📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তিউনিসিয়া

📄 তিউনিসিয়া


তিউনিসিয়া ফ্রান্সের, সাইপ্রাস ইংল্যান্ডের এবং আলজাস (১৩) ও লরেইন (১৪) হবে জার্মানির—এ মর্মে ফ্রান্স, ইংল্যান্ড ও জার্মানি একমত হওয়ার পর ১২৯৮ হিজরিতে (১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রান্স তিউনিসিয়া দখল করে নেয়। ১২৯৫ হিজরিতে (১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) বার্লিন সম্মেলনে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফ্রান্স তিউনিসিয়া দখল করে নেওয়ার পর নামমাত্র উসমানি আনুগত্য টিকে থাকে। পরে তোপকাপি প্রাসাদ অধিগ্রহণের স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়।

আলজেরিয়া ও অন্যান্য দখলীকৃত দেশের মতো তিউনিসিয়াকেও ফ্রান্স ফরাসিকরণের চেষ্টা করে। কিন্তু তিউনিসিয়া তার ইসলামি বৈশিষ্ট্য টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়। ফরাসি উপনিবেশ থেকে মুক্তির পাওয়ার উদ্দেশ্যে শুরু হয় জাতীয় ও গোত্রীয় আন্দোলন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত এই আন্দোলন অব্যাহত থাকে। এর মাঝে হাবিব বোরগুবার নেতৃত্বে পরিচালিত জাতীয় আন্দোলন ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিউনিসীয় জনগণ ও আরবলিগের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত সংগ্রামের পর ১৩৭৬ হিজরিতে (১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রান্স তিউনিসিয়াকে স্বাধীনতা দেয়। হাবিব বোরগুবা তিউনিসিয়ার প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়। ফ্রান্স বিজার্ট দখল করে রাখে। ১৩৮৩ হিজরিতে (১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) বিজার্ট থেকেও সেনাপ্রত্যাহার করে নেয় ফ্রান্স। বোরগুবা ১৪০৭ হিজরি (১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত তিউনিসিয়া পরিচালনা করে। পরে শারীরিক অবস্থার কারণে তাকে পদচ্যুত করা হয়। তারপর প্রেসিডেন্ট জাইনুল আবিদিন বিন আলি ক্ষমতা গ্রহণ করে। উল্লেখ্য যে, মিশরের সাথে আবরবিশ্ব সম্পর্ক ছিন্ন করার পর আরবলিগকে কায়রো থেকে সরিয়ে তিউনিসিয়ায় নিয়ে আসা হয়। মিশরের সাথে আরবে সন্ধি হওয়ার পর ১৪০৯ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) আরব লিগ পুনরায় মিশরে ফিরে আসে।

টিকাঃ
১৩. আলজাস: উত্তর-পূর্ব ফ্রান্সের, জার্মানির সীমান্তে অবস্থিত একটি প্রদেশ। -সম্পাদক
১৪. লরেইন: আলজাস সংলগ্ন ফ্রান্সের আরেক প্রদেশ। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আলজেরিয়া

📄 আলজেরিয়া


আলজেরিয়া দখলের ইচ্ছা পূরণের জন্য তুচ্ছ অজুহাত দাঁড় করায় ফ্রান্স, যাতে ভারত ও আমেরিকা মহাদেশে ক্ষমতা হারানোর ক্ষতিপূরণস্বরূপ আলজেরিয়া হয় আফ্রিকায় প্রভাব বিস্তারের সূচনা। ১২৪৬ হিজরিতে (১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দে) ফ্রান্স আলজেরিয়া দখল করে নেয় এবং উসমানি শাসন বাতিল করে।

ফরাসি শক্তি আলজেরিয়াতে ঢুকে ফরাসিকরণ শুরু করার সময় থেকে ফরাসি উপনিবেশ প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়ে। আলজেরিয়া তার দ্বীন ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য হাজারো শহিদকে উৎসর্গ করে দেয়। এমনকি আলজেরিয়ার নামই হয়ে যায় ‘মিলিয়ন শহিদের দেশ’। আলজেরিয়া সংগ্রামের অন্যতম প্রসিদ্ধ নেতা ছিলেন আমির আবদুল কাদের জাজায়িরি। তিনি ঔপনিবেশিকদের আক্রমণ চালানোর জন্য মাসকারাত ও হারানে ঘাঁটি গড়ে তোলেন এবং ফরাসিদের ব্যাপক ক্ষতি সাধন করেন। ফরাসিরা তার সাথে চুক্তি করতে বাধ্য হয়। চুক্তিতে ফ্রান্স কর্তৃক আমির আবদুল কাদিরকে মধ্য ও পশ্চিম আলজেরিয়ার শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। তারপর ফরাসিরা যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে এবং আলজেরিয়ার আরও ভূখণ্ড দখল করতে সক্ষম হয়। আমির আবদুল কাদির মারাকেশে(১৫) পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। কিন্তু ফরাসিরা মারাকেশেও চাপ প্রয়োগ করে। মারাকেশের শাসক আবদুল কাদিরকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। আমির আবদুল কাদির শেষপর্যন্ত ফরাসিদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হন। ফরাসিরা তাকে দামেশকে নির্বাসন দেয়। তিনি দামেশকে থাকা অবস্থায়ই মৃত্যুবরণ করেন।

আলজেরিয়ার ওপর ফরাসি নির্যাতন বাড়তেই থাকে। দখলদাররা মুসলিমদের জমি বাজেয়াপ্ত করে ফরাসিদের দিতে শুরু করে এবং ফরাসিদেরকে আলজেরিয়ায় অভিবাসী হতে উৎসাহিত করে। এ ছাড়া আরবি ভাষা বাতিল করে ফরাসি ভাষার প্রচলন ঘটানোর চেষ্টা করে ফরাসিরা। আলজেরিয়ানদের মাঝে আজও আরবি ভাষার দুর্বলতা ও ফরাসি ভাষার দক্ষতা লক্ষ করা যায়। আলজেরিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে ঔপনিবেশিকরা তার ফল ভোগ করতে থাকে।

অত্যাচার বাড়ার সাথে সাথে প্রতিরোধও ভীষণ হতে থাকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আমির খালিদ বিন আবদুল কাদির প্রতিরোধ আন্দোলনের ঝান্ডা বহন করেন। আমেরিকান প্রেসিডেন্ট উইলসন কর্তৃক ঘোষিত ‘সেল্ফ ডিটারমিনেশন' বা স্বায়ত্তশাসনের মতো শান্তি স্থাপনের নানারকম মাধ্যম গ্রহণ করেন তিনি। কিন্তু ফরাসিরা তার সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। তারপর ১৩৪৫ হিজরিতে (১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দে) আলজেরিয়ার উলামায়ে কেরাম ইসলামি মূল্যবোধ সংরক্ষণ ও ফরাসিদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণের আহ্বান জানান। মেসালি আল-হাজের নেতৃত্বে উত্তর আফ্রিকা ‘জামাআ নাজমা' (স্টার গ্রুপ) আত্মপ্রকাশ করে। এই দলটি ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আলজেরিয়ার ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের তীব্রতা বেড়ে যায়। জার্মানির সাথে সংঘটিত যুদ্ধে প্যারিস পদানত হয় এবং জার্মান বাহিনী প্যারিসে ঢুকে পড়ে। সে সময় আলজেরিয়ানরা ফরাসিদের সাহায্য করে। এই সাহায্যের বদলায় ফরাসিরা আলজেরিয়াকে স্বাধীনতা দেওয়ার পরিবর্তে ফ্রান্সের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শার্ল দা গল সেনা প্রত্যাহার না করার চেষ্টা করে। সে মনে করতে থাকে, আলজেরিয়া ফ্রান্সের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

১৩৭৪ হিজরিতে (১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দে) আলজেরিয়ার সবচেয়ে বড় বিদ্রোহের ঘোষণা দেওয়া হয়। কায়রোতে অস্থায়ী সরকারের কার্যালয় নির্ধারণ করা হয়। আরব রাষ্ট্রগুলো আলজেরিয়ান সেনাবাহিনী ও জনগণকে প্রয়োজনীয় অর্থ দিয়ে সাহায্য করে। দীর্ঘ আট বছর বিদ্রোহ অব্যাহত থাকে। বিদ্রোহে শহিদ হয় আলজেরিয়ার অসংখ্য সন্তান। ফ্রান্স আলজেরিয়ায় টিকি রাখার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে পড়ে। অবশেষে ১৩৮২ হিজরিতে (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দে) 'ইফিয়ান' চুক্তির মাধ্যমে আলজেরিয়াকে স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয় ফ্রান্স। আহমাদ বিন বিলা গণপ্রজাতন্ত্রী আলজেরিয়ার রাষ্ট্রপতিত্ব গ্রহণ করে। যদিও তার ঝোঁক ছিল সমাজতন্ত্রের প্রতি।

**তানদুফ সংকট**

তানদুফ প্রদেশ নিয়ে মরক্কো ও আলজেরিয়ার মাঝে বিরোধ দেখা দেয়। ফ্রান্স তানদুফ প্রদেশ আলজেরিয়ার অন্তর্ভুক্ত করে নিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মরক্কো তানদুফ ফিরে পাওয়ার দাবি জানায়। এই বিরোধকে কেন্দ্র করে ১৩৮৩ হিজরিতে (১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) মরক্কো ও আলজেরিয়ার মাঝে যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কিন্তু এই যুদ্ধ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

**সামরিক অভ্যুত্থান (১৩৮৫ হিজরি/১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)**

কর্নেল হোয়ারি বুমেদিন আলজেরিয়ার শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সারাদেশে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। আহমাদ বিন বেলাকে ক্ষমতাচ্যুত করে সে নিজেই রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে। ১৩৮৮ হিজরিতে (১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে) তার শাসনামলে আলজেরিয়ার জলসীমায় পুনরায় ফরাসি নৌঘাঁটি স্থাপিত হয়। ১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) হোয়ারি বুমেদিন মৃত্যুবরণ করে। তার মৃত্যুর পর আলজেরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট শাজিলি বিন জাদিদ জয় লাভ করে। তার আমলে মরক্কো ও আলজেরিয়ার মাঝে সন্ধিচুক্তি হয়। কিন্তু তার শাসনামলেই দলীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে 'ইসলামিক সালভেশন ফ্রন্ট' জয় লাভ করে।

আলজেরিয়ায় অভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয় চাপ বাড়তে থাকে। কারণ, আলজেরিয়ার সামরিক শাসন অন্য কারও হাতে শাসনক্ষমতা অর্পণ করতে সম্মত নয়; বিশেষ করে সেই 'অন্য কেউ' যদি হয় ইসলামপন্থী। একই সময়ে বাইরের ইসলামের শত্রুরা আশঙ্কা করছিল, ইরানের ইসলামি অভ্যুত্থানের(১৬) পর আরেকটি নতুন ইসলামি রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে। সরকার যৌক্তিক কারণ ছাড়াই নির্বাচন বাতিল করে দেয়। তাই শাজিলি বিন জাদিদকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

আলজেরিয়ায় বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। আবদুল মালিক বিন হাবিলিস ক্ষমতা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। তারপর মুহাম্মাদ বুদিয়াফ ক্ষমতা গ্রহণ করে। আলজেরিয়ার পরিস্থিতি উত্তাল হয়ে ওঠে। বিশৃঙ্খলা বেড়েই চলে। হাজারো আলজেরিয়ান নিহত হয়। প্রেসিডেন্ট বুদিয়াফ আন্নাবায় আততায়ীর হাতে নিহত হয়। তারপর আলি কাফি ক্ষমতা গ্রহণ করে। কিন্তু তারও বেশিদিন ক্ষমতায় থাকা হয়নি। আলজেরিয়ার সংগ্রামও বন্ধ করতে পারেনি সে।

তারপর প্রেসিডেন্ট জেরোওয়ালের আগমন ঘটে। সে ক্ষমতা গ্রহণ করে। তার আমলে কয়েকটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। অনেক সমালোচক নির্বাচনে জালিয়াতির ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে। আলজেরিয়ার গোলযোগ অব্যাহত থেকে যায়। প্রশাসন দেশ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং হাজারো মানুষের মৃত্যু ঠেকাতে অক্ষম হয়ে পড়ে। তারপর আবদুল আজিজ বুতেফ্লিকার শাসনক্ষমতা গ্রহণ করে। সে জাতীয় শান্তিস্থাপনের ঘোষণা দেয়। অতঃপর ধীরে ধীরে আলজেরিয়ায় স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করে।

টিকাঃ
১৫. আটলান্টিক মহাসাগরের তীরবর্তী এবং উত্তরে ভূমধ্যসাগরের জিব্রাল্টার প্রণালি পর্যন্ত বিস্তৃত উত্তর আফ্রিকার দেশ মরক্কোর মারাকেশ-তেনসিফট-আল হৌজ অঞ্চলের মারাকেশ প্রদেশের রাজধানী। এটি দেশটির চতুর্থ মহানগর। -সম্পাদক
১৬. স্মর্তব্য যে, ইরানের শিয়া অভ্যুত্থানকে অনেকে ইসলামি বিপ্লব মনে করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইরানের এ বিপ্লব ইসলামি কোনো বিপ্লব ছিল না। বরং তা ছিল শিয়াদের একটি অভ্যুত্থান। আর শিয়াদের যতগুলো দল আছে, তার অধিকাংশই কাফের। ইরানের রাষ্ট্রক্ষমতায় বর্তমানে যারা আছে, তারা সবাই ইসনা আশারিয়া শিয়া, যাদের কুফরি সুস্পষ্ট হওয়ায় তারা সবাই দলগতভাবে কাফের। তাই এসব ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 মরক্কো সাম্রাজ্য

📄 মরক্কো সাম্রাজ্য


আব্বাসি আমল থেকে ফরাসি দখলদারি পর্যন্ত এই সময়ে স্বাধীনতা অর্জনকারী সর্ববৃহৎ ইসলামি ভূখণ্ড হচ্ছে মরক্কো সাম্রাজ্য। পশ্চিম আফ্রিকায় ইসলাম প্রচারে ও আন্দালুসের মুসলিমদের সাহায্যকরণে মরক্কোবাসীদের বড় অবদান রয়েছে।

যখন আব্বাসি খিলাফত দুর্বল হতে শুরু করে এবং খিলাফতের সদস্যদের মাঝে অনৈক্য দেখা দেয়, তখন মরক্কোতে ইদরিসি রাজবংশের উত্থান ঘটে। ইদরিসিরা ১৭২-৩৭৫ হিজরির মাঝে মরক্কোতে কর্তৃত্ব করতে সক্ষম হয়। তারপর ইদরিসি সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। মরক্কোর গোত্রগুলো স্বাধীনতা লাভ করে। ফাতিমিরা চলমান অবস্থা কাজে লাগিয়ে মরক্কোর উত্তরাঞ্চল পর্যন্ত কর্তৃত্ব বিস্তার করে।

তারপর মুরাবিতিরা ৪৪৮-৫৪১ হিজরি (১০৫৬-১১৪৭ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মরক্কো শাসন করে। ৫২৪ হিজরির (১১৩১ খ্রিষ্টাব্দের) মাঝে মুওয়াহহিদি খিলাফতের উত্থান ঘটে। ৬৬৮ হিজরি (১২৭০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত তাদের সাম্রাজ্য টিকে থাকে। ৫৯১ হিজরিতে বনু মারিন তথা মারিন সাম্রাজ্য মরক্কোতে কর্তৃত্ব বিস্তার করতে শুরু করে। তারা ৯৫৭ হিজরি (১৫৫১ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত কর্তৃত্ব করে। এর মাঝে পর্তুগিজরা মরক্কোর অনেক অঞ্চল দখল করে নেয় এবং আন্দালুসে ইসলামের সর্বশেষ ঘাঁটি গ্রানাডার পতন ঘটে। পর্তুগিজদের দখলদারির সময় বুন ওয়াতাসের উত্থান ঘটে। পর্তুগিজ দখলদাররা যেসব অঞ্চল পদানত করে মুসলিমদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালিয়েছিল, সেসব অঞ্চল থেকে দখলদারদের উৎখাত করার জন্য যুদ্ধ করে তারা।

তারপর হুসাইনি বংশীয় শাসকদের উত্থান ঘটে। জনগণ তাদের পাশে সমবেত হতে থাকে। তারা পর্তুগিজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে এবং ৯১৫-১০৬৯ হিজরি (১৫০৯-১৬৫৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত মরক্কো শাসন করে। তাদের শাসনামলে উসমানি খিলাফত আলজেরিয়ায় পৌঁছে মরক্কোর সীমানা পর্যন্ত চলে আসে। পর্তুগিজ ও স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সময় উসমানিরা মরক্কোর কাছ থেকে সাহায্য গ্রহণ করত। মরক্কোর শাসকরাও অনেক সময় নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে এবং যেকোনো বিদ্রোহ দমন করতে কিংবা পর্তুগাল ও স্পেনের শত্রুতা প্রতিরোধ করতে উসমানিদের সাহায্য নিত। কিন্তু ইসলামের শত্রুরা মরক্কোর শাসকদের মনে উসমানিদের ব্যাপারে ভয় ঢুকিয়ে দেয়। এ কারণে মরক্কোর অধিবাসীরা উসমানি নেতৃত্বের স্বীকৃতি দেয়নি। তেমনইভাবে স্প্যানিশ ও পর্তুগিজদের মোকাবিলায় মুসলিমদের মাঝে অনৈক্য সৃষ্টি না করার ইচ্ছায় উসমানিরাও মরক্কোকে নিজেদের সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেনি।

হুসাইনি শাসকরা ধীরে ধীরে দুর্বল হতে থাকে। মরক্কোর গোত্রগুলো তাদের শাসন থেকে মুক্ত হতে শুরু করে। এ সময় শাবানাত পরিবারের উত্থান ঘটে। শাবানাত পরিবার হুসাইনিদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয় এবং তাদের প্রভাব শেষ করে দিতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই অবস্থা বেশিদিন স্থায়ী হয় না। ফালালি শাসকদের উত্থান ঘটে। তারা শাবানাত পরিবারকে ধ্বংস করে দেয় এবং মরক্কোর অধিবাসীরা তাদের বশ্যতা স্বীকার করে নেয়। আজ পর্যন্ত তারাই মরক্কো শাসন করছে।

**মরক্কোর বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতি**

ফালালি শাসক মাওলা সুলাইমান মরক্কোর ওপর বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি চাপিয়ে দেয়। সে স্পেনের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করে। চুক্তিতে মরক্কোর কিছু উপকূলীয় শহরে স্প্যানিশদের দখলদারির স্বীকৃতি দেয় এবং ইউরোপ উপকূলে ও জাহাজে মরক্কোর আক্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। মরক্কোর ব্যবসায়ীদের ইউরোপে ব্যবসা পরিচালনার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করে সে। এ ধরনের আরও কিছু পন্থা মরক্কোকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে। আলজেরিয়ায় ফরাসি দখলদারি শুরু হওয়া পর্যন্ত এই বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি চলতে থাকে। মরক্কো আলজেরিয়ার মুসলিম ভাইদের পরিণতিতে প্রভাবিত হয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়।

১২৯৭ হিজরিতে (১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দে) অনুষ্ঠিত মাদ্রিদ সম্মেলনের কারণে মরক্কোতে ফরাসি দখলদারি-পরিকল্পনার বাস্তবায়ন পিছিয়ে পড়ে। সম্মেলনে সর্বসম্মতি ব্যতীত মরক্কোতে অনুপ্রবেশ না করার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।

**বিদেশি দখলদারি**

ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো ইসলামি বিশ্বে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তারকে ভাগ করে নেয়। মিশর পড়ে ইংল্যান্ডের ভাগে, লিবিয়া আসে ইতালির ভাগে। মরক্কো স্পেন ও ফ্রান্সের মাঝে বিভক্ত হয়ে পড়ে। উত্তরাঞ্চল আসে স্পেনের ভাগে, আর মধ্য ও দক্ষিণাঞ্চল হয় ফ্রান্সের। ১৩৩১ হিজরিতে (১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে) তাঞ্জিয়ার শহর আন্তর্জাতিক পরিচালনার অধীনে চলে আসে। তখন ভিনদেশি দখলদারির বিরুদ্ধে শুরু হয় তুমুল বিদ্রোহ ও প্রতিরোধ।

এই বিদ্রোহের নেতাদের মাঝে অন্যতম প্রসিদ্ধ হলেন মুহাম্মাদ আবদুল কারিম খাত্তাবি। তিনি রিফ প্রদেশে স্প্যানিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনা করেন এবং স্পেনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করেন। কিন্তু তার বিরুদ্ধে স্পেনের দৃঢ় অবস্থান অবশেষে তাকে পরাজিত ও আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করে।

এদিকে ফ্রান্স আলজেরিয়া ও তিউনিসিয়ার মতো মরক্কোর সংস্কৃতি-সভ্যতাকেও ফরাসিকরণের চেষ্টা করে। মুসলিমদের ঐক্যে ফাটল ধরানোর জন্য বারবারিয়ান জাতীয়তাবাদ তুলে ধরে ফ্রান্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলে আসে। যেসব মিত্র যুদ্ধশেষে মরক্কোকে স্বাধীনতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, সুলতান পঞ্চম মুহাম্মাদ তাদেরকে সাহায্য করেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। মরক্কোর জনগণের আন্দোলন আরও বেড়ে যায়। কায়রোয় প্রতিষ্ঠিত হয় 'মরক্কো মুক্তি কমিটি'।

সুলতান পঞ্চম মুহাম্মাদ মরক্কোর সংকট জাতিসংঘের কাছে তুলে ধরে। ১৩৭৩ হিজরিতে ফরাসিরা সুলতান মুহাম্মাদকে নির্বাসনে পাঠায়। ফরাসি দখলদারির বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন শুরু হয়, ফরাসিরা টিকতে না পেরে পুনরায় সুলতান মুহাম্মাদকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনে।

**উপনিবেশের কবল থেকে মরক্কোর স্বাধীনতা**

**মরক্কোর স্বাধীনতার পর্যায়ক্রম**

১৩৭৬ হিজরিতে (১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) ফরাসিরা মরক্কোকে স্বাধীনতা দেয়। কিন্তু ফরাসিরা মরক্কোতে কিছু সামরিক ঘাঁটি রেখে দেয়। ১৩৮১ হিজরিতে (১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দে) শেষ ঘাঁটি গুটিয়ে নেয় ফরাসি সেনাবাহিনী। ফরাসি দখলদারির সময় যুক্তরাষ্ট্রও মরক্কোতে ঘাঁটি স্থাপন করেছিল। তারপর বাদশাহ দ্বিতীয় হাসান যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে ঘাঁটিটি সরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে জন কেনেডির সাথে একমত হন।

মরক্কোয় মৌরিতানিয়াকে কেন্দ্র করে জটিলতা দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত মৌরিতানিয়া মরক্কোর অধীনে ছিল। মৌরিতানিয়া থেকেই মুরাবিতিদের উত্থান ঘটে। মরক্কোতে ফরাসি ঔপনিবেশিকদের আগমনের আগ পর্যন্ত মৌরিতানিয়া মরক্কোর সাথে একরাষ্ট্র হয়ে থাকে। ফরাসি উপনিবেশ মরক্কো ও মৌরিতানিয়ার মাঝে বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে। ১৩৮০ হিজরিতে (১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) মৌরিতানিয়ায় স্বাধীন প্রজাতন্ত্রের ঘোষণা দেওয়া হয়।

**স্পেন কর্তৃক দখলীকৃত অঞ্চলসমূহ**

মরক্কো স্বাধীনতা লাভের পরও তার কিছু অঞ্চল স্পেনের অধীনে রয়ে যায়। তারপর মরক্কো তার অধিকাংশ অঞ্চলই ফিরে পায়। কিন্তু মেলিলিয়া ও সিবতাহ আজ পর্যন্ত স্পেনের দখলে রয়ে গেছে এবং মরক্কো এই শহর দুটির দাবি আজও করে যাচ্ছে। ফরাসি উপনিবেশ যেসব সমস্যা রেখে গিয়েছিল তার মাঝে একটি ছিল 'সাহারা'-কেন্দ্রিক সমস্যা। সাহারার অধিবাসীরা মরক্কো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা প্রকাশ করে। এই লক্ষ্যে 'পোলিসোরিও ফ্রন্ট' গঠিত হয়।

মরক্কোর সাথে আলজেরিয়ার তানদুফ নিয়ে বিরোধ থাকায় শুরুর দিকে আলজেরিয়া পোলিসোরিও ফ্রন্টকে সাহায্য করে। কিন্তু ১৪০৮ হিজরিতে (১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) আলজেরিয়া ও মরক্কোর মাঝে সন্ধিচুক্তি হয়। সাহারায় মরক্কোর সেনাবাহিনী থাকার পরও জাতিসংঘ সাহারায় পরিণতি নির্ধারণের জন্য গণভোটের আয়োজন করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত বিষয়টি অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00