📄 ককেশাস জনগণের প্রতিরোধ
ককেশাসে রাশিয়ানদের আগমন এবং উসমানি ও পারসিয়ানদের প্রত্যাবর্তনের ফলে এখানকার মুসলমানদের একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তারা ১২৪১ হিজরিতে (১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে) দাগিস্তানে সরকার গঠন করে। যাদের অধিকাংশ ছিল আলম। শেখ শামিল ককেশাসে রাশিয়ান ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেন। তিনি শেখ মুহাম্মাদ আমিনকে সার্কাস রাজ্যে প্রেরণ করেন। মুসলিম আলেমগণ জনগণকে ক্রুসেডার ঔপনিবেশিকদের প্রতিরোধ করার আহ্বান জানান। তখন মুসলমানরা রাশিয়ানদের বিপর্যস্ত করতে শুরু করল। বিশেষ করে এ অঞ্চলের মানুষ পাহাড়ি প্রকৃতির কারণে কঠিন ও খুবই শক্তিশালী ছিল। তারা যুদ্ধে রাশিয়ানদের সমুচিত শিক্ষা দিতে থাকে। বিশেষ করে ওই সময় রাশিয়ানরা ক্রিমিয়ানদের সাথে যুদ্ধে জড়িত ছিল।
ক্রিমিয়ার সাথে যুদ্ধ যখন শেষ হয় তখন ককেশাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার জন্য তিন লক্ষেরও বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়। ১২৮১ হিজরিতে (১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়ানরা শেখ শামিলকে বন্দি করে ও দেশের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালায় এবং সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ করতে থাকে। বিশেষ করে দেশের জনসাধারণের মাঝে তারা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। যারা পূর্বেই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। এ ছাড়াও মুসলমানদের প্রতি ক্রুসেডারদের স্থায়ী বিদ্বেষ ছিল। অনেক সার্কাসিয়ান, চেচেন, দাগিস্তানি ও অন্যান্য বন্দিরা রাশিয়ান উপনিবেশিকদের নির্মম অত্যাচারে বিভিন্ন মুসলিম দেশে হিজরত করে। উসমানিরা তাদের অনেককে স্বাগত জানায় এবং ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করে। যাতে তারা রণাঙ্গনে ইসলামের শত্রুদের সাথে বীরবিক্রমে কঠিনভাবে মোকাবিলা করার কৌশল অবলম্বন করে।
১২৯৫ হিজরিতে (১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) বার্লিন চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপের সীমানা থেকে উসমানি সৈন্য ও ককেশাসের জনগণকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়। ক্রুসেডারদের নির্যাতন ও প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে উসমানি সাম্রাজ্যের অনেকেই শাম ও ইরাকে আবাসন গড়ে। এবং রুশ উপনিবেশিক ককেশাসে যারা বাকি ছিল তারা চরম নির্যাতন ভোগ করে।
১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়ায় কম্যুনিস্টরা ক্ষমতা গ্রহণ করলে তারা মুসলমানদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে। তারা দেশকে ছোট ছোট প্রদেশে ভাগ করে। যাতে ককেশাসের গোত্রগুলো বিভক্ত হয়ে যায়। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় তখন বেশিরভাগ ককেশিয়ান জনগণ রাশিয়ান হিংস্র দখলদারদের তুলনায় জার্মানির দখলদারদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। কিছু সংখ্যক লোক জার্মানদেরকে সহযোগিতাও করে। কিন্তু জার্মানরা যুদ্ধে হেরে যায় ও রাশিয়ানরা আবারও তা দখল করে নেয়।
এ সময় রাশিয়ানরা বেশিরভাগ ককেশিয়ানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিযুক্ত করে। চেচনিয়া ও অন্যান্য জাতির মতো অনেককেই সাইবেরিয়া ও কাজাখস্তানে দেশান্তর করে। অনুরূপ ব্যবহার করেছিল তারা তাতারদের সাথে। অত্যাচারী স্টালিন মুসলমানদের ওপর ঘৃণা ও ক্ষোভের বিষ ঢেলে দেয়। সে সময় নির্বিচারে মুসলমানদের হত্যা করা হয়, যার সংখ্যা এগারো মিলিয়নে পৌঁছে। অনেকেই সাইবেরিয়ার অজ্ঞাত স্থানে হারিয়ে যায় আর নির্বাসিত অল্পকিছু লোক নিজ দেশে ফিরতে সক্ষম হয়। আর অনেকে তুরস্কে ও অন্যান্য ইসলামি দেশে হিজরত করে। জনসংখ্যা কাঠামো পরিবর্তন করে দিতে এতদঞ্চলে রুশ নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ঘটায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রজাতন্ত্র ইউক্রেন যেমনটি করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত ককেশাসের প্রজাতন্ত্র ও প্রদেশগুলো নিম্নে দেওয়া হলো:
📄 দাগিস্তান
এটি পাহাড়ি দেশ হিসেবে পরিচিত। এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র, যা এখন পর্যন্ত রাশিয়ান ইউনিয়নের অনুসরণ করছে। তার রাজধানী হলো মাহাজকিল্লা (ম্যাকাচালা)। আর এখানেই রয়েছে ডারবেন্ড শহর।
📄 উত্তর ওসেটিয়া
এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র। এর রাজধানী ব্লাদিকাকজ। রাশিয়া ওসেটিয়াকে উত্তর ও দক্ষিণে বিভক্ত করার পর উত্তর অংশ রাশিয়ার সাথে ও দক্ষিণ অংশ জর্জিয়ার সাথে যুক্ত করা হয়। উত্তর ওসেটিয়ায় ইসলাম ছড়িয়ে পড়লে রাশিয়া এ ভেবে আতঙ্কিত হয়ে পড়ে যে, কোনোদিন হয়তো ওসেটিয়ার অবশিষ্টাংশেও ইসলাম ছড়িয়ে পড়বে। এজন্য দক্ষিণ ওসেটিয়াকে ভাগ করে খ্রিষ্টান অধ্যুষিত জর্জিয়ার সাথে মিলিয়ে দেয়।
📄 কাবার্দিনো বলকারিয়া
এটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতান্ত্রিক দেশ। এটি রাশিয়ান ইউনিয়নের সাথে যুক্ত। এখানে দুটি গোষ্ঠীর বসবাস। এগুলো হচ্ছে সার্কাসিয়ান বংশোদ্ভূত কাবার্ডিয়ান, আর তুর্কি বংশোদ্ভূত বুলগেরিয়ান। স্টালিন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানদের সমর্থন দেওয়ার অভিযোগ ও বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে বুলগেরিয়াকে অভিযুক্ত করে তাদেরকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করে। অবশেষে তারা নির্দোষ প্রমাণিত হলে তাদের অনেকে দেশে ফিরে আসে।