📄 মালয়েশিয়া
হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে প্রধানত ব্যবসার যোগসূত্রে মালয়েশিয়ায় ইসলাম পৌঁছে। পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে (ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও অন্যান্য) ইসলামের প্রচার-প্রসারের কাজ সবচেয়ে বেশি করেছে মালাক্কা রাজ্য। এ রাজ্যের রাজা হিজরি সপ্তম শতাব্দীতে ইসলাম গ্রহণ করেন। ইসলাম প্রচারে এটি এ অঞ্চলের প্রথম ইসলামি রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করে। বরং রাজ্যটি পূর্বভারতীয় দ্বীপপুঞ্জে ইসলাম প্রচার-প্রসারের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে দাঁড়ায়।
মালাক্কা রাজ্যটি একসময় থাইল্যান্ডের অধীনে ছিল এবং স্বায়ত্তশাসনের বিনিময়ে তাকে কর দিয়ে চলত। এর কিছুদিনের মধ্যেই ৮০৮ হিজরিতে (১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দে) চেং হো নামক একজন চীনা মুসলিম আমির এ রাজ্যে আগমন করেন। এখানে এসে তিনি থাইল্যান্ডের যেকোনো হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলেন। অতঃপর রাজ্যটির গভর্নর থাইল্যান্ড থেকে এর স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে ইসলামের বিস্তার ও বিজয় লাভের জন্য সৈন্য প্রস্তুত করেন।
মালাক্কার শাসনব্যবস্থায় লাগাতার সাতজন শাসক আসেন। তাদের মধ্যে সর্বাধিক বিখ্যাত ছিলেন মনসুর পাশা। তিনি তুর্কিদের সম্মানে 'পাশা' উপাধি গ্রহণ করেন। কিন্তু উসমানি সুলতানদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে এবং তাদেরকে খিলাফতের প্রতিনিধি মনে করাতে তিনি 'সুলতান' উপাধি গ্রহণ করেননি। তিনি বার্মার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত মালয় উপদ্বীপ বিজয় করতে সক্ষম হন। তার রাজ্য সুমাত্রা থেকে ব্রুনাই পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তার শাসনামলে মালয়ের বেশিরভাগ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে।
📄 পাতানি সমস্যা মোকাবিলায় মালয়েশিয়ার নীতি
পাত্তানি মুজাহিদরা ১৩৮৯ হিজরিতে (১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) সামরিক শক্তি অর্জন করতে শুরু করে। আর মালয়েশিয়ায় অবস্থিত তাদের ভাইয়েরা তাদেরকে সাহায্য করতে থাকে। পাত্তানিরা কখনো কখনো মালয়েশিয়ার কেলান্টন রাজ্যে আশ্রয় গ্রহণ করে। কারণ, সেখানকার বেশিরভাগ লোক ইসলামি পার্টিকে সমর্থন করে। আর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী টেংকু আবদুর রহমান পাত্তানিদেরকে সাহায্য করা বাতিল করে দেয়। কেননা, তার মা ছিল থাইল্যান্ডের অধিবাসী।
এরপর এলো টান আবদুর রাজ্জাক। সে থাইল্যান্ডে মুজাহিদদের আন্দোলন দমন করার ঘোষণা দিয়ে মুসলমানদেরকে বিস্মিত করে। থাইল্যান্ড ও মালয়েশিয়ার যৌথ সহযোগিতায় শাসনব্যবস্থা শুরু হয়। যেহেতু কম্যুনিস্টদের বিরোধিতার কারণে মালয়েশিয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হয়; আর পাত্তানি মুজাহিদদের কারণে থাইল্যান্ডের কষ্ট হয়। এমতাবস্থায় থাইল্যান্ড কম্যুনিস্টদের সহযোগিতা করা বন্ধ করে দেয় এবং মালয়েশিয়া মুজাহিদদের সহযোগিতা করা বন্ধ করে দেয়। অতএব, বিরোধী দল ও মুজাহিদদের প্রভাব সমানভাবে কমতে থাকে।
মুজাহিদদের প্রতি সমর্থন থাকায় ১৩৯৭ হিজরিতে মালয়েশিয়ান ন্যাশনাল ফ্রন্ট থেকে ইসলামি দলকে বহিষ্কার করা হয়। থাইরা তখন থাই মুজাহিদদের দমনের উদ্যোগ গ্রহণ করে।
**দ্রষ্টব্য**
মালয়েশিয়ায় মোট জনসংখ্যার ৫৬% মালয়, ৩২% চীনা বংশোদ্ভূত ও ১০% হিন্দুদের মাঝে পরস্পর ঝগড়া লেগেই থাকে।
📄 ইন্দোচীন
বর্তমানে মায়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস ইত্যাদি দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব করে ইন্দোচীন। এ সকল এলাকায় দাওয়াতের মাধ্যমে ইসলাম প্রবেশ করে। কিন্তু ব্যাপকভাবে প্রসারিত না হলেও কিছু কিছু রাজ্যে, যেমন আরাকানে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে।
মায়ানমারে দাওয়াত ও বাণিজ্যিক পথে ইসলাম পৌঁছে। মায়ানমারকে তখন বার্মা বলা হতো। পশ্চিম বার্মায় একটি রাজ্য ছিল, তার নাম আরাকান। মুসলিম বাংলার প্রতিবেশি হওয়ার কারণে ইসলামের অন্তর্ভুক্ত হয়ে বার্মার বাকি অংশেও তা বিস্তৃত হয়। কিন্তু বৌদ্ধরা ইসলামের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কারণ, ইসলাম প্রসার লাভ করলে বৌদ্ধ পুরোহিতদের স্বার্থহানি ঘটবে। সম্পদশালী ও সরকারি টাকার সাহায্যে পুরোহিতরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। বৌদ্ধদের শক্তিশালী প্রতিরোধের কারণে ইসলাম স্বল্প পরিসরে প্রসারিত হয়। চীনের পথ ধরে ৬৮৬ হিজরিতে (১২৮৭ খ্রিষ্টাব্দে) তাতার মুসলিমরা বার্মায় আক্রমণ করে এবং অত্যাচারী রাজাকে ক্ষমতাচ্যুত করে সাধারণ মানুষকে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা দেয়। তখন কিছু লোক ইসলাম গ্রহণ করে।
করে। অতঃপর আওরঙ্গজেবের ভাই সুজা ভারত থেকে পালিয়ে অনুগতদের সহ বার্মায় প্রবেশ করে জনসাধারণের সাথে মিশ্রিত হয়ে গেলে ইসলাম প্রসারিত হতে থাকে। যখন বার্মাকে কম্যুনিস্টরা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল তখন তারা সেখানে মুসলমানদের ওপর আক্রমণ ও নির্যাতন চালায়। বার্মিজ জনগণের মধ্যে প্রায় ৭% মুসলমান। তারা চরম নির্যাতন ও দারিদ্র্যের মাঝে বসবাস করে; চরম ইসলামবিদ্বেষী বৌদ্ধদের শাসন ও কম্যুনিস্টদের শাসন উভয়ই তাদের সাথে এক আচরণ করে।
📄 চম্পা (Campa)
চম্পা হলো ভিয়েতনামের মধ্যবর্তী একটি রাজ্য। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে দাওয়াত ও ব্যবসার মাধ্যমে এখানে ইসলাম পৌঁছে। এরপর কিছুদিনের মধ্যেই একজন আরব ব্যবসায়ীর সাথে চম্পার রাজা তার কন্যাকে বিয়ে দেন। রাজ্যের প্রত্যেক এলাকায় তিনি ইসলাম প্রসার করেন। ৮৭৫ হিজরিতে (১৪৭১ খ্রিষ্টাব্দে) পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহের বিরাট অংশ নিজ রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করতে পেরেছেন। এরপর চম্পা উত্তর ভিয়েতনাম সাম্রাজ্যের সাথে ক্রমাগত যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ১২৩৮ হিজরি, ১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দে ভিয়েতনাম চম্পার মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালায় এবং চম্পার সমস্ত অঞ্চল দখল করে নেয়।
**৪০ দ্রষ্টব্য**
মুসলিম জনতা গণহত্যা থেকে বাঁচার জন্য আশেপাশের দেশে পালিয়ে যায়। বড় একটি অংশ কম্বোডিয়ায় এবং অন্যরা লাওস, ভারত, চীন ও মালয়ে হিজরত করে। ভিয়েতনামে থাকা মুসলমানরা গণহত্যা ও কঠিন নিপীড়নের শিকার হয়। অবশেষে ফরাসিরা ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওসে আক্রমণ করে, কিন্তু গণহত্যার শিকার মুসলমানদের ইসলামের প্রচারাভিযান থেমে যায়নি। মুসলমানদের ওপর গণহত্যা চালাতে বৌদ্ধরা ইসলামের শত্রুদের আহ্বান জানায়। ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার কম্যুনিস্টরা তাদের সাথে অংশগ্রহণ করে। তারা মুসলমানদের সাথে চরম অসদাচরণ করে এবং বড় বড় মসজিদ ও মাদরাসাগুলো আয়ত্তে নিয়ে নেয়। উত্তর ভিয়েতনামের রাজধানী হ্যানয়ের মসজিদ এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের রাজধানী সায়গুনোর মসজিদ-এ দুটি ছাড়া ভিয়েতনামে আর কোনো মসজিদ অবশিষ্ট রাখেনি। এমনকি সরকারের অনুমতি ছাড়া জুমার নামাজ আদায় করা বন্ধ হয়। জুমার নামাজে এলে তাদের নাম-ঠিকানা রেজিস্ট্রিভুক্ত করতে বাধ্য করা হয়।
**দ্রষ্টব্য**
এ ছাড়াও কম্বোডিয়ায় মুসলমানদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গণহত্যা, গা শিউরে ওঠার মতো লোমহর্ষক ঘটনা, অপমানকর আচরণ ও কঠিন অবমাননার শিকার হয় তারা। এমতাবস্থায় যারা প্রতিবেশী রাজ্যে পালিয়ে যেতে চেয়েছিল, পথিমধ্যে তাদের অনেকে মৃত্যুবরণ করে। কমিউনিস্টদের পৃষ্ঠপোষকতা ও ক্ষোভ মুসলমানদের নির্মূল ও পরাজিত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। ভিয়েতনামে মুসলমানদের সংখ্যা ৩%, লাওসে কয়েক হাজারের বেশি হবে না আর কম্বোডিয়ায় ৭.১৪%। ফলে শীর্ষস্থানীয় মুসলমানরা তাশামিবায় চলে আসতে থাকে। তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার নীতিতে সবাই এক থাকে। যদিও তাদের নীতির ধরণ ভিন্ন। মুসলিমনিধন আক্রমণ চলতে থাকে। নিধনযজ্ঞ ও মিডিয়ার লুকোচুরি চলতে থাকে। ইন্দোচীনের কমিউনিস্টরা হত্যা ও অপদস্থ করা অব্যাহত রাখে।