📄 পর্তুগাল
৯১৫ হিজরিতে (১৫০৯ খ্রিষ্টাব্দে) পর্তুগিজরা মালাক্কা দখলের চেষ্টা করে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়। এরপর তারা আবারও তা দখলের চেষ্টা করে। আক্রমণের আগে তাদের কমান্ডার অলবুকাক তাদেরকে বলেছিল, 'প্রথম কথা হলো, এটা একটি মহান সেবা, যা আমরা পালনকর্তার কাছে পেশ করতে পারব, যখন এই দেশ থেকে আমরা মুসলমানদের বিতাড়িত করব এবং মুহাম্মাদি বাহিনীর এ উত্থান থামিয়ে দিতে পারব, যা আর কখনো জেগে উঠতে পারবে না। এমন একটি ফলাফলের জন্য আমি খুবই উৎসাহী। যখন আমরা বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হব, তখন তারা সম্পূর্ণ ভারত আমাদের জন্য ছেড়ে যাবে। মুসলমানদের অধিকাংশ বা বলা যায় সবাই-ই এ দেশে ব্যবসার মাধ্যমে জীবনযাপন করে। এতে তারা ধনী হয়ে গেছে এবং প্রচুর সম্পদের অধিকারী হয়েছে। মালাক্কা তাদের ইসলামের মূলকেন্দ্র। প্রতি বছর তারা তাদের দেশে মশলা ও ওষুধ আমদানি করে থাকে; অথচ আমরা তাদেরকে বাধা দিতে পারিনি। যদি আমরা এই প্রাচীন বাজার-ঘাট থেকে তাদেরকে বঞ্চিত করতে পারি, তাহলে ব্যবসা পরিচালনা করার মতো এ অঞ্চলে তাদের আর কোনো বন্দর বা উপযুক্ত স্টেশন অবশিষ্ট থাকবে না। আমি তোমাদেরকে আশ্বাস দিচ্ছি যে, যদি মালাক্কাকে মুক্ত করতে সক্ষম হই তাহলে আমাদের হাতে কায়রো ভেঙে চুরমার হবে। সর্বশেষ মক্কাও ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।
এরপর ভেনিসকে তাদের ব্যবসায়ীদের পর্তুগালে পাঠাতে হবে, যদি তারা মশলা কিনতে চায়।'
৯১৭ হিজরিতে (১৫১১ খ্রিষ্টাব্দে) পর্তুগাল মালাক্কা দখল করতে সক্ষম হয়। এতে ইউরোপের সর্বত্র আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে। কৃতজ্ঞতাস্বরূপ পোপকে পবিত্র ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার জন্য ইউরোপে আমন্ত্রণ জানানো হয়। পর্তুগিজরা মুসলমানদের ওপর প্রতিশোধ গ্রহণ করে এবং হাজার হাজার মুসলিমকে হত্যা করে। এ সময় মালয়ের সর্বত্র পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। বরং জনসাধারণের সাথে খারাপ ও অমানবিক আচরণের প্রতিক্রিয়ায় ইসলাম আরও প্রসার লাভ করে। সাধারণ জনতা দখলদার নৃশংস খ্রিষ্টান বাহিনীকে প্রতিরোধ করে। পরে তাদের মিশন মালাক্কা থেকে সুমাত্রা দ্বীপের আশিয়ায় স্থানান্তরিত হয়।
📄 হল্যান্ড
স্প্যানিশরা ৯৮৯ হিজরিতে (১৫৮১ খ্রিষ্টাব্দে) পর্তুগাল দখল করে। তখন হল্যান্ড পর্তুগালের অনেক উপনিবেশ দখল করে নেয়। এর মধ্যে ছিল মালয়, জাভা, সুমাত্রা ইত্যাদি। তারা ১০৫২ হিজরিতে (১৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে) মালাক্কা থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করতে সক্ষম হয়। তারা সেখানে ভারতের ব্রিটিশ নীতি অনুসরণ করে ১০১১ হিজরিতে (১৬০৩ খ্রিষ্টাব্দে) ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠন করে। তবে মুসলিম নিধনে তারা পর্তুগিজ পদ্ধতি অনুসরণ করে।
📄 ইংল্যান্ড
নেদারল্যান্ডস সাম্রাজ্যের দুর্বলতা শুরু হয়ে গিয়েছিল, বিশেষ করে ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধের কারণে। তাই ইংল্যান্ড এটাকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে ১০২৩ হিজরিতে (১৬১৪ খ্রিষ্টাব্দে) পূর্বভারতে আসে এবং ১২০৭ হিজরিতে (১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) মালাক্কা তাদের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। পরে ১২৩৩ হিজরিতে (১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে) তা নেদারল্যান্ডকে ফিরিয়ে দেয়। অতঃপর ১২৩৯ হিজরিতে (১৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে) হল্যান্ডের সাথে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এতে হল্যান্ড মালাক্কা ও মালয় উপদ্বীপে ইংল্যান্ডের কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়। তারা ব্রিটিশ প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে জাতীয়তাবাদ ও ধর্মীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া রাজ্য চালানোর অধিকার পায়।
**দ্রষ্টব্য**
ব্যাপারে আরও প্রভাব বিস্তার করেছে মালয়, সাবাহ, ব্রুনাই, সারওয়াক ও অন্যান্য রাজ্যের সুলতানদের ওপর।
এ অঞ্চলগুলো ব্রিটিশ বলয়ে পরিণত হয় এবং ইংরেজরা জনসংখ্যা কাঠামো পরিবর্তনের পদ্ধতি গ্রহণ করে। মালয়ে ও অন্যান্য প্রদেশে হিন্দু ও চাইনিজদেরকে অভিবাসনের জন্য ডাকে। শর্ত থাকে অমুসলিম হতে হবে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও চাইনিজ অভিভাসন বৃদ্ধির লক্ষ্যে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটায়। এতে মুসলিম জনসংখ্যা হ্রাসে একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়ে, একপর্যায়ে মুসলমানদের সংখ্যা ৫২%-এ নেমে আসে। রাজ্যে খ্রিষ্ট ধর্মপ্রচার, অমুসলিমদের দেশে আনয়ন ও রাষ্ট্রের উচ্চপদে স্থান দেওয়াসহ বিভিন্ন কর্মতৎপরতা আরও বাড়তে থাকে।
📄 জাপান
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অবস্থিত মালয়েশিয়ার আংশিক দখল করে নেয়। অতঃপর জাপানের পরাজয়ের পর ব্রিটিশ দখলদাররা আবার ফিরে আসে। ১৩৭৭ হিজরিতে (১৯৫৮ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীন হওয়া পর্যন্ত ব্রিটিশরা মালয়ে ইউনিয়ন গঠন করার কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করে। ব্রিটিশ কমনওয়েলথের অধীনে রাজা এনুডি বার্তুয়ানের নেতৃত্বে একটি রাজ্য গঠন করে। ব্রুনাই দ্বীপের কিছু অংশ ইংল্যান্ডের অধীনে থাকে। অথচ সারওয়াক, সিঙ্গাপুর, উত্তর ব্রুনাই ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীন হয়ে ১৩৮২-১৩৮৩ হিজরি (১৯৫৪-১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মালয়েশিয়া ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকে। অতঃপর ১৩৮৫ হিজরিতে (১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দে) সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়ান ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যায় এবং সে বছরই স্বাধীনতা লাভ করে এবং ব্রিটিশ রুলস অনুসারে মুসলমানদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে ১৬%-এ নিয়ে আসে। ব্রিটিশরা ব্রুনাইকে নিয়ন্ত্রণ করে। পরে ১৪০৪ হিজরিতে (১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে) স্বাধীনতা লাভ করে এবং সম্পূর্ণ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে গঠিত হয়। এর রাজা একজন মুসলমান এবং বিশ্বের ধনী ব্যক্তি ছিলেন।
সুকার্নো ছিল ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট। ব্রুনাইয়ের উত্তরাঞ্চলীয় দ্বীপকে বিচ্ছিন্ন করে মালয়েশিয়ার সাথে একীভূত করার ব্যাপারে সে বিরোধিতা করে, কারণ সে ব্রুনাইকে ইন্দোনেশিয়ার অংশ মনে করত। উত্তর ব্রুনাইয়ের প্রতি ফিলিপাইনেরও আকাঙ্ক্ষা ছিল। কিন্তু ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া উভয় রাজ্যের প্রধানদের মতামত অতি দ্রুত পরিবর্তিত হয়। তারা মালয়েশীয় ইউনিয়নের স্বীকৃতি দেয়। তারপর ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ফিলিপাইন ও থাইল্যান্ড মিলে ১৩৮৭ হিজরিতে (১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় জাতিসংস্থা (আসিয়ান) গঠিত হয়।
মালয়েশিয়া ইউনিয়নের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হলো টেংকু আবদুর রহমান। দেশের মধ্যে দাঙ্গা বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৩৮৯ হিজরিতে (১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) সে পদত্যাগ করে। উক্ত পদে আসে টান আবদুর রাজ্জাক। তারপর তার জায়গায় আসে হুসাইন বিন আওন জাফর। অতঃপর ১৪০১ হিজরিতে (১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে) তার জায়গায় আসে সুরি মাহাথির মুহাম্মাদ।