📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 ইসলামের মূল প্রাণশক্তি

📄 ইসলামের মূল প্রাণশক্তি


ইসলামের স্বর্ণোজ্জ্বল ইতিহাসের দিকে দৃকপাত করলে আমরা সেখানে তার মূল প্রাণশক্তিকে সদা সক্রিয় দেখতে পাই।
সত্য দ্বীনকে যে ব্যক্তি জানবার চেষ্টা করবে এবং তার মেজাজ-প্রকৃতি ও ইতিহাসকে অধ্যয়ন করবে সে তার প্রাণশক্তিকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে। এই প্রাণশক্তিকে সে ইসলামের আইন-কানুন ও নীতিমালার মধ্যে পূর্ণোদ্যমে কার্যকর দেখতে পাবে। এটা এত প্রভাবশালী যে, যে কোনো মানুষই এর দ্বারা প্রভাবান্বিত না হয়ে পারে না। কিন্তু কোনো গভীর অনুভূতি ও মৌলিক চিন্তাধারা যেমন সীমাবদ্ধ ভাষায় বর্ণনা করা যায় না তেমনি এই প্রাণশক্তিরও বর্ণনা দেয়া অত্যন্ত দুঃসাধ্য ব্যাপার। এ প্রাণশক্তি আবেগ ও উদ্দীপনায়, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে এবং রসম-রেওয়াজের মধ্যে সক্রিয় থাকে বটে কিন্তু তাকে ভাষার সীমিত পোষাকে আবৃত করা অত্যন্ত কঠিন।
এই প্রাণশক্তিই সেই সমুন্নত প্রোজ্জ্বল দিক চক্রবালের রূপরেখা নির্দেশ করে, যার অভিমুখে যাত্রা করার জন্য ইসলাম তার অনুসারীদেরকে প্রেরণা ও উৎসাহ জোগায়। ইসলাম তার অনুসারীদেরকে জীবনের সর্বোচ্চ লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য উদ্বুদ্ধ করে এবং সে জন্য শুধু অপরিহার্য্য কর্তব্য ও গতানুগতিক আনুষ্ঠানিকতা পালনে ক্ষান্ত না হয়ে স্বেচ্ছায় সানন্দে আরো বেশী চেষ্টা সাধনা করার জন্য অনুপ্রাণিত করে। মহৎ লক্ষ্যে পৌঁছার পথ অত্যন্ত কঠিন ও দুর্গম আর সেখানে পৌঁছার পর তার ওপর অবিচল থাকা আরো বেশী দুঃসাধ্য। জৈবিক প্রেরণা ও চাহিদা এবং নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের প্রবল চাপ অধিকাংশ মানুষের পায়ে জিঞ্জির হয়ে জীবনের মহত্তর লক্ষ্যে পৌঁছার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। আর যদিও-বা আবেগ উদ্দীপনার তীব্রতায় এর সংকল্পের প্রাবল্যে কখনো সেখানে পৌঁছেই যায় তা'হলেও তার সেখানকার বাধা-বিঘ্ন ও বিপদ-আপদ অতিক্রম করে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অবস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
কারণ এ মহোন্নত স্তরের সাথে জড়িত রয়েছে জান-মাল এবং চিন্তা ও কর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তন্মধ্যে প্রতিটি ব্যক্তির ওপর নিজ সত্তা, নিজ সমাজ ও মানব জাতি সম্পর্কে এবং সর্বোপরি তার স্রষ্টার ব্যাপারে যে দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে তা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুতর। তার স্রষ্টা যে তার প্রতিটি ছোট বড় কাজ সর্বদা স্বচক্ষে অবলোকন করছেন, তার মনের গভীরে লুকানো গোপন কথা ও তার নিঃশব্দ কার্যক্রম সম্পর্কেও ওয়াকিফহাল রয়েছেন- এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট অনুভূতি জাগরূক রাখাই হচ্ছে স্রষ্টার সম্পর্কে তার গুরু দায়িত্ব। এই গুরু দায়িত্ব উপলব্ধি করার জন্য ইসলাম তার বিবেককে করেছে সদা জাগ্রত এবং হুশিয়ার। আর তার চেতনা ও প্রজ্ঞাকে করেছে সুতীক্ষ্ণ ও সুতীব্র।
উচ্চতম লক্ষ্যের অভিমুখে যাত্রার এই জটিলতা এবং লক্ষ্যে উপনীত হবার পর তথায় স্থায়িত্বের এই দুঃসাধ্যতার অর্থ এ নয় যে, ইসলাম একটা কবিসুলভ কল্পণা অথবা এমন একটা অতি মানবিক ধারণা যাকে জয় করার অভিযোগ পোষণ করা যায় কিন্তু যাকে স্পর্শ করা যায় না। আসল ব্যাপার তা নয়। যে সুমহান ও সুউচ্চ স্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে তাতে উপনীত হওয়া সকল যুগের সকল মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। এটা হচ্ছে একটা লক্ষ্যসীমা মাত্র। মানুষ সর্বদা ওটা অর্জন করার জন্য সচেষ্ট থাকবে সে জন্যে তার রূপরেখা নির্দেশ করে দেয়া হয়েছে। এ চেষ্টা অতীতে যেমন করা হয়েছে, আজ এবং আগামীতেও তা অব্যাহত থাকা উচিত। অতীতের মানব সমাজ এ লক্ষ্যে উপনীত হবার চেষ্টা চালিয়েছে- কখনো লক্ষ্যে উপনীত হয়েছে আবার কখনো বা দূরে সরে গেছে। এটা এমন একটা আদর্শ যাকে শুধু মানুষের বিবেক ও তার অন্তর্নিহিত শক্তি সমূহের ওপর গভীর আস্থা দ্বারাই জয় করা সম্ভব। এতে করে প্রমাণিত হচ্ছে যে, অনাগত ভবিষ্যতে মানুষ সম্পর্কে হতাশ হবার কোনো কারণ নেই। এই সর্বোচ্চ লক্ষ্যের পূর্বেই একটি সুবিশাল প্রান্তর রয়েছে। চেষ্টা সাধনা ও সাফল্যের যে মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়া অধিকাংশ মানুষের পক্ষে সম্ভব সে মাপকাঠির জন্য এ বিশাল প্রান্তর যথেষ্ট। আল্লাহর একটি স্থায়ী নীতি এই যে, তিনি কোনো ব্যক্তিকে তার ক্ষমতার চেয়ে বেশী চেষ্টার জন্য বাধ্য করেন না।
""আল্লাহ্ কোনো মানুষকে তার ক্ষমতার চাইতে বেশী কাজের দায়িত্ব অর্পণ করেন না।" (সুরা বাকারা-শেষ আয়াত) ইসলামের মেজাজ-প্রকৃতি এতো ইনসাফপ্রিয় ও মধ্যমপন্থি যে, সে সাধারণ মানুষের নিকট থেকে শুধুমাত্র অবশ্য করণীয় কার্যসমূহ গ্রহণ করেই সন্তুষ্ট হয়। কারণঃ
"প্রত্যেকের কাজের বিভিন্ন স্তর রয়েছে।" বস্তুত অবশ্য করণীয় হিসেবে যে সব দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে জীবনের সাফল্যের জন্য সেটাই যথেষ্ট। এরপরে সর্বোচ্চ স্তরে উপনীত হবার জন্য পথ সর্বদা উন্মুক্ত রয়েছে এবং সেদিকে অগ্রসর হবার জন্য উদাত্ত আহবানে ইসলাম সদা সোচ্চার রয়েছে।
যে প্রাণশক্তির কথা আমরা ওপরে উল্লেখ করেছি, তা ইসলামের সমাজ ও সভ্যতাকে বাস্তব রূপদানে পরিপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। যে ইসলাম শুধু একটা ও বিশ্বাসের নাম ছিল, তা ব্যক্তিসমূহ ও ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে। এখন আর ইসলাম শুধু মতবাদ ও মতাদর্শের নাম নয় - ওটা নিছক ওয়াজ-নছিহত ও হেদায়েত কিংবা অলীক কল্পনা সমূহের সমষ্টিও মাত্র নয়। ওটা এখন জীবন্ত ও জাগ্রত মানব চরিত্রের রূপ ধারণ করেছে, বাস্তব জীবনের ঘটনাবলীতে আত্মপ্রকাশ করেছে - সর্বোপরি তা এমন সব সমাজ সংস্থা ও সংস্কারমূলক কীর্তি স্থাপন করেছে - তা যে কেউ স্বচক্ষে দেখতে ও স্বকর্ণে শ্রবণ করতে পারে। এ সব সমাজ সংস্থা ও সংস্কার কীর্তি গোটা মানব জীবন ও ইতিহাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। বস্তুতঃ এ সব ইসলামের সেই মহিমান্বিত 'প্রাণশক্তির'ই অবদান। এই প্রাণশক্তিই মৃতপ্রায় ব্যক্তি সমূহের জীবনে বিপ্লব এনে দিয়েছিল। তাতে এক নব চেতনা ও নতুন জীবনী শক্তির সঞ্চার করেছিল।
বস্তুতঃ ইসলামের ইতিহাসের সূচনা যুগে এবং তার পরবর্তী যুগে বিস্ময়কর ব্যক্তিসমূহের আবির্ভাব ঘটেছিল এবং যাদের জীবনের আলোড়ন সৃষ্টিকারী গৌরবগাথা ইসলামের ইতিহাসে সুরক্ষিত রয়েছে তাদের সম্পর্কে এটাই হচ্ছে সঠিক ব্যাখ্যা। যে অবিশ্বাস্য ধরনের ঘটনাবলী শুধু উচ্চতর চিন্তার সৃষ্ট রূপকথার মত মনে হয়, তারও রহস্য এই।
আত্মার পবিত্রতা, বিবেকের নির্ভীকতা, অভাবনীয় ত্যাগ-তিতীক্ষা ও কোরবানী, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য অর্জনের মরণপণ সংকল্প, চিন্তা ও আত্মার অসাধারণ ও অচিন্তনীয় উচ্চতা এবং জীবনের বিভিন্ন বিভাগের অসামান্য কৃতিত্ব যা পুরোপুরি ভাবে বর্ণনা করা ইতিহাসেরও ক্ষমতা বহির্ভূত-এ সব কিছু ইসলামের এই বিপ্লবী প্রাণশক্তিরই অবদান।
ইতিহাসের পাতায় যে সব অসাধারণ কীর্তি ও ঘটনাবলী ছড়িয়ে থাকতে দেখা যায় তার সাথে ইসলামের বিপ্লবী প্রাণশক্তির একটা সুগভীর সম্পর্ক আমাদের স্বীকার করে নিতে হবে। মূলতঃ ইসলামের ইতিহাসে যে শক্তির প্রকাশ দেখা যায় এই অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তিই তার মূল উৎস।
এ কীর্তি সমূহকে যদি আমরা উক্ত প্রাণশক্তি থেকে পৃথক ও বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখতে যাই তা'হলে আমাদের অধ্যয়ন অসম্পূর্ণ থাকবে। এই ভ্রান্ত অধ্যয়নের ফলে জীবন ও জগতের ওপর সক্রিয় ভাবে প্রভাবশীল শক্তিসমূহ সম্পর্কে আমরা অত্যন্ত মারাত্মক বিভ্রান্তির মধ্যে লিপ্ত হতে বাধ্য হব। এর ফল দাঁড়াবে এই যে, প্রত্যেক গৌরবোজ্জ্বল ব্যক্তিদের গৌরব ও সম্মানের উৎস নির্ণয় করতে গিয়ে আমরা তার ব্যক্তিগত মাহাত্মকেই প্রাধান্য দেব এবং এ সবের সর্বপ্রথম উদ্দীপক ও সর্বাপেক্ষা প্রভাবশালী কার্যকারণ উক্ত 'প্রাণশক্তি'কে অগ্রাহ্য করবো। অথচ এই প্রাণশক্তিই সেই মহান ব্যক্তিদের বিবেক ও মনকে প্রভাবান্বিত করেছিল, আর এরই বলে বলিয়ান হয়ে তারা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল এবং ঘটনা স্রোতকে নিজেদের ইন্সিত স্রোতে প্রবাহিত করেছিল। এর পর তারা ইতিহাসকে জীবনের এক উদ্দাম, উচ্ছল ও গতিবান স্রোতধারার নিকট সোপর্দ করেছিল। আর সেই স্রোতধারার ওপর ভর করেই আত্মপ্রকাশ করেছিল সেই সব অবিস্মরণীয় বিপ্লবাত্মক কীর্তি।
আমরা যদি গৌরবদীপ্ত মহৎ ব্যক্তিগণের আবির্ভাব এবং তাদের কীর্তি সমূহের প্রকাশকে সম্পূর্ণরূপে এই বিপ্লবী প্রাণশক্তির অবদান বলে অভিহিত করি তা'হলে সেটা অত্যুক্তি হবে না। আসলে এই প্রাণশক্তি একটা অতীন্দ্রিয় প্রেরণা ছাড়া আর কিছু নয়। এটা যে সব কীর্তি ও ব্যক্তিত্বের সাথে এসে মিলিত হয়েছে তা বাহ্যতঃ ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন শক্তি হলেও মূলতঃ তা-সবই অতীন্দ্রিয় শক্তি। এদের মধ্যে প্রতিটি ব্যক্তিত্ব উক্ত অতীন্দ্রিয় প্রেরণাকে গ্রহণ করার ব্যাপারে কতদূর যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে সেটাই হচ্ছে তার মহত্বের মাপকাঠি। এখন যদি আব্দুল্লাহর পুত্র মুহম্মদ (সাঃ) এর নবুয়তকে উক্ত যোগ্যতার সর্বোচ্চ স্তর বলে মনে করা হয় তা হলে সেটা বিচিত্র কি? আসলে তাঁর সত্তাই অতীন্দ্রিয় প্রেরণাকে পরিপূর্ণ রূপে গ্রহণ করেছিল এবং সারা জীবন ব্যাপী সেই সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল।
নবুয়তের স্তরের পর উচ্চ মর্যাদার বহু স্তর রয়েছে। হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর সাহাবীরা এবং তাদের পরবর্তী অনুসারীরা এই সব স্তরে অধিষ্ঠিত হন। এই মহান দ্বীনের প্রাণশক্তিকে যে ব্যক্তি যতদূর গ্রহণ করতে পেরেছে, সে সেই অনুযায়ী উচ্চ মর্যাদা লাভ করেছে। বস্তুতঃ অত্যন্ত ব্যাপক অধ্যয়নের পরই আমরা অনুধাবন করতে পারবো যে, এই প্রেরণা মানবাত্মাগুলোকে কতদূর প্রভাবান্বিত করতে পেরেছে- কিভাবে তাদের ঘুমন্ত প্রাণকে জাগিয়ে তুলেছে- কর্মচঞ্চল ও কর্মক্ষম করে তুলেছে- অপূর্ব ও আশ্চর্যজনক দৃষ্টান্তসমূহ স্থাপনে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং সর্বশেষ গোটা মানবেতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে।
এই প্রেরণা ও প্রাণশক্তির প্রভাব আমরা ইতিহাসের বড় বড় ঘটনা এবং দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট ঘটনা- উভয়ের মধ্যেই দেখতে পাই। জানা কথা যে, আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্যের পরিমাণ ইঞ্চি-গজে নির্ণয় করা সম্ভব নয় বরং তার সম্পর্ক হলো গুণাগুণের সাথে। এর পরিমাণ নির্ণয় করা যায় শুধু বিভিন্ন পরিস্থিতি ও পরিবেশে অনুষ্ঠিত ঘটনাপুঞ্জের মাধ্যমে।
আরব উপদ্বীপের মুষ্টিমেয় কতগুলো লোক অতি অল্প সময়ের মধ্যে রোম ও পারস্যের মত দু'টো বিশাল সাম্রাজ্যকে পদানত করে ফেলেছিল। গোটা মানব জাতির ইতিহাসে এত অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় বিজয়ের অন্য কোনো নজীর পেশ করতে পারবে না। কিন্তু এই গৌরবদীপ্ত ঘটনার গৌরব ও মাহাত্ম্য কিছুমাত্র ম্লান হবে না যদি আমরা বলি যে কোরাইশদের জুলুম-নির্যাতনের জবাবে বেলাল (রাঃ) নামক হাবসী ক্রীতদাস একাই যে ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিল তাতেই এই একই মাহাত্ম্য প্রকাশ পেয়েছে। কোরাইশরা হযরত বেলাল হাবশী (রাঃ) কে ইসলাম পরিত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য যে যাতনা দিয়েছিল তা মানুষ মাত্রেরই ধৈর্য ক্ষমতার বহির্ভূত। নীচ থেকে তাকে উত্তপ্ত বালি দগ্ধ করছিল, পেট ও বুকের ওপর পাথরের বোঝা চাপানো ছিল, প্রবল ক্ষুধা ও পিপাসায় তার বুক ফেটে যাচ্ছিল, তদুপরি তাকে প্রচন্ড জোরে প্রহার করা হচ্ছিল। কিন্তু এই অসহনীয় নির্যাতনের মধ্যে তার মুখ দিয়ে যে কথা নিঃসৃত হয়, তা ছিল 'আহাদ' 'আহাদ'।
এ প্রেরণাই যখন কোনো পথচারী সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রবেশ করে তখন স্বৈরাচারী সম্রাটের সামনে দাঁড়িয়েও সে কড়া কড়া স্পষ্ট কথা বলে এবং আল্লাহর রাহে কারো নিন্দা-সমালোচনাকে ভয় পায় না। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি খলিফায়ে রাশেদ যখন বিনয়, অল্পে তুষ্ট ও আত্মত্যাগের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করেন তখন তার মধ্যেও একই প্রাণশক্তি কার্যকর দেখা যায়। উভয় ব্যক্তি একই উৎস থেকে শক্তি লাভ করেছেন আর সে উৎস হচ্ছে ইসলামের দুর্জয় ও বিপ্লবী প্রাণশক্তি।
রোম ও পারস্য বিজয় প্রসঙ্গে এ কথা বলা প্রয়োজন মনে হচ্ছে যে, এখানে ইসলামের বিজয় মূলতঃ একটা আধ্যাত্মিক মতাদর্শের বিজয় ছিল। এই মতাদর্শ মানুষের অন্তরাত্মাকে জয় করতে সক্ষম হয়েছিল। এ ঘটনা ইতিহাসের আধ্যাত্মিক বিশ্লেষণকে সমর্থন করে কেননা এখানে বস্তুগত বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। বস্তুগত বিশ্লেষণ দ্বারা এই অসাধারণ বিজয়ের হেতু নির্দেশ করা অসম্ভব। নিছক বস্তুগত শক্তি দ্বারা আরবরা অত বড় দু'টো সাম্রাজ্যকে পদানত করতে পারতো না।
সঙ্গে সঙ্গে এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ইসলাম আরবদের চিন্তা ও কর্মে, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যে এবং তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় যে মনস্তাত্মিক বিপ্লব সংঘটিত করেছে তার গুরুত্ব ঐ সব দেশের বিজয়ের চেয়ে কোন অংশে কম নয় বরং বেশী। এটা ইসলামের প্রাণশক্তির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে দেশ জয়ের ঘটনাবলীর চাইতে স্পষ্ট সাক্ষ্য দেয়। এ কথা সকলেরই জানা যে, মুহম্মদ (সাঃ) এর নবুয়ত ও ইন্তেকালের মাঝামাঝি সময়ে আরব উপদ্বীপে খোদ তাঁর আনীত নৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব ছাড়া স্বতন্ত্র কোন অর্থনৈতিক বিপ্লব অনুষ্ঠিত হয়নি- তাই সেখানকার অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এমন কোন মৌলিক পরিবর্তনও সাধিত হয়নি যা আরবদের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গী, কার্যকলাপ ও সমাজ ব্যবস্থায় এত বড় বিপ্লব আনতে পারে। বস্তুতঃ এ সমস্ত কীর্তিকলাপ আসলে এই আধ্যাত্মিক মতাদর্শেরই সৃষ্টি।
এখানে আমাদের পক্ষে এই বিপ্লবের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া সম্ভব নয়। আমরা এর একটি মাত্র দৃষ্টান্ত পেশ করবো। এ দৃষ্টান্ত সে যুগের আরবদের একটি বিবৃতির মধ্যে পাওয়া যায়। এ বিবৃতিটি তারা ইসলামের শত্রুদের সামনে দিয়েছিলেন অথচ তারা এর একটি কথারও প্রতিবাদ করতে পারেনি। এ হচ্ছে আন্দোলনের প্রাথমিক যুগের ঘটনা। কোরাইশদের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের দ্বীন ও ঈমান রক্ষা করার জন্য মুসলমানরা হিজরত করে হাবশায় চলে যান। হাবশায় গিয়ে পাছে তারা শক্তি অর্জন করে ফেলে এই আশংকায় কোরাইশরা রাজা নাজ্জাশীর নিকট দু'জন প্রতিনিধি প্রেরণ করে। উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম মোহাজেরদেকে সেখান থেকে বহিষ্কার করানোর ব্যবস্থা করা। এই প্রতিনিধিদ্বয় ছিল আমর ইবনুল আস ও আবদুল্লাহ ইবনে আবি রাবিয়া। তারা গিয়ে বললো,
"জাহাপনা! আমাদের দেশের কতিপয় অবুঝ তরুণ আপনার দেশে এসে বসবাস করছে। তারা নিজ জাতির ধর্ম ত্যাগ করেছে এবং আপনার ধর্মও গ্রহণ করেনি। তারা নিজেদের পক্ষ থেকে এক মনগড়া ধর্ম এনেছে- যা আমাদের জন্যও নতুন- আপনার জন্যও নতুন। ওদের বাপ-চাচা, অন্যান্য আত্মীয়-স্বজন এবং আমাদের জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আমাদেরকে আপনার কাছে এই উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেছেন যে আপনি অনুগ্রহ পূর্বক ওদেরকে দেশে ফেরত পাঠাবেন। সে সব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এই তরুণদের চেয়ে অনেক বেশী বুদ্ধিমান। তরুণরা যে সব জিনিষের ওপর আপত্তি তোলে এবং যেগুলোকে মন্দ বলে, তা আমাদের নেতারাই ভাল বোঝেন।"
এই কথা শুনে নাজ্জাশী মুসলিম তরুণদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, "যার জন্য তোমরা নিজ জাতিকে পরিত্যাগ করে এসেছ এবং আমার ধর্ম বা অন্য কোন ধর্ম গ্রহণ করনি সে ধর্মটা কি?"
উত্তরে আবু তালেবের পুত্র জাফর (রাঃ) বললেন, "হে বাদশাহ! আমরা চরম মুর্খতা ও অজ্ঞতার মধ্যে লিপ্ত ছিলাম, প্রতিমা পূজা করতাম, মৃত দেহ আহার করতাম ও ব্যভিচার করতাম। আত্মীয়তার বন্ধনের অবমাননা করা ও প্রতিবেশীর অধিকার হরণ করা আমাদের নিত্যকার অভ্যাস ছিল। আমাদের মধ্যে যারা সবল ছিল তারা দুর্বলের ওপর অত্যাচার ও শোষণ চালাতো। এমনি অবস্থায় আমাদেরই একজনকে আল্লাহ নবী বানিয়ে আমাদের নিকট প্রেরণ করলেন। আমরা তার বংশ-মর্যাদা, তার সততা-সত্যবাদিতা, তার বিশ্বস্ততা ও পবিত্রতা সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। তিনি আমাদেরকে আল্লাহর প্রতি আহ্বান করেন, আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা ও কেবলমাত্র তারই ইবাদত-উপাসনা ও আনুগত্য করার শিক্ষা দেন। আমরা এবং আমাদের পিতৃপুরুষেরা আল্লাহ ছাড়া অন্যান্য যে সব প্রতিমা ও প্রস্তর মূর্তির পূজা করতাম, তিনি সেগুলোর পূজা ছেড়ে দিতে বলেন। তিনি সততা, সত্যবাদিতা, বিশ্বস্ততা, আত্মীয়-স্বজনের সাথে ও প্রতিবেশীর সাথে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি অশ্লীল ও অশালীন কার্যকলাপ, মিথ্যাবাদিতা, ইয়াতিমের ধন আত্মসাৎ ও সতী নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনা করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদেরকে এক আল্লাহর এবাদত করতে নির্দেশ দিয়েছেন এবং তার সাথে কাউকে শরীক করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদেরকে নামাজ কায়েম করতে, জাকাত দিতে ও রোজা রাখতেও নির্দেশ দিয়েছেন....।"
কোরাইশদের দু'জন প্রতিনিধিই দরবারে উপস্থিত ছিল। তার মধ্যে একজন ছিল আমর ইবনুল আস- বাকপটুতা ও কুটনৈতিক দক্ষতায় যার জুড়ি ছিল না। কিন্তু জাফর (রাঃ) প্রাগৈসলামিক আরবের পরিস্থিতির যে ছবি এঁকেছেন এবং রাসুলুল্লাহ'র আনীত জীবন-বিধানের যে পরিচয় পেশ করেছেন দু'জনের কেউ তার প্রতিবাদ করেনি। এটা প্রমাণ করছে যে আরবের অতীত ও বর্তমান সম্পর্কে এ বর্ণনা সম্পূর্ণ সঠিক ছিল।
এ হচ্ছে শুধু আরব উপদ্বীপ সম্পর্কে ইতিহাসের একটি সাক্ষ্য। আধুনিক যুগের একজন অমুসলিম সে সময়কার সমগ্র পৃথিবী সম্পর্কে এ ধরনেরই একটি সাক্ষ্য দিয়েছেন। জে. এইচ. ডেনিসন (J.H.Denison) তার পুস্তকে সভ্যতার ভিত্তি হিসাবে ভাবাবেগ-এ (Emotion as the basis of civilization) লিখেছেন,
"পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে সভ্য জগত নৈরাজ্যের এক সাংঘাতিক বিপজ্জনক পর্যায়ে উপনীত হয়েছিল। এরূপ মনে হচ্ছিল যে, চার হাজার বছরের অবিশ্রান্ত চেষ্টা সাধনার ফলে গড়ে ওঠা বিরাট সভ্যতা ছিন্ন ভিন্ন হয়ে যেতে চাচ্ছে এবং মানবতা অসভ্যতা ও বর্বরতার আদিম যুগে ফিরে যেতে উৎসুক হয়ে উঠেছে। গোত্রে গোত্রে ভয়াবহ দাংগা ও কোন্দল লেগে ছিল। কোন আইন-শৃঙ্খলা অবশিষ্ট ছিল না। খৃষ্টবাদ যে সংগঠন কায়েম করেছিল, তা ঐক্য ও শৃংখলার পরিবর্তে বিভেদ ও বিশৃংখলার জন্ম দিচ্ছিল। যেন একটি বিরাট বৃক্ষের বিস্তীর্ণ ডালপালা সমগ্র পৃথিবীকে নিজের ছায়াতলে আবৃত করতে চায়। কিন্তু ভেতর থেকে তার কান্ডকে মূল পর্যন্ত এমনভাবে ঘুনে খেয়ে দিয়েছে যে, যে কোন মুহূর্তে বৃক্ষটি ভুমিস্মাৎ হতে পারে। তখনকার সভ্যতা ঠিক এমনি অবস্থার মুখোমুখি হয়েছিল। এহেন সর্বাত্মক ধ্বংসের চিহ্ন যখন পরিস্ফুট ঠিক তখনি সেই ব্যক্তি জন্মলাভ করলেন যিনি সমগ্র বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করলেন।" যাহোক আমরা এখন এই ইসলামের সামাজিক ন্যায়-নীতির সাথে সংশ্লিষ্ট কতিপয় ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত পেশ করবো।

টিকাঃ
• মওলানা মুহাম্মদ আলী প্রণীত ও ওস্তাদ আহমদ জাওদাতুছাছানুহার কর্তৃক আরবীতে অনুদিত Islam and New World order থেকে গৃহীত।

📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 বিবেকের সচেতনতার দৃষ্টান্ত

📄 বিবেকের সচেতনতার দৃষ্টান্ত


দৃষ্টান্তগুলো পেশ করার আগে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় অর্থাৎ ইসলামের ইঙ্গিত বিবেকের ওপর আলোকপাতকারী কয়েকটা দৃষ্টান্ত উল্লেখ করা প্রয়োজন বোধ করছি। কেননা এই বিবেকের ওপরই ইসলামের গোটা ব্যবস্থার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত।
আগেই বলেছি যে, ইসলাম ব্যক্তির বিবেককে সদা জাগ্রত থাকার এবং তার চেতনা ও অনুভূতিকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণ ও তীব্র করার শিক্ষা দেয়। ইসলামের ইতিহাস এই বিবেকের সচেতনতা ও অনুভূতি তীব্রতার এত অধিক দৃষ্টান্ত সংরক্ষণ করেছে যে তা আমাদের এ সীমাবদ্ধ গ্রন্থে বর্ণনা করা সম্ভব নয়। এখানে অনেকগুলো নমুনার স্থলে বিবিধ রকমের মাত্র কয়েকটি নমুনা পেশ করা যাচ্ছে।
হযরত বারিদা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, "মাগের ইবনে মালেক (রাঃ) রাসুলুল্লাহর (সাঃ) দরবারে হাজির হয়ে বললো, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে পবিত্র করুন।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "তোমার সুমতি হোক, যাও, আল্লাহর নিকট তওবা কর গিয়ে।" মাগের কিছুদূর পর্যন্ত চলে যায়- অতঃপর আবার রাসূলুল্লাহর (সাঃ) কাছে ফিরে এসে বলে, "ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমাকে পবিত্র করুন।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আগের মতই জবাব দেন, তিনবার এরূপ হলো। চতুর্থবার রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "আমি তোমাকে কিসের থেকে পবিত্র করবো?" মাগের বললো, "ব্যভিচার থেকে।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) লোকদের নিকট জিজ্ঞাসা করলেন, "এই ব্যক্তি মাতাল নয় তো?" সকলে জানালো যে সে মাতাল না। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "ও কি মদ খেয়েছে?" এক ব্যক্তি গিয়ে মাগেরের মুখ শুঁকলো। দেখা গেল সে মদ খায়নি। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আবার তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কি সত্যই ব্যভিচার করেছ?” মাগের বললো, "হ্যাঁ"। এরপর তিনি শাস্তির হুকুম দিলেন এবং তাকে প্রস্তরাঘাতে হত্যা করে শাস্তি কার্যকরী করা হলো।"
এই ঘটনার দুই তিন দিন পর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, "তোমরা মাগেরের জন্য মাগফেরাতের দোয়া কর। সে যেরূপ তওবা করেছে তা একটি গোটা জাতির মধ্যে বন্টন করে দিলে তাদের জন্য যথেষ্ট হবে।"
এরপর তাঁর নিকট আজদ গোত্রের এক মহিলা এল। সে বললো, "হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করুন।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "তোমার সুমতি হোক, যাও, আল্লাহর নিকট তওবা কর গিয়ে।" সে বললো, " আপনি কি আমাকে মাগেরের মত ফিরিয়ে দিতে চান? আমি যে ব্যভিচার দ্বারা গর্ভবতী হয়েছি।" রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "তুমি কি সত্যই ব্যভিচার দ্বারা গর্ভবতী?" সে বললো, "হ্যাঁ।" তিনি তাকে বললেন, "সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত অপেক্ষা কর।" অতঃপর তিনি উক্ত মহিলাকে সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত জনৈক আনসারীর তত্ত্বাবধানে প্রেরণ করেন। কিছুদিন পর উক্ত আনসারী এসে রাসূলুল্লাহকে জানালেন যে, মহিলাটি সন্তান প্রসব করেছে। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন "আমি তাকে মৃত্যুদন্ড দেব আর শিশুকে দুধ পান করানোর কেউ থাকবে না- এমন কাজ আমি করবো না।" এতে একজন আনসারী বললেন, "হে আল্লাহর রসূল! শিশুর দুধ পান করানোর দায়িত্ব আমি গ্রহণ করছি।" এরপর রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তার ওপর মৃত্যুদন্ড কার্যকর করলেন।
অন্য রেওয়ায়েতে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মহিলাকে বললেন, "তুমি যাও, সন্তান প্রসব করার পর এসো।" সন্তান প্রসবের পর সে এলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, "যাও, ওকে দুধ পান করাও গিয়ে। দুধ ছাড়লে তখন এসো।"
এরপর শিশু দুধ ছেড়ে দিলে সে শিশুকে কোলে নিয়ে রাসূলুল্লাহর কাছে এলো। শিশুর হাতে এক টুকরো রুটি ছিলো। সে বললো, "রাসূলে খোদা! আমি • শিশুর দুধ ছাড়িয়ে দিয়েছি। এখন সে রুটি ইত্যাদি খেতে শিখেছে।" তখন তিনি শিশুকে একজন মুসলমানের হাতে সোপর্দ করলেন এবং মহিলার মৃত্যুদন্ডের নির্দেশ দিলেন। তার বুক পর্যন্ত গভীর গর্ত খোড়া হলো, অতঃপর রাসূলুল্লাহর নির্দেশে লোকেরা তাকে পাথর ছুড়ে মেরে ফেললো। খালেদ ইবনে অলীদ (রাঃ) একটু সামনে অগ্রসর হয়ে একটা পাথর তার মাথায় নিক্ষেপ করলেন। এর দরুন খানিকটা রক্ত ছিটে এসে খালেদের মুখমন্ডলে লাগলো। এতে খালেদ মহিলাটিকে উদ্দেশ্য করে কটুক্তি করলেন। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তা শুনতে পেয়ে বললেন, "খালেদ! মুখ সামলে কথা বলো। খোদার শপথ করে বলছি, এই মহিলা এমন তওবা করেছে যে, অন্যায়ভাবে করা আদায়কারীও যদি সেরূপ তওবা করতো তবে তাকে ক্ষমা করে দেয়া হতো।” অতঃপর তার নির্দেশে মহিলার জানাজার নামাজ পড়া হলো এবং তাকে যথারীতি দাফন করা হলো। (মুসলিম, নাসায়ী)।
মাগের ইবনে মালেক ও উক্ত মহিলার চরিত্র আমাদের সামনে সুস্পষ্ট। এদের কারো ব্যভিচারের কঠিন শাস্তির কথা অজানা ছিল না। তাদেরকে কেউ পাপ কাজ করতে দেখেনি এবং তা প্রমাণ করার উপায়ও ছিল না। তা সত্ত্বেও তারা উভয়ে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে পিড়াপিড়ি করলো। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) হৃদয়ের কোমলতা ও ইসলামের ন্যায়-নীতি মূলক প্রকৃতির তাগিদে সন্দেহের ভিত্তিতে তাদের শান্তি ক্ষমা করতে চাইলেন। কিন্তু তারা এত বেশী পিড়াপিড়ি করলো যে তাদের মুক্তির সমস্ত দ্বার রুদ্ধ হয়ে গেল। মহিলাটি তো খানিকটা শক্ত কথাই বলে ফেললো যে, তিনি কি তাকে মাগেরের মত ফিরিয়ে দিতে চান? যেন সে ইসলামের অকাট্য বিধানের ব্যাপারে শৈথিল্য ও উদারতা প্রদর্শনের অভিযোগ রাসূলুল্লাহর ওপর আরোপ করতে চাচ্ছে।
এ সব কেন? তাদের এরূপ কথা বলা যে- 'হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে পবিত্র করে দিন' তাদের মধ্যে এমন এক জীবন্ত ও উদগ্র প্রেরণার অস্তিত্ব নির্দেশ করে যা স্বয়ং বেঁচে থাকার আকাংখার চেয়েও প্রবল ও প্রাণবন্ত। এই প্রেরণা বিবেকের সচেতনতা ও অনুশোচনার তীব্রতা ছাড়া আর কিছু নয়। যে পাপের কথা আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না তা থেকে পবিত্র হবার সুতীব্র বাসনা এবং অপবিত্র অবস্থায় আল্লাহর কাছে উপস্থিত হতে হবে এই অনুভূতি থেকে সৃষ্ট প্রচন্ড লজ্জা তাদেরকে অস্থির করে তুলেছিল।
এই হচ্ছে প্রকৃত ইসলাম। অপরাধীর মনে সুতীব্র অনুশোচনা আর নবীর মনে প্রথমে দয়া ও সহানুভূতি এবং পরে অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পর অপরাধীর তওবা ও স্বীকারোক্তির মাহাত্ম্যের প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে দন্ড কার্যকরী করার মত দৃঢ়তা ও বুদ্ধিমত্তা এই ইসলামেরই বহিঃপ্রকাশ। কেননা ইসলাম তার সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকুক ও তার গৌরব অম্লান থাকুক- এটাই ছিল অপরাধী ও শাসক উভয়ের নিকট সবচেয়ে কাম্য বস্তু।
দন্ড বিধির ক্ষেত্রে যখন মুসলিম বিবেকের এই অবস্থা তখন যে সব সামাজিক কাজে প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে হয় তাতে তার ভূমিকা কিরূপ হবে তা সহজেই অনুমান করা যায়।
এ প্রসঙ্গে সিরিয়ার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব থেকে খালেদ ইবনে ওলীদকে অপসারিত করে আবু ওবায়দাকে সেনাপতি নিযুক্ত করার ঘটনা প্রণিধানযোগ্য। খালিদ হলেন সেই গৌরবদীপ্ত সেনাপতি, যিনি তখন পর্যন্ত কোন যুদ্ধে পরাজয় বরণ করেননি। সৈনিক সুলভ স্বভাব ও দক্ষতা তার মেরু মজ্জায় মিশে গিয়েছিল। জাহেলিয়াতের যুগে এবং ইসলাম গ্রহণের পরেও তিনি ছিলেন। একমাত্র অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা। এহেন খালেদকে সেনাপতিত্ব থেকে অপসারিত করা হয় অথচ তিনি অসহযোগিতাও করেননি, বিদ্বেষও পোষণ করেননি। লজ্জা কিংবা সম্ভ্রমবোধ তাকে যুদ্ধের ময়দান থেকে পালাতে উদ্বুদ্ধ করেনি। বিদ্রোহ করার কোনো চিন্তার তো প্রশ্নই ওঠে না। তিনি একই যুদ্ধের ময়দানে সমান আবেগ উদ্দীপনা নিয়ে ইসলামের বিজয়ের প্রেরণায় ও শাহাদাতের কামনায় উজ্জীবিত হয়ে পূর্ণোদ্যমে যুদ্ধ চালিয়ে যান। এ সময়ে তিনি তার মনে কোনো প্রকার কু-চিন্তা ও কু-প্ররোচনার প্রশ্রয় দেননি। কেননা সচেতন মুসলিম বিবেক এ ধরনের চিন্তার বহু উর্দ্ধে। এ সব চিন্তার কোনই গুরুত্ব নেই তার কাছে।
ঘটনার অপর দিকটিও অর্থপূর্ণ। হযরত ওমরের খালেদকে অপসারিত করাও একই চেতনা ও প্রেরণা থেকে উদ্ভূত ছিল। তিনি হযরত আবু বকরের খেলাফত কালে খালেদ ইবনে ওলিদের মধ্যে এমন কয়েকটি ত্রুটি লক্ষ্য করেন যা ওমরের বিবেককে প্রকম্পিত করে তোলে। একটি ছিল এই যে, খালেদ মালেক ইবনে নোয়াইরাকে হত্যা করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেন এবং তার অব্যবহিত পরে তার স্ত্রীকে বিয়ে করেন। এর পর তিনি আবার অনুরূপ একটা ত্রুটি লক্ষ্য করেন। সেটা হচ্ছে এই যে, মুসাইলেমায়ে কাজ্জাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেদিন বারশত শীর্ষস্থানীয় সাহাবী শহীদ হন, তার অব্যবহিত পরের দিন প্রত্যুষে খালেদ মাজ্জায়ার মেয়ে বিয়ে করেন।
এ সব কার্যকলাপের সামনে যা আমার ধারণায় ত্রুটিপূর্ণ কার্যকলাপ ছিল খলিফা খালেদের বীরত্বের এবং যুদ্ধ জয়ের কোনোই গুরুত্ব দেননি। নিঃসন্দেহে খালেদ সবচেয়ে বড় সেনাপতি ছিলেন। তিনি সর্বাপেক্ষা অধিক সংখ্যক যুদ্ধ জয় করেছিলেন। তদুপরি মুসলিম জাতি সিরিয়া ও ইরাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সিদ্ধান্তকারী যুদ্ধের মুখোমুখি ছিল। সেখানে খালেদের মত অপরাজেয় সেনাপতির সমর দক্ষতা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। কিন্তু খালেদের মারাত্মক ত্রুটিসমূহ ওমর (রাঃ) এর বিবেক যে চাঞ্চল্য ও অস্থিরতার সৃষ্টি করেছিল, খালেদের এই সব গুণাগুণের কোনোটাই তা দমন করতে সক্ষম হয়নি। এর কোনোটিই খালেদকে সেনাপতিত্ব থেকে এবং পরে খোদ সেনাবাহিনী থেকেও অপসারিত করার স্বপক্ষে তাঁর অভিমতকে পরিবর্তিত করতে পারেনি। আরো একটা কারণ ছিল এই যে, খালেদ অত্যন্ত সেচ্ছাচার মূলকভাবে দায়িত্ব পালন করতেন আর এটা ছিল হযরত ওমরের মেজাজের পরিপন্থী। তাঁর দায়িত্ববোধ তাঁকে খুটিনাটি ব্যাপারেও নজর রাখতে হস্তক্ষেপ করতে উদ্বুদ্ধ করতো। (সাদেক উরজুন কৃত গ্রন্থ 'খালেদ ইবনে ওলিদ' থেকে)।
কেউ প্রশ্ন করতে পারে যে, খালেদ যদি এত বড় ভুল করে থাকেন, তাহলে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে ছেড়ে দিলেন কেন? আসল ব্যাপার এই যে, খালেদ বিন ওলিদ সম্পর্কে হযরত আবু বকরের মতামত ওমরের মত গুরুতর ছিল না। তিনি মনে করতেন যে, খালেদের বুদ্ধির ভুল হয়েছে এবং তিনি পরিকল্পিতভাবে কোনো ত্রুটি বা গুনাহর কাজ করেননি। এ কারণে তিনি তার ওপর রুষ্ট হওয়া সত্ত্বেও তাকে ক্ষমা করেছেন। অবশ্য দ্বিতীয় ঘটনাটিকে হযরত আবু বকর (রাঃ)ও ঘোর আপত্তির দৃষ্টিতে দেখেন এবং তিনি এক ক্রোধাপ্তি চিঠি লিখে পাঠান। কিন্তু এ সব সত্ত্বেও খালেদের ভুল ভ্রান্তিকে তিনি ক্ষমার যোগ্য মনে করতেন এবং তা শেষ পর্যন্ত ক্ষমা করেও দেন।
এই যুগে মুসলিম গণ-বিবেক যে সু-উন্নত মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিল, তার সাথে ঘটনার উপরোক্ত ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যশীল। কিন্তু ডাঃ হাইকেলের মত ব্যক্তি খালেদের ব্যাপারে হযরত আবু বকর ও ওমরের নীতির যে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা আমাকে রীতিমত বিস্মিত করেছে। হাইকেলের এই ব্যাখ্যার ইসলামের প্রাণশক্তির সাথে কোনোই সম্পর্ক নেই। অবশ্য এটা এ যুগের নোংরা রাজনীতির সাথে যথার্থভাবে সংগতিশীল। "আস-সিদ্দিকু আবু বকর" নামক গ্রন্থের ১৫০ থেকে ১৫২ পৃষ্ঠায় ডাঃ হাইকেল লিখেছেনঃ
"মালেক ইবনে নোয়াইরার ব্যাপারে আবু বকর ও ওমরের মধ্যে মতভেদ কত দূর গিয়ে পৌঁছেছিল তা পাঠক নিশ্চয় উপলব্ধি করতে পেরেছেন। তারা দু'জনেই যে ইসলাম ও মুসলমানদের কল্যাণকামী ছিলেন, সেটা সন্দেহাতীত ব্যাপার। এখানে প্রতিপাদ্য বিষয় এই যে খালেদের ভুল কি একজনের নিকট অতীব বিরাট এবং অপর জনের নিকট অতীব ক্ষুদ্র ছিল, না ব্যাপক বিদ্রোহ ও ধর্ম ত্যাগের সমস্যা জর্জরিত আরব উপদ্বীপের মুসলিম জীবনের নাজুক পরিস্থিতিতে সঠিক নীতি নির্ধারণ নিয়েই আসল মতভেদের উদ্ভব হয়েছিল?"
আমার মতে আসল মতভেদ ছিল নীতি নির্ধারণ নিয়ে। উভয় খলিফার প্রকৃতিতে যে পার্থক্য ছিল সে অনুসারে এই মতভেদ অত্যন্ত স্বাভাবিক ছিল। ওমর (রাঃ) ছিলেন আপোষহীন ন্যায় বিচারের প্রতীক। তার দৃষ্টিতে খালেদ জনৈক মুসলমানের ওপর অবিচার করেছিলেন এবং ইদ্দত অতিবাহিত হবার আগেই তার স্ত্রীকে বিয়ে করেছিলেন। তাই তিনি যাতে ভবিষ্যতে আর এরূপ ন্যাক্কারজনক ও ভাবমূর্তি ক্ষুন্নকারী কাজ করার সুযোগ না পান সে জন্যে তাকে সেনাবাহিনী থেকে অপসারণ করা প্রয়োজন ছিল। মালেকের ব্যাপারে খালেদের বুদ্ধি ও বিবেচনাই ভুল হয়েছে একথা মেনে নিয়ে তাকে ক্ষমা করা গেলেও- যদিও হযরত ওমর (রাঃ) তা মানতে পারতেন না- মালেকের স্ত্রী লায়লার সাথে অশালীন আচরণের শাস্তি না দেয়া কিছুতেই শোভন হতো না। 'তিনি একজন অজেয় সেনাপতি' 'তিনি খোদার তলোয়ার' এ সব কথা তাকে অব্যাহতি দেয়ার জন্য যথেষ্ট হতো না। কেননা তার মানে দাঁড়াতো খালেদের মত লোকদের জন্য হারামকে হালাল করে দেয়া। আর এরূপ করা হলে মুসলমানদের সামনে আল্লাহর বিধানের প্রতি অশ্রদ্ধা জ্ঞাপনের নিকৃষ্টতর নজীর স্থাপন করা হতো। নিজের এই মতামতের কারণে ওমর (রাঃ) বার বার আবু বকর (রাঃ) এর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। শেষ পর্যন্ত আবু বকর (রাঃ) খালেদ (রাঃ) কে ডেকে তার কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কড়া সতর্কবাণী উচ্চারণ করেন।
অপরদিকে আবু বকরের (রাঃ) দৃষ্টিতে পরিস্থিতি এত বেশী নাজুক ছিল যে, এ ধরনের ব্যাপারগুলোকে গুরুত্ব দেয়া সম্ভব ছিল না। সে সময়ে গোটা দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছিল এবং আরবের চারিদিকে বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছিল। এমনি পরিস্থিতিতে ভুলবশতঃ কিংবা ইচ্ছাবশতঃ এক ব্যক্তি অথবা কয়েক ব্যক্তিকে হত্যা করার কি গুরুত্ব থাকতে পারে? যে সেনাপতিকে ত্রুটিপূর্ণ কার্যকলাপের দায়ে অভিযুক্ত করা হচ্ছিল তিনি সেই ভয়াবহ বিপদ থেকে দেশকে রক্ষা করার সবচাইতে শক্তিশালী মাধ্যম ছিলেন। কোন স্ত্রীকে ইদ্দতের পূর্বে বিয়ে করা আরবদের প্রচলিত আদত-অভ্যাসের পরিপন্থী ছিল না, বিশেষতঃ কোনো বিজয়ী সেনাপতির পক্ষে। কারণ যুদ্ধের কারণেই সে যুদ্ধবন্দী মেয়েদের মালিকানা অধিকার লাভ করে থাকে। খালেদের মত অসাধারণ মানুষের ব্যাপারে আইনের কড়াকড়ি আরোপ করা অপরিহার্য ছিল না। বিশেষতঃ এমন পরিস্থিতিতে যখন এমন কাজ রাষ্ট্রের স্বার্থের বিরোধী ছিল এবং তার অস্তিত্ব বিপন্ন করতে পারতো। এ সময়ে মুসলমানদের জন্য খালেদের তরবারী অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। যেদিন আবু বকর (রাঃ) তাকে ডেকে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করেন সেদিনই মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন ছিল খালেদের। খালেদের (রাঃ) অবস্থানস্থল আল-বাত্তাহের সন্নিকট এমামাতে মোসায়লেমা বনু হানিফার চল্লিশ হাজার নওজোয়ানকে নিয়ে যুদ্ধের সাজে সেজে ছিল। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে তার বিদ্রোহ ছিল সবচাইতে সাংঘাতিক বিদ্রোহ। মুসলমানদের সেনাপতিদের মধ্যে থেকে ইকরামা (রাঃ) কে সে আটক করে ফেলেছিল এবং তখন বিজয়ের সমস্ত আশা-আকাংখা খাঁলেদের তরবারীর ওপর একান্তভাবে নির্ভরশীল ছিল। এমতাবস্থায় মালেক ইবনে নোয়াইরাকে হত্যা করার কারণে অথবা খালেদকে বিমুগ্ধকারিণী অপরূপ সুন্দরী লায়লার কারণে খালেদ (রাঃ) কে অপসারণ করা এবং মুসলিম বাহিনীকে মুসাইলেমার হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবার অবকাশ সৃষ্টি করা কি করে উচিত হতো? এভাবে আল্লাহর দ্বীনকে পৃথিবীতে সবচেয়ে মারাত্মক বিপদে ফেলে দেয়া হতো নয় কি? খালেদ খোদার পতাকা ছিলেন- খোদার তরবারী ছিলেন- তাই আবু বকর (রাঃ) তাকে ডেকে নিয়ে শুধু তিরষ্কার করে ক্ষান্ত হওয়া এবং তৎক্ষণাৎ এমামাতে গিয়ে মোসালেমার মোকাবেলা করতে নির্দেশ দেয়াই সবচেয়ে সংগত কর্মপন্থা বলে বিবেচনা করেছিলেন।
এই হচ্ছে আমার দৃষ্টিতে খালেদ ইবনে ওলিদের ব্যাপারে আবু বকর ও ওমরের নীতির পার্থক্যের আসল চিত্র। বনি হানিফার মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার যখন ইকরামা (রাঃ) কে গ্রেফতার করে তখন আবু বকর (রাঃ) খালেদকে তার মোকাবিলার জন্য প্রেরণ করেন। সম্ভবতঃ তার উদ্দেশ্য ছিল এই যে, মদিনাবাসী এবং ওমরের মতের সমর্থকরা এতে করে বুঝতে পারবে যে- খালেদ ইসলামের দুর্যোগ মুহূর্তের সবচেয়ে বড় বন্ধু। এ নির্দেশ দিয়ে হযরত আবু বকর (রাঃ) তাকে এক কঠিন পরীক্ষার মধ্যে নিক্ষেপ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল, খালেদ হয় যুদ্ধের ময়দানে শহীদ হবে- তখন সেটা হবে মালেক ও তার স্ত্রীর প্রতি অবিচারের চেয়ে উত্তম শাস্তি আর না হয় তিনি বিজয়ী হবেন এবং সে বিজয় তাকে গুনাহ থেকে পবিত্র করবে। শেষ পর্যন্ত তিনি বিজয়ী হলেন এবং বিপুল গণিমতের সম্পদ নিয়ে রাজধানীতে ফিরে এলেন। এভাবে তিনি মুসলমানদেরকে এত বড় বিপদ থেকে মুক্ত করলেন। সে বিপদের সামনে আল বাত্তাহে অবস্থানকালে তার পক্ষ থেকে যে ত্রুটি বিচ্যুতি হয় সেটার কোনো গুরুত্বই ছিল না।
এই হচ্ছে ডাঃ হাইকেলের দৃষ্টিতে পরিস্থিতির রূপ। আমার দেখে বিস্ময় জাগে যে, এক ব্যক্তি কিভাবে তার কল্পনার ডানা মেলে ইসলামের ইতিহাসের প্রাথমিক যুগে প্রবেশ করে এবং সেই জাগ্রত ও সচেতন বিবেক সমূহের ছায়াতলে বসে লেখনি পরিচালনা করে। অথচ তার নিজের বিবেক ও মন ঘটনাবলীর ব্যাখ্যা দানের ব্যাপারে আধুনিক জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গীর উর্দ্ধে ওঠা تو দূরের কথা তার দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত। তার দৃষ্টিভঙ্গীর সাথে ইসলামের মূল প্রাণশক্তি এবং সেই বিশেষ যুগের বাস্তব ইতিহাসের কোনই সম্পর্ক নেই। এটা তো বর্তমান যুগের রাজনীতি। এই রাজনীতির দৃষ্টিতে উৎকৃষ্ট লক্ষ্যের জন্য নিকৃষ্ট কর্মপন্থা ও উপায় উপকরণের আশ্রয় গ্রহণ সম্পূর্ণ বৈধ। এ রাজনীতি মানবীয় বিবেক-বুদ্ধিকে পরিস্থিতি ও প্রয়োজনে গোলাম বানিয়ে দেয় আর একে উচ্চতর 'ডিপ্লোমেসী' এবং উচ্চাঙ্গের কর্মদক্ষতা ও কর্মকুশলতার নামে অভিহিত করে।
যে চিত্র ডাঃ হাইকেল তুলে ধরেছেন এবং যাকে তিনি একমাত্র বিশুদ্ধ চিত্র বলে দাবী করেছেন- তাতে হযরত আবু বকরের (রাঃ) ব্যক্তিত্বকে কত নীচ ও হীন করে দেখানো হয়েছে তা যে কোন চক্ষুষ্মান ব্যক্তি দেখতে পারে। সৌভাগ্য যে, আজকের নিকৃষ্ট ও অধঃপতিত সমাজের মানুষ যে দূরবীক্ষণ দ্বারা দেখতে অভ্যস্ত আবু বকরের ব্যক্তিত্ব তার অনেক উর্দ্ধে। এ দূরবীক্ষণ দ্বারা মানবতার সেই সু-উন্নত স্তরকে পর্যবেক্ষণ করা কিছুতেই সম্ভব নয়। বিশেষতঃ পর্যবেক্ষক যদি ইসলামী শরিয়তের সম্পর্কেও অজ্ঞ থাকে তাহলে ব্যাপার আরো ঘোলাটে হয়ে যায়।
স্বীয় পুস্তক 'আল-ফারুক-উমর'-এ ডাঃ হাইকেল পুনরায় এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি খালেদকে অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়ার সময়ে হযরত ওমরের মানসিক অবস্থা পর্যালোচনা করতে চেষ্টা করেছেন। সেখানেও পুনরায় তাকে আধুনিক অধঃপতিত সভ্যতা প্রভাবিত করেছে। যে দল-নেতার সামনে আপাতঃ কল্যাণ ও আঞ্চলিক প্রয়োজন ছাড়া অন্য কিছুর গুরুত্ব থাকে না- ইসলামের প্রাণশক্তি যার পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব নয়- সেই নেতার চরিত্রই লেখকের মন মানসে বদ্ধমূল হয়ে গেছে। ৯৯ ও ১০০ পৃঃ তিনি লিখেছেনঃ
"বুঝে আসে না যে, হযরত ওমর (রাঃ) খালেদের (রাঃ) অপসারণের মত বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত কেন নিলেন। অথচ সিরিয়ায় মুসলমানদের সমগ্র সামরিক শক্তি খালেদের (রাঃ) অধীন ছিল। মুসলিম বাহিনীর পক্ষে সেটা ছিল অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ মুহুর্ত। তারা রোমক সৈন্যদের মুখোমুখী দাঁড়িয়েছিল। প্রকাশ্য যুদ্ধও হচ্ছিল না- আবার দু'পক্ষের কেউ কাউকে হার মানাতেও পারছিল না। ইরাক থেকে খালেদের আগমনের পূর্বে যে পরিস্থিতি ছিল তার আগমনের পরও সে পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে। উভয় পক্ষ আক্রমণ চালাবার উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করছিল। খলিফার এটা উপলব্ধি করা প্রয়োজন ছিল যে, খালেদকে পদচ্যুত করলে মুসলমানদের উৎসাহ উদ্দীপনায় ভাটা পড়বে এবং পরিস্থিতি আরো অধিক বিপজ্জনক হয়ে উঠবে। বস্তুতঃ খালেদ যতক্ষণে না মুসলমানদের উক্ত বিপজ্জনক মুহূর্ত অতিক্রম করিয়ে না নেন ততক্ষণ খলিফার অপেক্ষা করাই উচিত ছিল এবং এরপর যা খুশী নির্দেশ তিনি জারী করতে পারতেন।"
"যুদ্ধের উত্থান-পতনে এ ব্যাপারগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং এর প্রতি দৃষ্টি দেয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। আবু ওবাইদা (রাঃ) খলিফার অসন্তোষ ও অমতকে অগ্রাহ্য করে এ সব ব্যাপারের প্রতি পূর্ণ দৃষ্টি রেখেছেন। কিন্তু ওমর ব্যাপারটা দেখেছেন অন্য দিক থেকে। তিনি যদি খালেদকে পদচ্যুত করার ব্যাপার যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত মূলতবী রাখতেন তাহলে তার নীতি ক্ষুন্ন হতো এবং ব্যাপারটা জটিল হয়ে পড়তো। জানা কথা যে, যুদ্ধে মুসলমানদের হয় জয় হতো না হয় • পরাজয় হতো। যদি পরাজয় হতো তাহলে খালেদকে পদচ্যুত করেও লাভ হতো না। কিন্তু যদি খালেদের নেতৃত্বে মুসলমানরা জয় লাভ করতো তাহলে হজরত ওমরের পক্ষে তাকে বিজয় ও সাফল্যের গৌরব থেকে নীচে নামিয়ে পদচ্যুত করা সম্ভব হতো না। এরূপ করা অত্যন্ত ভুল কাজ হতো।
"ওমর (রাঃ) মোটের ওপর চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন যে, সিরিয়ায় অথবা অন্য কোথাও খালেদকে সেনাপতি পদে বহাল রাখবেন না। এ কারণেই তিনি পদচ্যুতির হুকুম জারী করার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করেন। এ সিদ্ধান্তের স্বপক্ষে তার যুক্তি এ ছিল যে খালেদ (রাঃ) হযরত আবু বকরের (রাঃ) নির্দেশাবলী যথাযথরূপে পালন করেননি। কিন্তু তা সত্ত্বেও যেহেতু মুসলমানরা জয়লাভ করেছিল, তাই কেউ ওমরের বিরুদ্ধে আপত্তি উত্থাপন করতে পারতো না। তিনি যা ভাল বুঝেছেন তা-ই করেছেন। খালেদও এমন পর্যায়ে ছিলেন যে, তাকে পদচ্যুত কারীর ওপর কোনো অবিচারের অভিযোগ আরোপ করা যেতো না।"
এ হলো বিংশ শতাব্দীর হাইকেল 'পাশা'র চিন্তাধারা- যা তিনি হিজরী প্রথম শতাব্দীর ওমর ফারুকের ওপর চাপাতে চাচ্ছেন। ইতিপূর্বে তিনি হযরত আবু বকরের ব্যাপারেও এরূপ করেছেন। যার আত্মা আবু বকর (রাঃ) ও ওমরের আত্মাকে স্পর্শও করতে পারেনি, যে ইসলামের পরিবেশে কিছুদিন শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ করা সত্ত্বেও এক মুহূর্তের জন্যও বিংশ শতাব্দীর মলিনতা ও কদর্যতা থেকে মুক্ত হতে পারেনি- সেরূপ লোকের পক্ষেই এরূপ ধৃষ্টাতাপূর্ণ উক্তি করা সম্ভব। আধুনিক সভ্যতার নিকৃষ্ট বৈশিষ্ট্যসমূহ এবং বিবেক, সত্যবাদিতা ও ধর্ম- সব কিছুকে উপেক্ষাকারী সুবিধাবাদ যে লেখকের পিছু ছাড়েনি- তা অত্যন্ত স্পষ্ট। অধিকন্তু এ যুগের মিথ্যাচার ও প্রতারণা দর্শন তার চিন্তা ও দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে, রেখেছে।
জিজ্ঞাস্য এই যে, হাইকেল সাহেব ওমর ফারুক (রাঃ) কে কি ভেবেছেন? যদি পরিস্থিতি অন্য রকম হতো এবং এরূপ সুযোগ না থাকতো তা হলে কি ওমর (রাঃ) খালেদ (রাঃ) কে ছেড়ে দিতেন? অথচ স্বয়ং হাইকেল পাশার বর্ণনা অনুসারে হযরত ওমরের বিবেক এ ব্যাপারে পূর্ণ নিশ্চিত ছিল যে, মালেক ইবনে নোয়াইরার ব্যাপারে এবং আল্লাহ ও তার দ্বীনের ব্যাপারে খালেদের কার্যকলাপ সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও অন্যায় ছিল।
যে ওমর (রাঃ) পাহাড়কে স্থানচ্যুত করতে পারতেন কিন্তু নিজে নীতিচ্যুত হতেন না, যে ওমরের ঈমান ঝড়ের গতিবেগ ঘুরিয়ে দিত, কিন্তু নিজে বিচলিত হতেন না- সেই ওমর (রাঃ) কি করে পরিস্থিতির কাছে আত্মসমর্পন করতে পারতেন?
এ ধরনের কাজ করতো উমাইয়া ও আব্বাসীয় বাদাশাহরা। মানুষ তাদের এসব কাজকে 'ডিপ্লোমেসী' ও চতুরতা বলে আখ্যায়িত করতো। কিন্তু ওমর (রাঃ) ও আবু বকর (রাঃ) ছিলেন এসব থেকে বহু উর্ধে। এখন কেউ যদি তাঁদের সম্পর্কেও এই রূপ চিন্তা করা শুরু করে থাকেন তাহলে সেটা হচ্ছে বর্তমান যুগের নিকৃষ্ট মনোবৃত্তি ও নিম্ন মানের মূল্যবোধের প্রভাব।
আমি এই চিন্তাধারার উপস্থাপনা এবং তার ভ্রান্তি স্পষ্ট করার ব্যাপারে খানিকটা বিস্তারিত বিবরণের সাহায্য নিয়েছি। কারণ এ ছাড়া আধুনিক যুগের ধ্বংসাত্মক বিভ্রান্তি থেকে আক্রান্ত মন-মানসকে উদ্ধার করা সম্ভব নয়। ইসলামের প্রাণশক্তির চরমোৎকর্ষের যুগে যে চিন্তা-পদ্ধতি প্রচলিত ছিল, কেউ কেউ সেই চিন্তা পদ্ধতির ব্যাখ্যা বর্তমান জড়বাদী চিন্তা-পদ্ধতির আলোকে দিতে চান। অথচ আজকের এ চিন্তা-পদ্ধতি প্রচলিত তখনকার আত্মিক চেতনা ও জাগরণ থেকে বহু দূরে অবস্থিত। আমি এই বিভ্রান্তিকর অপব্যাখ্যার অপনোদন করতে চাই। কারণ মানবীয় বিবেক এবং তার অন্তর্নিহিত শক্তি সমূহের এ দ্বারা বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনা রয়েছে।
অবশ্য আমি প্রথম শতকের লোকদেরকে কোনো কৃত্রিম পোষাকে আবৃত করে পেশ করতে চাই না অথবা তাদেরকে যাবতীয় মানব-সুলভ দুর্বলতা থেকে মুক্ত দেখাতেও ইচ্ছুক নই। আমি শুধু চাই মানুষ পুনরায় বিবেকের ওপর নির্ভর করতে শিখুক। এই উদ্দেশ্যে আমি মুসলমানদের জীবনের সঠিক পরিচয় পেশ করতে চাই। এতে করে যে সব বিবেকের মধ্যে উক্ত উন্নত স্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার যোগ্যতা রয়েছে তারা সেই পরিচয় উপলব্ধি করতে সক্ষম হবে।
এখন আমি জীবনের বিভিন্ন বিভাগে প্রথম শতকের মুসলমানরা যেরূপ বিবেক সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন, তার দৃষ্টান্ত পুনরায় পেশ করবো।
একদিন দেখা গেল, আমিরুল মুমেনীন ওমর ইবনুল খাত্তাব (রাঃ) পানির মশক ঘাড়ে করে নিয়ে আসছেন। তার পুত্রও বিক্ষুব্ধভাবে জিজ্ঞাসা করেন, "আপনি এরূপ করছেন কেন?" তিনি জবাব দেন, "আমার মন অহংকার ও আত্মগরিমায় লিপ্ত হয়েছিল, তাই ওকে আমি অপদস্থ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।"
চেতনার তীব্রতা দেখুন! এই ব্যক্তির মনের কোন এক কোণে ক্ষণিকের জন্য খেলাফত, রাজ্য জয় এবং অনাগত কালের সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কে সামান্যতম আত্মম্ভরিতা মাথা তুলেছিল। তিনি এটা বরদাশত করলেন না এবং তৎক্ষণাৎ সকলের সামনে প্রবৃত্তিকে জব্দ করা শুরু করে দিলেন। তিনি বিন্দুমাত্র ভেবে দেখলেন না যে, তিনি কত বড় বিশাল সাম্রাজ্যের সর্বাধিনায়ক, যার মধ্যে আরব উপদ্বীপ ছাড়াও রোম এবং পারস্য সাম্রাজ্যের অধিকাংশ দেশ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
আর একদিন দেখা গেল, আলী ইবনে আবু তালেব প্রচন্ড শীতে ঠক্ ঠক্ করে কাঁপছেন। তার গায়ে শীত নিবারনের উপযুক্ত পোষাক নেই। 'বায়তুল মাল' তার মুঠোর মধ্যে রয়েছে। কিন্তু তাঁর বিবেক সচেতনতা তাঁকে একটি কপর্দকও স্পর্শ করতে দিচ্ছে না।
আবু ওবায়দা (রাঃ) 'আমওয়াসে' নিজ বাহিনী নিয়ে শিবির স্থাপন করেছেন। 'আমওয়াসে' ভয়াবহ মহামারী দেখা দিল। হযরত ওমর (রাঃ) শংকিত হলেন পাছে 'আমিনুল উম্মতের'র (আবু ওবায়দা) কোনো অনিষ্ট না হয়। তিনি তাঁকে মহামারীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য চিঠি লিখে নিজের কাছে ডাকেন। চিঠিতে তিনি লিখেনঃ
"সালাম বাদ, একটা জরুরী কাজে তোমার আমার সামনা-সামনি কথা বলা প্রয়োজন। আমি খুব জোর দিয়ে বলছি, এই চিঠি পড়ার পর চিঠি রাখার আগেই আমার কাছে রওয়ানা হও।" আবু ওবায়দা (রাঃ) চিঠি পড়া মাত্রই আসল উদ্দেশ্য আঁচ করে ফেলেন। তিনি বুঝতে পারেন যে, মহামারীর হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই খলিফা একটা পথ খুঁজে বের করেছেন। সংগে সংগে বলে ওঠেনঃ "আল্লাহ! আমিরুল মুমেনীনকে ক্ষমা করুন।" তিনি হযরত ওমরকে চিঠির নিম্নরূপ জবাব লিখে পাঠানঃ
"আমি বুঝতে পেরেছি আমাকে দিয়ে আপনার প্রয়োজনটা কি, এ সময়ে মুসলমানদের গোটা বাহিনী আমার সাথে রয়েছে। আমি মুসলিম জোয়ানদের নিকট থেকে পৃথক হতে চাই না। আল্লাহ যতক্ষণ আমার ও তাদের ভাগ্যের লিখন পূর্ণ না করেন ততক্ষণ আমি তাদেরকে ছেড়ে যেতে পারি না। আমিরুল মুমেনীন, এই সব কারণে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি, আপনি আমাকে এই নির্দেশ পালনে বাধ্য করবেন না। আমাকে আমার জোয়ানদের সাথে থাকতে দিন।"
হযরত ওমর (রাঃ) চিঠিটা পড়ে কাঁদতে লাগলেন। উপস্থিত লোকেরা জিজ্ঞেস করেন, "আবু ওবায়দা কি ইন্তেকাল করেছেন?" তিনি বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে জবাব দেন, "না।"
বস্তুতঃ তকদীরের ওপর অটল বিশ্বাস এবং আল্লাহর পথের প্রতিটি সৈনিকের নিজের সমান মর্যাদা দান-এ দুটো কার্যকারণই আবু ওবায়দা (রাঃ) কে মৃত্যুর মুখে অবিচল থাকতে বাধ্য করেছিল।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর মুয়াজ্জিন হজরত বেলাল বিন রাবাহের ইসলামী ভাই আবু রুয়াইহা খায়ামী তার বিয়ের জন্য ইয়ামনের কতিপয় লোকের সাথে আলাপ করিয়ে দেয়ার জন্য বেলালের কাছে আবদার ধরেন। হযরত বেলাল সেই লোকদেরকে বলেন, "আমি বেলাল বিন রাবাহ। আর এ হচ্ছে আমার ভাই আবু রুয়াইহা। এর ধর্ম ও চরিত্র দুটোই খারাপ। তোমাদের ইচ্ছা হয় তার সাথে 'আত্মীয়তা কর, না হয় করো না।"
একদম পরিস্কার কথা বলে দেন। নিজের ভাই এর দোষ গোপন করে তাদেরকে প্রতারিত করেননি।
তিনি একটা বিয়ের কথা-বার্তার মাধ্যম হচ্ছেন-এ অনুভূতি তাঁকে আল্লাহর নিকট জবাবদিহির অনুভূতি থেকে বিস্মৃত করে দেয়নি। ইয়ামনবাসীরা তাঁর সত্যবাদিতায় মুগ্ধ হয়ে সম্বন্ধ স্থাপনে রাজী হন। এত বড় সত্যবাদী তাদের মেয়ের জন্য বিয়ের পয়গাম এনেছে এটুকুই তাদের জন্য যথেষ্ট গৌরবের ব্যাপার ছিল।
ইমাম আবু হানিফার চরিত্র লক্ষ্যনীয়ঃ তিনি নিজের শরীক ব্যবসায়ী হাফস ইবনে আবদুর রহমানের কাছে কিছু কাপড় বিক্রীর জন্য পাঠান। তিনি তাঁকে বলে দেন যে, একখানা কাপড়ে কিছু খুঁত আছে তা ক্রেতাকে জানিয়ে দিতে হবে। হাফস সেই কাপড় বিক্রী করে দেন কিন্তু খুঁতের কথা বলতে ভুলে যান। খুঁতপূর্ণ কাপড়ের বিনিময়ে তিনি পুরো দাম আদায় করেন। এই চালানের দাম ছিল ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার দিরহাম। আবু হানিফা (রাঃ) তাঁর শরীককে ক্রেতার সন্ধান নিতে বলেন কিন্তু অনেক চেষ্টার পরও ক্রেতার সন্ধান পাওয়া যায়নি। এরপর তিনি তাঁর শরীক থেকে পৃথক হন এবং গোটা চালানের দাম আল্লাহর পথে দান করে দেন। নিজের পবিত্র সম্পত্তির সাথে তিনি সেটা মিশাতেও চাননি।
বর্ণিত আছে যে, প্রখ্যাত ইমাম ইউনুছ বিন ওবায়েদের নিকট বিভিন্ন মূল্যের কাপড় বিক্রীর জন্য রক্ষিত ছিল। এক রকমের কাপড়ের প্রতি জোড়ার দাম ছিল চারশো দিরহাম। অপর এক ধরনের কাপড়ের প্রতি জোড়ার দাম ছিল দু'শো দিরহাম। তিনি নিজের ভ্রাতুস্পুত্রকে দোকানে রেখে নামাজ পড়তে যান। এ সময় একজন লোক আসে এবং চারশো দিরহাম মূল্যের জোড়া চায়। ছেলেটি তাকে দু'শো দিরহাম মূল্যের জোড়া দেখায়। সেটা তার পছন্দ হয় এবং সন্তুষ্ট চিত্তে খরিদ করে নিয়ে যায়। সে উক্ত কাপড় নিয়ে বাড়ী যাওয়ার সময় পথে ইউনুছের সাথে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। ইউনুছ তার কাপড় চিনতে পেরে জিজ্ঞাসা করেন যে, সে ওটা কত দামে খরিদ করেছে? সে জবাব দেয় যে, চারশো দিরহাম। তিনি বলেন, এটা তো দু'শো- দিরহাম মূল্যের কাপড়। যাও ওটা ফেরত দিয়ে এস। সে জবাব দিল, এ কাপড় আমাদের দেশে পাঁচশো দিরহাম মূল্যে পাওয়া যায়। তাই আমি ওটা সন্তুষ্ট চিত্তেই খরিদ করেছি। ইউনুছ বললেন, তোমাকে ফেরত নিতেই হবে। কারণ ইসলামের ব্যাপারে হীত কামনার চেয়ে উত্তম কাজ আর কিছু হতে পারে না। এই বলে তিনি তাকে দোকানে নিয়ে যান এবং দু'শো দিরহাম ফিরিয়ে দেন। অতঃপর তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রকে এই বলে তিরস্কার করেনঃ "তোর লজ্জা করলো না? তোর মনে খোদার ভয়ের সৃষ্টি হলো না? শতকরা একশো ভাগ লাভ করিস। আর মুসলমানদের কল্যাণের প্রতি লক্ষ্য রাখিস না?" ছেলেটি শপথ করে বললো যে, ক্রেতা খুব খুশী হয়েই কাপড় কিনেছিল। এতে তিনি বললেন, "তুই নিজের জন্য যা পছন্দ করিস- তা অপরের জন্যও পছন্দ করতে হয়, একথা ভুলে গেলি কেন?"
মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদ থেকে বর্ণিত আছে যে, তার অনুপস্থিতিতে তার ভৃত্য এক ব্যক্তির নিকট পাঁচ দিরহাম দামের কাপড় দশ দিরহামে বিক্রী করে। তিনি জানতে পেরে সারাদিন উক্ত ক্রেতার সন্ধান করেন। শেষে তাকে পেয়ে বললেন, ভৃত্য ভুল করে তোমার কাছে পাঁচ দিরহামের কাপড় দশ দিরহামে বিক্রী করেছে। সে আশ্চর্য হয়ে বললো, "আমি তো খুশী হয়েই এ দাম দিয়েছি।" তিনি জবাব দিলেন, "তুমি হাজার খুশী হও। আমি নিজের জন্য যা পছন্দ করি তা তোমার জন্যও পছন্দ করবো।" এই বলে তিনি তাকে পাঁচ দিরহাম ফিরিয়ে দেন। (আর রিসালাতুল খালেদাঃ আবদুর রহমান আজ্জাম)
এ তিনটি ঘটনার রহস্য উদঘাটনের সবচেয়ে শক্তিশালী চাবিকাঠি হচ্ছে ইউনুস ইবনে ওবায়েদের এই উক্তি যেঃ "তোর লজ্জা করলো না?" নিঃসন্দেহে নিজের বিবেকের কাছে লজ্জিত হওয়া ও আল্লাহর ভয়ে ভীত হওয়াই হচ্ছে এই সমস্ত ঘটনার পেছনে সক্রিয় একমাত্র শক্তি। মানুষের বিবেক, প্রকৃতি ও মন-মানস যখন ইসলামের প্রাণশক্তিকে গ্রহণ করে এবং সেই প্রাণশক্তি তার মেরু-মজ্জায় মিশে যায় তখন ইসলাম পূর্ণ শক্তি সহকারে তার মধ্যে এরূপ চরিত্রের সৃষ্টি করে।
এই কয়টি দৃষ্টান্ত ছাড়া আরো বহু দৃষ্টান্ত রয়েছে। কিন্তু মানুষের বিবেকের পরিশুদ্ধির জন্য ইসলাম যে সর্বোচ্চ লক্ষ্য সামনে রেখে, তার দিকে পথ-নির্দেশের জন্য এই দৃষ্টান্ত কয়টিই আমাদের জন্য যথেষ্ট। ইসলাম মানুষের বিবেককে যাবতীয় বস্তুগত প্রয়োজন, সম্পর্ক-সম্বন্ধ এবং জানমাল ও পদ-মর্যাদার আকর্ষণ থেকে উর্ধে তুলতে চায়। সে মানুষকে সদা সচেতন, বিবেকবান ও তীব্র অনুভূতি সহকারে জীবনের সকল দায়িত্ব যথাযথ রূপে পালন করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করতে চায়।

টিকাঃ
• যদি সত্যিই হযরত ওমরের অভিমত এত কঠিন ও চরম ভাবাপন্ন হতো তাহলে নিজের খেলাফত কালে তাকে অবশ্যই ব্যভিচারের শাস্তি দিতেন- গ্রন্থকার।
• ইসলামী শরিয়তের ক খ-ও জানে না- এমন লোকের পক্ষে এ ধরনের উক্তি করা সম্ভব। যদি সত্যি সত্যিই খালেদ কোন মুসলমানের স্ত্রীর ওপর বলাৎকার করে থাকেন তাহলে তার ওপর ব্যভিচারের দন্ড কার্যকরী করা অপরিহার্য ছিল। তাছাড়া মালেক যখন মুসলমান তখন তার স্ত্রীকে বাঁদী বানানোর প্রশ্নই ওঠে না।
• আবদুল হালিম আল-জুনদীর গ্রন্থ- "আবু হানিফা বাতলুল হুররিয়াতি অত্-তাছামুহি ফিল ইসলাম" থেকে গৃহীত।

📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 সাম্যের উদাহরণ

📄 সাম্যের উদাহরণ


ইসলাম মানব জাতির জন্য পরিপূর্ণ সাম্যের বাণী নিয়ে এসেছিল। যত মূল্যবোধ সাম্যের পথে অন্তরায় সৃষ্টি করেছে তার শৃংখল থেকে সে মানুষকে মুক্ত করতে এসেছিল। এবার আমরা দেখতে চাই এই মতবাদকে বাস্তব জীবনে কিভাবে রূপায়িত করা হয়েছে।
সে সময়ে সারা দুনিয়ার দাস-শ্রেণী স্বাধীন মানব জাতি থেকে পৃথক একটা স্বতন্ত্র শ্রেণী হিসাবে বিদ্যমান ছিল। আরব উপদ্বীপেরও ছিল একই অবস্থা। এ ব্যাপারে আমরা যখন হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর কার্যাবলী বিবেচনা করি তখন দেখতে পাই যে তিনি নিজের ফুফাতো বোন এবং কোরাইশ বংশীয় হাশেমী গোত্রের মেয়ে জয়নবকে নিজের আজাদ করা গোলাম জায়েদের সাথে বিয়ে দেন। বিয়ে একটা অত্যন্ত নাজুক ব্যাপার, এতে উভয় পক্ষের সমতা অন্য সকল প্রশ্নের চাইতে গুরুতর হয়ে দাঁড়ায়।
মহানবী (সাঃ) ছাড়া আর কোনো ব্যক্তি এবং ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো শক্তির পক্ষে এত বড় অসাধারণ কাজ করা সম্ভব ছিল না-এমন কি আজও মুসলিম জাহান ব্যতীত অন্য কোথাও সম্ভব নয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দাস বৃত্তি বে-আইনী বটে কিন্তু কোনো নিগ্রোর পক্ষে কোন শ্বেতাংগিনীকে-তা সে যতই নিকৃষ্ট হোক-বিয়ে করা আইনানুগভাবে নিষিদ্ধ। শুধু তাই নয়, বরং কোনো নিগ্রোর পক্ষে বাসে বা অন্য কোন যানে-রোস্তাঁরায় থিয়েটারে অথবা অন্য কোন স্থানে কোন শ্বেতাংগের পাশাপাশি উপবেশন করাও আজ পর্যন্ত নিষিদ্ধ।
হিজরতের প্রথম যুগে যখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আনসার ও মোহাজেরদের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্থাপন করেন তখন তার স্বাধীনকৃত গোলাম জায়েদ এবং তার চাচা হামজা ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হন, হজরত আবু বকর (রাঃ) এবং খাঁরেজা ইবনে জায়েদ ভাই ভাই বন্ধনে আবদ্ধ হন। খালেদ ইবনে রুয়াইছা খায়ানী এবং বিলাল ইবনে আবি রাবাহের মাঝে ভ্রাতৃত্ব স্থাপিত হয়। এই ভ্রাতৃত্ব শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি-বরং রক্ত সম্পর্কের মত মজবুত ও পাকাপোক্ত সম্পর্কের রূপ ধারণ করে। জান-মাল ও জীবনের সকল ব্যাপারে তাদের মধ্যে আত্মীয়তা প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর পরে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) জায়েদকে মুতা যুদ্ধে সেনাপতি বানিয়ে পাঠান। অতঃপর তার ছেলে উসামা (রাঃ)-কে রোমের যুদ্ধে এমন এক বাহিনীর সেনাপতি করেন-যার মধ্যে অধিকাংশ ছিলেন মুহাজের ও আনসার এই সেনাবাহিনীতে হজরত আবু বকর (রাঃ) এবং ওমর (রাঃ)ও ছিলেন- যারা ছিলেন রাসূলুল্লাহর (সাঃ) নিকটতম সাথী ও উজীর এবং পরে পূর্ণ ঐক্যমত সহকারে খলিফা নির্বাচিত হন। উসামার নেতৃত্বে পরিচালিত এই সেনাবাহিনীতে রাসূলুল্লাহর (সাঃ) ঘনিষ্ট আত্মীয় সা'দ ইবনে আবি আক্কাছও ছিলেন। তিনি ছিলেন রাসুলুল্লাহর (সাঃ) মাতুল গোষ্ঠি-বনু জোহরা গোত্রের লোক। তাছাড়া কোরাইশদের যে সব ব্যক্তি নবুয়তের প্রথম দিকেই ইসলাম গ্রহণ করেন-তিনি ছিলেন তাদের অন্যতম। আল্লাহ তায়ালা তাকে মাত্র সতের বছরে ইসলাম গ্রহণের তওফিক দেন। তিনি বিরাট বিত্তশালী ও মর্যাদা সম্পন্ন লোক ছিলেন। তিনি অত্যন্ত অভিজ্ঞ সমর-কুশলীও ছিলেন এবং সেই সাথে জেহাদী প্রেরণায়ও উদ্বুদ্ধ ছিলেন।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ইন্তেকালের পর হজরত আবু বকর (রাঃ) যখন উসামার বাহিনীকে পুনরায় যুদ্ধে প্রেরণের সিদ্ধান্ত করেন তখন তিনি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর নিযুক্ত সেনাপতিকেও বহাল রাখেন। তিনি যখন সেনাপতিকে বিদায় দেয়ার জন্য মদিনার বাইরে আসেন-তখন উসামা সওয়ারীতে চড়ে যাচ্ছিলেন, আর খালিফাতুল মুসলেমীন চলছিলেন পায়ে হেঁটে। উসামা এতে অত্যন্ত কুণ্ঠা বোধ করেন। নিজে সওয়ার হয়ে সওয়ারীতে চড়বেন, আর বৃদ্ধ খলিফা পায়ে হেঁটে চলবেন- এটা তিনি স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করতে পারছিলেন না। তাই উসামা বললেন, "খলিফাতুর রাসূল! আপনিও সওয়ারীতে আরোহণ করুন- নইলে আমি নেমে আসবো।" খলিফা শপথ করে বলেন, "খোদার কছম! তুমি নীচে নেমনা। খোদার কছম! নীচে নেমনা। খোদার কছম! আমি সওয়ারীতে আরোহণ করবো না। আমি কিছুক্ষণ আল্লাহর রাহে হেঁটে চললে আমার কোনোই ক্ষতি হবে না।" এর পর হজরত আবু বকরের (রাঃ) হঠাৎ মনে পড়ে যে, হজরত ওমরের তাঁর প্রয়োজন পড়তে পারে। অসুবিধা ছিল এই যে, ওমর (রাঃ) উসামার বাহিনীর একজন সৈনিক ছিলেন। যেহেতু সে বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন উসামা, তাই ওমর (রাঃ) কে রাখতে হলে উসামার অনুমতি প্রয়োজন ছিল। খলিফা বলেন, "যদি আপনি ভাল মনে করেন তবে অনুগ্রহ পূর্বক ওমরকে আমার সাহায্যের জন্য রেখে যান।"
এখানে এসে বিস্ময়ে ইতিহাসের গতি স্তব্ধ হয়ে যায়। "যদি ভালো মনে করেন তবে ওমর (রাঃ) কে আমার সাহায্যের জন্য রেখে যান।" একথা কত উচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হয়ে খলিফা তার মামুলী সেনাপতিকে বলতে পারেন তা বুঝিয়ে বলার উপযুক্ত ভাষা আমাদের নেই।
ইতিহাস আরো সম্মুখে অগ্রসর হয়। আমরা দেখতে পাই, ওমর ইবনে খাত্তাব (রাঃ) আম্মার ইবনে ইয়াসার (রাঃ) কে কুফার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন অথচ তিনিও দাস শ্রেণী-উদ্ভুত ছিলেন আমাদের কল্পনার চোখ আরো বিস্তারিত হয় যখন আমরা দেখি যে, আমর ইবনে হিশামের পুত্র সোহায়েল, আবু সুফিয়ান ইবনে হারব এবং অন্যান্য কোরাইশ সর্দার দাঁড়ানো থাকতে হজরত ওমর দু'জন প্রাক্তন গোলাম সোহায়েব (রাঃ) ও বিলাল (রাঃ) কে আগে ডেকে নেন। কেননা তারা ছিলেন রাসূলুল্লাহর সাহাবী ও বদর যুদ্ধের সিপাহী। এ অগ্রাধিকারে আবু সুফিয়ান অস্ফুট ক্রুদ্ধ স্বরে জাহেলিয়াতের উক্তি করে ফেলেনঃ "এমন কান্ড কখনো দেখিনি। আমাদেরকে দরজায় দাঁড় করিয়ে গোলামগুলোকে ভেতরে ডেকে নেয়া হলো।"
হযরত ওমর (রাঃ) একদিন মক্কা শরীফের কোথাও যাচ্ছিলেন। দেখেন যে চাকর-নফররা মুনিবদের সাথে খেতে বসেনি বরং একপাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তিনি রাগান্বিত হয়ে মুনিবদের উদ্দেশ্যে বলেন, "ব্যাপার কি! নিজেদের ভৃত্যদের সাথে এরূপ বৈষম্যমূলক ব্যবহার করা হচ্ছে কেন?" অতঃপর তিনি ওই ভৃত্যদেরকে ডেকে জোর পূর্বক মনিবদের সাথে ভোজনে বসিয়ে দেন।
হযরত ওমর (রাঃ) নাফে ইবনুল হারেসকে মক্কার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। তার সাথে উসফানে খলিফার সাক্ষাত হলে জিজ্ঞাসা করেন, "কি সংবাদ, কাকে স্থলাভিষিক্ত করে এসেছ?" নাফে জবাব দেন, "ইবনে আবজাকে স্থলাভিষিক্ত করে এসেছি। তিনি আমাদের আজাদকৃত গোলামদের অন্যতম।" ওমর (রাঃ) বললেন, "সে কি! একজন আজাদকৃত গোলামকে মক্কাবাসীদের ওপর নিজের স্থলাভিষিক্ত করে এলে?" জবাব এলো, "তিনি কোরআনে অভিজ্ঞ, শরিয়তে সুপন্ডিত এবং সুবিচারক।" হযরত ওমর (রাঃ) বললেন, "হবেই তো! আমাদের নবী (সাঃ) বলে গেছেন যে, আল্লাহ তায়ালা এই কিতাব দ্বারা অনেককে ওপরে তুলবেন, অনেককে নীচে নামাবেন।"
إِنَّ اللَّهَ يَرْفَعُ بِهَذَا الْكِتَابِ أَقْوَامًا لِيَضْعِ بِهِ أُخِرِينَ
বলা বাহুল্য, হযরত ওমর (রাঃ) আপত্তি জ্ঞাপনের উদ্দেশ্যে নয়- বরং ইবনে আবজার পরিচয় জানবার জন্য প্রশ্ন করেছিলেন। নইলে এই ওমরই নিজের পরবর্তী খলিফা নির্বাচনকারী ছয় সদস্য বিশিষ্ট পরিষদকে অছিয়ত করার সময় বলতেন না যে, "হোজাইফার গোলাম সালেম জীবিত থাকলে আমি তাঁকে খলিফা নিয়োগ করে যেতাম।" এ থেকে বুঝা যায়, তিনি তাকে পরিষদের ছয়জন সদস্যের প্রত্যেকের চেয়ে উত্তম মনে করতেন। এই ছয়জন ছিলেন; ওসমান, আলী, তালহা, জোবায়ের, আবদুর রহমান ইবনে আওফ, সা'দ ইবনে আবি আক্কাস এবং আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রাঃ)।
একবার জনৈক আজাদকৃত গোলাম অন্য একজন কোরাইশ বংশীয় ব্যক্তির নিকট তার বোনের পানি গ্রহণের অভিলাষ প্রকাশ করে এবং তার বোনকে প্রচুর অর্থ দিতে চায়। কিন্তু সে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। ওমর (রাঃ) যখন একথা জানতে পারলেন, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমি কোন কারণে তার সাথে তোমার বোন বিয়ে দিতে চাওনি? সে অত্যন্ত ভালো মানুষ এবং সে তোমার বোনকে অনেক অর্থ সম্পদও দিতে চেয়েছে।" লোকটা বললো, "আমরা উচ্চ সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোক। কিন্তু সে আমার বোনের সম-পর্যায়ভূক্ত নয়।" ওমর (রাঃ) বললেন, "এই ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাত উভয় দিক থেকে দুনিয়ায় সম্ভ্রান্ত এই জন্যে যে, সে প্রচুর বিত্তবান আর আখেরাতে সম্ভ্রান্ত এই জন্য যে, সে খোদাভীরু ও সৎকর্মশীল। যদি মেয়ে রাজী থাকে তবে তাকে এই ব্যক্তির সাথে বিয়ে দিয়ে দাও।" লোকটি তার বোনের মতামত গ্রহণ করে দেখে যে সে সম্মত। অতঃপর তার সাথে তার বোনকে বিয়ে দিয়ে দেয়।
গোলামদের যে ক্ষেত্রে ইচ্ছা, উচ্চ থেকে উচ্চতর পদমর্যাদায় উন্নীত হবার অবাধ সুযোগ ছিল। তাই আব্দুল্লাহ ইবনে ওমরের সাথে তার গোলাম ইকরাম, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের সাথে তার গোলাম নাফে, আনাস ইবনে মালিকের সাথে তার গোলাম ইবনে শিরীন এবং আবু হোরাইরার সাথে তার গোলাম ইবনে হরমুজ ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য ও অবিস্মরণীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। বসরায় হাসান বসরী এবং মক্কায় মুজাহেদ ইবনে জুবায়ের, আতা ইবনে আবি রাবাহ এবং তাউস ইবনে কাইসান খ্যাতনামা ফকীহ ছিলেন এবং তাঁরা সকলেই ছিলেন দাস বংশোদ্ভূত। অনুরূপভাবে হযরত ওমর ইবনে আবদুল আজীজের সময়কার মিশরের মুফতি ইয়াজিদ ইবনে আবু যিব দিনকালার আসওয়াদ নামক ব্যক্তির গোলাম ছিলেন। (আবু হানিফাঃ আবদুল হালিম জুন্দী)।
শ্রমজীবীদের ব্যাপারেও মুসলমানদের নীতি অনুরূপ ছিল। গায়ে খেটে জীবিকা উপার্জনকারীরা মুসলমানদের সমাজ জীবনে অত্যন্ত মর্যাদার অধিকারী ছিল। স্বয়ং শ্রমের মর্যাদা ছিল অত্যন্ত উচ্চ। তাই শ্রমিক মাত্রই - তা সে যে পেশার সাথেই সংশ্লিষ্ট হোক - সমান শ্রদ্ধা লাভ করতো। কোনো শ্রমজীবীর পেশা তাকে জ্ঞানার্জনে বাধা দিতে পারতো না- এমনকি বড় বিদ্বান ও ওস্তাদে পরিণত হবার পথেও কোনো বাধা ছিল না।
ইমাম আবু হানিফা কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন, আর তার পরবর্তী বহু বিখ্যাত মনীষি ব্যবসায়ী অথবা কারিগর ছিলেন। ইমাম আহমদ ইবনে আমর ছিলেন জুতা প্রস্তুতকারী। তার পিতা ছিলেন ইমাম আবু হানিফার সহচর মুহাম্মদ ও হাসানের শিষ্য। ইনি এক দিকে, জুতা তৈরী করে জীবিকা উপার্জন করতেন, আবার অপরদিকে খলিফা মুহতাদী বিল্লাহর জন্য 'কিতাবুল খারাজ' বা 'ইসলামের রাজস্ব-নীতি' প্রণয়ন করছিলেন। এই সময়ে তিনি ফেকাহ শাস্ত্রের ওপর নিজের মূল্যবান গ্রন্থাবলী প্রণয়ন সমাপ্ত করতেন। কাফ্ফালের হাতে তালা বানানোর দাগ পরিদৃষ্ট হতো, ইবনে কাত্তান্দুবাগা দজ্জীগিরী করতেন, খ্যাতনামা ইমাম জাসসাস ছিলেন কাঁচপাত্র নির্মাতা। এমনিভাবে ইতিহাসের পাতায় সাক্ষ্য দিতে আমাদের সামনে আসেন পিতলের পাত্র বিক্রেতা (সাফফার), আতর বিক্রেতা (সায়দালানী), হালুয়া বিক্রেতার পুত্র (হালওয়ায়ী), আটা বিক্রেতা (দাক্কাক), সাবান বিক্রেতা (সাজুনী), জুতা প্রস্তুতকারী (নায়ালী), তরকারী বিক্রেতা (বাক্কালী) এবং হাড়ী বিক্রেতা (কুদূরী) প্রমুখ।
ইসলামী সভ্যতার প্রাতঃকালেই অর্থাৎ প্রথম শতাব্দীতে মুসলমানরা যা করে দেখান, বহু শতাব্দীব্যাপী চেষ্টা করেও পাশ্চাত্য জগত তা করতে পারেনি- অর্থাৎ কিনা কোন পেশাই মূলতঃ নীচ কিংবা সম্ভ্রান্ত নয়, আসলে মানুষই উচ্চতর গুণাবলীর অধিকারী হয় অথবা তা থেকে বঞ্চিত হয়। (আবু হানিফাঃ জুন্দী)

📘 ইসলামের স্বর্ণযুগে সামাজিক ন্যায়নীতি > 📄 ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা

📄 ব্যক্তি স্বাধীনতা ও বাক স্বাধীনতা


মানবিক সাম্যের এই সু-উচ্চ মর্যাদার পূর্ণ বিবরণ দেয়া সম্ভব হবে না যতক্ষন আমরা উচ্চ পদস্থ লোকদের ব্যাপারে ইসলামী সমাজের নীতি সম্পর্কে সঠিকভাবে ওয়াকিফহাল না হবো। বড়রা যখন ছোটদের সাথে এক সারিতে দাঁড়াবে এবং শ্রেষ্ঠত্ব ও মহত্বের একমাত্র ভিত্তি হবে- বংশ-মর্যাদা, পদ-মর্যাদা ও ধন-সম্পদ নয় বরং চরিত্র- কেবলমাত্র তখনি প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। কেবলমাত্র ছোটদের সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রকৃত সাম্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারে না।
ইমাম আবু ইউসুফ (রাঃ) তদীয় 'কিতাবুল খারাজে' লিখেছেনঃ "একবার হযরত ওমর (রাঃ) তার কর্মচারীদেরকে হজ্জের সময় তার সাথে সাক্ষাত করার নির্দেশ পাঠান। যথাসময়ে তারা উপস্থিত হলে হযরত ওমর (রাঃ) তাদের ও সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে ভাষণ দেনঃ
"ভাই সব! সততার সাথে তোমাদের তত্ত্বাবধান ও সেবার জন্যই আমি এ সব কর্মচারী নিয়োগ করেছি। তোমাদের জান-মাল ও মান-সম্মানের উপর হস্তক্ষেপ করার জন্যে আমি এদেরকে নিযুক্ত করিনি। সুতরাং কোন কর্মচারীর বিরুদ্ধে তোমাদের কারো কোন অভিযোগ থাকলে তার দাঁড়িয়ে সে কথা বলা উচিত। সেদিন মাত্র এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললো, "আমিরুল মুমেনীন! আপনার অমুক কর্মচারী আমাকে অন্যায়ভাবে একশো কোড়া মেরেছে।"
হযরত ওমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "তুমিও কি তাকে প্রহার করতে চাও? এস, প্রতিশোধ গ্রহণ কর।" তখন আমর ইবনুল আস দাঁড়িয়ে বললেন, "আমিরুল মুমেনীন! আপনি কর্মচারীদের সাথে এরূপ ব্যবহার করা শুরু করলে তা তাদের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন ব্যাপার হয়ে দাড়াবে। এটা একটা স্থায়ী রীতি হয়ে দাঁড়াবে এবং আপনার পরবর্তী লোকেরাও তদনুসারে কাজ করবে।"
হযরত ওমর (রাঃ) বললেনঃ "তাই বলে কি আমি এই ব্যক্তিকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে দেব না? অথচ আমি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কে নিজের নিকট থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে দেখেছি। (লোকটিকে লক্ষ্য করে) এস, প্রতিশোধ গ্রহণ কর।" আমর ইবনুল আস বললেন, "আমাদেরকে লোকটিকে সন্তুষ্ট করার সুযোগ দিন।"
হযরত ওমর (রাঃ) অনুমতি দিলেন। তখন তারা লোকটিকে দু'শো দিনার দিয়ে সন্তুষ্ট করলেন। প্রতিটি কোড়ার বিনিময়ে দুই দিনার দিতে হলো। আমর ইবনুল আস অন্য কর্মচারীর ওপর থেকে বিপদ অপসারণ করলেন সত্য, কিন্তু স্বয়ং তাঁর পুত্রের বিরুদ্ধে যখন জনৈক মিশরীয় ছেলেকে প্রহার করার অভিযোগ এল তখন ওমর (রাঃ) তাকে প্রতিশোধ গ্রহণ করিয়ে ছাড়েন এবং আমরকে কোন উচ্চ-বাচ্য করতে দেননি। প্রতিশোধ গ্রহণ করানোর সময়ে হজরত ওমর (রাঃ) বলেছিলেন, "এই বড়লোকের ছেলেকে প্রহার কর।" আমর ইবনুল আসেরও শাস্তি ভোগ করা অবধারিত হয়ে উঠেছিল কিন্তু মিশরীয় লোকটি ক্ষমা করে দেয় এবং প্রহার থেকে বিরত থাকে।
আর একদিন হজরত ওমর (রাঃ) বসে মুসলমানদের মধ্যে কিছু অর্থ বন্টন করছিলেন। সমবেত লোকদের ভীড় প্রবল হয়ে ওঠে। সা'দ ইবনে আবি আক্কাস সম্মূখে অগ্রসর হলেন এবং অন্যান্য লোককে ঠেলে হজরত ওমরের নিকট পৌঁছে যান। এই সাহাবী ছিলেন বিশিষ্ট অভিজাত পরিবারের সন্তান। হজরত ওমর (রাঃ) এই বলে তাঁকে এক দোররা কষে দিলেন "তুমি পৃথিবীর ওপরে আল্লাহর হুকুমতের প্রতাপ মান না কিন্তু আল্লাহর হুকুমাতের দৃষ্টিতে যে তোমার প্রভাব প্রতিপত্তির কানা-কড়িও মূল্য নেই তা তোমাকে দেখিয়ে দেয়া আমি প্রয়োজন বোধ করলাম।"
কেউ বলতে পারে যে, তিনিতো ছিলেন খলিফা। তার সাথে কার তুলনা? এই জন্য আমরা এবার দেখবো যে খলিফা ও বাদশাহদের সামনে তাদের প্রজারা মত প্রকাশ ও সমালোচনার ব্যাপারে কতখানি স্বাধীনচেতা ও নির্ভীকতার পরিচয় দিয়েছেন। মতামত প্রকাশে এই স্বাধীনচেতা ও নির্ভীকতার আসল উৎস হচ্ছে ইসলাম প্রদত্ত বিবেক ও প্রজ্ঞার স্বাধীনতা এবং কথায় ও কাজে বাস্তবায়িত পূর্ণ সাম্য।
খলিফা হিসাবে ভাষণ দিতে গিয়ে হজরত ওমর (রাঃ) বলেন, "যদি তোমরা আমার মধ্যে কোন বক্রতা দেখ তবে আমাকে সোজা করে দিও।" সমবেত মুসলমানদের মধ্য থেকে একজন বলে ওঠেন, "তোমার মধ্যে কোন বক্রতা দেখলে আমরা তোমাকে তীক্ষ্ণধার তরবারী দিয়ে সোজা করে দেব।” এক কথা শুনে ওমর (রাঃ) বললেন, "আল্লাহর হাজার শোকর যে, তিনি ওমরের খেলাফতের মধ্যে এমন ব্যক্তিও সৃষ্টি করেছেন যে তাকে তীক্ষ্ণধার তরবারী দিয়ে সোজা করতে পারে।" একবার মুসলমানরা গণিমতে কতগুলো ইয়ামেনী চাদর লাভ করেন। সকল মুসলমানের মত হজরত ওমরও একটা চাদর পান। এবং তার পুত্র আবদুল্লাহকেও একটা চাদর দেন। যেহেতু খলিফার জামার দরকার ছিল তাই আবদুল্লাহ নিজের অংশের চাদরটাও খলিফাকে দিয়ে দেন যাতে দু'টো মিলে একটা জামা হতে পারে। এ জামা গায়ে দিয়ে হযরত ওমর (রাঃ) বক্তৃতা দিতে ওঠেন এবং বলেন, "তোমরা আমার কথা শোন এবং মেনে চল।” তৎক্ষণাৎ সালমান উঠে বললেন, "আপনার কথা আর শোনবোও না মানবোও না।” ওমর (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, "কেন?” সালমান বললেন, "আগে আপনি জবাব দিন, এ জামা কি করে তৈরী করলেন? নিশ্চয়ই আপনিও একটা চাদরই পেয়েছেন, আর আপনি খুবই লম্বা মানুষ।" তিনি বললেন "তাড়াহুড়া করে ফয়সালা করে ফেল না।" অতঃপর তিনি আবদুল্লাহ ইবনে ওমরকে ডেকে বললেন, "আমি তোমাকে খোদার শপথ দিয়ে জিজ্ঞাসা করছি বল, যে চাদর দিয়ে আমি জামা বানিয়েছি তা তোমার চাদর কি-না? তিনি বললেন, "হ্যাঁ"। তখন সালমান বললেন, "এবার বলুন আপনি, কি হুকুম। আমরা শুনবো এবং মানবোও।"
কেউ বলতে পারে যে, এটা তো ওমরের (রাঃ) ব্যাপার। তার সাথে কার তুলনা?
আবু জাফর মনসুরের উদাহরণ নিন। তিনি যে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন তার আইনের ভিত্তি শরিয়তের ওপর নয় বরং আমাদের পরিভাষা অনুসারে সামাজিক রসম-রেওয়াজ ও রীতি-প্রথার ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। সুফিয়ান সওরী তার নিকট গিয়ে বলেন, "আমিরুল মুমেনীন! আপনি আল্লাহ ও মুসলমানদের ধন-সম্পদ তাদের ইচ্ছা ও সম্মতি ছাড়াই ব্যয় করেছেন। বলুন এর কি জবাব আছে আপনার কাছে?" হযরত ওমর (রাঃ) একবার সরকারী খরচে হজ্জ করেছিলেন, তাতে তার এবং তার সংগী-সাথীদের ওপর সর্বমোট ষোল দিনার ব্যয়িত হয়েছিল। তথাপি ওমর (রাঃ) বলেছিলেন, আমার মনে হয় আমরা বাইতুল মালের ওপর বিরাট বোঝা চাপিয়েছি। আপনি নিশ্চয়ই জানেন, মনসুর ইবনে আম্মার আমাদেরকে কি হাদীস শুনিয়েছিলেন। কারণ সেই মজলিসে আপনিও ছিলেন এবং সর্বপ্রথম আপনিই হাদীসটা লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ইবনে মাসউদ থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তার রাসুলের সম্পদে নিজের খেয়াল খুশী মত হস্তক্ষেপ করবে তার জন্য দোজখের আগুন অবধারিত রয়েছে।" এতে বাদশাহর ঝানু চাটুকার আবু ওবায়দা নামক কেরানী বলে উঠলো, "কি! আমিরুল মুমেনীনের সাথে এ ধরনের আলাপ!" সুফিয়ান তাকে ধমক দিয়ে বললেন, "চুপ হতভাগা! হামান ও ফেরাউন এই ভাবেই। চাটুকারীতা করে পরষ্পরকে ধ্বংস করেছিল।” এই বলেই দরবার থেকে নিষ্ক্রান্ত হন।
স্বৈরাচারী শাসকদের স্বৈরাচার যতই প্রবল হোক, যার হৃদয় জ্যোতির্ময় ছিল এবং যে বস্তুগত প্রয়োজনের উর্দ্ধে উঠে আল্লাহর বিধানের নিকট পরিপূর্ণরূপে আত্মসমর্পন করেছে- তেমন ব্যক্তির ওপর হস্তক্ষেপ করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
ওয়াসেকও ছিলেন স্বৈরাচারী শাসক। তার কাছে একবার জনৈক মুসলিম দার্শনিক আগমন করেন। তিনি ওয়াসেককে সালাম করেন কিন্তু তার জবাবে ওয়াসেক বলেন- "লা সাল্লামাল্লাহু আলায়কা” (অর্থাৎ আল্লাহ যেন তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত না করেন)। এ কথা শোনা মাত্রই তিনি ওয়াসেককে ধমক দিয়ে বলেন, "তোমার শিক্ষকরা তোমাকে অত্যন্ত অভদ্র আচরণ শিখিয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেনঃ
"যখন তোমাদেরকে সালাম করা হয় তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম কর অথবা সেটার মতই জবাব দাও।" অথচ তুমি আমাকে উত্তম সালাম করা দূরে থাক সমান সমান জবাবও দাওনি। (আবু হানিফা-জুন্দী)।
বিচারপতি আবু ইউসুফ আদালতের অধিবেশনে বসেছেন। এক ব্যক্তি তার নিকট মোকদ্দমা নিয়ে এলো। আব্বাসী বাদশাহ হাদীর সাথে একটি বাগানের ব্যাপারে তার কোন্দল। আবু ইউসুফ মত পোষণ করেন যে, বাগান ওই লোকটিরই প্রাপ্য। কিন্তু অসুবিধা এই যে, বাদশাহের সাক্ষী ছিল। তিনি বললেন, "বাদী দাবি করছেন যে, বাদশাহর সাক্ষীরা সত্যবাদী এ মর্মে বাদশাহকে শপথ করতে হবে।" হাদী শপথ করাকে নিজের অবমাননা মনে করায় তা অস্বীকার করেন এবং বাগান তার মালিককে ফেরত দেন। অপর একটি মামলায় তিনি হারুনুর রশীদকে শপথমূলক বিবৃতি দিতে বাধ্য করেন।
ফজল ইবনুর রবী হারুনুর রশীদের পক্ষে সাক্ষী হয়ে এলে তিনি তার সাক্ষ্য নাকচ করে দেন। খলিফা এতে বিক্ষুব্ধ হয়ে জিজ্ঞাসা করেন, "ফজলের সাক্ষ্য নাকচ করার কারণ কি?" জবাবে আবু ইউসুফ বলেন, "আমি তাকে বলতে শুনেছি যে, আমি আপনার গোলাম।" যদি তার কথা সত্য হয়ে থাকে তাহলে গোলামের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয় আর যদি সে মিথ্যুক হয়ে থাকে তাহলে মিথ্যুকের সাক্ষ্য গ্রাহ্য হতে পারে না।" (আবু হানিফা-জুন্দী)
ইসলাম যে ব্যক্তি-স্বাধীনতার প্রদীপ মানুষের বিবেক-মনে প্রজ্জলিত করেছিল, তা ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকারময় যুগেও অনির্বাণ ছিল। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে বিবেকের এহেন গৌরবদীপ্ত স্বাধীনতার প্রচুর উদাহরণ পরিদৃষ্ট হয়। মিসরে আহমদ ইবনে তুলুন, বাক্কার ইবনে কাতিবা নামক হানাফী কাজীকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন। আহমদ তাকে আব্বাসী যুবরাজ মুয়াফ্ফাকের ওপর অভিসম্পাত করার অনুরোধ জানালে তিনি ক্ষণিক থেমে বললেনঃ
أَنْ لَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الظَّالِمِينَ (الاعراف - ٤٤)
"সাবধান! অত্যাচারীদের ওপর অভিসম্পাত।" এতে এক ব্যক্তি আহমদ ইবনে তুলুনকে বলেন যে, বাক্কার আপনাকে (আহমদকে) লক্ষ্য করেই অভিসম্পাত করেছে। এর ফলে ইবনে তুলুন তাকে প্রদত্ত যাবতীয় উপঢৌকন ফেরত চান। এ জিনিসগুলো তিনি যেরূপ সিলমোহর করা অবস্থায় দিয়েছিলেন সে অবস্থায়ই ফেরত পান। অতঃপর ইবনে তুলুন বাক্কারকে একটি ভাড়াটিয়া ঘরে অন্তরীণ করেন। বহুলোক তার সাথে সাক্ষাৎ করার জন্য ইবনে তৃলুনের নিকট থেকে অনুমতি নিয়ে আসতো। বাক্কার তাদের সাথে জানালার মধ্য দিয়ে আলাপ করতেন, এরপর ইবনে তুলুন এমন কঠিন রোগে আক্রান্ত হন যে, তার জীবনের কোন আশাই থাকলো না। তখন তিনি বাক্কারের মুক্তির নির্দেশ দেন। যে দূত মুক্তির বার্তা নিয়ে এসেছিল তাকে তিনি বলেছেন, "ইবনে তুলুনকে বল, আমি অত্যন্ত বৃদ্ধ হয়ে গেছি আর উনি রোগাক্রান্ত। এখন শীগগীরই আমাদের - সাক্ষাত হবে। আমাদের মাঝে শুধু আল্লাহ ব্যবধান সৃষ্টি করে রেখেছেন।" ইবনে তুলুন মারা গেলে বাক্কার বলতেন, "আহা! বেচারা মারা গেছে!” (আবু হানিফা- জুন্দী)
এই "বেচারা মারা গেছে" উক্তিটির মধ্য দিয়ে তার এ অনুভূতি মূর্ত হয়ে উঠেছে যে, ইবনে তুলুন ক্ষমতাসীন ছিল সত্য, কিন্তু সে ছিল তার চেয়ে নীচ এবং অসহায়।
আইয়ুবী শাসনামলে মিশরের বাদশাহ ইসমাইল ক্রুসেড-যুদ্ধে ইংরেজদের সহযোগিতা করেন। ইংরেজরা তাকে সুলতান নাজমুদ্দিন আইয়ুবের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে-এই মর্মে আশ্বাস পেয়ে সায়দাসহ কতিপয় এলাকা তিনি ইংরেজদের নিকট হস্তান্তর করেন। কিন্তু আজ্জুদ্দীন ইবনে আব্দুস সালাম এর কঠোর প্রতিবাদ জানালে বাদশাহ রুষ্ট হয়ে তাকে গ্রেফতার করেন। অতঃপর তিনি দূত পাঠিয়ে আজ্জুদ্দীনকে ভীতি ও লোভ প্রদর্শন করেন। দূত তাকে বলে, "আপনি বাদশাহর কার্যকলাপে হস্তক্ষেপ না করলে আপনাকে সাবেক পদে বহাল করা হবে এবং আপনার আরো পদোন্নতি হবে।" আজ্জুদ্দীন জবাব দেন, "খোদার শপথ! বাদশাহ এসে আমার হাত চুম্বন করুক-তাও আমি বরদাশত করবো না। আসলে, তোমরা এক জগতের লোক আর আমি অন্য জগতের লোক।" (আবু হানিফা- আব্দুল হালিম জুন্দী)
জাহির বেবরিসের শাসনামলে শেষ মহিউদ্দিন নবভী দামেস্কে অবস্থান করতেন। তিনি জাহিরকে প্রায়ই সদুপদেশ দিতেন। তিনি কখনো চিঠি দ্বারা কখনো মৌখিক উপদেশ দিতেন। আল্লামা জালালুদ্দীন সুযুতী তার প্রখ্যাত গ্রন্থ "হুসনুল মুহাজারা"তে বাদশাহর নিকট লিখিত তার বহু চিঠি উদ্ধৃত করেছেন। এর অধিকাংশ চিঠিতে জনগণের অর্থনৈতিক দুরবস্থার কথা উল্লেখ করে কর মওকুফ করার দাবি জানানো হয়েছে। একটি চিঠিতে তিনি লিখেছেন; "এ বছর যথোপযুক্ত বৃষ্টি হয়নি। দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি, খাদ্য দ্রব্যের তীব্র অভাব, গবাদি পশুর মড়ক প্রভৃতি কারণে সিরিয়াবাসীরা শোচনীয় অবস্থায় পতিত। এমতাবস্থায় দরিদ্র জনগণের ওপর আপনার অনুগ্রহ প্রদর্শন করা উচিত। আপনার এবং জনগণের কল্যাণের জন্যই এ কথা বলা। কেননা কল্যাণ কামনাই হচ্ছে ইসলামের মূল কথা।"
বাদশাহ এ উপদেশ শুধু প্রত্যাখ্যানই করলেন না, অধিকন্তু তার প্রতি আলেম সমাজের অসহযোগিতায় তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করে বলেন; "তাতারীরা যখন দেশের ওপর হামলা করে লুটতরাজ চালাচ্ছিল-তখন এই হুজুররা কোথায় ছিলেন?" শেখ মহিউদ্দীন তার এ টিটকারীর কঠোর জবাব দিয়েছিলেন। তিনি নিজের মতামত এবং পূর্বোক্ত উপদেশের পূনরাবৃত্তি করে বলেন; "অমুসলিম হানাদারদের ব্যাপার আর দেশের মুসলিম শাসকদের ব্যাপার সমান হতে পারে না। সেই বিদ্রোহী কাফেররা যখন আমাদের দ্বীনের ওপর বিন্দুমাত্র ঈমান রাখতো না- তখন তাদেরকে আমরা কি উপদেশ দিতে পারতাম এবং তাতে কি লাভ হতো? আমি স্পষ্ট জানিয়ে দিতে চাই যে, আমাকে সত্য কথা বলা এবং সদুপদেশ দেয়া থেকে কেউ বিরত রাখতে পারবে না। কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই যে, এটা আমার এবং আমার মত অন্যান্যদের পক্ষে অবশ্য কর্তব্য। আর কর্তব্য পালন করতে গিয়ে যে বিপদেরই সম্মুখীন হতে হোক না কেন, সেটা আল্লাহর নিকট মহাকল্যাণের কারণ এবং মর্যাদা বৃদ্ধির সহায়ক হবে। আমি পুরোপুরিভাবে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করছি। আল্লাহ তার বান্দাদের অবস্থা সম্পর্কে সম্পূর্ণরূপে ওয়াকিফহাল। আল্লাহর রাসূল আমাদেরকে সত্য কথা বলা সর্বাবস্থায় অব্যাহত রাখতে এবং এ ব্যাপারে কোন নিন্দুকের নিন্দাবাদ গ্রাহ্য না করতে উপদেশ দিয়েছেন। আমরা বাদশাহকে সর্বাবস্থায় ভালবাসি এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তার কল্যাণ কামনা করি।"
শেখ সাহেব এমনি হীত কামনার প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে চিঠি লিখতে থাকেন। কিন্তু জাহির তার উপদেশ কর্ণপাত না করে আসন্ন যুদ্ধের প্রস্তুতির অজুহাতে কর আদায় করা অব্যাহত রাখেন। বাদশাহ নিজের মতামতের পক্ষে আলেমদের ফতোয়া জমা করে রেখেছিলেন। এই সব আলেম তার নির্দেশ অনুসারে ফতোয়া দিয়েছিল। তিনি শেখকে ডেকে অন্যান্য আলেমদের ফতোয়ায় স্বাক্ষর দিতে বলেন। শেখ এতে অত্যন্ত কঠোর ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, "আমি জানি, তুমি একজন কয়েদী ক্রীতদাস ছিলে। তুমি ছিলে দেউলে। এরপর আল্লাহ তোমার ওপর অনুগ্রহ করেন এবং তোমাকে বাদশাহর মর্যাদায় উন্নীত করেন। আমি জানি, তোমার কাছে জরিদার কাপড় পরিহিত এক হাজার ক্রীতদাস এবং আপাদমস্তক স্বর্ণালংকারে মন্ডিত একশো দাসী রয়েছে। এখন তুমি যদি ক্রীতদাসদের এই জরিদার কাপড়গুলো এবং দাসীদের অংকারগুলো খরচ করে দাও তাহলে আমি ফতোয়া দেব যে, তোমার জন্য প্রজাদের নিকট থেকে কর আদায় করা বৈধ।"
জাহির এ কথা শুনে প্রচন্ড ক্রোধে ফেটে পড়েন এবং তাকে তৎক্ষণাৎ দামেস্ক থেকে বহিষ্কার করেন। শেখ সিরিয়ার নাভা নামক স্থানে বসবাস করতে থাকেন। পরে সমস্ত আলেমগণ ও ফকীহগণ বাদশাহকে বলেন যে, "ইনি আমাদের সর্বজনমান্য ও সবার সেরা আলেম। তাকে দামেস্কে ফিরিয়ে আনুন।" এতে বাদশাহ তাকে দামেস্কে ফিরে আসার অনুমতি দেন, কিন্তু শেখ তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "যতদিন জাহির ওখানে থাকবে ততদিন আমি আসবো না।” এর একমাস পর জাহির মৃত্যুমুখে পতিত হন। (অধ্যাপক আবু জুহরা কৃত "ইবনে তাইমিয়া" থেকে)
সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসেও এ ধরণের মহৎ চরিত্রের দৃষ্টান্ত বিরল নয়। আমি শুধু দু'টো ঘটনার উল্লেক করবো।
ইসমাইলের শাসনামলে একবার সুলতান আব্দুল আজীজ মিসরে আগমন করেন। ইসমাইল তার আগমনের প্রতীক্ষার দিন গুণছিলেন, কারণ তার খদেভ উপাধি লাভের ব্যাপারে তার আগমন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ছিল। তা ছাড়া সুলতানের সফরের ফলে মিসরের বহু রাজনৈতিক সুবিধাদি পাওয়ার বহু সম্ভাবনা ছিল। এই সময়ে সুলতান কর্তৃক আলেমদের সাক্ষাত দানের এক কর্মসূচী তৈরী করা হয়। এই সাক্ষাত দানের অনুষ্ঠানে বহু ইসলাম বিরোধী রসম-রেওয়াজ পালিত হয়। তন্মধ্যে একটি ছিল এই যে, আগমনকারীর নতজানু হয়ে ভূমির সাথে মাথা ঠুকে তুর্কী কায়দায় কুর্ণিশ করতে হতো। রাজ প্রাসাদের ব্যবস্থাপকদের ওপর আগত আলেমদেরকে এ সব রসম-রেওয়াজের অনুশীলন দানের দায়িত্ব ছিল, পাছে তারা সুলতানের সামনে ভুল না করে বসেন।
অতঃপর সাক্ষাত অনুষ্ঠান সময় যখন ঘনিয়ে এল, আলেমগণ একে একে ভেতরে প্রবেশ করতে লাগলেন এবং নিছক পার্থিব স্বার্থের লোভে নিজেরই মত সৃষ্ট জীবের সামনে কুর্ণিশ করে যেতে লাগলেন। তারপর শিখানো পদ্ধতিতে সুলতানের দিকে মুখ করে পেছনের দিকে অগ্রসর হতে হতে বেরিয়ে এলেন। এই ঘৃণ্য কাজ থেকে মাত্র একজন আলেম রক্ষা পেলেন। তিনি হচ্ছেন শেখ হাসানুল আদাদী। তিনি তুচ্ছ পার্থিব স্বার্থকে ঘৃণাভরে উপেক্ষা করেন এবং আল্লাহর হাতে সমস্ত শক্তি নিহিত এই অনুভূতি জাগ্রত রাখেন। তিনি স্বাধীন মানুষের মত মাথা উঁচু করে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সুলতানের সামনে এসে ইসলামী রীতি অনুসারে 'আস্সালামু আলাইকুম' বলে সালাম করেন। অতঃপর (শাসকের সাথে সাক্ষাৎ করার সময় কোন আলেমের যেমন করা উচিত) তিনি তাকে আল্লাহকে ভয় করা এবং মানুষের সাথে সুবিচার ও সদয় ব্যবহার করার উপদেশ দেন। তারপর কথা শেষ হলে আবার সালাম করেন এবং নির্ভীক স্বাধীন মানুষের মত আবার মাথা উঁচু করে বাইরে চলে যান।
এসব দেখে দরবারের ব্যবস্থাপক এবং স্বয়ং খদেভের চেতনা বিলোপের উপক্রম হলো। তারা ভাবলেন পরিস্থিতি আয়ত্বের বাইরে চলে গেছে এবং সুলতানের বোধ হয় ক্রোধের কোন সীমা থাকবে না। তাদের সযত্ন অনুশীলন ব্যর্থ হওয়ায় তারা হতাশায় ভেংগে পড়লো।
কিন্তু সত্য কথার প্রভাব কখনো ব্যর্থ হতে পারে না। ওটা যে শক্তি ও প্রতাপ নিয়ে মন থেকে বেরিয়ে আসে সেই শক্তি ও প্রতাপ নিয়ে অন্যান্যদের মনে উপ্ত হয়। এখানেও তাই হলো। সুলতান বে-ইখতিয়ার বলে ফেললেন যে, তোমাদের এখানে শুধু এই একজনই আলেম রয়েছে। সুলতান শুধু তাকে পুরস্কৃত করলেন এবং অন্য সবাইকে বঞ্চিত রাখলেন।
দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে খদেভ তওফিক পাশা ও শেখ হাসানুওভীলের মাঝে 'দারুল উলুমে'।
শেখ হাসানুওভীল ছিলেন দারুল উলুমের অধ্যাপক। তিনি সস্তা মূল্যের মামলী ধরণের জামা (জালবাব) পরিধান করতেন। একদিন দারুল উলুমের অধ্যক্ষ জানতে পারলেন যে, খাদেভ শীগগিরই মাদ্রাসা পরিদর্শন করতে আসবেন। তিনি তৎক্ষনাৎ মাদ্রাসা পরিস্কার করা ও সাজ শয্যা শুরু করে দিলেন। শেখ হাসানুওভীলকে পোষাক পরিবর্তন করে কাফতান ও জুব্বা (অপেক্ষাকৃত অভিজাত পোষাক) পরিধান করে আসতে বলা হলো। শেখ ইংগীতে এ অনুরোধ মেনে নিলেন।
নির্ধারিত দিনে শেখ তার পুরনো পোষাক পরিধান করেই এলেন। তবে তার হাতে একটা রুমালে একটা কিছু পুটুলির মত বাধা ছিল। তাকে পুরনো পোষাকে দেখে অধ্যক্ষের মুখ-মন্ডল বিবর্ণ হয়ে গেল। খানিকটা ক্রোধমাখা স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন "শেখ! জুব্বা ও কাফতান কোথায়?" তিনি রুমালের দিকে ইংগিত করে দেখিয়ে দিলেন যে এখানে আছে। অধ্যক্ষ ভাবলেন যে মেহমানের আগমন আসন্ন হলেই হয়তো উনি পোষাক পরিবর্তন করে নেবেন।
কিছুক্ষণ পর প্রতিক্ষিত মেহমান এলেন। সমগ্র মাদ্রাসায় একটা আনন্দের ঢেউ বয়ে গেল। এর পরক্ষণেই এক অপূর্ব ঘটনা সংঘটিত হলো। শেখ হাসানুওভীল হাতের পুটুলীটি নিয়ে খদেভের সামনে হাজির হলেন এবং সম্পূর্ণ নির্বিকার চিত্তে বললেন, "আমাকে লোকেরা বলেছে যে আমাকে অবশ্যই জুব্বা ও কাফতান পরে আসতে হবে। যদি আপনার জুব্বা কাফতানই চাই তাহলে এই রইলো জুব্বা-কাফতান, আর যদি আপনার হাসানুওভীলকে চাই তাহলে এই যে, হাসানুওভীল উপস্থিত।”
স্বাভাবিকভাবেই খদেভ জবাব দিলেন যে, তার হাসানুওভীলকে চাই।
এ হচ্ছে মুমেনদের প্রকৃত অবস্থা। তাদের ইসলামের সম্মান ছাড়া অন্য কোন সম্মানের আকাংখা থাকে না। তাদের মন-মানস ও বিবেক তুচ্ছ ও অসার মূল্যবোধ এবং ক্ষণস্থায়ী স্বার্থের কোন গুরুত্ব দেয় না। তারা ইসলামের প্রকৃত মর্ম উপলব্ধি করে এবং তাকে পুরোপুরিভাবে জীবনে কার্যকরী করে। তারা ইসলামের দুর্জয় প্রাণশক্তি অর্জন করার পর কোন মানুষকে সন্তুষ্ট করা প্রয়োজন বোধ করে না। বস্তুতঃ এটাই হলো প্রকৃত ইসলাম।
সিরিয়ায় ইয়াজিদের পক্ষে 'বাইয়াত' (প্রস্তাবিত অথবা মনোনীত খলিফার প্রতি জনগনের আনুগত্য বা সমর্থন ও সম্মতিকে 'বাইয়াত' বলা হয়) গ্রহণের পর মুয়াবিয়া সাইদ ইবনুল আসকে যে প্রকারেই হোক হেজাজবাসীদের সমর্থন আদায় করার দায়িত্ব অর্পণ করেন। কিন্তু সাইদ ব্যর্থ হন। অতঃপর মুয়াবিয়া স্বয়ং বিপুল সৈন্য-সামন্ত সমভিব্যাহারে মক্কায় যান এবাং শীর্ষস্থানীয় মুসলমানদেরকে সমবেত করে তাদের উদ্দেশ্যে বলেনঃ
"দেখ, তোমাদের সাথে আমি যেরূপ ব্যবহার করেছি এবং তোমাদের আত্মীয়তা ও সম্পর্ক-সম্বন্ধের যেরূপ মর্যাদা রক্ষা করেছি তা তোমরা ভালভাবেই অবগত আছ। ইয়াজিদ তোমাদেরই ভাই-তোমাদের চাচার ছেলে। আমার ইচ্ছা এই যে, তোমরা ইয়াজিদকে নামে মাত্র খলিফা মেনে নাও। যাবতীয় নিয়োগ-বদলী, রাজস্ব আদায় ও বন্টন প্রভৃতি কাজ তোমরাই করবে।"
আব্দুল্লাহ ইবনে জোবায়ের (রাঃ) জবাব দিলেন, "আপনার জন্য দু'টো পন্থার একটা অনুসরণ করা উচিত, হয় রাসূলুল্লাহ (সাঃ) যেমন নিজের বংশ বহির্ভূত এক ব্যক্তির পক্ষে অছিয়ত করেছিলেন তাই করুন; নচেৎ হযরত ওমর (রাঃ) যেমন নিজের কোনো নিকট আত্মীয় নয় এমন ছয় ব্যক্তির সমন্বয়ে যে পরিষদ গঠন করেন সেরূপ একটি নিরপেক্ষ পরিষদ গঠন করুন।"
মুয়াবিয়া (রাঃ) ক্রোধে যেন জ্বলে উঠলেন। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, "তোমার কাছে তৃতীয় কোনো পন্থা নেই?" ইবনে জোবায়ের বললেন, "না।" মুয়াবিয়া অন্যান্য লোকদের দিকে ফিরে বললেন, "তোমাদের মতামত কি?" সকলে একযোগে বললেন, "ইবনে জোবায়ের যা বলেছেন আমাদের বক্তব্যও তাই।" তখন মুয়াবিয়া (রাঃ) তাদেরকে হুমকি দিয়ে বললেন, "কোনো চরম পন্থা অবলম্বন করার আগে হুশিয়ারী সংকেত দিলে পরে আর আপত্তির অবকাশ থাকে না। আমি তোমাদের সামনে ভাষণ দিলাম সঙ্গে সঙ্গে তোমাদের একজন দাঁড়িয়ে সকলের সামনে আমার কথার প্রতিবাদ করলো। আমি এটা বরদাশত করলাম এবং ক্ষমা করে দিলাম।"
কিন্তু এখন আমি একটি চূড়ান্ত কথা বলার জন্য দাঁড়িয়েছি। আমি হুশিয়ার করে দিচ্ছি, তোমাদের কেউ যদি এর জবাবে একটি কথাও বলে, তবে দ্বিতীয় কোনো কথা কর্ণগোচর হবার আগেই তরবারী তার দেহ থেকে মাথা ছিন্ন করে ফেলবে। এখন প্রত্যেকের নিজ নিজ প্রাণ রক্ষা করার চিন্তা করা উচিত।"
এরপর মোয়াবিয়ার দেহরক্ষী বাহিনীর অধিনায়ক ইয়াজিদের মনোনয়নের বিরোধী হেজাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিগণের মস্তকোপরি উলংগ তরবারীধারী দু'জন করে লোক নিযুক্ত করে মুয়াবিয়া অধিনায়ককে নির্দেশ দেন যে ওদের কেউ যদি আমার ঘোষণার সমর্থনে অথবা প্রতিবাদে একটি বাক্যও উচ্চারণ করে তবে উভয়ে যেন একযোগে তরবারী দিয়ে আঘাত করে।
এই ব্যবস্থা করার পর মুয়াবিয়া মিম্বারে আরোহণপূর্বক বললেন, "এই ব্যক্তিগণ হচ্ছেন মুসলমানদের নেতা এবং তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি, এদের মতামত ছাড়া কোনো কিছু করা উচিত নয়। এরা ইয়াজিদের খেলাফতে সম্মত হয়ে 'বাইয়াত' করেছেন তোমরাও আল্লাহর নাম নিয়ে বাইয়াত কর। সংগে সংগে লোকেরা 'বাইয়াত' করলো।
এই হচ্ছে ইয়াজিদ সরকারের ভিত্তি। এই ভিত্তিকে ইসলাম কখনো মেনে নিতে পারে না। আর স্বয়ং ইয়াজিদ কি ধরনের লোক ছিল? তার সম্পর্কে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে হানজালার (রাঃ) বিবরণ লক্ষ্যণীয়।
"খোদার শপথ! আমরা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে তখন আন্দোলন শুরু করি যখন আমাদের আশংকা হয় যে আমাদের ওপর আকাশ থেকে প্রস্তর বৃষ্টি হবে। এই ব্যক্তি মা ও কন্যা এবং একাধিক বোনকে এক সাথে বিয়ে করে, মদ পান করে, নামাজ পরিত্যাগ করে। খোদার শপথ! অন্য কোন লোক আমার সাথী না হলেও আমি একাই আল্লাহর পথে কোরবানী দিতাম।"
হয়তো বা এটা ইয়াজিদের একজন দুশমনের অতিরঞ্জিত কথা। কিন্তু পরে ইয়াজিদ যে সব জঘন্য কাজ করেছিল যথাঃ হযরত হোসাইন (রাঃ) কে এমন নিকৃষ্ট পন্থায় হত্যা করা, কাবা শরীফ ঘেরাও এবং তার ওপর প্রস্তর নিক্ষেপ প্রভৃতি সাক্ষ্য দেয় যে ইয়াজিদের দুশমনেরা আদৌ অতিরঞ্জিত বর্ণনা দেয়নি। প্রকৃত অবস্থা যাই থাক না কেন মুসলমানদের মধ্যে সাহাবায়ে কেরাম (রাঃ) ও তাবেইন্দের উপস্থিতি সত্ত্বেও ইয়াজিদই খেলাফতের যোগ্যতম ব্যক্তি ছিল-এ কথা দাবি করার ধৃষ্ঠতা কেউ দেখাতে পারে না। মূলতঃ এ সবের লক্ষ্য ছিল সরকারকে শুধু উমাইয়া বংশের মধ্যে সীমিত করা এবং তাকে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করা। এ প্রবণতা ইসলাম ও ইসলামী বিধানের বুকে ছুরিকাঘাতের সমতুল্য ছিল।
এ তথ্যগুলো আমাদের পরিবেশন করার প্রকৃত উদ্দেশ্য কোন ব্যক্তির নিন্দা করা নয়, বরং ইসলামে যে রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা কোন শরিয়ত সম্মত সনদ ছাড়াই শুরু করা হয়, তার সাথে ইসলামের প্রাণশক্তি ও মূলনীতির যে কোনই সম্পর্ক নেই, তা স্পষ্ট করে দেখানো। ইসলামকে ও ইসলামের রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে কলুষমুক্ত ও আসল স্বরূপে প্রকাশ করার জন্যই আমাদের এ আলোচনার অবতারণা।

টিকাঃ
• ইবনুল আমীর, হাওয়াদেস হিঃ ৫৬। আমরা এই বর্ণনাতে সত্য বলে গ্রহণ করার ব্যাপারে বেশী জোর দেয়া পছন্দ করি না। কিন্তু ইসলামের মূলনীতিকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য এটুকু নিশ্চয়ই বলবো যে, এই রেওয়ায়েত যদি সত্য হয়ে থাকে তবে এ ধরণের কাজ ইসলামের মূল প্রকৃতির সম্পূর্ণ পরিপন্থি ছিল। কোন যুক্তি কিংবা ওজর আপত্তি এ কাজকে সঠিক বলে প্রমাণ করতে পারে না। -গ্রন্থকার

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00