📄 হাঙ্গেরি
ভলগা নদীর অববাহিকা হয়ে মোঙ্গল বংশোদ্ভূত বাশকিরের কিছু মুসলিম গোত্রের হিজরতের মাধ্যমে হাঙ্গেরিতে ইসলাম প্রবেশ করেছে। হাঙ্গেরির চারপাশে খ্রিষ্টানদের বসবাস থাকা সত্ত্বেও হাঙ্গেরিয়ান মুসলিমরা ইসলামকে আঁকড়ে ধরে থাকে। তারপর ইউরোপ ক্রুসেড যুদ্ধের পরিকল্পনা করে। হাঙ্গেরির বাদশাহ লাদিপ্লাউস ছিল ক্রুসেডের সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থক। হাঙ্গেরিয়ান মুসলিমদেরকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করতে কিংবা দেশত্যাগ করতে বাধ্য করে তারা।
আন্দালুস ও মরক্কো থেকে অনেক দাঈ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হাঙ্গেরিতে আগমন করেছিলেন। খলিফা সুলাইমান কানুনির আমলে ৯৩৩ হিজরিতে (১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে) যখন হাঙ্গেরিতে উসমানি বিজয় সংঘটিত হয়, তখন হাঙ্গেরিতে মুসলিমদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল আড়াই লাখের অধিক। বুদাপেস্টে তিরাশিটিরও অধিক মসজিদ ছিল। অনেক ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু ১১১১ হিজরিতে (১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানিরা হাঙ্গেরি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তখন মুসলিমদের ওপর চালানো হয় নির্যাতনের স্টিমরোলার। অধিকাংশ মুসলিম হিজরত করে। বেশিরভাগ মসজিদ ধ্বংস করা হয়। যেগুলো ধ্বংসের হাত থেকে মুক্ত ছিল, সেগুলো গির্জায় পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়া হাঙ্গেরিকে ওয়ারশ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। তারপর ১৪০৯ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) ওয়ারশ চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। হাঙ্গেরিতে এখনো হাজারো মুসলিম বাস করে। ১৪১৯ হিজরিতে (১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) হাঙ্গেরি ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পথে এগিয়ে যায়।
📄 স্লোভাকিয়া
স্লোভাকিয়া বোহেমিয়া (চেক প্রজাতন্ত্র) সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। তারপর আহমাদ কোপরিলির নেতৃত্বে উসমানিরা স্লোভাকিয়া জয় করে নেয়। বেশকিছু উসমানি পরিবার স্লোভাকিয়ায় আবাস গড়ে তোলে। স্লোভাকিয়াবাসীদের কেউ কেউ ইসলাম গ্রহণ করে। তারপর ১১১১ হিজরিতে (১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে) যখন ভলেন্ডের রাজা সুবেস্কি উসমানিদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করে, তখন উসমানিরা স্লোভাকিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয় এবং স্লোভাকিয়া অস্ট্রিয়ার অধীনে চলে যায়। অস্ট্রিয়া মুসলিমদের ওপর ক্রুসেডীয় বিদ্বেষ ঢেলে দেয়। তখন মুসলিমরা হিজরত করে। অনেককে হত্যা করা হয়।
অস্ট্রিয়া বোহেমিয়া তথা চেককে পদানত করেছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর চেকোস্লোভাকিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মান চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে নেয়। তারপর রাশিয়ান বাহিনী চেকোস্লোভাকিয়ায় প্রবেশ করে এবং ওয়ারশ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করে নেয়।
কম্যুনিস্টরা চেকোস্লোভাকিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। ১৪০৯ হিজরিতে (১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) কম্যুনিজমের পতন ঘটে। চেক শান্তিচুক্তির মাধ্যমে স্লোভাকিয়া থেকে আলাদা হয়ে যায়। চেক ও স্লোভাকিয়া দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ব্রাতিস্নাভা স্লোভাকিয়ার রাজধানী।
📄 অস্ট্রিয়া
উসমানিদের সাথে অস্ট্রিয়ার যুদ্ধ লেগেই থাকত। উসমানিরা ইউরোপে অস্ট্রিয়ার অনেক ভূখণ্ড দখল করে নেয়। এমনকি অস্ট্রিয়ায় প্রবেশ করে উসমানিরা দুবার ভিয়েনা অবরোধ করে। একবার খলিফা সুলাইমান কানুনির যুগে, আরেকবার খলিফা চতুর্থ মুহাম্মাদের যুগে। কিন্তু তারা অস্ট্রিয়া বিজয় করতে পারেনি। যখন উসমানিরা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অস্ট্রিয়া উসমানি সাম্রাজ্যের থেকে শেষ অংশ পর্যন্ত টুকরো করে ফেলে, তখন মুসলিমরা অস্ট্রিয়ার অধিকৃত অঞ্চলগুলো থেকে অস্ট্রিয়ার মূল অংশে হিজরত করে। এই মুসলিমদের অধিকাংশই ছিল বসনিয়ান।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উসমানি ও অস্ট্রিয়ার মাঝে ঐক্য সৃষ্টি হয়। বিশ্বযুদ্ধে উভয়ের পরাজয়ের মাধ্যমে এই ঐক্য শেষ হয়ে যায় এবং অনেক ভূখণ্ড তাদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। জার্মানি অস্ট্রিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। তারপর যখন জার্মানি পরাজিত হয়, তখন রাশিয়া প্রবেশ করে অস্ট্রিয়াতে। কিন্তু রাশিয়ানরাও অস্ট্রিয়া ত্যাগ করে। এরপর অস্ট্রিয়া প্রাচ্য কিংবা পাশ্চাত্যের কোনো সামরিক বাহিনীর সাথে যোগ দেয়নি।
পূর্বের তুলনায় অস্ট্রিয়ার আয়তন অনেক হ্রাস পায়। অস্ট্রিয়ায় মুসলিমরা সংখ্যালঘু। তাদের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারের বেশি।
📄 গ্রিস
প্রথম মুসলিমদের আমলেই ক্রিট, রোডস ও অন্যান্য দ্বীপে ইসলামি বিজয় পৌঁছে যায়। কিন্তু মুসলিমরা স্থির হতে পারেনি। রোম পুনরায় দখল করে নিয়ে মুসলিমদের সমূলে ধ্বংস করে দেয়। তারপর উসমানি বিজয় শুরু হয়। সমগ্র গ্রিস, এজিয়ান, ক্রিট ও রোডস দ্বীপ বিজিত হয়। গ্রিসের অর্ধেক অধিবাসীই ছিল মুসলিম। তারপর ইউরোপ গ্রিসকে উসমানিদের বিরুদ্ধে সাহায্য করতে শুরু করে এবং অস্ত্র, যুদ্ধোপকরণ ও সৈন্য দিয়ে তাদেরকে শক্তি জোগায়। একপর্যায়ে গ্রিস উসমানিদের থেকে স্বাধীনতা লাভ করে গ্রিস সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত করে।
স্বাধীন গ্রিসের আয়তন ছিল মোরা উপদ্বীপের চেয়েও ছোট। তারপর ইউরোপ উসমানি সাম্রাজ্যের অনুপাতে গ্রিসের ভূখণ্ড সম্প্রসারিত করতে থাকে এবং উসমানিদেরকে আরও বেশি ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। গ্রিকরা মুসলিমদের সাথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। অনেক মুসলিমকে তারা উসমানি শাসনাধীন ভূখণ্ডে হিজরত করতে বাধ্য করে।
তারপর প্রথম বলকান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে উসমানি সাম্রাজ্যের শাসনাধীন পূর্ব রোমেলি প্রদেশের অনেক ভূখণ্ড গ্রিসের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। উসমানি সাম্রাজ্য পূর্ব রোমেলি প্রদেশ হারানোর পর গ্রিস ও সার্বিয়া মিলে আলবেনিয়ার ভূখণ্ডগুলোকে একে একে টুকরো করে ফেলে।
তারপর ম্যাকডোনিয়া বিভক্তিকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে ম্যাকডোনিয়ার বড় অংশ গ্রিসের ভাগে আসে। তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। মিত্রশক্তি অনেক উসমানি ভূখণ্ড দখল করে নেয়। মিত্রশক্তির কর্তৃত্ব আনাতোলিয়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তারা উসমানি ভূখণ্ডে গ্রিকদেরকে জায়গা করে দেয়। তুরস্ক ও গ্রিসের মাঝে যুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। মিত্রশক্তি তুরস্কের অনেক অঞ্চল বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। তবে যুদ্ধে তুর্কিরা জয় লাভ করে। গ্রিসের বিরুদ্ধে তুর্কিদের সবচেয়ে বড় বিজয় ছিল সাকারিয়ার বিজয়।
গ্রিস কর্তৃক অধিকৃত অধিকাংশ ভূমি ফিরিয়ে আনে তুর্কিরা। উদ্ধারকৃত ভূমির মাঝে ইস্তাম্বুল, ইজমির, পূর্ব থ্রেস বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কিন্তু গ্রিকরা এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ দখল করে রাখে।
তুর্কি ও গ্রিকদের মাঝে মুসলিমদের সাথে অর্থোডক্স খ্রিষ্টান বিনিময়ের চুক্তি সংঘটিত হয়। অনেক মুসলিম হিজরত করে, যাদের সংখ্যা ছিল গ্রিসের অধিবাসীদের চার ভাগের এক ভাগ। গ্রিসের বিভিন্ন স্থানে মুসলিম নিধন চলে। ক্রিট, রোডস দ্বীপের মুসলিমরা অধিকাংশ গ্রিক হওয়া সত্ত্বেও তাদের একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়। এ সময় গ্রিসে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ২.৫ মিলিয়ন। বর্তমানে সেই সংখ্যা কোয়ার্টার মিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।
- দ্রষ্টব্য -
আজ পর্যন্ত এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জ ও সাইপ্রাসে গ্রিস ও তুরস্কের মাঝে যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। পরস্পরে হুমকি ও দোষারোপ করে যাচ্ছে, যার কারণে সার্বক্ষণিক উত্তেজনা বিরাজ করছে। এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৩৯৩ হিজরিতে (১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) গ্রিসে রাজতন্ত্র বাতিল করে গণতন্ত্রের ঘোষণা দেওয়া হয়। গ্রিসে তুর্কি, আলবেনিয়ান, বুলগেরিয়ানরা সংখ্যালঘু হিসেবে বাস করে, যাদের অধিকাংশই মুসলমান।