📄 মহাদেশে ঔপনিবেশিক নৃশংসতার স্বরূপ ও নীতি
আফ্রিকায় ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক নৃশংসতা বিভিন্ন রূপ ধারণ করে। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য হলো:
• বহিরাগত ঔপনিবেশিকতা দেশের সর্বস্তরে ও অর্থনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে। দেশের মূল নাগরিকদের জন্য কোনো অংশ ছাড়া হয়নি। তারা ক্ষুধা, গৃহহীনতা ও মহামারিতে কষ্ট করেছে।
• ঔপনিবেশিকতা দেশের নাগরিকদেরকে শুধু কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তাদের থেকে সুবিধা ভোগ করারও ইচ্ছা করে। আর তা হলো আফ্রিকায় বিশাল পরিসরে দাসের ব্যবসা চালু করে এবং লাঞ্ছনা, অত্যাচার, হেয় প্রতিপন্ন করার চূড়ান্ত দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। ঔপনিবেশিকরা নাগরিকদের পরিবর্তন করতে শুরু করে। তারা নারী-পুরুষ ও শিশুদের হাঁকিয়ে বাজারে নিয়ে যায়। তাদের বিভিন্ন ধরনের অপমানকর ও প্রতিশোধমূলক কাজে নিয়োজিত করে, বিশেষ করে মহিলাদেরকে। বিক্রির জন্য যাকে পেশ করা হতো তার ধ্বংস অনিবার্য। তারপর ক্রেতারা তাদের নতুন জমি ও শক্ত দ্বীপে নিয়ে যেত। যেখানে উপনিবেশবাদ তাদেরকে ফসল উৎপাদনে বাধ্য করত।
দ্বীপে যেতে জাহাজে থাকা অবস্থায় তাদের অসদাচরণ, অবহেলা এবং খাদ্যাভাবে হাজার হাজার লোক মারা যেত। অতঃপর তাদেরকে মাছের খাদ্য হিসেবে সাগরে ফেলে দিত। বেত্রাঘাত ও হত্যা ছিল বিদ্রোহীদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যাতে এ থেকে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করে। যারা যাত্রাপথে বেঁচে থাকত তাদের অফিসারের দপ্তরে না পৌঁছতেই চরম অসহনীয় কষ্টের সম্মুখীন হতে হতো। যার ভোগান্তি মৃত্যু পর্যন্ত শেষ হতো না। দাসদের মানবাধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত করার আইন প্রণয়ন করা হয়। তাদের মালিকরা ইচ্ছানুযায়ী তাদেরকে ব্যবহারের অধিকার রাখত। আফ্রিকায় মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ ও তাদের অস্তিত্ব বিলীন করতে তাদেরকে দাস বানানো ছিল দখলদার খ্রিষ্টানদের প্রধান একটা নীতি। এ নীতি তারা মহাদেশের মুসলিম-অমুসলিম সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে। নতুন দেশে দেশান্তর হওয়ার ক্ষেত্রে যে সমস্ত দাস পথিমধ্যে মারা যায় তাদের সংখ্যা ছিল আশি মিলিয়নের মতো। এটা ছিল যারা অন্য দেশে পৌঁছেছে তার অর্ধেক।
ঔপনিবেশিকরা আফ্রিকার উর্বর জমি দখল করে সেখানকার নাগরিকদের তাড়িয়ে দেয়। তারা জঙ্গল ও দারিদ্র্যপ্রবণ এলাকায় নির্বাসনে চলে যায়। সেটাকে তাদের আশ্রয়স্থল বানিয়ে নেয়। ওই সময় ঔপনিবেশিকতা নাগরিকদেরকে দেশান্তর হতে ও দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে উদ্বুদ্ধ করে এবং দেশকে তাদের অধীনস্থ করে।
ঔপনিবেশিকতা মহাদেশে ফাটল ধরায়। পূর্বের রাজা-বাদশাহদের অপসারণ করে। বিভিন্ন অঞ্চল ও সম্প্রদায়কে বিভিন্ন দেশে ভাগ করার ইচ্ছা করে। দেশ থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় তারা ফিতনা ও ভাঙনের বীজ বপন করে যায়। এখানে অনেক ভাড়াটে সৈনিক রেখে যায়। তারা ছিল সীমান্তরক্ষী। তারা সাম্প্রদায়িক যুদ্ধের উসকানি দিত। এটা ছিল আফ্রিকায় দ্বন্দ্ব ও বিবাদের অগ্নি প্রজ্বলিত করার জন্য। যাতে করে আফ্রিকায় অস্ত্রের বিক্রিতে শীর্ষে যেতে পারে।
ঔপনিবেশিকরা দেশে বর্ণ-বৈষম্যের রাজনীতি প্রয়োগ করে। এতে শ্বেতাঙ্গরা জীবনে সব আনন্দ ও সুখ ভোগ করার সুযোগ পেয়ে যায় আর দেশের প্রকৃত অধিবাসী যারা, তারা এসব থেকে বঞ্চিত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে থাকে। শ্বেতাঙ্গরা জীবনের সর্বোচ্চ আসনে উপনীত হয় এবং তাদের জন্য সর্বোচ্চ পদ ও স্থান নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বিপরীতে কৃষ্ণাঙ্গরা নিম্নমানের জীবনযাপন করতে থাকে এবং বিলাসী জীবন থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে। চাকচিক্যময় জীবনে প্রবেশ করা তাদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ হয়। দেশের উচ্চপদে সমাসীন হওয়া তাদের জন্য অবৈধ করা হয়।
ঔপনিবেশিকরা যখন দেখল আফ্রিকায় তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়, তখন তারা সেখানকার কর্মচারীদের হাতে নেতৃত্বের লাগাম ছেড়ে দিলো; যদিও তারা ছিল সংখ্যালঘু। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান থাকতে নেতারা ছিল খ্রিষ্টান। তাদেরকে শক্তিশালী করতে এবং দৃঢ়পদ রাখতে বিশ্বের খ্রিষ্টানরা সহায়তা করত।
ঔপনিবেশিকরা ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও খ্রিষ্টবাদ প্রচারের পক্ষে অবস্থান নেয়। যাতে করে নাগরিকদেরকে এর সাথে সম্পৃক্ত করতে পারে। তারা উদ্যোগ নেয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মিশনারি হাসপাতাল তৈরি করতে। যাতে করে এটা খ্রিষ্টবাদ প্রচারের প্রধান মাধ্যম হয়। এতসব সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করা সত্ত্বেও খ্রিষ্টান মিশনারিদের সফলতা ছিল খুবই কম। এদের সাফল্য অধিকাংশই পৌত্তলিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বিপরীতে অধিকাংশ আফ্রিকানের অন্তরে ঔপনিবেশিকতার প্রতি প্রচণ্ড ঘৃণা সৃষ্টি হয়। অনুরূপ তাদের ধর্ম ও তাদের সাথে সম্পৃক্ত সবকিছুর প্রতিই অনীহা সৃষ্টি হয়। তদুপরি ধর্মগুরু ও পুরোহিতদের মনোনিবেশ সম্পদ অর্জনের প্রতি থাকায় এবং খ্রিষ্টান মিশনারির মিশনে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারই মূল লক্ষ্য হওয়ায় তাদের আবেদন পুরোপুরিই নষ্ট হয়ে যায়।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকতা দেশের সভ্যতা ও চিন্তাধারার ওপর বিজয়ী হয়ে যায়। আর আফ্রিকা হয়ে যায় বিশ্বের দরিদ্র ও মূর্খদের মহাদেশ, এখনো পর্যন্ত যাদের সে গ্লানি বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। (২৫)
টিকাঃ
২৫. ড. জামাল আবদুল হাদি ও ড. ওয়াফা মুহাম্মাদ আফ্রিকার ইতিহাস বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনা করেছেন, যেখানে তারা আফ্রিকার ইতিহাস-ঐতিহ্য ও ইউরোপিয়ানদের শোষণ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। গ্রন্থটির নাম আফ্রিকিয়া ইউরাদু লাহা আন তামুতা জুয়ান। -সম্পাদক
📄 উপনিবেশিকতার বিরোধিতা
আফ্রিকার ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে ওঠে যখন এর অস্তিত্ব মহাদেশকে কলুষিত করে। এ প্রতিরোধ মহাদেশের নাগরিকদের ওপর ইউরোপীয়দের অত্যাচার ও নিপীড়ন কেবল বৃদ্ধিই করে যায়। তখন মুসলমানদের জন্য ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাটা গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় ছিল। এতে আফ্রিকার অন্যান্য নাগরিকরাও তাদের অনুসরণ করে। যেমন এশিয়ায় স্বাধীনতা আন্দোলন হয়েছিল। এর প্রভাব আফ্রিকায়ও পৌঁছে। তারা আফ্রিকা স্বাধীন করতে চেষ্টা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রদের পরাজয় আফ্রিকা আন্দোলনে বিরাট প্রভাব ফেলে। আর ঔপনিবেশিকদের প্রভাবও তাদের থেকে দূরীভূত হয়। আফ্রিকায় ঔপনিবেশিকতার প্রতিরোধে প্রসিদ্ধ আন্দোলন হলো তানজানিয়ায় জার্মানদের দখলের বিরুদ্ধে মুসলিম নেতা বুশিরি বিন সালিনের আন্দোলন। যা ঔপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছিল। এতে তারা কঠিনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। দীর্ঘ যুদ্ধের পর জার্মানরা বুশিরিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়। এমনইভাবে আফ্রিকার আন্দোলনসমূহের মধ্যে মাহদি সোমালের আন্দোলনও প্রসিদ্ধ, যা সুদানে বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল এবং ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের নির্মূল করেছিল।
সোমালিয়ায় তারা এর পুনরাবৃত্তি করতে ইচ্ছা করে। তাদের সাথে প্রথমদিকে খ্রিষ্টান মিশনারিরা যুদ্ধ করে, যারা মানুষকে খ্রিষ্টবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য করত, এরপর ঔপনিবেশিকতার দিকেও তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। মাহদি আন্দোলনের বিদ্রোহীরা ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। একপর্যায়ে তার বাহিনীর মধ্যে বিশ্বাসঘাতক বের হয়ে আসে, যাদেরকে ইংরেজরা আকর্ষণ করতে ও লোভ দেখাতে পেরেছিল। এতে মাহদির বিদ্রোহ আন্দোলন দুর্বল হয়ে যায় এবং সৈনিকরা বিপর্যস্ত হওয়ার পর মাহদি ইনতেকাল করে।
ঔপনিবেশিকতা দমনে অসংখ্য আন্দোলন সংগঠিত হয়। কঠিন প্রতিরোধ ঔপনিবেশিকদেরকে আফ্রিকা থেকে চলে যেতে বাধ্য করে। এরপর সেখানকার কোনো কোনো দ্বীপ ও ছোট ছোট অঞ্চলেই কেবল কিছু ঔপনিবেশিকতা বাকি থেকে যায়।