📄 বুলগেরিয়া
বুলগেরিয়ানরা মূলত তুর্কি বংশোদ্ভূত। ৩৫১ হিজরিতে তাতারদের আগমনের সময় বুলগেরিয়ানরা ভলগা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত বুলগার শহর (বর্তমানে কাজান) থেকে হিজরত করে এই ভূখণ্ডে চলে আসে এবং বলকানে স্থায়ী আবাস গড়ে নেয়। তারা যেসব অঞ্চলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে, সেই অঞ্চলকেও তাদের পূর্ববর্তী শহরের নাম অনুসারে বুলগার বলতে শুরু করে। দুঃখজনক বিষয় হলো, তারা মুসলিম হয়েও পরবর্তীকালে খ্রিষ্টান হয়ে যায়। কারণ, তাদের চারপাশে সমাজের সবাই ছিল অর্থোডক্স খ্রিষ্টান। বুলগেরিয়ায় ইসলামি বিজয়ের সূচনা হয় উসমানিদের হাতে।
৭৭৪ হিজরিতে (১৩৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) সুলতান প্রথম মুরাদ বুলগেরিয়ার দক্ষিণাঞ্চল জয় করেন। এরপর ৭৯৬ হিজরিতে (১৩৯০ খ্রিষ্টাব্দে) তার ছেলে প্রথম বায়েজিদ উত্তরাঞ্চল জয় করেন। তৈমুর লংয়ের সাথে যুদ্ধ হওয়ার পর বুলগেরিয়া উসমানিদের হাতছাড়া হয়ে যায়। তারপর সুলতান মুহাম্মাদ আল-ফাতিহের আমলে উসমানিরা পুনরায় বুলগেরিয়াকে ফিরিয়ে আনে।
১২৯৫ হিজরিতে (১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) বার্লিনে সম্মেলন হওয়া পর্যন্ত বুলগেরিয়া উসমানিদের শাসনাধীন থাকে। সম্মেলনে ইউরোপিয়ানরা উসমানিদের ওপর বুলগেরিয়াকে স্বায়ত্তশাসন অর্পণ করার জন্য চাপ দেয়। বুলগেরিয়াতে পূর্বে অনেক মুসলিম ছিল। রাশিয়ান যুদ্ধের সময় খ্রিষ্টান নাগরিকরা মুসলিমদের অধিকাংশের সাথে খারাপ ব্যবহার করে, যা বুলগেরিয়ার স্বায়ত্তশাসন লাভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খ্রিষ্টানরা মুসলিমদের বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করে। ফলে মুসলিমদের একটি অংশ উসমানি খিলাফত-শাসিত ভূমিতে পালিয়ে যায়। অন্যরা পাহাড়ে আশ্রয় নিয়ে আত্মরক্ষা করে এবং মুসলিমদের সাথে বুলগেরিয়ানরা যে আচরণ করেছে, তার প্রতিশোধ নিতে গেরিলা হামলা শুরু করে। তারপর ১৩২৬ হিজরিতে (১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে) বুলগেরিয়ানরা উসমানিদের থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে বুলগেরিয়া রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।
এরপর ১৩৩০ হিজরিতে (১৯১২ খ্রিষ্টাব্দে) প্রথম বলকান যুদ্ধ শুরু হয়। এই যুদ্ধে বলকানের রাষ্ট্রগুলো উসমানি খিলাফতের শাসনাধীন পশ্চিম রোমেলিকে বলকানের অন্তর্ভুক্ত করার ব্যাপারে একমত হয়।
উসমানিদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে। বুলগেরিয়া (তুরস্কের ইউরোপীয় অংশ) থ্রেস (তারাকিয়া) দখল করে নেয়। ম্যাকডোনিয়া বিভক্তি নিয়ে বলকানের সাথে তাদের মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। বুলগেরিয়া পুরো ম্যাকডোনিয়া নিজেদের দখলে নিতে চায়। এই মতবিরোধের ফলে ১৩৩২ হিজরিতে (১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে) দ্বিতীয় বলকান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বুলগেরিয়ার বিরুদ্ধে বলকান উসমানিদের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করে। যুদ্ধে বুলগেরিয়া পরাজিত হয়। উসমানিরা থ্রেস (তারাকিয়া) ফিরে পায়। ম্যাকডোনিয়া গ্রিস, সার্বিয়া ও বুলগেরিয়ার মাঝে বিভক্ত হয়ে পড়ে। সার্বিয়া পায় ২৭%, বুলগেরিয়া ১০% এবং গ্রিস ম্যাকডোনিয়ার বাকি অংশ লাভ করে।
তারপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধে বুলগেরিয়া অক্ষশক্তির সাথে যুক্ত হয়। অক্ষশক্তির পরাজয়ের কারণে বুলগেরিয়াও বিপর্যয়ের শিকার হয়।
তারপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুতে জার্মানি বুলগেরিয়া দখল করে নেয়। পরে জার্মানি পরাজিত হয়ে বুলগেরিয়া ত্যাগ করতে শুরু করে। এ সময় রাশিয়ান বাহিনী বুলগেরিয়ায় ঢোকে। যুদ্ধ শেষে রাশিয়া বুলগেরিয়াকে ওয়ারশ চুক্তিতে যোগ দিতে বাধ্য করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাশিয়ান বাহিনী যেসব রাষ্ট্রে ঢুকেছিল, ওয়ারশ চুক্তিকে সেসব রাষ্ট্রে রাশিয়ান দখলদারি প্রতিষ্ঠার ভূমিকা মনে করা হয়। কারণ, সেসব রাষ্ট্রের মধ্য হতে কোনো রাষ্ট্রই ওয়ারশ চুক্তি থেকে পিছিয়ে আসতে পারেনি; বিরোধিতাও করতে পারেনি। রাশিয়াই এই চুক্তির নেতৃত্ব দেয়।
বুলগেরিয়া ওয়ারশ চুক্তিতে যোগ দেওয়ার পর রাশিয়া বুলগেরিয়ায় কম্যুনিস্টদেরকে প্রতিষ্ঠিত করতে শুরু করে এবং তাদের হাতেই বুলগেরিয়ার কর্তৃত্ব অর্পণ করে। আমরা পূর্বেই জেনেছি, বিশ্বের যেখানেই কম্যুনিজম (সমাজতন্ত্র) আত্মপ্রকাশ করেছে, সেখানেই ইসলামকে তার ঘোরতর শত্রু হিসেবে দেখেছে। কম্যুনিজম ইসলামের বিরুদ্ধে এমন নির্দয়ভাবে আগ্রাসন চালিয়েছে, পৃথিবীর অন্য কোনো শাসনব্যবস্থায় যার নজির নেই।
📄 দ্রষ্টব্য
বুলগেরিয়ার অধিকাংশ মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল। ধ্বংসলীলা থেকে যে মসজিদগুলো বাদ পড়েছিল, সেগুলোকে নাট্যশালা কিংবা আস্তাবলে পরিণত করা হয়। এমনকি সফিয়ায় টিকে থাকা একমাত্র মসজিদটিকেও তারা জাদুঘরে পরিণত করে। মুসলিমদেরকে খ্রিষ্টান বানানো পর্যায়ক্রমিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তারা মুসলিম নাম পাল্টে খ্রিষ্টান নাম রাখতে বাধ্য করে, নারীদেরকে শালীনতা অবলম্বন করতে বাধা দেয়, অনাবৃত হতে বাধ্য করে তাদেরকে। মুসলিমদেরকে ইসলামি পন্থায় দাফন করতে বাধা দেয়, বিশেষ কবরস্থানে দাফন করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। ঈদুল আজহায় বের হওয়ার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে তারা। ইসলামি নিদর্শন মুছে ফেলার জন্য এমন আরও অনেক পন্থা অবলম্বন করে তারা। এমনকি আজ পর্যন্ত মুসলিমদেরকে সংখ্যালঘু হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও নারাজ তারা; অথচ মুসলিমদের জনসংখ্যা বুলগেরিয়ার অধিবাসীদের মাঝে ২১%-এর চেয়েও বেশি। মুসলিমদেরকে হজ আদায় করতে এবং বহির্বিশ্বের মুসলিম ভাইদের সাথে সম্পর্ক রাখতেও বাধা দেয় তারা। এতসব প্রতিকূলতা ও চাপ সত্ত্বেও বুলগেরিয়ার মুসলিমরা সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধে চেষ্টা করে যাচ্ছে। অনেকে কারাবরণ করছেন; দ্বীনের জন্য ভোগ করে যাচ্ছেন অনিঃশেষ কষ্ট-যাতনা।
📄 রোমানিয়া
ওয়ালাচিয়া, মোলদাভিয়া, ট্রান্সসিলভানিয়া ও দুবরুজা মিলে বর্তমান রোমানিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। উসমানি সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে এক কাতারে দাঁড়ানোর জন্য ইউরোপের পৃষ্ঠপোষকতায় এই প্রদেশগুলোর ঐক্য সৃষ্টি হয়। ১২৯২ হিজরির (১৮৭৫ খ্রিষ্টাব্দের) বার্লিন সম্মেলনের শর্ত অনুযায়ী রোমানিয়া উসমানিদের থেকে সম্পূর্ণরূপে স্বাধীনতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়া রোমানিয়াকে ওয়ারশ চুক্তির অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। এবং কম্যুনিস্টদের হাতে রোমানিয়ার কর্তৃত্ব অর্পণ করে। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর ওয়ারশ চুক্তির অধীন রোমানিয়া কম্যুনিস্ট প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়।
রোমানিয়ার অধিকাংশ মুসলিম তুর্কিস্থান ও অন্যান্য দেশে হিজরত করে। রোমানিয়ার দুবরুজা ও ইদা কেল্লায়, মাজিদিয়া ও বাবাদাগে মুসলিমরা একত্র হতে শুরু করে। অধিকাংশ বাসিন্দা অর্থোডক্স খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে। ওয়ারশ চুক্তি শেষ হয়, রোমানিয়ায় কম্যুনিস্ট শাসনেরও পতন ঘটে। কিন্তু কম্যুনিস্ট শাসনের সময় মুসলিমদের অবস্থা যেমন ছিল, তেমনই রয়ে যায়। ১৪১৯ হিজরিতে (১৯৯৮ খ্রিষ্টাব্দে) রোমানিয়াকে ন্যাটোর অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়।
📄 মোলদাভিয়া
মোল্দাভিয়া মূলত সার্বিয়ার ভূখণ্ড ছিল। পরে রাশিয়া উসমানিদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। তারপর রোমানিয়ার অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর রাশিয়া পুনরায় মোলদাভিয়া দখল করে এবং রোমানিয়ার জন্য শুধু দুবরুজা ভূখণ্ড ছেড়ে দেয়। মোলদাভিয়ায় অনেক মুসলিম বাস করত। মুসলিমদের ঐক্য ধ্বংস করার জন্য এবং মুসলিম কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যকে দুর্বল করার জন্য রাশিয়া মোলদাভিয়াকে বিভক্ত করার পরিকল্পনা করে। এক অংশ দেয় ইউক্রেনকে, আরেক অংশ রোমানিয়ার দখলে রয়ে যায়। আর বাকি অংশ নিয়ে গঠিত হয় মোলদাভিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রজাতন্ত্র।
১৪১১ হিজরি (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মোলদাভিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীন থাকে। তারপর স্বাধীনতা অর্জন করে। মোলদাভিয়ার মুসলিমদের ব্যাপারে আমাদের অবগতি খুবই কম। কারণ, সোভিয়েত ইউনিয়নের শাসনামলে এবং স্বাধীনতার পরও কম্যুনিস্টরা মোলদাভিয়ার মুসলিমদের তথ্য গোপন রেখেছে। তাই তাদের সম্পর্কে খুব কমই জানা যায়।