📄 আলবেনিয়া
উসমানি সুলতান দ্বিতীয় মুরাদের আমলে আলবেনিয়া বিজিত হয়। সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের আমল পর্যন্ত ইস্কান্দার বেকের বিদ্রোহ-আন্দোলন অব্যাহত থাকার পরও আলবেনিয়া ভূখণ্ডে উসমানিদের কর্তৃত্ব টিকে থাকে। এতদঞ্চলে উসমানিরা স্থিতিশীল হয়। তারপর মেসিডোনিয়া ও বলকানের অন্যান্য ভূখণ্ড মিলে পূর্ব রোমেলি রাষ্ট্র গঠিত হয়। পূর্ব রোমেলিও উসমানি শাসনের অধীনে থেকে যায়। তারপর প্রথম বলকান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। উসমানি সাম্রাজ্য পরাজিত হয়। আলবেনিয়া উসমানিদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। গ্রিক ও সার্বিয়ার লোভাতুর দৃষ্টি পড়ে আলবেনিয়ার ওপর। গ্রিক ও সার্বিয়ানরা আলবেনিয়ার অনেক অঞ্চল দখল করে নেয়। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। বর্তমানে যে ভূখণ্ডজুড়ে আলবেনিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে, সেই ভূখণ্ড দখল করে ইতালি। তারপর অক্ষশক্তি পরাজিত হয়। ইতালি ছিল অক্ষশক্তির অন্যতম রাষ্ট্র। ইউরোপ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সামরিক শক্তিকে ভাগ করে ফেলে। আলবেনিয়া পড়ে রাশিয়ার ভাগে। রাশিয়া আলবেনিয়াকে ওয়ারশ চুক্তিতে ঢুকিয়ে দেয়। তারপর সমাজতন্ত্র কায়েম করে আলবেনিয়ায়। উসমানি শাসনামলে অধিকাংশ আলবেনিয়ান ইসলাম গ্রহণ করে। এজন্য ইউরোপ আলবেনিয়াকে বিভক্ত করার জন্য উঠেপড়ে লাগে। এদিকে আলবেনিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর আগ্রহ বাড়তে থাকে। উসমানি শাসনামলের আয়তনের তুলনায় এক-তৃতীয়াংশে কমে আসে আলবেনিয়ার আয়তন। তাই আলবেনিয়ার পতাকায় দুই মাথা বিশিষ্ট ঈগলের ছবি খচিত। একটি মাথা ডান দিকে ফেরানো, অন্যটি বাম দিকে। যা গ্রিক ও সার্বিয়া কর্তৃক দখলীকৃত আলবেনিয়ান ভূখণ্ডের প্রতি ইঙ্গিত করছে।
আলবেনিয়ার অধিকাংশ জনগণ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও কম্যুনিস্ট শাসন ইসলামি কর্মকাণ্ডের ওপর সংকীর্ণতা আরোপ করে। মুসলিমবিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয় আলবেনিয়াকে। ইউরোপ আলবেনিয়াকে সবচেয়ে দরিদ্র ইউরোপিয়ান দেশে পরিণত করে।
১৪০৯ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) ওয়ারশ চুক্তি ভঙ্গ হওয়ার পর আলবেনিয়া মুসলিমদের জন্য উন্মুক্ত হয়। আলবেনিয়া ইসলামি সম্মেলন সংস্থাতে যোগ দেয়। এই সংস্থা স্বাধীন রাষ্ট্রগুলোকে সদস্য করে গণতান্ত্রিকদের হাতে তুলে দেয়। ইউরোপিয়ানরা আলবেনিয়ায় স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে শুরু করে। মূলত এই প্রচেষ্টা ছিল বিশ্বের নানা দেশে চলতে থাকা মুসলিম নিধনেরই একটি অংশ। স্বয়ং ক্রুসেডার ইউরোপ কর্তৃক নৃশংসতম অপরাধ ঘটিয়ে বসনিয়াকে বিভক্ত করার পর ইউরোপিয়ান বাহিনী বসনিয়ায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে নেয়।
ইউরোপিয়ান অর্থবিনিয়োগ সংস্থা আলবেনিয়ার প্রতি মনোযোগী হয়। এই সংস্থার মাধ্যমে আলবেনিয়ার দরিদ্র জনগণকে প্রতারণা করে। জনগণ মনে করতে থাকে, এই সংস্থায় অর্থসম্পদ বিনিয়োগ করলে তাদের দীর্ঘস্থায়ী দারিদ্র্য দূর হবে। ইউরোপিয়ান সংস্থা তাদেরকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল, অর্থ বিনিয়োগ করলে লাভের ঢল নামবে। ইউরোপিয়ান অর্থবিনিয়োগ সংস্থা আলবেনিয়ান সঞ্চয়কারীদের টাকা স্টক এক্সচেঞ্জে বিনিয়োগ করে। তারপর ইউরোপিয়ান ক্রুসেড-পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে তার সব টাকা খুইয়ে বসে।
এতে স্বর্বস্ব বিনিয়োগকারী আলবেনিয়ান জনগণ উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আলবেনিয়া সরকারের কাছে জবাবদিহিতা দাবি করে। আলবেনিয়ায় বিশৃঙ্খলা ও বিভক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে আলবেনিয়ান বিদ্রোহীদেরকে অস্ত্র সরবরাহ করে ইউরোপিয়ান সামরিক বাহিনী। বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে আলবেনিয়াতে। প্রশাসন নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। আলবেনিয়ানরা তাদের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা হারিয়েছে এবং নতুন সরকার গঠনের জন্য নির্বাচনও পরিচালনা করতে হবে—এই অজুহাতে উদ্ভূত বিশৃঙ্খলার সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইউরোপ পুলিশরূপী সামরিক বাহিনী প্রেরণ করে আলবেনিয়াতে।
৪১-দ্রষ্টব্য-সে এভাবে খ্রিষ্টান ইউরোপিয়ানরা আলবেনিয়ায় পা রাখে এবং আলবেনিয়া ও ইউরোপের সকল মুসলিমকে ধ্বংস করার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে আলবেনিয়ায় অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে শুরু করে। নির্বাচনে কম্যুনিস্টরা জয়ী হলে ইউরোপিয়ানরা আলবেনিয়া ও সারা বিশ্বে ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধকারী হিসেবে প্রসিদ্ধ সমাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রত্যাবর্তনকেই প্রাধান্য দেয়।
📄 যুগোশ্লাভিয়া
যুগোস্লাভিয়া বলতে দক্ষিণ স্লাভিক উদ্দেশ্য। কয়েকটি জনগোষ্ঠী এই ভূখণ্ডে অবস্থান করে। তারা হলো সার্বিয়ান, ক্রোয়েশিয়ান, বসনিয়ান, (বসনিয়া ও কুমান গোত্রগুলো তাদের মাতৃভূমি ত্যাগ করে ভলগা নদীর অববাহিকায় অভিবাসী হয় এবং বলকানের স্থায়ী নাগরিক হয়ে যায়) ম্যাকডোনিয়ান, আলবেনিয়ান, স্লোভেনিয়ান ও মন্টেনিগ্রিন।
সার্বিয়া উসমানিদের থেকে স্বায়ত্তশাসন পাওয়ার পর পুরোপুরি স্বাধীন হওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। সেই সাথে উসমানি ভূখণ্ডে তাদের সীমানা সম্প্রসারিত করার চেষ্টাও করতে থাকে। তারপর যখন সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো উসমানিদের থেকে পুরোপুরি স্বাধীনতা লাভ করে, তখন তারা আরও বেশি উসমানি ভূমি দখল করার চেষ্টা করতে শুরু করে। এতে প্রথম বলকান যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে এবং সত্যি সত্যিই সার্বিয়া, মন্টেনিগ্রো ও তাদের মিত্রশক্তিগুলো মিলে উসমানিদেরকে বুলগেরিয়া, রোমানিয়া ও গ্রিস থেকে; অর্থাৎ পূর্ব রোমেলি রাষ্ট্র থেকে এবং বলকান ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদ করতে সক্ষম হয়। বাকি থাকে কেবল ইস্তাম্বুল।
তারপর ম্যাকডোনিয়াকে মিত্র রাষ্ট্রসমূহের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার জন্য সংঘটিত হয় দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ। সার্বিয়া ম্যাকডোনিয়ার ২৭% লাভ করে।
সে সময়ে বসনিয়া, হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া, স্লোভেনিয়া ও দালমাতিয়ার উপকূলীয় অঞ্চলগুলো ছিল অস্ট্রিয়ার শাসনাধীন। আর সার্বিয়া আলবেনিয়ান ভূখণ্ডে লাগাতার আক্রমণ করে কসোভো, সানজাক (১৮) ও অন্যান্য আলবেনিয়ান অধ্যুষিত অঞ্চল দখল করে নিয়েছিল।
সারাজেভোয় অস্ট্রিয়া সম্রাটের ক্রাউন প্রিন্স হত্যাকাণ্ডে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। সার্বিয়াকে হত্যার জন্য দায়ী করা হয়। অস্ট্রিয়া, জার্মানি ও উসমানি সাম্রাজ্য মিলে গঠিত হয় অক্ষশক্তি। এরই মাঝে রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইতালি মিলে গঠিত হয় মিত্রশক্তি। সার্বিয়াও যুদ্ধে প্রবেশ করে মিত্রশক্তির পক্ষ নেয়। যুদ্ধে মিত্রশক্তি জয় লাভ করার পর বসনিয়া, হার্জেগোভিনা, ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়াকে সার্বিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে তারা উপযুক্ত পুরস্কার দেয়।
অস্ট্রিয়া অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়; সমুদ্রে তাদের কোনো দখল বাকি থাকে না। অস্ট্রিয়ান দখলদারি দেশত্যাগে বাধ্য করা কিংবা হত্যার মাধ্যমে বসনিয়ায় মুসলিমদের হার কমিয়ে দেয়। তারপর সার্বিয়ানরা মুসলিম নিপীড়ন ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যেতে থাকে। এরই মাঝে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সার্বিয়া এবারও মিত্রপক্ষের কাতারে দাঁড়ায়। সার্বিয়া জার্মানদের দখলে চলে যায়। জার্মানি সত্তাগতভাবেই সার্বিয়া ও মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ এবং ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়ার প্রতি ঘনিষ্ঠতা লালন করে। কারণ, সার্বিয়া ছিল অর্থোডক্স খ্রিষ্টান, আর ক্রোয়েশিয়া ছিল ক্যাথলিক খ্রিষ্টান। তাদের আকিদা-বিশ্বাস ছিল অধিকাংশ জার্মানের মতো।
যুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হওয়ার পর রাশিয়ান বাহিনী জার্মানদেরকে সার্বিয়া থেকে বিতাড়িত করে। তারপর রাশিয়া নিজেও সার্বিয়া ত্যাগ করে। রাশিয়া মনে করেছিল, উসমানিদের আমলে কিংবা বিশ্বযুদ্ধের সময়ে রাশিয়া সার্বিয়াকে যে ঐতিহাসিক সাহায্য করেছে, সেই সাহায্য সার্বিয়াকে ওয়ারশ চুক্তিতে অংশগ্রহণ করতে উদ্বুদ্ধ করবে। কিন্তু সার্বিয়া তাদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে ওয়ারশ চুক্তিতে অংশগ্রহণ করে না। এই ওয়ারশ চুক্তিকে মনে করা হতো মিত্রদেশগুলোতে রাশিয়ান দখলদারি গোপনের এক প্রতারণা। তারপর যুগোস্লাভিয়া প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হয়। সার্বিয়ানদের প্রাধান্য না দেওয়ার ব্যাপারে জনগণকে অনুপ্রাণিত করার জন্য 'যুগোস্লাভিয়া' নামটি নির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা ছিল বিপরীত। কূটনৈতিক পরিমণ্ডলে ও সামরিক বাহিনীতে ৮০% ছিল সার্বিয়ানরা। কোনো মুসলিমকে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার অনুমতি দেওয়া হতো না।
জোসেফ ব্রোজ টিটোর নেতৃত্বে যুগোস্লাভিয়ায় কম্যুনিজম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরই সার্বিয়ানরা মুসলিমদের প্রতি বিদ্বেষ উগড়ে দেয়। তারা সারাজেভোতে তিন হাজার এবং বসনিয়ার তুলজা নগরীতে হাজার হাজার মুসলিমকে হত্যা করে। এই গণহত্যায় প্রায় ষাট হাজার মুসলিমকে হত্যা করে সার্বিয়া। এই জঘন্য গণহত্যার পর নিহতদের বসনিয়ার ভলগা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। নিহতদের আধিক্যে ভলগার পানি লাল বর্ণ ধারণ করে।
ক্রোয়েশিয়ার মুফতিকে হত্যা করা হয়। মেসিডোনিয়ার সার্বিয়ান শাসনাধীন অঞ্চলে অনেক মুসলিম নেতাকর্মীকে ফাঁসি দেওয়ার আদেশ দেওয়া হয়। যুগোস্লাভিয়ার নানা প্রান্তে অনেক নেতাকর্মীকে ফাঁসি দেওয়া হয়। অনেক মসজিদ ধ্বংস করা হয়। যে বেলগ্রেড শহরে প্রায় ২৭০টি মসজিদ ছিল, তার অধিকাংশই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। বাকিগুলো নাইটক্লাব কিংবা আস্তাবলে পরিণত হয়। পুরো বেলগ্রেডে একটিমাত্র মসজিদ টিকে থাকে। ইসলামি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদরাসা ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়। অভিবাসী চুক্তি হয় যুগোস্লাভিয়া ও তুরস্কের মাঝে। ফলে লক্ষ লক্ষ মুসলিম যুগোস্লাভিয়া থেকে তুরস্কে চলে আসে। যুগোস্লাভিয়াকে ছয়টি ফেডারেল প্রজাতন্ত্রে ভাগ করা হয়। প্রজাতন্ত্রগুলো এই :
১. সার্বিয়া : দুটি স্বায়ত্তশাসিত ভূখণ্ডজুড়ে সার্বিয়া গঠিত হয়েছিল। একটি ভোজভোডিনা, যার রাজধানীর নাম নোভিসাদ। আর অপরটি কসোভো, যার রাজধানী ক্রিস্টিনা।
২. ক্রোয়েশিয়া (ক্রোয়েশিয়া অর্থ: ক্যাথলিক)। ক্রোয়েশিয়ার রাজধানী জাগরেব।
৩. বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা: সারাজেভো এই দুই রাষ্ট্রের রাজধানী।
৪. মেসিডোনিয়া: মেসিডোনিয়ার রাজধানীর নাম স্কোপজে।
৫. স্লোভেনিয়া: এর রাজধানী লুবজানা।
৬. মন্টেনিগ্রো: মন্টেনিগ্রোর রাজধানী পোডগোরিকা।
বসনিয়ার বেশকিছু অঞ্চল দখল হয়ে যায়। ক্রোয়েশিয়া, মন্টেনিগ্রো ও সার্বিয়া বসনিয়ার অঞ্চলগুলো নিজেদের সীমানাভুক্ত করে নেয়। ঠিক এই সময়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার জনসংখ্যার কাঠামো পাল্টে দেওয়ার জন্য সার্বিয়ান ও ক্রোয়েশিয়ান নাগরিকরা স্রোতের মতো আসতে শুরু করে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনাতে। ফিলিস্তিন যুদ্ধে আরবদের সাথে একদল বসনিয়ান মুজাহিদ অংশগ্রহণ করে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় ইসলামি আন্দোলন শুরু হয়। সার্বিয়া শক্ত হাতে এই আন্দোলনের মোকাবিলা করে। ১৪০১ হিজরিতে (১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে) কম্যুনিস্ট সরকার শাসনব্যবস্থা পাল্টে দেওয়ার অভিযোগে বসনিয়ার তরুণ মুসলিম আন্দোলনের সদস্যদের গ্রেফতার করে জেলে ঢুকিয়ে দেয়। তাদের মাঝে আলি ইজ্জত বেগোভিচও ছিলেন। সার্বিয়ানরা অবশ্য এর পূর্বেই তরুণ মুসলিম আন্দোলনের সদস্যদের বন্দি করে।
প্লোবোডান মিলোসেভিক যুগোস্লাভিয়ার ক্ষমতাসীন কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করে এবং কসোভোর স্বায়ত্তশাসন বাতিল করে। তার আগমন হয়েছিল বৈশ্বিক সমাজতন্ত্রের শেষ যুগে। কারণ, এর মাঝে ওয়ারশ চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল এবং সারা বিশ্বে, বিশেষত ইউরোপে বহু কম্যুনিস্ট শাসনব্যবস্থার পতন ঘটেছিল।
১৪১১ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) ক্রোয়েশিয়া ও স্লোভেনিয়া যুগোস্লাভিয়া থেকে স্বাধীনতা ঘোষণা করে। 'গ্রেট সার্বিয়া' (যুগোস্লাভিয়া) ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা করে সার্বিয়া। সার্বিয়ান সেনাবাহিনী ক্রোয়েশিয়ায় আক্রমণ করে। অতঃপর স্লোভেনিয়া শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পৃথক হয়ে যায়। ক্রোয়েশিয়ায় যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। আড়াল থেকে ইউরোপ ও ভ্যাটিকান পরিচালনা করত পোপ। কারণ, তারা ছিল ক্যাথলিক। আর সার্বিয়ানরা ছিল অর্থোডক্স। সিকিউরিটি কাউন্সিল ক্রোয়েশিয়ায় যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত প্রদান করে। জাতিসংঘ সার্বিয়ান ক্রোয়েশিয়ান ফ্রন্টের ১৪,০০০ সৈন্য প্রেরণ করে। সার্বিয়া ক্রাজিনা ও স্লোভেনিয়ায় সৈন্য বহাল রাখে। বাকি যুগোস্লাভিয়ান সৈন্যকে বসনিয়ায় স্থানান্তরিত করা হয়। যুগোস্লাভিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টা বন্ধ করার জন্য বসনিয়ার ৬৫% ভূখণ্ডে অবস্থান নেয় সার্বিয়ান সৈন্যরা। মুসলিমরা যুগোস্লাভিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার নিরাপদ পন্থা অবলম্বন করে। বসনিয়ার প্রেসিডেন্ট আলি ইজ্জত বেগোভিচ যুগোস্লাভিয়ার সাথে থাকা কিংবা বিচ্ছিন্ন হওয়ার সিদ্ধান্ত জানাতে গণভোটের ঘোষণা দেয়।
ঠিক এই সময়ে বসনিয়ায় অবস্থানকারী যুগোস্লাভিয়ান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সার্বিয়ান নাগরিকদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করছিল। গণভোটে যুগোস্লাভিয়া থেকে বসনিয়া বিচ্ছিন্ন হওয়ার মত বিজয়ী হয়। ফল প্রকাশের সাথে সাথেই সার্বিয়া মুসলিমদের সাথে যুদ্ধ বাধানোর কৌশল খাটায়। বসনিয়ার ৬৫% ভূখণ্ডে বসনিয়ার সার্বিয়ানদের স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ায় সার্বিয়া। এই ৬৫% ভূখণ্ডে যুগোস্লাভিয়ান বাহিনী কর্তৃত্ব করছিল। অথচ সে সময়ে বসনিয়ায় সার্বিয়ানদের সংখ্যা ছিল মোট জনসংখ্যার ৩০%, যাদের অধিকাংশই (সবাই নয়) বসনিয়ায় এসেছিল জনসংখ্যার অনুপাত পাল্টে দেওয়ার জন্য। এতে করে বিশ্ব জানতে পারল, বসনিয়ায় সার্বিয়ান বিচ্ছিন্নতাবাদী ও বসনিয়া সরকারের মাঝে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই যুদ্ধ চলছিল বসনিয়া ও যুগোস্লাভিয়ার সার্বিয়ানদের মাঝে।
প্রত্যাশিতভাবেই বসনিয়া সরকার এই সার্বিয়ান সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে। ফলে ১৪১২ হিজরিতে (১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে) বসনিয়া সরকারের পক্ষগ্রহণকারী অস্ত্রহীন মুসলিম ও আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত সার্বিয়ানদের মাঝে যুদ্ধে শুরু হয়। সার্বিয়ানরা এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটায়, যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সার্বিয়ান ধর্মীয় যাজকরা এই হত্যাযজ্ঞের বৈধতা দিচ্ছিল আর বিশ্ববাসী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছিল, কেউ কিছুই করছিল না। বসনিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের আচরণ ছিল দ্বিমুখী।
ক্রোয়েশিয়ায় সার্বিয়ান আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য জাতিসংঘ সেনাবাহিনী পাঠিয়েছিল। কিন্তু বসনিয়ার জন্য কিছুই করেনি; বরং বসনিয়াতে সার্বিয়ান দখলদারি মজবুত করার জন্য একদল সৈন্য পাঠিয়ে দিয়েছে। জাতিসংঘ বসনিয়াকে বিভক্ত করার জন্য ভ্যান্স-ওয়েন পরিকল্পনা পেশ করে এবং সার্বিয়ান, ক্রোয়েশিয়ান ও মুসলিমদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন জাতিসত্তা সৃষ্টি করে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলিমদের দেওয়া হবে বসনিয়ার আয়তনের ৪৪%, ক্রোয়েশিয়ানদের ২০% এবং সার্বিয়ানদের দেওয়া হবে ৩৭%। মুসলিম ও ক্রোয়েশিয়ানরা এই পরিকল্পনার সাথে ঐকমত্য পোষণ করে, কিন্তু সার্বিয়ানরা বসনিয়ার ৭০%-এর বেশি ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব করত বলে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
ইসলামের শত্রুরা শুধু এতটুকুতেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়ার মধ্যকার দ্বন্দ্ব দূর করে বসনিয়াকে গিলে খাওয়ার জন্য তাদেরকে এক করে দিয়েছিল।
সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়া তাদের মাঝে চলমান যুদ্ধ বন্ধের ব্যাপারে এবং ক্রোয়েশিয়ার যে ভূখণ্ডে সার্বিয়ানরা বাস করে, সে ভূখণ্ডের স্বায়ত্তশাসন প্রদানে একমত হয়। তারপর মুসলিমদের বিরুদ্ধে মৈত্রীচুক্তি করে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়া। ক্রোয়েশিয়া মুসলিমদের সাথে গাদ্দারি করে। মুসলিমরা মনে করেছিল, বসনিয়াকে রক্ষা করতে এবং সার্বিয়ার আগ্রাসন থামিয়ে দিতে বসনিয়ায় ক্রোয়েট সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছে। কিন্তু এই শক্তি দখলদারদের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে সার্বিয়াকে মুসলিম নিধনে সাহায্য করতে শুরু করে। সারাজেভো অবরোধকারী সার্বিয়ান সৈন্যরা মুসলিমদের ওপর মর্টারশেল নিক্ষেপ করতে শুরু করে। এমনকি এক সার্বিয়ান নেতা বলে, তারা ইউরোপকে ইসলামি জাগরণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মুসলিমদের ওপর ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে।
ইসলামের শত্রুরা এতটুকু করেও ক্ষান্ত হয়নি; বরং তারা সাবেক যুগোস্লাভিয়ার ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মূলত এই নিষেধাজ্ঞা ছিল মুসলিমদের ওপর। সার্বিয়ান ও ক্রোয়েটদের কাছে ইউরোপ ও ইহুদিদের থেকে অবাধে অস্ত্র আসতে থাকে। সার্বিয়াকে রাশিয়া ও আশেপাশের অর্থোডক্স খ্রিষ্টান রাষ্ট্রগুলো সাহায্য করতে থাকে। অনুরূপ ইহুদিরাও সাহায্য করে। এদিকে ভ্যাটিকান ও ভ্যাটিকানের আড়াল থেকে ইউরোপ ক্রোয়েশিয়াকে সাহায্য করে। সার্বিয়া বসনিয়ায় ৭২% ভূখণ্ডে এবং ক্রোয়েশিয়া ২০% ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার পর ১০%-এর চেয়েও কম ভূখণ্ড মুসলিমদের দখলে থাকে। এতকিছুর পরও মুসলিমদের সংখ্যা দাঁড়ায় বসনিয়ার মোট জনসংখ্যার ৫০%। কারণ, সবকিছুর পর আল্লাহর ইচ্ছাই বহাল থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
يُرِيدُونَ لِيُطْفِئُوا نُورَ اللهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَاللَّهُ مُتِمُّ نُورِهِ وَلَوْ كَرِهَ الْكَافِرُونَ
'তারা মুখের ফুঁৎকারে আল্লাহর নুর নিভিয়ে দিতে চায়। আল্লাহ তাঁর নুরকে পূর্ণরূপে বিকশিত করবেন; যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে।' [সুরা আস-সফ: ৮]
মুসলিমরা ইমানের অস্ত্রে সজ্জিত হয়। আল্লাহর ওপর উত্তম তাওয়াক্কুল করে বিজয় লাভ করতে সক্ষম হয় তারা। অপর পক্ষের বিরুদ্ধে বিজয় অর্জনের মাধ্যমে পাওয়া অস্ত্রই ছিল মুসলিমদের অস্ত্রের প্রধান উৎস। ক্রোয়েশিয়া ফ্রন্টের ওপর মুসলিমদের আক্রমণ বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে মুসলিমরা ষাট হাজার ক্রোয়েট সৈন্যবিশিষ্ট একটি অঞ্চল আয়ত্ত করতে সক্ষম হয়। ক্রোয়েশিয়া বসনিয়ানদের সাথে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়।
বিশেষ করে বসনিয়ার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ক্রোয়েশিয়া ও সার্বিয়ার মাঝে হিসাব বুঝে নেওয়ার পরিণতি নিয়ে চিন্তা করে ক্রোয়েশিয়া। মুসলিমদের সাথে পুনর্বার মৈত্রীচুক্তির ইচ্ছাপোষণ করে। মুসলিম শাসনাধীন ভূখণ্ড ও ক্রোয়েশিয়া-শাসিত বসনিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম ভূখণ্ড মিলে গঠিত হয় ফেডারেল ইউনিয়ন।
ক্রোয়েশিয়ার যে ভূখণ্ডে সার্বিয়া কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল, সেই ভূখণ্ড ফিরিয়ে আনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ক্রোয়েশিয়ার সেনাবাহিনীকে ভালোভাবে প্রস্তুত করেছিল। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র সার্বিয়াকে রাশিয়া ও ইউরোপে কম্যুনিজমের শক্তি হিসেবে বিবেচনা করত। সত্যি সত্যিই অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে ক্রোয়েশিয়া সার্বিয়ার হাত থেকে স্লোভেনিয়া ও ক্রাজিনা মুক্ত করে।
এই ঘটনা ছিল ওই বিষয়সমূহের একটি, যেগুলো সার্বিয়ার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মুসলিমদের অগ্রাভিযানে কাজে লেগেছে। ক্রোয়েশিয়ায় কেবল পূর্ব স্লোভেনিয়ার ভূখণ্ডটি সার্বিয়ার দখলে রয়ে যায়, যা ক্রোয়েশিয়ার মোট আয়তনের ৫%।
বিশ্ববিবেক জেগে উঠতে শুরু করে। মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ইসলামি সম্মেলনে মুসলিমরা ঘোষণা দেয়, তারা বসনিয়ার ওপর অস্ত্র-নিষেধাজ্ঞার সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য নয়। জাতিসংঘ হুমকি দেয়, যদি সার্বিয়া বেসামরিক মানুষের ওপর বোমা নিক্ষেপ করে, তাহলে জাতিসংঘ সার্বিয়ার ওপর বিমান হামলা চালাবে।
কিন্তু সার্বিয়া জাতিসংঘের হুমকির কোনো পরোয়াই করে না। বসনিয়ার সার্বিয়ান নেতা রাদোভান কারাদিচ ও সেনাবাহিনীর প্রধান রাটকো স্লাডিচ মুসলিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে যেতে থাকে। সার্বিয়ানরা যখন মুসলিম অধ্যুষিত প্রিব্রিয়ানিকা ও জাইবা শহর দখল করে, তখন পনেরো হাজারের বেশি মুসলিমকে হত্যা করা হয়।
জাতিসংঘ সার্বিয়ায় কয়েকটি বিমান হামলা চালায়। তারপর যখন সার্বিয়া জাতিসংঘের সৈনিকদের মানব-ঢাল রূপে ব্যবহার করতে শুরু করে, তখন জাতিসংঘ হামলা বন্ধ করে দেয়। তারপর সার্বিয়া জাতিসংঘের সৈনিকদের মুক্ত করে দেয়। বসনিয়ায় সার্বিয়ান যুদ্ধে জাতিসংঘের কয়েকটি বিমান বিধ্বস্ত হয়।
বসনিয়ান ক্রোয়েট ও মুসলিমরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সার্বিয়া কর্তৃক দখলীকৃত ভূমির দিকে অভিযান চালিয়ে অনেক ভূখণ্ড মুক্ত করে নেয়। একপর্যায়ে মুসলিমরা বসনিয়ার ৩১% ভূখণ্ডে আর ক্রোয়েশিয়া ২০% ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। বাকি ৪৯% সার্বিয়ানদের দখলে রয়ে যায়।
ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো মুসলিদের এই অগ্রগতিতে ভয় পেয়ে যায়। তিন পক্ষকেই যুদ্ধ বন্ধের ও ডেটন চুক্তিতে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেওয়া হয়। ডেটন চুক্তিতে উল্লেখ করা হয়, বসনিয়াতে দ্বিপাক্ষিক ফেডারেল রাষ্ট্র গঠিত হবে। একটি হবে সার্বিয়ান, যারা বসনিয়ার ৪৯% ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব করবে। আর অপরটি হবে মুসলিম ও ক্রোয়েটদের মাঝে বিভক্ত।
এই চুক্তিতে সুস্পষ্টভাবে মুসলিমদের প্রতি জুলুম প্রকাশ পায়। চুক্তি দুর্বল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। বসনিয়াতে তিনটি সেনাবাহিনীর তিন সদস্য বিশিষ্ট প্রেসিডেন্সি বোর্ড গঠন করা হয়, যা সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়াকে যেকোনো সময় সহজে বসনিয়া থেকে পৃথক হওয়ার সুযোগ এনে দেয়। ডেটন চুক্তি কার্যকর রাখার জন্য সেনাবাহিনী রাখা দরকার—এই অজুহাতে যেন বসনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর প্রভাব বজায় রাখা যায়, সেজন্য যুক্তরাষ্ট্র মুসলিমদেরকে এই চুক্তি মেনে নিতে চাপ দিতে থাকে।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র পাওয়ার জন্য মুসলিমরা এই চুক্তি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়। চুক্তি করার এ ছাড়া আরেকটি কারণও ছিল। তা হলো, এই সুযোগে ইউরোপে আশ্রয়গ্রহণকারী মুসলিমরা বসনিয়ায় ফিরে আসতে পারবে। এতে মুসলিমরা তাদের শক্তি এক করতে পারবে এবং বসনিয়ার বাকি অংশ স্বাধীন করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে পারবে। বসনিয়ার প্রেসিডেন্সি বোর্ডের নেতৃত্বের জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রেসিডেন্ট আলি ইজ্জত বেগোভিচ জয় লাভ করে। এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মুসলিমদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অস্ত্র দিতে গড়িমসি শুরু করে।
বসনিয়ায় যুদ্ধ চলাকালে মেসিডোনিয়া শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। মেসিডোনিয়াতে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটে যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হওয়ার মত জয় লাভ করে। সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো মিলে নতুন যুগোস্লাভিয়া প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়।
দ্রষ্টব্যঃ-
যুগোস্লাভিয়াতে আলবেনিয়ান মুসলিম অধ্যুষিত কসোভো নিয়েও সমস্যা দেখা দেয়। কসোভো যুগোস্লাভিয়া থেকে আলাদা হতে চায়, কিন্তু সার্বিয়া শক্তভাবে কসোভোর ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে। বিদ্রোহীদের সাথে চরম নির্দয় আচরণ করা হয়। কসোভোর মতো মুসলিম অধ্যুষিত প্রদেশ সানজাকও ভাগাভাগি করে নেয় সার্বিয়া ও মন্টেনিগ্রো।
বসনিয়া যুদ্ধের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, কুয়েত-সমস্যা ও সামরিক দ্বন্দ্ব নিরসন। বসনিয়া যুদ্ধের ক্ষেত্রে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনে পাশ্চাত্য-আমেরিকান নীতি ছিল দ্বিমুখী। অবশ্য এর উত্তর সবার জানা আছে। বিশ্বক্রুসেড শেষপর্যন্ত এক লক্ষ্যে গিয়ে মিলিত হয়। সে লক্ষ্য হলো মুসলিম নিধন। বসনিয়ার যুদ্ধে দুই লাখের অধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয়। শরণার্থী হয় এর দ্বিগুণ মুসলিম। অনেক মুসলিমকে তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়, যাকে বলা হয় জাতিগত শুদ্ধিকরণের রাজনীতি। আর সেই স্থানগুলোতে সার্বিয়ানরা আস্তানা গেড়ে নেয়। তারা মুসলিমদের ওপর এমন নৃশংস হত্যা ও ধ্বংসযজ্ঞ চালায়, যার বিবরণ শুনে গা শিউরে ওঠে। অনেকে বিকলাঙ্গ ও পঙ্গুত্ব বরণ করে। সম্ভ্রম হারায় অনেক মুসলিম নারী। লাঞ্ছনা ও নির্যাতনের এমন দৃষ্টান্ত আগে কখনো গত হয়নি।
শিশু, যুবতী ও বৃদ্ধাদের সম্ভ্রম লুটেই তারা ক্ষান্ত হয়নি; বরং গর্ভবতী হওয়ার আগে তারা যুবতীদের ছাড়ত না, যাতে যুবতীরা অবৈধ সন্তান জন্ম দেয়। অনেক নারীর স্তন কেটে নেওয়া হয়, গর্ভবতী নারীদের পেট চিরে দেওয়া হয়। আমরা যত কথাই বলি না কেন, আসলে আমাদের পক্ষে এর নৃশংসতার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা শুধু বলতে পারি: حسبنا الله ونعم الوكيل، إنا لله وإنا إليه راجعون.
টিকাঃ
১৮. সানজাক: উসমানি শাসনামলে এটি ছিল প্রশাসনিক একটি বিভাগ। -সম্পাদক
📄 পোল্যান্ড
তাতাররা যুদ্ধ করতে করতে পোল্যান্ডে এসে পৌঁছে। ইউরোপ অভিযানে পোল্যান্ডে এসে তাতাররা থেমে যায়। তাতাররা ইসলাম গ্রহণের পর পোলিশরা জার্মানির বিরুদ্ধে তাতারদের সাহায্য গ্রহণ করে। তাই কিছু মুসলিম তাতার সৈন্য পোল্যান্ডে থেকে যায় এবং স্থায়ীভাবে জীবনযাপন করতে থাকে। অনেক মসজিদ-মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করে তারা। উসমানি শাসনামলে স্বল্প সময়ের জন্য পোল্যান্ড উসমানি নিয়ন্ত্রণের অধীনে আসে। উসমানিরা পোল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তারপর রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও বেলারুশ পোল্যান্ডকে ভাগ করে নেয়। মুসলিমদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি কয়েকবার তো পোল্যান্ডের নামই হারিয়ে যায়।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর পুনরায় পোল্যান্ডের আত্মপ্রকাশ ঘটে। তখন পোল্যান্ডে এক লাখেরও বেশি মুসলিম অবস্থান করে। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানি পোল্যান্ড দখল করে নেয়। যুদ্ধে জার্মানি পরাজিত হয়। তখন রাশিয়ান বাহিনী পোল্যান্ডে ঢুকে পোল্যান্ডকে ওয়ারশ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এই চুক্তির নামে পোল্যান্ডের রাজধানীর নামকরণ করা হয়। রাশিয়া পূর্ব পোল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে নেয়, এর পরিবর্তে পোল্যান্ডকে পূর্ব জার্মানির কিছু অঞ্চল দেয়। পোল্যান্ডে মুসলিমদের সংখ্যা কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে মুসলিমদের সংখ্যা পঁচিশ হাজারে এসে পৌঁছে। আমরা জানি না, বাকিরা কোথায় হারিয়ে গেছে। হয়তো তাদেরকে দেশান্তর করা হয়েছে অথবা নিধন করা হয়েছে কিংবা তাদের অনেকেই রাশিয়ার অধিকৃত অঞ্চলে রয়ে গেছে।
📄 সাইপ্রাস
খলিফা উসমান বিন আফফান রা.-এর যুগে মুসলিমরা সাইপ্রাস বিজয় করে। সে সময়েই সাইপ্রাসে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। আবদুল মালিক বিন মারওয়ানের শাসনামলে রোম পুনরায় সাইপ্রাস দখল করে নেয়। তারপর থেকে উসমানিদের শাসনামলের পূর্বে আর মুসলিমরা সেখানে থিতু হতে পারেনি।
খলিফা দ্বিতীয় সেলিমের শাসনকালে উসমানিরা পুনরায় সাইপ্রাস জয় করে। তারপর ৯৭৯-১২৯৬ হিজরি (১৫৭২-১৮৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত তিন শতাব্দীকাল মুসলিমদের অধীনে পরিচালিত হয় সাইপ্রাস। সাইপ্রাসে মুসলিমদের সংখ্যা দাঁড়ায় খ্রিষ্টানদের তিনগুণ। ১২৯৬ হিজরিতে ইংল্যান্ড উসমানিরদেরকে এই মর্মে চুক্তিতে আবদ্ধ হতে বাধ্য করে—উসমানিরা ইংল্যান্ডের জন্য সাইপ্রাস ছেড়ে দেবে, আর এর বিনিময়ে ইংল্যান্ড উসমানিদের সব ধরনের বহিরাক্রমণ থেকে রক্ষা করবে।
ইংল্যান্ডের স্বার্থ উদ্ধার হওয়ার সাথে সাথেই সাইপ্রাসের জনসংখ্যার অনুপাত পাল্টে ফেলতে শুরু করে। গ্রিকদেরকে সাইপ্রাসে অভিবাসী হতে আগ্রহী করে তোলে তারা। মুসলিমদেরকে দ্বীপ ত্যাগ করতে চাপ দেয়। তখন অনেক মুসলিম হিজরত করে। গ্রিসে কয়েকটি আন্দোলন হয়। এর মাঝে একটি আন্দোলনে গ্রিসের সাথে সাইপ্রাসকে মিলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। আরেকটিতে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান করা হয়। মুসলিমদের উপর চাপ বৃদ্ধি পায়। মুসলিমরা গ্রিসের সাথে মিলতে ভয় পায়। কারণ, ক্রিট গ্রীসের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর ক্রিটের মুসলিমদের ধ্বংস করা হয়েছিল।
তারপর ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) ইংল্যান্ড সাইপ্রাসকে স্বাধীনতা দেয়। স্বাধীনতা দেওয়ার শর্ত ছিল, সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট হবে গ্রিকবংশোদ্ভূত, ভাইস প্রেসিডেন্ট হবে তুর্কি বংশোদ্ভূত। সে সময়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সাইপ্রাসের মুসলিমদের জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১৯%, গ্রিকদের ৭৮% এবং ইহুদিদের ৩%।
**দ্রষ্টব্য**
১৩৯৪ হিজরিতে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) সাইপ্রাসের প্রেসিডেন্ট তৃতীয় ম্যাকারিয়ুসের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। তুরস্ক আশঙ্কা করে, সাইপ্রাস গ্রিসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। তাই তুর্কি সশস্ত্র বাহিনীকে সাইপ্রাসে অবতরণ করার আদেশ দেওয়া হয়। তুর্কি বাহিনী সাইপ্রাসের মুসলিমদেরকে গ্রিসের ক্রুসেডীয় বিদ্বেষ থেকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যে সাইপ্রাসের ৩৮% ভূখণ্ডে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়। সাইপ্রাসের মুসলিমরা তুর্কি বাহিনীকে স্বাগত জানায়। এতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। তুরস্ক ও গ্রিসের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। বর্তমানেও সাইপ্রাসে এই অবস্থা বিরাজ করছে।