📄 সেনেগাল
পূর্বে আমরা উল্লেখ করেছি যে, ফ্রান্সের অধীনে সেনেগাল ও মালি এক হয়ে মালিরাষ্ট্র গঠন করে। এ দেশ মালি থেকে পৃথক না হওয়া পর্যন্ত ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারেনি। ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে) সেনেগাল প্রজাতন্ত্র স্বাধীন দেশ ঘোষণা করে লিওবুলাদ সানজুরকে প্রজাতন্ত্রের প্রধানের দায়িত্ব অর্পণ করে। ১৪০১ হিজরিতে (১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে) সে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেয় এবং তার প্রধানমন্ত্রী আবদি জুয়ুফের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।
তার রাজত্বকালে গাম্বিয়ার সঙ্গে ঐক্যের সংলাপ হয়। অতঃপর সেনেগাল গাম্বিয়ায় অনুপ্রবেশ করলে তাদের মধ্যকার ঐক্যচুক্তি ব্যর্থ হয়ে যায়। ১৪১০ হিজরিতে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে) সেনেগাল গাম্বিয়া থেকে তার সৈন্য প্রত্যাহার করে। এমনইভাবে মৌরিতানিয়া ও সেনেগালের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট দেখা দেয়। এ সম্পর্কে আমরা মৌরিতানিয়া সম্পর্কিত অধ্যায়ে আলোকপাত করেছি।
📄 গাম্বিয়া
গাম্বিয়া নিয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের মধ্যে সংঘাত হয়। ইংল্যান্ডের কাছে ফ্রান্স নত হলে এ সংঘাত শেষ হয়। দেশটি ১৩৯০ হিজরিতে (১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীন হয়। এখানে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। দাউদ গাওরা প্রেসিডেন্ট হন ১৪০০ হিজরিতে (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে)। তখন সেনেগালের নিকট দাবি জানানো হয়, শান্তি রক্ষায় সহায়তার জন্য তারা যেন গাম্বিয়ায় তাদের সৈনিক প্রেরণ করে। ১৪০১ হিজরিতে (১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে) গাম্বিয়ায় একটি বিপ্লব হয়। এতে দাউদ গাওরাকে পরাজিত করা হয়। কাকু সাম্বা সানিয়ানাকে প্রেসিডেন্ট বানানো হয়। সেনেগালের সৈনিকরা গাম্বিয়ায় প্রবেশ করে বিপ্লব চালিয়ে দাউদ গাওরাকে পুনরায় ক্ষমতায় বসাতে সক্ষম হয়। সেনেগালের সঙ্গে গাম্বিয়াকে মিলিয়ে একক দেশ গঠন করার জন্য একটি পরিকল্পনা গঠন করা হয়। যার নাম হবে সেনেগাম্বিয়া, আবদি জুয়ুফ হবে এর প্রেসিডেন্ট, আর দাউদ গাওরা হবে ভাইস প্রেসিডেন্ট। অতঃপর উভয় নেতার মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলে ১৪১০ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) ঐক্য ভেঙে যায়।
📄 তানজানিয়া (তানজানিকা)
তানজানিয়া জার্মানির উপনিবেশ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পরাজয়ের পর এখানে ইংরেজদের উপনিবেশ তৈরি হয়। এদিকে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের সরু সেক্টরও জানজিবার রাজ্য দুই উপদ্বীপ তথা জানজিবার ও বুম্বার ভূখণ্ড ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও ইতালির মধ্যে বণ্টিত হয়ে যায়। পরিশেষে তার রাজত্বের অধীনে মাত্র দুটি উপদ্বীপ তথা জানজিবার ও বুম্বা বাকি থাকে। অতঃপর ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে) জানজিবারের সমস্ত রাজ্য ইংরেজদের হাতে ফিরে আসে। তারপর ১৩৮১ হিজরিতে (১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) ইংল্যান্ড তানজানিয়াকে স্বাধীনতা দান করে। সেটা ব্রিটেশ কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়।
জানজিবারকে ১৩৮৩ হিজরিতে (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীনতা দেওয়া হয়। এর বাদশাহ ছিল জুলিমশিদ বিন আবদুল্লাহ খলিফা। তার যুগে জানজিবারে আন্তর্জাতিক রাজনীতি খেলা শুরু করে। মুসলমান, আরব ও আফ্রিকানদের মধ্যে গোলযোগ সৃষ্টি হয়। ফলে ১৩৮৩ হিজরিতে জানজিবারে আবিদ কুরমির সেনা বিপ্লব ঘটে। বাদশাহ জুলিমশিদ পরাজিত হয়। এতে প্রায় ষোলো হাজারের অধিক আরব নিহত হয়। কেননা ক্ষমতা ছিল আফ্রিকানদের অধীনে। আরবরা উপদ্বীপ দখল করে রেখেছিল, ফলে ক্ষমতা প্রয়োগ করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। এতে মুসলমানদের চুয়ান্ন হাজার লোক নিহত হয়েছিল। আবিদ কুরমি তানজানিয়ার সরকারের সাথে একাত্মতা পোষণ করে। তার সঙ্গে একটি দেশ হওয়া নিয়ে পরস্পরে চুক্তি করে, যার নাম হবে তানজানিয়া। এতে ক্ষমতা থাকবে জুলিয়াস নাইরের হাতে। প্রেসিডেন্ট হবে জুলিয়াস নাইরে এবং আবিদ কুরমি হবে ভাইস প্রেসিডেন্ট।
আল্লাহ তাআলা আবিদ কুরমি থেকে প্রতিশোধ নিলেন, যে ভেবেছিল তার কর্মের মাধ্যমে সে দেশে উচ্চপদ হাসিল করবে। কিন্তু সে ভুলে গিয়েছিল যে, ইসলামের শত্রুরা এক কথায় অটল থাকে না। বিশেষ করে যদি সেই শত্রু নামধারী মুসলিম হয়। শত্রুরা দেখল, তার প্রয়োজন শেষ হয়ে গেছে; অথচ দেশে তার বেঁচে থাকাটা ইসলামি প্রভাব সৃষ্টি করবে। তাই ১৩৯৪ হিজরিতে (১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) তাকে গুপ্তহত্যা করা হয়। এরপর আবুদ জাম্বি জানজিবার উপদ্বীপের শাসক নিযুক্ত হয়। জানজিবার সম্প্রদায় জানজিবার ও তানজানিয়ার ঐক্য মেনে নিতে রাজি হয়নি। কেননা, ক্ষমতা ছিল খ্রিষ্টানদের হাতে; অথচ জানজিবার ও তানজানিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ বাসিন্দা ছিল মুসলমান। খ্রিষ্টান শাসন তানজানিয়ায় মুসলমানদের জঘন্য কষ্ট ও সীমাহীন শান্তি প্রদান করেছিল।
১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) উগান্ডার জাতীয় ফ্রন্ট মুসলিম প্রেসিডেন্ট ইদি আমিনকে পরাস্ত করার সময় তানজানিয়ান সেনাবাহিনী তাদেরকে সাহায্য করেছিল। আবুদ জাম্বি ১৪০৩ হিজরিতে (১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে) তার পদ থেকে সরে দাঁড়ায়। তারপর ১৪০৩ হিজরিতে আলি হাসান মুভিনাইকে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। সে একই সময় তানজানিয়ার ভাইস প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করে। তারপর ১৪০৫ হিজরিতে (১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) জুলিয়াস নিরির পর সে তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়। তারপর ১৪০৭ হিজরিতে (১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) তানজানিয়া মুজাম্বিক সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে সৈনিক প্রেরণ করে সহায়তা করে। তারপর ১৪০৮ হিজরিতে (১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং ১৪০৬ হিজরিতে (১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) উগান্ডার ক্ষমতা দখলকারী মুসিভিনিকে সমর্থন দেয়। তখন তানজানিয়ায় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৬২% আর খ্রিষ্টান ছিল ২৭% ও পৌত্তলিক ছিল ১১%। আর জানজিবারে মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছিল ৯০%।
📄 নাইজেরিয়া
১৩৮۳ হিজরিতে (১৯৬۳ খ্রিষ্টাব্দে) নাইজেরিয়া ইংল্যান্ড থেকে স্বাধীন হয়। সেটা বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে একটি ইউনিয়ন হিসেব গঠিত হয়েছিল। স্বাধীনতার পূর্বে ক্যামেরুনের একটি অংশ তার সাথে সম্পৃক্ত হয়।
নাইজেরিয়া ছিল ইংরেজদের মিত্র দেশসমূহের একটি। নাইজেরিয়ায় মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৭৫%। খ্রিষ্টান ১৫% আর বাকিরা ছিল পৌত্তলিক। অভ্যাস অনুযায়ী ঔপনিবেশিকরা দেশ ছাড়ার আগে সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানদের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেয়। ফলে নান্দী এজিকয়ে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হয়। ওই সময়ই সেনাবাহিনীতে খ্রিষ্টান কর্মকর্তারা উচ্চপদে নিযুক্ত ছিল। তাই সেনাবাহিনীও তাদের হাতে ছিল। যদিও প্রধানমন্ত্রী ছিল আবু বকর তাফাওয়া। উপপ্রধান মন্ত্রী ছিল আহমাদ বিলু। তারা উভয়ে মুসলমান ছিল। তারা উভয়ে নাইজেরিয়ায় ইসলামের প্রাণ সঞ্জীবিত করার জন্য এবং ইহুদিদের যেকোনো আক্রমণ ব্যর্থ করার জন্য কাজ করে। এমনকি তারা এ বিষয়টি সভাসদে ঘোষণা করে দেয়।
নাইজেরিয়ায় ইসলামি আওয়াজ স্তব্ধ করার জন্য দেশে আন্তর্জাতিক খ্রিষ্টীয় খেলা শুরু হয়ে যায়। তারা এক নাইজেরিয়ান সেনা কর্মকর্তা চোকো গানসুগুর পৃষ্ঠপোষকতা করে। তার নেতৃত্বে বিদ্রোহ সংঘটিত করে আহমাদ বিলু, আবু বকর তাফাওয়া ও সরকারের অনেক মুসলিম মন্ত্রীকে হত্যা করে। এমনকি যাদেরকে মুসলমানদের সহযোগী সন্দেহ করত তাদেরকেও হত্যা করে। এটা হয়েছিল ১৩৮৫ হিজরিতে (১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে)। আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শক্তিশালী করার জন্য চোকো গানসুগু খ্রিষ্টান সেনাপ্রধান জনসন আগাভি ইরানির নিকট আত্মসমর্পণ করে।
উল্লেখ্য যে, উত্তর নাইজেরিয়ার অধিকাংশ বাসিন্দা ছিল মুসলিম। আর পূর্ব নাইজেরিয়ায় খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ছিল বেশি। তারা ইবো গোত্রের লোক ছিল। ইংরেজ ঔপনিবেশিকরা তাদের সহায়তায় কাজ করে। যাতে দেশে তাদের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা সহজ হয়। এ দেশ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় ইংরেজরা তাদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে যায়।
এমনকি উত্তর নাইজেরিয়ায় বিভিন্ন অঘটন ঘটলে মুসলমানরা ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারত না। খ্রিষ্টানদের মাধ্যমে গুপ্তহত্যার শিকার হতো। উত্তর নাইজেরিয়ার একজন খ্রিষ্টান প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা ইয়াকুব গাউনের পৃষ্ঠপোষকতায় সেখানে খ্রিষ্টীয় নতুন খেলা শুরু হয়। যেখানে খ্রিষ্টান ছিল সংখ্যালঘু। সে ১৩৮۶ হিজরিতে (১৯۶۶ খ্রিষ্টাব্দে) ক্ষমতায় সমাসীন হয়। এটা হয়েছিল উত্তরাঞ্চলের মুসলমানদের শিথিলতার কারণে। কেননা, রাষ্ট্রপ্রধান মুসলমান থাকা সত্ত্বেও ক্ষমতা হয়ে যায় খ্রিষ্টানদের। সে বছরই পূর্ব নাইজেরিয়ার সেনাপ্রধান সেখানকার সব মুসলমানকে পূর্ব প্রদেশে একত্র হওয়ার ও উনোতিশা শহরে স্থানান্তরিত হওয়ার নির্দেশ দেয়। এ সময় বিরাট এক গণহত্যা সংঘটিত হয়, যা থেকে অল্পসংখ্যক লোকই মুক্তি পায়।
কালাবার কাতিনা গোত্র তাদেরকে ওই প্রদেশে ভাগিয়ে দেয়। উত্তর প্রদেশের লোকেরা তা জানার পর আন্দোলন করে এবং উত্তর প্রদেশের সেনানিবাসে হামলা করে। অস্ত্রের ওপর তারা দখল নিয়ে উত্তরাঞ্চলে অবস্থানরত ইবো গোত্র থেকে প্রতিশোধ নেয়। আর যারা উনোতিশা শহরে মুসলমানদের গণহত্যা সংঘটিত করেছিল তাদের থেকেও প্রতিশোধ গ্রহণ করে। কিন্তু উত্তরাঞ্চলীয় মুসলমানরা নারী ও শিশু হত্যা করা থেকে বিরত থাকে। তবে তারা কালাবার গোত্রের কাছে যায়নি বা আক্রমণ করেনি।
এদিকে পূর্ব প্রদেশের নেতা চোকো মিকা অজুকো নাইজেরিয়া থেকে পৃথক হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। ফলে তার ও সরকারের সৈনিকদের মধ্যে মারাত্মক গৃহযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। অবশেষে সরকারি সৈনিক বিজয় লাভ করে, আর চোকো মিকা অজুকো দেশ ছেড়ে পলায়ন করে।
১৩۹۵ হিজরিতে (১৩۹۵ খ্রিষ্টাব্দে) নাইজেরিয়ান প্রেসিডেন্ট ইয়াকুব গাউন যখন উগান্ডায় অনুষ্ঠিত আফ্রিকান শীর্ষ সম্মেলনে উপস্থিত হয় তখন নাইজেরিয়ার সেনানায়করা মুর্তাজাল্লা রহমত মুহাম্মাদকে দেশের প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করে। সে এক বছর শাসন করে ১৩۹۶ হিজরিতে (১৯۷۶ খ্রিষ্টাব্দে) গুপ্তহত্যার শিকার হয়। ফলে উলসিগান উবাসিনজু সামরিক চীপ অব স্টাপ-এর পদ গ্রহণ করে। ১৩۹۸ হিজরিতে (১৯۷۸ খ্রিষ্টাব্দে) নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শিখোশাগারি আলি বিজয়ী হয়। ১৪০۴ হিজরিতে (১৯৮۳ খ্রিষ্টাব্দে) মুহাম্মাদ বুখারির নেতৃত্বে দেশে সেনা বিপ্লবের পূর্ব পর্যন্ত সে এ পদে বহাল থাকে। মুহাম্মাদ বুখারি ১৪০۵ হিজরি (১৯৮۴ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকে। অতঃপর পোপ নাগিদার নেতৃত্বে দ্বিতীয় সেনা বিদ্রোহ হলে দেশে নতুন নেতার আবির্ভাব ঘটে।