📄 দ্রষ্টব্য
বুলগেরিয়ার অধিকাংশ মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল। ধ্বংসলীলা থেকে যে মসজিদগুলো বাদ পড়েছিল, সেগুলোকে নাট্যশালা কিংবা আস্তাবলে পরিণত করা হয়। এমনকি সফিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র মসজিদটিকেও তারা জাদুঘরে পরিণত করে। মুসলিমদেরকে খ্রিষ্টান বানানো পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা মুসলিম নাম পাল্টে খ্রিষ্টান নাম রাখতে বাধ্য করে, নারীদেরকে শালীনতা অবলম্বন করতে বাধা দেয়, অনাবৃত হতে বাধ্য করে তাদেরকে। মুসলিমদেরকে ইসলামি পন্থায় দাফন করতে বাধা দেয়, বিশেষ কবরস্থানে দাফন করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ঈদুল আজহায় বের হওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে তারা। ইসলামি নিদর্শন মুছে ফেলার জন্য এমন আরও অনেক পন্থা অবলম্বন করে তারা। এমনকি আজ পর্যন্ত মুসলিমদেরকে সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও নারাজ তারা; অথচ মুসলিমদের জনসংখ্যা বুলগেরিয়ার অধিবাসীদের মাঝে ২১%-এর চেয়েও বেশি। মুসলিমদেরকে হজ আদায় করতে এবং বহির্বিশ্বের মুসলিম ভাইদের সাথে সম্পর্ক রাখতেও বাধা দেয় তারা। এতসব প্রতিকূলতা ও চাপ সত্ত্বেও বুলগেরিয়ার মুসলিমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধে চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেকে কারাবরণ করছেন; দ্বীনের জন্য ভোগ করে যাচ্ছেন অনিঃশেষ কষ্ট-যাতনা।
📄 রোমানিয়া
ওয়ালাচিয়া, মোলদাভিয়া, ট্রান্সসিলভানিয়া ও দুবরুজা মিলে বর্তমান রোমানিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড়ানোর জন্য ইউরোপের পৃষ্ঠপোষকতায় এই প্রদেশগুলোর ঐক্য সৃষ্টি হয়। ১২৯২ হিজরির (১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দের) বার্লিন সম্মেলনের শর্ত অনুযায়ী রোমানিয়া উসমানিদের থেকে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়া রোমানিয়াকে ওয়ারশ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এবং কম্যুনিস্টদের হাতে রোমানিয়ার কর্তৃত্ব অর্পণ করে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ওয়ারশ চুক্তির অধীন রোমানিয়া কম্যুনিস্ট প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
রোমানিয়ার অধিকাংশ মুসলিম তুর্কিস্থান ও অন্যান্য দেশে হিজরত করে। রোমানিয়ার দুবরুজা ও ইদা কেল্লায়, মাজিদিয়া ও বাবাদাগে মুসলিমরা একত্র হতে শুরু করে। অধিকাংশ বাসিন্দা অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। ওয়ারশ চুক্তি শেষ হয়, রোমানিয়ায় কম্যুনিস্ট শাসনেরও পতন ঘটে। কিন্তু কম্যুনিস্ট শাসনের সময় মুসলিমদের অবস্থা যেমন ছিল, তেমনই রয়ে যায়। ১৪১৯ হিজরিতে (১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) রোমানিয়াকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়।
📄 মোলদাভিয়া
মোল্দাভিয়া মূলত সার্বিয়ার ভূখণ্ড ছিল। পরে রাশিয়া উসমানিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। তারপর রোমানিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর রাশিয়া পুনরায় মোলদাভিয়া দখল করে এবং রোমানিয়ার জন্য শুধু দুবরুজা ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়। মোলদাভিয়ায় অনেক মুসলিম বাস করত। মুসলিমদের ঐক্য ধ্বংস করার জন্য এবং মুসলিম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যকে দুর্বল করার জন্য রাশিয়া মোলদাভিয়াকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করে। এক অংশ দেয় ইউক্রেনকে, আরেক অংশ রোমানিয়ার দখলে রয়ে যায়। আর বাকি অংশ নিয়ে গঠিত হয় মোলদাভিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্র।
১৪১১ হিজরি (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মোলদাভিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীন থাকে। তারপর স্বাধীনতা অর্জন করে। মোলদাভিয়ার মুসলিমদের ব্যাপারে আমাদের অবগতি খুবই কম। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনামলে এবং স্বাধীনতার পরও কম্যুনিস্টরা মোলদাভিয়ার মুসলিমদের তথ্য গোপন রেখেছে। তাই তাদের সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়।
📄 হাঙ্গেরি
ভলগা নদীর অববাহিকা হয়ে মোঙ্গল বংশোদ্ভূত বাশকিরের কিছু মুসলিম গোত্রের হিজরতের মাধ্যমে হাঙ্গেরিতে ইসলাম প্রবেশ করেছে। হাঙ্গেরির চারপাশে খ্রিষ্টানদের বসবাস থাকা সত্ত্বেও হাঙ্গেরিয়ান মুসলিমরা ইসলামকে আঁকড়ে ধরে থাকে। তারপর ইউরোপ ক্রুসেড যুদ্ধের পরিকল্পনা করে। হাঙ্গেরির বাদশাহ লাদিপ্লাউস ছিল ক্রুসেডের সবচেয়ে শক্তিশালী সমর্থক। হাঙ্গেরিয়ান মুসলিমদেরকে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করতে কিংবা দেশত্যাগ করতে বাধ্য করে তারা।
আন্দালুস ও মরক্কো থেকে অনেক দাঈ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে হাঙ্গেরিতে আগমন করেছিলেন। খলিফা সুলাইমান কানুনির আমলে ৯৩৩ হিজরিতে (১৫২৭ খ্রিষ্টাব্দে) যখন হাঙ্গেরিতে উসমানি বিজয় সংঘটিত হয়, তখন হাঙ্গেরিতে মুসলিমদের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল আড়াই লাখের অধিক। বুদাপেস্টে তিরাশিটিরও অধিক মসজিদ ছিল। অনেক ইসলামি শিক্ষাকেন্দ্রও প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু ১১১১ হিজরিতে (১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে) উসমানিরা হাঙ্গেরি ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। তখন মুসলিমদের ওপর চালানো হয় নির্যাতনের স্টিমরোলার। অধিকাংশ মুসলিম হিজরত করে। বেশিরভাগ মসজিদ ধ্বংস করা হয়। যেগুলো ধ্বংসের হাত থেকে মুক্ত ছিল, সেগুলো গির্জায় পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়া হাঙ্গেরিকে ওয়ারশ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য চাপ দেয়। তারপর ১৪০৯ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) ওয়ারশ চুক্তি ভঙ্গ হয়ে যায়। হাঙ্গেরিতে এখনো হাজারো মুসলিম বাস করে। ১৪১৯ হিজরিতে (১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) হাঙ্গেরি ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার পথে এগিয়ে যায়।