📄 মোঙ্গল
ককেশাসের সমস্ত অংশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মোঙ্গলীয় শাসন। যা ছিল জোচি বিন চেঙ্গিস খান পরিবারের অধীনে। মোঙ্গলরা ইসলামে প্রবেশ করলেও তারা ছিল এ বিষয়ে আনাড়ি। এজন্য তারা ককেশাসে ইসলাম প্রচারের জন্য কোনো কাজ করেনি। তারা ককেশাস সীমান্তে ইলখানি রাজ্যের সাথে যুদ্ধ করে অনেকাংশই ককেশাসের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
📄 অটোমান ও পারস্য
উসমানিরা ককেশাস ও ক্রিমিয়ার ওপর তাদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল; বিশেষ করে যখন রাশিয়ান হুমকি তীব্রতর হয় এবং তাতার রাজ্য মুসলমানদেরকে গ্রাস করে তখন উসমানিরা তাদেরকে থামিয়ে দেয়। এদিকে তারা পারস্যের সাথে ককেশাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত ছিল আর সাফাভিরা ককেশাসের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে ফেলেছিল। অতঃপর উসমানিরা সাফাভিদের দখল করা অংশ উদ্ধার করে। সাফাভি শিয়া সম্প্রদায়গুলো কখনো কখনো শিয়া মতবাদ গ্রহণের জন্য জনগণকে বাধ্য করেছে। বিশেষ করে তারা আজারবাইজানের লোকদেরকে বাধ্য করতে সক্ষম হয়েছিল। অতঃপর উসমানিরা তাদের সাম্রাজ্য থেকে শিয়া মতবাদের উত্থান বন্ধ করে দেয়।
সেখানে এমন কিছু গোত্র ছিল, যারা সার্কাসিয়ান ও অন্যান্য গোত্রের মতো তখনও ইসলামে প্রবেশ করেনি। উসমানি যুগে ককেশাসের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করে। অতঃপর কুবার্দি, আদিগে, আবখাজ এবং অস্ট্রিন, চেচনিয়ান, ইঙ্গুশগোত্রীয় লোকেরা ইসলাম গ্রহণ করে। আর্মেনিয়ার অধিকাংশ লোক খ্রিষ্টান ছিল। আর ককেশাসের মুসলমানদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল সুন্নি। উসমানিরা তাদের কাছে নিয়ে আসার জন্য কাজ করছিল। এতে ককেশাসবাসী উসমানিদের প্রতি নমনীয় হয়। তারা উসমানিদেরকে তারা রাশিয়ার খ্রিষ্টান ও পারস্যের শিয়াদের ওপর প্রাধান্য দেয়।
পারসিয়ানরা তাদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে। নিজেদের রাজ্য মনে করে তারা ককেশাসের অধিকাংশ অঞ্চল দখল করে নেয়। একপর্যায়ে উসমানিরা তাদের থেকে তা দখল করে। এ সময়ে রাশিয়ানরা ককেশাসের দিকে নজর দিতে শুরু করে। কারণ, তারা এটাকে তাদের সাথে মিলিয়ে নিতে পারলে পারস্য ও উসমানিদের সামনে এ অঞ্চলটি রুশদের পক্ষে শক্তিশালী একটি দুর্গ হয়ে দাঁড়াবে। অন্যদিকে যারা তাদের মতাদর্শী ও ধর্মের অনুসারী ছিল এবং যাদেরকে রাশিয়া নিজেদের প্রজা মনে করত তাদেরকে কিরগিজ ও আর্মেনিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। অতঃপর রাশিয়ানরা ককেশাসের মরু অঞ্চলে পৌঁছে তার আশেপাশের এলাকা দখল করে নেয়।
পারসিয়ানরা ককেশাসের অধিকাংশ এলাকা উসমানিদের থেকে উদ্ধার করে। একসময় সাফাভি পারসিকরা দুর্বল হতে শুরু করে। পরে মির মুহাম্মাদ আফগানি সাফাভিদের রাজ্য দখল করতে আরম্ভ করে। রাশিয়ানরা এটাকে সুযোগ মনে করে দাগিস্তান দখল করে নেয়। এ অবস্থা দেখে উসমানিরা দ্রুত আর্মেনিয়া ও জর্জিয়াকে তাদের সাথে সংযুক্ত করে নেয়।
উসমানিরা রাশিয়ার গ্রেট পিটারকে হুমকি দেয় যে, ককেশাসে কোনোপ্রকার আগ্রাসন চালালে তাতে উসমানিদের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ ঘোষণা করা হবে। সাফাভিদের শেষ শাসক দ্বিতীয় তাহমাস্প রাশিয়ানদেরকে দাগিস্তান ও শিরভান দিতে বাধ্য হয়। আর উসমানিদের জন্য ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় জর্জিয়া এবং পারস্যের অন্যান্য অংশ। ককেশাসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উসমানি, রাশিয়ান ও পারসিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়।
📄 রাশিয়ান উপনিবেশ
উসমানীয় ও পারসিকদের শক্তি দুর্বল হতে থাকে। ১১৫২ হিজরিতে (১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দে) বেলগ্রেড চুক্তিতে উসমানিরা কাবাদিনো রাজ্যকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়। রাশিয়ানরা কাবাদিনো ও ককেশাসের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মিশন সহজ করতে পূর্বোক্ত চুক্তিটি করেছিল। রাশিয়ানরা ককেশাসে হস্তক্ষেপ করে ও তা অধিগ্রহণ করে। পারসিয়ান ও উসমানিদের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিটি বিজয়ে ককেশাসে একটি করে নতুন অংশ সংযুক্ত হয়।
📄 ককেশাস জনগণের প্রতিরোধ
ককেশাসে রাশিয়ানদের আগমন এবং উসমানি ও পারসিয়ানদের প্রত্যাবর্তনের ফলে এখানকার মুসলমানদের একমাত্র আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তারা ১২৪১ হিজরিতে (১৮২৬ খ্রিষ্টাব্দে) দাগিস্তানে সরকার গঠন করে। যাদের অধিকাংশ ছিল আলম। শেখ শামিল ককেশাসে রাশিয়ান ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধে নেতৃত্ব দেন। তিনি শেখ মুহাম্মাদ আমিনকে সার্কাস রাজ্যে প্রেরণ করেন। মুসলিম আলেমগণ জনগণকে ক্রুসেডার ঔপনিবেশিকদের প্রতিরোধ করার আহ্বান জানান। তখন মুসলমানরা রাশিয়ানদের বিপর্যস্ত করতে শুরু করল। বিশেষ করে এ অঞ্চলের মানুষ পাহাড়ি প্রকৃতির কারণে কঠিন ও খুবই শক্তিশালী ছিল। তারা যুদ্ধে রাশিয়ানদের সমুচিত শিক্ষা দিতে থাকে। বিশেষ করে ওই সময় রাশিয়ানরা ক্রিমিয়ানদের সাথে যুদ্ধে জড়িত ছিল।
ক্রিমিয়ার সাথে যুদ্ধ যখন শেষ হয় তখন ককেশাসের ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার জন্য তিন লক্ষেরও বেশি সেনা মোতায়েন করা হয়। ১২৮১ হিজরিতে (১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়ানরা শেখ শামিলকে বন্দি করে ও দেশের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে ভয়াবহ নির্যাতন চালায় এবং সবচেয়ে জঘন্য অপরাধ করতে থাকে। বিশেষ করে দেশের জনসাধারণের মাঝে তারা বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়। যারা পূর্বেই শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছিল। এ ছাড়াও মুসলমানদের প্রতি ক্রুসেডারদের স্থায়ী বিদ্বেষ ছিল। অনেক সার্কাসিয়ান, চেচেন, দাগিস্তানি ও অন্যান্য বন্দিরা রাশিয়ান উপনিবেশিকদের নির্মম অত্যাচারে বিভিন্ন মুসলিম দেশে হিজরত করে। উসমানিরা তাদের অনেককে স্বাগত জানায় এবং ইউরোপের যুদ্ধক্ষেত্রে মোতায়েন করে। যাতে তারা রণাঙ্গনে ইসলামের শত্রুদের সাথে বীরবিক্রমে কঠিনভাবে মোকাবিলা করার কৌশল অবলম্বন করে।
১২৯৫ হিজরিতে (১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) বার্লিন চুক্তি অনুযায়ী ইউরোপের সীমানা থেকে উসমানি সৈন্য ও ককেশাসের জনগণকে সরিয়ে নিতে বাধ্য করা হয়। ক্রুসেডারদের নির্যাতন ও প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে উসমানি সাম্রাজ্যের অনেকেই শাম ও ইরাকে আবাসন গড়ে। এবং রুশ উপনিবেশিক ককেশাসে যারা বাকি ছিল তারা চরম নির্যাতন ভোগ করে।
১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে) রাশিয়ায় কম্যুনিস্টরা ক্ষমতা গ্রহণ করলে তারা মুসলমানদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করে। তারা দেশকে ছোট ছোট প্রদেশে ভাগ করে। যাতে ককেশাসের গোত্রগুলো বিভক্ত হয়ে যায়। যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয় তখন বেশিরভাগ ককেশিয়ান জনগণ রাশিয়ান হিংস্র দখলদারদের তুলনায় জার্মানির দখলদারদেরকে অগ্রাধিকার দেয়। কিছু সংখ্যক লোক জার্মানদেরকে সহযোগিতাও করে। কিন্তু জার্মানরা যুদ্ধে হেরে যায় ও রাশিয়ানরা আবারও তা দখল করে নেয়।
এ সময় রাশিয়ানরা বেশিরভাগ ককেশিয়ানকে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিযুক্ত করে। চেচনিয়া ও অন্যান্য জাতির মতো অনেককেই সাইবেরিয়া ও কাজাখস্তানে দেশান্তর করে। অনুরূপ ব্যবহার করেছিল তারা তাতারদের সাথে। অত্যাচারী স্টালিন মুসলমানদের ওপর ঘৃণা ও ক্ষোভের বিষ ঢেলে দেয়। সে সময় নির্বিচারে মুসলমানদের হত্যা করা হয়, যার সংখ্যা এগারো মিলিয়নে পৌঁছে। অনেকেই সাইবেরিয়ার অজ্ঞাত স্থানে হারিয়ে যায় আর নির্বাসিত অল্পকিছু লোক নিজ দেশে ফিরতে সক্ষম হয়। আর অনেকে তুরস্কে ও অন্যান্য ইসলামি দেশে হিজরত করে। জনসংখ্যা কাঠামো পরিবর্তন করে দিতে এতদঞ্চলে রুশ নাগরিকদের অনুপ্রবেশ ঘটায়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও প্রজাতন্ত্র ইউক্রেন যেমনটি করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে স্বায়ত্তশাসিত ককেশাসের প্রজাতন্ত্র ও প্রদেশগুলো নিম্নে দেওয়া হলো: