📄 ইসমাইল
ইসমাইল বিন ইবরাহিমের শাসনামলে ধর্মীয় বিষয়ে অবহেলা, পাশ্চাত্যের অনুকরণ, ঋণের আধিক্য ও বিলাসিতার দিক থেকে মিশর এক কদর্য রূপ ধারণ করে। তবে রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড সম্প্রসারণ এবং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার বেশকিছু সাফল্য রয়েছে। নীলনদের উৎস ভিক্টোরিয়া হ্রদ থেকে নীলনদের মোহনা ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত পৌঁছে যায় ইসমাইলের আফ্রিকান বিজয়াভিযান। আবিসিনিয়ার বহু অঞ্চল সে মিশরের অন্তর্ভুক্ত করে। সোমালিয়াতেও যুদ্ধ পরিচালনা করে উত্তরাঞ্চল দখল করে। সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে সে মিশর ও সুদানে অনেক বিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে। সভ্যতার ক্ষেত্রে নগর নির্মাণ, সংস্কার ও হাসপাতাল নির্মাণে গুরুত্বারোপ করে।
রাজনৈতিক ক্ষেত্রে সে মুহাম্মাদ আলি পরিবারের সবচেয়ে বড় সদস্যকে ক্ষমতা প্রদানের পরিবর্তে তার পরিবারের বড় সদস্যকে ক্ষমতা অর্পণ করার নিয়ম করে। সাইদও এই পরিবর্তন করতে চেয়েছিল, কিন্তু ইসমাইল তা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হয়। ইসমাইলের শাসনামলেই নির্দিষ্ট পরিমাণ সেনাসংখ্যার নিয়ম থেকে বেরিয়ে এসে মিশর সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির অধিকার লাভ করে। সাইদের আমলে সুয়েজ খাল খননে বিনা পারিশ্রমিকে জোরপূর্বক শ্রম দেওয়ার যে নিয়ম করা হয়েছিল, তা রহিত করে ইসমাইল। জনগণকে কাজে লাগানোর পরিবর্তে সুয়েজ খাল সংস্থাকে তিন মিলিয়ন উনিশ হাজার পাউন্ড প্রদানের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করে সে। বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে মিশরও দাসমুক্তি আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে। এ ছাড়া ইসমাইল তার জন্য এবং তার অনুসারীদের জন্য 'খেদিভ' (ডেপুটি সুলতান) উপাধি চালু করে। এর পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে সে।
তার নেতিবাচক দিকগুলো হলো, তার শাসনামলে বিলাসিতা ও ঋণ বেড়ে যায়। সুয়েজ খাল উদ্বোধন অনুষ্ঠানের পেছনেই তার কয়েক মিলিয়ন পাউন্ড খরচ হয়ে যায়। সেই অনুষ্ঠানে ইউরোপের রাজা-বাদশাহদের অভ্যর্থনা জানানো হয়। উপস্থিতদের প্রদর্শনের জন্য অপেরা হাউজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। অভ্যর্থনার জন্য বিভিন্ন প্রাসাদ ও পার্ক নির্মাণ করা হয়। এসব করতে গিয়ে সে চড়া সুদের বিনিময়ে ঋণ গ্রহণ করে এবং সুয়েজ খালের মিশরীয় অংশ ইংল্যান্ডের কাছে বিক্রি করে দেয়। এর কারণে মিশরের ওপর ইংল্যান্ডের শক্তিশালী প্রভাব পড়ে। ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো তাদের ঋণ চাইতে শুরু করে। ঋণ পরিশোধে খেদিভের অক্ষমতা দেখে মিশরের রাষ্ট্রীয় কোষাগার রক্ষণাবেক্ষণ ও ঋণ আদায়ের জন্য ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স দ্বিপাক্ষিক কমিটি নির্ধারণ করে। এই কমিটি মিশরের সমস্ত বিষয়; এমনকি মন্ত্রী নির্ধারণ ও বরখাস্তকরণেও নাক গলাতে শুরু করে।
ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো আফ্রিকায় ইসমাইলের প্রভাব দেখে আশঙ্কা করতে শুরু করে, আফ্রিকান কর্তৃত্বের ক্ষেত্রে ইসমাইল তাদের সাথে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে। তাই উসমানি খলিফা কর্তৃক ইসমাইলকে ক্ষমতাচ্যুত করার সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়। মুহাম্মাদ আলির মতো পরিণতি বরণ করার আশঙ্কায় ইসমাইল এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করতে পারে না।
📄 তাওফিক ও মিশরে ইংরেজ উপনিবেশ
তাওফিক ছিল দুর্বল। সে ইউরোপের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখত। মনে করা হয়, তাকে ক্ষমতায় আনার ক্ষেত্রে ইউরোপের বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। তার শাসনকালে ১২৯৮ হিজরিতে (১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দে) অত্যাচারী কর্মকর্তাদের ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য দুইবার আরাবিয়া বিদ্রোহ হয়। খেদিভ আরাবিয়া বিদ্রোহে আনুগত্য প্রকাশ করে এবং ক্রমশ দুর্বল হতে থাকা প্রধান কার্যালয় হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা করতে থাকে।
ইংরেজরা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে মিশরে ঢুকে প্রধান কার্যালয় রক্ষা করার প্রস্তাব পেশ করে। তাওফিক প্রস্তাব মেনে নেয়। অবশেষে ইংরেজরা মিশরে ঢুকতে শুরু করে। আহমাদ আরাবি ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। কিন্তু তিনি তিল্ল আল-কাবিরের যুদ্ধে পরাজিত হন। মিশর ইংরেজ কর্তৃত্বের অধীনে চলে আসে। খেদিভ তাওফিকই এই কর্তৃত্বকে সমর্থন করত। সে মনে করত, ইংরেজরা তার ক্ষমতার মসনদ টিকিয়ে রাখবে। আরবি ও তার সঙ্গীদেরকে শ্রীলঙ্কায় নির্বাসনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
তাওফিকের শাসনামলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল সুদানের মাহদিয়া বিদ্রোহ। ইংরেজদের পরিকল্পনা ছিল, মিশর সুদান ত্যাগ করবে। তারপর ইংরেজরা এসে সুদান দখল করে নেবে। একপর্যায়ে ইংরেজরা সুদান থেকে সেনাপ্রত্যাহার করার জন্য মিশরকে চাপ দিতে শুরু করে। ফলে মাহদিয়া বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। এই বিদ্রোহ মিশরীয় কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে নানামুখী বিজয় এনে দেয় এবং মিশরীয় সেনাবাহিনী সুদান ত্যাগ করে। ইংল্যান্ডের সামনে সুযোগ চলে আসে। ইংল্যান্ড আগে থেকেই চাইত, সুদানে মিশরের কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনবে। ইংল্যান্ড মাহদিয়ার বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করে সুদানে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সুদানকে মিশরের অন্তর্ভুক্ত করতে সক্ষম হয়। অথবা আরও সঠিক অর্থে বলা যায়, ইংরেজ কর্তৃত্বের অন্তর্ভুক্ত করে নেয়। একে বলা যায় ইংরেজ-মিশরীয় দ্বিপাক্ষিক শাসন।
তাওফিক ১৩১০ হিজরিতে (১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দে) ইনতেকাল করে। তার ছেলে আব্বাস হিলমি তার স্থলাভিষিক্ত হয়।
📄 আব্বাস হিলমি
আব্বাস হিলমির শাসনকালে মিশর থেকে ইংরেজ দখলদারি উচ্ছেদের আহ্বানে আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু অত্যন্ত আফসোসের বিষয়, আন্দোলনগুলো গোত্রীয় নীতি অনুযায়ী চলতে থাকে। সে সময় মোস্তফা কামিলের আন্দোলনও সংঘটিত হয়। মোস্তফা কামিল জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করে। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইসলামের অধিক নিকটবর্তী। সে মিশরের সাথে উসমানি সালতানাতের সম্পর্ক দৃঢ় করার চেষ্টা করে।
লর্ড ক্রোমার যখন মিশরে ব্রিটিশ হাই-কমিশনার ছিল, তখন মিশরের খেদিভ(১১) এসব আন্দোলন সমর্থন করত। তার শাসনামলে ১৩২৪ হিজরিতে (১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে) ডেনশাওয়ে ট্র্যাজেডি সংঘটিত হয়। মন্ত্রণালয়ে বুত্রোস গালির মতো অনেক বিশ্বাসঘাতক দেখা দেয়। বুত্রোস গালি ডেনশাওয়ে ঘটনায় চারজন মিশরিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড, আটজনকে বেত্রাঘাত ও বারোজনকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়ার ফায়সালা দেয়। এভাবে তার বিশ্বাসঘাতকতা চলতেই থাকে। সুয়েজ খালে প্রভাব বিস্তারকারী বিদেশি সংস্থার জন্য সুয়েজ খাল ব্যবহারের ছাড় দেওয়া হয়। সে ১৩২২ হিজরিতে (১৯১০ খ্রিষ্টাব্দে) গুপ্তহত্যার শিকার হয়।
১৩২৬ হিজরিতে (১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে) মোস্তফা কামিলের মৃত্যুর পর মুহাম্মাদ ফরিদ তার স্থলাভিষিক্ত হয়। মুহাম্মাদ ফরিদ স্বাধীনতার ডাক দেয়। তাকে বন্দি করে নির্যাতন করা হয়। একপর্যায়ে সে মিশর ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ইউরোপে শরণার্থী হয়ে ১৩৩৮ হিজরিতে (১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে) তার ইনতেকাল হয়।
সে সময় নতুন ব্রিটিশ দূত এলডোন গ্রুসত মিশরে আগমন করে, যে খেদিভ উপাধি লাভের রাজনীতি অনুসরণ করে এবং জনগণের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সহযোগিতা করে। তারপর কিচেনার নামে আরেকজন ব্রিটিশ দূত মিশরে আসে। সে জনগণকে আকৃষ্ট করার জন্য রাজনীতির পরিবর্তন ঘটায় এবং খেদিভ উপাধি ত্যাগ করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সে উসমানি খিলাফতের পক্ষ নেয়। ইংরেজরা তাকে ত্যাগ করে নামকাওয়াস্তে চলতে থাকা উসমানি খিলাফতের অধীনতা বাতিল করে মিশরে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব ঘোষণা করে。
টিকাঃ
১১. খেদিভ: মিশরে নিযুক্ত উসমানি সালতানাতের গভর্নরদের উপাধি ছিল খেদিভ। ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দ থেকে এর প্রচলন শুরু হয়। -সম্পাদক
📄 হুসাইন কামিল
তার আমলে শুধু বাহ্যিক ক্ষমতা ছিল সরকারের, আর প্রকৃত কর্তৃত্ব ছিল ইংরেজদের হাতে, যারা উসমানি খলিফার বিপরীতে তাকে সুলতান উপাধি দেয়। ব্রিটিশ কর্তৃত্বের পথে চলা ব্যতীত সে না কোনো মত প্রকাশ করেছে, আর না কোনো আপত্তি করেছে। ১৩৩৬ হিজরিতে (১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে) মৃত্যুবরণ করা পর্যন্ত সে এই পদেই বহাল থাকে।