📄 সিয়েরা লিওন
দেশটি ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের অধীনে ছিল। ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীনতা লাভ করে। যদিও দেশের অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলমান ছিল, কিন্তু দখলদাররা প্রত্যাবর্তনের সময় খ্রিষ্টানদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যায়, যাদের সংখ্যা ছিল মাত্র ১০%-এর মতো; অন্যদিকে জনসংখ্যার ৮০%-এর বেশি ছিল মুসলিম।
📄 ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়া
ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, ইথিওপিয়া ঔপনিবেশিকদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই ইউরোপীয় শাসন থেকে মুক্তি লাভ করে। চারপাশজুড়ে মুসলিম রাষ্ট্রের বেষ্টনীতে থাকা এ দেশটিকে তারা খ্রিষ্টরাজ্যে পরিণত করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য পূর্ব আফ্রিকায় ক্রুসেডীয় ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। আশেপাশের মুসলিম দেশগুলোতে সম্প্রসারণবাদী নীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ ভূমিতে মিশে ছিল তাদের স্বপ্ন-আশা। এ ছাড়া, মুসলিম দেশগুলোর স্থিতিশীলতা নষ্ট করার জন্যও এ দেশটি তাদের জন্য উর্বর ভূমি হবে বলে বিবেচনা করা হয়।
তবে মুসোলিনি এ অঞ্চলে তার ক্ষমতা বিস্তারের ব্যাপারে খুব আগ্রহী ছিলেন; এমনকি সেটা গির্জার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে কিংবা ভ্যাটিকান সিটির নির্দেশনা বাতিল করে হলেও। তিনি ইথিওপিয়ায় প্রাধান্য বিস্তার করে কিছুদিনের জন্য তা দখলেও রাখেন। ইথিওপিয়ার সীমানাভুক্ত ছিল তখন তার পাহাড়ি অঞ্চল, হারার প্রদেশ ও ওগাদিন। ইংরেজ ও ইতালিয়ানরা যখন সোমালিয়া ও মিসর দখল করে, তখন এগুলো ইথিওপিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে যায়। এসব অঞ্চলে মুসলিম জনসংখ্যার হার ছিল অত্যাধিক। এদিকে ইতালি ইরিত্রিয়াও দখল করে নেয়। মুসোলিনি তখন ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া ও দক্ষিণ সোমালিয়া নিয়ে ইতালিয়ান পূর্ব আফ্রিকা গঠনের ঘোষণা দেন।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। ইতালি পরাজিত হয়। তখন মিত্রপক্ষের সৈনিকরা ইতালির অধীনস্থ আফ্রিকার দেশসমূহে প্রবেশ করে। ইথিওপিয়া অক্ষশক্তির দেশসমূহের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর জাতিসংঘ ইরিত্রিয়া ও দক্ষিণ ও পশ্চিম সোমালিয়া (হারার ও ওগাদিন) থেকে ইথিওপিয়ার সীমানা আলাদা করে এবং ইথিওপিয়াকে স্বাধীন দেশ বলে ঘোষণা দেয়। অর্থাৎ, ইথিওপিয়ায় মাত্র সাত বছরের মতো উপনিবেশ স্থায়ী ছিল। পক্ষান্তরে দক্ষিণ ও পশ্চিম সোমালিয়া এবং ইরিত্রিয়াকে ইতালির অংশ বলে ঘোষণা করা হয়।
এদিকে ইথিওপিয়ার রাজা হাইল স্যালেসি প্রকাশ্যে ইসলামবিদ্বেষী অবস্থান গ্রহণ করেন। তিনি ইতালির বিভিন্ন অংশকে ইথিওপিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করেন। খ্রিষ্টান দেশগুলো নিজেদের মুসলিমবিদ্বেষী স্বপ্ন ইথিওপিয়ার হাতে বাস্তবায়ন হতে দেখে অত্যন্ত পুলকিত হয়। ফলে ১৩৭০ হিজরিতে জাতিসংঘ ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্মিলনে রাষ্ট্রগঠনের ব্যাপারে সম্মতি প্রদান করে। ইরিত্রিয়া এভাবে ইথিওপিয়ার অংশে পরিণত হয়। ১৩৭২ হিজরিতে ইথিওপিয়া ইরিত্রিয়া দখলের জন্য সশস্ত্র বাহিনী প্রেরণ করে। দখল প্রতিষ্ঠার পর সেখানে দমনপীড়ন শুরু হয়, ইথিওপিয়ার বক্রনীতি পৌঁছে যায় ইরিত্রিয়ায়। সেখানে আরবি ভাষা শিক্ষাদান নিষিদ্ধ করা হয়। খ্রিষ্টান বসতি স্থাপন করা হয়। খ্রিষ্টানদের ইরিত্রিয়ার উর্বর ভূমির অধিকার প্রদান করা হয়। পক্ষান্তরে মুসলমানদেরকে দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় নির্বাসন দেওয়া হয়।
এ হলো ইথিওপিয়ানদের অমানবিক আচরণের সামান্য দৃষ্টান্ত, যা তারা ইরিত্রিয়া, ইথিওপিয়া ও তাদের শাসনাধীন মুসলিম অঞ্চলগুলোতে চালায়। বহির্বিশ্বে ইথিওপিয়া ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করে। দেশের অভ্যন্তরে ইহুদিদের কার্যক্রম পরিচালনা ও সেনা প্রশিক্ষণে তাদেরকে ব্যাপক অনুমতি দেওয়া হয়। পক্ষান্তরে দেশীয় مسلمانوں বিরুদ্ধে তাদের বক্রনীতি বৃদ্ধি করে। এ সময়ে মোগাদিসুতে ইরিত্রিয়া লিবারেশন ফ্রন্ট প্রতিষ্ঠা পায়। এরপর ১৩৮২ হিজরিতে (১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপিয়ার পক্ষ থেকে ঘোষিত হয় যে, ইরিত্রিয়াকে সামরিক শক্তিবলে অধিকার করে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে ইরিত্রিয়ায় দখল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়।
**পশ্চিম সোমালিয়া সংকট**
পশ্চিম সোমালিয়ায় ইথিওপিয়ার ক্ষমতা বিস্তারের জন্য ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালি পূর্ণ সুযোগ দেয়। ফলে ইথিওপিয়া হারার ও ওগাদিন দখল করে নেয়। এরপর ইথিওপিয়াকে ইতালি দখল করে নেয়। তারা পশ্চিম সোমালিয়া ও ইতালিয়ান সোমালিয়া সংযুক্তির ঘোষণা দেয়। তারপর ইতালিয়ানদের হটিয়ে ইথিওপিয়ায় মিত্রপক্ষের সৈনিকরা প্রবেশ করে। মিত্রপক্ষ ঘোষণা করে, তারা দশ বছর পর পশ্চিম সোমালিয়াকে স্বাধীনতা প্রদান করবে। কিন্তু ১৩৭৪ হিজরিতে (১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপিয়ার সাথে একচুক্তির পর তার পথ সুগম করে দিতে দশ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পূর্বেই পশ্চিম সোমালিয়া থেকে ইংরেজরা সেনা প্রত্যাহার করে নেয়। এরপর ইথিওপিয়া পশ্চিম সোমালিয়ায় প্রবেশ করে তা দখল করে নেয়। এ পদক্ষেপ জাতিসংঘ বিন্দুমাত্রও আপত্তি জানায়নি।
ইথিওপিয়ানরা পশ্চিম সোমালিয়ায় (হারার ও ওগাদিন) তাদের ক্রোধ-বিদ্বেষ উগড়ে দেয়। হিফজখানা বন্ধ করে দেয়। আরবি শিক্ষাব্যবস্থা তছনছ করে। মুসলমানদের ওপর গুম-খুন, জেল-জুলুমের ধারাবাহিকতা বইয়ে দেয়। এ পরিস্থিতিতে ১৩৮৩ হিজরিতে (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) শায়েখ তাহেরের নেতৃত্বে ওগাদিনে বড় ধরনের বিদ্রোহ হয়। তিনি হারার ও পার্শ্ববর্তী অনেক এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। ইথিওপিয়ান সৈনিকদের বিরুদ্ধে অনেক বিজয় অর্জন করেন। এ সময় বিশ্বের ইহুদি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ইথিওপিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। ইথিওপিয়ান সেনাদের মধ্যে অনেক খ্রিষ্টান ও ইহুদি সৈনিক এবং ইসরাইলি, আমেরিকান ও ইউরোপিয়ান অস্ত্রশস্ত্র ছিল। তারা ইসলামি আন্দোলনের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। ইথিওপিয়ানরা পুনরায় মুসলমানদের ওপর তাদের দমননীতি প্রয়োগ করে। মুসলিম নিধন, খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণে বাধ্যকরণ, নারীদের বন্দি করা, শিশুদের অপহরণ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, তাদের ওপর অসাধ্য করের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া ইথিওপিয়ান ইতিহাসে ভরপুর। এ ছাড়া নিরবচ্ছিন্ন সাংস্কৃতিক আগ্রাসন, শহরে-শহরে গির্জা নির্মাণ ইত্যাদিও ছিল। মুসলমানদের ওপর ব্যাপক নিপীড়ন ও লাঞ্ছিতকরণের ধারা ক্রমান্বয় প্রসারতা ও হিংস্রতার সাথে অব্যাহত থাকে।
**দক্ষিণ সুদানের প্রতি লোলুপ দৃষ্টি**
ইথিওপিয়া দক্ষিণ সুদানের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদান করে। এর পেছনে তাদের বিভিন্ন উদ্দেশ্য লুক্কায়িত ছিল। যেমন : তারা নিজেরাই মূলত দক্ষিণ সুদানকে গ্রাস করে নিতে চাচ্ছিল। যে কারণে দেখা যায়, দক্ষিণ সুদানের বিচ্ছিন্নতাবাদী চেতনার নেতৃত্বে ছিল খ্রিষ্টানরা। দ্বিতীয়ত, সুদান ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতাকামী ঐক্যফ্রন্টকে সহায়তা করে। সুতরাং, ইথিওপিয়া সুদানকে চাপে রাখার জন্য এ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। তৃতীয়ত, এর মাধ্যমে কমপক্ষে ক্রুসেডীয় পরিকল্পনার অংশ বাস্তবায়ন অনুযায়ী পার্শ্ববর্তী কোনো মুসলিম দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে রাখার বিষয়টি অর্জিত হবে।
**রাজা হাইল স্যালেসির পতন**
১৩৯৪ হিজরিতে (১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপিয়ায় সামরিক বিপ্লব ঘটে। দেশের দুর্ভিক্ষ ও অবনতিশীল পরিস্থিতির কারণে রাজার পতন ঘটে। ইথিওপিয়ায় প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা হয়। সামরিক শাসক মেঞ্জিস্টুর নেতৃত্বে কমিউনিস্ট শাসন শুরু হয়। এ সময় নতুন সরকার বিরোধী বেশকিছু সংগঠনের জন্ম হয়।
**পশ্চিম সোমালিয়ার পরিস্থিতি**
১৩৯৭ হিজরিতে (১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপিয়ার দখলদারিত্ব থেকে পশ্চিম সোমালিয়াকে স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে সোমালিয়া প্রজাতন্ত্রের পক্ষ থেকে অনেক আক্রমণ পরিচালিত হয়। ইথিওপিয়ার সৈনিকদের বিরুদ্ধে তারা বিশাল বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু রাশিয়া ও ইহুদিরা ইথিওপিয়ার পাশে দাঁড়ায়। ফলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সোমালিয়া প্রজাতন্ত্রের সৈনিকরা ইথিওপিয়া থেকে মুখ ঘুরিয়ে সোমালিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করতে থাকে। তারপর উভয় দেশের মাঝে সন্ধি হয় যে, উভয়েই আন্তর্জাতিক সীমানার ভেতর ফিরে যাবে।
সোমালিয়া ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতে পৃষ্ঠপোষকতা করত। এজন্য ইথিওপিয়াও সোমালিয়ার অভ্যন্তরীণ সংঘাতে পৃষ্ঠপোষকতা করে। ১৪১১ হিজরিতে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে) সিয়াদ বারির শাসন পতনে এবং সোমালিয়ার গৃহযোদ্ধা বাহিনীগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার ফলে সেখানকার যুদ্ধের ক্ষেত্রে ইথিওপিয়ার বিশাল ভূমিকা ছিল।
**ইরিত্রিয়ার পরিস্থিতি**
১৪০৪ হিজরি (১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) থেকে ইরিত্রিয়া মুক্তিফ্রন্টের তৎপরতা বৃদ্ধি পায়। সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমণ চলতে থাকে। এ সময় ইরিত্রিয়ান স্বাধীনতাকামীরা সহযোগী হিসেবে তাজরা মুক্তিফ্রন্টকে পেয়ে যায়। এরপর তারা নিরবচ্ছিন্নভাবে সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালায় এবং বিজয় অর্জন করতে থাকে। অন্যদিকে তাজরা মুক্তিফ্রন্ট ইথিওপিয়ান রেভ্যুলেশনারি ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের সাথেও যোগদান করে। ইথিওপিয়ার আন্দোলনকারীরা দেশের অধিকাংশ এলাকায় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। ঠিক সে সময় ইরিত্রিয়া মুক্তিফ্রন্টও দেশের অধিকাংশ এলাকায় শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।
এরপর ১৪১১ হিজরিতে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে) তাজরা মুক্তিফ্রন্ট রাজধানী আদ্দিস আবাবা দখল করে এবং মেঞ্জিস্ট শাসনের পতন ঘটাতে সক্ষম হয়। এরপর তারা ইরিত্রিয়ার ভাগ্য নির্ধারণকল্পে গণভোটের আয়োজন করে। এর মাধ্যমে উভয় দেশ পৃথক হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর কার্যতই ১৪১৪ হিজরিতে (১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইসিয়াস আফওয়ারকিকে প্রধান করে ইরিত্রিয়া প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
প্রসঙ্গত, ইথিওপিয়ার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৬০%-এর বেশি, আর ইরিত্রিয়ায় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি। এতৎসত্ত্বেও ইথিওপিয়ার ক্ষমতা মুসলিমবিদ্বেষী খ্রিষ্টানদের হাতেই রয়ে যায়।
📄 ইরিত্রিয়া
ইথিওপিয়ান খ্রিষ্টান নেতাদের ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার পর ইথিওপিয়া থেকে ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতা অর্জনের কারণে অনেক মুসলিম দেশ আনন্দিত হয়। কিন্তু ইরিত্রিয়ার স্বাধীনতা অর্জনকে ইসরাইল ও আমেরিকা কীভাবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, তা তখন অনেক মুসলিম দেশের কাছেই অস্পষ্ট থাকে। অবশ্য সময় তাদের এসব অস্পষ্টতার উত্তর প্রদান করে। (২৬)
ইরিত্রিয়া হঠাৎ করেই তার উপকূলীয় এলাকা ইয়ামেনের হানিশ দ্বীপপুঞ্জে আক্রমণ করে বসে। এতে আমেরিকা ও ইহুদিদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইরিত্রিয়াকে তারা মুসলিম ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধ সৃষ্টির জন্যই নির্বাচন করেছে। ইরিত্রিয়াকে ব্যবহার করে তাদের এ ছক মূলত ইথিওপিয়ার খ্রিষ্ট-মুসলিম দ্বন্দ্বে সহযোগিতার চেয়েও মারাত্মক ছিল।
কারণ, সেখানে ছিল মুসলিম-অমুসলিমের স্বাভাবিক সংঘাত, অথচ এখানে হচ্ছে মুসলিম-মুসলিম ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষ। স্বভাবতই এই প্রকারের সংঘর্ষ প্রথম প্রকার থেকে বহুগুণ অনিষ্টকর। তদুপরি আমেরিকা ও ইসরাইলের তৎপরতাও এ অঞ্চলে বৃদ্ধি পায়। ইসরাইলের অনেক সৈনিক হানিশ দ্বীপপুঞ্জের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ইয়ামেনের সাথে যুদ্ধের জন্য ইরিত্রিয়াকে তারা ভারী অস্ত্র সরবরাহ করে। অথচ এ সীমালঙ্ঘন দেখে আমেরিকা বা জাতিসংঘ কেউই কোনোরূপ সমালোচনা করেনি। বরং এ দ্বীপপুঞ্জের ক্ষেত্রে প্রদত্ত আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার জন্য ইয়ামেনের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। ইরিত্রিয়ার মাধ্যমে ইসরাইল-আমেরিকার নীলনকশা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি আরও জোরালো প্রমাণ যে, সুদানের বিদ্রোহীদের প্রতি ইরিত্রিয়া সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় এবং সুদানকে যুদ্ধ-সংঘাতের নাট্যশালায় পরিণত করে।
উল্লেখ্য, উল্লিখিত পরিস্থিতিতে আফওয়ারকির শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তোলে হরকতুল জিহাদ ও স্বাধীনতাফ্রন্ট নামের সংগঠনদ্বয়。
টিকাঃ
২৬. ইহুদি ও খ্রিষ্টানবিশ্ব ইরিত্রিয়ার ওপর অমুসলিম শাসক চাপিয়ে দেয়। এটাকে কেমন যেন স্বাধীনতার শর্তস্বরূপ রাখা হয়। ইসিয়াস আফওয়ারকি শাসনক্ষমতায় বসেই দেশে আন্তর্জাতিক ক্রুসেডীয় মিশন বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন। অথচ এখানকার মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৭০%। ইসিয়াস অনেক মুসলিম অঞ্চলকে খ্রিষ্টান প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করেন। তার নবগঠিত সরকারের বারোজন মন্ত্রীর মধ্যে নয়জনকেই নির্বাচন করা হয় খ্রিষ্টান, আর তিনজন মাত্র মুসলমান। ইরিত্রিয়ায় আরবীয় ইসলামি চেতনা নিষ্ক্রিয় করতে কাজ শুরু করেন। আরব লীগের সাথে ইরিত্রিয়ার সংযুক্তি বর্জন করেন। তিগ্রিনিয়া ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করা হয়। আরবি ভাষাকে কোণঠাসা করা হয়, অথচ দেশে সেই ভাষার প্রচলন ছিল খুব বেশি। সে সময় দেশের গুরুত্বপূর্ণ অনেক ইসলামি ব্যক্তিকে গুপ্তহত্যা করা হয়, অনেককে গ্রেফতার করা হয়। আফওয়ারকি ইসরাইলের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ার প্রতি মনোযোগ দেন। তিনি অনেক ইসলামি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেন। অনেক ইসলামি সংগঠনের কার্যক্রমে বাধ সাধেন। অথচ খ্রিষ্টান মিশনারি কার্যবিস্তারের জন্য সবকিছু উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। এ সময় দেশের মুসলমানদের ওপর লিবারেশন ফ্রন্টের আক্রমণ বৃদ্ধি পায়। অনেক গ্রামগঞ্জে গিয়ে তারা সীমালঙ্ঘন করতে থাকে। পাঁচশতেরও বেশি মুসলিম যুবতীকে বন্দি করে নিয়ে যায়। বাচ্চাদের অপহরণ করে। এ ছাড়াও আরও জঘন্য সব কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে, যা কেবল ইসলাম ও মুসলমানের শত্রুদের দ্বারাই সম্ভব।