📄 কাবার্দিনো বলকারিয়া
এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতান্ত্রিক দেশ। এটি রাশিয়ান ইউনিয়নের সাথে যুক্ত। এখানে দুটি গোষ্ঠীর বসবাস। এগুলো হচ্ছে সার্কাসিয়ান বংশোদ্ভূত কাবার্ডিয়ান, আর তুর্কি বংশোদ্ভূত বুলগেরিয়ান। স্টালিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ ও বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে বুলগেরিয়াকে অভিযুক্ত করে তাদেরকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করে। অবশেষে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাদের অনেকে দেশে ফিরে আসে।
📄 কারাচাই-চের্কেসিয়া
এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতান্ত্রিক দেশ। এটি রাশিয়ান ইউনিয়নের সাথে যুক্ত। এখানে দুটি গোষ্ঠীর বসবাস। একটি হলো তুর্কি বংশোদ্ভূত কারাচাই, আরেকটি হলো সার্কাস। স্টালিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের পক্ষে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার অভিযোগ ও বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে কারাচাইকে অভিযুক্ত করে তাদেরকে সাইবেরিয়ার বনাঞ্চলে নির্বাসিত করে। অবশেষে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হলে দেশে ফিরে আসে।
📄 আদিগিয়া
এটি হলো সার্কাসদের স্বায়ত্তশাসিত একটি প্রদেশ এবং রাশিয়ান ইউনিয়নের সাথে যুক্ত।
📄 চেচনিয়া-ইঙ্গুশেতিয়া
এটি রাশিয়ান ইউনিয়নের একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র। এখানে দুটি জাতির বসবাস। একটি হলো চেচনিয়ান অন্যটি ইন্সুশেতিয়ান। উসমানি শাসনামলে তারা ইসলাম গ্রহণ করে। চেচনিয়া ছিল রাশিয়ান উপনিবেশিকদের বিরুদ্ধে সোচ্চার। রাশিয়ার বিরুদ্ধে শেখ শামিলের যুদ্ধে তাদের বড় ভূমিকা ছিল। রাশিয়ানদের এ দেশটি দখলে নিতে দশ বছর লেগে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় চেচেনরা বিশ্বাসঘাতকতা ও জার্মানদের সহযোগিতার কারণে অভিযুক্ত হয়েছিল। ফলে তাদেরকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দেওয়া হয়। অবশেষে স্টালিনের মৃত্যুর পর তারা স্বদেশে ফিরে আসে।
এসব ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাই, ইতিহাসের বিবর্তনে রাশিয়া কর্তৃক দুর্ভোগের শিকার ককেশীয় ও তাতার জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও পর্যন্ত রাশিয়ার প্রতি রয়েছে তীব্র ক্ষোভ। তাদের মধ্যে চেচেনরা সবচেয়ে বেশি ঘৃণা ও শত্রুতা পোষণ করত রাশিয়ানদের প্রতি। ফলে ১৪১১ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সময় চেচেনরা সুযোগের সদ্ব্যবহার করে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। অথচ তখন ইঙ্গুতেশিয়ানরা রাশিয়ার নৃশংসতার ভয়ে তাদের অনুগতই থেকে যায়। এমনইভাবে রাশিয়ার স্বায়ত্তশাসিত মোঙ্গলিয়া ও ককেশাসসহ অন্যান্য প্রদেশও রাশিয়ানদের অনুগামীই থেকে যায়।
চেচনিয়ার স্বাধীনতাকে রাশিয়া স্বীকৃতি দেয়নি। তাই তারা প্রাথমিকভাবে বিরোধীদেরকে সাহায্য করার প্রস্তাব করে এবং রাজ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য তাদেরকে অস্ত্রের জোগান দেয়। আর এটাকে রাজ্য নিয়ন্ত্রণের উপায় মনে করে রাশিয়া। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। কারণ, জওহার দুদায়েভের নেতৃত্বে চেচেনরা বিরোধী দলকে ভেঙে দেয়। এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলতসিন গভীর হতাশা ও ক্ষোভে জর্জরিত হয়। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে চেচনিয়া যদি স্বাধীনতা লাভ করে, তাহলে ককেশাস ও মঙ্গোলিয়ার জনগণও রাশিয়া থেকে স্বাধীনতা অর্জনে উৎসাহিত হবে। এজন্য ১৪১৪ হিজরিতে (১৯৯৪ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়ান বাহিনী চেচনিয়ায় আক্রমণ চালায় এবং রাজধানী গ্রোজনিতে প্রবেশের চেষ্টা করে। কিন্তু রাশিয়ার সৈন্যরা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয় এবং গ্রোজনির রাস্তায় রাস্তায় তাদের লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়।
ব্যর্থ হামলার পর বরিস ইয়েলতসিনের বিরোধীরা হইচই শুরু করে দেয়। তারা অভিযোগ করে যে, তার স্বেচ্ছাচারিতা ও ব্যর্থ অভিযানের কারণে রাশিয়ান সেনাবাহিনীকে বিশাল মূল্য দিতে হচ্ছে। এতৎসত্ত্বেও ইলেতসিন তাদের সব অভিযোগ-আপত্তি উপেক্ষা করে গ্রোজনি আক্রমণ করার নির্দেশ দেয়। রাশিয়ার সেনাবাহিনী এবার গ্রোজনিতে আক্রমণ করে সমস্ত ভবন ও স্থাপনা ধ্বংস করে ফেলে। এতে শহরটি প্রজ্বলিত আগুনের শহরে পরিণত হয়। তাদের প্রতিশোধের আগুন থেকে কোনো জায়গাই বাকি ছিল না, যেখান থেকে কোনো প্রতিরোধ আসতে পারে। তারা গ্রোজনির পেট্রোলের খনিগুলোতেও আগুন লাগিয়ে দেয়। ধ্বংসাত্মক আক্রমণের পর রাশিয়ানরা শহরটি নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হয়। প্রচুর মানুষ মারা যায়; অথচ এতে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপই ছিল না। একদিকে তারা মুসলমানদেরকে হত্যা করতে থাকে, অন্যদিকে তারা তাদের দেশের দিকে অগ্রসর হয়।
চেচনিয়া শক্তভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং চেচেন প্রেসিডেন্ট জওহর দুদায়েভ যুদ্ধকে রাশিয়ার অভ্যন্তরে স্থানান্তর করে মরণপন অপারেশন পরিচালনা করার জন্য হুঁশিয়ারি প্রদান করেন। তিনি বলেন, 'যদি চেচেন জনগণকে মৃত্যুগ্রহণ ও রুশ উপনিবেশ হিসেবে বেঁচে থাকার মধ্য হতে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে রাশিয়ার দাসত্বের উপর তারা মৃত্যুকেই প্রাধান্য দেবে।'
রাশিয়ানরা এ হুঁশিয়ারির প্রতি কোনো কর্ণপাত করেনি। ইতিমধ্যে দুর্ধর্ষ গেরিলা কমান্ডার শামিল বাসায়েভ আবির্ভূত হলেন। রাশিয়ানরা চেচনিয়া আক্রমণকালে তিনি তাদের পুরো ইউনিট ধ্বংস করে দেন। তিনি চেচনিয়ার ওপর রাশিয়ার নৃশংস আক্রমণ থামাতে এবং রাশিয়ার ওপর চাপ প্রয়োগ করতে দাগিস্তানের একটি হাসপাতাল দখল করেন। কিন্তু রাশিয়ানরা হাসপাতালের রোগীদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিল না। তারা তাতে প্রবেশ করতে চেষ্টা করে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে তারা প্রবেশ করতে ব্যর্থ হয়। চেচেন মুজাহিদরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে তাদের আক্রমণ অব্যাহত রেখে রুশদেরকে ক্লান্ত করে দেয়। হামলার প্রচণ্ডতায় রাশিয়ার এক সামরিক কমান্ডার বলেছিল যে, আফগানিস্তানে যুদ্ধ করা চেচনিয়ার তুলনায় একটি পিকনিকের মতো।
চেচেন প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওপর এক আক্রমণে চেচেনের নেতা জাওহার দুদায়েভ শাহাদাতবরণ করেন। এতে চেচনিয়ার জনগণ গভীরভাবে দুঃখিত হয়। এমনকি বিশ্বের সকল প্রান্তের সমস্ত মুসলমানও এ সংবাদে শোকাহত হয়। রাশিয়ানদের ধারণা ছিল, দুদায়েভের মৃত্যুর ফলে তাদের অভিযান সফল হয়েছে এবং চেচনিয়ার জনগণ এখন পরাজয়ের সাদা পতাকা উত্তোলন করবে। কিন্তু দুদায়েভের শাহাদাতের খবর ছড়িয়ে দিয়ে রাশিয়া চরম ভুল করেছিল। মুজাহিদগণ রাশিয়ার দখল থেকে চেচনিয়াকে মুক্ত করতে যখন বদ্ধপরিকর, ঠিক সে সময় তাঁর শাহাদাতের খবরে তারা আরও কঠিনভাবে রাশিয়ানদের ওপর আক্রমণ শুরু করে এবং রাশিয়ান সৈন্যদের লাশ একের পর এক রাশিয়ায় ফিরতে থাকে।
চেচনিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আসলান মাসখাদভ মুজাহিদ আক্রমণের মাধ্যমে রুশ বাহিনীকে পরাস্ত করেন। আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকেন। এর বেশিরভাগের নেতৃত্বে ছিলেন অভিজ্ঞ কমান্ডার শামিল বাসায়েভ। এতে রাশিয়ানরা কঠিনভাবে বিপদের মধ্যে পড়ে যায়। রুশ বাহিনীর ওপর চেচেন প্রতিরোধ আক্রমণ অব্যাহত থাকে। ১৪১৬ হিজরিতে (১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে) তারা গ্রোজনি দখল করে এবং এর ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। মুজাহিদদের আক্রমণে সহস্রাধিক রাশিয়ান সৈন্য নিহত হয়। তখন রাশিয়ানরা পুরাপুরি উপলব্ধি করতে পারে যে, চেচনিয়ায় তাদের অবস্থান বিশ্ববাসী ও নিজেদের দেশবাসীর কাছে লাঞ্ছনাকর ও কলঙ্কজনক এক অধ্যায় সৃষ্টি করেছে।
**দ্রষ্টব্য**
১৪২২ হিজরিতে (২০০২ খ্রিষ্টাব্দে) তারা চেচনিয়া ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে মুজাহিদদের সাথে একমত হয় এবং চেচনিয়ার স্বাধীনতার ব্যাপারে একটি গণভোটের আয়োজন করা হয়। চেচেন সন্তানদের দ্বারা রাষ্ট্র গঠিত হয়। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হয়। এতে আসলান মুসখাদাভ বিজয়ী হন। চেচনিয়ার স্বাধীনতার চিন্তা রদ করতে রাশিয়া নতুন পন্থা অবলম্বন করে। পুনরায় তারা চেচনিয়ায় আসে এবং চেচনিয়া দখল করে নেয়। কিন্তু চেচেন জাতি রাশিয়া থেকে পূর্ণ স্বাধীনতার জন্য দাঁড়াতে দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ থাকে এবং দৃঢ়তার সাথে আক্রমণকারীদের মোকাবিলা করে। ২০০৫ সালের ৮ মার্চ রাশিয়ানরা আসলান মুখাদেভকে হত্যা করে। মুজাহিদগণ তার স্থলে সাইদ লায়িভকে নির্বাচিত করেন, যিনি লাগাতার জিহাদ চালিয়ে যাওয়ার শপথ করেছিলেন।