📄 কুরদফান
ফাতিমি শাসনের অবসান হওয়ার পর মিশর থেকে অনেকে চলে আসে এবং অনেক আরব গোত্র কুর্দফানে হিজরত করে। মুহাম্মাদ আলির পরিবারের শাসনামলে কুর্দফান মিশরীয় শাসনাধীন হয়। সেখানে ইসলামের প্রসারে মিশরীয়দের জন্য বড় ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল। সেখানে অনেক দাঈর আগমন ঘটে। তাদের মধ্যে বিখ্যাত হলেন মুহাম্মাদ উসমান আল মিরঘানি। তিনি সেখানকার অনেক মানুষকে সফলভাবে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করতে পেরেছিলেন। সেখান থেকে মাহদি আন্দোলন শুরু হয়। যা সুদানে প্রবেশ করে কিন্তু ইংরেজরা তা থামিয়ে দেয় এবং মিশরীয় ইংরেজ দ্বৈত শাসনের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
টিকাঃ
২০. মধ্য সুদানে অবস্থিত একটি এলাকা। এর আয়তন তিন লক্ষ আশি হাজার বর্গকিলোমিটার। -সম্পাদক
📄 আল-বাজ্জা
এটি পূর্ব সুদানে অবস্থিত। আবদুল্লাহ বিন আবু সারাহ এটা জয়ের জন্য চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু রাস্তার কণ্টকাকীর্ণতা ও পানি সংকট এর বাধা হয়ে দাঁড়ায়। এ ছাড়া এখানকার বাসিন্দারা কর প্রদানেও সম্মত হয়ে যায়। তবে আব্বাসি শাসনামলে মুসলমানদের সাথে করা চুক্তি ভেঙে দিয়েছিল, ফলে মুসলমানদের সাথে তাদের যুদ্ধ বেধে যায়। প্রত্যেকবারই মুসলমানরা বিজয় লাভ করে এবং বাজ্জা অধিবাসীদের থেকে বশ্যতার স্বীকারোক্তিমূলক চুক্তি সম্পাদন করে। কিন্তু এ সম্প্রদায় বারবার বিদ্রোহ করে এবং মুসলমানদের সাথে যুদ্ধ করে। আরব গোত্রগুলো বাজ্জাতে হিজরত করে জনগণের সাথে মিশে যায় এবং তথায় প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। বাজ্জা ছিল ফুনজ রাজ্যের অধীনে। যা মাগরা ও আলওয়াজুড়ে বিদ্যমান ছিল। মুহাম্মাদ আলি পরিবারের শাসনামলে এগুলো মিশরের সাথে যুক্ত হয়।
📄 ফুনজ রাজ্য
নীলাভ নীলনদ (২৪) শ্বেত নীলনদের সাথে মিলিত হওয়ার আগে দক্ষিণ নুবিয়া রাজ্যের সীমান্তে মাগরা ও আলওয়া নামে দুটি খ্রিষ্টান রাজ্য ছিল। যখন মিশরে ইসলামের আগমন ঘটে তখন ওই রাজ্যদ্বয় এবং মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। তারপর একটি শান্তিচুক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়, যা আলবাকত চুক্তি নামে পরিচিত। এতে উত্তর ও দক্ষিণ উপত্যকার মধ্যে অর্থনৈতিক বিনিময়-সমঝোতা অন্তর্ভুক্ত ছিল। মাগরা রাজ্য মামলুক শাসনকালে চুক্তি ভঙ্গ করে মামলুকদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডারদের সাহায্য গ্রহণ করে। জাহের বাইবার্স বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে অভিযান চালায়, সেখানে মামলুক রাজা নির্ধারণ করা হয়। এখানে অনেক আরব গোত্র হিজরত করে এবং দেশের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা ব্যবহার করে ইসলাম প্রচার করতে থাকে। ফলে আরব গোত্রের হাতে ক্ষমতা আসে।
অনেক মুসলিম এবং আরব আলওয়ায় হিজরত করার পরও মুসলমানদের হাতে নিয়ন্ত্রণ আসতে অনেক সময় লেগেছে। অতঃপর আবির্ভাব ঘটে ফুনজের, যারা উমাইয়া বংশোদ্ভূত ফুনজ গোত্রের সাথে সম্পৃক্ত এবং আবদালাতের, যারা কাসিম বংশোদ্ভূত আবদুল্লাহ জেমার সাথে সাথে সম্পৃক্ত। তারা এটাকে বৃহৎ কেন্দ্রীয় ইসলামি রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল, যা ফুনজ রাজ্য নামে পরিচিত। ফুনজরা আবাদালাতকে মাগরা অঞ্চলে শাসনের দায়িত্ব অর্পণ করে, আর ফুনজ রাজত্ব করে আলওয়া অঞ্চলে। ফুনজ রাজ্য প্রশস্ত করতে থাকে এবং এতে বাজ্জা ও কুর্দফানের অধিকাংশ ভূমি শামিল করতে সক্ষম হয়। হাবশি খ্রিষ্টান ও তাদের মধ্যে যুদ্ধ বাধে। সেখানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ফুনজ বিজয় লাভ করে। আর ফুনজ রাজ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়, যা পরে মুহাম্মাদ আলির পরিবারের শাসনকালে মিশরের সাথে যুক্ত হয়েছিল। অতঃপর ইংরেজরা এসে সব দখল করে নেয়।
টিকাঃ
২৪. নীলনদ: আফ্রিকা মহাদেশের দীর্ঘতম নদ। বিশ্বের দীর্ঘতম নদও বলা হয় একে। যদিও ব্রাজিল দীর্ঘতম হিসেবে অ্যামাজন নদীকে দাবি করে। নীলনদের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৬৫০ কি. মি.। আফ্রিকায় মোট এগারোটি দেশ তথা তানজানিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, বুরুন্ডি, কঙ্গো, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, ইরিত্রিয়া, দক্ষিণ সুদান, সুদান ও মিশরে প্রবাহিত হচ্ছে নীলনদের পানি। তবে বিশাল মরুভূমি অঞ্চল সুদান ও মিশরের পানির মূল উৎস এই নদ বিধায় এ দুটি দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে নীলনদের নাম অধিক উচ্চারিত হয়। নীলনদের দুটি উপনদ রয়েছে: শ্বেত নীলনদ ও নীলাভ নীলনদ। শ্বেত নীলনদ দীর্ঘতম। এর উৎপত্তি আফ্রিকার মধ্যভাগের হ্রদ অঞ্চল থেকে এবং নীলাভ নীলনদের উৎপত্তি টানা হ্রদ থেকে যা ইথিওপিয়ায় অবস্থিত। সুদানের দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে শ্বেত নীলনদ এবং পূর্বাঞ্চল দিয়ে নীলাভ নীলনদ প্রবাহিত হয়ে সুদানের রাজধানী খার্তুমে এসে মিলিত হয়ে দেশটির উত্তরাঞ্চল দিয়ে মিশরের দিকে প্রবাহিত হয়েছে। মিশরের দক্ষিণাঞ্চল থেকে প্রায় দেড় হাজার কিলোমিটার অতিক্রম করে নীলনদ দেশটির উত্তরাঞ্চলে নদী মোহনায় বিশাল ব-দ্বীপ সৃষ্টি করে ভূমধ্যসাগরে পতিত হয়েছে। নীলনদের সম্পূর্ণ প্রবাহ মানচিত্র লিংক: https://bit.ly/3kgnTkC -সম্পাদক
📄 মিশরীয় শাসনামলে সুদান
মুহাম্মাদ আলির শাসনামলে মিশর আরবি সুদান অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। মিশরের বিবরণে আমরা এর কথা আলোচনা করেছি। খেদিভ ইসমাইলের যুগে সুদানের বিভিন্নমুখী অভিযান থেকে আমরা জানতে পেরেছি যে, তিনি সুদানকে অতিক্রম করে আরও সম্প্রসারণ করেছেন। যাতে নীলনদের উৎস, লোহিত সাগরের সমস্ত উপকূল, আফ্রিকান হর্ন ও ইথিওপিয়ার হারার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করতে পারে।
আফ্রিকায় মিশরের বিজয়গুলো এর চেয়েও বেশি ব্যাপক হতে পারত, যদি মিশরীয় সেনাবাহিনীতে দুইজন ইংরেজ অধিনায়ক না থাকত। তারা হলো স্যামুয়েল ও গর্ডন। মিশরীয়দের ধারাবাহিক বিজয়ে তারা বাধা সৃষ্টি করেছিল। জানজিবার গভর্নর মিশরের সুরক্ষায় থাকার আবেদন করলে অধিনায়ক গর্ডন বিষয়টি বাতিল করে দেয় এবং জানজিবারের গভর্নরকে মিশরের সুরক্ষায় না থাকার সতর্কবার্তা পাঠায়।
সুদানের মহান বিজেতা জুবাইর পাশাকে, এমনইভাবে তার পুত্র সুলাইমানকে বরখাস্ত করার ক্ষেত্রে গর্ডনের বড় ভূমিকা ছিল। এটা উল্লেখ্য যে, মিশরীয় সেনাবাহিনী আফ্রিকার এই অঞ্চলে প্রবেশ করেছিল; এ কারণে এখানে ইসলামের প্রসারে তাদের বড় অবদান ছিল। আমরা এ অঞ্চলের অধিকাংশ স্থানে এখনো ইসলামের আনুগত্য খুঁজে পাই।
সুদান ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের দ্বৈত শাসনের পূর্ব পর্যন্ত মিশরের অধীনে ছিল। আফ্রিকার মিশরের সম্পত্তি বিভক্ত ছিল ইংরেজ, ফ্রান্স, ল্যাটিন, ইথিওপিয়া ও বেলজিয়ামের মধ্যে। এগুলো নিয়ে আফ্রিকায় ইউরোপিয়ানদের দখলদারি অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে।