📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে স্প্যানিশ আক্রমণ

📄 ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে স্প্যানিশ আক্রমণ


৯২৭ হিজরিতে (১৫২১ খ্রিষ্টাব্দে) স্প্যানিশরা ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে আসে। ম্যাগেলানের নেতৃত্বে দখলদার বেশে তারা এ দেশে আসে এবং তারা ঘোষণা করে এ দেশের জনগণের জন্য খ্রিষ্টধর্ম বাধ্যতামূলক। এটি ছিল উত্তর দ্বীপে, দক্ষিণ দ্বীপে তারা তা করতে সক্ষম হয়নি। ম্যাগেলান সিবু দ্বীপের রাজার সাথে সমঝোতা করে যে, ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণের জন্য তারা স্পেনের পক্ষ সমর্থন করবে। এরপর শাসন করে তা একত্র করতে মনস্থ করে। কিন্তু মুসলমানরা একের পর এক তাদেরকে প্রতিহত করে এবং স্প্যানিশরা অস্ত্রসমৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দ্বীপপুঞ্জ থেকে তাড়িয়ে দেয়। ম্যাগেলান এ দ্বীপকে নিয়ন্ত্রণে আনতে অন্য পথ অনুসরণ করে। সে মুসলিম শাসক লাবু লাবুর কাছে গিয়ে বলে, আমি ঈসা মাসিহের নামে শপথ করে বলছি আপনি আত্মসমর্পণ করুন। আমরা শ্বেতাঙ্গ ও সভ্যতার ধারকবাহক। তাই আমরা আপনাদের চেয়ে এ দেশের শাসন পরিচালনার অধিক উপযুক্ত। লাবু লাবু তার কথা প্রত্যাখ্যান করে বললেন, নিশ্চয়ই ধর্ম কেবল আল্লাহর জন্য। আর আমি যে উপাস্যের ইবাদত করি, তিনি হলেন জাতিবর্ণনির্বিশেষে সমস্ত মানুষের উপাস্য। অতঃপর ম্যাগেলানকে তিনি নিজ হাতে হত্যা করেন। তার দলবলকে নিশ্চিহ্ন করে দেন। তার মরদেহ স্পেনে হস্তান্তর করতে অস্বীকার করেন। অতঃপর স্পেন ফিলিপাইন থেকে স্প্যানিশদেরকে প্রত্যাহার করে নিয়ে যায়। এ পর্যন্ত স্পেনকে অনেক লোকবল ও নৌপরিবহণ খোয়াতে হয়েছে। অতঃপর স্প্যানিশ ক্রুসেডাররা ফিলিপাইন দ্বীপপুঞ্জে আবার আক্রমণ শুরু করে। স্পেন সেখানে চারটা অভিযান চালায়, যার একটার নেতৃত্বে ছিল রুই লোপেজ। যাকে দ্বিতীয় ফিলিপ বলা হয়। যেহেতু এ চারটি অভিযান মুসলিম অধ্যুষিত মিন্দানাও দ্বীপে পরিচালিত হয়েছে, যেখান থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়েছিল, স্প্যানিশ ক্রুসেডাররা মুসলমানদের ওপর ক্রুসেডীয় বিদ্বেষ ছড়াচ্ছিল।

এরপর ৯৭৩ হিজরিতে (১৫৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) ফিলিপাইনের ওপর স্পেনের আক্রমণ আরও গুরুতর হয়। তারা দেশের জনগণকে খ্রিষ্টান বানানোর জন্য নীতি ঘোষণা করে। ফিলিপাইনের উত্তর দ্বীপপুঞ্জ তাদের সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়। কিন্তু মিন্দানাও দ্বীপ ও সোলো দ্বীপপুঞ্জের মতো দক্ষিণ দ্বীপগুলো দখল করতে ব্যর্থ হয়, যা মুসলমানরা শাসন করছিল। স্প্যানিশরা মুসলিমদের আন্দালুস শাসনকালের সময় থেকে তাদেরকে মুরু বলে, আরব ও বার্বারদের প্রথম পরিচয় মুসলিম।

স্প্যানিশরা তাদের দখল করা এলাকা আয়ত্তে রাখার জন্য জনগণকে খ্রিষ্টানধর্মে রূপান্তরিত করতে এবং মুসলমানদেরকে ধ্বংস করতে খুব জোর দিয়েছিল। একই সময়ে তারা জনগণের সাথে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে এবং তাদের ওপর কর্তৃত্ব করে। তাদের প্রতি জনগণের ঘৃণার কারণে দেশে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লব ছিল ১২৯০ হিজরি (১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দ) ও ১৩১৪ হিজরির (১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দের) বিপ্লব। এরপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাঁচ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিময়ে স্পেনের কাছ থেকে ফিলিপাইন কিনে নেয়। কেননা, আমেরিকানরা স্প্যানিশদের ঔপনিবেশিকতা থেকে পরিত্রাণ দেওয়ার সহায়তার ব্যাপারে অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য তারা স্প্যানিশদের তাড়িয়ে দেয় এবং প্যারিস চুক্তি অনুযায়ী ফিলিপাইন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বলে স্পেন স্বীকার করে নেয়।

ফিলিপাইন এ চুক্তি ভঙ্গ করে এবং ১৩১৯ হিজরিতে (১৯০১ খ্রিষ্টাব্দে) একটি বিদ্রোহ ঘোষণা করে, যা যুক্তরাষ্ট্র দমন করে ফেলে। ফিলিপাইনে এটি দমন করার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের নীতি অব্যাহত রাখে। তাদের এলাকাসমূহ ব্যাপকভাবে অবহেলা করতে থাকে, ফলে তথায় দারিদ্র্য, মূর্খতা ও দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

১৩৫৩ হিজরিতে (১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দে) ফিলিপাইন স্বাধীনতা অর্জন করে। ১৩৫৮ হিজরির (১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান আবার তা দখল করে নেয়। ফিলিপিনোদের সাথে মুসলমানরা ঔপনিবেশিক জাপানিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এতে ফিলিপিনোরা জাপানিদের হটাতে সক্ষম হয়। ১৩৬৫ হিজরিতে (১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে) ফিলিপিনোরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিছু সামরিক ঘাঁটি সেখানে চালু রাখে, যা মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নীতিকে সহায়তা করে, যাতে দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বিদ্যমান থাকে।

ঔপনিবেশিকদের সময়কার অজ্ঞতায় নিমজ্জিত অবস্থা থেকে উদ্ধার পেতে ফিলিপাইনের মুসলমানরা নিজেরাই উদ্বুদ্ধ হয়। সন্তানদের ইসলামি শিক্ষা দিতে এবং ইসলামি চেতনা বিস্তার করতে মাদরাসা ও সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করে।

রাষ্ট্রপতি মার্কোস তার সময়ে মুসলমানদের নির্মূল ও নিঃশেষ করে ফিলিপাইনকে ইহুদি ও খ্রিষ্টরাজ্যে পরিণত করার কাজ করে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে সে এটা করতে থাকে। মুসলমানদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টির জন্য, তাদের সম্পত্তি লুট করার জন্য এবং দেশ থেকে তাদেরকে বের করার জন্য। সে এর জন্য কয়েকটি বাহিনী গঠন করে। সবচেয়ে ভয়াবহ বাহিনী ছিল অক্টোপাস বাহিনী ও ইঁদুর বাহিনী; যাদের কাজ হলো মুসলমানদের জমি দখল করা। মুসলমানদের মধ্যে নিষ্ঠুর অপরাধ, হত্যা, ভাঙচুর, অপহরণ ও ঘর থেকে বের করে দেওয়া, যাতে মুসলমানরা জমি ছেড়ে চলে যায়।

তারপর ফিলিপাইনের ভূমিতে বসবাসের জন্য তাদের দ্বিতীয় ধাপটি আসে এবং তাদের জমিতে দেশের খ্রিষ্টানদের আবাসন গড়া ও খ্রিষ্টানদের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৩৯০ হিজরিতে (১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) এই কার্যক্রম শুরু হয়। ফিলিপাইন সরকার এদেরকে সাহায্য করেছিল। মুসলমানরা ফিলিপাইন সরকারের কাছে অভিযোগ দায়ের করলে তাতে সে কোনো কর্ণপাত করেনি। এতে তারা জিহাদ ছাড়া আর কোনো উপায় খুঁজে পায়নি।

এ পরিস্থিতিতে ১৩৯২ হিজরিতে (১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে) তারা মরো লিবারেশন ফ্রন্ট গঠন করেন। যাতে ফিলিপিনো খ্রিষ্টানদের দ্বারা পরিচালিত গণহত্যা ও যুদ্ধকে মুসলমানরা নিজেরাই প্রতিরোধ করতে পারে। এতেই ১৩৯২ হিজরিতে ফিলিপিনো সেনাবাহিনী ও মুজাহিদ বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। ফিলিপিনো সৈন্য সংখ্যা ও শক্তিতে অধিক ছিল। তাদের ইহুদিরা এবং যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্রের জোগান দিত। এদিকে মুজাহিদদের শুধু হালকা অস্ত্র ও ঈমানি জোর ছিল। তারা এর দ্বারাই শত্রুদের মোকাবিলা করে এবং তাদেরকে চরমভাবে পরাজিত করে। ফলে ফিলিপাইন সরকার মুসলমানদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 ত্রিপোলি সম্মেলন (১৩৯৭ হিজরি)

📄 ত্রিপোলি সম্মেলন (১৩৯৭ হিজরি)


ফিলিপাইনে মুসলমানদের সমস্যা সমাধানে ত্রিপোলি সমঝোতা চুক্তি হয় এবং এতে দক্ষিণ রাজ্যের মুসলমানরা স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। সম্মত হয়। চুক্তি সম্পাদনের পর এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, মার্কোস এ আন্তর্জাতিক চুক্তি লঙ্ঘন করে মুসলমানদের ওপর একটি নতুন হামলার প্রস্তুতির জন্য আলোচনায় অংশগ্রহণ করে। ফিলিপাইন সরকার ঘোষণা করে যে, আমরা মুসলমানদের সাথে যে চুক্তি করেছি তা প্রত্যাহার করে নিয়েছি। ফলে আগ্রাসী সরকারি বাহিনী ও মোরো লিবারেশন ফ্রন্টের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধ শুরু হয়। এতে মার্কস সৈন্যরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যাসহ মারাত্মক অপরাধ ঘটিয়েছিল। কিন্তু মুসলমানরা বীরত্বের সাথে ইসলামের শত্রুদের সাথে মোকাবিলা করে টিকে থাকে। এতে সেনাবাহিনীর সরঞ্জাম বিপুলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দেশে মার্কোসের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। মার্কোসের স্বৈরশাসনের বিরোধিতা শুরু হয় এবং এ সময় বিরোধী নেতা বেনিগনো অ্যাকুইনো নিহত হয়। এতে মার্কোসকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয় এবং সে ক্ষমতা ও দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়। ফলে বিরোধী দলের প্রয়াত নেতার স্ত্রী কোরাজন অ্যাকুইনোর প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। সে ঘোষণা করে যে, মুসলমানদের অধিকার প্রদান করবে। কিন্তু সেও সেরকম কিছু করে না; বরং যুদ্ধ অব্যাহত রাখে। এরপর ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ফিদেল রামোস ক্ষমতা গ্রহণ করে। ফিলিপাইন সরকার জনসংখ্যার কাঠামো পরিবর্তন করতে দক্ষিণ দ্বীপের দখলীকৃত স্থানগুলোতে উত্তর ফিলিপাইনের খ্রিষ্টানদের স্থানান্তর করতে কাজ করে। মিন্দানাও দ্বীপে খ্রিষ্টানদের আগমনের ফলে জনগণের শতকরা হারে ৫০% হয় খ্রিষ্টান। অতঃপর সে ফিলিপাইন সরকারের দখলীকৃত অংশগুলো থেকে মুসলমানদের বহিষ্কার করে।

দ্রষ্টব্য-ে مسلمانوں বিভক্ত করার জন্য সরকার কাজ করে। মোরো লিবারেশন ফ্রন্টের সাথে ১৪১৭ হিজরিতে (১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে) একটি চুক্তি হয় যে, মানুষ স্বায়ত্তশাসন চায় না, বরং ফিলিপাইন সরকারের অধীনে থাকতে চায়, এর ওপর দক্ষিণ দ্বীপে তিন বছর অন্তর একটি গণভোট দেওয়া হবে। খ্রিষ্টানদের চুক্তি ভঙ্গ করা এবং বিশ্বাসঘাতকতা করার অভিজ্ঞতার কারণে মোরো লিবারেশন ফ্রন্ট চুক্তি বাতিল করে। ফলে এখন পর্যন্ত ফিলিপাইন সরকার ও মুসলমানদের মধ্যে যুদ্ধ বিরাজমান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00