📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মরক্কো সাম্রাজ্য

📄 মরক্কো সাম্রাজ্য


আব্বাসি আমল থেকে ফরাসি দখলদারি পর্যন্ত এই সময়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী সর্ববৃহৎ ইসলামি ভূখণ্ড হচ্ছে মরক্কো সাম্রাজ্য। পশ্চিম আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারে ও আন্দালুসের মুসলিমদের সাহায্যকরণে মরক্কোবাসীদের বড় অবদান রয়েছে।

যখন আব্বাসি খিলাফত দুর্বল হতে শুরু করে এবং খিলাফতের সদস্যদের মাঝে অনৈক্য দেখা দেয়, তখন মরক্কোতে ইদরিসি রাজবংশের উত্থান ঘটে। ইদরিসিরা ১৭২-৩৭৫ হিজরির মাঝে মরক্কোতে কর্তৃত্ব করতে সক্ষম হয়। তারপর ইদরিসি সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মরক্কোর গোত্রগুলো স্বাধীনতা লাভ করে। ফাতিমিরা চলমান অবস্থা কাজে লাগিয়ে মরক্কোর উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত কর্তৃত্ব বিস্তার করে।

তারপর মুরাবিতিরা ৪৪৮-৫৪১ হিজরি (১০৫৬-১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মরক্কো শাসন করে। ৫২৪ হিজরির (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দের) মাঝে মুওয়াহহিদি খিলাফতের উত্থান ঘটে। ৬৬৮ হিজরি (১২৭০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত তাদের সাম্রাজ্য টিকে থাকে। ৫৯১ হিজরিতে বনু মারিন তথা মারিন সাম্রাজ্য মরক্কোতে কর্তৃত্ব বিস্তার করতে শুরু করে। তারা ৯৫৭ হিজরি (১৫৫১ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত কর্তৃত্ব করে। এর মাঝে পর্তুগিজরা মরক্কোর অনেক অঞ্চল দখল করে নেয় এবং আন্দালুসে ইসলামের সর্বশেষ ঘাঁটি গ্রানাডার পতন ঘটে। পর্তুগিজদের দখলদারির সময় বুন ওয়াতাসের উত্থান ঘটে। পর্তুগিজ দখলদাররা যেসব অঞ্চল পদানত করে মুসলিমদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, সেসব অঞ্চল থেকে দখলদারদের উৎখাত করার জন্য যুদ্ধ করে তারা।

তারপর হুসাইনি বংশীয় শাসকদের উত্থান ঘটে। জনগণ তাদের পাশে সমবেত হতে থাকে। তারা পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে এবং ৯১৫-১০৬৯ হিজরি (১৫০৯-১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মরক্কো শাসন করে। তাদের শাসনামলে উসমানি খিলাফত আলজেরিয়ায় পৌঁছে মরক্কোর সীমানা পর্যন্ত চলে আসে। পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় উসমানিরা মরক্কোর কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করত। মরক্কোর শাসকরাও অনেক সময় নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং যেকোনো বিদ্রোহ দমন করতে কিংবা পর্তুগাল ও স্পেনের শত্রুতা প্রতিরোধ করতে উসমানিদের সাহায্য নিত। কিন্তু ইসলামের শত্রুরা মরক্কোর শাসকদের মনে উসমানিদের ব্যাপারে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। এ কারণে মরক্কোর অধিবাসীরা উসমানি নেতৃত্বের স্বীকৃতি দেয়নি। তেমনইভাবে স্প্যানিশ ও পর্তুগিজদের মোকাবিলায় মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি না করার ইচ্ছায় উসমানিরাও মরক্কোকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেনি।

হুসাইনি শাসকরা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। মরক্কোর গোত্রগুলো তাদের শাসন থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। এ সময় শাবানাত পরিবারের উত্থান ঘটে। শাবানাত পরিবার হুসাইনিদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং তাদের প্রভাব শেষ করে দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ফালালি শাসকদের উত্থান ঘটে। তারা শাবানাত পরিবারকে ধ্বংস করে দেয় এবং মরক্কোর অধিবাসীরা তাদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। আজ পর্যন্ত তারাই মরক্কো শাসন করছে।

**মরক্কোর বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি**

ফালালি শাসক মাওলা সুলাইমান মরক্কোর ওপর বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি চাপিয়ে দেয়। সে স্পেনের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তিতে মরক্কোর কিছু উপকূলীয় শহরে স্প্যানিশদের দখলদারির স্বীকৃতি দেয় এবং ইউরোপ উপকূলে ও জাহাজে মরক্কোর আক্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। মরক্কোর ব্যবসায়ীদের ইউরোপে ব্যবসা পরিচালনার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে সে। এ ধরনের আরও কিছু পন্থা মরক্কোকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আলজেরিয়ায় ফরাসি দখলদারি শুরু হওয়া পর্যন্ত এই বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি চলতে থাকে। মরক্কো আলজেরিয়ার মুসলিম ভাইদের পরিণতিতে প্রভাবিত হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

১২৯৭ হিজরিতে (১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে) অনুষ্ঠিত মাদ্রিদ সম্মেলনের কারণে মরক্কোতে ফরাসি দখলদারি-পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়ে। সম্মেলনে সর্বসম্মতি ব্যতীত মরক্কোতে অনুপ্রবেশ না করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

**বিদেশি দখলদারি**

ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো ইসলামি বিশ্বে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তারকে ভাগ করে নেয়। মিশর পড়ে ইংল্যান্ডের ভাগে, লিবিয়া আসে ইতালির ভাগে। মরক্কো স্পেন ও ফ্রান্সের মাঝে বিভক্ত হয়ে পড়ে। উত্তরাঞ্চল আসে স্পেনের ভাগে, আর মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল হয় ফ্রান্সের। ১৩৩১ হিজরিতে (১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে) তাঞ্জিয়ার শহর আন্তর্জাতিক পরিচালনার অধীনে চলে আসে। তখন ভিনদেশি দখলদারির বিরুদ্ধে শুরু হয় তুমুল বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ।

এই বিদ্রোহের নেতাদের মাঝে অন্যতম প্রসিদ্ধ হলেন মুহাম্মাদ আবদুল কারিম খাত্তাবি। তিনি রিফ প্রদেশে স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনা করেন এবং স্পেনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে স্পেনের দৃঢ় অবস্থান অবশেষে তাকে পরাজিত ও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে।

এদিকে ফ্রান্স আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার মতো মরক্কোর সংস্কৃতি-সভ্যতাকেও ফরাসিকরণের চেষ্টা করে। মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য বারবারিয়ান জাতীয়তাবাদ তুলে ধরে ফ্রান্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলে আসে। যেসব মিত্র যুদ্ধশেষে মরক্কোকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সুলতান পঞ্চম মুহাম্মাদ তাদেরকে সাহায্য করেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। মরক্কোর জনগণের আন্দোলন আরও বেড়ে যায়। কায়রোয় প্রতিষ্ঠিত হয় 'মরক্কো মুক্তি কমিটি'।

সুলতান পঞ্চম মুহাম্মাদ মরক্কোর সংকট জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরে। ১৩৭৩ হিজরিতে ফরাসিরা সুলতান মুহাম্মাদকে নির্বাসনে পাঠায়। ফরাসি দখলদারির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়, ফরাসিরা টিকতে না পেরে পুনরায় সুলতান মুহাম্মাদকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে।

**উপনিবেশের কবল থেকে মরক্কোর স্বাধীনতা**

**মরক্কোর স্বাধীনতার পর্যায়ক্রম**

১৩৭৬ হিজরিতে (১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) ফরাসিরা মরক্কোকে স্বাধীনতা দেয়। কিন্তু ফরাসিরা মরক্কোতে কিছু সামরিক ঘাঁটি রেখে দেয়। ১৩৮১ হিজরিতে (১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে) শেষ ঘাঁটি গুটিয়ে নেয় ফরাসি সেনাবাহিনী। ফরাসি দখলদারির সময় যুক্তরাষ্ট্রও মরক্কোতে ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। তারপর বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ঘাঁটিটি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জন কেনেডির সাথে একমত হন।

মরক্কোয় মৌরিতানিয়াকে কেন্দ্র করে জটিলতা দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মৌরিতানিয়া মরক্কোর অধীনে ছিল। মৌরিতানিয়া থেকেই মুরাবিতিদের উত্থান ঘটে। মরক্কোতে ফরাসি ঔপনিবেশিকদের আগমনের আগ পর্যন্ত মৌরিতানিয়া মরক্কোর সাথে একরাষ্ট্র হয়ে থাকে। ফরাসি উপনিবেশ মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে। ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) মৌরিতানিয়ায় স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।

**স্পেন কর্তৃক দখলীকৃত অঞ্চলসমূহ**

মরক্কো স্বাধীনতা লাভের পরও তার কিছু অঞ্চল স্পেনের অধীনে রয়ে যায়। তারপর মরক্কো তার অধিকাংশ অঞ্চলই ফিরে পায়। কিন্তু মেলিলিয়া ও সিবতাহ আজ পর্যন্ত স্পেনের দখলে রয়ে গেছে এবং মরক্কো এই শহর দুটির দাবি আজও করে যাচ্ছে। ফরাসি উপনিবেশ যেসব সমস্যা রেখে গিয়েছিল তার মাঝে একটি ছিল 'সাহারা'-কেন্দ্রিক সমস্যা। সাহারার অধিবাসীরা মরক্কো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই লক্ষ্যে 'পোলিসোরিও ফ্রন্ট' গঠিত হয়।

মরক্কোর সাথে আলজেরিয়ার তানদুফ নিয়ে বিরোধ থাকায় শুরুর দিকে আলজেরিয়া পোলিসোরিও ফ্রন্টকে সাহায্য করে। কিন্তু ১৪০৮ হিজরিতে (১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) আলজেরিয়া ও মরক্কোর মাঝে সন্ধিচুক্তি হয়। সাহারায় মরক্কোর সেনাবাহিনী থাকার পরও জাতিসংঘ সাহারায় পরিণতি নির্ধারণের জন্য গণভোটের আয়োজন করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00