📄 ইরাক-ইরান যুদ্ধ (১৪০০-১৪০৮ হি./১৯৮০-১৯৮৮ খ্রি.)
সাদ্দام হুসাইন ইরাককে ইরানের বিরুদ্ধে এক অনিয়ন্ত্রিত যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেন। আমরা পূর্বে ইরানের অধ্যায়ে এ বিষয়ে আলোচনা করেছি। ইসলামের শত্রুরা সাদ্দাম হুসাইনকে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। শত্রুরা এ কাজের কিছু মনোযোগী শ্রোতা পেয়ে যায়। সীমাহীন আশাও দেখতে পায় এই যুদ্ধের মাঝে। কিন্তু সবই ছিল আষাঢ়ে স্বপ্ন। মিলিয়ন ইরাকির মৃত্যু, দেশ ধ্বংস হওয়া এবং রাষ্ট্রের ওপর ঋণের বোঝা বৃদ্ধি ব্যতীত তেমন কোনো লাভই হয় না এই যুদ্ধে। বরং অবশেষে কুয়েতের আক্রমণের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য ইরাক সব আশা ত্যাগ করে। সাদ্দাম হুসাইন প্রথমে স্বায়ত্তশাসন ও তেলের আয়ের কিছু অংশ প্রদানের মাধ্যমে কুর্দিদের বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি কুর্দিদের কঠোর শাস্তি দেন। অতঃপর ১৪০৮ হিজরিতে (১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) কুর্দিদের ওপর বিষাক্ত গ্যাস প্রয়োগের মাধ্যমে তিনি নারকীয় হত্যাকাণ্ড ঘটান।
📄 আরব কো-অপারেশন কাউন্সিল
১৪০৯ হিজরিতে (১৯৮৯ খ্রিষ্টাব্দে) মিশর, ইরাক, ইয়ামেন, জর্দান আরব কো-অপারেশন কাউন্সিল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ঐকমত্য প্রকাশ করে। আরব কো-অপারেশন কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে নানা ধরনের পরিকল্পনা প্রকাশ পেতে থাকে। এসব পরিকল্পনার মধ্য হতে ইরাক কর্তৃক উপসাগরীয় যুদ্ধ ও কুয়েত দখলের উদ্দেশ্যে প্রস্তুতি-পরিকল্পনা বিশেষভাবে প্রাধান্য পায়। জর্দান ও ইয়ামেন ইরাককে সহযোগিতা করার কথা বলে উৎসাহ দেয়। কুয়েত দখল জর্দানকে হিজায ও জাফা দখলের এবং ইয়ামেনকে সৌদির আসির দখলের পথ সুগম করে দেয়। এসব অঞ্চল পূর্বে জর্দান ও ইয়ামেনের অধীনে ছিল। বাদশাহ আবদুল আজিজ আলে সউদের শাসনামলে এই ভূখণ্ডগুলো সৌদি আরবের অধীনে চলে যায়। ইরাক, জর্দান ও ইয়ামেন মিশরের ভৌগোলিক গুরুত্ব ও অবস্থান অনুধাবন করে মিশরকেও তাদের দলে ভিড়াতে চায়। কিন্তু মিশর কুয়েতের ওপর ইরাকের এই স্বেচ্ছাচারী আক্রমণকে প্রত্যাখ্যান করে। উপসাগরীয় যুদ্ধ চলাকালীন আরব কো-অপারেশন কাউন্সিল বিলুপ্ত হয়।
📄 উপসাগরীয় যুদ্ধ (গালফ ওয়ার) ১৪১১ হি./১৯৯০ খ্রি.
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার পতন এবং প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হওয়ার পর ইসলামের শত্রু ইউরোপিয়ান ও আমেরিকানরা মুসলিমদের ধ্বংস করার জন্য পূর্ণ অবসর পেয়ে যায়। তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত হয়েছে, মুসলিম রাষ্ট্রের সাথে সরাসরি যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়া কিংবা তা দখল করা অথই সাগরে ঝাঁপ দেওয়ার নামান্তর। অথচ স্বয়ং মুসলিমদের হাতেই মুসলিমদের ধ্বংস করা সম্ভব। এজন্য শত্রুরা সাম্প্রতিক কালে উপনিবেশ-নীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটিয়ে সামরিক দখলদারির পরিবর্তে অর্থনৈতিক দখলদারি শুরু করেছে। এখন তারা সরাসরি যুদ্ধ ত্যাগ করে মুসলিমদের পরস্পরের যুদ্ধ লাগিয়ে দিচ্ছে।
শত্রুরা সাদ্দام হুসাইনকে কুয়েতের বিরুদ্ধে উসকে দিয়েছিল। পেট্রোলিয়াম (তেল) সম্পদের মাধ্যমে ইরাকের যে সমৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল, দীর্ঘ আট বছরের যুদ্ধে তা পুরোপুটি ধ্বংস হয়ে যায়। সে সময়ে যুদ্ধ করার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য শক্তিই ছিল না। কুয়েতের সাথে ইরাকের সামরিক শক্তি তুলনা করার কোনো কারণ ছিল না তখন। তা ছাড়া কুয়েতের কখনো মনে হয়নি যে, ইরাক তাদের সাথে যুদ্ধ করতে পারে। কেননা ইরানের সাথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে কুয়েত ইরাকের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ইরাক মনগড়া অযৌক্তিক কিছু ইস্যু বানিয়ে নেয়। ১৪১১ হিজরিতে কুয়েতে আক্রমণ করে ইরাক। সাদ্দাম হুসাইন ভেবেছিল, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ন্যাটো তাকে সাহায্য করবে এবং ১৪০৮ সালে সংঘটিত কুর্দি-হত্যাকাণ্ডের মতো এবারও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে। কিন্তু পাশ্চাত্য কুয়েতের ওপর ইরাকি আগ্রাসনকে প্রত্যাখ্যান করে। সাদ্দাম হুসাইন বুঝতে পারে, এই প্রত্যাখ্যান আন্তর্জাতিক চক্রান্ত-পরিকল্পনা।
সাদ্দام হুসাইনের কুয়েত দখলের ও কুয়েতের সম্পদ ভোগের সুখ-স্বপ্ন টুটে যায়। ঘুম থেকে জেগে সে বুঝতে পারে, প্রতারণা করা হয়েছে তার সাথে। সব প্রতিশ্রুতি ধোঁকা বৈ কিছু ছিল না। আত্মরক্ষা ও বড় ভুল সংশোধনের পরিবর্তে সাদ্দাম হুসাইন তার অবস্থানে অনড় থাকেন।
চরমভাবে পরাজিত হয়ে সবকিছু হারানো পর্যন্ত তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যান। ১৪১২ হিজরিতে (১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দে) মিত্রশক্তি ইরাককে কুয়েত থেকে বের করে দেয়।
এই যুদ্ধের ফলে ইসলামের শত্রুদের কয়েকটি উদ্দেশ্য সাধন হয় :
* উপসাগরীয় রাষ্ট্রসমূহের আদর্শ ইসলামি অর্থনীতিকে আঘাত হানা।
* ইরাকি সামরিক শক্তি ধ্বংস করে দেওয়া, যা ইসরাইলের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
* ১৪০৮ হিজরিতে (১৯৮৮ খ্রিষ্টাব্দে) রাবাত সম্মেলনে মুসলিম আবরবিশ্বের মাঝে সমঝোতা হওয়ার পর নতুন করে বিদ্বেষ ও শত্রুতা সৃষ্টি করা।
* প্রতিরক্ষার নাম করে প্রতিবেশি উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোতে ন্যাটো বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
* বিশ্ববাসীর দৃষ্টি ফিলিস্তিন আগ্রাসন থেকে সরিয়ে অন্য ঘটনার দিকে নিবদ্ধ করা।
* ইরাকি জনপদকে দুর্বল করে দেওয়া এবং সবচেয়ে বড় ইসলামি শক্তিতে পরিণত হওয়ার পর সেই শক্তিকে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য অর্থনৈতিক ও খাদ্য অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া। (দীর্ঘ দশ বছর এই অবরোধ অব্যাহত থাকে, যার বলি হয় ইরাকের সাধারণ জনগণ।)
ইরাকি জনগণকে দুর্বল করা, ইরাককে খণ্ডবিখণ্ড করা, উত্তরের কুর্দিদের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনকে উসকে দেওয়া এবং দক্ষিণের শিয়াদের খেপিয়ে তোলার জন্য আমেরিকা অবরোধ তুলে নিতে গড়িমসি শুরু করে। এ সবকিছুই বিশ্ব-মুসলিমের সামনে ঘটতে থাকে। মুসলিমরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়েছে, তারা এমন পরিণতি বরণ করার অপেক্ষায়ই ছিল।
২০০১ সালে ৯/১১-এর ঘটনার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালায়। তারপর ইরাকের দিকে অগ্রসর হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, ইরাক সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেয় এবং তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। আরও দাবি করে, ইরাকের কাছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে।
জাতিসংঘ অনুসন্ধানকারী দল পাঠায় ইরাকে। অনুসন্ধানকারী দলটি ইরাকের প্রতিটি পাথর পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে, কিন্তু তথাকথিত গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায় না তারা। তারপরও আমেরিকা গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যাপারে গোঁ ধরে থাকে। ব্রিটেন ও স্পেনকে নিয়ে জোটবাহিনী গড়ে তোলে। গণবিধ্বংসী অস্ত্র ছাড়াও আমেরিকা ইরাকের স্বৈরশাসন ধ্বংস করে ন্যায় ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখায় ইরাকি জনগণকে।
২০/৩/২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে আমেরিকা ও তার মিত্রবাহিনী ইরাকে আক্রমণ করে। ইরাকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ কিংবা অবৈধ—সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে।
৯/৪/২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদ দখল করে নেয়। সারা দেশে যুদ্ধের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে। ১৪/১২/২০০৩ খ্রিষ্টাব্দে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাদ্দাম হুসাইনকে বন্দি করে।
মিত্রশক্তি ইরাকের অবকাঠামো, বাগদাদের সভ্যতার নিদর্শন, মানব ও ইসলামি ঐতিহ্য ধ্বংস করে দেয়। মসজিদ ধ্বংস করে এবং পেট্রোলসংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করে নেয়। শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে দেয়। ইরাককে পরিণত করে এক উন্মুক্ত কারাগারে। সেখানে হত্যা, লুণ্ঠন ও নির্যাতনের ঘৃণ্য চর্চা চালায় তারা। মসজিদের ভেতরে নারীদের সম্ভ্রম লুণ্ঠন করে। এ সবের মধ্য দিয়ে আমাদের সামনে তুলে ধরে পুরোনো ক্রুসেডের নতুন এক কালো অধ্যায়।