📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 শামে বিদেশি উপনিবেশ ও বিভক্তিকরণ

📄 শামে বিদেশি উপনিবেশ ও বিভক্তিকরণ


প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে শাম, ইরাক ও জাজিরাতুল আরব রাজনৈতিকভাবে কিংবা নামকরণের দিক থেকে উসমানিদের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বলা যায়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে উসমানি খিলাফত এই ভূখণ্ডে স্থির হতে পারেনি। এই সুযোগে ঔপনিবেশিকরা বিভিন্নভাবে উসমানি খিলাফত ও অধীনস্থ আবর রাষ্ট্রগুলোর মাঝে সম্পর্কচ্ছেদ ঘটায়। এর মাঝে অন্যতম পদ্ধতি ছিল আরব জাতীয়তাবাদের আহ্বান।

উসমানি খিলাফত থেকে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আরব রাষ্ট্রগুলোকে নানারকম প্রতিশ্রুতি ও আশার বাণী শোনায় ঔপনিবেশিকরা। হিজাযের গর্ভনর শরিফ হুসাইনকে ঔপনিবেশিকরা প্রতিশ্রুতি দেয় যে, যদি সে তাদেরকে যথাসময়ে সাহায্য করে, তাহলে তাকে উসমানি খিলাফতের অধীন আরব ভূখণ্ডের বাদশাহ বানানো হবে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে সেই কথিত যথাসময় এসে পড়ে। শরিফ হুসাইন আরবের স্বাধীনতার বিষয়ে তার চিন্তাধারা প্রকাশ করে। আল-ফাতাত (তরুণ আরব সংঘ) তাকে এই ব্যাপারে সহযোগিতা করে। শরিফ হুসাইনকে আরবের বাদশাহ বানানোর পরিকল্পনাও প্রকাশ করা হয়। ঔপনিবেশিকরা এই পরিকল্পনা প্রচারে সহযোগিতা করে। ঔপনিবেশিকদের এই সহযোগিতা মূলত শরিফ হুসাইনের জন্য ছিল না; বরং এটা ছিল আরববিশ্বে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার জন্য। তাদের দৃষ্টিতে যখন শরিফ হুসাইনের কাজ শেষ হয়ে যাবে, যখন পথ পরিষ্কার হয়ে যাবে, তখন তাদের প্রথম বলি হবে সে। কার্যত উসমানি খিলাফতের পরাজয় ও আরব ভূখণ্ড ঔপনিবেশিকদের দখলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়। প্রথমে ঔপনিবেশিকরা আরব ভূখণ্ডে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার জন্য শরিফ হুসাইনকে সম্মুখভাগে রাখে। এদিকে শরিফ হুসাইনের ছেলে ফয়সালকে শাম শাসনের জন্য নির্ধারণ করে।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে তারা এ সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসে। তারা বুঝতে পারে, উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শরিফ ও তার পরিবারকে এত উপরে তোলার প্রয়োজন নেই। বরং এতে পরিকল্পনা পাল্টে তাদের জন্য অকল্যাণ ডেকে আনতে পারে। কারণ, ফয়সালকে সিরিয়ার জন্য নিযুক্ত করা হলে সিরিয়ার সব প্রদেশ এক হয়ে যাবে। তাই তারা পরিকল্পনা করে, ফয়সালকে ইরাকের জন্য নির্ধারণ করবে এবং পূর্ব জর্দানকে শামের অঙ্গরাজ্য বানিয়ে আমির আবদুল্লাহ বিন শরিফকে তার দায়িত্ব দেবে। তাতে শরিফ হুসাইনের ও তার পরিবারের কর্তৃত্ব বাগে আনা যাবে; একই সময়ে ঔপনিবেশিকদের কর্তৃত্ব আরও ব্যাপক আকারে বিস্তৃত হবে।

পথ পরিষ্কার হতেই ঔপনিবেশিকরা তাদের আসল রূপ প্রকাশ করে এবং ফসল ঘরে তোলা শুরু করে। প্রথমেই তারা শরিফ হুসাইনকে দুর্বল করে দিতে সৌদিদের শরিফ হুসাইনের বিরুদ্ধে সাহায্য করে। শরিফ হুসাইন হিজায হারিয়ে বসে। (হিজায ছিল শরিফ হুসাইনের মূল ঘাঁটি। হিজায থেকেই পুরো আরবে তার রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রভাব বিস্তৃত হতো।)

দুদিন আগে যে শক্তি ছিল আবরবিশ্বে ঔপনিবেশিকদের প্রভাব বিস্তারের মাধ্যম, সেই শক্তির সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা থেকে বেঁচে যায় ঔপনিবেশিকরা। এরপর ইরাক ও পূর্ব জর্দান প্রদেশ ছাড়া আরবের অন্য কোথাও শরিফদের কোনো অস্তিত্ব বাকি থাকে না। কিন্তু এই দুই শাসনব্যবস্থায়ও তারা বিদেশি কর্তৃত্বের অনুগত হয়েই টিকে থাকে।

এভাবে শরিফদের থেকে সব ধরনের ঝুঁকির সম্ভাবনা শেষ করে দেয় ঔপনিবেশিকরা। তারা বিভক্তির রাজনীতি (ডিভাইড এন্ড রুল) ছড়িয়ে দিতে থাকে দেশে দেশে। আরবের জন্য এই কৌশল প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রতিরোধের কোনো পথও বাকি থাকে না তাদের। এই অংশে আমরা শামে ঔপনিবেশিক রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করব।

শামের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভক্তির শুরুতে দুই প্রদেশে দুটি উপনিবেশ কর্তৃত্ব করে। একটি ছিল ফরাসি উপনিবেশ, যা উত্তরাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করত। আর অন্যটি ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ, যা দক্ষিণাঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব করত। ফরাসিরা তাদের অধীনস্থ অঞ্চলে 'ডিভাইড এন্ড রুলের' চর্চা করে। এই উদ্দেশ্যে ফরাসিরা গ্রেট লেবানন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়, যার বীজ ছিল ম্যারোনাইটরা।

উসমানি খিলাফতের আমল থেকেই ফরাসিদের সাথে এই ম্যারোনাইটদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল। তাই ফরাসিরা তাদেরকে সিরিয়া থেকে ভিন্ন একটি সামন্তে পরিণত করে গঠন করে লেবানন সাম্রাজ্য। শুধু সিরিয়াকে বিভক্ত করেই ক্ষান্ত হয়নি ফরাসিরা; বরং সিরিয়ার বাকি ভূখণ্ডকে আরও কয়েকটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে। রাষ্ট্রগুলো হলো: দামেশক, হালাব, আলাওয়েটস, ও জর্দান সীমান্তের দরজ রাষ্ট্র। এই বিভক্তি ঘটেছিল সানজাক-ই আলেকজান্দ্রিয়া আতাতুর্কের হাতে তুলে দেওয়ার পরে।

এর মাঝে ইংরেজরা তাদের অধীনস্থ অঞ্চল ফিলিস্তিনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে। এক ভাগ তার আপন নাম নিয়ে টিকে থাকে। বেলফোর ঘোষণা বাস্তবায়িত করতে ইংরেজরা সেই ভাগকে ইহুদিদের মাতৃভূমি বানিয়ে দেয়। আর অন্য ভাগটি হলো পূর্ব জর্দানের আমিরাত, যাতে ইংরেজরা আবদুল্লাহ বিন শরিফ হুসাইনকে আমির বানিয়েছিল।

ফরাসিরা শামের যে ভূখণ্ডে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল, তাতে তারা তুমুল প্রতিরোধের মুখে পড়ে। ফরাসি উপনিবেশের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ব্যাপক আকার ধারণ করে। এই বিদ্রোহগুলোর মাঝে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সিরিয়ায় ১৩৩৮ হিজরির (১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের) ইবরাহিম হাতানুর বিদ্রোহ। ১৩৩৪-১৩৪৬ হিজরির (১৯১৬-১৯২৭ খ্রিষ্টাব্দের) মাঝে সুলতান আল-আরতাসের নেতৃত্বে পরিচালিত পাহাড়ের বিদ্রোহ ছিল সবচেয়ে বড় বিদ্রোহ।

অনেক ঔপনিবেশিকদের দুর্বল করে দেওয়ার পেছনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বড় ধরনের ভূমিকা ছিল। যেসব দেশে বিদেশি উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল, সে দেশগুলোতে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল মুসলিমদের। অধিবাসীদের মাঝে মুসলিমদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাক কিংবা না থাক, মুসলিমদের ভূমিকাই ছিল বড়। কারণ, মুসলিমদের আকিদা-বিশ্বাস অমুসলিমদের নেতৃত্ব প্রত্যাখ্যান করে। অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও মুসলিমদের এই বৈশিষ্ট্যে প্রভাবিত হয় এবং উপনিবেশের বিরুদ্ধে জেগে ওঠে। সিরিয়ায় যা ঘটেছে, তাই এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্যারিস জার্মানির পদানত হয় এবং ফরাসিরা দুর্বল হয়ে পড়ে। যদিও মিত্রশক্তি পরবর্তী সময়ে জার্মানিকে পরাজিত করে ফ্রান্সকে উদ্ধার করে, তারপরও ফ্রান্স যুদ্ধের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারেনি। অবশেষে ১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) লেবানন ও সিরিয়া সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করতে বাধ্য হয় ফরাসিরা।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 সিরিয়া

📄 সিরিয়া


আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি যে, সিরিয়ার বাকি অঞ্চল থেকে লেবানন ও আলেকজান্দ্রিয়া আলাদা হওয়ার পর ফরাসিরা সিরিয়াকে কয়েকটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করে ফেলে। কিন্তু এসব রাষ্ট্রের শাসকগণ এই বিভক্তিকে অস্বীকার করে। নিজেদের ইচ্ছাতেই একরাষ্ট্র হওয়ার ঘোষণা দেয় তারা।

১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) সিরিয়া ফরাসিদের দখল থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। সিরিয়াকে মনে করা হয় শামের উত্তরাধিকার, আর অন্যান্য রাষ্ট্রকে শামের হারানো সম্পদের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। স্বাধীন সিরিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিল শুকরি আল-কুয়াইতলি। তারপর ১৩৬৮-১৩৬৯ হিজরির (১৯৪৯-১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দের) মাঝে সিরিয়ায় তিনটি অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। প্রথমে হুসনি আল-জাইমের অভ্যুত্থান, তারপর সামি আন-নাদি এবং আদিব আশ-শিশাকলির অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। তারপর ১৩৭৩ হিজরিতে (১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দে) সাংবিধানিক জীবনাচার ও নির্বাচন ফিরিয়ে আনতে ফয়সাল আল-আতাসির নেতৃত্বে সংঘটিত হয় সামরিক অভ্যুত্থান। অভ্যুত্থানের পর প্রথমে হাশিম আল-আতাসি গণপ্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। এরপর ১৩৭৫ হিজরিতে (১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে শুকরি আল-কুয়াইতলি পুনরায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়।

১৩৭৫ হিজরিতে (১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর ও সিরিয়ার মাঝে আরব ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এই ঐক্যের মাধ্যমে জামাল আবদুন নাসেরের রাষ্ট্রপতিত্বে সংযুক্ত আরব প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু এই সংযুক্ত প্রজাতন্ত্র মাত্র চার বছর টিকে থাকে। ১৩৮১ হিজরিতে (১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে) সিরিয়ায় আরেকটি অভ্যুত্থান হয় এবং অভ্যুত্থানে নাজিম আল-কুদসি রাষ্ট্রপতিত্ব লাভ করে। সিরিয়ায় এভাবে একের পর এক অভ্যুত্থান হতেই থাকে। ১৩৮১ হিজরির শেষদিকে আরও একটি অভ্যুত্থান হয়, কিন্তু নাজিম আল-কুদসি তার পদে বহাল থাকে। মন্ত্রণালয়ে পরিবর্তন আসে। পূর্ববর্তী অভ্যুত্থানের নেতাদেরকে দেশান্তর করা হয়। তারপর বিচ্ছিন্নবাদীদের নেতারা আবার দেশে ফিরে এসে ১৩৮২ হিজরিতে নতুন করে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করে। কিন্তু তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। তারপর ১৩৮২ হিজরির (১৯৬২ খ্রিষ্টাব্দের) শেষদিকে আরেকটি অভ্যুত্থান হয় এবং লুআই আতাসির নেতৃত্বে একটি বিপ্লব-পরিষদ গঠন করা হয়। লুআই আতাসি পুনরায় মিশরের সাথে ঐক্য স্থাপনের এবং ইরাককেও এই ঐক্যে আনার চেষ্টা করে।

কিন্তু কিছুদিন পর ১৩৮৩ হিজরিতেই (১৯৬৩ খ্রিষ্টাব্দেই) পিপলস পার্টির নেতৃবৃন্দ ও সদস্যরা বিচ্ছিন্নবাদীদের সাথে বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। তাদের মধ্য হতে আমিন হাফিজ ক্ষমতা গ্রহণ করে। তারপর ১৩৮৬ হিজরির (১৯৬৬ খ্রিষ্টাব্দের) বাথ পার্টির একটি শাখার মাধ্যমে আরেকটি অভ্যুত্থান হয় এবং নুরুদ্দিন আতাসি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি হয়। তারপর প্রেসিডেন্ট হাফিজ আল-আসাদ ১৩৯০ থেকে ১৪২০ হিজরি (২০০০ খ্রিষ্টাব্দ) পর্যন্ত এককভাবে কর্তৃত্ব করে। এরপর হাফিজ আল-আসাদের পুত্র বাশার আল-আসাদ তার স্থলবর্তী হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 লেবানন

📄 লেবানন


১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) যখন লেবানন ফ্রান্স থেকে স্বাধীনতা লাভ করে, তখন বাশারা আল-খুরি প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির পদ লাভ করে। ১৩৭১ হিজরি পর্যন্ত সে এই পদে বহাল থাকে। লেবাননের যে বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, তা হলো, লেবানন নানা ধর্মে বৈচিত্র্যপূর্ণ একটি রাষ্ট্র। লেবাননের জনগণের মধ্যে শিয়া ২৮%, ম্যারোনাইট ২৪%, সুন্নি ১৯%, অর্থোডক্স ৯%, দরজি ৬%, ক্যাথলিক ৬% এবং আর্মেনিয়ান ৫%।

ফরাসিরা লেবানন সাম্রাজ্য তৈরি করেছিল কেবল খ্রিষ্টানদের কর্তৃত্ব করার জন্য। আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায়, শুধু ম্যারোনাইটদের জন্য। ফরাসিরা লেবাননের রাজনীতির বিন্যাস করেছিল এভাবে যে, রাষ্ট্রপতি হবে ম্যারোনাইট, প্রধানমন্ত্রী সুন্নি, প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার শিয়া, সুপ্রিম কমান্ডার ও গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হবে ম্যারোনাইট, আর চিফ অব স্টাফ হবে দরজি। পার্লামেন্ট ও সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পদ বণ্টিত হয়েছিল বিভিন্ন মুসলিম ও খ্রিষ্টান গোত্রগুলোর মাঝে। কিন্তু যখন গণপ্রজাতন্ত্রী লেবানন প্রতিষ্ঠিত হলো, তখন লেবানন একটা টাইমবোমাতে পরিণত হলো। যা যেকোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।

প্রতি ছয় বছর পর নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের নিয়ম করা হয়। ১৩৭১ হিজরিতে (১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে) কামিল শামউন লেবাননের রাষ্ট্রপতি নিবাচিত হয়। তার মেয়াদ শেষে দ্বিতীয়বার রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের এই পদ্ধতি পরিবর্তনের চেষ্টা করে সে। এই কাজ করতে গিয়ে তাকে বিরোধিতার মুখে পড়তে হয়। ১৩৭৮ হিজরিতে (১৯৫৯ খ্রিষ্টাব্দে) যখন কামেল শামউন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চায়, তখন গৃহযুদ্ধের আগুন জ্বলে ওঠার উপক্রম হয়। কিন্তু আল্লাহ সে সময় লেবাননকে রক্ষা করেন। যুক্তরাষ্ট্র লেবানন ত্যাগ করে চলে যায়।

১৩৭৮ হিজরিতে ফুয়াদ শিহাব নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়। তারপরই ১৩৮৪ হিজরিতে (১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে) রাষ্ট্রপতি চার্লস হোলু দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়। চার্লস হোলুর আমলেই ১৯৬৭ খ্রিষ্টাব্দে ৬৭-এর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ইহুদিদের দখলীকৃত অঞ্চল থেকে বিতাড়িত ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে লেবাননে। তারপর ১৩৮৯ হিজরিতে (১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) লেবাননের প্রধানমন্ত্রী রশিদ কারামি প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুন নাসেরের সাথে 'কায়রো এরেজমেন্ট' চুক্তি করে। কায়রো এরেজমেন্ট চুক্তিতে লেবাননে ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য শরণার্থী শিবির তৈরি করার কথা উল্লেখ করা হয়।

তারপর ১৩৯০ হিজরিতে (১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে) সুলাইমান ফ্রেইঙ্গ রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে। তার শাসনামলে লেবাননে ফিলিস্তিনি মুভমেন্ট এবং সীমান্তে ইহুদিদের ওপর আত্মঘাতী হামলা বেড়ে যায়। লেবাননে ফিলিস্তিনি শক্তি বাড়তে থাকে। এমনকি বলা হতে থাকে, লেবাননই ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র ছিল। লেবানিজ সরকার উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অক্ষম হয়ে পড়ে। ইসরাইল লেবাননে গেরিলা হামলা চালাতে শুরু করে। ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনী ‘পিএলও’ বা প্যালেস্টাইন মুক্তি সংস্থার নেতাদের ওপর গুপ্তহত্যা চালাতে থাকে। পুরো লেবানন অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে।

**লেবাননের গৃহযুদ্ধ (১৩৯৫ হিজরি/১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দ)**

১৩৯৫ হিজরিতে লেবাননের বিভিন্ন দলের মাঝে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। খ্রিষ্টানরা লেবাননে ফিলিস্তিনিদের বড় ধরনের ক্ষমতা অনুভব করে, যা অন্য কেউ বুঝতে পারে না। এই সময়ে লেবাননের মুসলিমরা যেমন ফিলিস্তিনিদের সাহায্য করতে থাকে, তেমনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল লেবাননে ফিলিস্তিনিদের অবস্থান নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনিদের লেবাননে অবস্থান ইহুদিদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাই লেবাননে গৃহযুদ্ধ লাগানোর পেছনে ইসরাইল ও পাশ্চাত্য দেশগুলো বড় ভূমিকা পালন করে।

লেবাননের গৃহযুদ্ধের সমস্যা নিয়ে আলোচনার জন্য দামেশকে ১৩৯৬ হিজরিতে (১৯৭৬ খ্রিষ্টাব্দে) আরবদের শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে সিরিয়ান সেনাবাহিনীকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্য লেবাননে পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৩৯৬ হিজরিতে ইলিয়াস সার্কেস লেবাননের রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচিত হয়। ১৩৯৭ হিজরিতে (১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ইসরাইল হঠাৎ লেবাননে আক্রমণ করে দক্ষিণ লেবানন দখল করে নেয়। পরিস্থিতি আরও অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। প্রতিটি দলের মাঝে দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে সিরিয়ান বাহিনী লেবাননে প্রবেশ করে ফিলিস্তিনি বিদ্রোহী ও বিদ্রোহীদের সাহায্যকারী বিভিন্ন মুসলিম দলকে দমন করার জন্য। সিরিয়ান বাহিনী তাদের মিশনে সফল হওয়ার পর ফিলিস্তিনিরা ও অন্যান্য মুসলিমরা সিরিয়াকে সাহায্য করার ঘোষণা দেয়। সিরিয়ান বাহিনী খ্রিষ্টান মিলিশিয়াদের দিকে অগ্রসর হয়।

খ্রিষ্টান মিলিশিয়ারা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাহায্য চায়, কিন্তু ইসরাইলের কাছে আশ্রয় নিতে বাধ্য করার জন্য ইউরোপ কিংবা যুক্তরাষ্ট্র কিছুই করে না মিলিশিয়াদের জন্য। অবশেষে সত্যিসত্যিই খ্রিষ্টান মিলিশিয়ারা ইহুদিদের সাথে যুক্ত হয়। ইহুদিরা এটাকে লেবাননের অবস্থা আরও শোচনীয় করার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। ইহুদিরা খ্রিষ্টান মিলিশিয়াদের প্রশিক্ষণ দেয়। সিরিয়ান সেনাবাহিনী, ফিলিস্তিনি ও লেবাননের মুসলিমদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য তারা আধুনিক আমেরিকান অস্ত্র দিয়ে মিলিশিয়াকে সাহায্য করে।

লেবাননের পরিস্থিতি ক্রমেই শোচনীয় হয়ে পড়ে। ম্যারোনাইট ও খ্রিষ্টানরা লেবাননে তাদের কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করতে না পেরে ইসরাইলকে সরাসরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানায়। ইহুদিরা তাদের আহ্বানে সাড়া দেয়, যা তাদেরকে আরও বেশি ভূখণ্ড দখল ও মুসলিম নিধনে সাহায্য করে। ১৪০২ হিজরিতে (১৯৮২ খ্রিষ্টাব্দে) ইসরাইল লেবাননে আক্রমণ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া ক্লাস্টার বোমা ও আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করে।

ইহুদিরা বৈরুত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বৈরুতকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেওয়া হয়েছিল। পূর্বাঞ্চল ছিল খ্রিষ্টানদের আর পশ্চিমাঞ্চল ছিল মুসলিমদের। ইহুদিরা বৈরুতে পৌঁছতেই খ্রিষ্টানরা পূর্বাঞ্চলের সব প্রবেশপথ উন্মুক্ত করে দেয়। ইহুদিরা পূর্ব-বৈরুতে ঢুকে পড়ে। কিন্তু মুসলিমরা পশ্চিম-বৈরুতে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইহুদিদের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার জন্য মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। সিরিয়ান বাহিনীর সাহায্যপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি ও লেবানিজ মুসলিমদের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয় ইসরাইলের। ইসরাইলরা আর এগিয়ে যেতে পারে না।

ইহুদিরা লেবানন ধ্বংস করার পর এবং তাদের আক্রমণাত্মক যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করার পর বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়া শুরু হয়। ফিলিস্তিনিরা লেবানন ত্যাগ না করলে তাদেরকে হত্যা করা হবে বলে হুমকি দেয় ইসরাইল। কিন্তু সর্বশেষ শক্তি থাকা পর্যন্ত ফিলিস্তিনিরা এই হুমকি প্রত্যাখ্যান করে। তখন এই দায়িত্ব পালনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের আগমন ঘটে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র লেবাননে পা রাখতে না রাখতেই ফিরে যায়। সে সময় বশির আল-জামিল লেবাননের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়। (বশির আল-জামিল ছিল খ্রিষ্টান কাটায়েব পার্টির একজন নেতা। এই পার্টি ইসরাইলকে লেবাননে আক্রমণ করার আহ্বান জানায়।) লেবানিজরা তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। ইসরাইল যে বছর লেবাননে আক্রমণ করে, সে বছরেই বশির আল-জামিল আততায়ীর হাতে নিহত হয়। এরপর বশির আল-জামিলের ভাই আমিন আল-জামিল রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে।

ইসরাইল বশির আল-জামিলের হত্যাকাণ্ডকে কাজে লাগায়। পশ্চিম-বৈরুতের সাবরা ও শাতিলায় ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে গণহত্যায় খ্রিস্টান কাটায়েব পার্টি ইসরাইলকে সাহায্য করে। ইসরাইল কাটায়েব পার্টিকে অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করে এবং সৈন্যদের পাহারা দেয়। কাটায়েব পার্টি সাবরা ও শাতিলার শরণার্থী শিবিরে ঢুকে হাজার হাজার নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে। এরপরই ইসরাইল মুসলিম গণহত্যা চালায়। ১৩৯৪ হিজরিতে (১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) আইনুল হালওয়ায় এই গণহত্যা সংঘটিত হয়।

এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে আমিন আল-জামিল যুক্তরাষ্ট্রকে লেবাননের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য হস্তক্ষেপ করতে বলে। যুক্তরাষ্ট্র ফ্রান্স ও ব্রিটেনের সহায়তায় এক বহুজাতিক বাহিনী গঠন করে লেবাননে প্রবেশ করে। কিন্তু আত্মঘাতী হামলার মুখে যুক্তরাষ্ট্র টিকতে পারে না। লেবাননে আমেরিকান সেনা ঘাঁটিতে একটি আত্মঘাতী হামলা হয়। সেই হামলায় যুক্তরাষ্ট্র শত শত সৈন্য হারায়। ইসরাইল বুঝতে পারে, তারা নিজেদেরকে লেবাননের অথই জলে এনে ফেলেছে। তাই তারা লেবানন থেকে আংশিকভাবে চলে যেতে শুরু করে। ইসরাইল দক্ষিণ-লেবাননের বেকা ভ্যালি এবং ১৪০৫ হিজরিতে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করে রাখা তাদের দখলীকৃত ও সুরক্ষিত অঞ্চল টিকিয়ে রাখে। লেবাননের পরিস্থিতি উত্তপ্তই রয়ে যায়। শিয়া মতাদর্শী হিজবুল্লাহর হাত ধরে লেবাননে ইরানি কর্তৃত্বের উদ্ভব ঘটে। ইসরাইলের প্রতিনিধিত্বকারী লেবানিজ সৈন্যদের মাঝে ইসরাইলি কর্তৃত্ব বিস্তার লাভ করে। সেই সৈন্যরা লেবাননে ইসরাইলকে শক্তিশালী করার জন্য ইহুদিদের সাথে যোগ দেয়।

লেবানিজ জনগণ বুঝতে পারে, লেবাননে যা কিছু ঘটেছে, তাতে শুধু ইসরাইল লাভবান হবে। তারা বুঝতে পারে, প্রকৃত শত্রু ও ইসরাইলের প্রতিনিধিদের (যাদের সংখ্যা ছিল লেবানিজ বাহিনীর মাত্র ৮%-এর মতো) মোকাবিলা করতে লেবনিজদের ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই। অবশেষে ১৪১০ হিজরিতে (১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দে) তায়িফ চুক্তির মাধ্যমে লেবাননে গৃহযুদ্ধ শেষ হয়। কিন্তু ইসরাইল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রপতিকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নতুন করে গৃহযুদ্ধ বাধাতে চায়।

চেষ্টা করে। রাষ্ট্রপতির গাড়িতে মাইন লাগিয়ে দেওয়া হয়। গাড়ি চলার মাঝে বোমা বিস্ফোরিত হয়ে রাষ্ট্রপতিসহ আরও দশজন নিরপরাধ মানুষ নিহত হয়। কিন্তু লেবানিজ জনগণ গৃহযুদ্ধ শেষ করার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে।

এরপর ইলিয়াস হারাবি রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে। পরবর্তী কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে এমিল লাহুদ রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রিত্ব দেওয়া হয় রফিক হারিরিকে। ২০০৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি (১৪২৬ হিজরিতে) বোমা হামলার শিকার হয় রফিক আল-হারিরির গাড়িবহর। সেই হামলায় তিনি নিহত হন। তার মৃত্যু লেবাননকে আবারও সেই পুরোনো সংঘাতে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।

**গৃহযুদ্ধের পর লেবানন**

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চলতে থাকা গৃহযুদ্ধে লেবানন তার সব সম্পদ হারায়। যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর লেবানন তার ক্ষত সারিয়ে তোলার চেষ্টা করে। লেবানন সরকার সব দলের কাছ থেকে অস্ত্র জমা নেয়। শিয়া মতাদর্শী হিজবুল্লাহ ব্যতীত সব দল সরকারের সিদ্ধান্তের সাথে একমত হয়ে লেবানন সেনাবাহিনীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করে। যদিও এর ফলে লেবাননে নতুন করে দুর্ভাগ্যের বীজ বপন করা হয়, কিন্তু তারপরও দক্ষিণ-লেবাননে ইসরাইলি দখলের বিরুদ্ধে লেবানিজদের সহযোগিতা করে হিজবুল্লাহ যে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে, তা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। ইসরাইলি শক্তি ও তার অনুগত বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত অনেক আত্মঘাতী হামলা ও উত্তর ইসরাইলে কাত্যুশা রকেট হামলায় হিজবুল্লাহ অংশগ্রহণ করে। ইসরাইল লেবানিজ সেনাছাউনি ও হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে লাগাতার আক্রমণ করে প্রতিরোধ শক্তি ধ্বংস করার চেষ্টা চালায়। এমনকি ইসরাইলি সরকারের সদস্যরা লেবাননে লাগাতার ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করে। ১৪১৬ হিজরিতে (১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দে) সংঘটিত কানার গণহত্যা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। পেরিজ সরকার ইসরাইলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের পূর্বে ইসরাইলি সেনাবাহিনী এই গণহত্যা চালায়। কিন্তু তুমুল প্রতিরোধের মুখে ইসরাইল দক্ষিণ লেবানন ত্যাগ করতে বাধ্য হয়।

📘 ইসলামের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষ > 📄 জর্দানের হাশেমি সাম্রাজ্য

📄 জর্দানের হাশেমি সাম্রাজ্য


আমরা পূর্বেই জর্দানের হাশেমি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস জেনেছি। আমরা জেনেছি যে, জর্দানের হাশেমি সাম্রাজ্য ছিল পূর্ব জর্দানের একটি প্রদেশ। বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন শরিফ হুসাইনকে যার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। ১৩৬৬ হিজরিতে (১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে) জর্দান ব্রিটেনের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। ১৩৬৮ হিজরিতে (১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে) জর্দান আরবের সাথে ফিলিস্তিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। যুদ্ধের পর বাদশাহ আবদুল্লাহ জর্দান নদীর পশ্চিম তীর দখল করে নেয় এবং গ্রেট সিরিয়া প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানায়। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে সিরিয়া, জর্দান, লেবানন ও ফিলিস্তিন আবদুল্লাহর শাসনাধীন হয়ে পড়ত। কিন্তু এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। ১৩৭১ হিজরিতে (১৯৫২ খ্রিষ্টাব্দে) বাদশাহ আবদুল্লাহ জেরুজালেমে আততায়ীর হাতে নিহত হয়। তারপর যুবরাজ তালাল ক্ষমতা লাভ করে। কিন্তু মানসিক অসুস্থতার অভিযোগে ১৩৭৩ হিজরিতে তাকে পদচ্যুত করা হয়। তালালের পর তার ছেলে বাদশাহ হুসাইন রাজক্ষমতা লাভ করে।

বাদশাহ হুসাইনের শাসনামলে ইরাকের সাথে জর্দানের ঐক্য সম্পাদিত হয়। তখন ইরাক শরিফ পরিবারের অধীনে ছিল। তারপর ইরাকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়া হলে এই ঐক্য ভঙ্গ হয়ে যায়। তার শাসনকালেই ইতিহাসবিখ্যাত ৬৭-এর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। জর্দান এই যুদ্ধে জর্ডান নদীর পশ্চিমাঞ্চল ও ফিলিস্তিন সংলগ্ন একটি সরু উপত্যকা হারায়।

১৩৯৯ হিজরিতে (১৯৭৯ খ্রিষ্টাব্দে) মিশরের সাথে আরববিশ্ব সম্পর্ক ছিন্ন করার পর জর্দানই প্রথম পুনরায় মিশরের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। আরব দেশসমূহ ১৩৯৪ হিজরিতে (১৯৭৪ খ্রিষ্টাব্দে) এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, ফিলিস্তিনের যে ভূখণ্ড স্বাধীন হবে, তা ফিলিস্তিনিদেরই থাকবে। জর্দান এই সিদ্ধান্তে ঐকমত্য প্রকাশ করে। ১৪১১ হিজরির (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের) উপসাগরীয় যুদ্ধে শুরুর দিকে ইরাকের পক্ষ নেওয়া জর্দানের ব্যতিক্রমী অবস্থান ছিল। যুদ্ধের পর পরই জর্দান সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে ১৪১৫ হিজরিতে (১৯৯২ খ্রিষ্টাব্দে) ইয়ারিব উপত্যকায় ইসরাইলের সাথে শান্তিচুক্তি করে। পরবর্তীকালে ইয়ারিব উপত্যকার নাম হয়ে যায় শান্তির উপত্যকা। শান্তিচুক্তির মাধ্যমে ৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরাইল কর্তৃক দখলীকৃত সরু উপত্যকা ফিরে পায় জর্দান। কিন্তু এই চুক্তির কিছু পয়েন্ট ছিল অদ্ভুত। যেমন: জর্দানের দুটি বসতি ইসরাইলের সাথে এই মর্মে চুক্তি করে যে, প্রিন্সিপাল ল্যান্ড ফর পিচ এর সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ায় তারা ইসরাইলকে পঁচিশ বছর ভাড়া প্রদান করবে।

জর্দানের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, জর্দান স্বল্প সম্পদের দেশ হিসেবে পরিচিত। জর্দান মূলত পাশ্চাত্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে। ১৩৮৭ হিজরিতে (১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে) পাশ্চাত্য থেকে অমুখাপেক্ষী করে তুলতে এবং বাজেট পূরণ করতে মিশর, সিরিয়া ও সৌদি আরব জর্দানকে ১২ মিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করে। কিন্তু পশ্চিমা ষড়যন্ত্রের কারণে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়নি। ১৪১৯ হিজরিতে (১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দে) বাদশাহ হুসাইন ইনতেকাল করে। তার ছেলে বাদশাহ দ্বিতীয় আবদুল্লাহ তার স্থলাভিষিক্ত হয়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00