📄 ফিলিস্তিন ও আরব-ইসরাইল সংঘর্ষ
**ফিলিস্তিন দখলের ইহুদিবাদী পরিকল্পনা**
আমরা পূর্বে উল্লেখ করেছি, উসমানি শাসনামলে স্প্যানিশরা মুসলিম ও ইহুদিদের স্পেন থেকে বিতাড়িত করে। পৃথিবী প্রশস্ত হওয়া সত্ত্বেও ইহুদিদের জন্য সংকীর্ণ হয়ে যায়। উসমানি সাম্রাজ্য ব্যতীত অন্য কোনো আশ্রয় খুঁজে পায় না ইহুদিরা। উসমানি সাম্রাজ্য দয়াপরবশ হয়ে মানবতার খাতিরে ইহুদিদেরকে বুকে টেনে নেয়। কিন্তু অকৃতজ্ঞতা ও খিলাফত ধ্বংসের মাধ্যমে ইহুদিরা এই সদ্ব্যবহারের প্রতিদান দেয়।
প্রখ্যাত জার্মান ইহুদি সাংবাদিক থিওডোর হার্টজেলের আবির্ভাব ঘটে দৃশ্যপটে। হার্টজেল ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জন্য স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণা পেশ করে। ইহুদি রাষ্ট্রের জন্য ফিলিস্তিনকে নির্বাচন করার কারণ ছিল, ইহুদিদের সাথে ফিলিস্তিনের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে। তা ছাড়া ইহুদিরা ফিলিস্তিনকে 'প্রতিশ্রুত ভূমি' বলে থাকে।
হার্টজেল খলিফা দ্বিতীয় আবদুল হামিদের সাথে ফিলিস্তিন নিয়ে দরাদরির চেষ্টা করে। খলিফা হার্টজেলের প্রস্তাব সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে ইহুদিদের জন্য ফিলিস্তিনে অভিবাসী হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। এ প্রেক্ষিতে ইহুদিরা উসমানি খিলাফত ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং একাজে মিত্রদের সহযোগিতা করতে থাকে। উসমানি সাম্রাজ্যে আরব জাতীয়তাবাদ ও ফ্রিম্যাসনারি ধারণা প্রচার করে তারা। সেই সাথে 'কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস'-এ যোগ দিতে থাকে।
দোনমে ইহুদিদের কথাও ভোলার মতো নয়। এদের অধিকাংশই ইসলাম গ্রহণ করেছে বলে ঘোষণা করে, কিন্তু মনে মনে ইহুদিই থেকে যায়। তারা ভেতর থেকে ইসলামকে ধ্বংস করতে থাকে এবং দেশে দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন ও বিশৃঙ্খলা উসকে দিতে সফল হয়। মিত্রশক্তি ইহুদিদের 'কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেস'-এ যোগ দিতে সাহায্য করে। একপর্যায়ে কমিটি অব ইউনিয়ন এন্ড প্রগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য হয়ে যায় ইহুদিরা। এরপর প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় এবং উসমানি সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।
**বেলফোর ঘোষণা (১৩৩৬ হিজরি)**
ব্রিটেনের পররাষ্ট্র সচিব আর্থার জেমস বেলফোর ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জাতীয় আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিন ইংরেজদের অধীনে চলে যায়। সারা বিশ্ব থেকে অভিবাসী ইহুদিরা আসতে শুরু করে ফিলিস্তিনে এমনকি ইহুদিদের কেন্দ্র গ্রিস থেকেও। বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আবাসভূমি প্রতিষ্ঠায় ইংরেজদের উদ্দেশ্য ছিল একদিকে আরবকে খণ্ডবিখণ্ড করে ফেলা ও আরবের আফ্রিকান অংশকে এশীয় অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, যাতে আরববিশ্বের স্থিতিশীলতা চিরদিনের জন্য দাফন হয়ে যায় ও আবরদের ঐক্য দুর্বল করে দেওয়া যায়। অন্যদিকে যেন ফিলিস্তিনকে কিনে নেওয়ার জন্য ইহুদিদের সম্পদের ঢল নেমে আসে এবং এই রাষ্ট্রগুলো তাদের অর্থনৈতিক জীবনের মেরুদণ্ডের অধিকারী ইহুদি উপনিবেশ থেকে মুক্তি পায়।
আরববিশ্ব ফিলিস্তিনে ইহুদিদের আবাসভূমি গড়ে তোলার পরিকল্পনাকে প্রত্যাখ্যান করে। ১৩৫৫ থেকে ১৩৫৮ হিজরি (১৯৩৬-১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত ভয়াবহ বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ইংরেজরা প্রথমবার ইহুদি ও আরবদের মাঝে ফিলিস্তিন ভাগ করে দেওয়ার প্রস্তাব পেশ করে। এই প্রস্তাব '১৯৩৭ সালের বিভক্তি' নামে পরিচিত। আরববিশ্ব এই প্রস্তাব সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করে। ফিলিস্তিনে ইহুদি অভিবাসন বাড়তে থাকে। এরই মাঝে ইহুদিদের ওপর জার্মান নিপীড়ন নিয়ে হাজির হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। ফিলিস্তিনের ইহুদি সংস্থা জার্মান নাজি সরকারের সম্মতিতে অনেক ইহুদিকে অভিবাসী হতে সাহায্য করে। ব্রিটিশ শক্তি দুর্বল হতে শুরু করে। আমেরিকান প্রভাব বেড়ে যায়। ইহুদিরা যুক্তরাষ্ট্র অভিমুখী হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতি কিংবা অর্থনীতি, সব ক্ষেত্রে ইহুদিদের ব্যাপক তৎপরতা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ইহুদিদের সহযোগিতা করতে শুরু করে। ১৩৬২ হিজরিতে (১৯৪৩ খ্রিষ্টাব্দে) বাল্টিমোর সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলন ফিলিস্তিনে জায়োনিস্ট পরিকল্পনাকে সমর্থন করে এবং তাদেরকে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
**৪৭-এর ফিলিস্তিন বিভক্তি (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দ)**
ফিলিস্তিনের বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপিত হলে বিভক্তির সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়। আমেরিকা জাতিসংঘের সদস্য-রাষ্ট্রগুলোকে এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। জাতিসংঘের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইহুদিদের দেওয়া হয় ফিলিস্তিনের উর্বর ভূমিগুলো, আর ফিলিস্তিনিদের দেওয়া হয় সবচেয়ে অনুর্বর ভূমি। বাইতুল মুকাদ্দাস ও অন্যান্য পবিত্র স্থান আন্তর্জাতিক অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করা হয়। ইংল্যান্ড ফিলিস্তিনে তাদের প্রতিনিধিত্ব সমাপ্তির ঘোষণা দেয়, যাতে এই সুযোগে ইহুদিরা তাদের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিতে পারে। ইহুদিদেরকে দেওয়া অনেক অঞ্চল থেকে আরবদের সরিয়ে নেওয়ার পরে এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল।
**৪৮-এর ফিলিস্তিন যুদ্ধ (১৩৬৭ হিজরি/১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ)**
ইহুদিরা ফিলিস্তিন ছাড়ার জন্য আরবদের চাপ দেয় এবং ভয় দেখায়। বড় কয়েকটি গ্রুপ ফিলিস্তিনিদের ওপর আক্রমণ করতে শুরু করে। ১৩৬৭ হিজরিতে (১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে) ‘দেইর ইয়াসিন’(১)-এ গণহত্যা সংঘটিত হয়। ইসরাইলি দখল থেকে ফিলিস্তিনকে স্বাধীন করতে যুদ্ধের বিকল্প কোনো পথ খুঁজে পায় না আরব ফিলিস্তিনিরা। এই প্রেক্ষিতে ১৩৬৮ হিজরিতে ৪৮-এর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মিশর, সিরিয়া, জর্দান ও ইরাক ফিলিস্তিনিদের সাথে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধের শুরুতে আরব মিত্রবাহিনী বিজয়ী হয়। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মুখে একমাস যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। যুদ্ধবিরতি চলাকালে আরব কিংবা ইহুদি কোনো দলই অস্ত্র নিতে পারবে না—এই মর্মে যুদ্ধবিরতি হয়।
আরব এই সিদ্ধান্ত রক্ষা করে। কিন্তু ইহুদিরা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র নেয়; পশ্চিমা বিশ্ব এ ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করে। তারপর আবার যুদ্ধ শুরু হলে মিশরীয় বাহিনীর কাছে ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের অস্ত্র-দুর্নীতির বিষয়টি প্রকাশ পায়। যুদ্ধের মোড় পাল্টে যায় এবং আরব বাহিনী পরাজয় বরণ করে। ১৯৪৭-এর বিভক্তিতে ইসরাইল যে ভূখণ্ড পেয়েছিল, ইসরাইলি ভূখণ্ড তার চেয়ে আরও বিস্তৃতি লাভ করে। বর্তমানে ইসরাইলি দখলদারি এত বিস্তৃতি লাভ করেছে যে, ফিলিস্তিনিদের মানচিত্র যেন খুঁজেই পাওয়া যায় না! এদিকে অ্যাপল ও গুগলের বিশ্বমানচিত্রে ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব না থাকার বিষয়টি অনেক আলোচিত হয়েছে।
পশ্চিম তীর জর্দান শাসনের অধীনে আসে, আর গাজা ভূখণ্ড চলে যায় মিশরীয় শাসনের অধীনে।
**১৩৭৫ হিজরি/১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দ-এর যুদ্ধ (ত্রিমুখী আগ্রাসন)**
মিশরের সাথে ইসরাইল, ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সম্মিলিত শত্রুতা সৃষ্টি হয়। মিশর সুয়েজ খাল খননের ঘোষণা দেয়, যা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জলপথে ব্রিটিশ কর্তৃত্ব শেষ করে দেবে। এ ছাড়া মিশর আলজেরিয়ার বিদ্রোহে সহযোগিতা করে (ফরাসি উপনিবেশ প্রতিরোধ করার জন্য আলজেরিয়া কায়রোতে অস্থায়ী সরকার প্রতিষ্ঠা করে, যা ফ্রান্সের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়)। আর ঠিক এই সময়ে আরব ঐক্য ও ফিলিস্তিন থেকে ইহুদি উৎখাতের আহ্বান জানায় মিশর। ১৩৭৬ হিজরিতে (১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দে) শত্রুত্রয় সিনাই উপদ্বীপে আক্রমণ করে সুয়েজ তীরবর্তী শহরগুলোতে বোমা হামলা শুরু করে। গণপ্রতিরোধ শুরু হয়। মিশর সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহায্য কামনা করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে যুক্তরাষ্ট্রও আক্রমণকারী রাষ্ট্রগুলোকে মিশর ত্যাগ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে। চাপের মুখে অত্যাচারী শক্তি মিশর ত্যাগ করে।
**৬৭-এর যুদ্ধ (১৩৮৭ হিজরি)**
ইয়ামেন যুদ্ধে আরববিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহিনী মিশরীয় সেনাদের ব্যস্ত থাকার সুযোগকে ইসরাইল কাজে লাগায়। মিশর, সিরিয়া ও জর্দানে আক্রমণ করে মিশরের কাছ থেকে গাজা ভূখণ্ড ও সিনাই উপদ্বীপ, সিরিয়ার কাছ থেকে গোলান মালভূমি এবং জর্দানের কাছ থেকে পশ্চিম তীর দখল করে নেয়। ইসরাইল যুদ্ধে বিজয় লাভ করার পর জাতিসংঘ ২৪২ নং রেজুলেশন ঘোষণা করে, যাতে ইসরাইলকে ১৩৮৭ হিজরিতে দখলীকৃত অঞ্চল থেকে সেনাপ্রত্যাহার করতে বলা হয়। কিন্তু ইসরাইল এই রেজুলেশনকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। কারণ, ইসরাইল জানত, যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য তাদের অবস্থানকে সমর্থন করবে। এর মধ্যে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সমস্যা দেখা দেয়। লেবানন শরণার্থীদের আশ্রয় দিতে সীমান্ত খুলে দেয়। ইসরাইল দখলীকৃত অঞ্চলে অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য আবাস গড়তে শুরু করে।
**১৯৭৩-এর যুদ্ধ (১৩৯৩ হিজরি)**
ইসরাইলের হাত থেকে দখলীকৃত ভূমি স্বাধীন করার জন্য আরব নিজেদেরকে প্রস্তুত করতে শুরু করে। মুসলিমবিশ্ব আরবদের পাশে দাঁড়ায়। ইসরাইলের মদদদাতা পাশ্চাত্যের কাছে পেট্রোল রপ্তানি না করার সিদ্ধান্ত নেয় মুসলিমবিশ্ব। ছয় বছর আরব-ইসরাইল সংঘর্ষ অব্যাহত থাকে। ১৩৯৩ হিজরির ১০ রমজানে দখলীকৃত ভূমি স্বাধীন করার উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায় আরব বাহিনী। আরব বাহিনী ইহুদিদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের বিজয় অর্জন করে সুয়েজ অতিক্রম করে। বার লেভ (Bar Lev) লাইনের দেয়াল গুঁড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এগিয়ে আসে ইসরাইলকে উদ্ধার করার জন্য। যুদ্ধ বন্ধের ঘোষণা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। ১৩৮৭ হিজরির (১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দের) দখলীকৃত অঞ্চল থেকে ইসরাইলের প্রত্যাহার নিশ্চিত করার ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি গ্রহণ করে আমেরিকা।
কিন্তু অতি শীঘ্রই সে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে ইসরাইল সুর পাল্টাতে শুরু করে। ইসরাইল বলে, যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়েছিল ১৩৮৭ হিজরিতে (১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে) দখলীকৃত কিছু অঞ্চল থেকে প্রত্যাহৃত হওয়ার শর্তে; পুরো অঞ্চল থেকে নয়। ইসরাইলি প্রতারণায় আরব রেগে যায়। এদিকে ১৩৯৭ হিজরিতে (১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তির উদ্যোগ নেয়। প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত দখলীকৃত ফিলিস্তিন সফর করে। সফরকালে ইসরাইলি সংসদে বক্তব্য প্রদান করে।
১৩৯৮ হিজরিতে (১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে) যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনের পরই ১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) ইসরাইল ও মিশরের মাঝে শান্তিচুক্তি সংঘটিত হয়। চুক্তিতে ইসরাইলের সিনাই উপদ্বীপ ত্যাগ করার কথা উল্লেখ করা হয়। এতে আরবদেশ আরও রেগে যায়। তারা মনে করে, মিশর কেবল নিজের স্বার্থ চিন্তা করে ফিলিস্তিনি জনগণের স্বদেশ স্বাধীন করার অধিকার খর্ব করেছে। এই প্রেক্ষিতে ১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাগদাদে আরবদের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আবরবিশ্ব মিশরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়। ওমান, সুদান ও সোমালিয়া ব্যতীত সব আরব দেশই এ ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করে। ১০ রমজান ১৩৯৩ হিজরির (৬ অক্টোবর ১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দের) যুদ্ধের পর ইসরাইলের সাথে মিশরীয়, জর্দান ও সিরিয়ান ফ্রন্টের যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায়। এর স্থলে নতুন ফ্রন্ট খোলা হয়, যারা আত্মঘাতী হামলায় অংশগ্রহণ করতে থাকে। ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের মধ্য হতে লেবাননে অনুপ্রবেশকারীরা দখলীকৃত ফিলিস্তিনে ১৩৯৫ হিজরি পর্যন্ত এসব আত্মঘাতী হামলা চালায়। ইসরাইল ও পাশ্চাত্য লেবাননে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সিদ্ধান্ত নেয়। ১৩৯৫ হিজরিতে (১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে) লেবাননে আক্ষরিক অর্থেই গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠে। ইসরাইল লেবানন ভূমিতে ঢুকে সংঘাত লাগিয়ে দেয়; যেমনটা আমরা পূর্বে 'লেবানন' অধ্যায়ে আলোচনা করেছি।
**ইরাকের পারমাণবিক চুল্লিতে আক্রমণ (১৪০১ হিজরি/১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দ)**
১৪০১ হিজরিতে ইরাকের পারমাণবিক চুল্লিতে ইসরাইল বিমান হামলা চালায়। এই আক্রমণের কারণ ছিল, ইরাকের পারমাণবিক চুল্লি ইসরাইলের নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। তখন ইরাক-ইরান যুদ্ধ চলছিল। তাই ইরাক এই হামলার কোনো প্রতিউত্তর দিতে পারেনি।
এদিকে দখলীকৃত অঞ্চলে ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি সংগ্রাম অব্যাহত থাকে। আত্মঘাতী হামলাও বাড়তে থাকে। ১৪০৭ হিজরিতে (১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে) ইসলামিক রেসিসটেন্স মুভমেন্ট হামাসের নেতৃত্বে ইসরাইলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা (আন্দোলন)-এর ঘোষণা দেওয়া হয় এবং ইসরাইল কর্তৃক দখলীকৃত ফিলিস্তিনি ভূমিতে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করা হয়।
আরব ও ইসরাইলের মাঝে আলোচনা শুরু হয়। এই উদ্দেশ্যে মাদ্রিদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ইহুদি ও ফিলিস্তিনিদের মাঝে গাজা-জেরিকো চুক্তি হয়। চুক্তিতে এই দুই ভূখণ্ডে ফিলিস্তিনি স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা এবং পশ্চিম তীরে ও গাজায় পুনরায় ইসরাইলি শক্তি বিস্তারের কথা উল্লেখ করা হয়। ১৩৯৩ হিজরিতে (১৯৭৩ খ্রিষ্টাব্দে) সাবেক ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ইসহাক রাবিনের আমলে এই চুক্তি সংঘটিত হয়। ইসরাইলি লেবার পার্টি তখন ক্ষমতায় ছিল।
তারপর ১৪১৫ হিজরিতে (১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) কট্টরপন্থী ইহুদি ইসহাক রাবিন (যে দখলীকৃত ফিলিস্তিনের এক বিঘত মাটিও ফিলিস্তিনিদের দিতে রাজি ছিল না) নিহত হয়। তারপর শিমন পেরেজ ইসরাইলি নির্বাচন চলাকালীন অস্থায়ী প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে। সে শান্তি স্থাপনের ব্যাপারে আগ্রহ প্রকাশ করে। পশ্চিম তীর ও গাজার পুনরায় ইসরাইলি শক্তি বিস্তারের মাধ্যমে গাজা-জেরিকো চুক্তির ধারাসমূহ বাস্তবায়ন করে। গোলান-সমস্যা সমাধানে আরব ও ইসরাইলের মাঝে আলোচনা হয়। তারপর লেবাননে ইসরাইলি সেনাদের হাতে কানার গণহত্যা সংঘটিত হয়।
নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এতে লিকুড পার্টি বিজয় লাভ করে। বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু প্রধানমন্ত্রিত্ব গ্রহণ করে। নেতানিয়াহু শান্তিচুক্তির সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক মতামত প্রকাশ করার পর পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে থাকে। সে অভিবাসীদের সংখ্যা বাড়াতে থাকে। বসতি নির্মাণ বন্ধে সংঘটিত অসলো চুক্তির এবং গোলান থেকে সেনাপ্রত্যাহার ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার তীব্র বিরোধিতা করে।
২৮ সেপ্টেম্বর ২০০০ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা এরিয়েল শ্যারন ইসরাইলি পুলিশের প্রহরায় বাইতুল মুকাদ্দাস পরিদর্শনে যায়। তার এই পরিদর্শন ফিলিস্তিনিদের মনে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। দ্বিতীয় ইনতিফাদা (আকসা আন্দোলন) সংঘটিত হয়। এতে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি জনগণ প্রাণ উৎসর্গ করে।
শ্যারন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর ফিলিস্তিনি ভূমিগুলোর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে ইসরাইলের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিভেদের দেয়াল গড়তে শুরু করে। সেই সাথে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধে শুরু করে গুপ্তহত্যার রাজনীতি। ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে আততায়ীর হাতে নিহত শাইখ আহমাদ ইয়াসিন ও কয়েক মাস পর নিহত হামাসের প্রসিদ্ধ নেতা ডক্টর আবদুল আজিজ রনতিসি এই গুপ্তহত্যার শিকার। (আল্লাহ তাদের দুজনের প্রতি এবং সকল শহিদের প্রতি রহম করুন, আমিন।)
টিকাঃ
১. দেইর ইয়াসিন: ফিলিস্তিনের অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রাম। এটি জেরুজালেম থেকে পশ্চিমে অবস্থিত। -সম্পাদক
১০. বার লেভ লাইন (Bar Lev Line): সুয়েজ খালের প্রান্তে পূর্ব তীরে ইসরাইল কর্তৃক নির্মিত সুরক্ষা প্রাচীর। -সম্পাদক