াই নিজেদের আকিদা-বিশ্বাস নিজেরাই নির্বাচন করে নেবে।
এই ব্যাখ্যার আলোকে এটা স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, ইসলামের দেশ জয়মূলক ঘটনাবলী শক্তিমদমত্ত জাতি সমূহের শোষণ-নিষ্পেষণের উদ্দেশ্যে বিজাতির বিরুদ্ধে পরিচালিত সম্প্রসারণবাদী ও সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ সমূহ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ধরনের। এ যুদ্ধসমূহের তাৎপর্য শুধু এই যে, এগুলো ছিল ইসলামের আনীত নতুন আকিদা-বিশ্বাস ও মতাদর্শের মধ্যে ও অন্য জাতিগুলোর মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টিকারী রাষ্ট্রীয় শক্তি অপসারণের সংগ্রাম। এটা জাতিগুলোর জন্য ছিল নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সংগ্রাম, আর তাদের ওপর বস্তুগত শক্তির সাহায্যে খোদা হয়ে সওয়ার থাকা রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর বিরুদ্ধে ছিল বস্তুগত ও সশস্ত্র সংগ্রাম।
ইসলাম নিজেকে গোটা মানব জাতির জীবন বিধান মনে করে এবং নিজের প্রচার ও প্রসারের ব্যাপারে বস্তুগত শক্তি প্রয়োগ করে না। নিজের এই মূলনীতি অনুসারে সে বিশ্বের সমস্ত জাতির সামনে তিনটে পথ রেখেছে। প্রত্যেক জাতিকে তার একটা না একটা গ্রহণ করতে হবে- ইসলাম গ্রহণ, জিজিয়া দেয়ার মাধ্যমে সহযোগিতা ও আনুগত্য প্রকাশ অথবা যুদ্ধ।
বিশ্ববাসীর উদ্দেশ্যে তার "ইসলাম গ্রহণের" আহ্বান নিঃসন্দেহে ন্যায় সংগত। কারণ এটাই হলো একমাত্র হেদায়েতের পথ। এটা খোদা, মানুষ, জীবন ও জগত সম্পর্কে সর্বাধুনিক ও পরিপূর্ণতম মতবাদ। এটা সেই সিংহদ্বার- যেখান দিয়ে প্রবেশ করার পর একজন অমুসলিম সমস্ত মুসলমানের ভাই হয়ে যায়, মুসলমানদের মতই তার অধিকার এবং মুসলমানদের মতই তার কর্তব্য স্থির হয়। বর্ণে, বংশে, ধনে, মানে- কোন দিক দিয়ে অন্য কোন মুসলমান এই নতুন মুসলমানের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করতে পারে না।
জিযিয়ার আহ্বানও অনুরূপ। দেশ রক্ষার জন্য মুসলানদের জান পর্যন্ত বিসর্জন দিতে হয়। সমাজের স্বার্থ সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে তারা জাকাতও দেয়। একজন অমুসলিমও ইসলামী রাষ্ট্রের অধীন পূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তা লাভ করে। আভ্যন্তরীণ, বৈদেশিক এবং অন্য যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করার ব্যাপারে সে ইসলামী রাষ্ট্রের অন্য সকলের সাথে সমান অংশীদার। বার্ধক্যে কিংবা অক্ষমতায় সে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুবিধাও উপভোগ করতে পারে। এমতাবস্থায় ইনসাফ ও ন্যায়-নীতির দাবি এই যে, এ সব কাজে তারও নিজ অর্থ দ্বারা শরীক হওয়া উচিত। জাকাতে যেহেতু আর্থিক করের চেয়ে ইবাদতের বৈশিষ্ঠ্যই অধিকতর বিরাজমান, তাই ইসলাম তাদেরকে এই ইবাদাত পালনে বাধ্য করে না। কেননা ইসলামকে যারা গ্রহণ করেনি তাদের আবেগ অনুভূতিকেও ইসলাম শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখে। এ জন্য সে তাদের নিকট থেকে জাকাতের পরিবর্তে জিজিয়ার আকারে কর আদায় করে। জিজিয়া ধার্য করার সময় এ কথা লক্ষ্য রাখা হয়েছে যে, দেশের জন্য প্রাণ উৎসর্গ করার প্রয়োজন হলে সেটা শুধু মুসলমানরাই করে থাকে। এছাড়া জিজিয়া আনুগত্য ও আত্মসমর্পনেরও নিদর্শন। এ থেকে বোঝা যায় যে, জিজিয়া দানকারীরা শক্তির মাধ্যমে ইসলামের পথে বাধার সৃষ্টি করবে না এবং জনগণের কাছে ইসলাম পৌঁছে দেয়ার পথে কেউ অন্তরায় হবে না। এটাই ছিল ইসলামের উদ্দেশ্য।
সর্বশেষ পন্থা হচ্ছে যুদ্ধ। ইসলাম এবং জিজিয়া-এ দু'টোই প্রত্যাখ্যান করার অর্থ দাঁড়ায় এই যে, সে (অর্থাৎ অমুসলিম) ইসলাম ও সাধারণ মানুষের মাঝে অন্তরায় হয়ে থাকতে বদ্ধপরিকর। এমতাবস্থায় শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে প্রদর্শিত এই স্পর্ধাকে মুক্তি দিয়েই খতম করা অনিবার্য হয়ে পড়ে। কেননা এ ছাড়া এর আর কোন ওষুধ নেই।
ইসলাম বিজিত দেশগুলোতে নিজের মানবিক ও আন্তর্জাতিক কর্মসূচীকে যথাযথরূপে বাস্তবায়িত করেছে। ইসলাম গ্রহণ করলে সে সেই অধিবাসীদেরকে সকল ব্যাপারে মুসলমানদের সমান অধিকার দিয়েছে। জিজিয়া দিলেও তাদেরকে সব উচ্চতর মানবাধিকারে সমৃদ্ধ করেছে। এমন কি যুদ্ধের পরিস্থিতিতেও সে তাদের সাথে ব্যবহারে ইনসাফ ও মানবতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।'
কোন বিজিত দেশের শাসনকর্তা ইসলাম গ্রহণ করার পর ইসলাম যথারীতি তাদেরকে সেখানকার শাসনকর্তা হিসাবে বহাল রেখেছে। পারস্য বংশোদ্ভূত 'বাজান'কে হযরত আবু বকর (রাঃ) ইয়ামানের শাসনকর্তা হিসেবে বহাল রাখেন। এমনিভাবে 'সানা'র শাসনকর্তা পারসিক ফিরোজকে তার পদে নিয়োজিত রাখেন। আরব বংশোদ্ভূত কয়েস ইবনে আবদে ইয়াগুস যখন ফিরোজকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে তখন হযরত আবু বকর (রাঃ) আরবী মুসলমানের বিরুদ্ধে পারসিক মুসলমানের সাহায্য করেন এবং তাকে পুনরায় সেখানে এনে পূর্বপদে বহাল করেন। এমনিভাবে মুসলমানরা অধীনস্থ কর্মচারীদেরকে এবং আমীরের নিম্নপদস্থ অমুসলিম কর্মকর্তাদেরকে স্বপদে বহাল রাখেন।
যারা ইসলামও গ্রহণ করে না- এবং জিজিয়াও দিতে স্বীকৃত হয় না বরং যুদ্ধের পথ বেছে নেয়- সেই সব বিদ্রোহীর যাবতীয় ধন-সম্পদ বিজেতা কর্তৃক করায়ত্ব করা ইসলামী আইন অনুসারে সম্পূর্ণ বৈধ। এ সত্ত্বেও হযরত ওমরের (রাঃ) যুগে যখন পারস্য বিজিত হয়, তখন তিনি ইসলামের নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধের দাবিতে অন্য এক নীতি প্রবর্তন করেন। তিনি ভূমির ওপর যথারীতি ভূমি মালিকদের স্বত্বাধিকার স্বীকার করেন, তবে তার ওপর খাজনা ধার্য করেন। তিনি একাধারে দু'টো স্বার্থের প্রতি দৃষ্টি রাখেন। একটি হলো স্বয়ং বিজিত দেশগুলোর স্বার্থ, যদিও তারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল; তথাপি তিনি তাদের জীবিকার উপায় হরণ করতে চাননি। দ্বিতীয় স্বার্থ ছিল মুসলমানদের পরবর্তী বংশধরদের। সমস্ত ভূমি বর্তমান বিজেতাদেরকে দিয়ে দিলে ভবিষ্যত বংশধররা তার ফল থেকে বঞ্চিত হতো। তাই তিনি মনে করলেন, ভূমি থেকে খাজনা গ্রহণ করার পন্থাই উত্তম। এতে করে লব্ধ অর্থ সব সময় জনকল্যাণে ব্যয় করা যাবে এবং ভবিষ্যতের বংশধররাও তা থেকে যুক্তিসংগত অংশ পেতে থাকবে।
এটা একটা সর্ববাদী সম্মত সত্য কথা যে, বিজিত দেশগুলোর সাথে ইসলাম সর্বদা অতি উন্নতমানের মানবিক আচরণ করেছে। মানুষকে সে তার সৌন্দর্য, বৈশিষ্ঠ্য ও কল্যাণকর গুণাবলী দ্বারা উপকৃত হওয়ার অবাধ ও শর্তহীন সুযোগ দিয়েছে। অধিকন্তু এগুলো দ্বারা উপকৃত হওয়ার জন্য সে বর্ণ, বংশ, ভাষা ও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলকে আহ্বানও জানিয়েছে। প্রত্যেককে সমাজ কল্যাণের জন্য সম্ভাব্য সব কিছু করার সুযোগ দিয়েছে। ইসলামের একটা বিশেষ বিভাগে অর্থাৎ আইন ও ফেকাহ শাস্ত্রে বিজিত দেশের অধিবাসীরা ও দাস শ্রেণীর লোকেরা বিশেষ ব্যুৎপত্তি লাভ করেছিল। গণজীবনের কোন একটি উল্লেখযোগ্য বিভাগেও আরবদের একচেটিয়া কর্তৃত্ব ছিল না। এমনকি আমীর ও শাসনকর্তার পদেও এমন সব লোক নিযুক্ত করা হতো, যারা সংশ্লিষ্ট দেশের অতিরিক্ত রাজস্ব প্রথমে সে দেশের কল্যাণ খাতে ব্যয় করতো এবং এর শুধু অবশিষ্টাংশই কেন্দ্রীয় বাইতুল মালে জমা করতো। বিজিত দেশগুলো উপনিবেশের পর্যায়ভূক্ত ছিল না এবং বিজেতাদের জন্য দেশবাসীর জনমাল নিজেদের আরাম-আয়েশের জন্য ব্যবহার করার অবকাশও ছিল না। ঠিক অনুরূপভাবে ইসলাম 'বিজিত দেশগুলোর অধিবাসীদেরকে ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালনের অতুলনীয় স্বাধীনতা দিয়েছে। তাদের ইবাদতখানা, খানকা, গীর্জা এবং আলেমদের ও ধর্মযাজকদের সংরক্ষণের দায়িত্ব ইসলাম স্ব-হস্তে গ্রহণ করেছে। সে তাদের সাথে সম্পাদিত চুক্তি ও প্রতিশ্রুতিগুলো এমন সততা ও নিষ্ঠার সাথে পালন করেছে যার কোন নজীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক সম্বন্ধের ইতিহাসে মেলা দুষ্কর। আজও এ ব্যাপারে ইসলামের প্রবর্তিত রীতিই বহাল রয়েছে।
আধুনিক পাশ্চাত্য সভ্যতা হতভাগ্য উপনিবেশগুলোর সাথে যে ব্যবহার করে, তার সাথে যখন আমরা ইসলামের তুলনা করি, তখন ইসলামকে তার ইতিহাসের প্রত্যেক যুগে সবচেয়ে উদার, সবচেয়ে মহৎ ও সবচেয়ে পবিত্র আদর্শ হিসেবে উজ্জ্বল ও ভাস্বর দেখতে পাই। আজ আমরা দেখতে পাই যে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনুশীলন ও অর্থনৈতিক উন্নতি-অগ্রগতির ব্যাপারে পাশ্চাত্য সভ্যতার গুণ বৈশিষ্ঠ্য থেকে ঔপনিবেশিক দেশগুলোকে সুপরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হচ্ছে, যাতে যত দীর্ঘদিন সম্ভব তাদেরকে দুধের গাভীর মত দোহন করা যেতে পারে। তা ছাড়া ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত পর্যায়ে মানবীয় মান-সম্মান ও ভদ্র রীতি-নীতিকে জলাঞ্জলী দেয়া, ইচ্ছাকৃতভাবে নৈতিক নৈরাজ্য বিস্তার করা, গোষ্ঠীগত ও দলগত বিদ্বেষ সৃষ্টি করা ও তা সম্প্রসারিত করা এবং অর্থনৈতিক শোষণ-নিপীড়ন চালানো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর বদভ্যাসে পরিণত হয়েছে।
পাশ্চাত্যবাসীরা আজ ধর্মীয় স্বাধীনতার বড় বড় বুলি আওড়ান বটে কিন্তু তাদের পূর্বতন ইতিহাস স্পেনের তথাকথিত তদন্ত আদালতগুলোর পাশবিক শাস্তি এবং প্রাচ্যে ক্রুসেড যুদ্ধের নৃশংসতা দ্বারা কলংকিত। আজও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিছক একটি প্রদর্শনী মাত্র। উদাহরণ স্বরূপ দক্ষিণ সুদানে খৃষ্টান মিশনারীদের সকল সুযোগ সুবিধা থাকলেও মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। গত মহাযুদ্ধে জনৈক ইংরেজ সেনাপতি এ্যালেন বী (Allen by) বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করার সময়ে ইউরোপের প্রতিটি মানুষের মানসিকতার রূপ এই বলে তুলে ধরেন যে, "প্রকৃতপক্ষে 'ক্রুসেড যুদ্ধ' আজ শেষ হলো।" ফরাসী জেনারেল কাট্টো ১৯৪০ সালে দামেস্কে বিপ্লব অনুষ্ঠানের পর সেখানে দাঁড়িয়ে বলেন, "আমরা ক্রুসেড যোদ্ধাদের বংশধর। আমাদের সরকার যাদের পছন্দ না হয়, তারা এখান থেকে চলে যেতে পারে।" ঠিক এ ধরনেরই একটি কথা তার এক সম-মতাবলম্বী ১৯৪৫ সালে আলজিরিয়াতে বলেছিলেন।
সমাজতান্ত্রিক বিশ্বের অবস্থা আরো সাংঘাতিক। সেখানে মুসলমানদেরকে ক্রমশঃ নিশ্চিহ্ন করার অভিযান চলছে। মাত্র সিকি শতাব্দিতে রাশিয়ায় মুসলমানদের সংখ্যা চার কোটি দু'লাখ থেকে কমে দু'কোটি ছ'লাখে এসে দাঁড়িয়েছে। যে রেশন কার্ড ছাড়া সেখানে জীবন যাপনের উপায় উপকরণ মেলা সম্ভব নয় তা থেকেও আজকাল মুসলমানদেরকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। তাদেরকে বলা হয়, "তোমাদের যখন খুশী নামাজ পড়ার অনুমতি রয়েছে। কিন্তু সরকার তোমাদেরকে খাদ্য দিতে পারবে না। তোমরা তোমাদের খোদার কাছে খাদ্য চাও।" এমনি ব্যবহার তাদের সাথে যুগোস্লাভিয়া এবং অন্যান্য দেশেও করা হয়।
ইসলাম চিরদিনই সর্বাত্মক ও সার্বজনীন সামাজিক সুবিচারের এমন উন্নত দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে- যার ধারে কাছেও ইউরোপীয় সভ্যতা যেতে পারেনি। আর কোনদিন পারবেও না, কেননা ওটা হচ্ছে নিছক জড়বাদী ও বস্তুবাদী সভ্যতা। নরহত্যা, লুটতরাজ, রক্তপাত, হিংস্রতা ও নৃশংসতার ওপরই ওর ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত।

টিকাঃ
• এ সম্বন্ধে বিস্তারিত অধ্যয়নের জন্য গ্রন্থকারের "আসসালামুল আলমী আল-ইসলাম (বিশ্বশান্তি ও ইসলাম) এবং "দিরাসাতুন ইসলামিয়া'র 'ইসলামের দেশ জয়ের প্রকৃতি ও তাৎপর্য' অধ্যায় দ্রষ্টব্য।

📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা

📄 পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা


সবল ও দুর্বল, ধনী ও নির্ধন, ব্যক্তি ও সমাজ, শাসক ও শাসিত এবং এমনিভাবে সকল মানব মন্ডলীর মধ্যে দয়া, সহানুভূতি, হীতকামনা ও পারষ্পরিক সহযোগিতার যে গুণাবলী ইসলামের কাম্য সে সম্পর্কে ইতিহাস থেকে কতিপয় বাস্তব উদাহরণ পেশ করবো। ইসলামের দীর্ঘ ইতিহাস এ ধরনের উদাহরণ মালায় পরিপূর্ণ।
ইসলাম গ্রহণের সময় হযরত আবু বকরের (রাঃ) নিকট ব্যবসায়ের মুনাফালব্ধ চল্লিশ হাজার দিরহাম ছিল। ইসলাম গ্রহণের পরও তিনি ব্যবসা করে বিপুল অর্থ উপার্জন করেন। কিন্তু যেদিন তিনি তার মহান বন্ধু হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর সাথে মদিনায় হিজরত করেন সেদিন তার এত বড় পুঁজির মাত্র পাঁচ হাজার দিরহাম অবশিষ্ট ছিল। নিজের অবশিষ্ট সমস্ত পুঁজি তিনি নির্যাতিত নিপীড়িত মুসলিম গোলামদের স্বাধীন করার জন্য ব্যয় করেন, এ সম্পদ থেকে তিনি দরিদ্র সর্বহারাদেরকে সাহায্য করতেন।
হযরত ওমর (রাঃ) ছিলেন নিতান্ত দরিদ্র। খয়বরে তিনি এক টুকরো ভূমি লাভ করেন। তিনি রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকট এসে বলেন, "আমি খয়বরে খানিকটা জমি পেয়েছি। এত মূল্যবান সম্পত্তি আমি কোন দিন পাইনি। এ সম্পর্কে আপনার নির্দেশ কি?" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁকে বললেন, "যদি তোমার মনে চায়, তবে আসল জমি নিজের অধিকারে রেখে তার লভ্যাংশ দান করে দিও।"
হযরত ওমর (রাঃ) সেটা গরীব-দুঃখী, অভাবী আত্মীয়-স্বজনের জন্য, গোলামদেরকে স্বাধীন করার জন্য এবং দুর্বল-অক্ষম লোকদের সাহায্যে ও জনকল্যাণমূলক কার্যাবলীর জন্য ওয়াক্ফ করে দেন। এভাবে তিনি নিজের সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ আল্লাহর পথে দান করে কোরআনের এই উক্তির স্বার্থকতা প্রমাণ করেনঃ
لَنْ تَنَالُوا الْبِرَّ حَتَّى تُنْفِقُوا مِمَّا تُحِبُّونَ - (العمران -۹۲)
"তোমরা যতক্ষণ নিজেদের প্রিয় সম্পদকে আল্লাহর পথে ব্যয় না করবে ততক্ষণ প্রকৃত কল্যাণ অর্জনে সক্ষম হবে না।"
খেলাফতের পূর্বে হযরত ওসমানের নিকট সিরিয়া থেকে একটি বাণিজ্য বহর আসে। এই বহরে গম, জয়তুনের তেল ও মোনাক্কাবাহী এক হাজার উট ছিল। এই সময়ে দুর্ভিক্ষের দরুন মুসলমানগণ শোচনীয় দুর্দশায় পতিত ছিলেন। বহু ব্যবসায়ী তার কাছে এসে বলে, "দেশে খাদ্য দ্রব্যের চাহিদা কত তীব্র তাতো আপনি ভাল করেই জানেন। এই দ্রব্য সম্ভার আমাদের নিকট বিক্রি করে দিন।" হযরত ওসমান (রাঃ) বলেন, "স্বাচ্ছন্দে বিক্রি করতে পারি কিন্তু আমাকে কত মুনাফা দেবে তাই বল।" ব্যবসায়ীরা বললো, "দ্বিগুণ মূল্য দেব।" হযরত ওসমান (রাঃ) বলেন, "আমাকে তো এর চেয়ে অনেক বেশী মুনাফা দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।" তারা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, "আপনার বাণিজ্য বহর এইমাত্র এলো, আর ওটা পৌঁছামাত্রই আমরা মদিনার সমস্ত ব্যবসায়ী হাজির হয়েছি। অন্য কেউ তো আপনার সাথে আমাদের পূর্বে সাক্ষাত করেনি। তাহলে কোন ব্যক্তি আপনাকে এত মুনাফা দিতে চেয়েছে?” হযরত ওসমান (রাঃ) বলেন, "আল্লাহ তায়ালা আমাকে দশগুণ মুনাফা দেয়ার ওয়াদা করেছেন। তোমরা কি আমাকে এর চেয়ে বেশী দিতে পার?" তার বললো, "না"। তখন হযরত ওসমান (রাঃ) আল্লাহকে সাক্ষী করে ঘোষণা করলেন যে, “এই বাণিজ্য বহরের সমস্ত সম্পদ আল্লাহর উদ্দেশ্যে দরিদ্র ও মিসকিনদের জন্য সঙ্কা করে দিলাম।"
হযরত আলীর (রাঃ) পরিবারে একদিন মাত্র তিনটে জবের রুটি ছিল। এই রুটি কয়টি তিনি একজন ইয়াতিম, একজন মিসকিন ও একজন কয়েদীকে দান করে দিলেন। তিনি তাদেরকে তৃপ্তির সাথে খাইয়ে নিজে সপরিবারে অভূক্ত অবস্থায় নিদ্রা গেলেন।
হযরত হোসাইনের ওপর ঋণের চাপ বেড়ে গেছে। আবি নাইজারের নির্ঝরিনী তার মালিকানাধীন, ইচ্ছা করলে সেটা বিক্রী করে তিনি ঋণ পরিশোধ করতে পারেন। কিন্তু গরীব মুসলমানরা তা থেকে সেচ কার্য সম্পন্ন করে, সে জন্য তিনি তা বিক্রী করলেন না। অথচ বনু হাসেমের শ্রেষ্ঠ পরিবারের সন্তান হয়ে ঋণের বোঝা বয়ে বেড়াতে লাগলেন।
মদিনায় আনসাররা মুহাজেরদেরকে নিজ নিজ সম্পত্তি, ঘরবাড়ী সকল জিনিসেরই অংশীদার করেন। তাদেরকে নিজেদের ভাই বলে গ্রহণ করেন। তাদের পক্ষ থেকে দিয়াত (অনিচ্ছাকৃত হত্যা বা জখমের আর্থিক ক্ষতিপূরণ) দিয়ে দেন, তাদের কয়েদীদেরকে ফিদিয়া দিয়ে মুক্ত করেন। এক কথায় তাদেরকে সম্পূর্ণরূপে আপন করে নেন। কোরআনের ভাষায়ঃ
وَلَا يَجِدُوْنَ فِي صُدُوْرِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا وَيُؤْثِرُونَ عَلَى انْفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِ خَصَاحَةٌ (الحش)
"তারা যা কিছু মুহাজেরদেরকে দেয়, সে সম্পর্কে মনে কোনো কুণ্ঠা বা সংকোচ বোধ করে না। তারা নিজ স্বার্থের ওপর অপরের স্বার্থকে অগ্রগণ্য মনে করে, এমনকি যদি তাদেরকে অভূক্তও থাকতে হয়।"
বস্তুতঃ যতদিন মুসলিম দেশগুলো পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রভাবমুক্ত থাকে ততদিন তাদের সমাজ জীবনে এই প্রাণশক্তি সক্রিয় থাকে। জনাব আবদুর রহমান আযযাম তার গ্রন্থ "আর রিসালাতুল খালিদা"য় লিখেছেনঃ
"আমি উত্তর আফ্রিকার তাওয়ারেক গোত্রকে পারস্পরিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তার ভিত্তিতে জীবন যাপন করতে দেখেছি। তাদের গোত্রে কোন ব্যক্তিই শুধু নিজের জন্য নয় বরং গোটা সমাজের জন্য জীবন ধারণ করে। তারা যে কাজ সমাজের জন্য করে তাতেই তারা সবচেয়ে বেশী গর্ব অনুভব করে। একটা অপূর্ব ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের প্রতি আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়। জনৈক শহরবাসী ফরাসীদের এলাকা থেকে হিজরত করে তাওয়ারেকদের নিকট 'ফাজানে' বসবাস এবং তাদের কৃপাদৃষ্টির ওপর জীবিকা নির্বাহ করতে থাকে। অতঃপর সে জীবিকার সন্ধানে বের হয়। সে তাদের দানের প্রতিদান দিতেও সংকল্পবদ্ধ ছিল। সে তার পরিবার পরিজনকে ঐ মুসলিম গোত্রের তত্ত্বাবধানে রেখে আসে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশতঃ সে কোন চাকরীর সন্ধান পেলো না। সে আমাদের নিকট 'মিসরাতা' নামক স্থানে সাহায্যপ্রার্থী হয়ে এলো। আমরা তাকে, যাতে সে পরিবারবর্গের নিকট ফিরে যেতে পারে সেই পরিমাণ সাহায্য করলাম। কিন্তু সে প্রায় এক বছর পর আবার আমাদের নিকটে এলো। আমরা মনে করলাম যে, সে তার পরিবারবর্গের নিকট থেকে ফিরে আসছে। কিন্তু সে আমাদের ধারণা খন্ডন করে বলে যে, সে এখন নিজ পরিবারবর্গের নিকট যাওয়ার উপযুক্ত হয়েছে। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, "কিভাবে?" সে বললো, "গত সাক্ষাতের সময় আমি যে টাকা পেয়েছিলাম তা দিয়ে ব্যবসা করেছি। এখন আমার নিকট যে টাকা সঞ্চিত হয়েছে তা নিয়ে আমি তাওয়ারেকদের নিকট যেতে পারবো।" আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, "তুমি নিজের পরিবারবর্গের নিকট যাবে-না তাওয়ারেকদের নিকট?” সে বললো, "আমি প্রথমে তাওয়ারেকদের নিকট যাব, কেননা তার আমর অনুপস্থিতিতে আমার পরিবারবর্গের তত্ত্বাবধান করেছে। এখন আমি গিয়ে তাদের মধ্যে যারা নিজ পরিবার থেকে অনুপস্থিত রয়েছে তাদের পরিবারবর্গের ভরণ-পোষণ চালাবো এবং নিজের উপার্জিত অর্থ নিজের এবং প্রতিবেশীদের সন্তান-সন্ততির মধ্যে বন্টন করে দেব।" আমি জিজ্ঞাসা করলাম, "তোমাদের সমাজে কি প্রতিবেশীদের পারস্পরিক সম্পর্ক এরূপই?" সে বললো, "হাঁ, আমরা সকলে সুখ-দুঃখে পরস্পরের অংশীদার হই। আমরা বিদেশ থেকে খালি হাতে বাড়ী যেতে অত্যন্ত লজ্জাবোধ করি। কারণ আমাদের প্রতিবেশীরাও ঠিক আমাদের পরিবারবর্গের মতই আমাদের পথ চেয়ে থাকে।"
এই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করার পর গ্রন্থকার এ সম্পর্কে পর্যালোচনা করতে গিয়ে ঘটনার অত্যন্ত নির্ভুল ব্যাখ্যা দেনঃ
"সমাজ জীবনের এ বিচিত্র পদ্ধতি শুধু তাওয়ারেক গোত্র কিংবা বেদুঈন যাযাবরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটা তাদের গোত্রবাদেরও ফল নয়। এটাই হচ্ছে আসল ইসলামী পদ্ধতি। আধুনিক জড়বাদী ও বস্তুবাদী সভ্যতা থেকে যারা বহু দুরে অবস্থিত- সে সমস্ত গোত্রের মধ্যেই এ সমাজ ব্যবস্থার অত্যন্ত ব্যাপক প্রচলন পরিলক্ষিত হয়। আমি পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের বহু শহর বন্দরকে ইসলামী ভাবাপন্ন দেখেছি এবং শ্বেতাংগ-কৃষ্ণাংগ ও আরব-অনারব নির্বিশেষে সেখানকার অধিবাসীদের মধ্যে এরূপ সমাজ পদ্ধতির প্রচলন দেখেছি। আমি বহু জায়গায় আজও মুসলমানদেরকে পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতার ভিত্তিতে অত্যন্ত সুখী জীবন-যাপন করতে দেখেছি। তারা নিঃসন্দেহে পাশ্চাত্যের জড়বাদী সভ্যতার পূজারী কোটি কোটি মানুষের তুলনায় অধিক সুখী ও সমৃদ্ধিশালী। তারা আজও হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর কায়েম করা সমাজ-ব্যবস্থার খুবই নিকটবর্তী। পাশ্চাত্য পূজারী মানুষ সমাজের বিরাট ক্ষতি ও বিপর্যয়ের বিনিময়েও নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থের অগ্রাধিকারে বিশ্বাসী। নিজের ব্যক্তিগত খেয়াল-খুশী ও প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা চরিতার্থ করার জন্য প্রয়োজন হলে তারা নিজ পরিবারেরও স্বার্থ ক্ষুন্ন করতে দ্বিধা করে না, প্রতিবেশীর স্বার্থে সদ্ব্যবহারের তো প্রশ্ন ওঠে না।"
প্রকৃত ব্যাপার হলো, এই পারস্পরিক নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা ইসলামের প্রাণশক্তিরই সৃষ্টি। কিন্তু এটাকে শুধু ব্যক্তির ও সমাজের বিবেকের বা দয়া-মায়ার ওপর ছেড়ে দেয়া হয়নি। সরকারও এটা কার্যকরী করার ব্যবস্থা করতো। হযরত ওমর (রাঃ) কর্তৃক 'বাইতুল মাল' থেকে মাতৃদুগ্ধ ত্যাগী শিশু, বৃদ্ধ ও রুগ্ন লোকদের জন্য মাসিক বৃত্তি নির্ধারণ করা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এখানে উল্লেখযোগ্য যে, এই ব্যয়ের খাতগুলো জাকাতের সুপরিচিত ব্যয়ের খাত থেকে সম্পূর্ণ পৃথক ছিল। স্বীয় প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এ খাতকে ‘সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ (Social security) বলে অভিহিত করা যেতে পারে। তিনি দুর্ভিক্ষের সময় চুরির শাস্তি রহিত করেছিলেন। কেননা হয়তোবা তীব্র ক্ষুধা কাউকে চুরি করতে উদ্বুদ্ধ করে থাকবে। ইসলামে সন্দেহের ভিত্তিতে দন্ডবিধি মওকুফ করা হয়ে থাকে। নিম্নোক্ত ঘটনা সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বাস্তবায়নের সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত পেশ করে এবং এ থেকে ব্যক্তি মালিকানার প্রকৃত স্বরূপ ও সীমারেখা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বর্ণিত আছে যে, আব্দুল রহমান ইবনে হাতেব ইবনে আবি বালতায়া'র কতিপয় গোলাম মোজাইনা গোত্রের একটি উট চুরি করে। তাদেরকে ধরে হযরত ওমরের (রাঃ) দরবারে নেয়া হলে তারা চুরির কথা স্বীকার করে। হযরত ওমর (রাঃ) কাছির ইবনুচ্চালতকে নির্দেশ দেন তাদের হাত কেটে দিতে। সে যখন হুকুম তামিল করতে এগিয়ে গেল, ওমর (রাঃ) তাকে থামালেন এবং বললেন, "শোন, আমি জানতে পেরেছি যে, তোমরা ঐ গোলামদের থেকে প্রচুর পরিশ্রম নিয়ে থাক অথচ তাদেরকে অভুক্ত রাখ? এমনকি তাদের ক্ষুধা এত তীব্র হয় যে, তারা হারাম জিনিষ খেলেও তা বৈধ হয়। আমি খোদার শপথ করে বলছি যে, এটা জানতে না পারলে আমি ওদের হাত কেটে দিতাম।" অতঃপর তিনি আবদুর রহমান ইবনে আবি হাতেব ইবনে আবি বালতায়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "আমি ওদের হাত কাটলাম না সত্য, তবে তোমার ওপর এমন জরিমানা ধার্য করবো যে তুমি মজা টের পাবে।" তিনি মোজাইনা গোত্রীয় লোকটির নিকট জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমার উটের দাম কত?" সে বললো, "চারশো দিরহাম"। ওমর (রাঃ) ইবনে হাতেবকে বললেন, "যাও ওকে আটশো দিরহাম দিয়ে যাও।" তিনি গোলামদের চুরির শাস্তি ক্ষমা করে দিলেন। কেননা তাদের মনিব তাদেরকে অভুক্ত রেখে চুরি করতে বাধ্য করেছিল।
ইসলামের ইতিহাসে সামাজিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মর্যাদা অন্য এক দিক দিয়েও বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। সে দিকটি হচ্ছে তার সার্বজনীনতা। কেননা ইসলামের গন্ডী পেরিয়েও এ ব্যবস্থা অক্ষুন্ন থাকে।
একবার হযরত ওমর (রাঃ) এক অন্ধ বৃদ্ধকে দ্বারে দ্বারে ভিক্ষা করতে দেখেন। জিজ্ঞাসা করে তিনি জানাতে পারেন যে, সে ইহুদী। তিনি তার নিকট জিজ্ঞাসা করেন, "তুমি ভিক্ষা করছ কেন?” সে বললো, "জিজিয়া, অভাব ও বার্ধক্য- এই তিনে মিলে আমাকে ভিক্ষা করতে বাধ্য করেছে।" হযরত ওমর (রাঃ) তাকে হাত ধরে গৃহে নিয়ে গেলেন এবং তার সাময়িক প্রয়োজন পূরণের- উপযোগী অর্থ দিলেন। অতঃপর বাইতুল মালের তত্বাবধায়ককে বলে পাঠালেন, এই ব্যক্তি এবং এর মত অন্যান্য লোকদের খোঁজ নাও। খোদার শপথ, এটা আদৌ ইনসাফের কথা নয় যে, যৌবনে আমরা তার পরিশ্রমের ফল ভোগ করবো আর বার্ধক্যে তাকে অবজ্ঞাভরে তাড়িয়ে দেব। জাকাত দরিদ্র ও সর্বহারাদের প্রাপ্য। আর এ লোকটি আহলে কিতাবের একজন সর্বহারা।" তিনি তার এবং তার মত অন্যান্য লোকদের জিজিয়া মওকুফ করে দেন।
দামেস্ক সফরের সময়ে তিনি একটি গ্রামের কাছ দিয়ে পথ অতিক্রম করেন। তিনি জানতে পারেন যে, সেখানে কতিপয় খৃষ্টান কুষ্ঠরোগী বাস করে। তিনি তাদেরকে জাকাতের তহবিল থেকে সাহায্য দান এবং তাদের জন্য রেশনে খাদ্য সরবরাহ করা নির্দেশ দেন।
তেরশো বছরেরও বেশী অতিক্রান্ত হয়ে গেছে। ইসলামের প্রাণশক্তি ওমরকে মানবতার সেই সুমহান স্তরে অধিষ্ঠিত করেছিল, যেখান থেকে তিনি সামাজিক নিরাপত্তাকে একটি সার্বজনীন মানবাধিকারের মর্যাদা দান করেন। এই অধিকার অর্জনের জন্য কোন বিশেষ ধর্ম অথবা সম্প্রদায়ের শর্ত ছিল না- কোন শরিয়ত এবং কি আকিদার অনুসারী তাও দেখার প্রয়োজন ছিল না।
এটা হচ্ছে সেই সু-উচ্চ স্তর যেখানে পৌঁছতে মানবতার পদদ্বয় ক্লান্ত হয়ে পড়েছে এবং সে এখনো তা থেকে বহু দূরে রয়েছে।

📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 রাজনৈতিক ব্যবস্থা

📄 রাজনৈতিক ব্যবস্থা


ইতিহাস সাক্ষী যে, একটি সু-সংহত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিক দিয়ে ইসলামের একটি দুর্লভ ও আদর্শ যুগ অতিবাহিত হয়েছে। নিদারুণ পরিতাপের বিষয় এই যে, ইসলামের এ যুগ বেশী দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেনি। আগামীতে আমরা এর প্রকৃত কারণ অনুধাবনের চেষ্টা করবো। কোন কোন ব্যক্তির ধারণা এই যে, এই কারণ স্বয়ং ইসলামের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূল প্রকৃতিতেই নিহিত রয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই কারণ তার অভ্যন্তরেই নিহিত না বাইরে-তা আমরা পরে আলোচনা করবো। প্রথমে আমরা রাজনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করবো। কেননা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সব সময় রাজনৈতিক ব্যবস্থার অধীন এবং তার প্রকৃতির অনুসারী হয়ে থাকে।
নবী করীম (সঃ)-এর ইন্তেকালের সময় ঘনিয়ে এলে একদিন তিনি হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে নামাজের ইমামতী করার নির্দেশ দিলেন। এতে হযরত আয়েশা (রাঃ) এই যুক্তি দেখিয়ে আপত্তি জ্ঞাপন করেন যে, আবু বকর (রাঃ) এর হৃদয় অত্যন্ত কোমল। তাই নামাজের ইমামতী করলে লোকেরা তার আওয়াজ শুনতে পাবে না, তাঁকে তার নির্দেশ পুনর্বিবেচনার অনুরোধ করেন। এতে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) রেগে যান এবং আবু বকর (রাঃ)-কে ইমামতী করার জন্যে ডেকে আনার ওপর জোর দেন।
প্রশ্ন এই যে, এর অর্থ কি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাকে খলিফা নিযুক্ত করে গেছেন? মুসলমানরা কি এ দ্বারা স্পষ্টতঃ তাই বুঝেছিলেন?
আমাদের মতে এ দু'টোই নিতান্ত অযৌক্তিক কথা। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যদি খলিফা নিযুক্ত করে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত করতেন এবং ইসলামে যদি খলিফা মনোনীত করার বিধানই থাকতো তাহলে তিনি যেমন ইসলামের অন্যান্য বিধি ও নীতি সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন, এটাও সেরূপ করতেন। আর মুসলমানরাও যদি স্পষ্ট বুঝে থাকতেন যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবু বকরকে খলিফা নিযুক্ত করে গেছেন-তাহলে সাকিফা নামক স্থানে মোহাজের ও আনসারদের মধ্যে খলিফা নিয়ে যে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় তার প্রশ্নই উঠতো না। কারণ আনসাররা কখনো রাসূলুল্লাহর (সাঃ) সিদ্ধান্তে আপত্তি করার মত লোক ছিলেন না।
প্রকৃতপক্ষে খেলাফতের গোটা ব্যাপারটাকেই মুসলমানদের পারস্পরিক পরামর্শের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। লোকেরা পূর্ণ স্বাধীনতা ও সম্মতির সাথে খেলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি নির্বাচন করবে-এটাই ছিল উদ্দেশ্য। সাকিফায় অনুষ্ঠিত আলোচনার পর যদি এই সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে যে, খলিফা মুহাজেরদের মধ্যে থেকে হবে-তাহলে সেটা ইসলামের কোন নির্দিষ্ট বিধান ছিল না বরং মুসলমানদের পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত একটা সিদ্ধান্ত। আনসাররা এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করলে তাতে কেউ আপত্তি করতে পারতো না। কিন্তু বাস্তবে যা হয়েছিল তাহলো এই যে, আনসাররা হযরত আবু বকরের খেলাফতে সম্মত হয়ে যান। কেননা তিনি অন্য সকলের চেয়ে যোগ্য ব্যক্তি ছিলেন। অবশ্য মদিনায় আওস ও খাসরাজ গোত্র আঞ্চলিকতা ভিত্তিক বিদ্বেষ উস্কিয়ে দিয়ে ব্যাপারটা ঘোলাটে করতে চেয়েছিল কিন্তু আনসাররা সে চক্রান্ত ব্যর্থ করে দেন।
এ ক্ষেত্রে খলিফা মোহাজেরদের মধ্য থেকে হবে, এ সিদ্ধান্তের অর্থ এ নয় যে, খলিফা কোরেশ বংশের মধ্য থেকেই হতে হবে, যদি তাই হতো তাহলে হযরত ওমর (রাঃ) পরামর্শ পরিষদ নিযুক্ত করার সময় বলতেন না যে "হোজায়ফার গোলাম সালেম জীবিত থাকলে আমি তাকে খলিফা নিযুক্ত করতাম।" জানা কথা যে, সালেম (রাঃ) কোরেশ বংশোদ্ভূত ছিলেন না। তাছাড়া ইসলামের মূলনীতি অনুসারেও কোন কোরেশীকে শুধু 'কোরেশী' এবং রাসূলুল্লাহর (সাঃ) বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে অন্যান্য মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে আখ্যায়িত করা যায় না। স্বয়ং হযরত রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ-
مَنْ أَبْطَاعَ بِهِ عَمَلُهُ لَمْ يُسْرِعْ بِهِ نَسبه (مسلم - ابوداؤد -ترمذی)
"যার কার্যকলাপ তাকে পিছিয়ে দেয় তার বংশ-মর্যাদা তাকে এগিয়ে দিতে পারবে না।"
হযরত আবু বকর (রাঃ) হযরত ওমর (রাঃ) কে খলিফা নিযুক্ত করে গিয়েছিলেন। কিন্তু তার অর্থ এ নয় যে তিনি মুসলমানদেরকে বাধ্য করে গিয়েছিলেন। তার এই নিয়োগকে রদ করার পূর্ণ অধিকার তাদের ছিল। হযরত ওমর (রাঃ) আবু বকরের নিয়োগের ফলে নয় বরং লোকদের নির্বাচনের ফলেই খলিফা হয়েছিলেন। এমনিভাবে হযরত ওমর (রাঃ) ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরামর্শ পরিষদ গঠন করেন। এই পরিষদকে নিজেদের মধ্য হতে একজনকে খলিফা নির্বাচনের জন্য তিনি নির্দেশ দিয়ে যান। কিন্তু মুসলমানদের ওপর সেই ছয়জনের একজনকে খলিফা মেনে নেয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল না। তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মধ্য থেকেই একজনকে নির্বাচিত করেন। কারণ প্রকৃতপক্ষে তখনকার মুসলিম উম্মতের মধ্যে ওই ছয়জনই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন।
হযরত আলীর (রাঃ) নির্বাচনের সময় মতভেদ দেখা দেয়। এই মতভেদের দরুন প্রথমবারের মত মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। এর পরিণামেই একে একে এমন সব হৃদয়বিদারক ঘটনা সংঘটিত হয় যে, ইসলামের প্রাণশক্তি, তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূলনীতি এবং জীবনের অন্যান্য বিভাগে তার প্রবর্তিত চিন্তাধারা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এই সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে শাসন পদ্ধতি সম্পর্কে ইসলামের আসল মতাদর্শ আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেটা হচ্ছে এই যে, কেবলমাত্র মুসলমানদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ভিত্তিতেই কোন ব্যক্তি শাসকের মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হতে পারে। হযরত আলী (রাঃ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর চাচাতো ভাই, তার জামাতা এবং তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ছিলেন। এসব জেনে বুঝেও মুসলমানরা তাকে অনেক বিলম্বে খেলাফতের আসনে অধিষ্ঠিত করেন। হয়তো বা হযরত আলীকে এরূপ বিলম্বিত করা বিশেষতঃ হযরত ওমরের পর-তার অধিকার ক্ষুন্ন করারই নামান্তর। কিন্তু একথা অনস্বীকার্য যে, এই বিলম্ব দ্বারাই ইসলামের শাসন পদ্ধতির সর্বাপেক্ষা নিখুঁত মূল্যায়ন সম্ভব হয়েছে। এতে করে এই বৃহত্তর কল্যাণ সাধিত হয়েছে যে উত্তরাধিকারের ধারণা খেলাফতের আসনের ধারে-কাছেও ঘেঁষতে পারেনি। কারণ এ ধারণা ইসলামের প্রাণসত্তা ও তার মূলনীতিসমূহ থেকে সবচেয়ে দূরত্বে অবস্থিত। হযরত আলীর প্রতি ব্যক্তিগতভাবে একটু অবিচার হলেও এই আদর্শের বাস্তব রূপায়ন যে তার চেয়েও গুরুতর, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এরপরে এলো বনু উমাইয়ার যুগ। তারা ইসলামী খেলাফতকে বনু উমাইয়া বংশের মধ্যে সীমিতই শুধু করলো না বরং এক স্বৈরাচারী রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করলো। এটা ইসলামের শিক্ষার ফল ছিল না বরং এটা ছিল "জাহেলিয়াতের" প্রভাব। জাহেলিয়াতের এই প্রভাব ইসলামের প্রাণ শক্তিকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
এখানে ইয়াজিদের নিয়োগ ও 'বাইয়াত' কিভাবে সম্পন্ন হয়েছিল সে সম্পর্কে কতিপয় রেওয়ায়েত পেশ করলেই ব্যাপরটা স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 শাসন পদ্ধতির কতিপয় নমুনা

📄 শাসন পদ্ধতির কতিপয় নমুনা


এই সত্যের সঠিক উপলব্ধির ব্যাপারে সহায়তা করার জন্য আমরা খেলাফতে রাশেদার বিভিন্ন যুগ যথাঃ হযরত আবু বকর ও ওমরের যুগ, হযরত ওসমান ও মারওয়ানের যুগ, অতঃপর হযরত আলীর যুগ এবং এমনিভাবে আব্বাসী ও উমাইয়া যুগ থেকে শাসন পদ্ধতির কতিপয় বাস্তব নমুনা পেশ করার চেষ্টা করবো।
যখন মুসলমানগণ হযরত আবু বকর (রাঃ)-কে খেলাফতের আসনে অভিষিক্ত করেন, তখন তাঁর দৃষ্টিতে মুসলমানদের ওপর আল্লাহর দ্বীন ও শরিয়তকে বাস্তবায়িত করা ছাড়া অন্য কোন কাজ ছিল না। এ ধরনের কোন চিন্তা তার ধারে কাছেও যেতে পারেনি যে, ইতিপূর্বে সাধারণ নাগরিক হিসেবে তার ওপর যে সব কাজ হারাম ছিল এখন তা এ পদের জন্য হালাল হয়ে যাবে। অথবা আগে যে সব অধিকার ছিল না, তেমন কোন নতুন অধিকার তিনি পাচ্ছেন কিংবা তার ওপর যে সব দায়িত্ব ও কর্তব্য এতদিন ছিল, এখন তা থেকে তিনি মুক্ত হয়ে যাচ্ছেন।
সাকিফায় যখন তার অভিষেক অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয় তখন তিনি নিম্নরূপ ভাষণ দেন, "আমি যদি আমার দায়িত্বসমূহ সুচারুরূপে পালন করি তাহলে তোমরা আমার সাহায্য ও সহযোগিতা করবে। আর যদি আমি বাঁকা পথে চলতে আরম্ভ করি, তাহলে তোমরা আমাকে সোজা করে দেবে। সত্যবাদিতা হচ্ছে বিশ্বস্ততা আর মিথ্যাবাদিতা হচ্ছে বিশ্বাসঘাতকতা। তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সবচেয়ে দুর্বল, সে আমার দৃষ্টিতে সবচেয়ে সবল-যাবত আমি তাকে তার অধিকার না দিয়ে দেই। আর যে ব্যক্তি সবচেয়ে শক্তিশালী, সে আমার নিকট সবচেয়ে দুর্বল-যাবত আমি তার নিকট থেকে রাষ্ট্রের অধিকার আদায় করি। মনে রেখো, কোন জাতি যখনি জেহাদ থেকে পিছপা হয়, তখনই আল্লাহ তাকে অপদস্থ ও লাঞ্ছিত করেন। যখনি কোন জাতি অশ্লীলতায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে, তখনই আল্লাহ তায়ালা সকলের ওপর পাইকারীভাবে আজাব নাজিল করেন। যতক্ষণ আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য করতে থাকবো, ততক্ষণ তোমরা আমার আদেশ মান্য করবে। আর যদি আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের আনুগত্য থেকে বিচ্যুত হই, তখন তোমাদের ওপর আমার আদেশ পালনের দায়িত্ব থাকবে না।"
হযরত আবু বকরের বাড়ী মদিনার পার্শ্ববর্তী 'সাহে' অবস্থিত ছিল। একটা ক্ষুদ্র মামুলী ধরনের বাড়ী। খলিফা হবার পরও তিনি সে বাড়ীতে অবস্থান করেন। নতুন বাড়ীও নির্মাণ করেননি কিংবা সেই বাড়ী মেরামতও করাননি। সেই বাড়ী থেকে মদিনা পর্যন্ত তিনি প্রতিদিন সকালে ও বিকালে পদব্রজে আসা- যাওয়া করতেন। কখনো কখনো একটা ঘোড়া ব্যবহার করতেন কিন্তু সেটা বাইতুল মালের ছিল না, ছিল ব্যক্তিগত। পরে কাজের চাপ বেড়ে গেলে তিনি মদিনায় চলে আসেন।
তিনি ব্যবসায় দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করতেন। খলিফা নির্বাচিত হবার পরের দিন যখন ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে রওনা করেছেন, তখন মুসলমানরা তাকে থামিয়ে বললেন, "খেলাফতের দায়িত্ব ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে সঙ্গে যথারীতি পালন করা যাবে না।" তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "আমি যখন জীবিকা নির্বাহের অন্য কোন পন্থা জানি না তখন আমার চলবে কি করে?" সবাই তার বিষয় বিবেচনা করলেন এবং তার ব্যবসায় করতে না পারা ও খেলাফতের সার্বক্ষনিক দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে 'বাইতুল মাল' থেকে তার পরিবারবর্গের বরণ-পোষণের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ বেতন নির্ধারণ করেন।
এ সত্ত্বেও তিনি মৃত্যুকালে অছিয়ত করেন যে তিনি 'বাইতুল মাল' থেকে যা কিছু গ্রহণ করেছেন তা যেন হিসাব করে তার জমি-জমা ও অন্যান্য সম্পত্তি থেকে গ্রহণ করে বাইতুল মালে জমা দেয়া হয়।
ইসলাম শাসক ও শাসিতের বিবেক ও মন-মগজে যে চেতনা ও দায়িত্বানুভূতি জাগিয়ে তোলে তারই প্রভাবাধীনে উজ্জীবিত হয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) প্রতিটি প্রজার অভাব অভিযোগ দূর করার জন্য নিজেকে ব্যক্তিগতভাবে দায়ী মনে করতেন। তিনি সানহে অবস্থানকালে তার পার্শ্ববর্তী দুর্বল ও অসহায় প্রতিবেশীদের ছাগলের দুধ প্রতিদিন দুইয়ে দিতেন। যখন তিনি খলিফার পদে অধিষ্ঠিত হন তখন তাঁর প্রতিবেশীর একটি শিশু মেয়ে তাকে বলে, "এখনতো আপনি আর আমাদের ছাগল দুইয়ে দেবেন না, তাই না?" আবু বকর (রাঃ) বলেন, "কেন দেব না? নিশ্চয় দুইয়ে দেব।" তিনি যথার্থই তাদের দুধ দুইয়ে দেয়া অব্যাহত রাখলেন। কখনো কখনো ছাগলের মালিক বালিকাকে তিনি জিজ্ঞাসা করতেন, 'খালি দুধ দুইয়ে দেব, না মাখনও বের করবো?" কখনো সে বলতো, "মাখন বের করে দাও।" আবার কখনো বলতো, "খালি দুধ রেখে দাও।" মোট কথা সে যা বলতো, তিনি তাই করতেন।
হযরত আবু বকরের খেলাফতকালে হযরত ওমর (রাঃ) মদিনায় একটি অন্ধ মহিলার তত্ত্বাবধান করতেন। কিছুদিন যেতে না যেতেই দেখেন, তিনি যাওয়ার আগেই কে এসে মহিলাটির কাজ করে দিয়ে যায়। এরূপ প্রতিদিন হতে লাগলো। একদিন গোপনে লুকিয়ে বসে থাকেন। দেখেন যে, হযরত আবু বকর (রাঃ) এসে মহিলাটির সব কাজ করে দিয়ে যান। খেলাফত এবং তার গুরুদায়িত্ব তাকে এ কাজ থেকে নিরস্ত করতে পারেনি। তাকে দেখামাত্র হযরত ওমর (রাঃ) চিৎকার করে বলে উঠলেনঃ "নিশ্চয়ই আপনি। খোদার শপথ আপনিই (প্রতিদিন এই কাজ করে থাকেন)।"
এটা হলো হযরত আবু বকরের শাসন নীতির কয়েকটা সাধারণ নমুনা! তার স্থলে যখন হযরত ওমর এলেন তখনও এই নীতি অক্ষুন্ন ছিল। ওমর (রাঃ) কখনো খেলাফতকে নিজের একটা বাড়তি অধিকার হিসাবে গ্রহণ করেননি। তবে বাড়তি দায়িত্ব অবশ্যই মনে করেছেন। বলা বাহুল্য সে দায়িত্ব আল্লাহর আইন জারী করা ছাড়া আর কিছু নয়।
'বাইয়াত' অনুষ্ঠানে তিনি যে ভাষণ দেন তাতে বলেন, "ভাই সব! আমি তোমাদেরই একজন। তার চেয়ে বেশী কিছু নই। যদি খালিফাতুর রসূলের (হযরত আবু বকর) অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা সংগত হতো তাহলে আমি কিছুতেই তোমাদের এ দায়িত্ব গ্রহণ করতাম না।"
অপর এক ভাষণে তিনি বলেন, "আমার ওপর তোমাদের সম্পর্কে কতিপয় দায়িত্ব অর্পিত আছে সেগুলো আমি উল্লেখ করছি। এগুলো সম্পর্কে তোমরা সব সময় আমার কাছে হিসাব চাইবে। তোমাদের খাজনা ও কর আদায় করা আমার দায়িত্ব। আমি তোমাদের মধ্যে সততার সাথে ধন বন্টন করবো, তোমাদেরকে বিপদের মুখে নিক্ষেপ করবো না, বেশীদিন সীমান্ত রাখবো না এবং যুদ্ধের জন্যে বিদেশে থাকাকালে তোমাদের পরিবার বর্গের তত্ত্বাবধান করবো।"
তিনি বলতেন, "আমি আল্লাহর মালকে নিজের পক্ষে ইয়াতিমের মালের সমতুল্য মনে করি। প্রয়োজন না হলে স্পর্শ করবো না আর প্রয়োজন হলে সততার সাথে গ্রহণ করবো।"
একবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয় যে, "আল্লাহর মাল থেকে আপনি কতটুকু গ্রহণ করা নিজের পক্ষে বৈধ মনে করেন?" তিনি উত্তরে বলেন, "শীত ও গ্রীষ্মের জন্যে দু'খানা কাপড়, হজ্জ-ওমরার জন্যে সওয়ারীর জন্তু এবং কোরেশের কোন মাঝারী পরিবারের সমমানের খাদ্য আমার পরিবারবর্গের জন্য। এর পরে আমি সাধারণ মুসলমানের মতই একজন মুসলমান। তারা যা পাবে আমিও তাই পাব।"
সাধারণতঃ তিনি এভাবেই জীবন যাপন করতেন। কিন্তু কখনো কখনো তিনি নিজের জন্য যা তিনি বৈধ বলে ঘোষণা করেছেন তার ব্যাপারেও অসাধারণ কঠোরতা প্রয়োগ করতেন। একদিন তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লেন। চিকিৎসার জন্য মধু ব্যবহার করতে বলা হলো।
বাইতুল মালে প্রচুর মধু ছিল। তিনি মিম্বরে আরোহন করে বললেন : "তোমরা অনুমতি দিলে মধু ব্যবহার করতে পারি নইলে এটা আমার জন্য হারাম।" তৎক্ষণাৎ উপস্থিত সবাই অনুমতি দিয়ে দিল।
মুসলমানরা হযরত ওমরের এই কঠোরতা দেখে তাঁর কন্যা উম্মুল মোমিনীন হযরত হাফসা (রাঃ) এর নিকট গিয়ে বললেন, "ওমর (রাঃ) নিজের ব্যাপারে কৃচ্ছতার সীমা ছাড়িয়ে গেছেন। বর্তমান সময়ে আল্লাহ তায়ালা স্বচ্ছলতা দান করছেন। যুদ্ধ লব্ধ সম্পদ থেকে তাঁর ইচ্ছামত ও প্রয়োজনমত গ্রহণ করা উচিত। মুসলমানদের পক্ষ থেকে তাদের এরূপ করার পূর্ণ অনুমতি রয়েছে।" হযরত হাফসা যখন হযরত ওমর (রাঃ) কে এ কথা বললেন তখন তিনি জবাব দিলেন, "হাফসা, তুমি তোমার জাতির পক্ষপাতিত্ব করেছ আর নিজের পিতার সাথে অহিতাকাংখী সুলভ আচরণ করেছ। আমার পরিবারভুক্ত লোকদের আমার জান ও মালে অধিকার রয়েছে, কিন্তু আমার ধর্ম ও আমানতদারীতে কোন অধিকার নেই।"
তিনি নিজের ও নিজের প্রজাদের মধ্যে সাম্যের ওপর অত্যাধিক গুরুত্ব দিতেন। যখন বিখ্যাত আমুর রমাদা'র দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় তখন হযরত ওমর (রাঃ) শপথ করেন যে যতদিন স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসবে ততদিন তিনি ঘি ও গোশত স্পর্শ করবেন না। তিনি এই প্রতিজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেন। ফলে তেল খেতে খেতে তার শরীরের চামড়া শুকিয়ে কালো হয়ে যায়। এর কিছু দিন পর বাজারে দুটো পাত্রে দুধ ও ঘি বিক্রি হতে দেখা গেল। হযরত ওমরের জনৈক ভৃত্য চল্লিশ দিরহাম দ্বারা তা কিনে নিয়ে এলো। সে এসে তাকে বললো, এখন আল্লাহ আপনার প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করে দিয়েছেন। বাজারে দুধ ও ঘি বিক্রির জন্য এসেছে, আমি তা কিনে নিয়ে এসেছি। কিন্তু যখন তিনি তার দাম জানতে পারলেন তখন বললেন, "খুব চড়া দামে কিনেছো দুটোই সদকা করে দাও। আমি অপব্যয় করে খাওয়া পছন্দ করি না।" মাথা নীচু করে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। অতপর বললেন, "জনগণের যে দুরবস্থা হয় তা যদি আমারও না হয় তাহলে তাদের সমস্যার গুরুত্ব আমি কি করে বুঝবো।"
ওমরের (রাঃ) মত ছিল যে জিনিস থেকে প্রজারা বঞ্চিত তা থেকে তার নিজেরও বঞ্চিত হওয়া উচিত। যেমন তিনি নিজেই বলেছিলেন, তার মনের কোন কোণেও এরূপ ধারণা বিদ্যমান ছিল না যে, খেলাফতের পদে অভিষিক্ত হয়ে তিনি কোনরূপ বিশেষ সুযোগ-সুবিধার অধিকারী হয়েছেন। তিনি মনে করতেন যে এ ব্যাপারে তিনি যদি সাম্য ও সুবিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত না হন তাহলে জনগণের আনুগত্য লাভের কোন অধিকারই তার থাকবে না। এ থেকে ইসলামের রাজনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি জানা যায়। তা হচ্ছে এই যে, কোন শাসক আল্লাহর আইন কার্যকরী করা এবং আল্লাহর সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা সত্ত্বেও নিজের বিচার ফায়সালায় ইনসাফ ও ন্যায়-নীতি রক্ষা না করলে আনুগত্য লাভের যোগ্য হতে পারে না। হযরত ওমরের (রাঃ) মনে ইসলামের এই মূলনীতি অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বদ্ধমূল ছিল এবং এ সম্পর্কে অনুভূতি সব সময় জাগরূক থাকতো।
একবার তিনি এক ব্যক্তির সাথে একটি ঘোড়ার দরদপ্তর করেন। এরপরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার উদ্দেশ্যে সেটায় সওয়ার হয়ে দৌড়াদৌড়ি করেন। ইত্যবসরে ঘোড়া ঠোকর খেয়ে পড়ে যায় এবং আহত হয়। তিনি ঘোড়া ফিরিয়ে দিতে চাইলেন। কিন্তু মালিক ঘোড়া ফেরত নিতে অসম্মতি প্রকাশ করলো। শেষ পর্যন্ত উভয়ে মোকদ্দমা নিয়ে বিচারপতি শোরাইহের আদালতে গিয়ে হাজির হলেন। শোরাইহ উভয় পক্ষের বিবৃতি শ্রবণের পর বললেন, "আমিরুল মোমিনীন! আপনি যে জিনিস কিনেছেন তা নিয়ে নিন। নচেৎ ওটা যে অবস্থায় নিয়েছিলেন সে অবস্থায় ফেরত দিন।" ওমর বে-ইখতিয়ার বলে ওঠলেন, "একেই বলে ন্যায় বিচার।" অতঃপর তিনি শোরাইহকে তার ন্যায় বিচারে সন্তুষ্ট হয়ে কুফার বিচারপতি নিযুক্ত করেন।
যখন হযরত ওমরের নীতি নিজের ব্যাপারেই এত কঠিন ছিল তখন খলিফার আত্মীয় স্বজন ও অন্যান্য নাগরিকের বেলায় কোন বৈষম্যমূলক আচরণের তো প্রশ্নই ওঠে না। উদাহরণ স্বরূপ, যখন তার পুত্র আব্দুর রহমান মদ পান করেন তখন তার ওপর ইসলামী দন্ড জারী করা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। এ সম্পর্কে তার ঘটনা সর্বজন বিদিত। এমনিভাবে আমর ইবনুল আসের পুত্র জনৈক মিশরীয় বালকের ওপর অত্যাচার করলে তাকে শরিয়তের দন্ড বিধি অনুযায়ী শাস্তি দেয়া হয়।
কর্মচারীদের ব্যাপারে তার নীতি ছিল, ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের নিকট যে অতিরিক্ত সম্পদ পাওয়া যেত, সে সম্পর্কে তাদেরকে জবাবদিহী করতে হতো। মুসলমানদের ক্ষতি করে কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঐ সম্পদ সঞ্চিত হয়েছে কিনা সে ব্যাপারে পুংখানুপুংখরূপে তদন্ত করা হতো! "সম্পদ কিভাবে অর্জিত হলো?" -এটা ছিল একটি মৌলিক প্রশ্ন এবং এ অনুসারে তিনি যখনই কোন কর্মচারীর মধ্যে দুর্নীতির সন্দেহ বোধ করেছেন তখনই কৈফিয়ত তলব করেছেন। মিশরের শাসনকর্তা আমর ইবনুল আসের অর্ধেক সম্পত্তি এই অনুসারেই বাজেয়াপ্ত করে বাইতুল মালে জমা করা হয়। কুফাস্থ প্রতিনিধি সাদ ইবনে আবি আক্কাসের সাথেও তিনি এ নীতি অবলম্বন করেন। এমনিভাবে বাহরাইনের শাসনকর্তা হযরত আবু হোরাইরার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন।
হযরত ওমরের রাজনীতির সংক্ষিপ্তসার হচ্ছে এই যে, প্রজারা ইসলামের চতুর্সীমার মধ্যে থেকে সরকারের আনুগত্য ও হীত কামনা করবে, আর সরকার করবে ন্যায়বিচার ও সর্বাঙ্গীন জনকল্যাণ। এ জন্যেই তিনি তার একজন সাধারণ প্রজার এ উক্তি স্বীকার করেন যে, "যদি তোমার মধ্যে আমরা গোমরাহী দেখি তবে আমরা তরবারী দ্বারা সোজা করে দেব।" অর্থাৎ কিনা তিনি মেনে নিলেন যে, প্রজাদের শাসকের সমালোচনা ও সংশোধনের অধিকার রয়েছে। একদিন তিনি বক্তৃতা প্রসংগে বলেন, "তোমাদের জান-মাল ও মান-ইজ্জতের ওপর অযথা হস্তক্ষেপের জন্যে আমি কর্মচারীদেরকে নিয়োগ করিনি। তাদেরকে নিয়োগ করেছি তোমাদেরকে কোরআন ও সুন্নাহর বাস্তব শিক্ষাদানের জন্য। যদি কোন কর্মচারী কারো ওপর জুলুম অত্যাচার করে তবে আমি তা কিছুতেই বরদাশত করবো না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তার সম্পর্কে আমার নিকট অভিযোগ আনা উচিত।" এ ভাবে তিনি কর্মচারীদের জন্য তাদের ক্ষমতার সীমারেখা নির্দেশ করেন এবং তা লংঘন করতে নিষেধ করে দেন।
শাসকের এহেন গুরু দায়িত্বের পরিপ্রেক্ষিতেই তিনি খাত্তাবের বংশধরদের মধ্য থেকে দ্বিতীয় কোন খলিফা নির্বাচিত হওয়া পছন্দ করেননি। তিনি সুস্পষ্টভাবে নিষেধ করে যান যে আব্দুল্লাহকে যেন খলিফা নির্বাচিত করা না হয়। অবশ্য তিনি তাকে পরামর্শ পরিষদে শামিল করেন। এ সময়ে তিনি যে উক্তি করেন তা খেলাফত সম্পর্কে তার ধারণার সঠিক প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি বলেন, "আমরা তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করার আদৌ কোন অভিলাষ পোষণ করি না। আমি নিজেও এটা করে সুখী হইনি। তাই আমার বংশধরের মধ্যে আর কেউ এ দায়িত্ব গ্রহণ করুক তাও আমি চাই না। এটা যদি সত্যই ভালভাবে সম্পাদিত হয়ে থাকে তাহলে আমরা সকলে তার ন্যায্য অংশ পেয়েছি। অন্যথায় সমগ্র বংশের মধ্যে একলা ওমরের জবাবদিহী করাই যথেষ্ট।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00