📄 সোমালিয়া
সোমালিয়ার আয়তক্ষেত্র তার বর্তমান আয়তক্ষেত্রের দ্বিগুণ ছিল। খ্রিষ্টান ঔপনিবেশিকরা সেটাকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে দেয়। ফলে ইংল্যান্ড একটি অংশ গ্রহণ করে, যা ইংরেজ-সোমালিয়া নামে প্রসিদ্ধ। এক অংশ দখল করে নেয় ইতালি, যা ইতালিয়ান-সোমালিয়া নামে পরিচিত। ইথিওপিয়াকেও সোমালিয়ার এক অংশ দেওয়া হয়। সেটা হলো ইকলিম অথবা গাদিন। কেনিয়াকে দেওয়া হয় এক অংশ। ফ্রান্সও একটি অংশ দখল করে, যা ফরাসি সোমালিয়া নামে পরিচিত।
ইংরেজ ও ইতালিয়ান সোমালিয়া ব্যতীত সোমালিয়ার অন্যান্য বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে পরে আর কেউই এক করতে পারেনি। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড সোমালিয়ার আরেকটি অংশ ইথিওপিয়াকে দান করে দেয়। আর ফ্রান্সের দখলীকৃত সোমালিয়া স্বাধীন একটি দেশ হয়ে যায়, যা বর্তমানে জিবুতি নামে পরিচিত। ইথিওপিয়া ও কেনিয়া সোমালিয়ার যে অংশ দখল করেছিল, তা আজও তাদের দখলে রয়েছে।
১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে) ইংরেজ ও ইতালিয়ান সোমালীয়রা স্বাধীনতা অর্জন করার পর তাদের লক্ষ্য অর্জনে সোমালিয়া ঐক্য গঠন করে। তারা উভয়ে সোমালি প্রজাতন্ত্র হিসেবে গঠিত হয়। তারা ইথিওপিয়া ও কেনিয়ায় তাদের হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করার ঘোষণা দেয়। ফলে ইথিওপিয়া-কেনিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যকার সম্পর্কে বিপর্যয় ঘটে এবং অবশেষে যুদ্ধ হয়। সোমালীয় প্রেসিডেন্ট আবদুর রশিদ আলি শেরমার্কের শাসনামলে প্রথম যুদ্ধ হয়। ১৩৮৪ হিজরিতে (১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপীয় ও সোমালীয়দের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অতঃপর ১৩৮৯ হিজরিতে (১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) সোমালীয় নেতা পরাজিত হয় এবং মুহাম্মাদ সিয়াদ বারি দেশের ক্ষমতা দখল করে। সে রাশিয়ার প্রতি মনোনিবেশ করে। সে দেশে সমাজতন্ত্র চর্চার ঘোষণা দেয়। আর সোমালিয়া আরব জোটের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আরবি ভাষাকে বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়।
১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এবার সোমালীয়রা ইথিওপিয়ায় অবস্থানরত পশ্চিম সোমালীয়দের স্বাধীনতা জোটের পক্ষে সহায়তা করে। সোমালিয়া থেকে অনেক সৈনিক ইথিওপিয়ায় প্রবেশ করে। এ আক্রমণ রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদের কারণ হয়, যারা ইথিওপীয়দের সহায়তা করেছিল। সোমালীয়রাও ইথিওপিয়া থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। এমনকি ১৪০৬ হিজরিতে (১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) উভয় দেশের মধ্যকার শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। এতৎসত্ত্বেও ইথিওপিয়া সোমালিয়ার বিদ্রোহীদের সহায়তা করে এবং তাদের সৈন্যরা সোমালিয়ায় অনুপ্রবেশ করে। ১৪০৪ হিজরিতে (১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) কেনিয়ার সাথে সোমালিয়ার উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে কেনিয়া ১৪১০ হিজরিতে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে) সোমালিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, সোমালীয়রা বিরোধীদেরকে ধাওয়া করে কেনিয়ার সীমান্তে প্রবেশ করেছে।
ইথিওপিয়া সোমালিয়ার বিরোধীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করায় সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার মধ্যে আবারও সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর সোমালিয়া ইথিওপিয়ার সমর্থিত বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য মাকদিসুতে একটি সেনাচৌকি নির্মাণ করে। এতে ইথিওপিয়াও সোমালিয়া-বিরোধীদের সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। সোমালীয় প্রশাসন ও বিদ্রোহী সৈনিকদের মধ্যে অনেক সংঘাত হতে থাকে। আর এতে বিদ্রোহী শক্তিগুলো প্রশাসনের ওপর বিরাট বিজয় অর্জন করে।
মুহাম্মাদ সিয়াদ বারি দেশ থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। ১৪১১ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) বিদ্রোহীরা মুহাম্মাদ ফারাহ ইদিদের নেতৃত্বে মোগাদিসুতে প্রবেশ করে। আর আলি মাহদিকে সাময়িকভাবে প্রজাতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করা হয় দেশের পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য। তারপর বিদ্রোহী সৈনিকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, যাদেরকে সোমালিয়ার বিভিন্ন গোত্র থেকে এনে গঠন করা হয়েছিল। ফলে তাদের মধ্যে সংঘাত এবং বিভক্তির লড়াই শুরু হয়ে যায়। তারপর উত্তর সোমালিয়ায় স্বাধীন প্রজাতন্ত্র দেশ ঘোষণা করা হয়। এদিকে মুহাম্মাদ সিয়াদ বারির অধীনে দক্ষিণ সোমালিয়ায় সমাজতান্ত্রিক দল নেতৃত্ব দিতে থাকে। আবার ওদিকে মোগাদিসুতে মুহাম্মাদ ফারাহ ইদিদ ও আলি মাহদির মধ্যেও কঠিন সংঘাত শুরু হয়।
চলমান গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার সোমালীয় নিহত হয়। বিভক্তির যুদ্ধে সন্ধিচুক্তির অসংখ্য প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সোমালিয়ায় তাদের সৈনিক প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালায়। এর পর পরই সোমালিয়ায় তার সৈনিক প্রেরণ করে। সাথে সাথে বিভিন্ন দেশের সৈনিকরাও অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এ সৈনিকরা দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়নি। তাদের অনেকেই নিহত হয়। অবশেষে সোমালিয়া পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
সোমালিয়ার চলমান যুদ্ধে মুহাম্মাদ ফারাহ ইদিদ সোমালিয়ায় নিহত হয়। তার ছেলে ক্ষমতা গ্রহণ করতে আসে। সে ১৪১৮ হিজরিতে (১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) সোমালিয়ার বিভিন্ন দলের সাথে কায়রোতে ঐক্যচুক্তি করে। যুদ্ধ ও দরিদ্রতায় হাজার হাজার প্রাণ ঝরার পর অবস্থা শান্ত হয়। আমরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সোমালিয়ার পরিস্থিতি পরিপূর্ণ শান্ত রাখেন এবং রক্তপাত বন্ধ করেন।
📄 জিবুতি
জিবুতি ছিল ফরাসি ঔপনিবেশিকতার অধীনে, যাকে ফরাসি-সোমালিয়া বলা হতো। তারপর সেটাকে ইফার ও ইসা বলা হয়। এগুলো মূলত দুটি গোত্রের নাম, যারা জিবুতির স্থায়ী বাসিন্দা। ১৩৯৭ হিজরিতে (১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) জিবুতি ফ্রান্স থেকে স্বাধীন হয়। হাসান জুলিদের নিকট তারা নেতৃত্ব সমর্পণ করে। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সাথে নিরপেক্ষ রাজনীতি পলিসি অবলম্বন করে। এ দেশটি আরবলীগের সদস্য।
📄 কমোরোস (দ্বীপরাষ্ট্র)
এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম বসবাস করত। এখানে ইসলাম প্রবেশ করে দাওয়াতের মাধ্যমে। আরব ও পারস্যের বিভিন্ন দলের হিজরতের মাধ্যমে কমোরোস উপদ্বীপ ফরাসিদের দখলে ছিল। তাদের এ জবরদখল চলতেই থাকে। অবশেষে ১৩৯৫ হিজরিতে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) এটা স্বাধীনতা লাভ করে। মাইয়ুত দ্বীপ ছাড়া অন্যান্য অঞ্চলকে ফ্রান্স স্বাধীনতা দেয়। কারণ, এখানে ফ্রান্স প্রবাসীদের বড় একটি অংশ আবদ্ধ ছিল। আর আফ্রিকার অন্যান্য দেশ থেকে কমোরোস উপদ্বীপ যে বিষয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রাখে, তা হলো, এখানে বিশালাকারে ইউরোপীয় ভাড়াটে সৈনিকদের অবস্থান। তারা তাদের আবাসিক এলাকায় রাষ্ট্রের আইনকানুন পরিবর্তনের জন্য এই দ্বীপে কয়েকবার আক্রমণ চালায়।
কমোরোস উপদ্বীপ স্বাধীন হওয়ার পর এখানকার প্রথম নেতা হয় আহমাদ আবদুল্লাহ। তার নেতৃত্ব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। অতঃপর ওই বছরই আলি সোয়াইলির নেতৃত্বে বিপ্লব হয়। এতে আহমাদ আবদুল্লাহকে উৎখাত করে সাইদ মুহাম্মাদ জাফরকে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সমর্পণ করা হয়। অতঃপর ১৩৯৬ হিজরিতে (১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) আলি মুহাম্মাদ সোয়াইলি সাইদ মুহাম্মাদ জাফরকে পরাজিত করে তার স্থানে নিযুক্ত হয়। তারপর ইউরোপীয় ভাড়াটে সৈনিকরা খেলা শুরু করে। তারা বুব দিনারের নেতৃত্বে আন্দোলন শুরু করে প্রেসিডেন্ট আলি সোয়াইলিকে হত্যা করে আহমাদ আবদুল্লাহকে পুনরায় প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করে। এটা হয়েছিল ১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে)। এখানে অধিক পরিমাণে ইউরোপীয় ভাড়াটে সৈনিক থাকার কারণে আফ্রিকায় ঐক্য সংগঠন থেকে কমোরোস উপদ্বীপের সদস্যপদ বাতিল করা হয়।
ইউরোপীয় ভাড়াটে সৈনিকদের তৎপরতায় কমোরোসে আন্দোলন চলতে থাকে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা পরাজিত হয়। অতঃপর ১৪১০ হিজরিতে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে) কমোরোস প্রেসিডেন্ট আহমাদ আবদুল্লাহ গুপ্তহত্যার শিকার হলে বুব দিনার রাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য সাময়িক ক্ষমতা গ্রহণ করে অতঃপর সাইদ মুহাম্মাদ জাওহারকে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। বুব দিনার ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য কৌশল অবলম্বন করে। তখন ফরাসিরা এটাকে সুযোগ মনে করে পরিস্থিতি শান্ত করার যুক্তি দিয়ে কমোরোসে প্রবেশ করে। এতে বুব দিনার একদল ভাড়াটে সৈনিক নিয়ে কমোরোসের বাইরে পালিয়ে যায়।
এরপর প্রেসিডেন্ট সাইদ মুহাম্মাদ জাওহার ঘোষণা করে যে, সে কমোরোসের নিরাপত্তা বাহিনীর প্রশিক্ষণ মজবুত করার জন্য ফরাসি সৈনিকদের সেখানে থাকার অনুমতি দেবে। অথচ কমোরোস উপদ্বীপ আরবলিগের অন্তর্ভুক্ত হতে চায়। কিন্তু আরবলিগ তাদের অন্তর্ভুক্তি ১৪১৭ হিজরির (১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) পূর্বে গ্রহণ করেনি। বর্তমানে কমোরোস উপদ্বীপ তাদের ইতিহাসে অনেকবার বিভক্ত ও স্বাধীন দেশ হওয়ার চেষ্টার পর নতুন আরেকটি কঠিন সময় পার করছে। এখানে সমস্ত আন্দোলনের ইউরোপীয় ভাড়াটে সৈনিকরা অংশ নিয়েছিল। তাদেরমধ্যে প্রসিদ্ধ ছিল ফ্রান্সের ভাড়াটে সৈনিকরা। তারা ১৪১৮ হিজরির (১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দের) আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
📄 চাদ
এটা আফ্রিকার অন্তর্গত মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশ। দেশটি ফ্রান্সের দখলের ছিল। অবশেষে দেশে খ্রিষ্টানরা ক্ষমতার লাগام সমর্পণ করার পর ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীনতা লাভ করে। প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট হয় ফরানসু তিম্বাল বায়ি। সে ছিল খ্রিষ্টান। দেশে খ্রিষ্টানদের পরিসংখ্যান ৫%-এর বেশি না হওয়া সত্ত্বেও চাদ প্রশাসন গঠন করা হয় এভাবে যে, মুসলমানরা অর্ধেক এবং খ্রিষ্টান ও মূর্তিপূজারিরা অর্ধেক। অথচ মুসলমানদের সংখ্যা হচ্ছে ৮৫%, মূর্তিপূজারিদের সংখ্যা ১০% এবং খ্রিষ্টানদের সংখ্যা ৫%। এতে মুসলমানদের অধিকার খর্ব করা হয়। আর ফরাসি সেনাশক্তি দেশে খ্রিষ্টীয় শাসনের পৃষ্ঠপোষকতা করে। এটা এ কারণে হয়েছিল যে, চাদে ফরাসি সামরিক ঘাঁটি থাকার ব্যাপারে খ্রিষ্টানরা চুক্তিবদ্ধ হয়!
প্রাথমিক অবস্থায় দেশের পরিস্থিতি শান্ত ছিল। অতঃপর খ্রিষ্টানদের বিদ্বেষ শুরু হয়। তাদের অল্পে তুষ্টি বিলীন হয়ে আসল রূপ প্রকাশ পায়। এটা তখন হয়, যখন ইহুদি রাষ্ট্রদূত চাদের প্রেসিডেন্টের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং ১৩৮১ হিজরিতে (১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) তারা তাকে অভ্যর্থনা জানায়। এতে মুসলমানদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়। এর কারণ হলো ইহুদিরাই একমাত্র মুসলমানদের শত্রু এবং অতীত ইতিহাসে ইসলাম ও মুসলমানদের ওপর তাদের শত্রুতা সবসময় অব্যাহত ছিল। ফলে মন্ত্রী ও মুসলিম রাজনীতিবিদগণ ইসরাইলি রাষ্ট্রদূতকে দেশে আমন্ত্রণ জানাতে বিরোধিতা করে। তারা নেতাকে জানিয়ে দেয় যে, তাদের মতের যেন বিরোধিতা না করা হয়।
এদিকে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত মুসলমানদের শাসানোর অঙ্গীকার করে। বাস্তবেও চাদের প্রেসিডেন্ট মন্ত্রীদের মধ্যে পরিবর্তন করে মুসলমান মন্ত্রীদের বহিষ্কার করতে শুরু করে। তাদের স্থানে অমুসলিমদের নিযুক্ত করে। মুসলিম মন্ত্রী ও রাজনীতিবিদদের বন্দি করে। কিছু নেতা ও মন্ত্রীকে দেশান্তর করে। ফলে দেশবাসী তাদের গভীর নিদ্রা থেকে জাগ্রত হয়।
দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ব্যাপক আন্দোলন শুরু হয়। অবশেষে ১৩৮৫ হিজরিতে (১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) তারা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে।
চাদ লিবারেশন জাতীয় ফ্রন্ট গঠন করে সুদানে তাদের ক্যাম্প স্থাপন করে। ১৩৮৭ হিজরিতে (১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) বিদ্রোহের আগুন আরও প্রজ্বলিত হয়। এবার তারা চাদ লিবারেশন জাতীয় ফ্রন্টের নেতৃত্বে দেশের উত্তরাঞ্চলে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। এদিকে ফরাসিরা চাদ নেতাকে আন্দোলনে প্রকাশ্যে সহায়তা করে। অপরদিকে লিবিয়া বিদ্রোহীদের সহায়তা করে। চাদ লিবারেশন জাতীয় ফ্রন্ট দপ্তর আলজেরিয়াতে স্থানান্তর করা হয়।
১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) আহমাদ আবদুল্লাহর নেতৃত্বে আন্দোলন ব্যর্থ হয়। আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে সে নিজেই আত্মহত্যা করে। চাদ অভিযোগ করল যে, এ আন্দোলনের পৃষ্ঠপোষকতা করছে লিবিয়া। এরপর লিবিয়া চাদের বিপ্লবে জোরালো ভূমিকা রাখে এবং বিদ্রোহীদের সহায়তা করার জন্য ১৩৯৩ হিজরিতে (১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) তারা চাদের আওজু সেক্টর দখল করে। ১৩৯৫ সালে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) খ্রিষ্টান স্টাফ প্রধান আবদুল কাদির কামুগার নেতৃত্বে সেনাবিপ্লব ঘটে। এতে চাদের প্রেসিডেন্ট ফ্রাস্কোইস টম্বালবয়ে নিহত হয়। খ্রিষ্টান ফেলিক্স মালুমকে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করা হয়।
জাতীয় স্বার্থে খার্তুমে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তারা ফেলিক্স মালুমকে প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট এবং হুসাইন হাবরিকে প্রধানমন্ত্রী স্বীকৃতি দিয়ে ফয়সালা করে। কিছুদিন যেতে না যেতেই প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। চাদ লিবারেশন জাতীয় ফ্রন্ট গোকুনি ওয়েদির নেতৃত্বে চাদের বিশাল অংশে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। যাকে লিবিয়া সহায়তা করেছিল। এটা হয়েছিল ১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে)। এরপর চাদে প্রশাসন পূর্ণরূপে ধসে পড়ে। হুসাইন হাবরি বাহিনী রাজধানী এনজামেনা প্রবেশ করে। ফেলিক্স মালুম দেশের বাইরে পালিয়ে যায়। তদ্রুপ গোকুনি ওয়েদি রাজধানী এনজামেনাতে প্রবেশ করে। তারপর হুসাইন হাবরি ও গোকুনি ওয়েদির মধ্যে সংলাপ হয়। দেশ শান্ত করার জন্য কয়েক দফা প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু অল্প কিছু সময় ছাড়া এ ঐক্য কার্যকর হয়নি। তারপর পুনরায় দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঘটে। ১৪০০ হিজরিতে (১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রান্স চাদ থেকে নিজেদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যাওয়ার পর যুদ্ধের অগ্নি আরও প্রজ্বলিত করার জন্য।
১৪০০ হিজরিতে (১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে) লিবিয়া গোকুনি সরকারের সাথে একটি মিত্রতার চুক্তি করে। গোকুনি ওয়েদি ও হুসাইন হাবরির মধ্যকার চলমান যুদ্ধে লিবিয়ার সৈনিকরা প্রকাশ্যে অংশ নেয়। গোকুনি ওয়েদি বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয় এবং হুসাইন হাবরি সুদান সীমান্তে চলে যায়। লিবিয়ার সাথে তাদের বিরোধ থাকার কারণে মিশর ও সুদান হুসাইন হাবরিকে সহায়তা করে। চাদ ও লিবিয়ার মধ্যে ঐক্য স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু গোকুনি তা প্রত্যাখ্যান করে এবং লিবিয়াকে চাদ ছাড়ার দাবি জানায়। লিবিয়া তার দাবিকে স্বাগত জানায় এবং ১৪০২ হিজরিতে (১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে) নিজেদের সৈনিক প্রত্যাহার করে।
লিবিয়ার প্রত্যাহারে হুসাইন হাবরি লাভবান হয় এবং ওই বছরই রাজধানী এনজামেনা প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। নিজের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করে এবং প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হয়। আর গোকুনি দেশ থেকে পলায়ন করে। লিবিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের উত্তরাঞ্চলে ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। তখন দক্ষিণাঞ্চল শাসন করছিল আবদুল কাদির কানমের অনুগত সৈনিকরা। সে সময় গৃহযুদ্ধের অগ্নি প্রজ্বলিত হতে থাকে এবং পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।
ফ্রান্স হুসাইন হাবরিকে সহায়তা করে যখন লিবিয়া গোকুনি ওয়েদিকে সহায়তা করে। খ্রিষ্টদেশগুলো আফ্রিকায় একে অপরকে সাহায্য করে। আর বিশ্বের খ্রিষ্টানরা আবদুল কাদির কানমের সঙ্গ দেয়। যুদ্ধে বিশ্বের অস্ত্র-ব্যবসায়ীরা প্রচুর অর্থসম্পদ অর্জনের মাধ্যমে ফায়েদা ভোগ করে। চাদের অভ্যন্তরে ফরাসি ও লিবিয়ানদের মধ্যে অনেক সংঘাত হয়।
অতঃপর লিবিয়ার সৈনিকরা দুর্বল হতে থাকে। অধিকাংশ অঞ্চল গোকুনির নিকট হস্তান্তর করে। চাদের হুসাইন হাবরির অনুগত সৈনিকরা লিবিয়ার সৈনিকদের থেকে আউজু শহর উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। অনেক লিবীয় সৈনিক বন্দি হয়। কিন্তু লিবিয়া তা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। লিবিয়া ও চাদের মধ্যকার যুদ্ধ থাকার কারণে জাতিসংঘ আউজুতে ক্ষমতা প্রয়োগ প্রত্যাখ্যান করে। এ বিষয়টি আফ্রিকার ঐক্যফ্রন্টের নিকট ছেড়ে দেয়। চাদের পরিস্থিতি অশান্ত হয়ে ওঠে। চাদের চিফ অব স্টাফ ইদরিস দিবি ও মুসতাশার হুসাইন হাবরি বিদ্রোহ করে। ওই সময় হুসাইন হাবরি লিবীয় বন্দিদের থেকে সুবিধা ভোগ করতে কাজ করে। লিবিয়া লিবারেশন জাতীয় ফ্রন্ট তথা বিরোধীদের সাথে সম্পৃক্ত করার জন্য। যাতে লিবিয়া নিষ্কৃতি পায়। যার নেতৃত্বে ছিল মুহাম্মাদ মুকরিফ।
ইদরিস দিবি প্রথমে সুদান তারপর লিবিয়ায় পলায়ন করে মুয়াম্মার গাদ্দাফির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। সে তাকে হুসাইন হাবরির বিরুদ্ধে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তারপর হুসাইন হাবরি ও ফ্রান্সের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। দেশের পূর্বাঞ্চলে জাতীয় ফ্রন্ট নেতা ইদরিস দিবির সাথে হুসাইন হাবরির যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু ইদরিস দিবির কাছে সে পরাজয় বরণ করে। ইদরিস দিবি রাজধানী এনজামেনায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়। হুসাইন হাবরি দেশের বাইরে পালিয়ে যায়।
এদিকে গোকুনি ওয়েদি নতুন প্রশাসনের সামনে নতি স্বীকার করে নিয়ে লিবীয় বন্দিদের মুক্তি দেয়। দেশে শান্তি ফিরে আসতে শুরু করে। কিন্তু এরপর আবারও বিদ্রোহ শুরু হয় এবং ১৪১২ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) নতুন করে দুটি বিপ্লব সংঘটিত হতে বসে। তবে উভয়টি অকৃতকার্য হয়। দক্ষিণাঞ্চলীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে। তারা দাবি করে যে, সৈনিকরা তাদের ওপর অত্যাচার চালাচ্ছে। অনুরূপ উত্তরাঞ্চলে কিছু বিদ্রোহ দেখা দেয়, হুসাইন হাবরির অনুগতদের পরিচালনায়।