📄 ক্রুসেডীয় উপনিবেশবাদ
৯১৭ হিজরিতে (১৫১১ খ্রিষ্টাব্দে) পর্তুগিজরা ইন্দোনেশিয়ার মালাক্কা দখল করে তাকে ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জ দখলের ঘাঁটি বানায়। এদিকে স্প্যানিশরা প্রভাব বিস্তার করে ব্রুনাই দ্বীপ ও মালুকু দ্বীপপুঞ্জ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
সাধারণ প্রতিক্রিয়ায়, ক্রুসেডিয়ানদের দ্বারা দখলীকৃত অংশগুলোতে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে এবং তাদের ও মুসলমানদের মধ্যে প্রচণ্ড যুদ্ধ বেধে যায়।
📄 হল্যান্ড উপনিবেশিকতা
পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়লে ইংরেজ ও ডাচদের উত্থান ঘটে। এ সময় স্প্যানিশ ও পর্তুগিজ দখলীকৃত বিরাট এলাকা ডাচদের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এমনকি স্প্যানিশরা হল্যান্ডের অধিকৃত হয়ে যায়। স্পেনের রেখে যাওয়া এলাকাগুলো হল্যান্ড গ্রহণ করতে শুরু করে এবং পূর্বভারতের দ্বীপগুলোর মধ্য থেকে ছেড়ে যাওয়া এলাকাগুলোর মধ্যে যা তারা পছন্দ করে তাও। ডাচরা মুসলিমদেরকে এ ভ্রান্তিতে ফেলে দেয় যে, অত্যাচারী পর্তুগিজদের তাড়াতেই তাদের আগমন। হল্যান্ড পূর্বভারতের দ্বীপগুলোতে অবস্থানরত পর্তুগিজদের উচ্ছেদ করে দেয়। হল্যান্ড দ্বারা প্রতারিত মিত্ররা মুসলমানদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়। এ কারণে হল্যান্ড অন্য নীতিমালা অনুসরণ করতে থাকে। তারা দ্বীপে বাণিজ্যিক কোম্পানি গঠনের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করার নিমিত্তে ১০১১ হিজরিতে (১৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে) ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে। অতঃপর তারা দ্বীপপুঞ্জের মুসলিম রাজ্যের সাথে সরাসরি যুদ্ধ শুরু করে। তারা এখানে পরের রাজ্যের রাজত্ব নিয়ন্ত্রণ করে। তারা মুসলিমদের অনৈক্য-বিচ্ছিন্নতা ও দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে ফরাসিদের সাথে যুদ্ধ করার কারণে হল্যান্ডের কর্তৃত্ব দুর্বল হতে শুরু করে। ১২১০ হিজরিতে (১৭৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) ফরাসিরা তাদের দেশ দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। অতঃপর ইংল্যান্ড ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জে হল্যান্ড কোম্পানির ভান্ডার দখল করে নেয়। আর পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জের অধিকাংশ ফিরিয়ে দেবে যখন ফরাসিদের দুর্বলতা শুরু হলে হল্যান্ড তাদের থেকে মুক্ত হতে সক্ষম হয়। তাদের এবং ইংরেজদের মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। অতঃপর এ কথার ওপর সমঝোতা হয় যে, ব্রিটিশরা শ্রীলঙ্কা, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ, আমেরিকা মহাদেশের ওয়েস্ট ইন্ডিজ ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে হল্যান্ডের প্রধান প্রধানরা পূর্বভারতের দ্বীপগুলোতে চলে যাবে।
ডাচ কোম্পানির পরিবর্তে হল্যান্ড কর্তৃত্ব শুরু করে। ইন্দোনেশিয়ার মুসলিম রাজ্যসমূহের সাথে পুনরায় যুদ্ধ শুরু করে। তারা মুসলিম সুলতানদেরকে প্রতারিত করার জন্য কেন্দ্রে তাদেরকে বহাল রেখে দেশের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর হল্যান্ড দেশের ওপর তার শক্তিকে দৃঢ় করে এবং মুসলমানদের ওপর চাপ বাড়িয়ে দেয়। হল্যান্ড উপনিবেশের বিরুদ্ধে মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিভিন্ন কমিটি সংঘ এবং ইসলামি আন্দোলনের দল গঠন করে।
ইসলামি আন্দোলন হল্যান্ড ঔপনিবেশিকতার জন্য বড় হুমকি হয়ে ওঠে। এতে হল্যান্ড কর্তৃপক্ষ মুসলিম জাগরণের বিরুদ্ধে নতুন নীতিমালা গ্রহণ করে। তারা মুসলিমদের আন্দোলনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। যেমন : নাস্তিক্যবাদী কম্যুনিস্ট প্রবণতাকে উৎসাহিত করা, যাতে তাদের ও মুসলমানদের দ্বন্দ্বকে ইসলাম ও কম্যুনিজমের মাঝে স্থানান্তর করতে পারে। এভাবে তারা ফিতনা সৃষ্টির জন্য উৎসাহিত করে এবং এমন কিছু করে যা ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে দায়মুক্ত রাখে। যাতে ঔপনিবেশিকতা থেকে মুক্ত হওয়ার বিপরীতে মুসলমানদেরকে অন্য দিকে ব্যস্ত রাখতে পারে। ভ্রান্ত মতবাদকে পৃষ্ঠপোষকতা দানে তারা ইংরেজদের অনুসরণ করে। তাই তারা কাদিয়ানিদেরকে সহযোগিতা করে যারা ঔপনিবেশিকদের কল্যাণে কাজ করে।
📄 জাপানি দখলদারি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৩৬১ হিজরিতে (১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে) জাপান ইন্দোনেশিয়া দখল করে। মুসলমানদের প্রতিরোধের কারণে মিত্ররা জাপানকে পরাজিত করে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে। চুক্তির আলোকে মিত্রদের আশা বাস্তবায়ন হয় এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপানের পরাজয় ঘটে। এতে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতা পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হয়। কিন্তু ঔপনিবেশিকতা মুসলমানদের স্বাধীনতাকে আটকে রাখে। তদুপরি ১৩৬৪ হিজরিতে (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্দোনেশিয়ায় আহমাদ সুকার্নো তার নেতৃত্বে একটি জোটবদ্ধ সরকার গঠন করার ঘোষণা দেয়। তবে মিত্ররা নিজেদের অবস্থান টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের নেতৃত্ব জাপানি সৈনিকদের হাতে তুলে দেয় এবং মিত্র সৈনিকরা তাদের জায়গা দখল করে।
📄 হল্যান্ড থেকে স্বাধীনতা
ব্রিটিশদের শক্তি ও সহযোগিতায় হল্যান্ডের সৈন্যবাহিনী ইন্দোনেশিয়ায় প্রবেশ করে। ফলে ১৩৬৪ হিজরিতে (১৯৪৫ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তায় মুসলমানদের একটি সম্মেলন হয়। তারা ইসলামের ছায়াতলে খ্রিষ্টানদের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতে একমত হয়। ইন্দোনেশিয়ার মুসলমানরা একটি মজলিশে শুরা গঠন করে, যা মাশুমি নামে পরিচিত। তারা হল্যান্ড ও তার সহযোগী বাহিনীকে প্রতিহত করতে থাকে। তখন হল্যান্ড প্রতিনিধিদের সাথে একটি অধিবেশন হয়। হল্যান্ড সর্বদা ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের ওপর ভিত্তি করে সরকারের কর্তৃত্বকে স্বীকৃতি দেয়। সময়ের ব্যবধানে তারা চুক্তি ভঙ্গ করে মুসলমানদের রক্ত ঝড়ায়। ফলে ডাচদের বিরুদ্ধে ইসলামের প্রতিরোধ তীব্রতর হয়।
অবশেষে ১৩৬৯ হিজরিতে তারা (১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।