📄 মৌরিতানিয়া
এটি একটি আরব দেশ, যার অধিকাংশ অধিবাসী মুসলমান। মৌরিতানিয়া অর্থ মুসলিমদের দেশ; যেমনটি ইউরোপ ও স্পেন এর নাম দিয়েছে। এটা ফরাসি শাসনের অধীনে ছিল। অবশেষে ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে) এটা স্বাধীন হয়। আর সেই স্বাধীন মৌরিতানিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট হন মুখতার। স্পেন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর মরক্কো, মৌরিতানিয়া ও আলজেরিয়ার মাঝে পশ্চিম সাহারা নিয়ে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। অতঃপর ১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) এ দেশে সিপাহি বিপ্লব ঘটে এবং মুহাম্মাদ সালিকের পুত্র মোস্তফাকে প্রজাতন্ত্রের প্রধান নির্ধারণ করা হয়। অতঃপর ১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) তাকে মৌরিতানিয়ার এমিরেট প্রেসিডেন্ট নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু প্রকৃত ক্ষমতা ছিল আহমাদ বুশিফের হাতে। সে ওই বছরই বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হয়। সে মন্ত্রিপরিষদের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাচারী হয়ে উঠেছিল। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রধান নিযুক্ত হয় মুহাম্মাদ খোনা। সে দেশ রক্ষার জন্য সেনা কমিশন গঠন করে। সে মন্ত্রীদের নেতৃত্বে সৈয়দ আহমাদ তায়ির সন্তান মুআবিয়ার সাথে চুক্তি করে। কিছুদিন যেতে না যেতেই সে চুক্তি ভঙ্গ করে। অতঃপর মুআবিয়া ১৪০৫ হিজরিতে (১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) সেনা বিদ্রোহ ঘটিয়ে মুহাম্মাদ খোনাকে পদচ্যুত করে। এরপর মুআবিয়া প্রজাতন্ত্র, সেনাবাহিনী ও প্রশাসন তিনটিরই প্রধান হয়।
মৌরিতানিয়ায় আফ্রিকান স্বাধীনতাকামীদের সেনাবিদ্রোহ ঘটে, যেখানে ইহুদি ও খ্রিষ্টান মিশনারি সহায়তা করেছিল। ফলে তারা ১৪০৮ হিজরিতে (১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) সেনা অভ্যুত্থানের চেষ্টা চালায়। এর কারণ বলা হয় যে, প্রশাসনে আরবরা হস্তক্ষেপ করছে এবং নিগ্রোরা তাদের শ্রেষ্ঠত্ব ও সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারছে না। কিন্তু এ অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়।
অতঃপর ১৪০৯ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) মৌরিতানিয়া ও সেনেগালের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটে। ফলে সেনেগালে বসবাসরত মৌরিতানিয়ানদের ওপর কয়েকবার হামলা হয়। এর ধারাবাহিকতায় মৌরিতানিয়ায় বসবাসরত সেনেগালিদের ওপরও কয়েকবার হামলা হয়। অবশেষে উভয় দেশের প্রবাসীদের রদবদলের মাধ্যমে এ সংকটের অবসান ঘটে।
📄 সুদান
সুদান মিশর ও ইংরেজদের দ্বিপাক্ষিক শাসনের অধীনে ছিল। অতঃপর ২৩ জুলাই বিদ্রোহ সংঘটিত হলে সুদানবাসীদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ইংরেজদের সাথে অনেক সংলাপ হয়। এসব আলোচনায় সুদানবাসীদেরকে দুটি সুযোগ দেওয়া হয়; হয়তো তারা মিশরের সাথে সংযুক্ত হয়ে থাকবে কিংবা পরিপূর্ণ স্বাধীনতা গ্রহণ করবে। সুদান মিশর থেকে স্বাধীন হওয়াকে গ্রহণ করে এবং ইসমাইল আজহারির নেতৃত্বে ১৩৭৫ হিজরিতে (১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) প্রজাতান্ত্রিক দেশ ঘোষণা করে। আর ওই বছরই তারা আরবলীগের অন্তর্ভুক্ত হয়।
যুগপৎ সেনা বিপ্লবে সুদানের ইতিহাস ভরপুর। তন্মধ্যে ১৩৭৭ হিজরির (১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দের) বিপ্লব অন্যতম; যদিও সেটা ব্যর্থ হয়। অতঃপর সেই বছরই ইবরাহিম আবুদের নেতৃত্বে দ্বিতীয় বিপ্লব ঘটে। এতে তারা বিজয়ী হয়। অতঃপর ১৩৭৮ হিজরিতে (১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে) আরও তিনটি সেনা বিপ্লব হয়। তন্মধ্যে প্রথমটিতে সফল এবং বাকি দুটিতে বিফল হয়। অতঃপর ১৩৮৪ হিজরিতে (১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) আরেকটি বিদ্রোহ হয়। এতে ইসমাইল আজহারির নেতৃত্বে ক্ষমতা পরিচালনার জন্য একটি কমিশন গঠন করা হয়। তারপর সেই বছরই আরেকটি আন্দোলন হয়। এবং এতে তারা পর্যুদস্ত হয়। তারপর ১৩৮৯ হিজরিতে (১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) জাফর নুমাইরির নেতৃত্বে আরেকটি বিপ্লব হয় এবং ১৩৯১ হিজরিতে (১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে) অন্য আরেকটি বিপ্লব হয়, এতেও তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনইভাবে ১৩৯৫ হিজরির (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দের) আন্দোলনেও বিপর্যয় ঘটে। তারপর ১৩৯৬ হিজরিতে (১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) জাফর নুমাইরিকে পদচ্যুত করার জন্য শক্তিশালী হামলা করা হয়। এতে বহির্বিশ্ব থেকে সুদানিদের অস্ত্রের জোগান দেওয়া হয়। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন স্থানে সেনা বিদ্রোহ ঘটানো হয়। সেখানে বিদেশ থেকে প্রত্যাবর্তনকারী নুমাইরির বিমান ধ্বংসের জন্য একটি পরিকল্পনা করা হয়। কিন্তু সেটা ব্যর্থ হয়। মিশর নুমাইরিকে এই মর্মে সহায়তা করে যে, ইথিওপিয়ার ইহুদিদেরকে সে ইসরাইলে স্থানান্তরিত হওয়ার ক্ষেত্রে পূর্ণ সহায়তা করবে এবং এ চুক্তি দীর্ঘকাল বলবৎ থাকবে।
সুদানে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের শক্তিশালী অবস্থান ছিল। প্রশাসনিক সেক্টরে তাদের খুব প্রভাব ছিল। ১৪০৩ হিজরিতে (১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে) সুদানে ইসলামি শরিয়ত প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের বিশাল ভূমিকা ছিল। ইখওয়ানুল মুসলিমিনের কার্যক্রম বৃদ্ধির ফলে জাফর নুমাইরি শঙ্কিত হয়ে পড়ে। ফলে ১৪০৫ হিজরিতে (১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) তাদেরকে নির্মূল করার জন্য সে চক্রান্ত করে তাদের ওপর বিভিন্ন অপবাদ দিতে থাকে। তাদের অনেককে সে কবজা করে নেয়। কিন্তু এ নির্মূলীকরণ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ১৪০৫ হিজরিতে (১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে) নতুন আরেকটি সেনা বিপ্লব ঘটে যায়। এ বিপ্লবের সূচনা করে প্রতিরক্ষামন্ত্রী আবদুর রহমান সাওয়ার সাহাব। সে রাষ্ট্রপ্রধান হয় এবং ১৪০৬ হিজরিতে (১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) সাদেক মাহদিকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। জাফর নুমাইরিকে পুনরায় নিযুক্ত করার জন্য অনেক আন্দোলন হয়, কিন্তু আন্দোলন সফল হয়নি।
অবশেষে ১৪০৯ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) উমর বশিরের নেতৃত্বে একটি সফল সেনা বিপ্লব হয়। ফলে সে সুদানের প্রধান নিযুক্ত হয়ে এখন পর্যন্ত সেই পদে বহাল রয়েছে। তার যুগে মিশর ও সুদানের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বিষয়টি প্রকাশ পায় হাকাইব ও শালাতিনের ক্ষেত্রে। সুদানিরা মনে করল, এটা সুদানের অংশ; অথচ এতে মিশর শাসন করছে। সুদানকে সন্ত্রাসী রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিশেষ করে আদ্দিস আবাবায় মিশরের প্রেসিডেন্ট হুসনি মোবারকের ওপর আত্মঘাতী ব্যর্থ হামলার পরিকল্পনাকারীদের সুদানে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর। এতে অনেক বহিরাগত শক্তি বিশাল বাহিনী নিয়ে বিরোধীপক্ষের সহযোগিতার জন্য সুদানে অনুপ্রবেশ করে। সুদানে সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে, যে আগুন প্রজ্বলিত করেছে ধূর্ত ক্রুসেডাররা।
**দক্ষিণাঞ্চলীয় সংকট**
সুদানে ইংরেজ দখলদারি কার্যকলাপের পর তারা সেখানে দক্ষিণাঞ্চলীয় সংকটের বীজ বপন করে। তারা দক্ষিণাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চলকে পৃথক করার প্রচেষ্টা চালায়। উত্তরাঞ্চলে মুসলিমদের, আর দক্ষিণাঞ্চলে মূর্তিপূজারিদের বসবাস ছিল। তারা দক্ষিণাঞ্চলে ইসলাম প্রচার নিষিদ্ধকরণের জন্য কাজ করে। আর সেটাকে ক্রুসেডাররা তাদের মিশন বাস্তবায়নের উর্বর ভূমি হিসেবে ধার্য করে। তাদের যে সমস্ত সহায়তা দক্ষিণ সুদানবাসীদের মধ্যে প্রভাব ফেলেছিল, তন্মধ্যে খ্রিষ্টান মিশনারির অধীনে হাসপাতাল নির্মাণ, দক্ষিণ সুদানে শিক্ষাবোর্ড স্থাপন ইত্যাদি ছিল অন্যতম। ইংরেজরা দক্ষিণ সুদানকে একচেটিয়া দেশ নির্ধারণ করে। উত্তরাঞ্চলীয়দেরকে সেখানে প্রবেশ করতে বারণ করে। এমনকি দক্ষিণ সুদান থেকে অনেক মুসলিম অন্যান্য দেশে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। এতটুকুতেই তারা ক্ষান্ত হয়নি; উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের মধ্যে যুদ্ধ বাধানোর জন্য চেষ্টা করে। দক্ষিণ সুদানকে সুদানের মূল ভূখণ্ড থেকে পৃথক করার ক্ষেত্রে তারা শক্তিশালী ভূমিকা রাখে। উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে ছোট ছোট আক্রমণ চলতে থাকে, বিভিন্ন বিষয়ে পরস্পর কুৎসা রটাতে থাকে। যেমন উত্তরাঞ্চলীয়দের দাস ব্যবসার ক্ষেত্রে দক্ষিণাঞ্চলীয়দের থেকে অধিক সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে।
সুদান স্বাধীন হওয়ার পর উত্তর ও দক্ষিণ সুদানের মধ্যকার সংঘাত শুরু হয়ে যায়। দক্ষিণ সুদানে কয়েকটি সেনা সংগঠন গঠিত হয়। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ হলো আনইয়ানয়া সংগঠন, যাদেরকে ইহুদি, আন্তর্জাতিক গির্জা পরিষদ ও খ্রিষ্টান মিশনারিরা সহায়তা করত। এমনইভাবে খ্রিষ্টান দেশ এবং খ্রিষ্টান শাসিত পার্শ্ববর্তী দেশ, যেমন ইথিওপিয়া, উগান্ডা, মধ্য আফ্রিকা, চাদ ইত্যাদি দেশসমূহ তাদেরকে সহায়তা করত। অতঃপর যারা দক্ষিণ সুদানিদের নিপীড়ন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে প্রথমদিকে তাদের অনুসরণ করেছিল তাদের ও সেখানকার প্রশাসনের মধ্যে সংঘাত হতে থাকে, যা দক্ষিণাঞ্চলীয়দের ক্ষেত্রে তাদের মনোভাব কঠোর করে তোলে।
অবশেষে জাফর নুমাইরির যুগ আসে। ফলে ১৩৯২ হিজরিতে (১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে) আদ্দিস আবাবা চুক্তি হয়। সেটা দক্ষিণ ও উত্তর সুদানেকে একীভূত করে। কিন্তু দক্ষিণ সুদানবাসীদের কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য থাকায় যেকোনো সময় তাদের পুনরায় বিদ্রোহী হওয়ার সম্ভাবনা রয়ে গিয়েছিল। যেমন: দক্ষিণ সুদানের নিরাপত্তা বাহিনী এককভাবে তাদের অঞ্চল থেকেই গঠিত হবে, কিন্তু উত্তর সুদানের নিরাপত্তা বাহিনীর গঠিত হবে উভয় পক্ষের অর্ধেক-অর্ধেক সৈন্য দ্বারা, এতে উত্তরাঞ্চলে খ্রিষ্টান মিশনারির কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ হয়ে যায়। এই চুক্তির ফলে পার্শ্ববর্তী দেশের মুসলমানের ওপর মন্দ প্রভাব পড়ে। তাই সুদান ইথিওপিয়া থেকে স্বাধীনতার জন্য ইরিত্রিয়াকে সহযোগিতা বন্ধ করে দেয়। এমনইভাবে চাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম যারা চাদ-প্রশাসনের পতন চেয়েছিল, তাদেরও সহায়তা করা বন্ধ করে দেয়। দেশে ক্রুসেডার সংখ্যালঘুদের মধ্যস্থতায় তারাও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়।
১৪০০ হিজরিতে (১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে) যখন প্রশাসন দেশটিকে তিনটি ভূখণ্ডে বিভক্ত করতে চায় তখন দক্ষিণ সুদানে পুনরায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। কারণ, দক্ষিণ সুদানের দিনকা নামক বেশ বড় গোত্রের জন্য কোনোরূপ ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব রাখা হয়নি। অতঃপর ১৪০৩ হিজরিতে (১৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দে) সুদানবাসীরা ইসলামি শরিয়তের প্রয়োগ করায় দেশে উত্তেজনা পুনরায় বৃদ্ধি পায়। জন কারনাক নামে এক ব্যক্তি বিদ্রোহ করে। সে ছিল সামরিক অফিসার। সে মূলত দক্ষিণ সুদানের বাসিন্দা ছিল। তারপর সুদানি সৈনিক থেকে সে একদল সৈনিক নিয়ে পৃথক হয়ে যায় এবং দক্ষিণ সুদানে স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন চালায়। যখন দক্ষিণ সুদানে স্বাধীনতার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেতে থাকে তখন উত্তর সুদানকে প্রশাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দেখা যায়। আর বিশ্ব-ক্রুসেডার সে সময় সুদানের বিদ্রোহ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে শক্তির জোগান দেয়। এর সাথে ছিল ইহুদিদের সহযোগিতা।
সুদানের সংবিধানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের সাথে বিরোধীদের ঐক্যের পর কঠিন সময় পার করে। আর দারফুরের অবস্থা কঠিন হয়ে স্থায়ী যুদ্ধের অবস্থা তৈরি হয়। এদিকে আজওয়ায় আঞ্চলিক নেতাদের মাঝে চলে দীর্ঘ যুদ্ধ। দারফুরের সংকট প্রকাশ পাওয়ার পর সুদানের শাসন মেনে নিতে ও উত্তর-দক্ষিণ সুদানের মধ্যে সন্ধি স্থাপনের শর্তে তাদের সহায়তা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক মহল থেকে নির্দেশ ও চাপ সৃষ্টি করা হয়, যারা ইতিপূর্বে দক্ষিণ সুদানকে বিভিন্ন প্রকার উপকরণ ও অধিকার দিয়ে সাহায্য করত। সংবিধানের সংশোধন সম্পন্ন হয় এবং ২০০৫ সালে জন কারনাককে সুদানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নিযুক্ত করা হয়। আর সে দেশের অভ্যন্তরে লাগাতার যুদ্ধবিগ্রহ চলাসহ বিভিন্ন কারণ ও লক্ষণ ইঙ্গিত করছে যে, শীঘ্রই সুদান বিভক্ত হয়ে যাবে।
📄 সোমালিয়া
সোমালিয়ার আয়তক্ষেত্র তার বর্তমান আয়তক্ষেত্রের দ্বিগুণ ছিল। খ্রিষ্টান ঔপনিবেশিকরা সেটাকে কয়েকটি অংশে বিভক্ত করে দেয়। ফলে ইংল্যান্ড একটি অংশ গ্রহণ করে, যা ইংরেজ-সোমালিয়া নামে প্রসিদ্ধ। এক অংশ দখল করে নেয় ইতালি, যা ইতালিয়ান-সোমালিয়া নামে পরিচিত। ইথিওপিয়াকেও সোমালিয়ার এক অংশ দেওয়া হয়। সেটা হলো ইকলিম অথবা গাদিন। কেনিয়াকে দেওয়া হয় এক অংশ। ফ্রান্সও একটি অংশ দখল করে, যা ফরাসি সোমালিয়া নামে পরিচিত।
ইংরেজ ও ইতালিয়ান সোমালিয়া ব্যতীত সোমালিয়ার অন্যান্য বিক্ষিপ্ত অংশগুলোকে পরে আর কেউই এক করতে পারেনি। ইতিমধ্যে ইংল্যান্ড সোমালিয়ার আরেকটি অংশ ইথিওপিয়াকে দান করে দেয়। আর ফ্রান্সের দখলীকৃত সোমালিয়া স্বাধীন একটি দেশ হয়ে যায়, যা বর্তমানে জিবুতি নামে পরিচিত। ইথিওপিয়া ও কেনিয়া সোমালিয়ার যে অংশ দখল করেছিল, তা আজও তাদের দখলে রয়েছে।
১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে) ইংরেজ ও ইতালিয়ান সোমালীয়রা স্বাধীনতা অর্জন করার পর তাদের লক্ষ্য অর্জনে সোমালিয়া ঐক্য গঠন করে। তারা উভয়ে সোমালি প্রজাতন্ত্র হিসেবে গঠিত হয়। তারা ইথিওপিয়া ও কেনিয়ায় তাদের হারিয়ে যাওয়া ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য কাজ করার ঘোষণা দেয়। ফলে ইথিওপিয়া-কেনিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যকার সম্পর্কে বিপর্যয় ঘটে এবং অবশেষে যুদ্ধ হয়। সোমালীয় প্রেসিডেন্ট আবদুর রশিদ আলি শেরমার্কের শাসনামলে প্রথম যুদ্ধ হয়। ১৩৮৪ হিজরিতে (১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপীয় ও সোমালীয়দের মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অতঃপর ১৩৮৯ হিজরিতে (১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) সোমালীয় নেতা পরাজিত হয় এবং মুহাম্মাদ সিয়াদ বারি দেশের ক্ষমতা দখল করে। সে রাশিয়ার প্রতি মনোনিবেশ করে। সে দেশে সমাজতন্ত্র চর্চার ঘোষণা দেয়। আর সোমালিয়া আরব জোটের অংশ হওয়া সত্ত্বেও আরবি ভাষাকে বিলুপ্ত করার ঘোষণা দেয়।
১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এবার সোমালীয়রা ইথিওপিয়ায় অবস্থানরত পশ্চিম সোমালীয়দের স্বাধীনতা জোটের পক্ষে সহায়তা করে। সোমালিয়া থেকে অনেক সৈনিক ইথিওপিয়ায় প্রবেশ করে। এ আক্রমণ রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বিচ্ছেদের কারণ হয়, যারা ইথিওপীয়দের সহায়তা করেছিল। সোমালীয়রাও ইথিওপিয়া থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়।
উভয় দেশের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি হতে থাকে। এমনকি ১৪০৬ হিজরিতে (১৯৮৬ খ্রিষ্টাব্দে) উভয় দেশের মধ্যকার শান্তিচুক্তি সম্পাদিত হয়। এতৎসত্ত্বেও ইথিওপিয়া সোমালিয়ার বিদ্রোহীদের সহায়তা করে এবং তাদের সৈন্যরা সোমালিয়ায় অনুপ্রবেশ করে। ১৪০৪ হিজরিতে (১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) কেনিয়ার সাথে সোমালিয়ার উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। তবে কেনিয়া ১৪১০ হিজরিতে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে) সোমালিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে যে, সোমালীয়রা বিরোধীদেরকে ধাওয়া করে কেনিয়ার সীমান্তে প্রবেশ করেছে।
ইথিওপিয়া সোমালিয়ার বিরোধীদের সাহায্য ও সহযোগিতা করায় সোমালিয়া ও ইথিওপিয়ার মধ্যে আবারও সম্পর্কের অবনতি ঘটে। এরপর সোমালিয়া ইথিওপিয়ার সমর্থিত বিদ্রোহীদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য মাকদিসুতে একটি সেনাচৌকি নির্মাণ করে। এতে ইথিওপিয়াও সোমালিয়া-বিরোধীদের সহযোগিতা বৃদ্ধি করে। সোমালীয় প্রশাসন ও বিদ্রোহী সৈনিকদের মধ্যে অনেক সংঘাত হতে থাকে। আর এতে বিদ্রোহী শক্তিগুলো প্রশাসনের ওপর বিরাট বিজয় অর্জন করে।
মুহাম্মাদ সিয়াদ বারি দেশ থেকে পলায়ন করতে বাধ্য হয়। ১৪১১ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) বিদ্রোহীরা মুহাম্মাদ ফারাহ ইদিদের নেতৃত্বে মোগাদিসুতে প্রবেশ করে। আর আলি মাহদিকে সাময়িকভাবে প্রজাতন্ত্রী প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত করা হয় দেশের পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য। তারপর বিদ্রোহী সৈনিকদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়, যাদেরকে সোমালিয়ার বিভিন্ন গোত্র থেকে এনে গঠন করা হয়েছিল। ফলে তাদের মধ্যে সংঘাত এবং বিভক্তির লড়াই শুরু হয়ে যায়। তারপর উত্তর সোমালিয়ায় স্বাধীন প্রজাতন্ত্র দেশ ঘোষণা করা হয়। এদিকে মুহাম্মাদ সিয়াদ বারির অধীনে দক্ষিণ সোমালিয়ায় সমাজতান্ত্রিক দল নেতৃত্ব দিতে থাকে। আবার ওদিকে মোগাদিসুতে মুহাম্মাদ ফারাহ ইদিদ ও আলি মাহদির মধ্যেও কঠিন সংঘাত শুরু হয়।
চলমান গৃহযুদ্ধে হাজার হাজার সোমালীয় নিহত হয়। বিভক্তির যুদ্ধে সন্ধিচুক্তির অসংখ্য প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। যুক্তরাষ্ট্র এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে সোমালিয়ায় তাদের সৈনিক প্রবেশ করানোর চেষ্টা চালায়। এর পর পরই সোমালিয়ায় তার সৈনিক প্রেরণ করে। সাথে সাথে বিভিন্ন দেশের সৈনিকরাও অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এ সৈনিকরা দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হয়নি। তাদের অনেকেই নিহত হয়। অবশেষে সোমালিয়া পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
সোমালিয়ার চলমান যুদ্ধে মুহাম্মাদ ফারাহ ইদিদ সোমালিয়ায় নিহত হয়। তার ছেলে ক্ষমতা গ্রহণ করতে আসে। সে ১৪১৮ হিজরিতে (১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) সোমালিয়ার বিভিন্ন দলের সাথে কায়রোতে ঐক্যচুক্তি করে। যুদ্ধ ও দরিদ্রতায় হাজার হাজার প্রাণ ঝরার পর অবস্থা শান্ত হয়। আমরা আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সোমালিয়ার পরিস্থিতি পরিপূর্ণ শান্ত রাখেন এবং রক্তপাত বন্ধ করেন।
📄 জিবুতি
জিবুতি ছিল ফরাসি ঔপনিবেশিকতার অধীনে, যাকে ফরাসি-সোমালিয়া বলা হতো। তারপর সেটাকে ইফার ও ইসা বলা হয়। এগুলো মূলত দুটি গোত্রের নাম, যারা জিবুতির স্থায়ী বাসিন্দা। ১৩৯৭ হিজরিতে (১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) জিবুতি ফ্রান্স থেকে স্বাধীন হয়। হাসান জুলিদের নিকট তারা নেতৃত্ব সমর্পণ করে। পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের সাথে নিরপেক্ষ রাজনীতি পলিসি অবলম্বন করে। এ দেশটি আরবলীগের সদস্য।