📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 তাওফিক ও মিশরে ইংরেজ উপনিবেশ

📄 তাওফিক ও মিশরে ইংরেজ উপনিবেশ


তাওফিক ছিল দুর্বল। সে ইউরোপের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখত। মনে করা হয়, তাকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে ইউরোপের বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। তার শাসনকালে ১২৯৮ হিজরিতে (১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে) অত্যাচারী কর্মকর্তাদের ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য দুইবার আরাবিয়া বিদ্রোহ হয়। খেদিভ আরাবিয়া বিদ্রোহে আনুগত্য প্রকাশ করে এবং ক্রমশ দুর্বল হতে থাকা প্রধান কার্যালয় হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা করতে থাকে।

ইংরেজরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিশরে ঢুকে প্রধান কার্যালয় রক্ষা করার প্রস্তাব পেশ করে। তাওফিক প্রস্তাব মেনে নেয়। অবশেষে ইংরেজরা মিশরে ঢুকতে শুরু করে। আহমাদ আরাবি ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কিন্তু তিনি তিল্ল আল-কাবিরের যুদ্ধে পরাজিত হন। মিশর ইংরেজ কর্তৃত্বের অধীনে চলে আসে। খেদিভ তাওফিকই এই কর্তৃত্বকে সমর্থন করত। সে মনে করত, ইংরেজরা তার ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখবে। আরবি ও তার সঙ্গীদেরকে শ্রীলঙ্কায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

তাওফিকের শাসনামলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল সুদানের মাহদিয়া বিদ্রোহ। ইংরেজদের পরিকল্পনা ছিল, মিশর সুদান ত্যাগ করবে। তারপর ইংরেজরা এসে সুদান দখল করে নেবে। একপর্যায়ে ইংরেজরা সুদান থেকে সেনাপ্রত্যাহার করার জন্য মিশরকে চাপ দিতে শুরু করে। ফলে মাহদিয়া বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ মিশরীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নানামুখী বিজয় এনে দেয় এবং মিশরীয় সেনাবাহিনী সুদান ত্যাগ করে। ইংল্যান্ডের সামনে সুযোগ চলে আসে। ইংল্যান্ড আগে থেকেই চাইত, সুদানে মিশরের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনবে। ইংল্যান্ড মাহদিয়ার বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে সুদানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সুদানকে মিশরের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়। অথবা আরও সঠিক অর্থে বলা যায়, ইংরেজ কর্তৃত্বের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। একে বলা যায় ইংরেজ-মিশরীয় দ্বিপাক্ষিক শাসন।

তাওফিক ১৩১০ হিজরিতে (১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইনতেকাল করে। তার ছেলে আব্বাস হিলমি তার স্থলাভিষিক্ত হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আব্বাস হিলমি

📄 আব্বাস হিলমি


আব্বাস হিলমির শাসনকালে মিশর থেকে ইংরেজ দখলদারি উচ্ছেদের আহ্বানে আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু অত্যন্ত আফসোসের বিষয়, আন্দোলনগুলো গোত্রীয় নীতি অনুযায়ী চলতে থাকে। সে সময় মোস্তফা কামিলের আন্দোলনও সংঘটিত হয়। মোস্তফা কামিল জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইসলামের অধিক নিকটবর্তী। সে মিশরের সাথে উসমানি সালতানাতের সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করে।

লর্ড ক্রোমার যখন মিশরে ব্রিটিশ হাই-কমিশনার ছিল, তখন মিশরের খেদিভ(১১) এসব আন্দোলন সমর্থন করত। তার শাসনামলে ১৩২৪ হিজরিতে (১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে) ডেনশাওয়ে ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়। মন্ত্রণালয়ে বুত্রোস গালির মতো অনেক বিশ্বাসঘাতক দেখা দেয়। বুত্রোস গালি ডেনশাওয়ে ঘটনায় চারজন মিশরিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড, আটজনকে বেত্রাঘাত ও বারোজনকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার ফায়সালা দেয়। এভাবে তার বিশ্বাসঘাতকতা চলতেই থাকে। সুয়েজ খালে প্রভাব বিস্তারকারী বিদেশি সংস্থার জন্য সুয়েজ খাল ব্যবহারের ছাড় দেওয়া হয়। সে ১৩২২ হিজরিতে (১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে) গুপ্তহত্যার শিকার হয়।

১৩২৬ হিজরিতে (১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে) মোস্তফা কামিলের মৃত্যুর পর মুহাম্মাদ ফরিদ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। মুহাম্মাদ ফরিদ স্বাধীনতার ডাক দেয়। তাকে বন্দি করে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে সে মিশর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইউরোপে শরণার্থী হয়ে ১৩৩৮ হিজরিতে (১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে) তার ইনতেকাল হয়।

সে সময় নতুন ব্রিটিশ দূত এলডোন গ্রুসত মিশরে আগমন করে, যে খেদিভ উপাধি লাভের রাজনীতি অনুসরণ করে এবং জনগণের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সহযোগিতা করে। তারপর কিচেনার নামে আরেকজন ব্রিটিশ দূত মিশরে আসে। সে জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য রাজনীতির পরিবর্তন ঘটায় এবং খেদিভ উপাধি ত্যাগ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সে উসমানি খিলাফতের পক্ষ নেয়। ইংরেজরা তাকে ত্যাগ করে নামকাওয়াস্তে চলতে থাকা উসমানি খিলাফতের অধীনতা বাতিল করে মিশরে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব ঘোষণা করে。

টিকাঃ
১১. খেদিভ: মিশরে নিযুক্ত উসমানি সালতানাতের গভর্নরদের উপাধি ছিল খেদিভ। ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এর প্রচলন শুরু হয়। -সম্পাদক

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 হুসাইন কামিল

📄 হুসাইন কামিল


তার আমলে শুধু বাহ্যিক ক্ষমতা ছিল সরকারের, আর প্রকৃত কর্তৃত্ব ছিল ইংরেজদের হাতে, যারা উসমানি খলিফার বিপরীতে তাকে সুলতান উপাধি দেয়। ব্রিটিশ কর্তৃত্বের পথে চলা ব্যতীত সে না কোনো মত প্রকাশ করেছে, আর না কোনো আপত্তি করেছে। ১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত সে এই পদেই বহাল থাকে।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 আহমাদ ফুয়াদ

📄 আহমাদ ফুয়াদ


আহমাদ ফুয়াদ তার ভাইয়ের মৃত্যুর পর ক্ষমতা লাভ করে। তার শাসনামলে ১৩২৮ হিজরিতে (১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে) বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর প্যারিসে অনুষ্ঠিত সন্ধি-সম্মেলনে ইংরেজ দখলদারি থেকে মিশর-স্বাধীনতার দাবি নিয়ে সাদ জগলুল ও তার সঙ্গীদের অংশগ্রহণ করতে বাধা দেওয়ায় এই বিদ্রোহ ঘটে। সাদ জগলুল ও তার সঙ্গীদের মাল্টায় নির্বাসিত করা হয়। পরে ইংল্যান্ড সাদ ও তার সঙ্গীদের মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। মুক্তি পেয়ে তারা প্যারিসে চলে যায়। তাদের ধারণা ছিল, অন্যান্য ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র তাদের অধিকার ফিরিয়ে দেবে। কিন্তু তারা অপমানিত হয়। মিশরের বিদ্রোহ আরও বেড়ে যায়। ইংরেজরা সাদ জাগলুল ও তার সঙ্গীদের সাথে আলোচনায় বসে।

১৩৪০ হিজরিতে (১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে) ইংল্যান্ড মিশরকে বাহ্যিক স্বাধীনতা দিতে বাধ্য হয়, যাতে নির্ধারণ করা হয়, মিশরে ইংরেজ সামরিক শক্তি বাকি থাকবে। ইংল্যান্ডের দায়িত্ব থাকবে, মিশর থেকে বহিরাগত হস্তক্ষেপ প্রতিরোধ করা এবং মিশরে অবস্থানরত বহিরাগতদের নিরাপত্তা বিধান করা।

বিদ্রোহে মিশরীয় ও ইংরেজদের মাঝে বাদশাহ ফুয়াদের অবস্থান ছিল নিরপেক্ষ। পরে ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সে ইংরেজদের সাহায্য করতে শুরু করে। ১৯৩৬ সালে (১৩৫৫ হিজরিতে) ইংল্যান্ড মিশরের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদিত করে, যাতে ২৮ ফেব্রুয়ারির কয়েকটি ধারা পাল্টে যায়। যেমন: ইংরেজদের পরিবর্তে বহিরাগতদের জন্য মিশরকে রক্ষা করা, সুয়েজ খালের ভূখণ্ডে ইংরেজ সামরিক শক্তি টিকিয়ে রাখা, মিশরে বহিরাগতদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান বাতিল করার চেষ্টা করা এবং সুদানে দ্বিপাক্ষিক শাসন জারি করা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, ইংল্যান্ড দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগমন টের পাচ্ছিল। তাই এই মর্মে চুক্তি হয় যে, যুদ্ধ পরিস্থিতিতে মিশরের অভ্যন্তরে মিশর ব্রিটেনকে সাহায্য করবে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00